ঢাকা, শুক্রবার, ২৯ মে ২০২০, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Bangla Insider

ব্যর্থতার দায় কার কতটা?

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৬ এপ্রিল ২০২০ সোমবার, ০৯:০১ পিএম
ব্যর্থতার দায় কার কতটা?

বাংলাদেশে যেটা আশঙ্কা করা হচ্ছিল, সেটাই হচ্ছে, গত কয়েকদিনে করোনা রোগী শনাক্তের হার জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। যদি পরীক্ষার হার তেমন বাড়েনি। কিন্তু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে এবং বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এইভাবে বাড়তে থাকলে মহামারিতে প্রবেশ করতে বেশি সময় লাগবে না। আর বাংলাদেশের এই জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়, যদিও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে যে এটা একটা বৈশ্বিক বিপর্যয় তাই কেউ দায়ী নয়। কিন্তু সাধারণ মানুষ মনে করছে, আমাদের সামনে একটা বিরাট সুযোগ ছিল। কারণ বাংলাদেশে করোনার বিপর্যয় শুরু হয়েছে অনেক দেরিতে, এই সুযোগটি আমরা কাজে লাগাতে পারেনি। যেকোন সমস্যা সমাধানের আগে ক্ষত চিহ্নিত করতে হয়, কার কতটুকু ব্যর্থতা সেটা নির্ণয় করতে হয় এবং সেই ব্যর্থতার ক্ষতগুলোকে নিরাময় করেই সামনে এগোতে হয়। কাজেই বাংলাদেশে করোনার মোকাবেলার ক্ষেত্রে এবং মহামারি ঠেকানোর ক্ষেত্রে কার কোথায় ব্যর্থতা তা নির্ণয় করতে হবে নির্মোহভাবে। কাউকে ছোট করার জন্য নয় বা কাউকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য নয়, বরং করোনা মোকাবেলায় সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের জন্যই ব্যর্থতাগুলো চিহ্নিত করা প্রয়োজন। আসুন আমরা সেই ব্যর্থতাগুলো দেখে নেই-

স্বাস্থ্যমন্ত্রী

বাংলাদেশে করোনা মোকাবেলার অনেক সুযোগ ছিল। যখন চীনের উহানে করোনা শনাক্ত হয়েছে, তখন থেকেই বাংলাদেশ জানতো যে, বাংলাদেশে এই করোনা সংক্রমণ হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। আমরা যদি জানুয়ারি মাস থেকেও প্রস্তুতি গ্রহণ করতাম, তাহলে আমাদের এই সঙ্কটগুলো তৈরি হতোনা। যখন ৮ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে করোনা বাংলাদেশে শনাক্ত হলো, তখন দেখা গেল যে আমাদের চিকিৎসকদের জন্য পিপিই নেই, পর্যাপ্ত আইসিইউ নেই, বিশেষায়িত যে হাসপাতালগুলোর কথা বলা হয়েছে সেগুলো প্রস্তুত নয়। এমনকি রক্ত পরীক্ষার কিটসহ বিভিন্ন আনুষাঙ্গিক জিনিসপত্রের স্বল্পতা রয়েছে। কাজেই আমরা যতই আন্তরিক থাকি না কেন, আমরা যদি চেকলিস্ট তৈরি না করি এবং আমাদের করণীয় কি সেটা বের না করি আর অন্যান্য দেশকে দেখে অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে না পারি- তাহলে সেই ব্যর্থতার দায় আমাদেরকে নিতেই হবে। কাজেই এক্ষেত্রে আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রীও ব্যর্থতার দায় এড়াতে পারেনা।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী

বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণের সূচনা হয় ইউরোপ থেকে আসা প্রবাসীদের মাধ্যমে। যখন ইতালিসহ ইউরোপে করোনা ছড়িয়ে পড়ে, তখন ঐসব দেশের অভিবাসীরা বাংলাদেশে ফেরা শুরু করে। এসময় পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় যদি ঐ দেশগুলোতে অবস্থারত দূতাবাসকে কঠোর নির্দেশনা দিতো এবং যারা দেশে আসতো তাঁদেরকে আগেই বলা হতো যে দেশে আসলে তাঁদের বাধ্যতামূলোক কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে এবং তালিকা তৈরি করে সেই তালিকা বাংলাদেশ বিমানবন্দর বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে দিত তাহলে তাঁদের চিহ্নিত করা এবং কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করা সহজ হতো। কিন্তু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সেই কাজটি করতে ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনেক কর্মকর্তা জানতোই না যে আমাদের দেশে কতজন অভিবাসী এসেছেন। দীর্ঘদিন ধরে আমাদের দূতাবাসগুলোর কর্মদক্ষতা এবং দায়িত্বশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলি, এবার সেটার প্রমাণ আমরা হাড়ে হাড়ে পেয়েছি। কাজেই এই ব্যর্থতার দায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড়াতে পারবেন না।

বাণিজ্য মন্ত্রী

অনেকে মনে করেন যে, করোনায় বাংলাদেশের যে পরিস্থিতি, তাঁর মূল অঘটনটি ঘটিয়েছেন আমাদের বাণিজ্য মন্ত্রী টিপু মুন্সী। কারণ তিনি তাঁর স্বার্থের উর্ধ্বে থেকে গার্মেন্টসগুলো বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। বরং নিজে গার্মেন্টসের মালিক হওয়াতে তিনি গার্মেন্টস খোলার মতো একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন এবং সেই সিদ্ধান্তের মাশুল বাংলাদেশকে দিতে হবে বলে মনে করছেন অনেকে। এছাড়াও শুরু থেকেই যখন সারাদেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হলো- তখন যারা এই সিদ্ধান্তের সাথে রাজি ছিলেন না তাঁদের মধ্যে বাণিজ্য মন্ত্রীও একজন বলে জানা গেছে। আর এই কারণে ব্যর্থতার দায় অবশ্যই বাণিজ্য মন্ত্রীকেও নিতে হবে।

ধর্ম প্রতিমন্ত্রী

যখন প্রধানমন্ত্রী নিজে বললেন যে মসজিদগুলোতে আপাতত না যাওয়ার জন্য, জুম্মার নামাযসহ সকল নামায বাড়িতে পড়ার জন্য, যখন আমরা দেখলাম যে সৌদি আরবসহ বিভিন্ন ইসলামিক দেশগুলো মসজিদ বন্ধ করে দিল, তখন বাংলাদেশে মসজিদগুলো খোলা ছিল দীর্ঘদিন। ২৬শে মার্চ সাধারণ ছুটি ঘোষণার পরেও মসজিদগুলোতে মুসল্লী সীমিতিকরণের কোন উদ্যোগ নিতে পারেনি ধর্ম মন্ত্রণালয়। ধারণা করা হচ্ছে, বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণের একটা বড় ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে এই মসজিদগুলো থেকে। কারণ করোনা ভাইরাস খুব সহজেই সংক্রমিত হয় গণজমায়েতপূর্ণ স্থানগুলোতে এবং তাই বারবার বলার পরেও মসজিদগুলো বন্ধ না করতে পারার ব্যর্থতা অবশ্যই নিতে হবে ধর্ম প্রতিমন্ত্রীকে।

দূর্যোগ প্রতিমন্ত্রী

যখন বিদেশ থেকে লোকজন আসে, তাঁদেরকে আশকোনা হজ ক্যাম্পে রাখার দায়িত্ব ছিল দূর্যোগ মন্ত্রণালয়ের এবং দূর্যোগ মন্ত্রণালয় এই ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেনি। যখন ইতালি ফেরতরা অভিযোগ করেছিল যে, সেখানে নূন্যতম থাকারা অবস্থা নেই, খাবার, পানি বা বিছানার চাদর নেই তখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে যে এটা দূর্যোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ছিল এবং দূর্যোগ মন্ত্রণালয় এটা করতে পারেনি। দ্বিতীয় ব্যর্থতা হলো যে, যখন সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হলো, সারাদেশের যত নিম্ন আয়ের মানুষ এবং দিনমজুর রয়েছে তাঁদের মাঝে যে যেভাবে পারে খাদ্য বিতরণ করা শুরু করলো এবং তাতে দূর্যোগ মন্ত্রণালয়ের কোন নিয়ন্ত্রণ ছিলনা। ফলে আবার সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়লো এবং বিভিন্ন স্থানে মানুষ জড়ো হওয়া শুরু করলো। একারণে আমরা বলতে পারি যে এখানে দূর্যোগ মন্ত্রণালয়ের সমন্বহীনতা ছিল এবং দূর্যোগ মন্ত্রণালয় নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

আমরা কাউকে দোষী প্রমাণিত করতে চাই না কিংবা কাউকে ব্যর্থ বলে বাতিলও করতে চাচ্ছি না। কিন্তু এই ব্যর্থতাগুলো আমাদের শেখাবে এবং করোনা মোকাবেলার ক্ষেত্রে আমরা জন্য সকলেই সমন্বিতভাবে কাজ করি, সেজন্য এই ক্ষতগুলো চিহ্নিত করতে করা হলো।