ঢাকা, বুধবার, ২৭ মে ২০২০, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Bangla Insider

বিএনপি: বয়স্ক নাগরিক পার্টি

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২২ মে ২০২০ শুক্রবার, ০৮:০০ পিএম
বিএনপি: বয়স্ক নাগরিক পার্টি

বিএনপিকে বলা হতো তারুণ্যের প্রতীক। দলটি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই তরুণদের উপর নজর দিয়েছিল এবং তরুণদেরকে দলে ভেড়ানোর জন্য নানারকম কৌশল এবং উপায় উদ্ভাবন করা হয়েছিল। জিয়াউর রহমান হিজবুল বাহারে নিয়ে তরুণদের রাজনীতির দীক্ষা দিয়েছিলেন এবং ‘মানি ই নো প্রবলেম’ বলে তাদেরকে টেন্ডারসহ নানারকম অবৈধ কাজকর্মের জন্য উৎসাহিত করেছিলেন। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিএনপিতে তারুণ্যের জয়জয়কার কমেনি বরং গোলাম ফারুক অভি, সানাউল হক নিরুর মতো সন্ত্রাসনির্ভর ছাত্র রাজনীতিবিদরাই তারুণ্যের কাছে চিত্তাকর্ষক হয়ে ওঠেন। বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক রাজনীতিতে বিএনপির সমর্থক ছিল বিপুল।

শুধু ছাত্রদল নয়, ১৯৯১ সালে ক্ষমতায় আসলেও বিএনপিতে তারুণ্যের জয়জয়কার ছিল। সাদেক হোসেন খোকা, মির্জা আব্বাসের মতো নেতারা তখন ছিলেন অপেক্ষাকৃত তরুণ এবং উদীয়মান। সেই তারুণ্যনির্ভর বিএনপি এখন আর নেই। এখন বিএনপি যেন বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে গেছে। বিএনপিকে এখন বলা হয় বয়স্ক নাগরিক পার্টি। যে দলটিতে তরুণদের কোন সম্ভাবনা নেই, তরুণদের কোন ভবিষ্যৎ নেই এবং আলোচিত কোন তরুণ বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। বিএনপিতে তরুণ বলতে বোঝানো নয় পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়সের হাবিবুন নবী খান সোহেলকে, মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী আলালকে। এরা সবাই তারুণ্য পার করে এসেছেন বহু আগেই। কিন্তু ছাত্রদল বা যুবদলের একটা সময় যে চিত্তাকর্ষক নেতৃত্ব ছিল, যেটা তরুণদেরকে উদ্বেলিত করতো সেরকম নেতৃত্ব এখন নেই। ছাত্রদল গত ডাকসু নির্বাচনে যে ভোট পেয়েছে তাতে বিএনপি নেতাদের লজ্জা পাবারই কথা।

বিএনপির যে স্থায়ী কমিটি, সেই কমিটিতে এখন তারুণ্যের কোন ছোঁয়া নেই। স্থায়ী কমিটির সদস্যরা নানা রোগশোকে জর্জরিত। অর্ধেকের বেশি স্থায়ী কমিটির সদস্যরা ঠিকমতো হাঁটাচলা করতে পারেন না, কথাবার্তা বলতে পারেন না। বিএনপির স্থায়ী কমিটি বাদ দিয়ে অন্য পর্যায়ের নেতৃত্বেও তারুণ্যের সেরকম অবস্থান দেখা যায় না। কেন এমন পরিণতি হলো?

২০০১ এর নির্বাচনে তারেক জিয়ার নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতায় আসে এবং সে সময় তারেক জিয়ার উত্থান ঘটে। তারেক জিয়া বিএনপিতে দুটি ধারা তুলে ধরে। একটি খালেদা জিয়ার অনুগতদের ধারা, যেটা বয়স্ক এবং প্রবীণ। অন্যটি তরুণদের ধারা, সেই ধারায় তিনি আমানুল্লাহ আমান, এহসানুল হক মিলন, রুহুল কুদ্দুস দুলুর মতো তরুণ নেতাদেরকে মন্ত্রিত্ব দেন এবং একটি প্যারালাল ধারা গঠন করেন। কিন্তু ২০০৬ এ যখন বিএনপি ক্ষমতাচ্যূত হয়, তারপর থেকে বিএনপিতে তরুণদের প্রবেশদ্বার বন্ধ হয়েছে।

অনেক বিশ্লেষকরা মনে করেন যে, বিএনপির ভুল রাজনীতি এবং ব্যর্থতার জন্য আজ তরুণরা বিএনপিতে আকৃষ্ট হচ্ছে না। বিএনপিতে তরুণদের বদলে কেন বয়স্করা প্রাধান্য বিস্তার করে আছেন সেটা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বিএনপির অনেক নেতাই পাঁচটি কারণ খুঁজে পেয়েছেন-

১. বয়স্ক নেতারা কেউ জায়গা ছাড়তে চান না

অতীতে যেমন তরুণদেরকে তুলে আনা হতো, খালেদা জিয়া পর্যন্ত তরুণদেরকে উৎসাহিত করতেন এবং তরুণদের জন্য জায়গা করে দিতেন। কিন্তু গত এক যুগে দলে তরুণদেরকে জায়গা করে দেয়া হয়নি বরং ধুঁকতে থাকা, মৃতপ্রায় নেতারা জায়গা দখল করে রেখেছেন, কেউ জায়গা ছাড়তে রাজি নন। ফলে নতুন রক্ত সঞ্চালন বন্ধ হয়েছে।

২. বিএনপির ভ্রান্ত আদর্শ এবং রাজনীতি

এখনকার তরুণরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বহন করে, তারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যাপারে সোচ্চার। তারা রাজনৈতিক দলের সমালোচনা করবে কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ব্যাপারে আপোসহীন। এই তরুণরা বিএনপি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, তারা বিএনপির মধ্যে কোনো আদর্শ খুঁজে পায় না।

৩. স্বাধীনতাবিরোধীদের সাথে যোগসাজশ

স্বাধীনতাবিরোধীদের সাথে যোগসাজশের কারণে অধিকাংশ তরুণ বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে আগ্রহী নন।

৪. তারেক জিয়ার দুর্নীতি এবং লুটপাট

তারেক জিয়া হলো তরুণ সমাজের ভ্রষ্ট রাজনীতির প্রতীক। তারেক জিয়া হলো নষ্ট তারুণ্যের এক প্রতীক। এ কারণে তারেককে দেখে তরুণরা বিএনপিতে আগ্রহী হতে চায় না।

৫. সামগ্রিকভাবে তরুণদের রাজনীতির ব্যাপারে নেতিবাচক ধারণা

শুধু বিএনপি নয়, এমনিতেও তরুণরা রাজনীতির প্রতি এখন একটি নেতিবাচক ধারণা পোষণ করে এবং সেজন্য কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তারা সম্পর্কে থাকতে চান না।

বিএনপি নেতারা মনে করছেন যে, যারা অযোগ্য, যারা দলে এক ধরণের বোঝা হয়ে গেছেন, যারা কোন কাজই করতে পারছেন না, নানা রোগশোকে আক্রান্ত ব্যক্তিদেরকে অবিলম্বে জায়গা ছেড়ে দিতে হবে এবং তরুণদের জন্য জায়গা করে দিতে হবে। তবে যদি তারা জায়গা ছেড়ে না দেন, তাহলে তরুণরা মনে করবে যে, এই দলে যোগ দিয়ে তাদের কোন লাভ নেই এবং বিএনপি ক্রমশ বয়সের ভারে ন্যুব্জ একটি বৃদ্ধাশ্রমে পরিণত হবে।