ঢাকা, বুধবার, ২৭ মে ২০২০, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Bangla Insider

রাজনীতিতে কিছু সম্ভাবনার মৃত্যু

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২২ মে ২০২০ শুক্রবার, ০৯:০০ পিএম
রাজনীতিতে কিছু সম্ভাবনার মৃত্যু

রাজনীতি একটি নিরন্তর প্রয়াস। একজন রাজনীতিবিদ নিজেকে তিল তিল করে গড়ে তোলেন। স্থানীয় পর্যায় থেকে, ছোট্ট পরিসর থেকে নিজেকে জাতীয় মঞ্চে উদ্ভাসিত করেন। একজন ক্ষুদ্র স্থানীয় নেতা বা অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের কর্মী থেকে নিজের যোগ্যতা, গুণ এবং ধারাবাহিকতা দিয়ে একজন জাতীয় রাজনীতিতে স্থান করে নেন। জাতীয় রাজনীতির একজন তারকায় পরিণত হন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই রকম কিছু উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় তারকা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সম্ভাবনা জাগিয়েও তারা রাজনীতিতে টিকতে পারেনি। নানারকম দৈব দুর্বিপাকে সেই সম্ভাবনাগুলোর মৃত্যু ঘটেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের বিভ্রান্তি, পথভ্রষ্টটা এবং অস্থিরতাই তাদেরকে রাজনীতিতে টিকে থাকতে দেয়নি। রাজনীতিবিদ হিসেবে নিজেদেরকে ব্যর্থ করেছে, অথচ তাদের যোগ্যতা ছিল। কিছু বাস্তবতার কারণে এবং নিজেদের কারণে তারা সেই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারেনি। এরকম কয়েকজন রাজনীতিবিদকে আমরা এখন দেখে নেই।

সোহেল তাজ

২০০৮ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করেন, সেখানে শহিদ তাজউদ্দীন আহমেদের সন্তান সোহেল তাজকে স্বরাষ্ট্রপ্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়েছিলেন। সেই সময় তাকে দায়িত্ব প্রদান করাটাকে প্রত্যেক মানুষ ইতিবাচকভাবে নিয়েছিল। সোহেল তাজ কেবল বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ও রাজনীতিতে সম্ভবত সবচেয়ে মেধাবী মানুষ তাজউদ্দীন আহমেদের পুত্র হিসেবেই নয়, বরং সোহেল তাজ নিজেও একজন দক্ষ রাজনীতিবিদ হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছিলেন। তার কথাবার্তা, তার ইতিবাচক পদক্ষেপ মানুষকে আকৃষ্ট করেছিল। কিন্তু তার কি যেন কি হল! হঠাৎ করে তিনি পদত্যাগ করলেন। দেশের বাইরে চলে গেলেন। তার এই পদত্যাগ নিয়ে নানা রকম গুঞ্জন রয়েছে। অনেকে মনে করেন একটা প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে তিনি পদত্যাগ করেছিলেন। আবার অনেকে মনে করেন তাকে পারিবারিক চাপের কারণে আমেরিকায় চলে যেতে হয়েছিল। যেটিই হোক না কেন, এরপর সোহেল তাজের অস্থিরতা, অপ্রাসঙ্গিক বিষয় নিয়ে নানা রকম কথাবার্তা, তার রাজনীতির শেষ সম্ভাবনাটুকুও আর রাখতে দেয়নি। একটি সম্ভাবনার মৃত্যু হয়েছে।

আমানুল্লাহ আমান

আমানুল্লাহ আমান ডাকসুর ভিপি ছিলেন এবং স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব স্থানীয় নেতা ছিলেন। এরপর তার রাজনীতিতে উত্থানটা ছিল একটি সহজ অঙ্ক। সেটি ছিল জোয়ারে শুধুমাত্র গা ঠিকঠাক মতো ভাসিয়ে দিতে পারলেই হল। রাজনীতিতে তার জাতীয় নেতা হিসেবে আবির্ভাব ছিল শুধু কিছুটা সময়ের অপেক্ষা মাত্র। কিন্তু আমানুল্লাহ আমান সেটি করতে পারেননি। এর কারণ হল তার অর্থলিপ্সা, দুর্নীতি, অনিয়ম এবং ভ্রান্ত নীতি। আমানুল্লাহ আমান ২০০১ সালে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। কিন্তু প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তিনি নিজেকে উজ্জ্বল করে মেলে ধরতে পারেননি। এরপর রাজনীতিতে তাকে আর তেমন সক্রিয় দেখা যায় না। বরং শুধুমাত্র গতানুগতিক রাজনীতির ধারায় তিনি নিজেকে বন্দী করে রেখেছেন।

মাহি বি চৌধুরী

মাহি বি চৌধুরী ২০০১ সালে সবচেয়ে আলোচিত রাজনীতিবিদদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। সে সময় মনে করা হতো মাহি হতে যাচ্ছেন বিএনপির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা। কিন্তু পিতার সঙ্গে তিনিও বিএনপি ছেড়ে দেন। পরবর্তীতে তারা বিকল্পধারা নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন। এটি একটি কুটিরশিল্প ধরনের রাজনৈতিক দল। জাতীয় রাজনীতিতে অবদানহীন এই সাইনবোর্ড সর্বস্ব রাজনৈতিক দলটির মূল উদ্দেশ্য কী, পরে তা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে যায়। সরকারের সঙ্গে দেনদরবার করে নানারকম ব্যবসাবাণিজ্য হাসিল করাই এই রাজনৈতিক দলের মূল উদ্দেশ্য। মাহি বি চৌধুরী রাজনীতিতে আছেন কি নেই, সেটিই এক বড় প্রশ্ন? তবে রাজনীতিবিদ হিসেবে তার প্রচুর সম্ভাবনা ছিল। তিনি নিজেও মেধাবী। কিন্তু রাজনীতিবিদ হিসেবে তার সম্ভাবনার মৃত্যু ঘটেছে।

গোলাম মাওলা রনি

গোলাম মাওলা রনি রাজনীতিতে ছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতিতে হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো। ২০০৮ এর নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পান। নির্বাচিত হওয়ার পরে তিনি বিভিন্ন টকশো ও লেখালেখির মাধ্যমে জনপ্রিয়তাও পেয়েছিলেন। কিন্তু এই জনপ্রিয়তাই তার কাল হয়ে দাঁড়ায়। হয়তো জনপ্রিয়তার ভার তিনি বহন করতে পারেননি। এরপর তিনি নিজেই বিভ্রান্তিতে জড়ান। নানারকম বিভ্রান্তি শেষে তিনি কখনো তিনি জামাতের প্রতি আকৃষ্ট হন। এখন তিনি বিএনপির রাজনীতিতে নিজেকে সপে দিয়েছেন। সম্ভাবনা জাগিয়েও তিনি নিজের অযোগ্যতা এবং অস্থিরতার কারণে পথভ্রষ্ট হয়ে রাজনীতিতে তার সম্ভাবনার মৃত্যুটা নিজেই ঘটান।

এ রকম বাংলাদেশে আরও অনেক রাজনীতিবিদ আছেন, যারা মেধাবী, যারা সম্ভাবনা জাগিয়েছিলেন। কিন্তু সেই সম্ভাবনা জাগিয়েও তারা টিকে থাকতে পারেননি। এর জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী তারা নিজেরাই।