ঢাকা, শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২০, ৩১ শ্রাবণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

বিএনপির দখলে স্বাস্থ্যখাত

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০১ জুলাই ২০২০ বুধবার, ০৮:৫৮ পিএম
বিএনপির দখলে স্বাস্থ্যখাত

বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায়। দেশ চালাচ্ছে আওয়ামী লীগ। কিন্তু চাঞ্চল্যকর হলেও সত্য বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতটা বিএনপির দখলে। স্বাস্থ্যখাতের মূল যে ঠিকাদাররা ব্যবসা করে এরা সবাই বিএনপি- জামাতের লোক। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ঠিকাদার হলো মিঠু।

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতর ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে দিয়ে ছোটখাট ঠিকাদারি ব্যবসা শুরু হয়েছিলো মিঠুর। পরবর্তীতে ক্রমান্বয়ে স্বাস্থ্যখাতে প্রবেশ করেন তিনি। মিঠুর সিন্ডিকেট শুরু হয় বহু আগে। ৯১ সালে বিএনপির ক্ষমতার আমলেই মিঠু এই সিন্ডিকেট গড়ে তোলে যা আর ভাঙ্গা হয়নি। হাওয়া ভবন থেকে মিন্টো রোড, মহাখালী থেকে সচিবালয়, মন্ত্রীর দপ্তর থেকে বাসা-যুগের কিংবা সরকারের বদল হলেও স্বাস্থ্য খাতে ঠিকাদারি সাম্রাজ্যের গডফাদার হয়েই আছেন মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠু। বিএনপি আমলে যেমন খোদ সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ছেলে তারেক জিয়াই ছিলো তার দুর্নীতির পার্টনার। আবার আওয়ামী লীগ আমলে কোন বিশেষ মন্ত্রীর ছেলের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও সখ্য গড়ে স্বাস্থ্য খাতে যন্ত্রপাতি থেকে শুরু করে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কেনাকাটার নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতেই রেখেছেন বছরের পর বছর ধরে। গা বাঁচাতে সাত বছর ধরে কিছুটা পর্দার আড়ালে থেকে চালাচ্ছেন নিজের গড়া সিন্ডিকেটের সব কিছু। থাকছেন কখনো দেশে, কখনো বা দেশের বাইরে। কেনাকাটার বাইরে স্বাস্থ্য খাতের সরকারি পর্যায়ে বদলি-নিয়োগেও রয়েছে তাঁর সমান নিয়ন্ত্রণ। নিজের সিন্ডিকেটের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রয়োজনীয় জায়গাগুলোতে বসানো এবং অপছন্দের লোকদের অন্যত্র বদলি করানোর কাজও নিয়মিত করে ফেলছেন নানা প্রভাব খাটিয়ে।

এমনকি এখন পালিয়ে থেকেও সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় সব কিছুই চালিয়ে যাচ্ছেন। স্বাস্থ্য খাত সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র থেকে মিলেছে এমন তথ্য। গত ৩০ মে জনপ্রশাসনসচিবের কাছে লেখা এক চিঠিতে এই মিঠুসহ আরো বিভিন্ন পর্যায়ে স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতির বিভিন্ন তথ্য উপস্থাপন করেন কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের (সিএমএসডি) সাবেক পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শহীদউল্লাহ।

স্বাস্থ্যখাতের আরেক রাঘব বোয়াল জেএমআই গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক। মৌখিক আদেশে আপদকালীন সময়ে শত শত কোটি টাকার কাজ দেয়া হয়েছে এই কোম্পানিকে। ওষুধ প্রশাসনের মহাপরিচালক ও এই কোম্পানি কর্তৃপক্ষ ছাড়া আর কেউ বলতে পারবে না কত টাকার কাজ দেওয়া হয়েছিল তাদের। তার কারণেই করোনা ঝুঁকিতে পড়েছে ডাক্তার, নার্সসহ সম্মুখযোদ্ধারা। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে ভুয়া এন-৯৫ মাস্ক সরবরাহ করে ঝুঁকিতে ফেলা হয়েছে। আর যারা এসব ভুয়া মাস্ক গ্রহণ করতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন তাদের বদলিসহ নানা হয়রানি করা হয়েছে। আমেরিকায় উৎপাদিত এন-৯৫ এর কোনো পণ্য চালান দেশেই আসেনি। অথচ মহামারির সুযোগে ভুয়া মাস্ক তৈরি করে এন-৯৫ এর প্যাকেটে চালিয়ে দেয়া হয়েছে। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তাদের এই দুর্নীতি নিয়ে কথা বলেছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এই মহাজন সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে কাজ করছে। তবে বিপত্তি বেধেছে ভুয়া এন-৯৫ মাস্ক সরবরাহ নিয়ে। কোনো ধরনের নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে এই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছিল জেএমআই সিরিঞ্জ এন্ড মেডিকেল ডিভাইস নামের ওই দেশীয় কোম্পানি। তারা মুন্সীগঞ্জের নিজস্ব কারখানায় মাস্ক উৎপাদন করে এন-৯৫ বলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে হস্তান্তর করে। এই নকল মাস্ক সরবরাহের পর প্রথম প্রতিবাদ আসে মুগদা জেনারেল হাসপাতালের পক্ষ থেকে। এই হাসপাতালের এক পরিচালক ভুয়া এন-৯৫ মাস্কের মান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ দেন। কিন্তু এসব বিষয় আমলে নেয়নি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এই গ্রুপের এতই ক্ষমতা রয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে।

বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হলে উল্টো সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সাফাই গেয়ে প্রতিবাদ দেয় কেন্দ্রীয় ওষুধ ভাণ্ডার বিভাগ (সিএমএসডি)। এমনকি যারা এ নিয়ে সমালোচনা করবে তাদের বিরুদ্ধে আইসিটি আইনে মামলা করার হুমকিও দেয়া হয়েছে।

মো. আব্দুর রাজ্জাক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ছাত্রশিবিরের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। তিনি বিএনপি- জামাতের আমল থেকে স্বাস্থ্যখাতের দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসলেও মন্ত্রণালয়ের কারো না করো সঙ্গে ঠিকই সখ্যতা গড়ে তোলেন।

স্বাস্থ্যখাতের একচ্ছত্র বিএনপির আধিপত্যে ২০০৮ সালের পর কিছু কিছু আওয়ামীপন্থী ব্যবসায়ীরা ব্যবসা শুরু করে। সে সময় অধ্যাপক ডা. শাহ মুনির স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক নিযুক্ত হন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে এবং আওয়ামীপন্থী চিকিৎসক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু শাহ মুনিরের বিদায়ের পরে ডা. খন্দকার সেফায়েত উল্লাহ আসেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পদে। যিনি বিএনপিপন্থী এবং ড্যাব নেতা ছিলেন। আওয়ামী লীগের পরস্পর বিরোধীতার কারণে শেষ পর্যন্ত সেফায়েত উল্লাহই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পদটি পান। তার সময়ই মিঠুর আদিপত্য বিস্তার লাভ করে। আওয়ামীপন্থী প্রায় সব ব্যবসায়ীকে ব্লাকলিস্ট করে, নানাভাবে তাদের দুর্নীতিগ্রস্থ তকমা দিয়ে সরিয়ে ফেলা হয়। এরপর স্বাস্থ্য অদিদপ্তরের মহাপরিচালক হন দ্বীন মোহাম্মদ নুরুল হক। তিনি দায়িত্ব পাওয়ার পর মিঠুর আধিপত্য কিছুটা খর্ব হলেও বর্তমান ডিজি অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ আসার পর মিঠুর আধিপত্য ফের কায়েম হয়। মিঠুর ক্ষমতা দেখা যায় প্রকাশ্য কিংবা গোপনে।

সরকার বদল হলেও বিএনপির সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য কমেনি। আর এই দুর্নীতির বড় একটি অংশ পান লন্ডনে পালাতক তারেক জিয়া। তারই ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীরা এই স্বাস্থ্যখাতে আধিপত্য ধরে রেখেছে। লন্ডনে তারেক জিয়ার বিলাসবহুল জীবন যাপনের অন্যতম জোগান দেয় এই স্বাস্থ্যখাতের ক্যাডাররা।

ছাত্রদল নেতা ডা. ইকবাল কবীর বহুদিন ধরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। সর্বশেষ সে একসঙ্গে পাঁচটি পদের দায়িত্বে ছিলেন। আর এই আপদকালীন সময়ে তার সব পদগুলোই ছিলো কোভিড মোকাবিলায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পরিচালক (পরিকল্পনা), লাইন ডিরেক্টর (পরিকল্পনা), বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় ইমার্জেন্সি কোভিড রেসপন্স প্রকল্পের প্রকল্প প্রধান এবং এডিবির অর্থ সহায়তায় ‘টেকনিক্যাল অ্যাসিস্টেন্স প্রজেক্ট অন কোভিড-১৯’এর প্রকল্প প্রধানের দায়িত্বও পালন করছিলেন। তার একসঙ্গে পাঁচটি পদে থাকা নিয়ে ক্ষুব্ধ হন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী। তিনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে ডেকে একটি লোক কিভাবে এতগুলো পদে থাকে তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এর প্রেক্ষিতে তাকে ওএসডি করা হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এখন যত অনিয়ম হচ্ছে স্বাস্থ্যখাতে তার সবই গুটিকয়েক ব্যক্তি ও কোম্পানির ফলশ্রুতিতে। আর এরাই স্বাস্থ্যখাতের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে। এইসব ব্যবসায়ীরা বিএনপি আমলে তৈরী। কিন্তু তাদের ক্ষমতা এতই বিস্তৃত ছিলো যে, কেউ কথা বলতো না তাদের বিরুদ্ধে।

তারাই স্যাবোটাজ করে সরকারকে একটি বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে ফেলছে। এভাবেই বিএনপির একটি ব্লুপ্রিন্ট চলছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে কয়েকদিন আগেও একজন অতিরিক্ত সচিব ছিলেন যিনি বিএনপি- জামাতের আমলে একটা গুরুত্বপূর্ণ জেলার জেলা প্রশাসক ছিলেন। তার পদোন্নতি করা হয়নি। অথচ তাকে করা হয়েছিল মুখপাত্র।

এরকমভাবে আমরা যদি দেখি, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বিএনপি-জামাতের দখলে। তারাই নানা রকম ঘটনা ঘটাচ্ছে যাতে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়। এর আগে আমরা দেখছিলাম, রুপপুর পারমানিক প্রকল্পে বালিশ কেলেঙ্কারি। সেখানের দায়িত্বে থাকা বিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী বালিশ মাসুদ ওরফে মাসুদুল আলম ছিলেন বিএনপির ক্যাডার। সে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য এমন ঘটনা ঘটিয়েছে। যা পরবর্তীতে তদন্তে বেরিয়ে আসে।

এখনো করোনার সময় এই দুর্নীতি প্রকটভাবে দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন চাহিদার বিপরীতে দেখা যাচ্ছে শুধু দুর্নীতিগ্রস্থ মুখ। আশার কথা হলো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই মন্ত্রণালয়ে সৎ মেধাবি আব্দুল মান্নানকে সচিব হিসেবে নিয়োগ দেন। তিনি এই বিষয়গুলো ঠিক করার জন্য বেশ তৎপরও। কিন্তু একা সচিব কিভাবে ঠিক করবেন? কারণ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি। তবু তিনি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তার প্রমাণও ইতিমধ্যে মিলেছে। তবে বাংলাদেশের মানুষের সবচেয়ে ভরসার যে জায়গা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার দিকেই সবাই চেয়ে আছেন সবাই, তিনিই পারবেন স্বাস্থ্যখাতকে দুর্নীতিমুক্ত করতে। স্বাস্থ্যখাতে যে ক্যাডার রাজনীতি চলছে তা বন্ধ করতে।