ঢাকা, মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২০, ২৬ শ্রাবণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

সচিবের কাজের গতিতে স্পিড ব্রেকার মন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৫ জুলাই ২০২০ রবিবার, ০৮:৫৮ পিএম
সচিবের কাজের গতিতে স্পিড ব্রেকার মন্ত্রী

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের নতুন সচিব দায়িত্ব নেওয়ার পর কাজের গতি ফিরেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে। একের পর এক সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সরাসরি তদারকি করছে মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এখন সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য তিনটি। প্রথমত, করোনা মোকাবেলার জন্য গতিশীলভাবে কাজ করা এবং সারাদেশের খোঁজখবর রাখা, দ্বিতীয়ত দুর্নীতি বন্ধ করা এবং তৃতীয়ত সবগুলো মন্ত্রণালয় এবং বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করা। আর এটা করার জন্য স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের নেতৃত্ব দিচ্ছেন স্বাস্থ্যসেবা সচিব মো. আবদুল মান্নান। আর এই কাজ করতে গিয়ে প্রতি পদে পদে তিনি বাঁধার সম্মুখীন হচ্ছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী প্রত্যেকটি কাজের গতি থামিয়ে দেওয়া এবং বিলম্বিত করতে চাইছেন। এই নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে নানারকম কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী তাঁর অসন্তোষের কথা গোপন রাখেননি, একটি ফাইলে লিখেছেন যে ভবিষ্যতে এইসব ব্যাপার নিয়ে আলোচনা করতে হবে। রুলস অব বিজনেস অনুযায়ী কিছু কিছু সিদ্ধান্ত সচিবই দিতে পারে, সেখানে মন্ত্রীর কোন ভূমিকার দরকার নেই। সিভিল সার্জন তৈরি করার কাজ শুরু হয় একটি ফিটলিস্টের মাধ্যমে এবং এই ফিটলিস্ট তৈরি করার কাজ মন্ত্রী করেন। ফিটলিস্টের পর যখন একজন সিভিল সার্জনকে অন্য জায়গায় বদলি করতে হয় তখন আর মন্ত্রীর অনুমতি দরকার হয়না। কিন্তু বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করার পর একজন পিয়নের বদলির জন্যে হলেও ফাইল মন্ত্রীর কাছে যেতো এবং মন্ত্রীর টেবিলে ২ দিন পরে থাকার পর মন্ত্রী সেটা নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতেন।

এই অবস্থার পরিবর্তন করেছেন বর্তমান স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব। তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেই যে ফাইলগুলো নীতিনির্ধারণী নয়, রুটিনমাফিক- সেই ফাইলগুলোর সিদ্ধান্ত তিনি নিজেই দিয়ে দিচ্ছেন। এতে মন্ত্রী অসন্তুষ্ট এমন খবর ছড়িয়ে পড়ছে নানা জায়গায়।

জানা গেছে যে, ভোলার সিভিল সার্জনকে ঝালকাঠীতে বদলি করার সিদ্ধান্তে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এক ফাইলে লিখেছেন যে, ভবিষ্যতে এইসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাঁকে যেন অবহিত করা হয়। এরপর স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব নিজে থেকে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে যান এবং বিষয়টি ব্যাখা করেন যে মন্ত্রীর ফিটলিস্ট থেকে এটা করা হয়েছে। এই ধরণের সিদ্ধান্তগুলোর ব্যাপারে মন্ত্রীকে শুধু অবহিত করলেই চলে, মন্ত্রীর অনুমোদনের দরকার নেই।

তবে একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র বলছে যে, মন্ত্রীর ক্ষোভ-অসন্তোষের কারণ অন্য। সিএমএসডি’র দুর্নীতি সম্পর্কে সকলেই অবহিত এবং সিএমএসডি-তে দুর্নীতিবাজদের একটি চক্র গড়ে উঠেছিল। বর্তমানে সিএমএসডির নতুন পরিচালক দেওয়া হয়েছে। তিনি একজন সৎ, দায়িত্ববান, কর্তব্যনিষ্ঠ ব্যক্তি। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সরাসরি সিএমএসডির কার্যক্রম তদারকি করছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পর্যবেক্ষণে ধরা পড়েছে সিএমএসডির তিনজন কর্মকর্তা রয়েছেন, যারা বর্তমান পরিচালককে অসহযোগিতা করছেন এবং বিভিন্ন কাজে বিঘ্ন সৃষ্টি করছেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অনুসন্ধানে এটাও ধরা পড়েছে যে, এই তিনজন কর্মকর্তাই মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ। তারা মন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকার কাছাকাছি অবস্থান করেন। এই বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সিএমএসডির ওই তিন কর্মকর্তাকে বদলির জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়। স্বাস্থ্যসচিব প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশ এই বদলি আদেশ জারি করেন। বদলিকৃতরা হলেন, উপপরিচালক (পিএন্ডসি) ডা. মো. জাকির হোসেন। তাকে বদলি করা হয়েছে তত্বাবধায়ক (উপপরিচালক সমমান) ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতাল, কক্সবাজার। তত্বাবধায়ক (উপপরিচালক সমমান) ডা. মো. মহিউদ্দীন। উপপরিচালক হিসেবে সিএমএসডিতে বদলি করা হয়েছে। সহকারী সার্জন ডা. মো. সাব্বির হোসেন। সিএমএসডিতে সংযুক্ত আদেশ বাতিল করা হয়েছে।

জানা গেছে যে, মন্ত্রী এতে অসন্তুষ্ট হয়েছেন। সিএমএসডি-কে দুর্নীতিমুক্ত করার জন্য প্রধানমন্ত্রী সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন। এই নির্দেশনা অনুযায়ী সিএমএসডির নতুন পরিচালক দেওয়া হয়েছে। এই পরিচালক সততা এবং নিষ্ঠার সাথে অতীতের যে দুর্নীতিগুলো হয়েছিল সেই কালিমা মোচন করার জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। এভাবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে যখন একটা গতি আনার চেষ্টা করা হচ্ছে, যখন করোনা মোকাবিলার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে অযোগ্যতা এবং দায়িত্বহীনতার বিপরীতে একটা কর্মচাঞ্চল্যের আবহ সৃষ্টি করা হচ্ছে তখন সেখানে মন্ত্রী দিচ্ছেন স্পিড ব্রেকার।

মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র বলছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রীর কাছে যে কোন ফাইল গেলে সেটা দুদিন পড়ে থাকে। কারণ তিনি অত্যন্ত স্বাস্থ্য সচেতন। আর সেকারণে যদি ফাইলে কোন জীবানু থাকে তা মুক্ত হতে কমপক্ষে দুদিন সময় লাগবে তাই ফাইলটি পড়ে থাকে। তৃতীয়দিন মন্ত্রী এই ফাইলের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেন। কিন্তু বর্তমানে যে পরিস্থিতি তাতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুইদিন দুই বছরের সমান। দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণই হলো এখানের মূল চ্যালেঞ্জ। এই বাস্তবতায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে গতি আনার যে চেষ্টা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে করা হচ্ছে সেই গতিতে স্পিড ব্রেকার বসাচ্ছেন যেন মন্ত্রী।