ঢাকা, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৫ আশ্বিন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

বিএনপিতে ‘হঠাৎ’ বনে যাওয়া নেতারা

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৪ আগস্ট ২০২০ মঙ্গলবার, ০৯:৫৯ পিএম
বিএনপিতে ‘হঠাৎ’ বনে যাওয়া নেতারা

বিএনপির একজন প্রয়াত সিনিয়র নেতা বলেছিলেন যে, টাকা দিলে বিএনপিতে শুধুমাত্র চেয়ারপারসন ছাড়া সব পদই পাওয়া যায়। তিনি শেষ জীবনে স্বেচ্ছায় যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করেছিলেন, বিএনপির উপর যারপরনাই ক্ষুব্ধ-বিরক্ত ছিলেন এবং সেই অবস্থায় থেকে তিনি বিএনপির বেহাল দশা দেখেন। ২০১৮ এর নির্বাচনে বিএনপির বিপর্যয়ের পর তিনি ঐ মন্তব্য করেছিলেন।

ঐ নির্বাচনে বিএনপির অনেক ত্যাগী-পরীক্ষিতদের বাদ দিয়ে টাকার বিনিময়ে অনেককে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল এবং প্রকাশ্যে মনোনয়ন বাণিজ্য করা হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে। সেই অভিযোগের প্রেক্ষিতে ওই প্রয়াত নেতা এমন মন্তব্য করেছিলেন।

টাকা দিলে বিএনপিতে সব পদ পাওয়া যায় কিনা সে এক অন্য প্রসঙ্গ। তবে টাকা দিয়ে যে বিএনপিতে হঠাৎ নেতা বনে যাওয়া যায় সেটা বিভিন্ন সময়ে প্রমাণিত হয়েছে। বিশেষ করে ২০০১ সাল থেকে বিএনপিতে টাকামুখী রাজনীতি এবং টাকা দিয়ে মন্ত্রী বা নেতা হওয়ার অনেক মুখরোচক গল্প কান পাতলেই শোনা যায়। বিএনপিতে টাকা দিয়ে মন্ত্রী হওয়া বা এমপি হওয়া সবথেকে আলোচিত নাম হলো মোর্শেদ খান। ২০০১ সালে বিএনপি-জামাত জোট নির্বাচনে জয়ী হয়। সেই জয়ের পরে হঠাৎ করেই বিএনপির পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিসেবে নাম ঘোষণা করা হয় মোর্শেদ খানের। বিএনপিতে অনেক বড় বড় নেতা থাকার পরেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে মোর্শেদ খান কিভাবে নিযুক্ত হলেন তা নিয়ে অনেক চাঞ্চল্যকর গল্প আছে। তবে সব গল্পের উপসংহার একটিই, তা হলো মোর্শেদ খান বিপুল পরিমাণ টাকা দিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পদটি কিনেছিলেন।

বিএনপিতে ২০০১ সালে আরেক নেতা আবির্ভূত হয়েছিলেন, তাঁর নাম হারিস চৌধুরী। হঠাৎ করেই তিনি প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব হিসেবে নিযুক্ত হন। এর আগ পর্যন্ত বিএনপির অনেক নেতাকর্মী তাঁকে চিনতো না, তিনি সিলেট অঞ্চলে রাজনীতি করতেন। হারিস চৌধুরীর উত্থানের পেছনেও টাকা ছিল এবং তারেক জিয়াকে মোটা অংকের টাকা দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে কমিশন বাণিজ্য করার জন্যেই তিনি প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব নিযুক্ত হয়েছিলেন বলে জানা যায়। অবশ্য কেউ কেউ বলেন যে, মোসাদ্দেক আলী ফালুর কর্তৃত্ব খর্ব করার জন্যেই হারিস চৌধুরীকে তারেক এনেছিল। তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে যে, এখানে বড় অংকের টাকার লেনদেন হয়েছে।

২০০১ সালে বিএনপির নেতৃত্বের আরেক বিষ্ময় ছিল লুৎফুজ্জামান বাবর। তাঁকে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল এবং প্রতিমন্ত্রী হয়েই তিনি পুরো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দণ্ডমুন্ডের কর্তা হয়েছিলেন। বাবরের প্রতিমন্ত্রী হওয়ার আগে বিএনপির অনেক নেতাই তাঁকে চিনতেন না। বাবর বিমানবন্দরে চোরাচালান ব্যবসা করতেন বলে কথিত রয়েছে। আর এজন্যেই তাঁর নাম হয়েছিল ক্যাসিনো বাবর। আর জানা যায়, গিয়াসউদ্দিন আল মামুনের হাত ধরেই বাবরের সঙ্গে তারেকের পরিচয় এবং মামুন-তারেকের যে চোরাচালান ব্যবসা, তাঁর দেখভাল করার জন্যেই বাবরকে ঘনিষ্ঠ করেন তারা। আর ২০০১ এর নির্বাচনের পর বাবরকে দেওয়া হয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়ে বাবর তারেকের ফাইফরমাশ খাটা থেকে শুরু করে সব অপকর্মই করেছিলেন। বাবরও মনোনয়ন নিয়েছিলেন মোটা অংকের টাকা দিয়ে।

তবে ক্ষমতায় থাকলে এরকম প্রচুর টাকা দিয়ে নেতা বনে যায়, সব রাজনৈতিক দলেই কমবেশি এটা ঘটে। কিন্তু বিষ্ময়কর হলো যে, ১২ বছরের বেশি সময় ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকলেও বিএনপিতে টাকার খেলা বন্ধ হয়নি। বিএনপিতে এখনো টাকা দিয়ে এমপি হওয়া যায়, নেতা হওয়া যায়। এর বড় প্রমাণ হলো তাবিথ আউয়াল। তাবিথ আউয়ালের বিএনপি নেতা হয়ে যাওয়াটা ছিল রূপকথার গল্পের মতো। যখন ঢাকা সিটি করপোরেশনকে দুইভাগে বিভক্ত করা হলো, তখন বিএনপি উত্তরের জন্যে মনোনয়ন দিলো আবদুল আউয়াল মিন্টুকে। কিন্তু রহস্যময়ভাবে আবদুল আউয়াল মিন্টু মনোনয়ন পত্রে স্বাক্ষর করলেন না, ফলে সঙ্গত কারণে তা বাতিল হয়ে গেল। অথচ তাঁর ছেলে তাবিথ আউয়ালের মনোনয়ন পত্র ঠিকঠাক হলো। পিতাপুত্র ইচ্ছে করে এই কাজ করেছিলেন বলে এখন সব মহলে চাউর আছে।  যাই হোক, ওই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ফলে তাবিথ বিএনপির নেতা বনে গেলেন। কোনদিন রাজনীতি করেননি, ফুটবল নিয়ে কিছু ব্যতিব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন। কোনদিন ছাত্রদল, যুবদল না করেও তাবিথ আউয়াল নেতা বনে যাওয়ায় আশ্চর্য হয়েছেন অনেকেই। গত নির্বাচনেও কোন রকম বিতর্ক ছাড়া তাবিথ আউয়াল ঢাকা উত্তরের মেয়দ পদে বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেলেন। তাবিথ আউয়ালের পিতা আব্দুল আউয়াল মিন্টু একজন ধনাঢ্য ব্যক্তি। তারেক জিয়াকে যারা নিয়মিত মাসোহারা দেয় তাদের মধ্যে এই আউয়াল পরিবার অন্যতম। সেখান থেকেই তাবিথ আউয়াল মনোনয়ন বাগিয়ে নিয়েছেন এবং বিএনপির নেতা হয়েছেন বলে অনেকে মনে করেন।

রুমিন ফারহানার এমপি হওয়াটা ছিলো আরো বিস্ময়কর। কারণ বিএনপিতে অনেক ত্যাগি পরীক্ষিত নারী কর্মী এবং নেত্রী রয়েছে। বিশেষ করে সেলিনা রহমানের মতো দীর্ঘদিনের পোড় খাওয়া রাজনীতিবিদ যখন স্থায়ী কমিটির সদস্য তখন রুমিন ফারহানার এমপি হওয়াটা ছিলো এক রহস্য উপন্যাসের মতোই রোমাঞ্চকর। কারণ রুমিন ফারহানার রাজনীতিতে অংশগ্রহণ বলতে বুঝায় কিছু টকশোতে অংশগ্রহণ করা। সেই রুমিন ফারহানা এমপি হলেন হঠাৎ করে তারেক জিয়ার বদান্যতায়। এখানে কিসের লেনদেন হয়েছিলো তা অনুমিত, প্রমাণিত নয়।

এভাবেই বিএনপিতে হঠাৎ বনে যাওয়া নেতার সংখ্যা বাড়ছে। বিএনপিতে নেতা হওয়ার সহজ উপায় টাকা ঢালা। এখনো ছোট ছোট স্থানীয় পর্যায়ে বিএনপির কমিটিতেও টাকার খেলা হয়। এই কমিটির নেতৃত্ব দিতে টাকা দিতে হয় এমন কথা বিএনপিতে এখন ওপেন সিক্রেট।