ঢাকা, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৫ আশ্বিন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

চ্যালেঞ্জের মুখে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৭ আগস্ট ২০২০ শুক্রবার, ০৭:৫৮ পিএম
চ্যালেঞ্জের মুখে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালীরা

টানা তিন মেয়াদে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আর তৃতীয় মেয়াদে এসে ঘরে-বাইরে নানারকম সঙ্কট মোকাবেলা করতে হচ্ছে। একদিকে করোনা পরিস্থিতি, বন্যা, অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা নিহত হওয়ার ঘটনা। এছাড়া দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন সবকিছু মিলিয়ে এক ধরনের চাপের মুখে আছে তিন মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের ঘরের ভেতরেও কিছু দুশ্চিন্তার কারণ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে রিজেন্টের সাহেদের ঘটনা আওয়ামী লীগকে বিব্রত করেছে বা কুয়েতে আটক সাংসদ পাপলুর ঘটনাতেও আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীরা প্রকাশ্যেই ক্ষোভ প্রকাশ করছে। আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতা বলছেন যে, এই সমস্ত অনুপ্রবেশকারীদের দলে ঢোকার দরজা বন্ধ করে দিতে হবে। এই বাস্তবতায় এই সমস্ত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন কিছু প্রভাবশালী নেতারা। শেখ হাসিনার অ্যাকশনের কারণে এসব নেতাদের প্রভাব এবং প্রতিপত্তি দলের ভেতরে এবং সরকারে খর্ব হয়েছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। যাদের কর্তৃত্ব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, যে সমস্ত প্রভাবশালী নেতাদের প্রভাব খর্ব করা হয়েছে তাঁদের মধ্যে রয়েছেন-

ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন

সাম্প্রতিক সময়ে শেখ হাসিনার নির্দেশে ফরিদপুরে যে অপারেশন হচ্ছে, সেই অপারেশনে চাপের মুখে পড়েছেন আওয়ামী লীগের এই সাবেক মন্ত্রী। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে বিগত দুই মেয়াদেই মন্ত্রীত্ব পালন করেছেন। প্রথমে তিনি প্রবাসী কল্যাণ ও শ্রমশক্তি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন, পরবর্তীতে তিনি স্থানীয় সরকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। তৃতীয় মেয়াদে ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে মন্ত্রণালয় থেকে বাদ দেওয়া হয়। এখন ফরিদপুরে চলমান অভিযানে যাদের আটক করা হচ্ছে তাঁদের সকলেই ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেনের ঘনিষ্ঠ বলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। এর ফলে দলের ভেতরে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন। বিশেষ করে ফরিদপুরে আওয়ামী লীগের তৃণমূলের পরীক্ষিত কর্মী যারা তাঁরা এখন সাবেক এই মন্ত্রীর সমালোচনায় মুখর হচ্ছেন। ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন নিজেও এলাকায় যাচ্ছেন না এবং এই ব্যাপারে তিনি কোন কথাও কোথাও বলছেন না। স্পষ্টতই ফরিদপুরে ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেনের যে প্রভাব, তা সংকুচিত হয়ে পড়েছে অপারেশন ফরিদপুরের মাধ্যমে।

মাহবুব উল আলম হানিফ

আওয়ামী লীগের আরেক প্রভাবশালী নেতা মাহবুব উল আলম হানিফ। ২০০৮ সালে তিনি নির্বাচন না করলেও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারীর পদটি পেয়ে পুরস্কৃত হন। এই সময়ে তিনি আওয়ামী লীগের একজন প্রভাবশালী নেতা হিসেবেই পরিচিতি পান। আওয়ামী লীগের যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক হিসেবে এখনো তিনি দায়িত্ব পালন করছেন, কিন্তু বিগত কাউন্সিলের পর থেকেই তিনি নিজেকে গুটিয়ে ফেলেন। শুধুমাত্র আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের যখন অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, তখন তাঁকে কিছুটা সরব দেখা গিয়েছিল। তবে এবার করোনা সঙ্কটের সময় কানাডাতে পাড়ি দিয়ে তিনি আলোচনা-বিতর্কের কেন্দ্রে আসেন। এই সময়ে কিভাবে তিনি কানাডায় গেলেন তা নিয়ে দলের ভেতরে-বাইরে অনেক প্রশ্ন উঠেছে এবং তাঁর রহস্যময় কানাডা যাত্রা দলে তাঁর কর্তৃত্ব এবং প্রভাব চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

এইচ টি ইমাম

আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালে সরকারে ক্ষমতাসীন হওয়ার পরে দলের প্রভাবশালী নেতাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন এইচ টি ইমাম। তিনি সেসময়ে জনপ্রশাসন উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করছিলেন। ২০১৪ থেকে তার প্রভাব কিছুটা কমতে থাকে। এ সময় আওয়ামী লীগের হেভিওয়েটরা মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত হন এবং এইচ টি ইমামেরও উপদেষ্টার ধরন পাল্টে যায়। তিনি জনপ্রশাসন উপদেষ্টা থেকে রাজনৈতিক উপদেষ্টা হয়ে যান। রাজনৈতিক উপদেষ্টা হলেও আওয়ামী লীগের ভেতরে বাইরে তার প্রভাব ছিল অত্যন্ত বেশি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কুয়েতে স্বতন্ত্র এমপি পাপুলের গ্রেপ্তারের ঘটনার পর দলের ভেতর ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছেন এইচ টি ইমাম। তার বরাতেই পাপুলকে সমর্থন দেওয়ার জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছিল বলেও আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা জানিয়েছেন। এই বাস্তবতায় দলের ভেতর এইচ টি ইমামের ক্ষয়িষ্ণু প্রভাব আরও সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে এবং তার কর্তৃত্বও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন

ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন আওয়ামী লীগের কোনো প্রভাবশালী নেতা না হলেও তিনি একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী। তিনি যেন সোনার চামচ মুখে দিয়েই আওয়ামী লীগে এসেছিলেন। একজন মাঝারি মানের আমলা এবং রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততা ছাড়াই তিনি এবার সিলেটের মতো গুরুত্বপূর্ণ আসন থেকে নির্বাচন করেন এবং নির্বাচনের পর পররাষ্ট্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি মন্ত্রাণালয়ের দ্বায়িত্ব পান। এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি নানা রকম বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন, তবে সর্বশেষ যেটি নিয়ে তিনি বিতর্কের কেন্দ্রে চলে এসেছেন, তা হলো একটি বই। ‘বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ’ শিরোনামে তিনি ১৯৮ পৃষ্ঠার যে বইটি লিখেছেন, সেই বইয়ের মধ্যে তথ্য বিকৃতি, ইতিহাস বিকৃতি এবং মিথ্যাচারের অভিযোগ উঠেছে প্রকাশ্যে। আওয়ামী লীগের একাধিক শীর্ষ নেতা এই বইটি বাজেয়াপ্ত এবং বাতিল করার দাবি উত্থাপন করেছেন।

আ জ ম নাছির উদ্দীন

চট্টগ্রামের রাজনীতিতে মহিউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুর পর একচ্ছত্র প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিলেন আ জ ম নাছির উদ্দীন। কিন্তু তিনি মেয়র পদে মনোনয়ন না পাওয়ায় এবং এখন দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ায় তার প্রভাব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা তাকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে, চট্টগ্রামের রাজনীতিতে তার একক কর্তৃত্ব থাকতে পারে না।

এ সমস্ত নেতাদের প্রভাব ক্ষুন্ন হওয়ার প্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগের তৃণমূলের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছে এবং চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। তারা মনে করছেন যে, যে কেউই খারাপ কাজ করুক না কেন, শেখ হাসিনা দলের স্বার্থে তাকে আশ্রয় প্রশ্রয় দেয় না। এটা আওয়ামী লীগের কর্মীদের মধ্যে টনিকের মতো কাজ করছে।