ঢাকা, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৪ আশ্বিন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

আবার মুখোমুখি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং চিকিৎসক

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮ আগস্ট ২০২০ শনিবার, ০৭:৫৮ পিএম
আবার মুখোমুখি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং চিকিৎসক

করোনা সঙ্কটের শুরু থেকেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে চিকিৎসকদের দফায় দফায় নানা দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছিল। প্রকাশ্য বিরোধ সবসময় লেগে ছিল। নতুন স্বাস্থ্যসেবা সচিব মো. আবদুল মান্নান দায়িত্ব গ্রহণের পর এই দ্বন্দ্ব উপশমের দায়িত্ব নেন, কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কিছু কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে চিকিৎসক এবং মন্ত্রণালয়ের মধ্যে আবার নতুন করে দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হয়েছে বলে জানা গেছে।

ইতিমধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় করোনায় দায়িত্বরত চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য হোটেল সুবিধা বাতিল করে দিয়েছে এবং এর বদলে তাঁদেরকে দৈনিক ভিত্তিতে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কথা বলেছে। বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশন(বিএমএ) এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করেছে। তারা বলেছেন যে, এই ধরনের সিদ্ধান্তের ফলে চিকিৎসকরা আরো বেশি ঝুঁকিতে পড়বেন।

জানা গেছে যে, ইতিমধ্যে উভয় পক্ষই বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে গিয়েছেন এবং প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের উপর এই সঙ্কটের সমাধান নির্ভর করছে। বাংলাদেশের করোনা সঙ্কটের শুরু থেকেই চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সম্পর্কটা ভালো নেই। প্রথম শুরু হয়েছিল স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী এবং পিপিই নিয়ে। করোনা সঙ্কট শুরুর সময় চিকিৎসকরা তাঁদের সুরক্ষার জন্যে পিপিই দেওয়ার দাবি করে। তখন মন্ত্রী বলেন যে, সকলের জন্যে পিপিই দরকার নেই এবং পিপিই উচ্চারণও তিনি ভুল করেন। এটা নিয়ে প্রথম বিতর্ক তৈরি হয়, পরবর্তীতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় চিকিৎসকদের পিপিই দেওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করে। কিন্তু সেই পিপিই-এর মধ্যেও ভেজাল ছিল এবং চিকিৎসকদের অনেকেই মনে করেন যে, ভেজাল পিপিই-এর কারণেই অনেক চিকিৎসক আক্রান্ত হয়েছেন। বিপরীতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজেই জাতীয় সংসদে বলেছেন যে চিকিৎসকরা এই পিপিই-এর ব্যবহার ঠিকমতো জানতেন না এবং এই কারণে প্রথমদিকে চিকিৎসকদের মৃত্যু ঘটেছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্য বাংলাদেশ মেডিক্যাল এ্যাসোসিয়েশন নাকচ করে দেয়। তাঁরা বলে যে, চিকিৎসকদের পেশাগত দায়িত্বের একটি অপরিহার্য অংশ পিপিই, কাজেই তাঁরা পিপিই ব্যবহার জানেন না এই ধরণের বক্তব্য অমার্জনীয়। পিপিই বিতর্ক শেষ হওয়ার পরে শুরু হয় করোনা চিকিৎসা করা না করা নিয়ে বিতর্ক। এইসময় সরকারি হাসপাতালে কিভাবে চিকিৎসা করা হবে এবং কিভাবে চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রণোদনা পাবেন এই নিয়ে চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে টানাপোড়েন চলতে থাকে। এরপর প্রধানমন্ত্রী উদ্যোগী হয়ে এই সঙ্কটের অবসান ঘটান এবং তিনি নির্দেশ দেন , যে সমস্ত চিকিৎসকরা করোনা রোগীদের চিকিৎসা করবেন তাঁরা বিশেষ প্রণোদনা পাবেন, তাঁদের জন্য গাড়ির এবং থাকার ব্যবস্থা করার নির্দেশনা দেন। এরপর থেকে চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীরা হোটেলে থাকার সিদ্ধান্ত নেন এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তরফ থেকে বলা হয় যে, তাঁরা তারকা হোটেলে থাকবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন যে, সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুদল কালাম আজাদের এটা একটি বিভ্রান্তিকর সিদ্ধান্ত ছিল। অবশ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কেউ কেউ বলেন যে, তখন চিকিৎসকরা করোনা রোগীদের চিকিৎসা করতে অনাগ্রহ দেখাচ্ছিল এবং তাঁদেরকে উদ্বুদ্ধ করার জন্যেই এটা করা হয়েছিল। কিন্তু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় মনে করে যে, এটা চিকিৎসকদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে, কাজেই তাঁরা এই দায়িত্ব পালনে বাধ্য এবং এই ধরনের প্রণোদনা দেওয়া অর্থহীন। এরপর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ যখন করোনা চিকিৎসায় যুক্ত হয় তখন তাঁদেরকে হোটেলে রাখার ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং দামী সব হোটেলগুলো তাঁদের দেওয়া হয়।

এরপর ১ মাসের হোটেলে থাকা-খাওয়া বাবদ বিল আসে ২০ কোটি টাকা। এই নিয়ে গণমাধ্যমে লেখালিখি হওয়ার পর চিকিৎসকরা প্রতিবাদ করেন এবং এটা নিয়েও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে চিকিৎসকদের টানাপোড়েন চলছে। এখন চিকিৎসকদের হোটেল ব্যবস্থা বাতিল করে তাঁদের জন্যে প্রণোদনার কথা বলা হয়েছে। বিএমএ-এর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, অনেক চিকিৎসকই বাড়িতে থাকেন না, তারা মেসে বা বন্ধুদের সঙ্গে থাকেন, আবার যারা বাড়িতে থাকেন তাঁরা করোনা রোগীদের চিকিৎসা করে যখন বাসায় ফিরবেন তখন সেটা তাঁদের পরিবারের বাকি সদস্যদের জন্যে ঝুঁকির কারণ হবে। ফলে অনেকের বাসার বয়স্ক, শিশুরাও আক্রান্ত হতে পারে। জানা গেছে যে, এই বিষয়গুলো নিয়ে দুই পক্ষ এখন মুখোমুখি অবস্থানে আছে। তবে স্বাস্থ্য সচিব মো. আবদুল মান্নান বলেছেন যে, কোন বিতর্ক নেই, এই নিয়ে আমরা যেকোন সময় বিএমএ-এর সঙ্গে আলাপ-আলোচনায় বসতে প্রস্তুত। আলোচনার মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করতে হবে। তিনি বলেন যে, সবাইকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে এই সঙ্কট মোকাবেলায় কাজ করতে হবে এবং আমাদের আর্থিক সাশ্রয়ের বিষয়টিও দেখতে হবে।