ঢাকা, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৫ আশ্বিন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

যে কারণে শেখ হাসিনার স্নেহসিক্ত মান্নান খান

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০ আগস্ট ২০২০ সোমবার, ০৮:৫৭ পিএম
যে কারণে শেখ হাসিনার স্নেহসিক্ত মান্নান খান

আব্দুল মান্নান খান যখন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য হলেন তখন আওয়ামী লীগের অনেকেই চমকে উঠেছিল। রাজনৈতিকভাবে যেমন তিনি কমিউনিস্ট পার্টি থেকে আসা, তেমনি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতেও তাঁর কোন ক্যারিশমা নেই। তিনি মাহমুদুর রহমান মান্না কিংবা আখতারুজ্জামানের মতো জনপ্রিয় নেতাও নন। তারপরেও কেন তাঁকে প্রেসিডিয়াম সদস্যের অন্তর্ভুক্ত করা হলো তাই নিয়ে অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেছিল।

বিস্ময়ের শুরু অবশ্য এখানে নয়, ২০০৮ সালের নির্বাচনে আব্দুল মান্নান খানকে মনোনয়ন দেওয়া হয় ঢাকা-১ আসন থেকে। আওয়ামী লীগের জোয়ারের ওই নির্বাচন থেকে আব্দুল মান্নান খান বিজয়ী হন এবং তাঁকে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী করা হয়। মান্নানের উত্থান পর্ব শুরু হয় ২০০৭ সাল থেকে। যখন ওয়ান ইলেভেন শুরু হয়, সেসময় আব্দুল মান্নান খান ছিলেন আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক এবং দলীয় কার্যালয়ে বসে প্রেস রিলিজ দেওয়া, চায়ের আড্ডায় মেতে ওঠাই ছিল তাঁর একমাত্র কাজ। তিনি কখনও নির্বাচন করবেন বা মন্ত্রী হবেন এমন ভাবনা তাঁর কোনসময়েই ছিলনা। বিশেষ করে তাঁর নির্বাচনী এলাকাটি ছিল সব হেভিওয়েটদের বিচরণক্ষেত্র। ব্যরিস্টার নাজমুল হুদা, প্রয়াত নুরুল ইসলাম বাবুল, সালমান এফ রহমান, নূর আলীর মতো ধনাঢ্য ব্যক্তিরা এই আসনের জন্যে প্রার্থী। আওয়ামী লীগ যখন ২০০৬ সালের নির্বাচনে শেষ মুহুর্তে সরে দাঁড়িয়েছিল, সেই নির্বাচনেও নূর আলীকে এই আসনের জন্যে আওয়ামী লীগ মনোনয়ন দিয়েছিল। যদিও শেষ পর্যন্ত সেই নির্বাচন হয়নি।

ওয়ান ইলেভেন শুরু হলে আওয়ামী লীগের একটি বড় অংশ সংস্কারপন্থী হয়ে যায় এবং সেই সময় শেখ হাসিনার পক্ষে আওয়ামী লীগের যে সমস্ত নেতারা দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন, তাঁদের প্রথম সারিতে নাম ছিল প্রয়াত জিল্লুর রহমান, প্রয়াত আশরাফুল ইসলাম, বেগম মতিয়া চৌধুরী প্রমুখ। আর দপ্তর সম্পাদক হিসেবে আব্দুল মান্নান খান শেখ হাসিনার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন। তাঁকে অনেকটা রুহুল কবির রিজভীর মতো মনে করা হতো। অনেক টকশোতেও আব্দুল মান্নান খান শেখ হাসিনার পক্ষে আপোসহীন ছিলেন এবং সেসময় নীতিহীনদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে কথা বলেছিলেন। এই সংকটকালীন সময়ে আদর্শ নিয়ে দাঁড়ানোর প্রতিদান হিসেবেই শেখ হাসিনা তাঁকে মূল্যায়ন করেছেন- এটাই আওয়ামী লীগের অন্দরমহলে জানে। আব্দুল মান্নান খানের নীতি এবং আদর্শের প্রতি অনুরাগ নতুন নয়। তিনি ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন, ছাত্র ইউনিয়নের নেতা ছিলেন, ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে যখন নির্মমভাবে হত্যা করা হয় তখন যারা প্রথমেই এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করেছিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে মিছিল করেছিল তাঁদের মধ্যে আব্দুল মান্নান খান ছিলেন অন্যতম। এক সময়ে আব্দুল মান্নান খান অনেকের মতোই কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতি ছেড়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যোগ দেন। পড়াশুনার দিকে মনোযোগী এবং ভালো প্রেস রিলিজ লিখতে পারার কারণে শেখ হাসিনা তাঁকে দপ্তর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব দেন। বিশ্বস্ত থাকার কারণে চিঠিপত্র লেখা সহ দাপ্তরিক কাজগুলো মনোযোগের সঙ্গেই তিনি করেন।

শেখ হাসিনার বিশ্বাস অর্জন করেই তিনি রাজনীতিতে টিকে ছিলেন। যদিও তিনি ক্যারিশম্যাটিক বক্তা নন, একজন ছাপোষা কেরানীর মতো ৯টা-৫টা দলীয় কার্যালয় আগলে রাখাই ছিল তাঁর কাজ। কিন্তু আওয়ামী লীগের কঠিন সময়ে তাঁর ভূমিকা বিভিন্ন মহলে প্রশংসিত হয়। তবে প্রশংসিত হলেও আওয়ামী লীগার হিসেবে কখনো তিনি কর্মীদের কাছে প্রশংসিত হননি। বরং ছাত্র ইউনিয়নের মান্নান খান হিসেবেই তিনি পরিচিত। ২০১৪ এর নির্বাচনে তিনি হেরে যান প্রয়াত নুরুল ইসলামের স্ত্রী সালমা ইসলামের কাছে। গত নির্বাচনে তিনি আর মনোনয়ন পাননি এবং নির্বাচনী এলাকাতেও তাঁর আর পদচারণা নেই। একজন টেবিলের নেতা হিসেবে পরিচিতি, শেখ হাসিনার স্নেহসিক্ত- এটাই তাঁর জীবনের সবথেকে বড় প্রাপ্তি।