ঢাকা, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৫ আশ্বিন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

আওয়ামী লীগের ধূমকেতু সাবের?

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১১ আগস্ট ২০২০ মঙ্গলবার, ০৮:৫৮ পিএম
আওয়ামী লীগের ধূমকেতু সাবের?

সাবের হোসেন চৌধুরী। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের আগে রাজনীতিতে তাঁর নামটিও কেউ জানতো না। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার জন্য যতগুলো চমক দেখিয়েছিল তাঁর মধ্যে অন্যতম চমক ছিল সাবের হোসেন চৌধুরীর মতো তরুন-আনকোরাকে মনোনয়ন দেওয়া। তাও আবার মতিঝিলের মতো নির্বাচনী এলাকা থেকে, যেখানে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী মির্জা আব্বাস। এই সময়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন মোজাফফর হোসেন পল্টু, কিন্তু শেখ হাসিনা মোজাফফর হোসেন পল্টুকে না দিয়ে তরুণ ব্যবসায়ী এবং রাজনীতিতে একেবারে আনকোরা সাবের হোসেন চৌধুরীকে মনোনয়ন দেন। এই মনোনয়ন দেওয়ার পর সাবের হোসেন চৌধুরী বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে প্রথম ব্যতিক্রমী নির্বাচনী প্রচার অভিযানের সূচনা করেন। যে নির্বাচনী প্রচার এখনো বিরল ব্যতিক্রমধর্মী। এর সঙ্গে তুলনা করা যায় শুধুমাত্র প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের মেয়র নির্বাচনের প্রচারণার সঙ্গে।

সাবের হোসেন চৌধুরী নির্বাচনী প্রচারণায় রাজনীতির বাইরের বিশেষ করে ক্রীড়াবিদ, শিল্প-সংস্কৃতির বিভিন্ন মানুষকেও যুক্ত করেন। নিজে বিনয়ী চেহারায় নিষ্পাপ ভাব এবং সুন্দর বাচনভঙ্গির কারণে ঐ নির্বাচনে তিনি বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী মির্জা আব্বাসকে পরাজিত করেন এবং রাজনীতিতে অভিষিক্ত হন। তাঁর রাজনীতির অভিষেকটা যেন ছিল এলাম-দেখলাম-জয় করলামের মতো। নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পরপরই তিনি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতির পদে নিয়োগ পান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশেই ক্রীড়া সংগঠক সাবের হোসেন চৌধুরী বাংলাদেশের ক্রিকেটের দন্ডমুন্ডের কর্তা হন। তাঁর হাত ধরেই দেশের ক্রিকেট অনেকগুলো সাফল্য অর্জন করে, যার মধ্যে টেস্ট ক্রিকেট মর্যাদা প্রাপ্তি অন্যতম। এই সময়ে উপমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছিলেন সাবের হোসেন চৌধুরী। রাজনীতিতে অভিষিক্ত হয়ে একবারে এতকিছু আওয়ামী লীগের হয়ে অন্য কেউ পেয়েছে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।

অনেকে মনে করতেন সাবের হোসেন চৌধুরী আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নেতাদের অন্যতম এবং আওয়ামী লীগে তিনি অনেক দূরে যাবেন। বিশেষ করে যখন শেখ হাসিনার স্নেহ এবং ভালোবাসা তাঁর জন্যে ছিল। ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয়ের পরে সাবের হোসেন চৌধুরী দল ছেঁড়ে যাননি, বরং দলের মধ্যে তাঁর অবস্থান আরো শক্তিশালী এবং সুদৃঢ় করেছেন। এই সময়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর আরো নৈকট্য হয়েছে। সাবের হোসেন চৌধুরীকে শেখ হাসিনা তাঁর রাজনীতিক সচিব হিসেবে নিয়োগ দেন, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ দেন। এই সময় আওয়ামী লীগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারক হয়ে ওঠেন সাবের হোসেন চৌধুরী। এই কারণেই রাজনীতিতে অতিথি সাবের হোসেন চৌধুরী অনেক নির্যাতনও ভোগ করেছেন। তাঁকে বিএনপি-জামাত জোট সরকারের আমলে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। যে মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল সেই মামলা এখনো বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম প্রহসন। তিনি তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সফরে যাচ্ছিলেন এই সময়ে ফেরি থেকে কাঁটা চামচ এবং প্লেট চুরির মামলায় সাবের হোসেন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। বিএনপি-জামাত বাংলাদেশের রাজনীতিতে যত প্রহসন এবং অপকর্ম করেছে তাঁর একটি বড় উদাহরণ সম্ভবত এটা।

সাবের হোসেন চৌধুরী আওয়ামী লীগকে ২০০১ পরবর্তী সময়ে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে নানামুখী তৎপরতা করেছিলেন। আওয়ামী লীগকে ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে শেখ হাসিনাকে সহযোগিতা করায় তিনি বিভিন্ন মহলে প্রশংসিত হয়েছিলেন। কিন্তু এরপরেই শুরু হয় ওয়ান ইলেভেন ঝড় এবং ওয়ান ইলেভেনের পর হঠাৎ করেই সাবের হোসেন চৌধুরী বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে আসেন। এখনো স্পষ্ট নয় সাবের হোসেন চৌধুরীর কি হয়েছিল, তিনি কি সংস্কারপন্থি হয়েছিলেন? তিনি কি শেখ হাসিনাকে মাইনাস করতে চেয়েছিলেন? নাকি তাঁর অন্যকোন চিন্তা ছিল? বিষয়টা যেমন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাও স্পষ্ট করেননি, তেমনি সাবের হোসেন চৌধুরীও এই নিয়ে কখনো কথা বলেননি। তবে সাবের হোসেন চৌধুরী একাধিকবার বলেছেন যে, তিনি কখনো সংস্কারপন্থি ছিলেন না। তবে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে দেখা যায় যে, সাবের হোসেন চৌধুরী ভারতের সোনিয়া গান্ধী মডেল বাংলাদেশে চালু করার জন্য কারো কারো সঙ্গে দেনদরবার করেছিলেন বলে জানা যায়। বিশেষ করে তৎকালীন বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর সঙ্গে সাবের হোসেন চৌধুরীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল, ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল সেই সময়ে কয়েকজন সেনা কর্মকর্তার সঙ্গেও। এই বাস্তবতায় সাবের হোসেন চৌধুরী আসলে শেখ হাসিনার মুক্তি বিলম্বিত করতে চেয়েছিলেন নাকি শেখ হাসিনাকে মাইনাস করতে চেয়েছিলেন তা এক বড় প্রশ্ন।

কিন্তু সাবের হোসেন চৌধুরী তারপরেও ভাগ্যবান। ২০০৮ সালে যারা সংস্কারপন্থী ছিলেন তাঁদের অনেকেই মনোনয়ন পাননি। মনোনয়ন পাননি অধ্যাপক আবু সাইয়িদ, মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, খ ম জাহাঙ্গীরের মতো অনেকেই। কিন্তু সাবের হোসেন চৌধুরী তারপরেও মনোনয়ন পেয়েছিলেন এবং এখনো আওয়ামী লীগের এমপি হিসেবে আছেন। এর মধ্যে সাবের হোসেন চৌধুরীকে ইন্টারন্যাশনাল পার্লামেন্ট কমিটির সহ সভাপতি পদেও মনোনয়ন দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা এবং সেখানে তিনি বিজয়ীও হয়েছিলেন।

কাজেই সাবের হোসেন চৌধুরীর রাজনৈতিক অবস্থান রহস্যাবৃত। শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর দুরত্ব আছে, কিন্তু তারপরেও তিনি আওয়ামী লীগে আছেন। তিনি যেন আওয়ামী লীগে ধূমকেতুর মতো। হঠাৎ আলো ছড়িয়েছিলেন, এখনো তাঁর আলোর ছটার রেখা দৃশ্যমান। তিনি রাজনীতিতে টিকবেন কিনা তা ভিন্ন প্রশ্ন, তবে রাজনীতিতে তাঁর আগ্রহ আছে কিনা সেই প্রশ্ন কেউ করতেই পারে।