ঢাকা, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৪ আশ্বিন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

রীভার বদলে বিক্রম: বাংলাদেশ নীতি বদলে যাবে?

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৪ আগস্ট ২০২০ শুক্রবার, ০৯:৫৯ পিএম
রীভার বদলে বিক্রম: বাংলাদেশ নীতি বদলে যাবে?

গণমাধ্যমে খবরটি আগেই প্রকাশিত হয়েছিল। আনুষ্ঠানিকভাবে ভারত তাঁদের স্বাধীনতা দিবসের আগে নতুন রাষ্ট্রদূতের নাম ঘোষণা করলো। রীভা গাঙ্গুলী তাঁর মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বিদায় নিচ্ছেন। তাঁর বদলে দায়িত্ব গ্রহণ করছেন বিক্রম কুমার দোরাইস্বামী। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এই সম্পর্কটি কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভেতর সীমাবদ্ধ নয়। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির মেরুকরণের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একারণেই ভারতের যে নতুন রাষ্ট্রদূত আসে তার ভূমিকা, তাঁর চিন্তভাবনা দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে কিছুটা হলেও প্রভাব ফেলে।

যদিও কূটনৈতিকরা মনে করছেন যে, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে মূল নিয়ামক হলো দুই দেশের উচ্চ পর্যায়ের কৌশল এবং নীতি। কিন্তু তারপরেও দেখা যায় যে, একজন রাষ্ট্রদূত সম্পর্কের ক্ষেত্রে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। যেমন বাংলাদেশে ২০০৭ এর জানুয়ারি থেকে ২০০৯ এর ডিসেম্বর পর্যন্ত পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী ছিলেন ভারতের রাষ্ট্রদূত এবং সেসময় তিনি বিরাজনীতিকরণ নীতির পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ভারতের সঙ্গে মিলে মাইনাস ফর্মুলা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পিনাক রঞ্জন ভূমিকা রেখেছিলেন বলেও অনেকে মনে করে। বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সবথেকে ভালো সময় গিয়েছিল পঙ্কজ শরণ এবং হর্ষবর্ধন শ্রিংলার সময়ে। পঙ্কজ শরণ ২০১২ সালের মার্চ থেকে ২০১৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। সেই সময় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এক নতুন মাত্রা লাভ করে এবং দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক-আন্তর্জাতিক অনেকগুলো বিষয়ের সমাধানের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের স্বর্ণযুগ বলা হয় হর্ষবর্ধন শ্রিংলার সময়কে। হর্ষবর্ধন শ্রিংলা ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং পূর্ণ মেয়াদে থেকে ২০১৯ সালে দায়িত্ব শেষ করে ফিরে যান। এই সময়ে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে পারস্পরিক আস্থা, বিশ্বাস বাড়ে এবং দুই দেশের মধ্যে অনেকগুলো ইতিবাচক পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যায়। ধারণা করা হয় যে, রীভা গাঙ্গুলী এসেছিলেন হর্ষবর্ধন শ্রিংলার ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্যেই এবং তিনি হর্ষবর্ধন শ্রিংলার স্থলাভিষিক্ত হয়ে রুটিন কাজগুলোর মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন। এখন নতুন রাষ্ট্রদূত বিক্রম দোরাইস্বামী এসে কি করবেন সেটাই দেখার বিষয়।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক মুক্তিযুদ্ধের বন্ধনে আবদ্ধ। কিন্তু ৭৫ এর পর থেকে এই সম্পর্ক উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গেছে। মজার ব্যাপার হলো যে, বাংলাদেশের সব সরকারই গোপনে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার জন্য মরিয়া চেষ্টা করেছে। কিন্তু ৭৫ এর পর বিএনপি-জামাত প্রকাশ্যে ভারতের সমালোচনা এবং ভারত বিরোধী রাজনীতিকে উপজীব্য করে দেশের মানুষের মন জয়ের চেষ্টা করেছে। আর এই প্রেক্ষাপটেই বাংলাদেশে ভারতের রাষ্ট্রদূত কে হচ্ছেন এবং তাঁর ভূমিকা কি হবে তাঁর উপরে দুই দেশের সম্পর্ক কিছুটা হলেও নির্ভর করে। ভারতের পররাষ্ট্রদপ্তরও সম্পর্ক কোন পর্যায়ে নিয়ে যাবে সে বিবেচনা করে একজন রাষ্ট্রদূতকে বাংলাদেশে প্রেরণ করে। বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে যদিও প্রকাশ্যে বলা হচ্ছে যে, দুই দেশের সম্পর্ক অত্যন্ত ভালো এবং বাংলাদেশ নতুন সম্পর্কের ক্ষেত্রে সবথেকে ভালো সময় কাটাচ্ছে। কিন্তু কূটনৈতিক মহল এই সম্পর্কের ক্ষেত্রে টানাপোড়েনের কিছু ইঙ্গিত দেয়। বিশেষ করে বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ নিয়ে পাকিস্তানের অতি আগ্রহ ইত্যাদি নিয়ে দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে কোন ছোটখাটো অস্থিরতা আছে কিনা তা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন।

তবে কূটনৈতিক মহল মনে করে যে, বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সবথেকে বেশি বিবেচ্য বিষয় হলো বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় এবং মদদ দেওয়া। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০৮ এ ক্ষমতায় আসার আগে বাংলাদেশের ভূমি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের জন্য ব্যবহৃত হতো এবং বিচ্ছিন্নতাবাদীরা এখান থেকেই ভারতে অপতৎপরতা চালাতো। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দায়িত্ব গ্রহণের পর এটা সম্পূর্ণ রূপে বন্ধ করেছেন এবং বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ব্যাপারে শূন্য সহিষ্ণুতা নীতি গ্রহণ করেছেন। এটা দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে মূল পরিমাপক মনে করা হচ্ছে এবং ভারতের কাছে শেখ হাসিনার কোন বিকল্প এখন পর্যন্ত নেই। শেখ হাসিনা জঙ্গীবাদ-বিচ্ছিন্নতাবাদীদের কোন আশ্রয় না দেওয়ার ব্যাপারে কঠোর অবস্থানের কারণেই ভারতের আস্থাভাজন। ভারতে কোন সরকার এলো না এলো সেটার চেয়েও ভারত তাঁর বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দমনের ক্ষেত্রে শেখ হাসিনাকে তাঁদের বিশ্বস্ত মিত্র মনে করেন। তাই অনেকের ধারণা যে, রাষ্ট্রদূত বদল একটি আনুষ্ঠানিকতা, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রদূত বদল কোন প্রভাব ফেলবে না এবং বাংলাদেশ সম্পর্কে ভারতের নীতিও খুব একটা বদলাবে না।