ঢাকা, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৪ আশ্বিন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

বাংলাদেশে চীনের আগ্রহ কি শুধু ব্যবসায়?

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৫ আগস্ট ২০২০ শনিবার, ০৯:৫৮ পিএম
বাংলাদেশে চীনের আগ্রহ কি শুধু ব্যবসায়?

বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক নিয়ে নানা রকম কথাবার্তা হয়। বিশেষ করে বাংলাদেশ ও চীনের অর্থনৈতিক সুসম্পর্ক ভারতের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে বলেও কোন কোন মহল থেকে বলা হয়। যদিও সম্প্রতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন যে, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক রক্তের। আর চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক একটির সঙ্গে আরেকটির কোন বিরোধ নেই। কিন্তু কূটনীতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন যে, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠতা ভারতের জন্য একটি মাথাব্যথার কারণ। ভারত এই অঞ্চলে চীনের যে আধিপত্য এবং অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদী কৌশল, সেই কৌশলে বাংলাদেশকে চায়। বাংলাদেশ- চীনের বেশি হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক ভারত কখনো প্রত্যাশা করেন না। যদিও দুই দেশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে চীন এখন এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

পদ্মা সেতু থেকে শুরু করে প্রায় সব বড় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডগুলোতে চীনের অংশগ্রহণ রয়েছে, চীনের সহযোগিতা রয়েছে। যদিও রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশ চীনের বৈরিতা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে পতিত। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে যে দেশগুলো বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল তারমধ্যে চীন অবশ্যই অন্যতম ছিল। সেই সময় চীন পাকিস্তানী জান্তা ও পাকিস্তানী গণহত্যার এক বড় সমর্থক ছিল। দীর্ঘদিন চীনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের শীতলতা ছিল। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে যখন নির্মমভাবে সপরিবারে হত্যা করা হয়। তারপর থেকে চীন বাংলাদেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করা শুরু করে। মজার ব্যাপার হল যে, বাংলাদেশে চীনপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যারা যুক্ত, তাদের একটি বড় অংশ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বিরোধী অবস্থান করেছিল। তারা দুই কুকুরের যুদ্ধ বলে এই মুক্তিযুদ্ধ থেকে নিজেদেরকে গুটিয়ে নিয়েছিলো।

আজকের সাম্যবাদী দল বা চীনপন্থী কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর একটি বড় অংশ সেদিন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি। বরং তারা এই মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অবস্থানের কারণে সমালোচিত হয়েছিলেন। পঁচাত্তরের পরেও চীনপন্থীরাই স্বাধীনতাবিরোধীদের সঙ্গে মিলে মিশে বিএনপি সংগঠিত করেছিল। সেই চীনের সঙ্গে এখন আওয়ামীলীগের যে সম্পর্ক, সেই সম্পর্ক কতটা বৈষয়িক কতটা আত্মীক সেই প্রশ্ন উঠতেই পারে। অনেকেই মনে করেন চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কটি শুধুমাত্র ব্যবসায়িক। বিশ্বে চীন একটি অর্থনৈতিক পরাশক্তি। চীনকে বাদ দিয়ে কোন দেশই অর্থনীতির চাকাকে বেশি দূর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে না। কারণ বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আমরা যদি বিশ্লেষণ করি তাহলে গার্মেন্টসের কাঁচামাল থেকে শুরু করে, শিল্পকারখানার যন্ত্রপাতির বড় অংশ চীন থেকে আমাদেরকে আনতে হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন দেশে দেখা গেছে যে, চীন শুধু অর্থনৈতিক আধিপত্যবাদ বিস্তার করেই ক্ষান্ত হয় না। সে দেশের রাজনীতির ক্ষেত্রেও একটি বড় ভূমিকা রাখে। সাম্প্রতিক সময়ে মালদ্বীপ ও শ্রীলংকার রাজনীতিতে চীন হস্তক্ষেপ করেছে, এমন তথ্য প্রমাণ কূটনীতিকরা পান।

অনেক কূটনীতিক মনে করেন যে, নেপাল সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের সঙ্গে যে বৈরিতা তৈরি করছে তার পেছনেও চীনের হাত আছে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কূটনীতি বিশ্লেষকরা গবেষণা করে দেখিয়েছেন যে, অর্থনৈতিকভাবে আধিপত্য বিস্তার করে চীন ওই দেশে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। একটা সময় পর্যন্ত যেটা মনে করা হতো, যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন- চীন তার সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে তাদের বাজার এবং অর্থনৈতিক বিস্তার করবে। সেই ধারণা ভুল বলে মনে করছেন হার্ভার্ডের গবেষকরা। তারা বলছেন, এখন চীন যেমন অর্থনৈতিকভাবে একটা দেশকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। ঠিক তেমনিভাবে ওই দেশের রাজনৈতিক বিষয়েও নাক গলাতে চায়। এটাই ভারতের মাথাব্যথার কারণ। বাংলাদেশের রাজনীতিতে যদিও চীনা লবিরা একেবারেই সক্রিয় নন। চীনপন্থী রাজনীতির একমাত্র প্রদীপ জ্বালিয়ে আছেন সাম্যবাদী দলের দিলীপ বড়ুয়া। তাও তার অবস্থান খুব একটা সক্রিয় নয়। আওয়ামী লীগে চীনের প্রতি ঘনিষ্ঠ বা চীনপন্থী হিসেবে পরিচিতদের মধ্যে সৈয়দ আবুল হোসেন ছাড়া কারো নাম উল্লেখ করার মতো নেই। তিনি যতোটা না রাজনীতিবিদ, তার চেয়ে বেশি ব্যবসায়ী।

তবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপির একটি অংশের সঙ্গে চীনের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু চীন কাউকে ক্ষমতায় আনা বা কোন দলের প্রতি সহানুভূতি দেখানোর মতো কৌশল এখনো পর্যন্ত গ্রহণ করেনি। কিন্তু বাংলাদেশে চীনের এখন বিনিয়োগ বাড়ছে। অর্থনৈতিক শর্তের কারণেই রাজনৈতিক বিষয়ে বাংলাদেশ কতদিন উদাসীন থাকবে? সেই প্রশ্ন অনেকের।