ঢাকা, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৪ আশ্বিন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

কেন ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি নিষিদ্ধ করল?

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ মঙ্গলবার, ০৪:৫৯ পিএম
কেন ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি নিষিদ্ধ করল?

সিদ্ধান্তটা আকস্মিক ছিল, দুইদিন আগেও ভারতীয় হাইকমিশনার রীভা গাঙ্গুলির সঙ্গে কথা বলেছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। ভার্চুয়াল এই সাক্ষাৎকারের পর ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন যে, বাংলাদেশ ভারত সম্পর্ক অত্যন্ত উষ্ণ এবং আন্তরিক। রক্তের ঋণের বন্ধনে দুই দেশ আবদ্ধ। কিন্তু তার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই ভারত বাংলাদেশে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দিল। এই সিদ্ধান্তটি এতোই আচমকা ছিল যে, বাংলাদেশ এর জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না। কারণ গত কিছুদিন ধরেই পেঁয়াজের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছিল। এর সতর্কতা হিসেবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় একাধিক দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির প্রক্রিয়া শুরু করেছিল।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র বলছে আর ১৫-২০ দিন পর এই সিদ্ধান্ত নিলে বাংলাদেশে তার প্রভাব পড়ত না। এবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয় অতীতের অভিজ্ঞতায় শুরু থেকেই প্রস্তুত ছিল। বিভিন্ন দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির ব্যাপারে প্রক্রিয়াও শুরু করেছিল। কিন্তু সে সমস্ত পেঁয়াজ আসার আগেই ভারতের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের পেঁয়াজের বাজারকে অস্থিতিশীল করেছে।

গত বছর একই কারণে ভারতের জন্য বাংলাদেশে পেঁয়াজের দাম কেজি প্রতি ২০০ টাকা উঠেছিলো। প্রশ্ন উঠেছে, কি কারণে হঠাৎ ভারত পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ করল? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে একাধিক কারণ বের হচ্ছে। যদিও ভারত থেকে বলা হচ্ছে যে, তাদের অভ্যন্তরীণ বাজারে পেঁয়াজের সংকট। তাদের দেশে পেঁয়াজের দাম বাড়ার কারণে তারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কিন্তু কূটনীতিক মহল মনে করছেন, এর পেছনে অন্য কোন কারণ রয়েছে। বিশেষ করে গত কয়েক মাস ধরে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের কূটনীতিক টানাপোড়েনের কথা শোনা যাচ্ছিল। এই টানাপোড়েনের মধ্যেই ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বাংলাদেশে সফরে আসেন। তিনি দুই দেশের সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ঘোষণা করেছিলেন। অনেকেই মনে করেন, বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বেশ কিছু প্রতিক্রিয়া হিসেবেই পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করেছে ভারত। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো এর পেছনে যে কারণগুলো থাকতে পারে বলে মনে করছে তারমধ্যে রয়েছে;

নেপালে সার রপ্তানি

ভারত সাম্প্রতিক সময়ে নেপালে সার রপ্তানি নিষিদ্ধ করেছে। সুস্পষ্টভাবে নেপালের উপর চাপ সৃষ্টির জন্যই ভারত এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কারণ নেপাল ইতোমধ্যে ভারতের সঙ্গে সীমান্ত নিয়ে বিরোধে জড়িয়ে পড়েছে এবং বিতর্কিত সীমান্ত এলাকায় ভারতের সীমান্ত খুঁটি উপড়ে ফেলার ঘটনাও ঘটেছে। এটা ভারত সহজভাবে নেয়নি এবং এইজন্য ভারত নেপালে সার রপ্তানি নিষিদ্ধ করে। আর এই সময়ে নেপালের প্রধানমন্ত্রী টেলিফোন করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে। বাংলাদেশ থেকে সার নেওয়ার জন্য নেপালের প্রধানমন্ত্রী আগ্রহ প্রকাশ করেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে নেপালকে সার দেওয়ার ব্যাপারে রাজি হন এবং এজন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও প্রদান করেন। একাধিক সূত্র বলছে যে, বাংলাদেশের এই সিদ্ধান্ত ভারত পছন্দ করেনি।

চীনের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক

চীনের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই কথাবার্তা হচ্ছে এবং এই নিয়ে ভারতের উদ্বেগ-উৎকন্ঠার কথা প্রায় প্রতিদিনই ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ে সার্ভিলেন্স সিস্টেমের কাজটি চীনা কোম্পানির পাওয়া, সিলেট বিমানবন্দরের কাজ চীনা কোম্পানির পাওয়ার প্রেক্ষাপটে দুই দেশের মধ্যে একটি শীতলতা তৈরি হয়েছে বলেও মনে করছেন অনেকে।

তিস্তায় গভীর জলাধার নির্মাণ

ইতোমধ্যে চীনের সঙ্গে ১০০ কোটি ডলারের একটি ঋণচুক্তি করেছে বাংলাদেশ। এই ঋণচুক্তির আওতায় ভারতের সীমান্তবর্তী তিস্তার দুই পাশে গভীর জলাধার নির্মাণ করা হবে। যেখানে বর্ষা মৌসুমে পানি জলাধারে সংগ্রহ করা হবে এবং তা শুকনো মৌসুমে ব্যবহার করা হবে। এর ফলে তিস্তার পানি চুক্তি অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়বে এবং এই নিয়ে ভারতের উপর নির্ভরশীল থাকতে হবে না বাংলাদেশকে। একাধিক সূত্র বলছে যে, ভারতের বিভিন্ন মহল থেকে এই বিষয়ে কথা হয়েছিল এবং হর্ষ বর্ধণ শ্রিংলার বাংলাদেশে আসার ক্ষেত্রে একটি বড় বিষয় ছিল এটা। কিন্তু এই ব্যাপারে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারত ইতিবাচক সাড়া পায়নি।

আর এই সমস্ত কারণেই বাংলাদেশের উপর একটা চাপ সৃষ্টির জন্যে পেঁয়াজ রপ্তানি নিষিদ্ধ করা হয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে। যদিও দুই দেশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বলা হচ্ছে যে পেঁয়াজ কূটনীতিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের কোন সম্পর্ক নেই। কারণ পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করা হয়েছে ভারতের একান্তই খাদ্য চাহিদা মেটানোর জন্যে। এই বিষয়টি ভারতের ফরেন ট্রেডের একটি অংশ। ভারতে পেঁয়াজের দাম স্থিতিশীল রাখার জন্যেই এটা করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে যাই হোক না কেন, পেঁয়াজ নিয়ে যে একটা রাজনীতি আছে তা মন করে বাংলাদেশের অধিকাংশ জনগণ।