ঢাকা, রোববার, ২৫ অক্টোবর ২০২০, ১০ কার্তিক ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

চিরদিন ক্ষমতায় থাকার বিএনপির ব্লু প্রিন্ট

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০১ অক্টোবর ২০২০ বৃহস্পতিবার, ১০:০০ পিএম
চিরদিন ক্ষমতায় থাকার বিএনপির ব্লু প্রিন্ট
 
অক্টোবর ২০০১, আপাত দৃষ্টিতে অবাধ এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে নিখুত পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের একটি নির্বাচন। যে নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসে। এই নির্বাচনের ফলাফল জনগণের ভোটের মাধ্যমে হয়নি; বরং একটি নীল নকশার নির্বাচনের নিখুত বাস্তবায়ন ছিল ১ অক্টোবরের ২০০১ এর নির্বাচন।
এই নির্বাচন হয়েছিল তারেক জিয়ার হাওয়া ভবনে তৈরি একটি ব্লু প্রিন্ট থেকে। এই নির্বাচনের নীল নকশার দুটি ভাগ ছিল। প্রথম ভাগ ছিল আওয়ামী লীগকে হারিয়ে নির্বাচনে বিজয়ী হতে হবে। আর ২য় ভাগ ছিল নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর বিএনপি জামায়াত জোটকে চিরস্থায়ী ক্ষমতায় রাখতে হবে। আর এটি বাস্তবায়ন করার জন্য যে নীল নকশা প্রণয়ন হয়েছিল, সেই নীল নকশার প্রথম ধাপে ছিল পাঁচটি স্তর।
 
প্রথম ধাপ
 
প্রথম স্তর ছিল প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়কে পকেটে পুরতে হবে। তারেক জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপির একাধিক নেতা ৬ মাস আগে থেকেই প্রশাসনের উচ্চ পদে আসীন অর্থাৎ সচিব পর্যায়ের ব্যাক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। তাদেরকে টোপ দেয়া হয়েছিল। বিএনপি জামায়াত ক্ষমতায় আসলে তারা কি কি সুবিধা পাবেন, সে সম্পর্কে যেমন বলা হয়েছিল; তেমনি দেয়া হয়েছিল নগদ আর্থিক সুবিধা। তাদেরকে বলা হয়েছিল যে, তারা যদি নির্বাচনে ভূমিকা পালন করে, তাহলে তারা ভবিষতে আরো ভালো থাকবেন। শুধু তাই নয়, তত্ত্বাবাধায়ক সরকার এলেই কে কোন মন্ত্রনালয়ে থাকবেন- সে সম্পর্কে তারেক সুনির্দিষ্ট ভাবে জানিয়ে দিয়েছিলেন।
 
একজন সচিব আলাপ কালে স্বীকার করেছেন যে, ২০০০ সালের নভেম্বর মাসে তারেক জিয়া তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। তিনি তত্ত্বাবাধয়ক সরকার এলে কোন মন্ত্রণালয় পেতে যাচ্ছেন, সে সম্পর্কে বলেছিলেন। সেটার জন্য এখনই হোম ওয়ার্ক করতে শুরু করতে অনুরোধ করেছিলেন। সচিবদের বশীভূত করার পর এই নীল নকশা করার ২য় পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু হয়।
 
দ্বিতীয় ধাপ
 
সেটি ছিল মাঠ প্রশাসন। বিএনপি জামায়াত পন্থি আমলাদের দিয়ে সম্ভাব্য জেলা প্রশাসক কারা হতে পারেন, তাদের একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছিল। এ তালিকায় সবই ছিল বিএনপি জামায়াতের মদদপুষ্ট ব্যক্তিরা। তাদেরকেই সারা দেশে জেলা প্রশাসকের দায়িত্বে যেন তত্ত্বাবাধায়ক সরকার নেয়, সে ব্যবস্থাও করা হয়েছিল। এই সমস্ত জেলা প্রশাসক অর্থাৎ যারা তত্ত্বাবাধয়ক সরকার এলে জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন, তাদেরকে নিয়ে গোপন বৈঠকও করেছিলেন তারেক জিয়া।
 
তৃতীয় ধাপ
 
তৃতীয় ধাপে পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গেও যোগাযোগ স্থাপন করা হয়েছিল, তারেক জিয়ার পক্ষ থেকে। তাদেরকেও নির্বাচনে বিএনপির পক্ষে কাজ করতে প্রলুব্ধ করা হয়েছিল এবং তাদেরকে ম্যানেজ করা হয়েছিল।
 
চতুর্থ ধাপ
 
আর ৪র্থ বিষয় ছিল আন্তর্জাতিক পরিমন্ডল। তারেক জিয়া ভারতে গিয়ে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার ‘র’ এর সঙ্গে সমঝোতা করেছিলেন যে, নির্বাচনে জয়ী হলে তারা ভারতকে কি কি  সুযোগ সুবিধা দিবে।
 
এই সমস্ত প্রেক্ষাপটের বাস্তবায়ন দেখা যায়, লতিফুর রহমানের নেতৃত্বে তত্ত্বাবাধায়ক সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে। শপথ নেয়ার ১০ মিনিটের মধ্যেই ১৯ জন সচিবকে বদলি করে দেয়া হয়। যাদেরকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেয়া হয়, তারা সবাই ছিলেন বিএনপি জামায়াতের সঙ্গে আগেই সমঝোতা করে নেওয়া ব্যক্তিবর্গ। এরা দায়িত্ব গ্রহণ করেই মাঠ প্রশাসনে রদবদল করেন। বিএনপি জামায়াত পন্থিদেরকে জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব দেয়া হয়। একই ভাবে পুলিশ প্রশাসনেও বিএনপি জামায়াত পন্থিরা সব জায়গায় গুরুত্বপুর্ণ পদগুলোতে বসেন।
 
এরপর শুরু হয় আওয়ামী লীগ নিধন। নির্বাচনের আগেই আওয়ামী লীগকে হারিয়ে দেয়ার জন্য সারা দেশে সাঁড়াশি অভিযানের নামে আওয়ামী লীগকে কোণঠাসা করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। আর যেহেতু ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে আগে থেকেই সমঝোতা করা হয়েছিল। সে জন্য এই নির্বাচনে আন্তর্জাতিক মহল কোন হস্তক্ষেপ করেনি। বরং প্রশাসনিক ক্যু, সে ক্যুকে সমর্থন দিয়া হয়েছে। নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বিএনপি তার ২য় লক্ষ্য বাস্তবায়ন করেন। এ লক্ষ্যেরও চারটি ধাপ ছিল।
 
প্রথম ধাপ
 
প্রথম ধাপ ছিল যে আওয়ামী লীগ নিধন। ১ অক্টোবর নির্বাচনের পরপরই সারাদেশে আওয়ামী লীগ কর্মী-সমর্থকদের হত্যা, তাদের বাড়ি-ঘর লুট করা, অগ্নি সংযোগ করা, গ্রাম ছাড়া করা শুরু হয়। একই সাথে ধর্ষণ এবং নিপীড়নের মাধ্যমে একটি আতঙ্কের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করা হয়, যাতে মানুষ আওয়ামী লীগ করতে ভয় পায়।
 
দ্বিতীয় ধাপ
 
দ্বিতীয় লক্ষ্য ছিল বিচার বিভাগের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। কে এম হাসানকে প্রধান বিচারপতি করা হয়। তাকে বয়স বাড়িয়ে এমন পরিস্থিতিতে নিয়ে যাওয়া হয়, যেন তিনি পরবর্তিতে তত্ত্বাবাধায়ক সরকারের প্রধান হন। নির্বাচন কমিশনে বিএনপি লোকদের বসানো হয়, যেন নির্বাচনের ফলাফল বিএনপির অনুকূলে আসে।
 
সর্বশেষ যে পরিকল্পনা করা হয়েছিল, দেড় লাখ ভূয়া ভোটার তালিকা তৈরি করা হয়েছিল; নির্বাচনে যাতে বিএনপি বিজয়ী হয়। এ ছাড়াও আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করতে ২১ আগষ্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনাও ঘটানো হয়েছিল। কিন্তু এতো সব ষড়যন্ত্রের পরও ২০০৭ সালে নির্বাচন করতে পারেনি বিএনপি। এই নীল নকশার কারণেই বিএনপি এখন ইতিহাসের আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে, বলে মনে করেন বিএনপির নেতাকর্মীরা।