ঢাকা, রোববার, ০৬ ডিসেম্বর ২০২০, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

নিজের পিতাকেও গুলি করতে চেয়েছিল ইরফান!

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৮ অক্টোবর ২০২০ বুধবার, ০৮:৫৭ পিএম
নিজের পিতাকেও গুলি করতে চেয়েছিল ইরফান!

 

হাজী সেলিম নিজেই লালবাগ এলাকায় একজন সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত। রাজনীতিতে তার উত্থানই সন্ত্রাসের মাধ্যমে। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, জমি দখল, বুড়িগঙ্গা দখল ইত্যাদি তার নিত্য-নৈমিত্তিক কাজ। মানুষের সাথে জবরদস্তি করা থেকে শুরু করে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলও দখলের অভিযোগও রয়েছে হাজী সেলিমের বিরুদ্ধে। এলাকার মানুষকে ভয়-ভীতি দেখানো বা জিম্মি করে রাখাই ছিল তার রাজনৈতিক কৌশল। আর এই কৌশলের কারণেই প্রথমে ওয়ার্ড কমিশনার এবং পরে ‘৯৬ সালে এমপি হয় হাজী সেলিম।

হাজী সেলিমের দুই পুত্র। দু’জনের মধ্যে বড় ছেলেকে নিয়ে কোন অভিযোগ নেই। কিন্তু ছোট ছেলেটি শুরু থেকে ছিল দুর্বিনীত, সন্ত্রাসী এবং অবাধ্য হয়ে উঠে। লালবাগের একাধিক ব্যক্তি জানায়, ইরফান ছোটবেলা থেকেই বখে যায় এবং নানা রকম অপকর্মের সঙ্গে যুক্ত হতে শুরু করে। ইরফানের সঙ্গে এক সময় চলাফেরা ছিল এই একজন বলেন,‘বখে যাওয়ার কারণে ইরফান শিক্ষা জীবনও শেষ করতে পারেনি। বিবিএ ভর্তি হলেও পড়াশোনা শেষ করতে পারেনি’। মহল্লার স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, ইরফানের এমন দুর্বিনীত হয়ে উঠার কারণেই হাজী সেলিম তাকে বিয়ে দিয়েছিলেন। সেইসাথে রাজনীতিতেও তাকে আনতে চেয়েছিলেন।

হাজী সেলিমের ঘনিষ্ঠরা বলেন,‘শেষ দিকে এসে হাজী সেলিমের সাথেও ইরফানের দূরত্ব তৈরি হয়। এটাকে ঠিক দূরত্ব বললেও ভুল বলা হবে। এক রকমের দ্বন্দ্বই বলা চলে’। তারা জানায়, বিভিন্ন বিষয়ে হাজী সেলিমের সঙ্গে প্রতিনিয়নই তার ঝগড়া বিবাদ হতো। ২০১১ সালের একটা ঘটনার কথা উল্লেখ করে তারা বলেন, তখন হাজী সেলিমকে পিস্তল নিয়ে তাড়া করেন ইরফান সেলিম। আর এরপর থেকে হাজী সেলিম ছেলে ইরফানকে ‘সমঝে’ চলতে শুরু করেন। লালবাগের বেশ কয়েকজন জানায়, ইরফান বড় হওয়ার সাথে সাথে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করতে থাকে। সেইসাথে চাঁদাবাজি আর দখল জবরদস্তিতে হাজী সেলিমকেও কোণঠাসা করে ফেলে।

জানা গেছে, ইরফান আগামী নির্বাচনে এমপি হওয়ার লড়াইয়ে নামতেন। এই বিষয়ে হাজী সেলিমকেও তিনি আগে থেকে সতর্ক করে দিয়েছেন বলে খোঁজ নিয়ে জানা যায়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন জানান, ইরফান ছোটবেলা থেকেই টাকার জন্য তার মা কে আটকে রাখত, অনেক সময় মারধর করত। সে যে বদমেজাজি এবং বদরাগী তা মাধ্যমিকের পর থেকেই সকলে জানতে শুরু করে। তাই ভয়ে সমঝে চলত সবাই।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কলেজ জীবন শেষ হতেই একটি নিজস্ব বাহিনী গড়ে তুলে ইরফান। আর এই বাহিনীর মাধ্যমের এলাকায় সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে জোর জবরদস্তি করে যে কোন কাজ করে বেরাত। গাড়ি নিয়ে ইরফান সেলিমের বাড়াবাড়ি বা উদ্ধত আচরণ অনেক আগে থেকেই বলে জানায় এলাকাবাসী। এর এই রকম ঘটনায় পুরান ঢাকায় অনেকেই লাঞ্চিত ও নিগ্রহের স্বীকার হয়েছেন বলে জানা যায়। লাঞ্চনার হাত থেকে নারীরাও বাদ যায়নি বলে জানায় মহল্লার অনেকে। গত বছরেই লালবাগ এলাকায় একটি বড় ঘটনা ঘটে। সে সময় ইরফানের গাড়ির সামনে দিয়ে রাস্তা পার হচ্ছিলেন এক কলেজ পড়ুয়া ছাত্রী। তখন ইরফান সেলিমের লোকজন ছাত্রীটিকে উঠিয়ে নিয়ে মদিনা আশিক টাওয়ারে আটকে রাখে। অবশ্য পরে অনেক অনুনয় করে মেয়েটিকে উদ্ধার করে তার অভিভাবকরা।

এ ঘটনার পরও ইরফান সেলিম কীভাবে কাউন্সিলর হল- সেটা একটি বড় প্রশ্ন। এলাকা বাসী জানায়, তাদের কোন উপায় ছিল না। ইরফান সেলিম এলাকায় এক আতঙ্কের নাম। তাদের মতে, হাজী সেলিমের তাও কিছু গুণ ছিল- সে এলাকার গরীব মানুষদের কিছু সাহায্য সহযোগিতা করত। মানুষের অভাব, অভিযোগ কিছুটা হলেও শুনত। কিন্তু ইরফান সেলিম এসবের ধারে কাছেও নেই। এলাকার মানুষকে মারপিট করা আর সন্ত্রাস করাই ছিল তার কাজ।

জানা গেছে, গত ১ বছরে ইরফান বাহিনী এলাকায় পুরো ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে রেখেছিল। আর এই বাহিনীতে ৭০ জনের মতো ক্যাডার ছিল। র‍্যাবের মতে, এদের সবার হাতেই অস্ত্র ছিল, যার সব কটিই আবার অবৈধ। আর এসবের কারণে এলাকায় ইরফান সেলিমের কথাই ছিল শেষ কথা। আর এই কারণে হাজী সেলিমও ছেলের ব্যাপারে হতাশ হয়ে পরেছিলেন। শেষের দিকে একেবারে হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন বলেও জানা যায়।

একাধিক ব্যক্তি জানায় যে, হাজী সেলিম বাকশক্তি হারানোর আগেও তার ছেলেকে নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করতেন। আর এখন হাজী সেলিমের এই উদ্বেগই যেন সত্যি হল!