ঢাকা, রোববার, ১৮ এপ্রিল ২০২১, ৫ বৈশাখ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

বিজেপির আদলে বিএনপি গড়ার উদ্যোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০১ মার্চ ২০২১ সোমবার, ০৯:৫৬ পিএম
বিজেপির আদলে বিএনপি গড়ার উদ্যোগ

সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে হঠাৎ করেই বিএনপির একটি চাঙ্গা ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্যদিয়ে আজ বিএনপি স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে অনুষ্ঠান শুরু করেছে। ঢাকার একটি পাঁচ তারকা হোটেল লেকশোরে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধন করা হয়েছে। বিএনপি এইবার প্রথম ৭ মার্চ উদযাপন করছে। 

বিএনপির নেতারা বলছেন, সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের পাশাপাশি রাজপথের আন্দোলন, দুটিই তারা সমান্তরালভাবে করতে চায়। রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বিএনপি তার সংগঠনের যে সীমাবদ্ধতা এবং দুর্বলতা সেটা কাটিয়ে উঠতে চায় বলে বিএনপির নেতারা বলছেন। এর মধ্যে গতকাল আকস্মিকভাবে বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে বিএনপির তিন নেতা সাক্ষাৎ করেছেন। অন্যদিকে বিএনপির সূত্রগুলো জানাচ্ছে যে, লন্ডনে পলাতক বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানের দীর্ঘদিন ধরে কোন খবর নেই। বিএনপির নেতাদের সঙ্গে তিনি এক রকম যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেছেন। খালেদা জিয়ার গত কয়েকদিন ধরেই রাজনীতিতে একটি অনাগ্রহ তৈরি হয়েছে এবং এখন তিনি আবার জেলে যাবেন, না জামিনের মেয়াদ বৃদ্ধি হবে তা নি টানাপোড়নের মধ্যে রয়েছেন।

এর মধ্যে বিএনপিতে পরিবারতন্ত্রের বিরুদ্ধে গুঞ্জন উঠেছে এবং বিএনপির মধ্যে একটি নীরব মেরুকরণ ঘটছে। বিএনপির যারা শুভাকাঙ্ক্ষী, যারা বিএনপির রাজনীতির প্রয়োজনীয়তার কথা মানেন এবং আওয়ামী বিরোধী একমাত্র রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি টিকে থাকবে বলে মনে করেন, তারা এখন এই মেরুকরণে উস্কানি দিচ্ছেন। তারা মনে করছে যে, এখন জিয়া পরিবারের বাইরে বিএনপিকে গড়ার সুযোগ এসেছে এবং এভাবেই যদি বিএনপি তৈরি হয় তাহলে বিএনপি একটি শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে যেমন আত্মপ্রকাশ করবে তেমনি অন্যান্য রাজনৈতিক দল এবং জোট থেকেও নেতৃবৃন্দকে এনেও বিএনপিকে শক্তিশালী করা যাবে। আর এই প্রক্রিয়ায় বিএনপি পূনর্গঠনে বিজেপি মডেল অনুসরণ করা হচ্ছে। উপমহাদেশে পরিবারতন্ত্রের বাইরে গিয়ে বিজেপি প্রথম সফল রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে, যে রাজনৈতিক দলের উত্তরাধিকার নির্বাচিত হচ্ছে যোগ্যতার ভিত্তিতে এবং একটি যৌথ নেতৃত্বের মাধ্যমে দল পরিচালনা করছেন। বিএনপির মধ্যেই এখন বিজেপি মডেলের ব্যাপারে জোর গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। তবে বিএনপি নেতারা বলছেন যে, এটি স্রেফ গুঞ্জন এবং যারা বিএনপিকে ভাঙতে চাইছে, দুর্বল করতে চাইছে তাদের ষড়যন্ত্রের অংশ।

সাম্প্রতিক সময়ে সরকার বিরোধী আন্দোলনের জন্য যে মেরুকরণ তৈরি হচ্ছে, সেই মেরুকরণে যারা উদ্যোক্তা তারা সবাই জিয়া পরিবারতন্ত্র মুক্ত একটি বিএনপির কথা বলছেন। কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম ওয়ান-ইলেভেন থেকেই রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্রের বিরুদ্ধে কথা বলছেন। তিনি মনে করেন যে, বিএনপির বর্তমান যে নেতৃত্ব আছে তাদের মধ্যে থেকেই নেতৃত্ব বেঁছে নিয়ে বিএনপিকে সংগঠিত করা উচিত। কর্নেল অলি আহমেদ প্রকাশ্যেই পরিবারতন্ত্রের বিরুদ্ধে কথা বলছেন এবং তারেক জিয়ার এখন বিএনপিতে আসার যোগ্যতা নেই, এরকম মন্তব্যও তিনি করেছেন। কারো কারো সঙ্গে বিএনপির সুসম্পর্ক রয়েছে। এদের মধ্যে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম নেতা ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরী প্রকাশ্যেই তারেক জিয়াকে আপাতত রাজনীতি থেকে সরে যাওয়ার দাবি জানিয়েছেন এবং বিএনপির মধ্য থেকেই কাউকে নেতৃত্বে বেছে নেওয়ার কথা বলেছেন।

গত তিনমাস বিএনপির মধ্যে দৃশ্যত সেই মেরুকরণটি দেখা যাচ্ছে যে, জিয়া পরিবারের প্রভাবমুক্ত থেকে বিএনপি কিছু কর্মসূচি পালন করছে এবং সেই সমস্ত কর্মসূচির কারণে কিছু শুভ উদ্যোগও দেখা গেছে। বিএনপির ৭ মার্চ উদযাপনকে আওয়ামী লীগও স্বাগত জানিয়েছে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন এর মাধ্যমে বিএনপি তরুণ প্রজন্মের ভোটার, যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করে তাদেরকে প্রথমবারের মতো আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে। আর এই পরিবর্তনগুলো সম্ভব হয়েছে জিয়া পরিবারের প্রভাব মুক্ত থেকে নেতৃত্বের কারণে।

বিএনপির থিংক ট্যাঙ্কদের কেউ কেউ মনে করেন যে, বিএনপির একটি চিরন্তন সমর্থক গোষ্ঠী থাকবে যারা আওয়ামী লীগ বিরোধী এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল উগ্র বাম যারা ছিল এদের আশ্রয়স্থল হলো বিএনপি। কাজেই বিএনপিতে কে নেতা থাকলো না থাকলো সেটি বড় বিষয় নয়, বড় বিষয় হলো বিএনপির একটি ভোট-ব্যাংক আছে। যদি জিয়া পরিবারের প্রভাবমুক্ত থেকেই ভোট-ব্যাংকে কাজে লাগানো যায়, তাহলে বিএনপি শক্তিশালী হবে। বিজেপি যদি পরিবারতন্ত্রের রাজনীতি না করে ক্ষমতায় আসতে পারে এবং একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক দল হিসেবে বিকশিত হতে পারে, তাহলে বিএনপি কেন পারবে না সেই প্রশ্ন বিএনপির মধ্যে এখন উঠছে। আর এজন্যই বিএনপির ভিতরে বাহিরে এখন জিয়া পরিবার মুক্ত একটি বিএনপিকে এগিয়ে নেওয়ার দাবি উচ্চারিত হচ্ছে। খালেদা জিয়া এবং তারেক জিয়া এখন কিছুটা হলেও দূরত্ব রেখে আছে। বিএনপির নেতারাই এখন নিজেদের মধ্যে আলাপ আলোচনা করে রাজনৈতিক কর্মসূচী এবং অন্যান্য ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। এর ফলে পরিবর্তিত বিএনপি কতটা সফল হবে কিংবা বিএনপি আদৌ ভারতের বিজেপির মত একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে বিকশিত হতে পারবে কিনা সেটা সময় বলে দেবে।