ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৯ অক্টোবর ২০২১, ৪ কার্তিক ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

বাংলাদেশে বাম রাজনীতির ভবিষ্যৎ

অলিউল ইসলাম
প্রকাশিত: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১ শনিবার, ১১:০০ এএম
বাংলাদেশে বাম রাজনীতির ভবিষ্যৎ

দেশে একটা কথা চালু আছে মানুষ বাঁ হাত ব্যবহার করে শৌচকর্মের জন্য, আর অন্যের শৌচকর্মে সহায়তার জন্য ব্যবহৃত হয় বামপন্থীরা। কথাটি মোটা এবং চিকন, উভয় দাগেই প্রযোজ্য। বাংলাদেশ থেকে অনেকটাই উঠে গেছে বাম রাজনীতি।  

বামপন্থীরা শতধা বিভক্ত। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বধীন ১৪ দলীয় জোটে রাশেদ খান মেননের ওয়ার্কাস পার্টি, হাসানুল হক ইনুর জাসদসহ ১০টি বাম দল। আর ২০ দলীয় জোটে রয়েছে আরো দুই দল। 

এর বাইরে বাম দলগুলোর আরও ২টি জোট রয়েছে। সিপিবি, বাসদ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি, ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগ, সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন, গণসংহতি আন্দোলন, বাসদ (মার্ক্সবাদী) মিলে গঠন করা হয়েছে বাম গণতান্ত্রিক জোট। আর জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল, জাতীয় গণফ্রন্ট, বাংলাদেশে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন নিয়ে গঠিত হয়েছে জাতীয় মুক্তি জোট। প্রশ্ন হলো, এই জোটগুলোর রাজনৈতিক তাৎপর্য কী? আগামী জাতীয় নির্বাচনে তাদের কী ভূমিকা থাকবে? কিংবা ভোটের হিসাবে কোথায় তাদের অবস্থান এ নিয়ে কোনো পর্যালোচনা নেই তাদের।

বাম দলগুলো একদিকে সরকার বিরোধী কথা বলছে, কিন্তু কোনো কর্মসূচি দিতে পারছে না। বস্তুত তাদের কোনো সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড নেই। অন্যদিকে মৌলবাদীরাও জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। সাধারণ মানুষদের মধ্যে বামদের নিয়ে কোনো প্রভাব-প্রতিক্রিয়া অবশিষ্ট নেই। তাদের কর্মকাণ্ড তেল-গ্যাস রক্ষা আন্দোলনেই সীমাবদ্ধ। অনেকেই মনে করেন তেল-গ্যাস ইস্যু ছাড়া তাদের সামনে কোনো ইস্যু নেই। 

এ দিকে নির্বাচনেও আসছে না অধিকাংশ বাম দল। গত নির্বাচনে যদিও এসেছিল, কিন্তু জনগণের সাড়া পায়নি। বলা হয়, বড় কোনও দলের ছত্রছায়ায় না থাকলে তাদের টিকে থাকা কঠিন। যদিও তারা রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তনের কথা বলেন, সমতাভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার কথা ভাবেন, কিন্তু তারপরও কেন তারা ভোট পায় না, তা একটি বড় রহস্য।

স্বাধীনতার পর থেকে এযাবৎ যে ১১টি জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছে তাতে বাম রাজনৈতিক দলগুলোর আসন প্রাপ্তি পর্যালোচনা করলে ভোটের রাজনীতিতে তাদের জনপ্রিয়তার মোটামুটি চিত্র পাওয়া যায়। ১৯৭৩ সালে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাম শিবির মাত্র একটি আসনে জয়ী হয়েছিল। ১৯৭৯ সালে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে নয়টি আসনে জয় লাভ করে। ১৯৮৬ সালে অনুষ্ঠিত তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পায় পাঁচটি আসন। ১৯৮৮ সালে অনুষ্ঠিত চতুর্থ জাতীয় সংসদে ২২টি আসনে জয় পায় যা ৯১ এর নির্বাচনে এসে ছয়টি আসনে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়।১৯৯৬ সালে অনুষ্ঠিত সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আরো কমে একটি মাত্র আসনে জয় লাভ করে বামপন্থী দলগুলো। এরপর ২০০১ সালের নির্বাচনে গোল্লায় যাওয়া সম্পূর্ণ করে বাম শিবির। অষ্টম জাতীয় নির্বাচনে একটি আসনও পায়নি তারা। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটবদ্ধ থেকে তারপরের নির্বাচনগুলোতে কয়েকটি আসন পাচ্ছে।  

তবে অনেকেই বলছেন, আওয়ামী লীগের করুনায় বাম দলগুলো কয়েকটি আসন পায়। আওয়ামী লীগ যদি নিজেদের পার্থীকে বসিয়ে না দেয়, তাহলে সাংসদ তো বহুদূরে, ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার হওয়ার যোগ্যতাও রাখেন না বলেও মনে করছেন তারা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বাম রাজনীতির অচলাবস্থার কারণ হিসেবে অনেকগুলো অনুসঙ্গ সামনে এনেছেন। তারা বলছেন, একাধিক কারণে দেশের বাম শিবিরের দূরাবস্থা।

প্রথমত, আমাদের কমরেডরা কার্ল মার্কসের ইন্ডাসট্রিয়াল রেভুলেশনকে কন্ট্রোল সি, কন্ট্রোল ভি, অর্থাৎ কপি পেষ্টে মত্ত থেকেছেন। বামপন্থীরা যদি মস্কো, পিকিং জিগির না তুলে এ দেশের মাটি, মানুষ, ভূমি আর জলবায়ুর উপর আস্থা ও নির্ভর করে কৃষকদের নিয়ে বিপ্লবের চিন্তা করতেন তাহলে হয়তো আজ ’বাংলাদেশে বাম রাজনীতি: ব্যর্থ না অসম্ভব’, ’পচে যাওয়া বাম’ কথাগুলো বলা এত সহজ হতো না। হয়তো বা হতোই না। কে জানে? 

দ্বিতীয়ত, কার্ল মার্কসকে ফেরেশতা সরূপ হাজির করা। কার্ল মার্কস আমাদের মতো দোষে গুণে মানুষ ছিলেন। কিন্তু অধিকাংশ বামপন্থী সেটা মানতে নারাজ। তাদের একগুঁয়েমিও রাতারাতি জনবিচ্ছিন্ন হতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।

তৃতীয়ত, ছোট ছোট বাম দলগুলোতে লেনিনের সংখ্যা খুব বেশি হয়ে গেছে। এমনকি ছাত্রছাত্রীদের যে ছোট ছোট স্টাডি সার্কেলে প্রত্যেকেই মনে করে যে সে লেনিন হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তারা সবাই যে একসঙ্গে কাজ করবে বা এ ধরনের কোনো চিন্তা করবে, এটা নেই। কাজেই তারা বিচ্ছিন্নভাবে কিছু মার্ক্সবাদী সাহিত্যচর্চা করে, পত্রিকা বের করে ইত্যাদি করে। কিন্তু আসলে কোনো বিপ্লবের চিন্তা এখানে অনুপস্থিত।

চতুর্থত, কমিউনিস্ট তথা বামপন্থীদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের আস্থাহীনতার আর একটি বড় কারণ হচ্ছে বিভিন্ন জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে তাদের ভুল সিদ্ধান্ত। ভুল সিদ্ধান্তের কারণে মানুষের কাছে, রাজনৈতিক মহলে সমালোচিত হয়েছে, নিন্দিত হয়েছেন তারা। পরে বদনাম ঘুচিয়ে মূলধারায় আসার চেষ্টা করলেও ততদিনে ক্ষয় রোধের শক্তি হারিয়ে ফেলেছেন বামপন্থীরা।

বাংলাদেশে বাম রাজনীতি মূলধারা থেকে ছিটকে পড়লেও বিশ্বে নতুন করে বাম রাজনীতির উত্থান ঘটছে। নানান দেশের নানান জায়গায় মিলিত হতে শুরু করেছে সর্বহারারা। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য নির্বাচনে বামরা হারলেও কেরালা রাজ্যে ঠিকই বিজয়ী হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে কোথাও নেই বিজয়ের লক্ষণ। 

বর্তমানে বামরা বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়ের উপর নীতি-ভিত্তিক ও আদর্শগত অবস্থান নিয়েছে, কিন্তু তাদের নিজেদের দলের অবস্থা নেই। এমতাবস্থায় এ প্রশ্ন উঠতেই পারে যে, বাম রাজনীতি বাংলাদেশ থেকে কি এক প্রকার উঠেই গেছে?