ইনসাইড থট

চুপচাপ গভর্নর, অন্যরাও কি বিব্রত হননি?


প্রকাশ: 09/06/2024


Thumbnail

বাজেট পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থেকেও একটি কথাও বলেননি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার। এমন নয় যে সেই সংবাদ সম্মেলনে ব্যাংক নিয়ে কোনো প্রসঙ্গ ছিল না। কিন্তু গভর্নর কোনো কথা বলেননি কারণ অর্থমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনের শুরুতেই অর্থ-বাণিজ্য বিষয়ক রিপোর্টারদের সংগঠন ইকনোমিক রিপোর্টাস ফোরামের (ইআরএফ) সভাপতি জানিয়ে দেন সাংবাদিকরা গভর্নরের বক্তব্য বয়কট করবেন। ওসমানি মিলনায়তনের সংবাদ সম্মেলনে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি মোহাম্মদ রেফায়েত উল্লাহ মীরধা অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকে সাংবাদিকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর। সে জন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমরা কেউ তাঁর বক্তব্য শুনব না। তিনি যেন কোনো বক্তব্য না দেন, সে বিষয়ে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বক্তব্য দিলে আমরা তা বয়কট করব।’ 

মাঠের রিপোর্টার হিসেবে অনেকদিন বাজেটত্তোর সংবাদ সম্মেলন কাভার করেছি, সেখানে কোনো দিনই এমন ঘটনা ঘটেনি। আরো অদ্ভুত যে অর্থমন্ত্রী গত শুক্রবারের সংবাদ সম্মেলনে সূচনায় হাসিমুখে থাকলেও একের পর এক অস্বস্তিকর প্রশ্নে মেজাজ হারিয়েছেন। এমনকি এক পর্যায়ে সাংবাদিকদের “ম্যাচিউরিটি” নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। আর শেষেতো বলেই ফেললেন যে সাংবাদিকরা বাজেট বইটি পর্যন্ত পুরোটা ভালো করে পড়ে আসেননি। কিন্তু ইআরএফ নেতা যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে বর্জনের কথা বললেন, সে সম্পর্কে একটা শব্দও বলেননি সাবেক পররাষ্ট্র মন্ত্রী এবং কর্মজীবনের শুরুতেই অর্থনীতির শিক্ষক অর্থমন্ত্রী আবুল হাান মাহমুদ আলী। দৈনিক প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘পুরো সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেননি গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার। ব্যাংক ও আর্থিক খাতের নানা বিষয় নিয়ে প্রশ্নের জবাব দেন অর্থমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা মসিউর রহমান, অর্থ প্রতিমন্ত্রী ওয়াসিকা আয়শা খান, অর্থসচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদারসহ অন্যরা। সংবাদ সম্মেলনের বেশির ভাগ সময় গভর্নরকে গালে হাত দিয়ে চুপচাপ বসে থাকতে দেখা যায়।’

এবারের বাজেটের আগে সবচেয়ে আলোচনায় ছিল মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক ঋণের সুদহার, ডলারের দাম এবং রিজার্ভের ক্ষয়। সংবাদ সম্মেলনে এ সম্পর্কিত অনেক প্রশ্নই হয়তো ছিল, যার জবাব আমরা শুনতে পারতাম গভর্নরের কাছ থেকে। কিন্তু জাতি তা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এটা ঠিক যে বাংলাদেশ ব্যাংক গণমাধ্যম কর্মীদের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে প্রবেশে বাধা সৃষ্টি করলেও রিজার্ভ সংকটসহ কোনো খবরই কিন্তু অপ্রকাশিত থাকছে না। বরং সেই সুযোগে এমন গুজব ভিত্তিক খবরও প্রচার হয়েছে যে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে আবারো অর্থ চুরি হয়েছে। সেই গুজবের জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংক যে ব্যাখ্যা দিয়েছিল তাও কিন্তু গণমাধ্যমগুলো জাতীয় দায়িত্ব হিসেবেই প্রচার করেছে। গত শুক্রবারের সংবাদ সম্মেলনেও কিন্তু আইআরএফ-এর সভাপতি স্পষ্টভাবে বলেছেন সকল মন্ত্রীসহ অন্যান্যদের বক্তব্য প্রচার করলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর কোনো বক্তব্য দিলে তারা তা বয়কট করবেন।

সুধীসমাজে আলোচনা আছে বর্তমান সরকারের আর্থিক নীতি নির্ধারকদের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি আব্দুর রউফ তালুকদার। ২০২২ সালের ১২ জুলাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হওয়ার আগে তিনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৯৮৮ সালে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে যোগ দিয়েছিলেন রউফ তালুকদার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ থেকে এমবিএ এবং যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উন্নয়ন ব্যবস্থাপনায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রী নেয়া এই দক্ষ আমলা দীর্ঘ অর্থ মন্ত্রণালয়ে কাজ করলেও একজন আমলা হিসেবে তার পরিচিতি সংরক্ষণবাদী হিসেবেই। তাই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে তিনি দায়িত্ব নেবার পর মতিঝিলের সুরম্য অট্টালিকায় সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকারে নিষেধাজ্ঞা নেমে আসায় অবাক হইনি। কিন্তু মাঠের রিপোর্টারদের সাথে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধানের এমন সম্পর্কহানি কাম্য নয়। একথা ঠিক যে রাজনীতিক মন্ত্রীদের মত বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হরহামেশাই গণমাধ্যম্যের মুখোমুখি হবে তা হয়তো আশা করা ঠিক নয়। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপত্র নিয়োগ এবং প্রাথমিকভাবে তার বক্তব্য নিয়েই সাংবাদিকরা সন্তুষ্ট ছিল, আর এটাও ঠিক যে খুব যে অবাধভাবে যাতায়াত করা যেতো তাও কিন্তু নয়। কিন্তু আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার বন্ধ করা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আর তা নিয়ে যখন ইআরএফের নেতারা যখন গভর্নরের সাথে দেন-দরবার করতে গেলেন তখন কিন্তু তারা প্রত্যাশিত সম্মান পাননি। তখন থেকেই গভর্নরকে বয়কটের বিষয় চলে আসছে। সর্বশেষ বাজেটত্তোর সংবাদ সম্মেলনে যা ঘটলো তাতো শুধু একজন আমলা নন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মত সরকারের সর্বোচ্চ আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবেও সরকারের জন্যই বিব্রতকর হলো ঘটনাটি। কিন্তু হতাশার বিষয় হলো সংবাদ সম্মেলনের পরও ওসমানি মিলনায়তনে উপস্থিত মন্ত্রিসভার কেউই কিন্তু বিষয়টি নিয়ে কোনো কথা বললেন না। বা জানতে চাইলেন না, কি পর্যায়ে এসে ইকোনমিক রিপোর্টার ফোরাম এমন অবস্থান নিল?

গভর্নরের সাথে সাংবাদিকদের যে অস্বস্তিকর অবস্থা চলে আসছে কিছুদিন থেকে তা নিরসনেরও কিন্তু কোনো উদ্যোগ রাজনীতিক এবং জনপ্রতিনিধি হিসেবে নতুন অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীও নেননি। যিনি অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পাবার আগে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটির সভাপতি এবং তার আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক যে অর্থ-বাণিজ্যের মাঠ পর্যায়ের রিপোর্টার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের মধ্যে যে সংকটের সৃষ্টি সেব্যাপারে অর্থমন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি। সর্বশেষ গত ২৫ এপ্রিল ইআরএফের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে একটি আলোচনা হলেও বাংলাদেশ ব্যাংকে সাংবাদিকদের প্রবেশ নিয়ে অচলাবস্থার নিরসন হয়নি। বিষয়টি নিয়ে ইআরএফ নেতৃবৃন্দ ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন ও জাতীয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন। সেই বৈঠকের বিষয়টি তথ্য প্রতিমন্ত্রীকেও অবহিত করা হয়েছে বলে জানালেন ইআরএফ সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম। সরকারের কোনো কর্তৃপক্ষই তাদের বিষয়টি নিয়ে বা সৃষ্ট সমাধানে কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ফলে সর্বশেষ একটি বিব্রতকর ঘটনা ঘটলো গত শুক্রবার অর্থমন্ত্রীর বাজেট পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে। বিষয়টি দুঃখজনক। আমরা আশা করতেই পারি যে অর্থ মন্ত্রণালয়, দ্বিতীয়ত তথ্য মন্ত্রণালয় বিষয়টি নিয়ে ইআরএফের নেতাদের সাথে কথা বলতে পারে। আর একটি উদ্যোগ নিতে পারে সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। বিষয়টি দ্রুত সুরাহা হওয়া দরকার বলেই, বিষয়টি নিয়ে লিখলাম। আশা করি সংশ্লিষ্টরা খোলা মনে বিষয়টি বিবেচনায় নিবেন। 

লেখক: প্রণব সাহা
সম্পাদক, ডিবিসি নিউজ


প্রধান সম্পাদকঃ সৈয়দ বোরহান কবীর
ক্রিয়েটিভ মিডিয়া লিমিটেডের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান

বার্তা এবং বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ২/৩ , ব্লক - ডি , লালমাটিয়া , ঢাকা -১২০৭
নিবন্ধিত ঠিকানাঃ বাড়ি# ৪৩ (লেভেল-৫) , রোড#১৬ নতুন (পুরাতন ২৭) , ধানমন্ডি , ঢাকা- ১২০৯
ফোনঃ +৮৮-০২৯১২৩৬৭৭