ইনসাইড থট

দুর্নীতির বিষবৃক্ষের বিরুদ্ধে কি করবে মহীরুহ আওয়ামী লীগ?


প্রকাশ: 23/06/2024


Thumbnail

৭৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর শোভাযাত্রায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের অভিযোগ “বিএনপি আওয়ামী লীগকে দুর্নীতিবাজ দল বানানোর ষড়যন্ত্র করছে ।” ঠিক মানা গেলো না। দেশের  পুরোনো বড় রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ । ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাজনের মাত্র দুই বছরের মধ্যে যে নতুন রাজনৈতিক দল যাত্রা (২৩ জুন ১৯৪৯) শুরু করেছিল, ১৯৫৪ সালের সরকারে থাকার পরও প্রতিষ্ঠার ৬ বছরের মধ্যে যে দল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রের একটি অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল হবার জন্য সংগঠনের নাম পরিবর্তন করতে পারে, যে দল প্রথমে আন্দোলন, পরে নির্বাচন আর শেষে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে একটি জাতি-রাষ্ট্রের জন্ম দেয় সেই দল কি এতো দুর্বল যে “দুর্নীতিবাজ’’ আখ্যা পাবে ? এজন্য দলের সর্বশেষ নির্বাচনী ইশতেহারেও দুর্নীতির ব্যাপারে “জিরো টলারেন্স’’ ঘোষণা হয়েছে। আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বেশি সময়ের সভাপতি শেখ হাসিনা তো জোর গলায় বলতে পারেন “বঙ্গবন্ধুর মেয়ে দুর্নীতি করতে আসেনি ।”

খুব স্পষ্ট করেই বলা দরকার,সরকারের কোনো পদে থেকে বোনো আমলা, এমনকি দলের ছোটো-বড় কোনো নেতাও যদি ব্যক্তি স্বার্থে, নিজের আরাম-আয়াশ বা পরিবারের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুখের সাগরে ভাসানোর জন্য দুর্নীতি করে সাদা টাকা-কালো টাকা উপার্জন করেন তারও দায় দল নিবে না, নিতে পারে না। হ্যা কোনো নেতা যদি অবৈধভাবে আয় করা অর্থ-সম্পদশালীকে দলে এনে পদ বা মনোনয়ন দিতে বিশেষ ভূমিকা রাখে তারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা দলকেই নিতে হবে। 

আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি-সাধারন সম্পাদকেদের মধ্যে বোধ করি ওবায়দুল কাদেরই সফল একজন সাবেক ছাত্রনেতা যিনি পরপর তিনবার আওয়ামী লীগের মত দলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পেয়েছেন  এবং এমন সময় যখন দল এক নাগাড়ে ১৫ বছর সরকার পরিচালনার দায়িত্বে আছে। তাই দুর্নীতির ছাট হয়তো বেশি করে ঝাপটা দিচ্ছে ভাসানী-সোহরাওয়ার্দি আর শেখ মুজিবের হাতে গড়া দলটিকে। 

একটানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকলে শুধু বিরোধী রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ কেন দেশের বেশিরভাগ রাজনৈতিক দলেরই তো গা জ্বালা করার কথা। আওয়ামী লীগের লাখো লাখো কর্মী, সমর্থক ও নেতার কতজনের দুর্নীতির সাথে জড়িত বা করার সুযোগ আছে ? তাই দুর্নীতির বিরুদ্ধেও সোচ্চার থাকতে হবে তাদেরও। কেন সরকারি আমলা বা পুলিশ এবং প্রশাসনের কারো ব্যক্তিগত অনিয়ম দুর্নীতির দায় নিবে নৌকার মাঝি-মাল্লারা?

আওয়ামী লীগের প্লাটিনাম জুবলি পালনের সময় কোনো একটি ব্যতিক্রমী কর্মসূচি না থাকাটা হতাশাজনক। শোভাযাত্রা এবং জনসভার পাশাপাশি মাস বা বছর জুড়ে একটি কর্মসূচি থাকতে পারতো। দলের অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলো বড় করে আলাদা আলাদা কর্মসূচি নিতে পারতো। হয়তো কিছু কর্মসূচি হবেও, কিন্তু স্মার্ট বাংলাদেশ করতে চান যে দলের প্রধান, তার দল প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে কোনো একটা স্মার্ট বা ব্যতিক্রমী কর্মসূচি পালন করবে বলেই প্রত্যাশা । যেমন লেখার শুরুতেই যে দুর্নীতির কথা উল্লেখ করলাম, বিরোধীপক্ষ যদি কোনো ষড়যন্ত্র করে বলে আগাম আভাষ মিলে তাহলে সেই ষড়যন্ত্র প্রতিহত করার জন্যই তো পাল্টা পদক্ষেপ নেয়া দরকার। 

দল যখন ৭৫ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করছে, তার মাত্র কিছুদিন আগে যখন একটি নির্বাচনী ইশতেহার দেয়া হলো , সেখানে “দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ’’ জোরের সাথে উল্লেখ করা হয়েছিল। আর সেখানেই বলা হয়েছিল “দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, দারিদ্র বিমোচন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং জাতির নৈতিক উন্নয়নের প্রধান অন্তরায় হলো দুর্নীতি । দুর্নীতির কারনে দেশের সার্বিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে ঈপ্সিত লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হয় না। কেবল আইন প্রয়োগ ও শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে দুর্নীতি দমন করা সম্ভব নয়,তার জন্য প্রয়োজন সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা। ” 

ইশতেহারে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের কথা বলার পাশাপাশি সরকারের গৃহীত কিছু পদক্ষেপের কথা উল্লেখ আছে। আর আছে “আমাদের অঙ্গীকার’’ উপ-শিরোনামে চারটি করণীয় সম্পর্কে। এটা খুব ভালো হতো যদি আওয়ামী লীগ তার ৭৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের ব্যাপারে ঘোষিত সামাজিক আন্দোলনের একটি বছরব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করতো। যেমনটি উল্লেখ আছে ইশতেহারে যে “জনগণকে সঙ্গে নিয়ে দুর্নীতি মোকাবেলায় কার্যকর পন্থা ও উপায় নির্বাচনপূর্বক তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে ।” এখন পুলিশের সাবে দুই কর্মকর্তা এবং রাজস্ব বোর্ডের আপিল ট্রাইব্যুনালের প্রধানের দুর্নীতির বিষয়টি খুব আলোচনা হচ্ছে । দলটির ইশতেহারে কিন্তু বলা হয়েছিল “প্রশাসনে দুর্নীতি নিরোধের জন্য ভূমি প্রশাসন,পুলিশ বিভাগ,আদালত,শিক্ষা,স্বাস্থ্যসেবাসহ সকল ক্ষেত্রে সূচিত তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণ করা হবে।’’ এর ব্যাখ্যা কি এমন যে এসব সরকারি দপ্তরে তথ্যপ্রযুক্তির স্মার্ট ব্যবহার ছাড়া দুর্নীতির প্রতিরোধ করা সম্ভব হচ্ছে না? শিক্ষার্থীদের মধ্যে দুর্নীতিবিরোধী মনোভাব গড়ে তোলার জন্য পাঠ্যক্রমে দুর্নীতির কুফল ও দুর্নীতি রোধে করণীয় বিষয়ে অধ্যায় সংযোজন করা। 

এসবই প্রশাসনিক কাজ। প্রস্তাব এমন যে এর বাইরে দলীয়ভাবে আওয়ামী লীগ এক বছরের জন্য একটি ধারাবাহিক কর্মসূচি তৈরি করুক যা দিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সচেতনতা,আর্থিক অনিয়ম এমনকি অতিরিক্ত ভোগ-বিলাসের বিরুদ্ধে সত্যিই একটি প্রতিরোধমূলক সচেতনতা গড়ে তোলা যায় । যারা আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেন, তারা ৭৫ বছরের মধ্যে বেশিরভাগ সময়ই লড়াই-সংগ্রামের মধ্যে ছিলেন। আসলে সর্বশেষ ১৫ বছর ছাড়া বাকি ৬০ বছর এমনকি স্বাধীনতার পরের সাড়ে তিন বছর ( ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতার হত্যাকাণ্ডের আগেও) এবং ১৯৯৬-২০০১ পর্যন্ত ৫ বছরও খুব সুখে ছিল না আওয়ামী লীগের মাঠের নেতা-কর্মীরা। ১৯৯৬ সালে সরকার গঠনের পরপরইা বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার আর ২০০৯ সালের সরকার গঠনের পর সেই বিচারের রায় কার্যকরের পাশাপাশি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য যথেষ্ট ঝুঁকি নিয়েছিলেন জাতির পিতার কন্যা ৪৩ বছর আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বে দেয়া শেখ হাসিনাকে। তাই দলের বর্তমান অন্যান্য নেতাকর্মীদের প্রতিদান হিসেবেও “ দুর্নীতিবিরোধী জিরো টলারেন্সে ’’ নিজেদের ভূমিকা রাখতে হবে শেখ হাসিনার সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য। নইলে সত্যিই ৭৫ বছরের সকল সফলতা ম্লান হবে দুর্নীতির বিষবৃক্ষে। ৭৫ এর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী মহিরুহ রাজনৈতিক দলের কাছে একটি দুর্নীতিবিরোধী সফল সামাজিক আন্দোলন কি খুব বড় চাওয়া ?



প্রধান সম্পাদকঃ সৈয়দ বোরহান কবীর
ক্রিয়েটিভ মিডিয়া লিমিটেডের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান

বার্তা এবং বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ২/৩ , ব্লক - ডি , লালমাটিয়া , ঢাকা -১২০৭
নিবন্ধিত ঠিকানাঃ বাড়ি# ৪৩ (লেভেল-৫) , রোড#১৬ নতুন (পুরাতন ২৭) , ধানমন্ডি , ঢাকা- ১২০৯
ফোনঃ +৮৮-০২৯১২৩৬৭৭