ইনসাইড বাংলাদেশ

তথ্য দিয়েছেন আবেদ আলী, তবে কি ফেঁসে যাচ্ছেন সেই বিসিএস ক্যাডাররা?


প্রকাশ: 11/07/2024


Thumbnail

বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সাবেক গাড়িচালক সৈয়দ আবেদ আলী প্রশ্নপত্র ফাঁস সংক্রান্ত তার দুর্নীতির বিষয়ে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। স্বীকারোক্তিতে সব অপকর্মের কথা বলে দিয়েছেন তিনি। তার হাত ধরে অনেকেই হয়েছেন বিসিএস ক্যাডার। সব ক্যাডারেই রয়েছেন তার লোক। আবেদ আলীর হাত ধরে যারা বিসিএস ক্যাডার হয়েছেন, তাদের তালিকা প্রণয়নের কাজ থেকে শুরু করেছে সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা।

পিএসসির প্রশ্নফাঁস হয়ে আসছে আগে থেকেই। গত ২৪তম ব্যাচে এর ব্যাপকতা বাড়ে। পরে ২৫তম ব্যাচে প্রশ্নফাঁস বিষয়টি ধরা পড়ে। ওই সময় পিএসসির মেম্বার ছিলেন মাহফুজুর রহমান। আর তার ড্রাইভার ছিলেন সৈয়দ আবেদ আলী। তার নেতৃত্বে একটি গ্রুপ থাকতো। তারা কাস্টমার যোগাড় করে দেওয়ার দায়িত্বে ছিল।

ঢাকায় গুলশান এলাকায় একটি ভবনে এবং নীলফামারির কিশোরগঞ্জ উপজেলায়ভিন্ন জগৎনামক একটি রিসোর্ট ছিল মাহফুজুর রহমানের। যারা টাকা দিতো, তাদের এই দুই স্থানে রেখে পরীক্ষার একদিন আগে প্রশ্নপত্র দেওয়া হতো। সেখানে পড়ালেখার ব্যবস্থা করা হতো। পরের দিন পরীক্ষায় তারাই সর্বোচ্চ মার্ক পেত। এভাবে মাহফুজুর রহমান হাজার হাজার কোটি টাকা কামিয়েছেন। ওই সময় বিএনপি দলীয় নেতাদের তালিকাও আসতো। সেই তালিকা অনুযায়ী তিনি টাকা নিতেন এবং নেতাদের ভাগ দিতেন। স্বাস্থ্যের আলোচিত বিতর্কিত মিঠু ঠিকাদারও প্রশ্নফাঁসের এই চক্রের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তার উত্থান মূলত এভাবেই। সৈয়দ আবেদ আলীর হাত ধরে যারা বিসিএস ক্যাডার হয়েছেন, তাদের তালিকা প্রণয়নের কাজ মঙ্গলবার (০৯ জুলাই) থেকে শুরু করেছে সংশ্লিষ্ট সংস্থা।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আবেদ আলী জানিয়েছেন, সৈয়দ আবেদ আলী শত শত কোটি টাকার সম্পদের মালিক। ঢাকায় তার একটি ছয়তলা বাড়ি, তিনটি ফ্ল্যাট একটি গাড়ি রয়েছে। গ্রামের বাড়িতে রয়েছে ডুপ্লেক্স ভবন। তবে আবেদ আলীর আরও সম্পদ রয়েছে।

সৈয়দ আবেদ আলীর জন্ম মাদারীপুর জেলার ডাসারে হলেও তিনি সিরাজগঞ্জের শাহজাতপুরে স্থায়ী ঠিকানা দিয়ে পিএসসিতে চাকরি নেন। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পিএসসির গাড়িচালক হিসেবে যোগদান করেন। পিএসসির সাবেক সদস্য মাহফুজুর রহমান ছাড়াও তিনি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটির সাবেক চেয়ারম্যান  ড. জিনাতুন নেসা তাহমিদা বেগম ও এটিএম আহমেদুল হক চৌধুরীর গাড়ির ড্রাইভার ছিলেন।  ইকরাম আহমেদ যখন পিএসসির চেয়ারম্যান ছিলেন তখন আবেদ আলী বরখাস্ত হন ও পরে চাকুরিচ্যুতি ঘটে। ২০১৪ সালের ৩ জুলাই তাকে বরখাস্ত করা হয়।

পিএসসি সূত্রে জানা গেছে, তার বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ১৯৮৫ এর ৩(বি) এবং ৩(ডি) ধারায় আনীত অভিযোগসমূহ সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হওয়ায় তাকে ২০১৫ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর চাকরি হতে অপসারণ করা হয়। তখন আবেদ আলীসহ চারজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছিল শেরে বাংলা নগর থানা পুলিশ। ২০১৫ সালে তাদের বিরুদ্ধে বিচার শুরু করার আদেশ দেন ঢাকার সিএমএম আদালত। বিগত ৯ বছরে ১২ জন সাক্ষীর মধ্যে মাত্র ২ জন সাক্ষীকে আদালতে হাজির করতে পেরেছে রাষ্ট্রপক্ষ। সেই সুযোগে তিনি পিএসসির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে বিসিএসসহ অন্যান্য চাকুরি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস করে আসছেন।

অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, ড্রাইভার আবেদ আলী যদি শত শত কোটি টাকার মালিক হন, তাহলে তিনি পিএসসির সদস্য মাহফুজুর রহমানসহ যেসব কর্মকর্তার গাড়ি চালিয়েছেন, তারা কত হাজার কোটি টাকার মালিক, তা আর বোঝার অপেক্ষা রাখে না। মাহফুজুর রহমানের বিরুদ্ধে ওই সময় মামলা হয়। পরে তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। কিন্তু ততোক্ষণে হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক বনে যান। তার সঙ্গে বিএনপি-জামায়াত জোটের একটি রাজনৈতিক সিন্ডিকেট ছিল, তাদের কতিপয় ক্ষমতাধর নেতা প্রশ্নফাঁসের এই টাকার ভাগ পেতেন। মাহফুজুর রহমান ছিলেন হাওয়া ভবন কানেকটেড। পিএসসিতে আলাদা একটি রুম ছিল। এখানে বসে তিনি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন। দলীয় সংসদ সদস্য মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। কারণে তাকে ভয় পেতেন পিএসসির চেয়ারম্যানসহ অনেকে।

মাহফুজুর রহমানের সময় বিএনপি-জামায়াত-শিবিরসহ চার দলীয় জোটের দলীয় নেতাকর্মীরা বেশি ঢুকেছে বিসিএস ক্যাডারে। তবে দলের পরিচয় দিলেও টাকা দেওয়া লাগছে প্রত্যককে। শত শত কোটি টাকা একটি ব্যাচ থেকে কামিয়েছে তারা। আবেদ আলী স্বীকারোক্তিতে সব বলে দিয়েছে। এখন সরকারি প্রায় সব পর্যায়ে দুর্নীতি, অনিয়ম অব্যবস্থাপনা বিরাজ করার নেপথ্যে রয়েছে ফাঁস হওয়া প্রশ্নের মাধ্যমে বিসিএস ক্যাডার হওয়া। তারা চাকরিতে প্রবেশ করেছে দুর্নীতির মাধ্যমে।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) প্রধান মোহাম্মদ আলী সংবাদমাধ্যমকে বলেন, এই ঘটনার সঙ্গে অনেকের নাম আসছে। জড়িত প্রত্যেককে গ্রেপ্তার করা হবে।

পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, প্রশ্নফাঁস ঘটনার সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক, ছাড় দেওয়া হবে না। যারা জড়িত তাদের প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনা হবে।

বিসিএসের প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে পিএসসি। জুলাই (মঙ্গলবার) করা কমিটিকে ১৫ দিনের সময় দেওয়া হয়েছে। কমিশনের যুগ্ম সচিব . আব্দুল আলীম খানের নেতৃত্বে বাকি সদস্যরা বুধবার থেকে কাজ শুরু করেছে।

কমিটির আহ্বায়ক . আব্দুল আলীম খান বলেন,  নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষে প্রতিবেদন জমা দিতে পারবো। প্রশ্নফাঁসের তদন্ত করা খুবই জটিল একটি কাজ। আমরা সব পক্ষের সঙ্গে কথা বলবো। তবে সন্দেহের বাইরে কেউ নন। যাকে আমরা মনে করবো তাকেই তদন্তের স্বার্থে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।



প্রধান সম্পাদকঃ সৈয়দ বোরহান কবীর
ক্রিয়েটিভ মিডিয়া লিমিটেডের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান

বার্তা এবং বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ২/৩ , ব্লক - ডি , লালমাটিয়া , ঢাকা -১২০৭
নিবন্ধিত ঠিকানাঃ বাড়ি# ৪৩ (লেভেল-৫) , রোড#১৬ নতুন (পুরাতন ২৭) , ধানমন্ডি , ঢাকা- ১২০৯
ফোনঃ +৮৮-০২৯১২৩৬৭৭