ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২০, ১৮ আষাঢ় ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Bangla Insider

সাংবাদিকের মৃত্যুতে ছেলের হৃদয়বিদারক স্ট্যাটাস

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম
প্রকাশিত: ২৯ এপ্রিল ২০২০ বুধবার, ০৭:২১ পিএম
সাংবাদিকের মৃত্যুতে ছেলের হৃদয়বিদারক স্ট্যাটাস

দৈনিক সময়ের আলোর সিটি এডিটর ও চিফ রিপোর্টার এবং জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক হুমায়ুন কবির খোকনের মৃত্যু হয়েছে মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল)। সাংবাদিক বাবার এমন হঠাৎ চলে যাওয়া যেন কোনোভাবে মেনে নিতে পারছেন না আশরাফুল আবির।

নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে বাবার অসুস্থ হওয়ার বিবরণ ও চিকিৎসা সম্পর্কে বর্ণনা দেন তিনি। তার বর্ণনা অনুযায়ী, হুমায়ুন কবির খোকন অসুস্থ হওয়ার আগ পর্যন্ত অফিস করেছেন। তবে তার অফিস দাবি করছে ১৫ দিন ধরে তিনি ছুটিতে ছিলেন।

আশরাফুল আবির তার স্ট্যাটাসে লিখেছেন, আমি ও আমার পরিবারের কাছে মনে হচ্ছে যে আমরা হয়তো কোনো বাজে স্বপ্ন দেখলাম। কিন্তু এইটা যে আসলেই বাস্তবেই হয়ে গেলো আমরা এখনো বিশ্বাসই করতে পারছি না। আমার কাছে এখনো মনে হচ্ছে যেন একটা বাজে স্বপ্ন দেখে হয়তো ঘুমটা ভাঙলো।

আমার বাবা একজন অত্যন্ত সৎ, নিষ্ঠাবান, পরিশ্রমী একজন ব্যক্তি ছিলেন। যিনি সারাটি জীবনে হয়তো নিজের কথা কখনো ভাবেননি। আমাদের জন্যই হয়তো সারাটা জীবন উৎসর্গ করে গেলেন। এই করোনা সংকটময় দিনেও তিনি ঝুঁকি নিয়ে প্রতিটা দিন অফিসে গিয়েছেন, বাসায় এসেছেন। আমি এই নিয়ে আমার বন্ধুদেরও বলেছিলাম যে আমরা খুব ভয়ে আছি। কারণ আমার আব্বু আর আপু দুই জন চাকরিজীবী পরিবারে এবং তারা প্রতিদিনই অফিসের গাড়ি দিয়েই অফিস এ আসা-যাওয়া করেছেন।

আমার বাবার ৩-৪ দিন ধরে কাশি হচ্ছিলো। পরিমাণটা দিন দিন বেড়েই চলছিল। আমার তখনই সন্দেহ হচ্ছিলো। আমি বাবাকে বললাম, আপনার করোনা হয়নি তো? সে হেসে বললো, অরে ধুর বেটা টন্সিলের ব্যাথা এইটা আগের থেকেই ছিল। ঐ রকম কিছু না।

কারণ সে চাচ্ছিলো বাসায় থেকেই ট্রিটমেন্ট নিয়ে সুস্থ হতে। কারণ করোনা পজেটিভ হলে এলাকার ভেতর আতঙ্ক ছড়াবে। এছাড়া লজ্জার ভয়ে সে তখনও এইটা সাধারণভাবেই দেখছিলো। আমি ও ভাবলাম যে হয়তো এই রকম জ্বর-কাশি হয়তো সাধারণ। বাসায় ওষুধ খেলে গরম পানি খেলে হয়তো ঠিক হয়ে যাবে। আমি এই কয়দিন বাসায় সাধারণভাবেই কাটাচ্ছিলাম। বিভিন্ন স্কিল ডেভেলপেড করার জন্য অনেক কিছু শিখছিলাম।কিন্তু বাবার কাশি বেড়েই চলছিল। আম্মু ও জ্বর অনুভব করতে শুরু করলো তার দুই দিন আগে। তখন আমি ভয় পেয়ে গেলাম।

আম্মুকে বললাম, বললো যে করোনার নমুনা দুই-একদিন এর ভেতরই নিতে আসবে বললো। কিন্তু বাবার কাশি বেড়েই চলছিল। কাশির সাথে সাথে ফুসফুসে মারাত্মকভাবে আক্রমণ করছিলো মনে হচ্ছে। হয়তো বাবার গলায় চুলকাচ্ছিল। আমি এর পরের দিন একটু দেরিতে উঠলাম। দেখলাম আম্মু বাবাকে ভাতের জাউ রান্না করে খাওয়াচ্ছে।

হঠাৎ দেখলাম, সে জানি কেমন করছে। মনে হচ্ছে অনেক কষ্ট হচ্ছে। মনে হলো শ্বাস কষ্ট হচ্ছে। সে ওই মুহূর্তে এই লড়াইয়ের সাথে পেরে উঠতে পারনি। আম্মুকে বললাম, বললো সকালে অ্যাম্বুলেন্স খবর দেওয়া হয়ছে। উত্তরার রিজেন্টে ব্যাবস্থা করা হয়ছে। অ্যাম্বুলেন্স আসতেছে।

আম্মু বললো তোর কাছে কি ভাংতি টাকা আছে? আমাকে দে তো। আমার কাছে ৩৫০০ টাকা ছিল আমি পুরোটাই আম্মুকে দিয়ে দিলাম সাথে সাথে। আমি ঘরে পরার জামা পরেই অ্যাম্বুলেন্সে উঠে গেলাম। কারণ আমার মনে হচ্ছিলো এমনিতেই দেরি হয় গেছে। আমি ভাবলাম হাসপাতালে হয়তো অনেকেই থাকবে আব্বুর জন্য অফিসে লোক। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখলাম আমি আর আম্মু ছাড়া পরিচিত কেউ নেই। কারণ লকডাউন থাকার জন্য গাড়ি তেমন চলে না রাস্তায়। এছাড়া অনেকেই হয়তো লক্ষণগুলোর বর্ণনা শুনে হয়তো কেউ আসতে সাহস করছিলো না।

এদিকে সাবান আঙ্কেল সব ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন ওইখানে। তারা সর্বাত্মক চেষ্টাই করেছিল আইসিইউতে রেখে অক্সিজেন দেয়ার, কিন্তু ডাক্তার বললো তার পালস নেই এবং ব্রেন ও অক্সিজেন নিচ্ছে না। ডাইরেক্টলি বললেনও না যে সে আগেই মারা গেছে। বললেন, আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করছি দোয়া করেন যদি ব্রেইন হঠাৎ মিরাকলভাবে কাজ করতে শুরু করে। রাত ১০টার দিকে আম্মুকে উপরে ডাকলো শেষবারের মতো দেখার জন্য। তখন আম্মু ফোনে কয়েকজনকে জানিয়ে দেন।

এছাড়া নিউজ স্ক্রলগুলাতেও অফিসিয়ালি আপডেট দিয়ে দেয় যে বাবা আর নেই। এখন বাবার করোনা টেস্ট হওয়ার আগেই মারা গেছেন তাই এইটা অফিসিয়ালি বলা হয়নি। বলা হয়েছে যে করোনাভাইরাসের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন।

সবাই বাবার জন্য দোয়া করবেন যেন আল্লাহ ওনাকে জান্নাতবাসী করেন। ওনার মতো ভালো, সৎ এবং নিষ্ঠাবান মানুষ খুব কমই আছে সমাজে। এছাড়া আমি চাই না এখন সবাই আমাদে কে ডিমোটিভেট বা ভয়ভীতি দেখাক। আমরা এমনিতেই অনেক কঠিন সময় পার করছি।

আমরা সবাই সতর্কতা অবলম্বন করেই বাসায় আছি। বাসা বা এলাকা হয়তো লকডাউন হতে পারে। তাই এই মুহূর্তে মনে করি সবাই আমাদের জন্য দোয়া করুক।

আমার বন্ধুরা অনেক চিন্তিত হয়ে পড়েছে আমার জন্য। আমাদের সামনের দিনগুলো নিয়ে। আশা করি আমাদের পরিবার, আমিন মোহাম্মদ গ্রুপ, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, বাংলাদেশ সরকার পাশে থাকবেন। বাস্তবতা কঠিন হয়ে গেছে তবুও বাস্তবতার সাথেই সবকিছু এখন এডজাস্ট করে নিতে হবে। সবাই ভালো থাকবেন এবং সচেতন হবেন। আপাতত আর কিছু লিখতে চাচ্ছি না।

উল্লেখ্য, রাজধানীর উত্তরার রিজেন্ট হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) রাতে মারা যান সাংবাদিক হুমায়ুন কবির খোকন। গতকাল বিকেলে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তাকে ওই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তিনি শ্বাসকষ্টজনিত রোগে ভুগছিলেন। বুধবার (২৯ এপ্রিল) তার মরদেহের নমুনা পরীক্ষায় করোনা পজিটিভ পাওয়া গেছে।