ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২০, ১৮ আষাঢ় ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Bangla Insider

করোনাকাল; উপকারী মানুষের গল্প

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম
প্রকাশিত: ০১ মে ২০২০ শুক্রবার, ০২:০৩ পিএম
করোনাকাল; উপকারী মানুষের গল্প

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন শ্রেনী পেশার মানুষ তাদের মতামত প্রকাশ করেন সেখানে সমসাময়িক নানা বিষয় নিয়ে তাদের মনের অভিব্যক্তি ফুটে ওঠে। বাংলা ইনসাইডার নিয়মিত আপনাদের সেসবের খোঁজ দেবে। তবে এই লেখার সমস্ত দায় দায়িত্ব একান্তই পোস্ট দাতার।

সৈয়দ নাজমুস সাকিব

শিক্ষক, বীরশ্রেষ্ঠ নুর মোহাম্মদ পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ

মফিজুল ইসলাম নামের এক প্রবাসী বাঙালি করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান স্কটল্যান্ডে। তার স্ত্রী ও সন্তানেরা আইসোলেশনে থাকায় মানুষটিকে শেষবারের মত দেখতেও আসতে পারেননি।

শুধু আপন মানুষেরা না, সেখানকার কেউই তাকে দাফন করতে এগিয়ে আসছিল না। সবার মাঝেই করোনার ভয়।

তখনই এগিয়ে আসেন এই মানুষটি। শুধু মফিজুল ইসলামের লাশ গোসল আর দাফন করাই নয়, এইসব কাজে যা খরচ হয় সেটাও নিজে বহন করেন তিনি। অবশেষে মফিজুল ইসলামের দাফন, কাফন ঠিকঠাকভাবে সম্পন্ন হয়।

মানুষটি সম্পর্কে আমার আপন ছোট মামা। আমার ক্ষুদ্র জীবনে দেখা সবচেয়ে সাহসী মানুষদের একজন। করোনায় মৃত্যুবরণ করা একজন মানুষকে দাফন করতে যাবেন, এই ব্যাপারটা নিয়ে আমরা সবাই যখন দুশ্চিন্তায় প্রায় আধমরা, তখন ছোট মামা ভিডিও কলে হেসে জানালেন- আরে ব্যাটা কিচ্ছু হবে না! এত টেনশনের কী আছে? করোনা কিচ্ছু করতে পারবে না আমার!

আশার কথা হচ্ছে, মামা এখন পর্যন্ত সুস্থ আছেন। স্কটল্যান্ডে তার একটা ডিপার্টমেন্টাল স্টোর আছে। এই লকডাউনের সময়ে তিনি নিজের দোকান খোলা রেখেছেন। শুধু তাই না, মাইলের পর মাইল গাড়ি চালিয়ে তিনি মানুষের বাসায় হোম ডেলিভারি দিয়ে আসেন। একটা বাড়তি পয়সাও রাখেন না এজন্য। শুধু তাই না, এই অবস্থায় অনেকে যেখানে খাবারের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন; মামা সেখানে খাবারের দাম কম রাখছেন।

`এরকম একটা অবস্থায় প্রতিদিন দোকানে যাওয়া কি খুব দরকার মামা?`

আমার এমন প্রশ্নে তিনি উত্তর দেন- বলিস কী রে! দোকান অফ রাখলে মানুষ খাবে কী? আমি স্বপ্নে দেখসি, করোনা কিচ্ছু করতে পারবে না আমার। দোয়া করিস খালি।

মামাকে নিয়ে বিবিসিতে একটি রিপোর্ট এসেছে। আমার গর্ব হয়, এরকম একজন মানুষ আমার মামা হওয়াতে। আমি শক্তি পাই এই মানুষটাকে দেখলে- লড়াই করার, বেঁচে থাকার যুদ্ধ নিয়ত চালিয়ে যাওয়ার।

দোয়া করবেন আমার মামার জন্য। ইদানীং আমারও কেন যেন বিশ্বাস হওয়া শুরু হয়েছে- করোনা হয়ত কিছুই করতে পারবে না এই মানুষটাকে।

রবিউল ইসলাম রবি

অভিনেতা

তোমাকে দেখে আজ আমার নিজের কথা অনেক মনে পড়ছে রে খোকা। কারণ আমিও পুলিশের ছেলে ছিলাম। আর আমারও পরিনতি হয়েছিল তোমার মতো, আজ থেকে ২১ বছর আগে। তখন আমার বয়স ছিল ২২/২৩। আমার বাবাও চাকুরিরত অবস্থায় মারা গিয়েছিলেন।

অনেকেই সেদিন এসেছিল সান্ত্বনা দিতে, তারপর ফিরে গেছে। আর আসেনি। আসবেও না। এটাই নিয়ম। জীবনের নিয়মটাই এমন। এতে দোষের কিছুই নেই। এখন থেকে তোকে একাই হাঁটতে হবে জীবন যুদ্ধে। তবে ভয় পাবি না। এদেশের লাখো পুলিশের হাত থাকবে তোর মাথার উপর। চলার পথে প্রমাণ পাবি দেখিস। আমিও পেয়েছি।

জীবনের কোন সায়াহ্নে যখন তুই নিভৃতে ভাববি যে তোর বাবা দেশের করোনা দুর্যোগের প্রথম পুলিশ শহীদ তখন তোর পকেটে টাকা বা পেটে ভাত না থাকলেও একটি জিনিস থাকবে। তাহলো গর্ব। গর্ব নিয়ে বেঁচে থাকার সুখ কয়জনের আছে বল? মহান আল্লাহ পাক তোমার বাবা ও তোমাদের সহায় হোন।

(করোনা যুদ্ধে মারা যাওয়া এক পুলিশ কর্মকর্তার ছেলের ছবি পোস্ট করে)

 সমীর চক্রবর্তী

রক্তদান আর সামাজিক কাজ ছিল রুবেলের নেশা। মানবিক মনের মানুষটি জীবন সংগ্রামে প্রবাসে। ভাগ্য বদলের আশায় মাস ছয়েক আগে পাড়ি জমান মধ্যপ্রাচ্যে। বিধিবাম, সেখানে গিয়েই পড়েন বিপত্তিতে। করোনার থাবা যে বিশ্বময়। এরই প্রভাবে মাস দুয়েক হয় কাজ নেই। ঘরেই বসা। ৮ বাই ৮ একটা কক্ষে থাকেন ১০ জন। অন্য প্রবাসীদের মতো কষ্টে দিন কাটছে তারও। প্রবাসে এই বৈরী পরিবেশের কষ্টটা অসহনীয়। এর মাঝেও রুবেলের কষ্ট দেশকে নিয়ে। দেশের মানুষ আর মানুষদের সেবায় নিয়োজিত বীরদের নিয়ে। নিজের কাজ না থাকলেও তার কষ্ট দেশে এই সময়ে খাদ্য কষ্টে থাকা মানুষদের নিয়ে।

রাত তখন তিনটে। মেসেঞ্জারে রিং। বিরক্তি- এটা নিশ্চয় বলার অপেক্ষা রাখে না। এখন সময় আমাদের কারোরই পক্ষে না। সবুজ বাটনে চাপ দিলাম। হ্যালো বলতেই অপরপ্রান্ত থেকে রুবেলের মায়াভরা কণ্ঠ। তখনও বুঝতে পারছি না কি ঘটতে চলেছে। সংগ্রামী মানুষটি রক্ত দিয়ে মানবিক সংগঠন আত্মীয়-এর সাথে আগে থেকেই যুক্ত। বর্তমান কাজগুলোর তথ্য পাচ্ছেন ফেসবুকে। সম্প্রতি তিনি জেনেছেন আখাউড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকরা সারাদিন কাজ ছাড়াও মোবাইলফোনে চিকিৎসা সেবা দিচ্ছেন। সেই চিকিৎসকদের মনোবল ধরে রাখতে আত্মীয়ের কাজগুলোও জেনে গেছেন। চিকিৎসকদের জন্য আত্মীয় কি করছে? বিনয়ের সঙ্গে তার এই কথায় জানালাম- আত্মীয় তাদের প্রাণশক্তি বাড়াতে কয়দিন পরপরই উপহার হিসেবে ফল, দুধসহ নানা খাবার দিচ্ছে। এবার থমকে যায় রুবেলের সুর। তার হাত খালি। তারপরও সংগ্রামী রুবেলের মন কিছু করতে চাইছে। সেই তাড়না থেকেই তপ্ত রোদ, উনুনের মতো গরম বাতাসে ঘণ্টা তিনেক কাজ করে হাতে উঠে বাংলাদেশি ৫শ’ টাকা। এই কারণেই এত রাতে ফোন দেওয়া। আত্মীয়ের পক্ষে তাকে বুঝানো হলো আপাতত টাকার দরকার নেই। এই টাকাটা এখন আপনিই খরচ করেন। যখন কাজ শুরু করবেন তখন দেখা যাবে। নাছোড় মানুষটির পাল্টা প্রশ্ন, এই করোনাকালে যদি না বাঁচি। তাহলে আমার হয়ে কৃতজ্ঞতা জানানোর তো কেউ নেই! তাদের উপহার দেয়ার নিয়তেই তো তপ্ত বাতাস, আর কাঠফাটা রোদকে উপেক্ষা করেছি। টাকাটা রুজি করেছি। এটা আপনাকে গ্রহণ করতেই হবে। আমার ইচ্ছা এই টাকায় করোনাযোদ্ধা বীর চিকিৎসকদের জন্য কয়েকটা ফল কিনে দিবেন।

রুবেল নামটি ছদ্মনাম। শেষ রাতের এমন ফোন কলে বিরক্তিভাব থাকলেও আলাপের পর আর ঘুমাতে পারলাম না। যে মানুষটা নিজেই এই সময়ে দারুন কষ্টে। যিনি নিজেই অনিশ্চয়তায়। তিনি কি না, ঘাম ঝড়ানো কষ্ট করেছেন শুধু চিকিৎসকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে। সারাক্ষণ চোখে শুধু তার পরিশ্রান্ত মুখটা ভাসছে।

ভাবছি কি অবলীলায় জয়ী হয়ে যায় এই রুবেলরা। আর দেশে আরাম আয়েশে খেয়ে আমরা কিভাবে করোনায় আক্রান্ত চিকিৎসাকর্মীদের বাসায় ঢিল ছুড়ি। তাদের চিকিৎসায় সন্দেহ করি। চিকিৎসক বলে বাড়ির মালিক ঘর ছাড়তে বলে। কোথাও আবার তালপাতার ঝুপড়িতে ঠাঁই হয় স্বাস্থ্যকর্মীর। করোনাযোদ্ধা বীরদের প্রতি প্রবাসী রুবেলদের এমন কৃতজ্ঞতা আমাদের সাহস দিচ্ছে। মনের জোর বাড়াচ্ছে।

তার কাছ থেকে পাওয়া প্রেরণাই বলছে এই যুদ্ধে জয়ী হবে বাংলাদেশ- জয় হবে মানবতার। রুবেলের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে আত্মীয়ও বলছে হে বীর যোদ্ধাগণ আমরা কৃতজ্ঞ...