ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৮, ৩০ কার্তিক ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কতটা সামাজিক?

হাসান সাইদুল
প্রকাশিত: ২২ অক্টোবর ২০১৭ রবিবার, ০৫:৩১ পিএম
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কতটা সামাজিক?

আমি মুসলিম হতে চাই.. কিন্তু সাহস পাইনা.. মুসলিম হলে তোমরা আমার পাশে থাকবা.. থাকলে শেয়ার করে সারা দাও... দেখি কয়জন থাকে। লিয়ানা লিয়া নামে একজন খোলামেলা একটি ছবির সাথে লেখাগুলো দেয় ফেসবুকে। ঘরে বসে লাখ লাখ টাকা আয় করুন। নিচের লিংকে বিস্তারিত...। প্রেম করতে গিয়ে কীভাবে ধরা খেল তরুণ-তরুণী (দেখুন ভিডিওসহ)। যে ভিডিও দেখলে আপনি চোখের পানি ধরে রাখতে পারবেন না। কেউ আমীন না বলে যাবেন না। বানানো ছবি দিয়ে নিচে লেখা, বলুন সুবাহানাল্লাহ! সহ এমন হরেক রকম লেখা প্রতিনিয়ত, প্রতিদিন ইচ্ছা না থাকা স্বর্ত্বেও যে কোনো ফেসবুক ব্যবহারকারী দেখতে ও পড়তে হয়। এ ছাড়া অশ্লীল ও আপত্তিকর ছবি দেখা নতুন কিছু না। ধর্ম নিয়ে বর্ণ নিয়ে বিষয়, অপ্রীতিকর ছবি ফেসবুকে দিয়ে নানা রকম অশ্লীল শব্দ টুকে দেওয়া নতুন কিছু না।

দুই.

পেছনে মিয়ানমারের সেনা সদস্যরা অস্ত্র তাঁক করে দাঁড়িয়ে আছে। কয়েকজন রোহিঙ্গা যুবতীকে বিবস্ত্র অবস্থায় হাত ও পা বেঁধে বসিয়ে রাখা হয়েছে। কিছুক্ষণ পরেই গলায় ছুরি বসিয়ে মাথা বিচ্ছিন্ন করা হয় ওই চার যুবতীর। সে দৃশ্য মোবাইলে ধারণ করা হয়। হৃদপিন্ড স্তব্দ হওয়া এমন অনেক ভিডিও। হৃদয়বিদারক ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অহরহর দেখা যায়।

তিন.

ষঢ়ঋতুর বাংলাদেশে প্রকৃতির সাথে খাপ খাইয়ে চলে কতিপয় সৌখিন মানুষ। প্রতিদিনের বিভিন্ন কাজের ফাঁকে কিংবা সঙ্গে মোবাইলে ছবি তোলা এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তা দেয়া নিয়মিত একটা কাজ হয়ে গেছে। সকালে ঘুম থেকে জেগে ওঠা থেকে নাস্তা বানানো খাওয়া, গোসল করা অফিসে যাওয়া কিংবা বাচ্চাকে স্কুলে নিয়ে যাওয়া আসাসহ বাজারে যাওয়া সব ধরনের কাজের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া নতুন কিছু না। তথাপি এরই মাঝে প্রকাশ পায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীদের নগ্নতা এবং ছোট মানসিকতাগুলো। ঠোট বাকা, নিজের শরীর পরিবেশনের বহু রকম ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া হয় এসব ছবি ছড়িয়ে পড়ে দেশ ও দেশের বাহিরে। মেতে ওঠে নগ্নতার নতুন পৃথিবী।

চার.

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বলতে বুঝানো হয়ে থাকে মূলত ফেসবুক, টুইটারকে। বিশেষ করে ফেসবুক সব চেয়ে বহুল ব্যবহৃত এবং জনপ্রিয় যোগাযোগ মাধ্যম। আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। প্রযুক্তিকে কাজ লাগিয়ে নানামুখি কাজে সাফল্য পেয়েছে রাষ্ট্র ও দেশের জনগণ। বর্তমানে খুব কম সংখ্যক মানুষ আছে যারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সঙ্গে সম্পৃক্ত না বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে না। খুব ভোর বেলা ঘুম ভাঙ্গার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বার বার অগণিত বার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যাওয়া আসা। নিজের ভাবের আদান প্রদান করা হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এখন আমাদের দেশের প্রতিটি মানুষের ক্ষেত্রে একটি বিশেষ এবং বাধ্যতামূলক মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রযুক্তির এই গতিশীল ভুবনে যতœবান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীদের প্রশ্ন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কতটা সামাজিক? কতটা রক্ষনশীল? কতটা নিরাপত্তা ও সম্মানবোধ টিকিয়ে রাখার মাধ্যম? আমাদের দেশে খুব করে তিন শ্রেনীর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারী দেখা যায়,

এক. নিজেদের সার্বিক যোগাযোগ বজায় রাখতে

দুই. নিজকে তারকা বানাতে (বিলাসিতার কারণে)

তিন. বিভ্রান্ত ছড়াতে (অপপ্রচার, ভূয়া)

তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে অসামাজিক করে তোলছে আমাদের মাঝের কেউই। ফেসবুকে নিজকে তারকা বানাতে বিভিন্ন রকম ভয়ংকর অথবা নগ্ন ছবি কিংবা ভিডিও ফেসবুকে দিয়ে থাকে। এসব আবার বিভিন্ন ডিভাইস বা অ্যাপস দিয়ে (ডিজাইন) কারসাজি করে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার চেষ্টাও চালায় (অনেকক্ষেত্রে সত্যও থাকে)। যে সব দৃশ্য দেখে আতঙ্কিত ফেসবুক ব্যবহারকারীরা। ৩৪ বছরের তানি নিয়মিত ফেসবুক ব্যবহার করেন। ঘুমাতে যাওয়ার আগে ফেসবুকে চোখ বুলান। কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ফেসবুকে আসেন না। কারণ বলেন, রোহিঙ্গা মুসলমানদের বীভৎসতা আসলে সহ্য করা যায় না। প্রকাশ্যে গলা কাটা। শরীর থেকে বিভিন্ন অঙ্গ আলাদা করে ফেলার দৃশ্য দেখে রাতে ঘুম হয় না। কখনো কখনো চিৎকার করে ওঠার কথাও বলেন তানি। আমাদের দেশে এখনো কিছু মানুষ বন্যার্তদের কান্না রোহিঙ্গাদের বেঁচে থাকার আর্তনাদ উপেক্ষা করে স্ত্রী কিংবা প্রেমিকের সঙ্গে বিভিন্ন প্রীতি অপ্রীতিকর ছবি দেন। ভাবি এরা কি মানুষ? আমাদের দেশের তারকারও থেমে নাই। নগ্ন ছবি এখনো তো আগের মতই আসছে বন্ধ হচ্ছে না। ফেসবুকটাকে কিছু কুলাঙ্গার অসামাজিক করে তোলছে।

পাঁচ.

পৃথিবীতে প্রতি মিনিটে ৯ লাখ বার লগ ইন করা হয় ফেসবুকে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সম্প্রতি একটি পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে। যেখানে বলা হয়েছে, প্রতি ৬০ সেকেন্ডে নেট দুনিয়ায় কী কী ঘটে চলে। এক মিনিটে কী ধরনের ডেটা তথ্য লেনদেন ও অর্থ ব্যয় হয়, তারও একটি তালিকা প্রকাশ করেছে ওই সংবাদমাধ্যম। সেই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইউটিউবে ৬০ সেকেন্ডে প্রায় ৪১ লাখ ভিডিও দেখা হয়। টুইটারে প্রতি মিনিটে প্রায় ৪ লাখ ৫২ হাজার ২০০ টুইট করে মানুষ। এই একই সময়ে প্রায় ৯ লাখ বার লগ ইন করা হয় ফেসবুকে। মেসেঞ্জার ব্যবহার করে মিনিটে ১৫ হাজার জিআইএফ পাঠানো হয়। বাংলাদেশে ফেসবুক ব্যবহারকারীর তথ্য সম্পর্কে সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ জানিয়েছে, বর্তমানে দেশে প্রায় দুই কোটি ৩৩ লাখ মানুষ ফেসবুক ব্যবহার করছেন। দেশে যত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহৃত হচ্ছে এর মধ্যে ৯৯ শতাংশই ফেসবুক। বাংলাদেশে ফেসবুক ব্যবহারকারীদের মধ্যে এক কোটি ৭০ লাখ পুরুষ আর ৬৩ লাখ নারী। ফেসবুক ব্যবহারকারীদের ৯৩ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৩৪ বছরের মধ্যে। এর মধ্যে মোবাইল ডিভাইস থেকে ২ কোটি ২৬ লাখ মানুষ ফেসবুকে ঢুকছেন।

ছয়.

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে কতিপয় অসাধু ব্যবহারকারী বিভিন্ন ভাবে অসামাজিক করে তোলে। এ অসামাজিকতার প্রভাব যে কতখানি তা সকলে হয় তো বোধ করতে পারে না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কারো কারো গোপন তথ্য ফাঁস হয়ে যায়। আবার কারও কারও নামে চালিয়ে দেওয়া হয় অপ্রীতিকর তথ্য। একমাত্র এই মাধ্যমকে ব্যবহার করে শিক্ষিত সমাজ আরও শিক্ষার প্রসার করতে পারে। কিন্তু কোনো কিছু খুঁজতে গেলেও অসামাজিক তথ্য ও চিত্র আগে চলে আসে। এখন ব্যবহারকারীই যে শুধু অসাধু হয় তা না। অনেকক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান কিংবা কর্তৃপক্ষও অসাধু পন্থায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে অসমাজিক করে তোলে। আমাদের দেশে বেশির ভাগ প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার ঘটনা জানা গেছে একমাত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই। এখন মাধ্যমগুলোকে সামাজিক নামে অভিহিত করা হলেও দিনের পর দিন এটি অসামাজিক রূপ নিচ্ছে। এ থেকে নিস্তার পাওয়র একাধিক উপায়ের মধ্যে টেলিযোগযোগ মন্ত্রণালয়ের কঠোরতা আরও বাড়াতে হবে। নির্দিষ্ট একটা নিয়মের মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। অন্যথায় অসামাজিকতা বেড়েই চলবে।

 

বাংলা ইনসাইডার/জেডএ