ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১২ ফাল্গুন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

ষষ্ঠ পর্ব: তাজমহল দেখা

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৪ জানুয়ারি ২০২০ মঙ্গলবার, ০৮:০৭ এএম
ষষ্ঠ পর্ব: তাজমহল দেখা

আগামী ১৭ মার্চ জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী। এ উপলক্ষে সরকার ২০২০ এর ১৭ মার্চ থেকে ২০২১ এর ১৭ মার্চ পর্যন্ত মুজিববর্ষ ঘোষণা করেছে। ১০ জানুয়ারি থেকে মুজিববর্ষের ক্ষণগণনা শুরু হচ্ছে। ১০ জানুয়ারি হলো জাতির পিতার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস। এই মহামানবের জীবন, বেড়ে ওঠা, রাজনীতি এবং বাঙালির জাতির পিতা হয়ে ওঠার যে গল্প তা তিনিই তার বিভিন্ন বক্তব্য, বিবৃতি, অসমাপ্ত আত্মজীবনী এবং ডায়রিতে লিখে গেছেন। সেখান থেকে সংগ্রহ করে মুজিববর্ষে বাংলা ইনসাইডারের এই বিনম্র নিবেদন:


আজমীর শরীফকে বিদায় দিয়ে আবার আমরা ট্রেনে উঠে বসলাম আগ্রার দিকে, যেখানে মমতাজ বেগম শুয়ে আছেন তাজমহলকে বুকে করে। বহুদিনের স্বপ্ন তাজমহল দেখব মোগল শিল্পের ও স্থাপত্যকলার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন এই তাজ। বাদশা শাহজাহানের অমর প্রেমের নিদর্শন এই তাজ। পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের অন্যতম এই তাজ। আমাদের নিজেদের মধ্যে তাজ দেখা নিয়ে অনেক আলোচনা হল। দুনিয়ার বহু দেশ থেকে বহু লোক শুধু তাজ দেখার জন্য ভারতবর্ষে আসত। তাজমহলের কথা জানে না, এমন মানুষ দুনিয়ায় খুব বিরল। আমাদের দেরি আর সইছে না। মনে হচ্ছে ট্রেন খুব আস্তে আস্তে চলছে, কারণ তাজ দেখার উদগ্র আগ্রহ আমাদের পেয়ে বসেছে। আমরা তো ভাবি নাই ঠিক পূর্ণিমার দিনে আগ্রা পৌঁছাব। আমরা হিসাব করে দিন ঠিক করে আসি নাই। মনে মনে পূর্ণিমাকে ধন্যবাদ দিলাম, আর আমাদের কপালকে ধন্যবাদ না দিলে অন্যায় হত, তাই তাকেও দিলাম। আমরা আগ্রায় পৌঁছালাম সকালের দিকে। দুই দিন আমরা আগ্রায় থাকব। কোন একটা হোটেলে উঠব ঠিক করলাম। লোক তো আমরা কম না, প্রায় বার চৌদ্দজন। অনেক টাকা খরচ করতে হবে। মোসাফিরখানা হলেই আমাদের সুবিধা হত। আগ্রা স্টেশনে পৌঁছালাম, অনেক হোটেলের লোকই তাদের হোটেলে থাকতে আমাদের অনুরোধ করল। এক ভদ্রলোক এলেন, তিনি বললেন, “আপনারা বাংলাদেশ থেকে এসেছেন, একটা বাঙালি হোটেল আছে, সেখানেই আপনাদের সুবিধা হবে।” চৌধুরী সাহেব বললেন, “আপনাদের হোটেলে তবু আছে? আমরা অনেক লোক।” তিনি বললেন, “তাঁবু খাটিয়ে দিতে পারব।” ঠিক হল, আগ্রা হোটেলেই যাব। চৌধুরী সাহেব একটা রুম নিলেন, আমাদের জন্য দুইটা তবু ঠিক করে দেওয়া হল। আমরা খাটিয়া পেলেই খুশি। শুধু প্রয়োজন আমাদের গোসল করার পানি, আর পায়খানা। হোটেলের মালিক বাঙালি, খুব ভদ্রলোক, আমাদের অভ্যর্থনা করলেন। আমাদের যাবতীয় বন্দোবস্ত করতে ম্যানেজারকে হুকুম দিলেন। কত টাকা দিতে হবে চৌধুরী সাহেবই ঠিক করলেন, তিনিই দিয়েছিলেন। আমাদের কিছুই দিতে হয় নাই।

তাড়াতাড়ি আমরা গোসল করে কিছু খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম, মন তো মানছে না, তাজ দেখার উদগ্র আগ্রহ। টাঙ্গা ভাড়া করে তাজ দেখতে রওয়ানা করলাম। প্রখর রৌদ্র। কি দেখলাম ভাষায় প্রকাশ আমি করতে পারব না। ভাষার উপর আমার সে দখলও নাই। শুধু মনে হল, এও কি সত্য! কল্পনা যা করেছিলাম, তার চেয়ে যে এ অনেক সুন্দর ও গাম্ভীর্যপূর্ণ। তাজকে ভালভাবে দেখতে হলে আসতে হবে সন্ধ্যায় সূর্য অস্ত যাবার সময়, চাঁদ যখন হেসে উঠবে তখন। আমরা বেশি দেরি করলাম না, কারণ আগ্রা দুর্গ ও ইতমতউদ্দৌলা দেখতে হবে সন্ধ্যার পূর্বেই। যখন সূর্য অস্ত যাবে তার একটু পূর্বেই ফিরে আসতে হবে তাজমহলে। টাঙ্গাগুলিকে আমরা দাঁড় করেই রেখেছিলাম।

ইতমতউদ্দৌলা–বেগম নূরজাহানের পিতার কবর। আমরা আগ্রা দুর্গে এলাম। দেওয়ানি আম, মতি মসজিদ, মছি ভবন, নাগিনা মসজিদ সবই ঘুরে ঘুরে দেখলাম। দেওয়ানি খাস ও জেসমিন টাওয়ার দেখতেও ভুল করলাম না। দিল্লির লালকেল্লার সাথে এর যথেষ্ট মিল আছে। মোগল আমলের শিল্প একই রকমের, দেখলেই বোঝা যায়। যমুনার দিকে বারান্দায় কতগুলি পাথর ছিল। সেই পাথরের মধ্যে সম্পূর্ণরূপে তাজকে দেখা যেত। এখন আর পাথরগুলি নাই। একটা কাঁচ লাগান আছে। এই কাচের মধ্যেও পরিষ্কারভাবে তাজকে দেখা যায়। আমরা সকলেই দেখলাম, শীশ মহল দেখে রওয়ানা করলাম। আমাদের যে ভদ্রলোক ঘুরে দেখাচ্ছিলেন, তিনি অনেক কথাই বলছিলেন। কিছু সত্য, কিছু গল্প, তবে একটা কথা সত্য, মোগলদের পতনের পরে বার বার লুটতরাজ হয়েছে। জাঠ ও মারাঠি এবং শেষ আঘাত হেনেছে ইংরেজ। জাঠ ও মারাঠিরা কিছু কিছু লুট করেই চলে গিয়েছিল, কিন্তু ইংরেজ সবকিছু লুট করেই নিয়ে গিয়েছে ভারতবর্ষ থেকে। লর্ড স্থানীয় লোকরাই এই লুটের প্রধান কর্ণধার ছিলেন। ভারত ও পাকিস্তানের অনেক জায়গায়ই মোগল শিল্পের অনেক নিদর্শন আছে। আমরা ইতমতউদ্দৌলা দেখে ফিরে চললাম তাজমহল দেখতে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। দিল্লির লালকেল্লা পূর্বেই দেখেছি, তাই আগ্রা দুর্গ দেখতে আমাদের সময় লাগার কথা না।

সূর্য অস্তাচলগামী, আমরাও তাজমহলের দরজায় হাজির। অনেকক্ষণ থাকব, রাত দশটা পর্যন্ত দরজা খোলা থাকে, তারপর দারোয়ান সাহেবরা এসে ঘণ্টা দিয়ে জানিয়ে দিবে সময় হয়ে গেছে। তাজকে ত্যাগ করতে হবে, রাতের জন্য। আমরা বসে পড়লাম, একটা জায়গা বেছে নিয়ে কয়েকজন নামাজ পড়তে গেলেন। আজানের ধ্বনি কানে এসেছে। পাকিস্তান হওয়ার পরও আজান হয় কি না জানি না। এই দিনে অনেক লোক দেশ-বিদেশ থেকে এসেছে। বাঙালি, মারাঠি, পাঞ্জাবি—মনে হল ভারতবর্ষের সকল জায়গার লোকই এসেছে। আমাদের পথপ্রদর্শককে জিজ্ঞাসা করলাম, এত ভিড় কি সকল সময়ই থাকে? বললেন, না, পূর্ণ চন্দ্রের সময়ই অনেক লোক বিশেষ করে আসে। সূর্য যখন অস্ত গেল, সোনালি রঙ আকাশ থেকে ছুটে আসছে। মনে হল, তাজের যেন আর একটা নতুন রূপ। সন্ধ্যার একটু পরেই চাঁদ দেখা দিল। চাঁদ অন্ধকার ভেদ করে এগিয়ে আসছে আর সাথে সাথে তাজ যেন ঘোমটা ফেলে দিয়ে নতুন রূপ ধারণ করেছে। কি অপূর্ব দেখতে!

 

অসমাপ্ত আত্মজীবনী, জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান।

(পৃষ্ঠা নং-৫৬ থেকে ৫৯)

চলমান……