ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৪ আশ্বিন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

স্মৃতিতে ৭৫

ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৪ আগস্ট ২০২০ মঙ্গলবার, ০৯:০০ এএম
স্মৃতিতে ৭৫

শোকের মাস আগস্ট। এই মাসেই জাতি হারিয়েছে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। স্বাধীন দেশের মাটিতে ষড়যন্ত্রকারীদের নির্মম হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়েছে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে। শোকের মাসে বাঙালি জাতি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে জাতির পিতা ও অন্যান্য শহীদদের। 

এই শোকাবহ মাসে বাংলা ইনসাইডার পাঠকদের জন্য নিয়েছে বিশেষ আয়োজন। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গের কিছু স্মরণীয় লেখা তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আজ থাকছে তাজউদ্দীন আহমদের কন্যা শারমিন আহমদের ‘ঘরে ফেরা’ শিরোনামে একটি লেখার অংশবিশেষ। লেখাটি নেওয়া হয়েছে ‘তাজউদ্দীন আহমদ: নেতা ও পিতা’ বই থেকে।

স্মৃতিতে ৭৫

‘১৫ আগস্ট সকালে আব্বুর কাপাসিয়া যাওয়ার কথা ছিল কিন্তু অভাবনীয়ভাবে ঘটনা মোড় নিলো অন্যদিকে। খুব ভোরে প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দে আমাদের ঘুম ভেঙে গেল। আমার সমবয়সী খালাতো বোন ইরিনা আগের রাতে আমাদের বাসায় বেড়াতে এসে থেকে গিয়েছিল। সে চিৎকার করে রিমিকে জড়িয়ে ধরল। রাজশাহীর এসপি (আমাদের এক মামা ও আম্মার মামাতো ভাই) সৈয়দ আবু তালেব দু’দিন আগে সরকারি কাজে ঢাকায় আমাদের বাসায় উঠেছিলেন। তিনি হতভম্বের মতো ঘর থেকে বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন। তাঁর পাশে আব্বু ও কাজের ছেলে ইলিয়াস দাঁড়ানো। আমরাও একে একে বারান্দায় জড়ো হলাম। আম্মা চিন্তাগ্রস্ত কণ্ঠে বললেন, ‘হঠাৎ এত গোলাগুলি কোথা থেকে আসছে।’ আব্বু বারান্দা থেকে দ্রুত ছাদে ছুটে গেলেন। রিমি ও আমিও গেলাম আব্বুর পেছনে পেছনে। দু’-একটা গুলির শব্দ আবারও শোনা গেল। তারপর সব নিঃশব্দ হয়ে গেল। আব্বু নিচে নেমে বারান্দায় ইস্ত্রির টেবিলের পাশে রাখা ফোনে বিভিন্নজনকে যোগাযোগের চেষ্টা করলেন। কিন্তু সেই ভোরে ফোনে কাউকেই পেলেন না। এরপর আব্বুর নির্দেশমতো রিমিও ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলো। মিন্টো রোডে অধ্যাপক ইউসুফ আলীর সরকারি বাড়ির ফোন ধরলো তাঁর মেয়ে বেবি। বেবি জানালো যে, ওর বাবা নামাজ পড়তে গিয়েছেন এবং তাঁদের বাড়ির কাছেও অনেক গোলাগুলি হয়েছে। বেবি তখনও জানতো না মুজিব কাকুর ভগ্নিপতি খাদ্যমন্ত্রী আবদুর রব সেরনিয়াবাতের মিন্টো রোডের বাসাতেও অভ্যুত্থানকারীরা আক্রমণ করে তাঁকেসহ তাঁর পরিবারের পাঁচ সদস্যকে হত্যা করেছে। আবদুর রব সেরনিয়াবাতের ছোট মেয়ে বেবি সেরনিয়াবাত রিমির সহপাঠী ছিল। সেও নিহতদের মধ্যে ছিল। তাঁর বড় মেয়ে শেখ ফজলুল হক মনির স্ত্রী আরজু মনি তাঁর স্বামীসহ তাঁদের ধানমন্ডির বাসায় ১৫ই আগস্ট ভোরে একই দলের গুলিতে নিহত হন। মুজিব কাকু ও তাঁর পরিবারের নিকটতম অত্যন্ত ক্ষমতাধর ব্যক্তিবর্গরা একই দিনে, কাছাকাছি একই সময়ে অকালেই জীবন হারালেন। একটু সকাল হতেই আব্বু ফোনে খোন্দকার মোশ্‌তাককে পেলেন। তিনি আব্বুর কাছে এই হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে বিস্ময় প্রকাশ করলেন। অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক পিয়ন আনোয়ার আগের রাতে আব্বুর সঙ্গে দেখা করতে এসে বেশি রাত হওয়ায় আমাদের বাসায় থেকে গিয়েছিলেন, তিনি চলে গেলেন। আমাদের বাড়ি যিনি দেখাশোনা করতেন সেই বারেক মিয়া (হাইয়ের বাবা) এবং ইলিয়াস বাইরে বেরিয়ে পড়লেন। একটু পর বারেক মিয়া রাস্তা থেকে প্রায় ছুটতে ছুটতে ঘরের কাছে এসে চিৎকার করে রেডিও অন করতে বলেন। রাস্তায় অনেক মানুষ জড়ো হয়েছে। তারা রেডিওতে কি এক ভাষণের কথা যেন বলাবলি করছে। আব্বু রেডিও অন করলেন। ইথারে ভেসে এল মেজর ডালিমের উত্তেজিত কণ্ঠ- ‘খুনি মুজিবকে হত্যা করা হইয়াছে।’ আমরা সবাই বাক্যহারা হয়ে গেলাম। বেদনায় বিমূঢ় আব্বু গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘মুজিব ভাই জেনে গেলেন না কে ছিল তাঁর প্রকৃত বন্ধু আর কে শত্রু। মৃত্যুর আগে যদি চিন্তার সময় পেয়ে থাকেন তাহলে হয়তো ভেবেছেন আমিই তাঁকে হত্যা করিয়েছি। আমি যদি মন্ত্রিসভায় থাকতাম কারও সাধ্য ছিল না মুজিব ভাইয়ের শরীরে কেউ সামান্য আঁচড় কাটে।’ সপরিবারে স্ত্রী ফজিলাতুন্নেসা মুজিব, তিনপুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল, দশ বছরের বালক শেখ রাসেল, ছোট ভাই শেখ নাসের, দুই পুত্র বধূ সুলতানা কামাল খুকী ও পারভীন জামাল রোজীসহ মুজিব কাকু নিহত হন। দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা সে সময় পশ্চিম জার্মানিতে থাকায় তারা প্রাণে বেঁচে যান। শিশু রাসেলকেও ছাড়েনি বর্বর ঘাতকের দল। ১৯৬৪ সালে যখন রাসেলের জন্ম হয়, আম্মার সঙ্গে আমি নবজাতক শিশুকে দেখতে গিয়েছিলাম। মুজিব কাকির কোল আলো করে রয়েছে ফুটফুটে রাসেল। আজ সে নেই! তাঁরা কেউ নেই! কি এক নির্মম ও অবিশ্বাস্য সত্যের মুখোমুখি আমরা সেদিন দাঁড়ানো! মুজিব কাকুকে হত্যার খবর রেডিও মারফত চারদিকে ছড়িয়ে পড়লো। ইলিয়াস রাস্তা থেকে আরও খবর নিয়ে এলো। অনেক মানুষ এই হত্যাকাণ্ডে উল্লাস প্রকাশ করেছে। হত্যাকাণ্ডকে সমর্থন করে কেউ কেউ শ্লোগানও দিচ্ছে।

পঁচাত্তরে মুজিব কাকুর জনপ্রিয়তা ছিল শূন্যের কোঠায়। তার নেতৃত্ব সম্পর্কে হতাশাগ্রস্ত জনগণ তার স্বৈরশাসনের অবসান কামনা করছিল। যদিও তারা হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করেনি (অতীতে একই জনগণ তার জন্য প্রাণ আহুতি দিতে পর্যন্ত প্রস্তুত ছিল) তা সত্ত্বেও ধারণা করা যায় যে, দেশের অধিকাংশ মানুষ এই নির্মম হত্যাকাণ্ডকে সমর্থন করেনি। দুর্ভাগ্য যে সেদিনের নির্মম হত্যাকাণ্ড রুখতে বা সেই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করতে মুজিব কাকুর অনুগত রক্ষী বাহিনী চরমভাবেই ব্যর্থ হয়। একমাত্র বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জাতির জনকের হত্যার সশস্ত্র প্রতিবাদ করেন ও জেনারেল জিয়াউর রহমান নিয়ন্ত্রিত আর্মির সঙ্গে সংঘর্ষের ফলে দেশান্তরী হতে বাধ্য হন। মুজিব কাকুকে হত্যা করা হয়েছে- এই ঘোষণা শোনার পর আব্বু বলেছিলেন, মুজিব কাকু জেনে গেলেন না কে ছিল তাঁর প্রকৃত বন্ধু আর কে শত্রু। রাষ্ট্রপতি হিসেবে খোন্দকার মোশতাকের নাম ঘোষিত হওয়ার পর মনে হলো নিয়তির কি নির্মম পরিহাস, মুজিব কাকুর অতি কাছের আস্থাভাজন এই ব্যক্তিটি নির্মম এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। সে ও তার মতো ষড়যন্ত্রকারীরা ঠিকই জানতো যে, আব্বু মুজিব কাকুর পাশে থাকলে তারা আঘাত হানতে পারবে না। সে কারণেই কুমন্ত্রণা ও ভুল পরামর্শ দিয়ে তারা মুজিব কাকুকে আব্বুর কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নেয়। মুজিব কাকুর আত্মীয়দের মধ্যে কেউ কেউ আব্বুর প্রতি তাঁদের ব্যক্তিগত আক্রোশের কারণে আব্বু ও মুজিব কাকুর সম্পর্কে ফাটল ধরায় এবং হত্যাকারীদের ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের পথকে সহজ করে দেয়। আব্বুর নিঃস্বার্থ উপদেশ, সতর্কবাণী সব অগ্রাহ্য করে মুজিব কাকু স্বাধীনতার শত্রুদের বরণ করেন পরম বন্ধু হিসেবে।

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের সকালবেলাটা ছিল উৎকণ্ঠা, উত্তেজনা ও বেদনাসিক্ত। আশপাশের অনেকেই আব্বুর সঙ্গে দেখা করতে এলেন। আব্বুর সাবেক একান্ত সচিব আবু সাঈদ চৌধুরীসহ অনেকে সকাল থেকেই আমাদের বাসায় ফোন করা শুরু করলেন। কেউ কেউ আব্বুকে বাসা ছেড়ে যাওয়ার উপদেশ দিলেন। আম্মা বারবার আব্বুকে অনুরোধ করলেন, ‘তুমি বাসায় থেকো না, আশপাশে কোথাও চলে যাও। নিরাপদ জায়গায় গিয়ে দেখো পরিস্থিতি কি হয়।’ আব্বু বাসা ছেড়ে যাওয়ার ব্যাপারে বিন্দুমাত্র আগ্রহ দেখালেন না। আব্বুর মুখমণ্ডলজুড়ে কি নিদারুণ বেদনার ছাপ। আব্বুর এক সতীর্থ উপদেশ দিলেন ভারতে আশ্রয় নেয়ার জন্য। আব্বু বললেন, ‘যে পথে একবার গিয়েছি সে পথে আর যাবো না।’ একাত্তরের সেই সময় ও আজকের সময়ের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ। সেদিন বঙ্গবন্ধু জীবিত ছিলেন। তাঁরই প্রতিনিধি হিসেবে তাজউদ্দীন এক স্বাধীনতা-পাগল জাতির মুক্তির সংগ্রামে নেতৃত্ব দিতে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। কিন্তু আজ তিনি যদি পালিয়ে যান তাহলে হত্যাকারী ও ষড়যন্ত্রকারীরা অপপ্রচারণার সুযোগ পাবে যে, তিনিই মুজিবকে হত্যা করিয়ে পালিয়ে গিয়েছেন। আব্বু বললেন, ‘বিশ্বাসঘাতক অপবাদ নিয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়াই ভাল।’ সকাল সাড়ে নয়টার দিকে সেনাবাহিনীর কিছু সদস্য আমাদের বাসা ঘিরে ফেললো। সামনের বড় রাস্তাজুড়ে সেনাবাহিনীর অতিকায় ট্রাকগুলো মূর্তিমান আতঙ্কের মতো একে একে বাসার সামনে জড়ো হলো। আব্বুর সঙ্গে আমরা বাসার টেলিফোনের পাশে দাঁড়ানো। সেই মুহূর্তে একজন অফিসার দ্রুতগতিতে আমাদের দোতলার বারান্দায় উঠে এলেন। ক্যাপ্টেন শহীদ হিসেবে পরিচয়দানকারী এই অফিসার আম্মাকে বললেন, ‘এই মুহূর্ত থেকে আপনারা কেউ বাসার বাইরে যেতে পারবেন না এবং বাইরের কেউ ভেতরে আসতে পারবে না।’ আব্বু প্রত্যুত্তর দিলেন, ‘বলুন হাউস অ্যারেস্ট। আমাদের গৃহবন্দি করলেন।’ ক্যাপ্টেন শহীদ আমাদের কাছে একটা চাকু চাইলেন। তাঁর হাতে চাকু দেওয়া মাত্রই তিনি টেলিফোনের তারটি দ্বিখণ্ডিত করলেন। তারপর ফোন-সেট সহকারে নিচে নেমে গেলেন। আমাদের নিচতলাটি একটি স্কুলকে ভাড়া দেওয়ার সময় আব্বু আব্বু সামনের রুমটি ব্যক্তিগত অফিস হিসেবে ব্যবহারের জন্য খালি রেখেছিলেন (ষাটের দশকেও ঐ রুমটি তিনি অফিস, পড়ার ঘর ও বৈঠকখানা হিসেবে ব্যবহার করতেন)। সেই রুমটিকেই তারা তাদের থাকার জন্য বেছে নিল এবং বাসার ছাদের ওপর অ্যান্টি-এয়ারক্র্যাফট-গান স্থাপন করল। তাদের ব্যাপার-স্যাপার দেখে মনে হচ্ছিল তারা যেন অস্ত্রেশস্ত্রে সজ্জিত বিশাল কোনো বাহিনীর মোকাবেলা করতে যাচ্ছে। ছোট সোহেল আমার কোলে চড়ে দোতলার জানালা দিয়ে নিচের রাস্তায় জমায়েত আর্মির ট্রাকগুলো দেখে উত্তেজিত কণ্ঠে বলে উঠলো ‘ব’পা, মিলিটারি বন্দুক’ !

এর পর থেকে আমরা সবাই বাসায়, সবার কাছ থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন। সময় যেন আর কাটছে না। প্রতিটি মুহূর্ত মনে হচ্ছে যেন একটি দিন। তারপর গভীর রাতে আমাদের দোতলার দরজার কলিংবেল আচমকা বেজে উঠল। দরজা খুলতেই দেখা গেল যে হত্যাকারীদের অন্যতম মেজর ডালিম ও তার সঙ্গে অন্য একজন দাড়িয়ে রয়েছে। মেজর ডালিম জানাল যে আব্দুর নিরাপত্তার জন্য বাসায় আর্মির পাহারা বসেছে। নিরাপত্তা ঠিক আছে কি না সেটা দেখতেই তার আগমন। আব্বু তাকে ধমক দিয়ে বললেন যে তাদের আসার উদ্দেশ্য আসলে তিনি বন্দী হয়েছেন কি না সে ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া।

আমাদের বাসায় বেড়াতে এসে আটকে পড়া সেই মামা চলে গেলেন পরদিন। আব্বু বলেকয়ে তাঁর চলে যাওয়ার ব্যবস্থা করলেন। ইরিনা গেল কয়েক দিন পর। তাদের চলে যাওয়ার অনুমতি মিললেও আমাদের কারো বাইরে যাওয়ার উপায় ছিল না। আব্বু বহু কষ্টে নিচের তলা থেকে সেনাবাহিনীর কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে যোগাযোগ করে ১৮ আগস্ট থেকে রিমি ও মিমির স্কুলে যাওয়ার অনুমতি জোগাড় করলেন। অন্তত বাইরের পরিস্থিতি রিমি স্বচক্ষে দেখে আমাদের জানাতে পারবে, যেটা আব্বু চিন্তা করেছিলেন। তাদের স্কুলে যাওয়ার সময় প্রচণ্ড ঝামেলা পোহাতে হতো। তাদের ব্যাগ, বই, খাতাপত্র ইত্যাদি পরীক্ষা করা হতো। স্কুল থেকে ফেরার পর আবারো একইভাবে আসতে হতো।

রিমির স্কুলের সহপাঠীদের ধারণা ছিল ১৫ আগস্টে আমাদের মেরে ফেলেছে। ওকে ক্লাসে প্রবেশ করতে দেখে তারা সবাই খুব চমকে গিয়েছিল। স্কুল থেকে রিমি শুনে এল যে আর্মির পাহারায় মুজিব কাকুকে টুঙ্গিপাড়ায় কবর দেওয়া হয়েছে। রাস্তায় বিভিন্ন জায়গায় সে আর্মির পাহারা দেখল। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সামনে একটি ট্যাংক রাখা হয়েছে দেখতে পেল।

১৯ আগস্ট রিমি ১৪ বছরে পা দিল। আমার জমানো অনেক স্ট্যাম্প ও কার্ডের মধ্যে একটি কার্ড রিমির খুব পছন্দের ছিল। সেই কার্ডটি ওকে জম্মদিনের উপহার হিসেবে দিতেই সে খুশিতে আপ্লুত হয়ে উঠল। আব্বুও মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করলেন, তিনি সচরাচর যা করেন না, কয়েক লােকমা খাবারও তার মুখে তুলে দিলেন।

২২ আগস্ট শুক্রবার সকালে আমাদের বাড়ির সামনে পুলিশের দুটি জিপ এসে থামল। এক পুলিশ অফিসার এসে আম্মুকে বললেন, স্যার আমাদের সঙ্গে আপনাকে যেতে হবে। আব্বুকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হবে তা তিনি প্রকাশ করলেন না। আব্বু গােসল করে নাশতা খেয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলেন। জিজ্ঞেস করলেন জামা-কাপড় নিতে হবে কি না। অফিসার বললেন, নিলে ভালো হয়। আপু একটা ছোট সুটকেসে কিন্তু জামা-কাপড় গুছিয়ে নিলেন। সঙ্গে নিলেন কুরআন শরিফ ও কালো মলাটের ওপর সোনালি বর্ডার দেওয়া একটা ডায়েরি, যাতে তিনি লিখেছিলেন মুক্তিযুদ্ধকালের কথা ও ভবিষ্যতে বাংলাদেশ কীভাবে চলবে তার নির্দেশনা। আব্বুর ঘরের সামনের বারান্দায় আমরা চার ভাইবোন দাঁড়িয়ে রয়েছি বিদায় দিতে। আব্বু আমাদের সবার মাথায় হাত বুলালেন। আম্মা জিজ্ঞেস করলেন, কী মনে হয়, কবে তোমাকে ছাড়বে ? আব্বু সিড়ির দিকে এগিয়ে যেতে যেতেই এক হাত নেড়ে বললেন, Take it forever, ধরে নাও চিরদিনের জন্যই যাচ্ছি। আমরা দৌড়ে লতাগুল্ম ও ফুলে ছাওয়া দোতলার জলছাদে এসে দাঁড়ালাম। গৃহবন্দি থাকা অবস্থায় আব্বু বাড়ির বারান্দার ওপরের এই জলছাদে দাঁড়িয়ে বাইরে অপেক্ষমাণ তার ভক্ত ও শুভানুধ্যায়ীদের উদ্দেশে হাত নাড়তেন। আজ আমরা আন্ধুকে বিদায় দিতে তার উদ্দেশে হাত নাড়ছি। আব্বু জিপে উঠতেই রাস্তার উল্টো দিকের মুদি দোকানের সামনে দাঁড়ানো নীল বর্ণের জিনসের ট্রাউজার পরিহিত এক বিদেশি আব্বুর জিপের জানালার সামনে এসে দাঁড়ালেন। তিনি আব্বুকে কী যেন বললেন, আব্বুও তাঁকে কী যেন উত্তর দিলেন। পুলিশ এবার তাকে বাধা দিল এবং আব্বুকে বহনকারী জিপটি শাঁ করে চোখের আড়াল হয়ে গেল। আমাদের মনে প্রশ্ন ছিল কে এই বিদেশি, তাঁর সঙ্গে আব্বুর কী কথা হয়েছিল। প্রায় এগারো বছর পর আলোড়ন সৃষ্টিকারী Bangladesh: The Unfinished Revolution গ্রন্থের রচয়িতা মার্কিন সাংবাদিক লরেন্স লিফশুল্টজ সেই প্রশ্নের উত্তর দিলেন। ওয়াশিংটন ডিসির উপকণ্ঠে আমাদের ডেমোক্রাসি বুলেভার্ডের বাসায় বেড়াতে এসে জানালেন যে তিনিই ছিলেন সেই বিদেশি যার সঙ্গে আব্বুর কথা হয়েছিল। লিফসুজ আব্বুকে জিজ্ঞেস করেছিলেন ‘আপনাকে কী মন্ত্রিসভায় যোগদানের জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ? ‘আব্বু উত্তর দিয়েছিলেন। ‘আমার তা মনে হয় না।` আব্বু যেন ধরেই নিয়েছিলেন যে ঐ যাওয়াই তার শেষ যাওয়া।’

[তাজউদ্দীন আহমদঃ নেতা ও পিতা’ বইয়ের ২১১ থেকে ২১৬ পৃষ্ঠা]