ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৪ আশ্বিন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

বত্রিশে বঙ্গবন্ধুর লাশ বঙ্গভবনে খুনি রাষ্ট্রপতির অভিষেক

প্রণব সাহা
প্রকাশিত: ১৪ আগস্ট ২০২০ শুক্রবার, ০৯:০০ এএম
বত্রিশে বঙ্গবন্ধুর লাশ বঙ্গভবনে খুনি রাষ্ট্রপতির অভিষেক

মিনিট পাঁচেকের মধ্যে পৌঁছে গেলাম ধানমন্ডি ৩২ নম্বর রোডের সেই বিখ্যাত বাসভবনটিতে। গেটে প্রহরায় রয়েছে ১ম ফিল্ড রেজিমেন্টের সৈনিকেরা । গেটে গাড়ি থেকে নামতেই ভেতর থেকে এগিয়ে এল মেজর বজলুল হুদা।

’ ভেতরে যাব ’ , আমি বললাম।

’ অবশ্যই , চলুন আমিই আপনাকে নিয়ে যাব ‘,হুদা বলল।

এই বর্ণনা  অবসরপ্রাপ্ত মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের। বিএনপির রাজনীতিক সাবেক মন্ত্রী হাফিজ উদ্দিন ১৯৭৫ সালের আগস্টে ঢাকায় অবস্থিত ৪৬ ব্রিগেডের ব্রিগেড মেজর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। খুব কাছে থেকে দেখা রক্তাক্ত পঁচাত্তরকে অনেক দিন পরে তুলে ধরেছেন এবছর নিজের লেখা একটি বইতে।

হাফিজ উদ্দিন লিখেছেন “ প্রথমবারের মতো এ বাড়ির ভেতরে ঢুকলাম। ঢুকতেই হাতের বাঁ দিকে রিসেপশন কক্ষ। টেবিলের ওপর রক্তমাখা টেলিফোন। ফ্লোরে একটি লাশ। পরনের জামা রক্তে লাল হয়ে আছে। হুদা জানাল , ইন প্রেসিডেন্টের ভাই শেখ নাসের। বাড়ির ভেতরে ঢুকেই বাঁ দিকে সিড়িঁ ল্যান্ডিংয়ে উঠলাম। ওপরে তাকিয়ে যে দৃশ্য দেখলাম, তা আমার আজীবন মনে থাকবে। ল্যান্ডিং পেরিয়েই ওপরের দু-একটি ধাপের পরই সিড়িঁর ওপর লম্বালম্বি শায়িত রয়েছে বঙ্গবন্ধুর মৃতদেহ। পরনে লুঙ্গি , গায়ে সাদা পাঞ্জাবি, গোড়ালি থেকে গলা পর্যন্ত সাদা চাদরে ঢাকা। কোথাও রক্তের দাগ নেই। সেই অতিপরিচিত অবয়ব, র্নিমীলিত চোখ, ঈষৎ হাসিমুখ। দেখে স্তব্দ হয়ে গেলাম। ফিরে আসার উদ্যোগ নিতেই হুদা বলল, ‘স্যার,ওপরে চলেন। সেখানে পরিবারের সদস্যদের ডেডবডি রয়েছে। ‘

‘আমার তাড়া আছে ,বঙ্গভবনে যেতে হবে আমাকে’, বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলাম। হুদা আমাকে জিপ পর্যন্ত এগিয়ে দিল।

ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে রাষ্ট্রপতির বাসভবনে যাবার আগে মেজর হাফিজ গিয়েছিলেন রাষ্ট্রপ্রধানের সরকারি দপ্তর গনভবনেও। সেখানে তিনি পেয়েছিলেন রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব কর্নেল মাশহুরুল হককে। মেজর হাফিজ জানাচ্ছেন “ ………. স্যার আপনি এখানে কেন ? ‘ আমাকে ল্যান্সার সৈনিকেরা রাস্তা থেকে ধরে এনে এখানে রেখে গেছে। ‘ মাশহুরুল বললেন। ‘

স্যার আপনি বাসায় যাবেন ?আমি বললাম।

’ আমি তো বন্দী। ’ মশহরুল বললেন।

’ কিসের বন্দী ? এখানে তো কোনো গার্ডও নেই। আপনি বসে আছেন কেন ?’ আমি বললাম।

তিনি নিরুত্তর, বিহবল। তাঁর চোখ থেকে অশ্রু নেমে এল। তিনি সিনিয়র, মোস্ট সিনিয়র টাইগার, আমি এবং আবুল খায়েরও একই পল্টনের সৈনিক। আমাদের সামনে মশহরুল নিজেকে অপদস্ত, অসহায় ভাবছেন।

আমি আবুল খায়েরকে বললাম একটি গাড়ি যোগাড় করে আনতে। মিনিট দশেক পরে একটি জিপ পাওয়া গেল। আমি মশহরুল হককে জিপে তুলে দিয়ে ড্রাইভারকে বললাম কর্নেল সাহেব যেখানে যেতে চান দিয়ে আসবে। কেউ প্রশ্ন করলে বলবে মেজর হাফিজ পাঠিয়েছে।

গনভবন, ৩২ নম্বর হয়ে বঙ্গভবন যাবার পথে মেজর হাফিজ গিয়েছিলেন শাহবাগের রেডিও স্টেশনে। সেখানেই তাঁর সাথে দেখা হয়েছিল অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু তাহেরের সাথে। নিজের বইতে লিখেছেন রেডিও স্টেশন দেখার কথা। নিজের বইটিতে তিনি লিখেছেন “ বাংলাদেশ বেতারের  নাম ইতিমধ্যে ঘোষকের মাধ্যমে পরিবর্তন করা হয়েছে। এখন এটি ‘ রেডিও বাংলাদেশ।’ স্থাপনাটিতে গার্ড ডিউটি করছেন ২য় ফিল্ডের সৈনিকেরা। ভেতরে বেশ কিছু অনুসন্ধিৎসু মানুষ কাজে-অকাজে ভিড় জমিয়েছে। মনে হচ্ছে আজ সবার জন্যই অবাধ প্রবেশাধিকার। একটি বড়সড় কক্ষে বসে আছেন অবসরপ্রাপ্ত মেজর শাহরিয়ার রশিদ খান। রেডিওর সিনিয়র, জুনিয়র সব পর্যায়ের কর্মকর্তা তার কাছ থেকে পাওয়া নির্দেশ অনুযায়ী বেতারের যাবতীয় কার্যক্রম চালাচ্ছেন। তিনি ধীরস্থির, শান্তভাবে সম্প্রচার সম্পর্কিত বিভিন্ন নির্দেশ দিচ্ছেন, উত্তেজনার লেশমাত্র নেই। তার রুমে মিনিট দশেক বসে বেরিয়ে এলাম। 

বাইরে বেরিয়ে দেখা হলো অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু তাহেরের সাথে। একটি সিভিল জিপ থেকে নামলেন। জিপের পেছনে দুজন সিগন্যাল কোরের সৈনিক। তারা কুচকানো ইউনিফর্ম পরা, নিরস্ত্র। অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক বলেই মনে হলো। তাহের আমাকে দেখে জিপ থেকে নেমে ক্রাচে ভর দিয়ে দাড়ালেন।

’ হাফিজ ,কেমন আছ? ‘ তাহের বললেন।

’ফাইন স্যার , ধন্যবাদ।’ আমি বললাম।

’ ভেতরে ফারুক বা রশীদ আছে? ‘ তাহের বললেন।

’ না ওদের দেখলাম না। শাহরিয়ার আছে।’ আমার সংক্ষিপ্ত জবাব।

আমার আশেপাশে কৌতুহলী পাবলিক জড়ো হচ্ছে। তাই সময়ক্ষেপন না করে জিপে উঠলাম। তাহের রেডিও স্টেশনের ভেতরে ঢুকলেন।

মেজর হাফিজ উদ্দিন ১৫ আগস্ট গিয়েছিলেন বঙ্গভবনেও। একটু বিস্তারিত বর্ননা আছে তাঁর বইটিতে। চমৎকার একটি মন্তব্য হচ্ছে “ সামনে চলমান দুজনকে অনুসরণ করে একটি বড়সড় কক্ষে দেখি এটি খোদ রাষ্ট্রপতির অফিস কক্ষ। পথে কিংবা দরজায় কেউ পরিচয়ও জিজ্ঞাসা করলো না। অনুধাবন করলাম, সামরিক ইউনির্ফমই আজ সব বাধা অতিক্রমের পাসপোর্ট। “

যখন দেশের রাষ্ট্রপতির গুলিবিদ্ধ মরদেহ পড়ে আছে তার বাসভবনে, তখন অবৈধ নতুন রাষ্ট্রপতির অভিষেকে জমজমাট বঙ্গভবন। বিস্তারিতই লিখেছেন মুক্তিযোদ্ধা মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম। তাঁর ভাষায় “………. রাষ্ট্রপতির ডান পাশে রক্ষিত চেয়ারের সারিতে বমে আছেন তিন বাহিনীর প্রধানেরা। সেনা উপপ্রধান জিয়াউর রহমান, সিজিএস খালেদ মোশারফ, বিডিআর প্রধান ব্রিগেডিয়ার খলিলুর রহমান প্রমুখ। রাষ্ট্রপতির বা দিকে কক্ষের এক কোনায় চুপঁচাপ বসে আছে অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী অফিসাররা- রশিদ, ফারুক, ডালিম, নূর, রাশেদ। এরা সবাই আমার বন্ধু ,মুক্তিযোদ্ধ শহীদ আজিজ পল্লিতে প্রতিবেশী। এদের সারিতেই বসে আছেন একমাত্র নারী, রশিদের স্ত্রী যুবয়েদা রশিদ। রশিদ ও ফারুক সম্পর্কে ভায়রা। চট্টগ্রামের শিল্পপতি এ কে খানের ভাইয়ের দুই মেয়েকে বিয়ে করেছেন তারা। এই অফিসারদের সঙ্গে প্রায়ই দেখা সাক্ষাৎ হতো গ্যারিসনের সিনোমা হলে কিংবা অফিসার মেসে বিভিন্ন পার্টিতে। এদের কারও মুখে কখনো রাজনৈতিক আলাপ শুনিনি। ফারুক তো বাংলাই ভালোমত বলতে পারেন না। পশ্চিম পাকিস্তানে বেড়ে উঠেছেন। তার পিতা মেজর রহমানি আর্মি মেডিকেল কোরের অফিসার, চাকরিকালীন অধিকাংশ সময় পশ্চিম পাকিস্তানে কাটিয়েছেন। ফারুক অবশ্য একটু এক্সট্রোভার্ট টাইপ, অতিকথনের অভ্যাস আছে। কিন্তু এ গ্রুপের কাউকেই রাজনীতিসচেতন বলে মনে হয়নি। অথচ এরাই কত বড় অঘটন ঘটিয়ে বসেছেন। ”

সিজিএস খালেদের কাছে রির্পোট করতেই বললেন , ‘বসো, একটু পরই শপথ গ্রহন অনুষ্ঠান হবে। এর পরই তোমাকে করণীয় সম্পর্কে  ব্রিফ করবো। ‘ আমি ডালিমের পাশে বসে ঘরের পরিবেশ বোঝার চেষ্টা করলাম। অবসরপ্রাপ্ত মেজর হাফিজ তার বইতে খন্দকার মোশতাক সম্পর্কে অনেক কিছু লিখেছেন। তাকে অভিহিত করেছেন “খন্দকার মোশতাকই সামরিক বাহিনীর তিন প্রধান ভেজা বিড়ালের মত জি-হুজুর ভঙ্গিতে বসে আছেন।” আরো অনেক চমকপ্রদ তথ্য ও বিশ্লেষনের জন্য পড়া দরকার বইটি। নাম “ সৈনিক জীবন গৌরবের একাত্তর রক্তাক্ত পচাঁত্তর’’। 

কোন শক্তিতে খন্দকার মোশতাক বলীয়ান ছিলেন, আর সশন্ত্র বাহিনীর সকল সিনিয়র কর্মকর্তা এবং বাহিনী প্রধানরা কিভাবে কয়েকজন খুনীর কাছে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করলেন, সেই রহস্য অনুসন্ধান এখনো শেষ হয়নি। তাই যেসব বই আমাদের হাতে আছে ,সেগুলোর তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই করা যেমন জরুরী, আবার যারা এখনো পঁচাত্তরের ঘটনার প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সাক্ষী তাদের কাছ থেকেও জানা-অজানা তথ্য উদঘাটনের দায়িত্ব আমাদের পালন করে যেতে হবে। ১৫ আগস্টে তিনবাহিনী প্রধান বা অন্যান্য সিনিয়র কমকর্তারা কি করেছিলেন, তার উল্লেখ কিছু আছে প্রকাশিত কয়েকটি বইটিতে। সেগুলো নিয়েও আলোচনা দরকার।