ঢাকা, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২০, ১১ কার্তিক ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড: যেভাবে গর্জে উঠেছিলেন কবি সাহিত্যিকরা

ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৫ আগস্ট ২০২০ শনিবার, ০৯:০০ এএম
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড: যেভাবে গর্জে উঠেছিলেন কবি সাহিত্যিকরা

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর সারা দেশে সৃষ্টি করা হয়েছিল ভীতিকর পরিস্থিতি। বঙ্গবন্ধুর নাম-নিশানা মুছে ফেলতে উদ্যত হয়েছিল ঘাতকচক্র ও তৎকালীন সামরিক সরকার। ফলে সেই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডে হতবিহ্বল মানুষ শোক প্রকাশ করতেও ভয় পেত, প্রতিবাদ করতেও ভয় পেত।

পঁচাত্তরের পর হাতে গোনা কয়েকজন কবি, লেখক, সাহিত্যিক, শিল্পী জীবন বাজি রেখে বঙ্গবন্ধুকে তুলে ধরেছিলেন তাঁদের সৃষ্টিকর্মে। প্রকাশ করেছিলেন তাকে নিয়ে শিল্প-সাহিত্যের নানা রচনাকর্ম। সাহসিকতার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রকাশ করেছিলেন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সংকলনও। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট-পরবর্তী দুঃসময়েও শিল্প-সাহিত্যে বঙ্গবন্ধুর প্রতি ভালোবাসা উচ্চারিত হয়েছে দুঃসাহসিকতার সঙ্গে। শিল্প-সাহিত্যের নানা শাখায় প্রতিবাদ হয়েছে বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের।

 

প্রথম কবিতা

জানা যায়, বঙ্গবন্ধু হত্যার পর অন্ধকার সময়ে ১৯৭৭ সালে বাংলা একাডেমির একুশের কবিতা পাঠের আসরে প্রথম সাহস  দেখান কবি নির্মলেন্দু গুণ। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রথম আবৃত্তি করেন স্বরচিত কবিতা ‘আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি’। কবিতায় তিনি লিখেছিলেন- ‘সমবেত সকলের মতো আমিও গোলাপ ফুল খুব ভালোবাসি,/রেসকোর্স পার হয়ে যেতে সেই সব গোলাপের একটি গোলাপ গতকাল/আমাকে বলেছে, আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি।/আমি তাঁর কথা বলতে এসেছি।’ কবি নির্মলেন্দু গুণের কবিতাটি বাংলা একাডেমিতে উপস্থিত দর্শক-শ্রোতার মাঝে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল। অন্ধকারে এক বিন্দু আলোকরশ্মি দেখা গিয়েছিল। উত্ফুল্ল দর্শক-শ্রোতা হয়ে সেই কবিতা দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়েছিল।

ঐতিহাসিক তথ্যানুসারে জানা যায়, কবি নির্মলেন্দু গুণের ‘আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি’ কবিতা রচনার আগেও বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পরপরই কবিতা রচনা করেছিলেন কয়েকজন কবি। মুক্তিযুদ্ধের গবেষক ও প্রাবন্ধিক মফিদুল হকের ‘নওশাদ নূরী ও তার একটি কবিতা’ শীর্ষক নিবন্ধ থেকে জানা যায়, বঙ্গবন্ধু হত্যার পর বাংলাদেশে তাঁকে নিয়ে প্রথম কবিতা লেখা হয়েছিল আরবিতে, দ্বিতীয় কবিতা রচিত হয়েছিল উর্দুতে আর তৃতীয় কবিতাটি রচিত হয়েছিল বাংলায়।

গবেষক ও প্রাবন্ধিক মফিদুল হক তাঁর নিবন্ধে লিখেছেন, ‘ইতিহাস এবং তার এক বিশেষ ক্ষণের পটভূমিকায় বিচার করলে আমাদের বিস্মিত হতে হয়, বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর প্রথম কবিতাটি রচিত হয় আরবিতে, এরপর উর্দুতে এবং তাৎপর্যময় তৃতীয় কবিতাটি বাংলায়। প্রথম কবিতার রচয়িতা শেখ আবদুল হালিম, দ্বিতীয় কবিতার রচয়িতা নওশাদ নূরী এবং তৃতীয় কবিতার রচয়িতা নির্মলেন্দু গুণ এভাবে প্রথিত হয়ে যান জাতির ইতিহাসের সঙ্গে।’

জানা যায়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর তখন তরুণ কবি, লেখক, সাহিত্যিক, শিল্পী, ছড়াকার, সংস্কৃতিকর্মীদের মধ্যে সৃষ্টি হয় তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ। ওই হত্যাকাণ্ডের পর প্রথম কবিতা প্রকাশ করেছিলেন কবি কামাল চৌধুরী। ১৯৭৭ সালে ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে ‘জয়ধ্বনি’ পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর কবিতাটির নাম ছিল ‘জাতীয়তাময় জন্মমৃত্যু’।

 

প্রথম সংকলন

ঐতিহাসিক তথ্যানুসারে জানা যায়, ১৯৭৮ সালে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণেই ঘটে অবিস্মরণীয় এক ঘটনা। কয়েকজন সাহসী মানুষ উদিত হলেন বইমেলার মাঠে, কবিতা পাঠের আসরের শামিয়ানার আশপাশে। তাঁদের হাতে বঙ্গবন্ধুকে বিষয় করে রচিত একগুচ্ছ ছড়া আর কবিতার অনন্যসাধারণ সংকলন ‘এ লাশ আমরা রাখবো কোথায়’। জানা যায়, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর প্রকাশিত প্রথম সংকলন ছিল এটি।

ঐতিহাসিক এই সংকলনটির প্রকাশক হিসেবে মুদ্রিত ছিল ‘সূর্যতরুণ গোষ্ঠী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’। যদিও এ নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন কোনো সংগঠন ছিল না। ছিল না কোনো প্রকাশকও। এ সংকলনটির সব কর্মযজ্ঞের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্যসেন হলের ১০২ নম্বর কক্ষ থেকে। কক্ষটি ছিল তখনকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবদুল আজীজের। তিনি ছিলেন কেন্দ্রীয় খেলাঘরের সংগঠক। এককভাবে সংকলনটির কোনো সম্পাদক না থাকলেও এই সংকলনের নেপথ্যে ছিলেন আবদুল আজীজ। সংকলনটি প্রকাশের পরিকল্পনা, লেখা সংগ্রহ, ছাপাখানা নির্ধারণ, মুদ্রণব্যয় জোগাড়, প্রচ্ছদ নির্মাণসহ নানা কাজে সহযোগিতা করেছিলেন ভীষ্মদেব চৌধুরী, সিরাজুল ফরিদ, আলতাফ আলী হাসু, নূর-উদ-দীন শেখ এবং আর্টিস্ট মানিক দে।

 

ঐতিহাসিক সেই সংকলনে মুদ্রিত প্রকাশনার পৃষ্ঠাক্রম অনুসারে লেখক তালিকা—অন্নদাশঙ্কর রায়, দিলওয়ার, হায়াৎ মামুদ, রাহাত খান, মাশুক চৌধুরী, ফরিদুর রহমান বাবুল, সুকুমার বড়ুয়া, মোহাম্মদ মোস্তফা, মাহমুদুল হক, আমিনুল ইসলাম বেদু, নির্মলেন্দু গুণ, তুষার কর, আলতাফ আলী হাসু, মোহাম্মদ রফিক, আবদুল আজীজ, শান্তিময় বিশ্বাস, আখতার হুসেন, ভীষ্মদেব চৌধুরী, জিয়াউদ্দীন আহমদ, জাহিদুল হক, ইউসুফ আলী এটম, সিরাজুল ফরিদ, ফজলুল হক সরকার, মহাদেব সাহা, জাফর ওয়াজেদ, লুত্ফর রহমান রিটন, নূর-উদ-দীন শেখ, ওয়াহিদ রেজা, কামাল চৌধুরী এবং খালেক বিন জয়েনউদ্দীন।

 বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ সংকলনগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল চট্টগ্রাম থেকেও। বইটির শিরোনাম ছিল ‘শেখ মুজিব একটি লাল গোলাপ’। বইটির সম্পাদক ছিলেন কবি মিনার মনসুর ও দিলওয়ার চৌধুরী।

 ঐতিহাসিক সংকলন ‘শেখ মুজিব একটি লাল গোলাপ’ বইটির প্রকাশিত লেখক সূচি ছিল যথাক্রমে—ড. মযহারুল ইসলাম, ড. আবদুল মতিন চৌধুরী, কবীর চৌধুরী, ইসমাইল মোহাম্মদ, সন্তোষ গুপ্ত, অন্নদাশঙ্কর রায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, আসাদ চৌধুরী, নির্মলেন্দু গুণ, মাহাদেব সাহা, জাহিদুল হক, ওমর আলী, শাহাদাত বুলবুল, ফজলুল হক সরকার, শামসুল আলম সাঈদ, খালিদ আহসান, কামাল চৌধুরী, মিনার মনসুর, রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, আবসার হাবীব, জাফর ওয়াজেদ, দিলওয়ার চৌধুরী, আলমগীর রেজা চৌধুরী, হারুন রশিদ, নাজিম হাসান, সুজাউদ্দিন কায়সার, বিনতা শাহীন, সনজীব বড়ুয়া, রবীন্দ্রনাথ অধিকারী, ইকবাল করিম, স্বপন দত্ত, শিশির দত্ত, খোরশেদ আলম সুজন, ইসরাইল খান ও জমীর চৌধুরী।