ঢাকা, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২০, ১১ কার্তিক ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

১৫ আগস্ট পরবর্তী রাজনীতিতে যা ঘটেছিল

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৫ আগস্ট ২০২০ শনিবার, ০৯:৫৮ এএম
১৫ আগস্ট পরবর্তী রাজনীতিতে যা ঘটেছিল

১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট বাঙালি জাতির ইতিহাসে কলঙ্কময় একদিন। ওইদিন জাতির পিতাকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করে স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি। সেইসাথে ‘৭৫ এর ১৫ আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক কালো অধ্যায়ের সূচনা ঘটে। অবৈধভাবে খন্দকার মোশতাকের ক্ষমতাগ্রহণ থেকে শুরু করে, সকল রাজনৈতিক কর্মতৎপরতা নিষিদ্ধকরণ ও ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স জারিসহ ঘটতে থাকে নানা নাটকীয় ঘটনা। সেই সময়ে প্রতি মুহূর্তেই দৃশ্যপট পবির্তনের সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু হয়েছে আমাদের স্বপ্নের। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত স্বপ্নগুলোকে ক্ষতবিক্ষত করে যেন প্রতিশোধের উন্মত্ততায় মেতে উঠেছিল স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তি। সপরিবারে বঙ্গবন্ধু, জাতীয় চার নেতাকে নির্মমভাবে হত্যার পর সংবিধানকেও কাটাছেঁড়া করে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে বিদায় করতে চেয়েছিল ক্ষমতা দখলকারী গোষ্ঠী। 

মোশতাকের ক্ষমতা দখল

১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর খন্দকার মোশতাক রাষ্ট্রপতির পদ দখল করেন। ২৩ আগস্ট গ্রেফতার করে বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন (অব.) এম মনসুর আলী, তাজউদ্দীন আহমদ, এএইচএম কামরুজ্জামান আরও বেশ কয়েকজন নেতাকে। পরদিন ২৪ আগস্ট কেএম শফিউল্লাহকে অপসারণ করে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সেইসাথে সারাদেশে সামরিক বিধি জারি করে বেশ কয়েকটি সংক্ষিপ্ত সামরিক আদালত গঠন করা হয়। 

রাজনৈতিক কর্মতৎপরতা নিষিদ্ধকরণ

১৯৭৫ সালের ৩০ আগস্ট এক সরকারী আদেশে সকল রাজনৈতিক কর্মতৎপরতা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। ৬ সেপ্টেম্বর জিল্লুর রহমান, আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ এবং কয়েকদিনের ব্যবধানে আমির হোসেন আমু, এম মতিউর রহমানসহ অসংখ্য নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। 

ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স

ক্ষমতা দখলকারী খুনীচক্র এ সময় বিভিন্ন অধ্যাদেশ জারি করতে শুরু করে। ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর জারি করা হয় কুখ্যাত ‘ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স’। অধ্যাদেশে বলা হয়, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে জড়িত কারো বিরুদ্ধে দেশের কোন আদালতে অভিযোগ পেশ করা যাবে না।

সেনাবাহিনীতে বিশৃঙ্খলা

এ সময় সেনাবাহিনীতে চরম বিশৃঙ্খলা চলতে থাকে। খন্দকার মোশতাক এবং জেনারেল জিয়ার প্রশ্রয়ে খুনী ফারুক-ডালিম-রশীদ চক্রের ঔদ্ধ্যত্বপূর্ণ আচরণ সেনাবাহিনীর অনেকেই পছন্দ করেনি। এ সময়ে খালেদ মোশাররফ সেনাপ্রধানের দায়িত্ব নেন। পাল্টা অভ্যুত্থানের খবর পেয়ে খুনী মোশতাক চক্র কারাভ্যন্তরে হত্যার পরিকল্পনা করে। ৩ নভেম্বর কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রবেশ করে খুনীর দল জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও এইচএম কামরুজ্জামানকে ব্রাশ ফায়ারে নির্মমভাবে হত্যা করে। সেইসাথে জাতীয় ৪ নেতাকে হত্যার পর সর্বত্র আতঙ্ক, বিশৃঙ্খলা ও গুজব প্রচার হতে থাকে। 

খুনীদের দেশত্যাগ

জেনারেল ওসমানীর মধ্যস্থতায় খুনী মেজরচক্র নিরাপদে দেশত্যাগ করে। খন্দকার মোশতাক বাংলাদেশ বিমানের বিশেষ ফ্লাইটে ৩ নভেম্বর রাত ৮টায় খুনী চক্রকে ব্যাংকক পাঠিয়ে দেন। 

দালাল আইন বাতিল

মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী শক্তি এবং ক্ষমতালোভী চক্রের সরকার ১৯৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর এক আদেশে দালাল আইন বাতিল করে দেয়। এর ফলে সমস্ত যুদ্ধাপরাধীদের কারাগার এবং অভিযোগ থেকে মুক্ত করে দেয়া হয়। শহীদদের রক্ত স্নাত বাংলাদেশে বুক ফুলিয়ে চলতে শুরু করে রাজাকার, আলবদর, আল শামস্ বাহিনীর সদস্যরা।

সাম্প্রদায়িক রাজনীতি

৩ মে ১৯৭৬ সরকার এক অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে সংবিধানের ৩৮নং অনুচ্ছেদ বাতিল করে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। ১৯৭৭ সালের ২২ এপ্রিল জেনারেল জিয়া সংবিধানের ৯ সংশোধনীর মাধ্যমে তা আইনে পরিণত করেন। ফলে মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলাম, পিডিপি, নেজামে ইসলামসহ অপরাপর ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলসমূহ আবার তাদের তৎপরতা শুরু করে। 

বিশেষ সামরিক আদালত

১৯৭৬ সালের ১৭ জুলাই এক বিশেষ সামরিক আদালতে ‘সরকার উৎখাত ও সেনাবাহিনীকে বিনাশ করার চেষ্টা চালানোর’- অভিযোগে জাসদ নেতা সেক্টর কমান্ডার কর্নেল তাহেরকে মৃত্যুদণ্ড এবং এমএ জলিল, আ.স.ম আবদুর রব, শাজাহান সিরাজ, হাসানুল হক ইনু, তাত্ত্বিক নেতা সিরাজুল আলম খানসহ আরও অনেককে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডসহ বিভিন্ন মেয়াদের শাস্তি প্রদান করা হয়। কথিত আছে যে, আন্তর্জাতিক সকল আইনকানুন লঙ্ঘন করে ১৯৭৬ সালের ২১ জুলাই পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল তাহেরকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়।