ঢাকা, রোববার, ১৭ অক্টোবর ২০২১, ২ কার্তিক ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি ও বিকাশ (প্রথম পর্ব)

সাযিদ আল মামুন
প্রকাশিত: ০৬ আগস্ট ২০২১ শুক্রবার, ০৮:০০ এএম
বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি ও বিকাশ (প্রথম পর্ব)

১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দ সম্পর্কে বলতে গেলে স্বাধীনতা পরবর্তী ইতিহাসের রাজসাক্ষীদের মধ্যে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা চেয়ে বোধ করি আর কেউ ভালো উপলব্ধি করতে পারবে না। ৭১ পরবর্তী সময়ের যথার্থ ব্যাখ্যা করার জন্য তাঁর লিখা “বাংলাদেশে স্বৈরতন্ত্রের জন্ম” বইটি আমায় প্রেরণা যোগায়। তাই এই বইয়ের অনেক অংশ সংযোজন করার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছি। 

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা হিসেবে শৈশব থেকেই পিতার রাজনৈতিক জীবনের সান্নিধ্য ও শিক্ষা-দীক্ষা শেখ হাসিনার মেধা-মননকেও পরিপুষ্ট করেছে। অপরদিকে রাজনীতি ছাড়াও পরিবারের বড় মেয়ে হবার সুবাদে পিতার কাছে সকল কিছুর সমূহ উত্তর ও সমাধান তিনি পেতেন, খুব কাছ থেকে অবলোকন ও উপলব্ধি করেছেন বাবা ও মার সংসার, দল থেকে শুরু করে কিভাবে সমস্ত কিছুর সঠিক দেখভাল করতেন, তাই বলাই যায় স্বাধীনতা পরবর্তী সময় যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে বঙ্গবন্ধু যে সকল পদক্ষেপ নিয়েছিলেন তা অনেক কাছ থেকে অবলোকন করেছেন তাঁর কন্যা হাসু বঙ্গকন্যা (শেখ হাসিনা)।

উল্লেখ করা প্রয়োজন, “বাংলাদেশে স্বৈরতন্ত্রের জন্ম” বইটিতে তিনি বলেন,

“পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে গণতন্ত্রকে কখনই স্থিতিশীল হতে দেওয়া হয়নি। তার জন্য প্রথম থেকেই সোচ্চার হয়েছিল এই বাঙালি জাতি। ১৯৫৮ সালে সেনাপ্রধান আইয়ুব খান অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের যে প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন এবং বাঙালি জাতিকে শাসন ও শোষণের যাঁতাকলে নিষ্পেষিত করবার জন্য যে স্বৈরতন্ত্রের পত্তন করেছিলেন তারই বিরুদ্ধে বাংলার জনগণ দীর্ঘদিন রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম করেছিল।”

“জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন অব্যাহতভাবে পরিচালিত করেন। আর এজন্য তাকে অনেক অত্যাচার নির্যাতন জেল জুলুম মিথ্যা মামলার হয়রানি সহ্য করতে হয়েছে। এমন কি মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে অকুতোভয় নেতা দেশ ও জাতির মুক্তির সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছিলেন বলেই তার আজীবনের স্বপ্ন স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা বিশ্বের মানচিত্রে স্থান পেয়েছে। অনেক ত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে প্রাপ্ত স্বাধীনতাকে অর্থবহ করে তোলার জন্য অর্থনৈতিক মুক্তির কর্মসূচি দিয়ে দেশকে যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের  মধ্য থেকে গড়ে তুলে নতুন দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন। স্বাধীন দেশে তখনও আইয়ুব-ইয়াহিয়ার প্রেতাত্মারা দেশের স্বাধীনতাকে ধ্বংস করবার জন্য উঠে-পড়ে লাগে। বঙ্গবন্ধুর বলিষ্ঠ নেতৃত্ব, জনগণের অগাধ বিশ্বাস ও আস্থা, নেতৃত্বের দূরদর্শিতা ও সময়োচিত পদক্ষেপ সব ষড়যন্ত্রকে মোকাবেলা করে যখন দেশকে সঠিক পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল তখন এই ষড়যন্ত্রকারীরা  চরম আঘাত হানে-১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে। আর তারপরই জন্ম নেয় আইয়ুব- ইয়াহিয়া পদাঙ্ক অনুসরণে দেশ শাসনের স্বৈরতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। যে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার জন্য এদেশের মানুষ স্বাধীনতা এনেছে, ত্রিশ লক্ষ মানুষ শহীদ হয়েছে, দু লক্ষ মা-বোন সম্ভ্রম দিয়েছে, সেই স্বাধীনতার মূল্যবোধ নস্যাৎ করে স্বৈরতন্ত্রের জন্ম দেওয়া হল। সামরিক শাসন জারি করে গণতন্ত্রকে কবর দিয়ে বাংলার মানুষকে আইয়ুবী কায়দায় শাসন ও শোষণ করা শুরু হল। যেখানে স্বাধীন দেশে নতুন চিন্তা-চেতনায় আমরা প্রগতির পথে যেতে পারতাম, সেখানে সেই পিছনেই যেতে হল। এই ক্ষমতা দখলের পিছনেও ছিল এক গভীর চক্রান্ত। যে অশুভ শক্তি বাংলার মানুষের স্বাধীনতা চায়নি, বাঙালি বিজয়ী হিসেবে পৃথিবীতে সম্মানিত হোক, বাংলার মানুষের সেই বিজয়ের মুকুটকে ধুলোয় লুণ্ঠিত করবার জন্যই এই চক্রান্ত করা হয়েছিল।”

“আমরা আন্দোলন করেছি পাকিস্তানি সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে। একটা সামরিক জান্তাকে যদি আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে পরিবর্তন করতে পারি তাহলে গণতান্ত্রিক সরকারকে তো পরিবর্তন করা আরও সহজ ছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে সত্য ঘটনা থেকে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে আন্দোলনকে বেশি পরিচালিত করবার চেষ্টা করা হয়েছে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে, মিথ্যা অপবাদ ছড়ান হয়েছে, যার ফলে হয়ত সাময়িকভাবে জনগণকে বিভ্রান্ত করা যায়। কিন্তু মিথ্যা দিয়ে আন্দোলন গড়ে তোলা যায় না।”

“বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধেও মিথ্যা অপবাদ দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করবার চেষ্টা করা হয়েছে কিন্তু গণআন্দোলন গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে। তার কারণ হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর প্রতি মানুষের অগাধ বিশ্বাস ছিল।” “বাংলাদেশে স্বৈরতন্ত্রের জন্ম”

স্বাধীনতা পরবর্তী সময় স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি স্বাধীন বাংলাদেশের ভিতরে কালোবাজারি, অন্তর্ঘাত, লুট, গুম, গুজব, বিদেশে বাংলাদেশ সম্পর্কে নানা রকম মিথ্যাচার, নাশকতামূলক কার্যকলাপ, আওয়ামী লীগের কর্মী হত্যা, করে দেশকে বিষিয়ে তুলে। “বাংলাদেশে স্বৈরতন্ত্রের জন্ম”

এ প্রসঙ্গে ১৯৭৫ এর ২৬ শে মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক জনসভায় বঙ্গবন্ধু বলেন “রাজনীতি করেছি শোষণহীন সমাজ কায়েম করার জন্য। দুঃখের বিষয়, তারা রাতের অন্ধকারে পাঁচজন পার্লামেন্ট সদস্যকে হত্যা করেছে, ৩/৪ হাজারের মতো কর্মীকে হত্যা করেছে। আর একদল দুর্নীতিবাজ টাকা-টাকা পয়সা-পয়সা করে। তবে যেখানে খালি দুর্নীতি ছিল সেখানে গত দুই মাসের মধ্যে অবস্থার কিছু পরিবর্তন হয়েছে। দুর্নীতি বন্ধ করার জন্য আজকে কিছু করা হয়েছে।” (প্রদত্ত ভাষণের অংশবিশেষ)

অভ্যন্তরীণ দুর্নীতির কবলে যখন রাষ্ট্রব্যবস্থা পিষ্ট তখনি ইতিহাসের এই মহানায়ক নিজ দলের ভেতর স্বচ্ছতার আয়না তৈরি করতে চেয়েছিলেন। ১৮ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধুর সভাপতিত্বে মন্ত্রীপরিষদের এক বৈঠকে সকল মন্ত্রীদের সম্পদের হিসাব দিতে বলেন, যা ছিল ইতিহাসের এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ ও দৃষ্টান্ত। জানুয়ারি মাসেই তিনি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘প্রজেক্ট ইমপ্লিমেন্টেশন ব্যুরো’ (পি.আই.বি) গঠন করেন। তথ্যসূত্র: বঙ্গবন্ধু কোষ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান  জীবন ও রাজনীতি ১ম খণ্ড। 

‘বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন ও সংগ্রামেরে একটাই লক্ষ্য ছিল। সে লক্ষ্য ছিল মূলত গরীব-দুঃখী মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করবে। অন্তত প্রতিটি মানুষের জীবনের ন্যূনতম চাহিদা ভাত, কাপড়, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও কাজের ব্যবস্থা করা। আমাদের দেশের মতো অনুন্নত দেশ তদুপরি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ যেখানে নানা সমস্যায় জর্জরিত, সেই দেশে অর্থনৈতিক কর্মসূচি সফল করে দেশের মানুষের চাহিদা মিটিয়ে সমস্যা দূর করার জন্য অবশ্যই ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা প্রয়োজন। সেই লক্ষ্য সামনে রেখেই বঙ্গবন্ধু এক মঞ্চের ডাক দিয়েছিলেন। জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার প্রয়াস নিয়েছিলেন। দলমত নির্বিশেষে সকল শ্রেণী ও পেশার মানুষকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অংশীদারিত্ব দিয়েছিলেন। সকলের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় জাতির অর্থনৈতিক মুক্তি আনতে চেয়েছিলেন’।“বাংলাদেশে স্বৈরতন্ত্রের জন্ম”

যারা বলেন বঙ্গবন্ধু তখন একাই সকল ক্ষমতার অধিকারী হন তাদের লক্ষ্য করা উচিৎ, যুদ্ধ পরবর্তী সমস্যায় জর্জরিত একটি দেশের শুধু সরকার পদ্ধতি পরিবর্তন নয় তার সাথে ব্যাপক অর্থনৈতিক কর্মসূচি সফল করার লক্ষেই পরিবর্তনশীল সাময়িক পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছিলো যার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল স্বচ্ছ ও পার্লামেন্ট দ্বারা সমর্থিত।

পরিবর্তনশীল সাময়িক পরিকল্পনা প্রণয়ন এই কথাটি বুঝতে হলে পার্লামেন্ট দ্বারা সমর্থিত বাকশাল এর গঠনতন্ত্রটি পড়ে সুচারু রূপে উপলব্ধির প্রয়োজন যে কি লিখা ছিল তাতে? 

একটা মানুষ কততা বিষিয়ে উঠলে স্বাধীনতা পরবর্তী সময় বলতে পারেন "এই ঘুনে ধরা সমাজকে আমি চরম আঘাত করতে চাই... যে আঘাত করেছিলাম পাকিস্তানীদের সে আঘাত করতে চাই এই ঘুনে ধরা সমাজ-ব্যবস্থাকে..." । কেনই বা স্বাধীন বাংলার বন্ধু উপাধি পাওয়া মানুষটি এমন মন্তব্য করলেন স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে? কি ইঙ্গিত করেছিলেন তিনি এই কথার মাধ্যমে? এই কথাটি উপলব্ধি করলেই বুঝতে পারা যায় পরিবর্তনশীল সাময়িক পরিকল্পনা প্রণয়ন করার প্রয়োজনীয়তা। তিনি উপলব্ধি করেন তাঁকে একাই প্রবল শক্তি প্রয়োগ করে এদের নির্মূল করতে হবে। আর তাতেই আঁতে ঘা হয়ে যায় ঘুনে ধরা সমাজের।

স্বার্থান্বেষী চরম আঘাত পাওয়া সেই মহল যার ভুল ব্যাখ্যা তৈরি করে অপপ্রচার চালায়, এবং তাঁরা সফল ও হয়। তারা তাদের নিজ স্বার্থ রক্ষার লক্ষে স্বাধীনতা পূর্বেও উল্লেখযোগ্য ছিলেন বোধ করি সফলতার সহিত এখনো বিদ্যমান।

উল্লেখ করা প্রয়োজন, বাকশাল শব্দটির পূর্ণ অর্থবহ অবস্থান স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকে এখনো অনেকের অজানা। কারণ সে সময়কাল থেকে এই শব্দটিকেই বিষিয়ে তলে একটি স্বার্থান্বেষী কুচক্রি মহল। বলতে গেলে সে সময় থেকে এখনো অনেকেরই অজানা বাকশাল এর গঠনতন্ত্র ও দূরদর্শী ফলপ্রসূ পক্রিয়া সম্পর্কে।  

“আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় ছিল তখন আওয়ামী লীগকে নিয়েই করা হয়েছিল ও ক্ষমতা আওয়ামী লীগ একদল হিসেবেই ভোগ করত। কিন্তু বঙ্গবন্ধু যখন ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ’ গঠন করলেন এবং চতুর্থ সংশোধনী পাশ করলেন তখন ‘আওয়ামী লীগ’ আর একদল সরকার গঠন করলেন না। বরং সরকারের বাইরে যেসব রাজনৈতিক দল অবস্থান করছিল তাদের সহযোগে সরকার গঠন করলেন। বহু দলের সমাবেশ এক মঞ্চে করে জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি করে নতুনভাবে সরকার গঠন করা হল। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় সকল দলের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠিত হল। এখানেই ছিল বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শিতা এবং উদার বিশাল হৃদয়ের পরিচয়।” “বাংলাদেশে স্বৈরতন্ত্রের জন্ম”

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান  ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দের ২৬ শে মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক জনসভায় বলেন, “…কিন্তু একটা কথা এই যে নতুন সিস্টেমে যেতে চাচ্ছি, তাতে গ্রামে গ্রামে বহুমুখী কো-অপারেটিভ করা হবে। ভুল করবেন না। আমি আপনাদের জমি নেব না। ভয় পাবেন না যে জমি নিয়ে যাব। তা নয়। পাঁচ বৎসরের প্ল্যানে বাংলাদেশের পঁয়ষট্টি হাজার গ্রামে একটি করে কো-অপারেটিভ হবে। প্রত্যেকটি গ্রামে এই কো-অপারেটিভের জমির মালিকেরা থাকবে। কিন্তু তার ফসলের অংশ সবাই পাবে। প্রত্যেকটি বেকার, প্রত্যেকটি মানুষ – যে মানুষ কাজ করতে পারে, তাকেই কো-অপারেটিভের সদস্য হতে হবে। এগুলি  বহুমুখী কো-অপারেটিভ হবে। পয়সা যাবে তাদের কাছে, ফারটিলাইজার যাবে তাদের কাছে, টেস্ট রিলিফ যাবে তাদের কাছে, ওয়ার্কস গ্রোগ্রাম যাবে তাদের কাছে। আস্তে আস্তে ইউনিয়ন কাউন্সিলে যারা টাউট আছেন তাদেরকে বিদায় দেওয়া হবে।…’

আজকে আমার একটি মাত্র অনুরোধ আছে আপনাদের কাছে, আমি বলেছিলাম ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলতে, জেহাদ করতে হবে, যুদ্ধ করতে শত্রুর বিরুদ্ধে। আজকে আমি বলব বাংলার জনগণকে- এক নম্বর কাজ হবে, দুর্নীতিবাজদের বাংলার মাটি থেকে উৎখাত করতে হবে। আমি আপনাদের সাহায্য চাই। গণ-আন্দোলন করতে হবে, আমি গ্রামে গ্রামে নামব। এমন  আন্দোলন করতে হবে যে ঘুষখোর, যে দুর্নীতিবাজ, যে মুনাফাখোর, যে আমার জিনিস বিদেশে চোরাচালান করে দেয় তাদের সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে।

দ্বিতীয় কথা, আপনারা জানেন আমার দেশের এক একর জমিতে যে ফসল হয়, জাপানের এক একর জমিতে তার তিন গুণ বেশি ফসল হয়। কিন্তু আমার জমি দুনিয়ার সেরা জমি। আমি কেন সে জমিতে ডবল ফলাতে পারব না, দ্বিগুণ করতে পারব না, কেন ভিক্ষা করতে হবে!
আমি চাই বাংলাদেশের প্রত্যেক কৃষক ভাইয়ের কাছে, যারা সত্যিকার কাজ করে, যারা প্যান্ট পরা কাপড় পরা ভদ্রলোক, তাদের কাছেও বলতে চাই, জমিতে যেতে হবে। ডবল ফসল করুন। প্রতিজ্ঞা করুন আজ থেকে ঐ শহীদদের কথা স্মরণ করে ডবল ফসল ফলাতে হবে।

ভাইয়েরা আমার, একটা কথা ভুলে গেলে চলবে না যে প্রত্যেক বৎসর আমাদের ৩০ লক্ষ লোক বাড়ে। আমার জায়গা হল ৫৫ হাজার বর্গমাইল। যদি আমাদের প্রত্যেক বৎসর ৩০ লক্ষ লোক বাড়ে তাহলে ২৫/৩০ বৎসরে বাংলার কোন জমি থাকবে না হালচাষ করার জন্য। বাংলার মানুষ বাংলার মানুষের মাংস খাবে। সে জন্য আমাদের পপুলেশন কন্ট্রোল, ফ্যামিলি প্ল্যানিং করতে হবে। এটা হল তিন নম্বর কাজ। এক নম্বর দুর্নীতিবাজদের খতম করা। দুই নম্বর হল কলকারখানায়, ক্ষেতেখামারে প্রোডাকশন বাড়ানো। তিন নম্বর হল পপুলেশন প্ল্যানিং। চার নম্বর হল জাতীয় ঐক্য। জাতীয় ঐক্য গড়ার জন্য এক দল করা হয়েছে।

আমরা তো কলোনি ছিলাম। দুই শ’ বছর ইংরেজদের কলোনি ছিলাম। পঁচিশ বছর পাকিস্তানিদের কলোনি ছিলাম। আমাদের তো সব কিছুই বিদেশ থেকে কিনতে হয়। কিন্তু তারপর বাংলার জনগণ কষ্ট করে কাজ করতে আরম্ভ করেছে। কিন্তু তারা তাদের এগোতে, কাজ করতে দেয় না। আরেক বিদেশি সুযোগ পেল। তারা বিদেশ থেকে অর্থ এনে বাংলার মাটিতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করল। স্বাধীনতাকে নস্যাৎ করবার দরকার ছিল না। কিন্তু আমার চোখের সামনে মানুষের মুখ ভাসে। আমার দেশের মানুষের রক্ত ভাসে। আমার চোখের সামনে আমারই মানুষের আত্মা। আমার চোখের সম্মুখে সে সমস্ত শহীদ ভাইয়েরা ভাসে, যারা ফুলের মতো ঝরে গেল, শহীদ হলো। রোজ কেয়ামতে তারা যখন বলবে- আমরা রক্ত দিয়ে দেশ স্বাধীন করলাম, তোমরা স্বাধীনতা নস্যাৎ করেছ। তোমরা রক্ষা করতে পার নাই, তখন তাদের আমি কি জবাব দেব?

আরেকটি কথা, কেন সিস্টেম পরিবর্তন?  সিস্টেম পরিবর্তন  করেছি দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফুটাবার জন্য। সিস্টেম পরিবর্তন করেছি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য। কথা হল, এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে যে, অফিসে যেয়ে ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে যায়, সাইন করিয়ে নেয়, যেন দেশে সরকার নই। দেখলাম, অনুরোধ করলাম, কামনা করলাম, কেউ কথা শোনে না,  চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনী।

ভাইয়েরা-বোনেরা আমার, আজকে যে সিস্টেম করেছি তার আগেও ক্ষমতা বঙ্গবন্ধুর কম ছিল না। আমি বিশ্বাস করি না ক্ষমতা বন্দুকের নলে। আমি বিশ্বাস করি ক্ষমতা বাংলার জনগণের কাছে। জনগণ যেদিন  বলবে ‘বঙ্গবন্ধু ছেড়ে দাও’, বঙ্গবন্ধু ক্ষমতার রাজনীতি করে নাই। বঙ্গবন্ধু রাজনীতি করেছে শোষণহীন সমাজ কায়েম করার জন্য। দুঃখের বিষয়, তারা রাতের অন্ধকারে পাঁচজন পার্লামেন্ট সদস্যকে হত্যা করেছে, ৩/৪ হাজারের মতো কর্মীকে হত্যা করেছে। আর একদল দুর্নীতিবাজ টাকা-টাকা পয়সা-পয়সা করে। তবে যেখানে খালি দুর্নীতি ছিল সেখানে গত দুই মাসের মধ্যে অবস্থার কিছু পরিবর্তন হয়েছে। দুর্নীতি বন্ধ করার জন্য আজকে কিছু করা হয়েছে।

শিক্ষিত সমাজের কাছে আমার একটি কথা, শতকরা কতজন শিক্ষিত লোক? তার মধ্যে শতকরা পাঁচজন আসল শিক্ষিত। শিক্ষিতদের কাছে আমার একটি প্রশ্ন, আমি এই যে কথা বলছি, আমার কৃষক দুর্নীতিবাজ? না। আমার শ্রমিক? না। তাহলে ঘুষ খায় কারা?  ব্ল্যাক মার্কেটিং করে কারা?  বিদেশি এজেন্ট হয় কারা?  বিদেশে টাকা চালান করে কারা?  হোর্ড করে কারা?  এই আমরা, যারা শতকরা পাঁচজন শিক্ষিত। এই আমাদের মধ্যে আছে ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ। আমাদের চরিত্র সংশোধন করতে হবে, আত্মশুদ্ধি করতে হবে। দুর্নীতিবাজ শতকরা পাঁচজনের মধ্যে, এর বাইরে নয়।” “বাংলাদেশে স্বৈরতন্ত্রের জন্ম”

৩০ মার্চ বঙ্গবন্ধুর পিতা শেখ লুৎফর রহমান ধানমন্ডিতে ৩২ নং সড়কের বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। অসুস্থ অবস্থায় শেখ লুৎফর রহমানকে ১২ মার্চ ১৯৭৫ খুলনা থেকে নিয়ে এসে ঢাকার তৎকালীন পিজি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বঙ্গবন্ধুর পিতা মৃত্যুকালে যে টাকা রেখে গিয়েছিলেন, বঙ্গবন্ধু সেটা তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক নুরুল ইসলামকে দেন এবং তা পিজিতে গরীব মেধাবীদের বৃত্তি প্রদানের জন্য ‘শেখ লুৎফর রহমান ফান্ড’ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। সামরিক স্বৈরশাসকরা এক লক্ষ টাকার সেই ফান্ডটি পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর স্থগিত করে রাখে।  তথ্যসূত্র: আলোকচিত্রে বঙ্গবন্ধু

১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ এই সময়ের মধ্যে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি জাতিকে স্বাধীনতার পূর্ণ সাধ গ্রহণের লক্ষ্যে বহির্বিশ্ব সহ দেশের অভ্যন্তরে ব্যাপক পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন। আজীবন লালিত স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণে দলমত নির্বিশেষে সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে তোলেন, সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির আশায়। পূর্বের বিশ্বাস আর নীতিতে অটল থেকে এই মহান নেতা সর্বস্তরের অভূতপূর্ব সাড়া পান গুটি কয়েক স্বাধীনতাবিরোধী লোভী ও স্বার্থান্বেষী মহল ব্যতীত। স্বল্প সময়ের শাসনামলে দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক অবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়। কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতে উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। চোরাকারবারি বন্ধ হয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে কৃত্রিম খাদ্য সংকট নিয়ন্ত্রণের ফলে দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার আওতায় চলে আসে। 

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের স্বপ্ন নিয়ে স্বাধীন প্রজন্মের প্রতিনিধি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলার আপামর জনতা যখনি অগ্রসর হতে থাকে ঠিক তখনি অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে বাঙালির স্বপ্নগুলো নস্যাৎ করে দেয়া হয়। সেদিন স্বাধীনতাকামী সোনার বাংলার সেই সোনার মানুষগুলো ভাবতেই পারে নি, যে বীর বাঙালিকে বর্বর পাকিস্তানিরাও হত্যা করতে তাদের আত্মা কেঁপে উঠত, তাঁকেই এই বাংলার বুকে নৃশংসভাবে নিস্তব্ধ করে দেয়া হবে। স্বাধীন বাঙালি আবার নিজ গৃহে পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে স্বপ্নহীন জাতিতে পরিণত হয়।

সাযিদ আল মামুন
লেখক ও গবেষক, সদস্য, বাংলাদেশ ইতিহাস সমিতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।