ঢাকা, রোববার, ১৭ অক্টোবর ২০২১, ২ কার্তিক ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড : ষড়যন্ত্র ও প্রেক্ষাপট-দ্বিতীয় পর্ব

সাযিদ আল মামুন
প্রকাশিত: ০৭ আগস্ট ২০২১ শনিবার, ০৮:০০ এএম
বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড : ষড়যন্ত্র ও প্রেক্ষাপট-দ্বিতীয় পর্ব

শুক্রবার, ২৯ শ্রাবণ ১৩৮২, ১৫ আগস্ট, ১৯৭৫

১৫ আগস্টের ভোরে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজ বাসভবনে সেনাবাহিনীর কতিপয় উচ্চাভিলাষী দুষ্কৃতিকারী, লোভী, বিশ্বাসঘাতক অফিসারদের হাতে শহীদ হন।

সেদিন সূর্য উঠার আগেই ধানমণ্ডি ৩২ নং সড়কে সামরিক জীপ ও ভারী ট্যাংক নিয়ে উপস্থিত হয় সেনাবাহিনীর কতিপয় উচ্চাভিলাষী দুষ্কৃতিকারী, লোভী, বিশ্বাসঘাতক অফিসার। উপর্যুপরি গুলি করতে থাকে ও ট্যাংক থেকে শেল নিক্ষেপ করতে থাকে, শুরু হয় ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড।

৩২ নম্বর বাড়ির দোতলা থেকে নেমে আসার সময় সিঁড়িতেই গুলি করে হত্যা করা হয় সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। রক্তে ভেসে যায় ৩২ নম্বরের বাড়ির সিঁড়ি। এরপর ঘাতকরা একে একে হত্যা করে বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী মহীয়সী নারী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুননেছা মুজিব, বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ পুত্র সন্তান মুক্তিযোদ্ধা ছাত্রনেতা শেখ কামালমেজো ছেলে শেখ জামাল ও মেহেদীর রঙ হাতে নব পরিণীতা দুই পুত্রবধূ সুলতানা কামাল (খুকু) ও পারভীন জামাল (রোজী) কে। শেখ রাসেলকে ঘাতকেরা মায়ের কাছে যাবার জন্য কান্না করলে, নিয়ে যাবার মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে বাবা ও ভাইয়ের লাশের পাশ কাটিয়ে মায়ের লাশের পাশে এনে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় দশ বছরের ছোট ছেলে, শিশু শেখ রাসেলকে। জঘন্য এই হত্যাকাণ্ডের পর ঘাতকরা প্রকাশ করে রাসেলকে তারা Mercy Murder (দয়া করে হত্যা) করেছে। শহীদ হয় বঙ্গবন্ধু পরিবারের আট জন।

আক্রমণের কথা শুনে রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তার কথা ভেবে ছুটে আসলে নিরাপত্তা কর্মকর্তা সামরিক সচিব ব্রিগেডিয়ার  জামিল আহমেদকে বঙ্গবন্ধুর ভবনে  পৌঁছার আগেই  পথ রোধ করা হয় ও  গুলি করে নির্মম  ভাবে হত্যা করা হয়। ১৫ই আগস্ট সকালে বাড়ির সামনে লাইনে দাড় করিয়ে হত্যা করা হয় স্পেশাল ব্রাঞ্চের সহকারী দারোগা-৩৭৯ জনাব সিদ্দিকুর রহমান ও  সেনা সদস্য সৈয়দ মাহবুবুল হককে।

একই সঙ্গে ঘাতক চক্র আক্রমণ চালায় মিন্টু রোডে অবস্থিত বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি ও কৃষিমন্ত্রী  আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের বাসায়। হত্যা করে আবদুর রব সেরনিয়াবাত সহ তাঁর পাশে থাকা ১৪ বছরের ছোট মেয়ে নবম শ্রেণির ছাত্রী বেবী সেরনিয়াবাত ও চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র ১২ বছরের পুত্র আরিফ সেরনিয়াবাত, ৪ বছরের নাতি আবুল হাসনাত আবদুল্লাহর বড় ছেলে সুকান্ত আব্দুল্লাহ বাবু, আবদুর রব সেরনিয়াবাতের বড় ভাইয়ের ছেলে শহীদ সেরনিয়াবাত ও কিশোর ভাগিনা নান্টূ এবং বেড়াতে আসা আত্মীয় আব্দুল নঈম খান রিন্টু সহ আরও দু-জন অতিথিকে। এছাড়াও কাজের লোক পটকা এবং লক্ষ্মীর মাকেও হত্যা করে তারা।

ঘাতকরা শেখ ফজলুল হক মণির ধানমন্ডির (রোড নং-৫/এ বাসা নং-৬১) বাসায়ও আক্রমণ চালায়। বুলেটের আঘাতে হত্যা করা হয় শেখ মণি ও তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী বেগম আরজু মণিকে।  

ঐ দিন ঘাতকের ব্যবহারিত কামান থেকে ধানমণ্ডির ৩২ নং এর বাসায় নিক্ষেপকৃত শেল ছুটে গিয়ে আঘাত করেছিল মোহাম্মদপুর এলাকার নিরীহ মানুষের উপর সেখানে প্রাণ হারায় আরও ১৩ জন। তারা হলেন মিসেস রাজিয়া বেগম, মিসেস আনোয়ারা বেগম (প্রথম), মিসেস আনোয়ারা বেগম (দ্বিতীয়), সাহাব উদ্দিন আহম্মেদ, কসেদা বেগম, মিস ছাবেরা বেগম, আমিন উদ্দীন আহম্মেদ, ময়ফুল বিবি, নাসিমা, হাবিবুর রহমান, আব্দুল্লাহ, রফিজল এবং সাফিয়া খাতুন।  

উল্লেখ করা প্রয়োজন স্বাধীনতাবিরোধী লোভী ও স্বার্থান্বেষী মহল হত্যা করলো এমন একজন নেতৃত্বকে যার শূন্যতা পূরণ করা কোন কালে সম্ভব নই। যিনি স্বাধীনতা পরবর্তী এক বছরের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি মৌলিক ও সর্বাধুনিক সংবিধান উপহার দিয়েছিলেন যা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল ঘটনা। স্বাধীন বাঙালি আবার নিজ গৃহে পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে স্বপ্নহীন জাতিতে পরিণত হলো। বর্তমান প্রজন্মকে মনে রাখতে হবে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দৈহিক বিদায় হলেও তাঁর আদর্শ, আত্মত্যাগ, মনন চিন্তা ও দর্শনের মৃত্যু হয় নি হবেও না। তিনি জ্যোতির্ময়, চিরঞ্জীব বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা। কেননা তিনি বাঙালি জাতির জন্য স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র-যন্ত্র এবং তা বাস্তবায়নের সুদুরপ্রসারি পরিকল্পনা ও অসংখ্য রাজনৈতিক নেতৃত্ব সৃষ্টি করে গেছেন। যাদের নেতৃত্ব আর অক্লান্ত পরিশ্রমে নানান চক্রান্তের পরেও আজও স্বাধীন বাংলার লাল সবুজের পতাকা  বিশ্ব সভায় বিশ্বময়। 

দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে বলতে হয়, এই মহান ত্যাগী নেতা বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর অসাধু শক্তি সেদিন উল্লাস করে। পক্ষান্তরে আত্মস্বীকৃত খুনিদের সঠিক বিচার না করে রেহাই দেবার জন্য ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দের ২৬শে সেপ্টেম্বর এক সামরিক অধ্যাদেশ (ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স) জারি করে ইতিহাসের বিশ্বাস ঘাতক খোন্দকার মোশতাক, যে কিনা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পরপরই নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করে। মীরজাফর ও বিশ্বাসঘাতকতা করে রেহাই পায় নি তেমনি ক্ষমতার লোভে অন্ধ বিশ্বাসঘাতক মোশতাকও তিন মাসের অধিক টিকে থাকতে পারেন নি ক্ষমতায়।

অন্যদিকে সরকার ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মসূচি পদ্ধতির চতুর্থ সংশোধনী থাকা অবস্থায় অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে জেনারেল জিয়াউর রহমান সামরিক শাসনের মাধ্যমে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে। সরকার পদ্ধতি ঠিক রেখে অধিকতর সংশোধনী এনে স্বৈরতান্ত্রিক ধারাকে বলবত করার লক্ষে পঞ্চম সংশোধনী আনা হয়। এবং সেই ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স নামের কুখ্যাত কালো আইন সংবিধানে সংযুক্ত করে সংবিধানের পবিত্রতা নষ্ট করে। হত্যাযজ্ঞের পর বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিদেশে অবস্থিত বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃতও করা হয়।

১৯৭৫ এর ১৫ ই আগস্ট এর সেই কালো রাতের ও পরবর্তী ঘটনা বর্ণনায় “সেই অন্ধকার” অনুষ্ঠানে প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় উঠে আসে বেদনাবিধুর লোমহর্ষক বর্ণনা। উঠে আসে বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় নিয়ে যাবার তাঁর জানাজা পর্যন্ত পরতে দেয়া হয়নি টুঙ্গিপাড়ার সাধারণ মানুষদের এমনকি শেষ দেখাও দেখতে পারেন নি গ্রামের ভীত স্তব্ধ হয়ে পরা মানুষগুলো। কোন রকম রাষ্ট্রীয় মর্যাদা তো দূরে থাক সাধারণ সন্মান টুকুও প্রদর্শন করে নি গাতকের দলে থাকা নিস্থুর হায়না গুলো।     

প্রত্যক্ষদর্শী ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বঙ্গবন্ধুর একান্ত সচিব, ১৯৭৫

প্রত্যক্ষদর্শী শাহরিয়ার জেড আর ইকবাল, বঙ্গবন্ধুর সহকারী একান্ত সচিব, ১৯৭৫

প্রত্যক্ষদর্শী এ. এফ. এম. মুহিতুল ইসলাম, বঙ্গবন্ধুর রেসিডেন্স পি.এ ১৯৭৫।

প্রত্যক্ষদর্শী নাসরিন আহমেদ প্রতিবেশী (সহযোগী অধ্যাপক, ভূগোল বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)।

প্রত্যক্ষদর্শী জিয়াউল হক, ঊর্ধ্বতন চিত্রগ্রাহক, বিটিভি ১৯৭৫। 

প্রত্যক্ষদর্শী নুরুল আলম এস. ডি. পি. ও গোপালগঞ্জ, ১৯৭৫।

প্রত্যক্ষদর্শী ইলিয়াস সরদার টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ

প্রত্যক্ষদর্শী আব্দুল হাই শেখ, টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ

প্রত্যক্ষদর্শী নির্মল, টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ

ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন, বঙ্গবন্ধুর একান্ত সচিব, ১৯৭৫  

 নতুন গণভবন ৷ ১৯৭৩ সনের অক্টোবর মাস থেকে জাতির জনক এইখানে বিকালবেলা অফিসের কাজকর্ম করতেন। ১৪ই আগস্ট উনার সেই শেষরাত্রি যেটা ছিল এই গণভবনে, এবং এই পৃথিবীতে। সেই দিনও তিনি এখানে অনেকসময় কাটিয়েছিলেন, ইনফ্যাক্ট বহুবার বহুকথা বলেছিলেন, অনেক কিছু জানতে চেয়েছেন, যেহেতু ঐ রাতে আমাদের ফেয়ার-ওয়েল ছিল। আমার মনোয়ার ভাই এবং কর্ণেল জামিলের। সেই জন্য তিনি আমাদের অনেককিছু জিজ্ঞেস করলেন  ওই দিন আমাকে বিশেষ ক`রে এবং গভীর মমত্ববোধে ২টি ৩টি ঘটনার কথা উনি জিজ্ঞেস করলেন, বিশেষ ক`রে রাজশাহীতে দু`টো বিয়োগান্ত ঘটনার কথা জিজ্ঞেস করলেন। একটি হলো—পাক বর্বর বাহিনী জোহা হলে বাঙালী নারীর উপর যে অত্যাচার করেছিল,  সেটা খুব কুখ্যাত ঘটনা, এটা সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জানতে চেয়েছিলেন। আরেকটি ছিল– পাকবাহিনী ওইখান থেক রিট্রিট করার সময় রাজশাহীর বহু বিশিষ্ট লোককে হত্যা ক`রে পদ্মার পারে কবর দিয়ে গিয়েছিল, সেটা সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলেন। আর যেটা ঐদিন বিশেষ করে আমার মনে পড়ে সেটা হল, উনি বলেছিলেন যে, “আমার মনে হয় রে ফরাস মাঝে মাঝে যজ আমি গ্রামে চলে যাই গিয়ে একটা আশ্রম খুলি, বাঙালী লোকের জন্য সেবা করার একটা সুযোগ আমি সৃষ্টি করি।"

এই সিঁড়িটার উপরে অনেকদিন উনি বসেছেন, তিনি বসেছেন। এখানটায় বসে বহুসময় কাটিয়েছেন। আরো কিছুলোক তখন ছিলেন, প্রথম দিকে আমি একা ছিলাম, কিছু সময় বসার পরে,  কথাবার্তা বলার পরে,  তিনি নামলেন,  এখানে এই পানিটা তখন আরও অনেক বেশী পরিষ্কার ছিল।

এখানে উনি হাত দিয়ে একরকম আওয়াজ করতেন বঙ্গবন্ধু তখন মাছগুলো সব কাছে আসতো। বঙ্গবন্ধু খাবার দিতেন এবং আমরা দেখেছি অনেক সময় অন্য কেউ খাবার দিতে চাইলে মাছ যেন খেতে চাইত না। বঙ্গবন্ধুর হাতে খাইতে চাইত।

তার পরে উনার বঙ্গবন্ধুর ঐদিন রাতে শেষ যে এপয়েন্টম্যান্টটা ছিল সেটা অবশ্য ঘরের ভেতর ছিল।

 

শাহরিয়ার জেড আর ইকবাল, বঙ্গবন্ধুর সহকারী একান্ত সচিব, ১৯৭৫

 ১৪ ই আগষ্ট ১৯৭৫, সন্ধ্যার পরে বঙ্গবন্ধু এখানে এসেছিলেন, আমি এখানে দাঁড়িয়েছিলাম আমি এবং নেভাল এ ডি সি লেফটেন্যান্ট রাব্বানি আমরা দুজনেই এই জাগাটায় দাড়িয়ে ছিলাম। ভিতরে বঙ্গবন্ধুর সাথে কথা বলছিলেন শিক্ষামন্ত্রী অধ্যাপক মোজাফফর আহম্মদ চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডঃ মতিন চৌধুরী এবং শিক্ষা সচিব মোকাম্মেল হক। আরো পরে এসছিলেন বন্যানিয়ন্ত্রণ মন্ত্রী আব্দুর রব সেরনিয়াবাত। বঙ্গবন্ধু সেদিন কিছুটা আগে তাঁর বাসায় ফিরে গিয়েছিলেন। যতদূর মনে পড়ে, রাত ৮টা থেকে সোয়া আটটার মধ্যে, সম্ভবত ৮টা ৫ হবে,  এই দরজা দিয়ে আস্তে আস্তে বের হয়ে গিয়ে গাড়িতে উঠলেন এবং আমাদের সবার কাছ থেকে চিরাচরিতভাবে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। তবে এটা বলতেই হবে যে ঐ দিন দুপুর থেকেই বঙ্গবন্ধুকে যথেষ্ট বিমর্ষ এবং চিন্তাশীল মনে হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর বাসস্থানে ৩২ নম্বর রোডে যে পি এ ডিউটি করত তারও ডিউটি সেদিন দুপুরে আমি ঠিক করে দিতাম। সেদিন রাতে ডিউটি ছিল আটটার পর থেকে রাতের জন্য মুহিতুল ইসলাম নামে এক অ্যাসিস্ট্যান্ট এর।

  

এ. এফ. এম. মুহিতুল ইসলাম, বঙ্গবন্ধুর রেসিডেন্স পি.এ  

১৯৭৫ রাত সাড়ে আটটা থেকে নয়টার ভিতর বঙ্গবন্ধু গণভবন থেকে চলে এলেন। এসে উপরে উঠে গেলেন। তারপর তোফায়েল সাহেব এসেছিলেন। তোফায়েল সাহেব কিছু কথা বললেন। ওনারা সবাই চলে গেলে। যথারীতি প্রায় সাড়ে বারটা থেকে একটার মধ্যে যেয়ে বিছানায় শুয়ে পড়তেন এবং সেদিনও ঠিক একইভাবে শুয়ে পড়েছিলেন। আমি গেটে এক আর্মি-সিপাহীর সাথে রাত একটা-দেড়টা পর্যন্ত গল্প করে এসে আমাদের নির্ধারিত জায়গায় শুয়ে পড়লাম। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম আমি ঠিক জানিনা। হঠাৎ আমাদের টেলিফোন মিস্ত্রি ছিল, সে মিস্ত্রি এসে আমাকে বলছে, `স্যার, প্রেসিডেন্ট সাহেব আপনাকে ডাকছেন। আমি যে লুংগীপরা অবস্থায় ছিলাম সে অবস্থায় এসে টেলিফোন ধরলাম। আমি টেলিফোন ধরার সাথে সাথে বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘সেরনিয়াবাতের বাসায় আক্রমণ করেছে ইমিডিয়েট পুলিশ কন্ট্রোল রুমকে টেলিফোন কর।` আমি ঠিক টেলিফোন ঘুরাচ্ছিলাম, পুলিশ কন্ট্রোল রুমকে পাচ্ছিলাম না, না পেয়ে আমি গণভবন এক্সচেঞ্জকে টেলিফোন করলাম, ওখানকার টেলিফোন অপারেটর রিসিভ করল। কিন্তু রিসিভ ক’রে কোন কথা বলছিল না, আমি যত বলি “হ্যালো আমি পি.এ-টু-প্রেসিডেন্ট বলছি” ও তত শুধু ‘এ্যা-এ্যা’ এই শব্দ করছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে বঙ্গবন্ধু উপর থেকে গেঞ্জি গায়ে লুংগি পরে নিচে নেমে এলেন। নেমে এসে আমাকে বললেন “কিরে, তোকে পুলিশ কন্ট্রোল রুমে লাগাতে বললাম, লাগালিনা? ” আমি তখন বলেছিলাম, "স্যার আমি কন্ট্রোল রুমকে লাগানোর চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু পাচ্ছি না। আমি গণভবন এক্সচেঞ্জকে পেয়েছি, কিন্তু কথা বলছে না।" তখন উনি রিসিভারটা আমার হাত থেকে নিলেন। নিয়ে উনি নিজেই তখন বলছিলেন,  হ্যালো “আমি প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিব বলছি” ঠিক সেই মূহূর্তে এই পিছনের জানালাতে বৃষ্টির মত গুলি আসতে থাকল। ইতিমধ্যে একটা গ্লাস—এই জানালার বেশ বড় একটা গ্লাস আমার হাতের মধ্যে ফুটলো এবং কেটে প্রচুর রক্ত ঝরছিল। এটা দেখে বঙ্গবন্ধু তাড়াতাড়ি আমার হাত ধ`রে টান দিলেন শুয়ে পড়ার জন্য। কিছুক্ষণ পর গুলি বন্ধ হয়ে গেল। সেই সময় কাজের ছেলে আব্দুল ওপর থেকে উনার পাঞ্জাবী আর চশমা নিয়ে আসে। আমার সামনে দাঁড়িয়ে উনি পাঞ্জাবীটা পরলেন, চশমাটা হাতে নিয়ে গাড়ি বারান্দায় গিয়ে বললেন, “পুলিশ সেন্ট্রি, আর্মি সেন্ট্রি; এত গুলি চলছে, তোমরা কী করছ?” বলে উনি উপরে উঠে চলে গেলেন। তার কিছুক্ষণ পর কামাল ভাই এলেন, নেমে এসে শুধু বললেন, “আর্মি সেন্ট্রি, পুলিশ সেন্ট্রি, কে কে আছেন  আসেন আমার সঙ্গে।” ঠিক সেই মুহূর্তে, আমি এবং ডিএসপি সাহেব উনার পিছনে যেয়ে দাঁড়িয়ে আছি. ঠিক হঠাৎ দেখি ৩-৪ জন কালো পোশাকধারী লোক উনার সামনে এসে হাজির হল। এসেই বলল, “এই শুয়োরের বাচ্চা, সোজা হয়ে দাঁড়া!” বলার সাথে সাথে এই দেখে ডিএসপি সাহেব আমাকে পিছন থেকে টান দিলেন, ঘরের ভিতর আসার জন্য ইঙ্গিত করলেন। প্রায় জোর ক`রে উনি আমাকে ধরে নিয়ে এলেন রুমের ভিতরে, আর ওরা সেই মুহূর্তে কামাল ভাইয়ের পায়ের উপর গুলি করল, কামাল ভাই জাম্প দিয়ে এখানে এসে পড়লেন—ঠিক আমার পাশেই এমনভাবে পড়লেন যে ওনার ধাক্কায় আমিও পড়ে গেলাম, ঠিক আমার বডির হাফ পোর্শন ছিল এই টেবিলের নিচে আর হাফ পোর্শন টেবিলের বাইরে। ঠিক সেই মুহূর্তে কালো পোশাকধারীরা কামাল ভাইকে লক্ষ্য ক`রে ব্রাশফায়ার করল। কামাল ভাইয়ের বুক ঝাঁঝরা হয়ে একটা গুলি লাগল ডিএসপি সাহেবের পায়ে,  আর একটা লাগল আমার। কামাল ভাই এখানেই স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তারপর ডিএসপি সাহেব আমাকে প্রায় টেনে ওনার রুমে নিয়ে গেলেন। ওখানে যেয়ে দেখি এসবি-র এক সাব-ইন্সপেক্টর দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছে, পিস্তলটা তার পায়ের কাছে ফেলানো। আমাদের দু’জনকে ডিএসপি সাহেব প্রায় ধাক্কাতে ধাক্কাতে এই দরজা দিয়ে আমাদের বাইরে নিয়ে গেলো। বাইরে যাওয়ার পর আমাদের তিনজনকে একজন এসে চুল ধরে টেনে তুলল। টেনে তোলার পর আমাদেরকে লাইনে দাঁড় করাল। চেয়ে দেখি ওখানে পুলিশের আরো কিছু লোক লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। আমরাও দাঁড়িয়ে রইলাম। আমাদের ৩-৪ জন সেন্ট্রিকে পাহাড়া দেওয়ার জন্য রেখে গেল, তারপর তারা ভিতরে চলে গেল। আমরা যখন লাইনে দাঁড়িয়ে আছি তখন উপরে বেশ গুলি গোলার শব্দ শুনলাম। একসময় বঙ্গবন্ধুর একটা কন্ঠ শুনলাম যে “আমাকে কোথায় যেতে হবে?”  তার কিছুক্ষণ পরেই প্রচণ্ড একটা ব্রাশফায়ার শুনলাম, তারপর উপরে বেশ নিস্তব্ধতা নেমে এল। কিছুক্ষণ পরে মহিলাদের কান্নার রোল পড়ে গেল। কান্নার পরে প্রচণ্ড ফায়ার হচ্ছিল, তারপর কান্নার আওয়াজগুলো থেমে গেল। কিছুক্ষণ পরে নাসের কাকাকে উপর থেকে নামিয়ে নিয়ে এল। উনি যখন নেমে আসলেন দেখলাম যে, একটা শাড়ির পাড় দিয়ে উনার আঙ্গুলগুলো বাঁধা, তাতে মনে হয়েছিল যে, আঙ্গুলগুলো হয়তো নেই। উনি আমাদের লাইনে এসে দাঁড়ালেন, তখন একজন আর্মি বললো, “চলেন, আপনি ঐ রুমে বসেন,” ব’লে আমাদের লাইন থেকে ঊনাকে আমাদের অফিস রুমের এটাচ্ বাথরুমে নিয়ে এলো নিয়ে এসে ওখানে গুলি করলো। যে গুলি করল, গুলি ক`রে সে আমাদের লাইনের কাছাকাছি এসে আবার দাঁড়াল। কিছুক্ষণ পরে নাসের কাকা `পানি-পানি` বলে চিৎকার ক`রে উঠলেন। তখন আরেকজন বললো, “যা পানি দিয়ে আয়”। তখন যে গুলি করেছিল, সে এসে আবার ফায়ার করল তারপর উনি স্তব্ধ হয়ে গেলেন।  

কিছুক্ষণ পরে দেখি যে রাসেলকে নিয়ে নিচে নেমে আসছে। রাসেল আমাকে দেখে, ও-যে গান পয়েন্টে ছিল ঠিক ভুলে গিয়ে আমাকে এসে জড়িয়ে ধরেছে, ধ`রে বলে, “ভাইয়া আমাকে মারবে না তো?” আমি বললাম, “না ভাইয়া, তোমাকে মারবে না।”

ও যখন আমাকে জড়ায়ে ধরছে, একজন আর্মি ওকে ধরে নিয়ে ঢুকতে গেটের ডানপার্শ্বে যে পুলিশ বাঙ্কারটা, ওখানে ওকে নিয়ে গেল নিয়ে যেয়ে ওখানে আটকে রাখল। একজন সেন্ট্রি ছিল ওখানে। ওখান থেকে ও কান্নাকাটি করছিল যে “আমি মায়ের কাছে যাব”। তখন ওকে ঐ পুলিশ বাঙ্কার থেকে বের ক`রে উপরে নিয়ে গেল। তার কিছুক্ষণ পর বেশ গুলির শব্দ শুনলাম, তারপরে আর সমস্ত স্তব্ধ হয়ে গেল। কর্ণেল জামিল সাহেবের ডেডবডি দেখলাম ওনারই লাল টয়োটা গাড়িতে নিয়ে এলো নিয়ে এখানে রাখলো। ওনার ডেড-বডির পা দুটো গাড়ির বাইরে আর বডির ম্যাক্সিমাম পোর্শনটা গাড়ির ভিতরে। কিছুক্ষণ পরে আব্দুল আর রমাকে নামিয়ে নিয়ে এল আমাদের লাইনে। তখন আমার পায়ে প্রচুর ব্লিডিং হচ্ছিল,  এবং আব্দুলেরও গুলি লেগেছে, তারও খুব ব্লিডিং হচ্ছে। তখন এ বাসায় যে বুড়ি ছিল,  রান্নার জন্য,  সে বুড়ি আর্মিদের কাছে অনুরোধ করছে বারবার যে “দু’টো ছেলে মারা যাচ্ছে, তোমরা তাদের হসপিটালে নিয়ে যাও।” কি মনে করে আব্দুলকে আর আমাকে দু`জনকে দু’গাড়িতে তারপর আমাদেরকে হসপিটালে নিয়ে গেল। তারপর আর বলতে পারব না এ বাড়িতে আর কি হয়েছিল।

 

নাসরিন আহমেদ, প্রতিবেশী (সহযোগী অধ্যাপক, ভূগোল বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)

সেদিন ভোরে আমাদের ঘুম ভাঙ্গল গুলির আওয়াজে। কিছু বুঝবার আগে একদম ঝাঁকে-ঝাঁকে গুলি। এত গুলি যে, মনে হচ্ছিল যে দেয়াল ভেদ ক`রে গুলি আমাদের গায়েই লাগবে। আমরা সবাই তখন হামাগুড়ি দিয়ে বাথরুমে আশ্রয় নিলাম। ঠিক বুঝছিলাম না কী হচ্ছে। গুলি সমানতালে চলে যাচ্ছে। এর মাঝে আমার ছোট ভাই গর্জন ও হামাগুড়ি দিয়েই শোবার ঘরের যে জানালা সেটা দিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে আমাদের এসে বলল যে, আমাদের মাঠে কালো পোশাকধারি বন্দুকধারী অনেক লোক দাঁড়িয়ে আছে এবং তাদের প্রত্যেকেরই মুখ মিরপুর রাস্তার দিকে। আমাদের মনে হয়েছিল এত গুলির মাঝে যেখানে থেকে গুলি হচ্ছে যে হয়ত বঙ্গবন্ধুর বাসায় কেউ আক্রমণ করেছে আর এরা আসছে ঐটাকে স্থায়ী করবার জন্য। যাই হোক, আমরা তখনও বুঝছিনা কী হচ্ছে। সমানতালে গুলি চলছে, আমরা সব চুপ ক`রেই বাথরুমের মধ্যে বসে আছি। এর মাঝে একটা ফোন বেজে উঠল, আবার হামাগুড়ি দিয়ে ফোনটা যখন ধরলাম তখন আমার ভাই ফোনটা ধরেছিল, সে ফোনটা করেছিলেন আমাদের এক আত্মীয়, যিনি শেখ মনির বাসার ঠিক উল্টোদিকে থাকতেন এবং তিনি ফোনে বললেন যে, এই মাত্র শেখ মনিকে মেরে ফেলা হয়েছে। ঐ খবরটা শোনার পরে আমরা বুঝলাম যে, কিছু একটা ঘটে যাচ্ছে। এমনি আমরা বাথরুমে বসে আছি। সমানতালে গুলি চলছে। কিছুই বুঝছি না, কী হচ্ছে। অনেকক্ষণ পর মনে হল একেবারে বাড়িঘর কঁপিয়ে মর্টার পড়ার শব্দ। কিছুক্ষণ পরে আবার পরপর দু`টো মর্টার পড়ার শব্দ এবং ঠিক তার পরের মুহূর্তে আমাদের নিচের তলার পেছন দিকে যে রান্নাঘরের দরজা, সেখানে দরজায় খুব ভীষণভাবে কারা যেন বাড়ি মারছিল। হয় বুটের লাথি হতে পারে, বন্দুকের বাট হতে পারে, জানি না আমরা কিন্তু বিকট শব্দ হচ্ছিল এবং সেই সঙ্গে চেঁচামেচি যে “তোমরা যারা ভিতরে আছো তারা বের হয়ে আস।” আমরা ঠিক বুঝছি না যে কি করবো! নিজেদের মধ্যেই কথাবার্তা হচ্ছে যে, কী করবো। কে যাবে, কে বের হবে? তার পরমুহূর্তে দেখি তারা সমানতালে চেঁচিয়ে যাচ্ছে যে, “বের হয়ে এসো তোমাদেরকে আর এক মিনিট সময় দিচ্ছি তা না হলে আমরা গুলি করব।” এই গুলি করার সব্দ শুনে শুনে আমরা সবাই সে রাতে বা সেইদিন আমাদের বাসায় আমরা অন্ততপক্ষে ১০ ১২ জন ছিলাম, আমরা সবাই লাইন ক`রে নিচের তলায় নেমে এলাম, দরজাটা খুললাম। খুলেই দেখি আমাদের সামনে কালো পোশাকের জওয়ানরা রয়েছেন, বেশ মেজাজ তাদের খুব উগ্র, এবং আমাদেরকে প্রথমেই তারা রেগেই বললেন যে, “এত দেরি করছিলে কেন দরজা খুলতে?” তারপরে আমাদেরকে বলা হল, ‘লাইন ক`রে দাঁড়াও`। এখন `৭১ থেকে ৭৫ মোটে ৪ বছরের সময়ের ব্যবধান। খুব স্পষ্ট মনে আছে  একাত্তরে যে লাইন ক`রে দাঁড়ানো মানে ব্রাশফায়ার। আমিও তখন আমার ছোট ছেলেটাকে কোলে নিয়ে, ছোট বোনকে হাতে করে তখন আমি তাদেরকে বলছিলাম “প্লিজ আমাদেরকে মারবেন না।” বলে, “আপনাদের ভয় কিসের? আপনারা লাইন করে দাঁড়ান।” আমরা লাইন ক`রে দাঁড়ালাম এবং লাইন  করিয়েই আমাদেরকে পেছনের বাসায় নিয়ে আসা হল, যে বাসায় তখন কেউ থাকত না। বাসায় এনে বারান্দায় এনে বলল যে, “আপনারা এখানে বসেন।” গোটা বারান্দাটায় ধুলো জমে আছে। সে ধুলোর মাঝে আমরা সব  চুপচাপ বসে পরলাম। এই বারান্দা থেকেই দোতলা এবং বঙ্গবন্ধুর বাসা স্পষ্টই দেখা যেত। তখন এখনকার মত এত গাছপালা ছিল না। এবং আমরা যখন বসে আছি গুলি আর মর্টারের শব্দে যখন  মনে হচ্ছিলো যে হয়ত গোটা বাসাটাই নাই বা ধ্বংস হয়ে গেছে। ঠিক তখন বাড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখছি যে বাড়িতে এত গুলি করল বা মর্টার যে পড়ল তার কোন চিহ্নই কোনখানে দেখা যাচ্ছে না। আমরা তখনও ঠিক বুঝছিনা  যে, কী হয়েছে ব্যাপারটা। আমরা সব বসে আছি লাইন ক`রেই বসে আছি এবং আমাদের গোটা বাড়িটা জুড়ে সেই কালো পোশাকের জোয়ানরা চারপাশে আনাগোনা করছে।  সামনের গেট দিয়ে আসছে, মাঝে যে ছোট গেটট সেই গেটের ভিতর দিয়েও আনাগোনা করছে। সেদিন এত গোলাগুলি হয়েছিল যে, আমরা বঙ্গবন্ধুর বাসার কিন্তু কোন চিৎকার শুনি নাই। তবে বারান্দায় যখন বসেছিলাম, বলতে পারব না ঠিক কখন ভোর হয়ে এসছে, চারদিকে বেশ আলো হয়ে আসছে। ঠিক তখন কী একটা মেয়েকণ্ঠের আর্তনাদ শুনি এবং কেমন হু-হু শব্দ জানি কান্নাটা, হু-হু ক`রে বেশ অনেকক্ষণ টেনে কান্নাটা ধরে রাখা এবং তারপরে কিন্তু দু`টো গুলির শব্দ এবং তারপরে সবকিছু চুপ হয়ে গেল। একদম স্তব্ধ যেটাকে বলে। আমরা চুপ ক`রে বারান্দায় বসে আছি, সবারই আনাগোনা দেখছি। এর মাঝে আমাদের গেটের সামনে দিয়ে ঠিক রাস্তার উপর দিয়ে একটা ট্যাঙ্কও ঘড়ঘড় ক`রে চলে গেল। এর সাথে সাথে আরো অনেক জওয়ান আসতে শুরু করল এই গেটের ভিতরে। প্রত্যেকেই কিন্তু কালো কাপড়ে এবং বন্দুক হাতে ক`রে এবং তারা বঙ্গবন্ধুর বাসায় আনাগোনা করছেন। আমরা তখনও জানি না, কী হয়েছে। এর মাঝে যেটা বললাম যে, বঙ্গবন্ধুর বাসার বারান্দাটা দোতলার বারান্দাটা তখন স্পষ্ট দেখা যেতো। সেখানে দেখি যে কয়েকজন জওয়ান দাঁড়িয়ে আছে এবং আমাদের সামনে যারা ছিল, আমাদের এখানেও দু`জন সেন্ট্রি দিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তাদের মধ্য থেকে একজন হাত ইশারা ক`রে দেখাচ্ছেন যে কী হয়েছে। অনেকটা হাত ইশারা ক`রে। এবং আমরা দেখছি,  সেই লোকটা সেখান থেকে বলছে যে আঙুল হাতটা উঠিয়ে `আটটা` ঠিক এমনি করে হাতটা দেখিয়ে একরম ক’রে, এইটাও আমরা দেখেছি। দেখেই মানে অনুভুতি যে তখন কী হয়েছে আমরা বলতে পারব না। আমরা সব চুপ। বিশ্বাসই হচ্ছে না। ওদেরকে আমরা জিজ্ঞেসও করছি না, চুপচাপ বসে আছি সেখানটায়। আমরা যে সময় বারান্দায় বসেছিলাম আমাদের দুইদিকেই দু’জন সেন্ট্রি ছিল, সারাটাক্ষণ সেন্ট্রি ছিল। তার মধ্যে একজন ছিল একটু রুক্ষ্ মেজাজের একজন ছিল অনেকটা নরমি, কারণ তাকে দেখলাম সে একবার আরেকজনকে তার বদলি দিয়ে নিজে বঙ্গবন্ধুর বাসায় ভেতরে গিয়েছিল এবং বেশ কিছুক্ষণ পর যখন ফিরে এলো ফিরে এসেই কিন্তু আমাদের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল কিছুক্ষণ। তারপর বন্দুকটা ধরে, বন্দুকটাকে ঠিক এম্নি ক`রে ধরে মাথাটা নিচু ক`রে সে বসে পড়ে। এবং বসে পড়ে বলে, “উফ! এতো রক্ত!” এই প্রথম বুঝলাম যে, রক্তাক্ত কিছু একটা ওখানে কিন্তু ঘটে গেছে এবং তার পরমুহূর্তেই সে আমাদেরকে যেটা বললো সেটা দাঁড়ায় এরকমি যে, তাদেরকে বিউগল বাজার সাথে সাথে তাদের আনা হয়েছে সে অন্তত জানতো না সে কোথায় আসছে। এবং এ বাড়িতে এসে যখন এ বাড়ির দিকে তাক করে তাকে যখন বলা হল যে গুলি করো, সে বলেছে “আমার ইচ্ছা করছিল যে লেকে ঝাঁপ দিয়ে ওপরে চলে যাই।” যাই হোক, এরকম ক`রে সময় বয়ে যাচ্ছে, কখন দুপুর হয়েছে আমরা জানি না, এর মাঝে ওখান থেকে খুনিদেরি  একজন, আজকে নাম নাই বা বললাম, সে এসে আমাদের মাঝে দাঁড়াল। কিছু আমাদের প্রশ্ন করা হলো এবং তারপর আমাদেরকে বলল, বাড়ির ভেতর চলে গিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা শুরু করবার জন্য। আমরা বাড়ির ভিতরে গেলাম। স্বাভাবিক তো আর হওয়া যায় না, কোনরকমে সময় পার হল। এর মধ্যে চেনাজানা যাঁরা ছিলেন সেনাবাহিনীতে, তাঁরা অনেকেই ফোনে খবর নিতে শুরু করলেন, তাঁরা আসলেনও কেউ কেউ। আমরা চেয়েছিলাম যে, সেদিন আমরা এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাব, এ পরিবেশে থাকব না। কিন্তু আমাদেরকে বলা হল,  না,  যতক্ষণ না বারি ঘর সাফ করা হচ্ছে ততক্ষণ আমরা এ রাস্তা থেকে কেউ বের হতে পারব না। অসহায়ের মত সেদিন সারাটা দিন কাটালাম।

 

জিয়াউল হক, ঊর্ধ্বতন চিত্রগ্রাহক, বাংলাদেশ টেলিভিশ

সেদিন সকাল বেলায়, প্রায় সকাল নয়টা কি দশটার সময়, সামরিক বাহিনীর কিছু লোক তারা আমার বাসায় এসে আমাকে তুলে নিয়ে যায়। তাদের প্রত্যেকেরই হাতে রিভালভার নতুবা স্টেনগান। উদ্দেশ্য বঙ্গবন্ধুর এই ৩২ নং বাসায় এসে তাঁদের এ নিহত অবস্থার এই ছবিগুলো তোলা। তখন, বঙ্গবন্ধু যখন এইখানে বা এ ভবনে বাস করতেন, তখন এটা অভ্যর্থনা কক্ষ হিসাবে ব্যবহার করা হত এবং এই দরজা দিয়ে এটাই ছিল মেইন প্রবেশদ্বার। বাইরের লোক এখানে এসে জিজ্ঞাসা ক`রে, সামনে ড্রয়িং রুম, সেই ড্রয়িং রুমে বসত। ঠিক এই কর্নারের মধ্যে এই কোণায় শেখ কামাল বঙ্গবন্ধুর বড় ছেলে, ওনাকে দেখেছি, ওনার মৃত দেহ এখানে পড়েছিল। আর এই সামনে একটা টুল ছিল, এখানে পুলিশের একজন সাব-ইনসপেক্টর, তাঁকে দেখেছি নিহত অবস্থায় পড়ে থাকতে।

আমি যখন এই ঘরে ঢুকি তখন দেখি এই দরজা বন্ধ অবস্থায়, এখানটায় বেগম মুজিব উপুড় হয়ে পড়ে আছেন, নিহত অবস্থায়। অবশ্য আমাকে বলা হল যে আর সামরিক বাহিনীর লোকরা গার্ডে ছিলেন তাঁরা আমাকে বললেন যে, মেয়েদের ছবি তুলবেন না। তো আমি ছবি তুলি নি।

এই কক্ষটা মূলত বঙ্গবন্ধু এবং বেগম মুজিবের শয়নকক্ষ, এখানে কিছু পাইপ-টাইপ রাখা আছে, আমি যখন ভিতরে আসি তখন দেখলাম যে, এই খাট এবং এই সাইড টেবিলের মাঝখানটায় আধাশোয়া অবস্থায় জামালের মৃতদেহ। গুলির চিহ্ন বুকে লাগা,  আর এই দিকে রক্ত বিভিন্ন জায়গায় ছড়ানো, পুরো মেঝের মধ্যেও রক্ত ছিল।

যদিও আমাকে ছবি তুলতে দেয়নি তখন, যেহেতু মেয়েদের ছবি, এবং ‘শেখ সাহেবের পরিবারের বড় বৌ আর মেঝো বউ, শেখ কামালের বৌ সুলতানা এবং রোজী দুজন এখানে এবং মাঝখানট রাসেল। তাদের মৃতদেহ এখানটায় ছিল আমি শুধু দেখছি, আমাকে ছবি তুলতে দেয়া হয়নি।

ঠিক এইখানে আমি বঙ্গবন্ধুর মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখেছি। যখন আমি সিঁড়ি দিয়ে আসি তেনার গায়ে রক্ত, সিঁড়ির একবারে একদিক দিয়ে নেমে নেমে লাস্ট সোপানে গিয়ে রক্তের ধারা পরা আমি বুঝতেই পারিনি প্রায় ৮ কোটি লোকের এরকম নেতা বঙ্গবন্ধু এখানে পড়ে থাকবে। আমি ক্যামেরায় ছবি তুলছি, আমার বিশ্বাস হয় না, তার আগের রাতে সোয়া আটটা পর্যন্ত আমি গণভবনে তাঁর সাথে। সকালবেলা তাঁর সাথে কথা বলেছি এবং এরকম এক মহান ব্যক্তিত্বকে এই সিঁড়ির তিন ধাপে ম্রিত দেহ আমি ভাবতেই পারিনি আমি একবার চশমা খুলি, তাঁকে দেখি, আবার ক্যামেরা দেখি, আ্যাপারচার লাগাই আর সেট করছি আমি ভাবছি, আমি সত্যি দেখছি না মিথ্যা দেখছি? আমি ঘড়িতে হাত দিয়ে দেখছি আমি সত্যিই দাঁড়িয়ে আছি কিনা জীবন্ত একজন মহামানবের মৃতদেহর সামনে। আমি ছবি তুলছি,  আবার তাকাচ্ছি যে, আমি সত্যি দেখছি কিনা, আমি চশমা খুলছি, আবার আ্যাপারচার লাগাচ্ছি, ফোকাস করছি। তারপর দেখছি বঙ্গবন্ধুর, তাঁর সেই গালের এখানকার মোষ, সেটা আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। এবং তিনি আমার মনে হয়  হাত দিয়ে কিছু বলতে চেয়েছিলেন।  হাতে কালো এই জায়গাটা একটা বুলেট লেগে হাতের এ জায়গাটায় আঙ্গুলটা নাই। বুকের ওপর হাতটা রাখা, আরেকটা হাত এ পাশে, উনি শুয়ে আছেন। আটকোটি লোকের নেতা বঙ্গবন্ধু। আমার বিশ্বাসই হয় না যে, তিনি এভাবে পড়ে থাকবেন ।

সমস্ত ছবিগুলো মৃতদেহের ছবি সব তোলার পর আমি এ বারান্দায় আসি। তখন আমাকে বলা হলো যে, “ক্যামেরার ছবিগুলো আমাকে দিয়ে দেন।” তো আমি ঠিক এ বারান্দায় এসে ক্যামেরাটা খুলে সমস্ত আমি ছবিগুলো দিলাম। এই একটা রোল দিলাম, তো বলে, “বাকিটায় কী আছে?" আমি বললাম, “ওগুলো আন-এক্সপোসড ম্যাটারিয়াল" বললো, “ওটাও আমাকে দেন।” ও দুটো সহ আমি তখন সেনাবাহিনীর লোকদের হাতে হস্তাস্তর করলাম।

 

নাসরিন আহমেদ, প্রতিবেশী (সহযোগী অধ্যাপক, ভূগোল বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)

সন্ধ্যার দিকে একটা কথাই মনে হচ্ছিল, সন্ধ্যে হয়ে আসছে। এমনিই মন খারাপ করা একটা সময় ঠিক সেই সময়েই লেকের পাড় থেকে কাঠের ওপরে পেরেক ঠোকার একটা শব্দ শুনছিলাম। দোতলার বারান্দা থেকে তাকিয়ে দেখি সেখানটায় কফিনই হবে হয়তো, আমি ঠিক বলতে পারছি না, কাঠের সব ফালি পড়ে আছে এবং সেখানে কিসব কাজ হচ্ছে। যাই হোক, কোনরকমে রাতটা হোল। ভোরও হলো। ১৬ই আগস্ট। কখন বাড়ি ছাড়বো সে চিন্তাই আমাদের সবার মনে। এর মধ্যে এই  সাড়ে দশটা এগারোটা হবে, আবার বলছি সময় ঠিক বলতে পারবো না, সেই সময়ে আমরা বাড়িটা ছেড়ে চলে যাচ্ছি, এবং যখন যাচ্ছি, তখন বঙ্গবন্ধুর বাড়ির ওপর দিয়েই আমাদের গাড়িটা চলে গেল। দেখলাম যে, তার গেটটা খোলা রয়েছে, এবং গেটের ভিতর থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, একটা কাঠের কফিন এবং তার পাশে স্তূপ ক`রে বরফ।

 

মোঃ নুরুল আলম, এস. ডি. পি. ও গোপালগঞ্জ

 ৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পরদিন সকালবেলা আমি অফিসে যাবার জন্যে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এ সময় টেলিফোন বেজে উঠলো। টেলিফোন ধরতেই অপরপ্রান্ত থেকে বললেন, “আমি ঢাকার এস পি সালাম বলছি, কিছুক্ষণের মধ্যেই বঙ্গবন্ধুর লাশ নিয়ে একটি হেলিকপ্টার টুঙ্গিপাড়া যাবে। আপনি কবর খোঁড়ার ব্যবস্থা করুন। এবং সেখানে নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন আর হেলিকপ্টার যাতে নামতে পারে কোথায় হেলিকপ্টার নামবে, সাদা ফ্লায় করে সেখানে হেলিকপ্টার নামারও ব্যবস্থা করুন।”

 

মোঃ ইলিয়াস মোল্লা, টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ।  

যখন আমরা হেলিকপ্টারের শব্দ পেয়ে ডাকবাংলার কাছে যাই, তখন দেখতেছিলাম যে, ডাকবাংলার উপর দিয়ে আকাশে হেলিকপ্টার চার-পাঁচবার রাউন্ড দিচ্ছে, অরা নামতে সাহস পাচ্ছে না, যেটা আমার মনে হচ্ছিল। তো হেলিকপ্টার যখন একবারে নামে নামে ভাব,  দুই ফুট ওপর থেকেই আবার তারা না নেমেই চলে গেল। এবং পরবর্তীতে যখন আবার রাউন্ড দিয়ে এসে নামতে গেলো তখন আইসে হেলিকপ্টারের জানালার ভিতর থেকেই বলতেছিল, “লোক হাঁকাও।” তখন ঐখানে যে পুলিশ অফিসার ছিল, তদানীন্তন সি আই আবদুর রহমান সাহেব, উনি তখন বাঁশিতে হর্ন দিয়ে সমস্ত লোকজনকে বললো, “আপনারা সব চলে যান এখান থেকে।”

 

মোঃ নুরুল আলম, এস. ডি. পি. ও গোপালগঞ্জ

শূন্যের ওপর দাঁড়ানো অবস্থায় হেলিকপ্টারের জানালা খুলে একজন আর্মি অফিসার মুখ বার ক`রে বললেন যে, `আপনি কে?` আমি বারান্দায় দাঁড়ায় ছিলাম, সেখান থেকে তখন আগায়ে ঠিক হেলিকপ্টারের কাছাকাছি যাবার চেষ্টা করি। এবং ওনাকে বলি যে, আমি মহকুমা পুলিশ অফিসার এসডিপিও বলে নিজেকে পরিচয় দিই। তিনি তখন আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন যে,  এখানে হেলিকপ্টার নামানোর জন্যে সিকিউরড কিনা? তো আমি তাঁকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিলে তখন তিনি হেলিকপ্টার নামালেন। এবং নেমেই আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন যে, কবর খোঁড়া শেষ হয়েছে কিনা আর এলাকায় লাশ ছিনতাই হওয়ার কোন সম্ভাবনা আছে কিনা? তখন আমি ওনাকে আমি ওনাকে বললাম যে, কোন অসুবিধা নাই। আমরা মোটামুটিভাবে থানার পুলিশ এবং ক্যাম্পের পুলিশ দিয়ে সিকিউরড করেছি আরো পুলিশ গোপালগঞ্জ থেকে মধুমতি নদী হয়ে লঞ্চ যোগে আসতেছে।

আব্দুল হাই শেখ, টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ

হেলিকপ্টার আসলো, হেলিকপ্টার আসলে ১৪/১৫ জন লোক সেখানে ছিল আর্মি। ওরা হেলিকপ্টার ল্যান্ড করার পরে তখন ওরা ওখানে লাফ দিয়ে  নামে পইরা পজিশন নেয়। পজিশন নেয়ার পরে আমাদেরকে ডাকে। ডাকবার পরে দরজা খুলে দেয়,  আমরা হেলিকপ্টারে উঠে যাই। হেলিকপ্টারে উঠে যাওয়ার পরে ঐ লাশ নামানোর জন্যে কফিন টানাটানি করি। কিন্তু খুব ভার। বরফের বড় বড় চাকা নামাইতে পারি না। তার কিছু সময় পরে অল্প একটু সময় পরে ইলিয়াস এবং সোহরাব মাস্টার,  তারাও আসে।

 

মোঃ নুরুল আলম, এস. ডি. পি. ও গোপালগঞ্জ

মরদেহ সহ বরফ ভর্তি কফিন অত্যন্ত ভারী ছিল নামাতে খুবই কষ্ট হচ্ছিল। তখন আমরা কষ্ট করে ঐ কফিন নামাই। এই কফিন নামাতে আর্মির হাবিলদারসহ দু`একজন আমাদের সাহায্য করে। আমরা তখন কফিন নামায়ে নিচের দিকে আনি। এটা এত ভারি ছিল যে, চার-ছয়জন লোকে এটা বহন করা খুবই কষ্টকর হচ্ছিল।

 

আব্দুল হাই শেখ, টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ

তখন কিছুদূর পথ এসে নামাই। নামানোর পরে আবার ঘাড়ে নই। ঘারে নিয়ে যখন পুলের ধারে আসি তখন নূরুল হক,  গেদু মিয়া এবং আতিয়ার কাজী ওনারা আইসা আমাদের সাথে শরীক হন।

 

মোঃ নুরুল আলম, এস. ডি. পি. ও গোপালগঞ্জ

পুল পার হবার সময় আমি সে সময় আসা আর্মি অফিসারকে জিজ্ঞাসা করলাম,  আমাদের জানাজা পড়তে হবে কিনা,  না ঢাকা থেকে জানাজা করা হয়েছে? অবশ্য ইতিমধ্যে তিনি আমাদের সিকিওরিটির ওপর সন্তুষ্ট ছিলেন না বলে বেশ কয়েকবার রাগ করেছেন। এ প্রশ্নে উনি অত্যন্ত রেগে যান এবং আমাকে ধমকায়ে উনি বললেন যে, “জানাজা কি ধর্মীয় রীতিনীতির বিরুদ্ধ?  এ-সমস্ত প্রশ্ন করা অবান্তর।" তখন আমি কথা না বাড়ায়ে জানাজা পড়ার জন্য একজন মৌলভী সাহেবকে ডাকতে ওসিকে আবার নির্দেশ দিই।

 

আব্দুল হাই শেখ, টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ

তারপর এখান থেকে বয়ে নিয়ে আমরা (লাশ) জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে নিয়ে আসি। নিয়া আসার পরে ওখানে আইউব আলী মিস্ত্রি এবং আবদুল হালিম মিস্ত্রি ওখানে আইসা উপস্থিত হয়। তারা ঐ কফিন খোলে। খোলার পরে আমরা দেখি যে, বঙ্গবন্ধুর লাশ।

 

মোঃ নুরুল আলম, এস. ডি. পি. ও গোপালগঞ্জ

কফিনের ডালা খুলে পাশে রাখার পর আমরা সবাই ধরাধরি ক`রে বঙ্গবন্ধুর মরদেহকে সে ডালার ওপর রাখি। তারপরে কাফনের যে কাপড় সে কাপড় খুলতেই দেখা গেল যে একটা সাদা কাপড়কে লম্বালম্বি করে বঙ্গবন্ধুর শরীরের ওপর দিয়ে দুই ভাঁজ ক`রে মোড়ায়ে পেঁচায়ে দেয়া হয়েছে। ঐ কাপড় খুলার পরে দেখা গেল, বঙ্গবন্ধুর পরনে পাঞ্জাবী, গেঞ্জি এবং লুঙ্গি আছে। উনি যেন শুয়ে ঘুমাইতেছেন এরকম অবস্থায় তাঁকে দেখা গেল। তারপরে গোসলের জন্য পাঞ্জাবী এবং গেঞ্জী খোলার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু এটা খোলা যাচ্ছিল না। তখন আমাদের একজন ওখান থেকে দৌড়ে পাশের দোকানে চলে গেল। এটা অবশ্য আমার জানা ছিল না, কিন্তু শেখ আবদুর রহমান সার্কেল ইন্সপেক্টর আমাকে এসে বললেন যে,  কাফনের কাপড়ের জন্য পাঁচগাছি বাজারে পাঠাই, কাফনের কাপড় নিয়ে আসুক,  অন্যথায় কাফনের কাপড় পাওয়া যাবে না এখানে। তখন আমি তাকে কাফনের কাপড় আনার জন্য পাঁচগাছি বাজারে যেতে বলি। এবং লোক চলে যায় আনার জন্য। কিছুক্ষণের মধ্যেই থানার ওসি একজন মৌলভি সাহের সহ আরও একজন লোক নিয়ে মোট তিন জন তারা ওখানে আসলেন এবং সাথে সাথে আরও একজন লোক পাশের দোকান থেকে একটা ব্লেড এবং কাপড় কাঁচার একটি ৫৭০ সাবান নিয়ে আসল। এবং মৌলভি সাহেবকে তখন গোসলের ব্যবস্থা করতে বলা হল। এ সময়ে গোসলের পানি আনার জন্য কিছু পাওয়া যাচ্ছিল না। বঙ্গবন্ধুর বাড়ীস্থ গোয়ালঘরে তখন কিছু গরু ছিল এবং ওখানে গরুকে খৈল দেয়ার জন্য, খাওয়ানোর জন্য, কিছু বালতি ছিল। আমাদের ওখান থেকে কয়েকজন দৌড়ে গিয়ে বালতি পরিস্কার ক`রে পাশের টিউবওয়েল থেকে পানি নিয়ে আসলো, এবং মৌলভি সাহেবকে গোসলের এন্তেজাম করতে বলা হ`লে তিনি ব্লেড হাতে নিয়ে কাঁপতে ছিলেন। তিনি ঐ-সময় অত্যন্ত পারপ্লেক্সড্ অবস্থায় ছিলেন। পারতেছিলেন না কোনমতেই রেড কাগজ থেকে খুলে বঙ্গবন্ধুর শরীর থেকে গেঞ্জী খুলতে। তখন আমি ওনার হাত থেকে ব্লেড নিলাম,  ব্লেড নিয়ে নিজে বঙ্গবন্ধুর পরনের পাঞ্জাবী এবং গেঞ্জি বুকের উপর দিয়ে সরাসরি কেটে দু`ভাগ ক`রে দেই। এবং মৌলভি সাহেবকে বলি যে, এবার গোসলের ব্যবস্থা করেন। এ সময় দেখা গেল বঙ্গবন্ধুর সারা বুক ঝাঝরা অবস্থায় ছিল গুলিতে,  ঘাড়ের উপর গুলি ছিল, হাতের মধ্যে গুলি ছিল,  আঙ্গুল একটা অলমোস্ট ছেঁড়া অবস্থায় ছিল। আর পাঞ্জাবীর পকেটে একটা ভাঙা চশমার একটা ভাঙা অংশ এবং পাইপের উনি বঙ্গবন্ধু ঐ পাইপে তামাক খেতেন পাইপের কিছুটা ভাঙা অংশ পকেটের মধ্যে পাওয়া গেল। ঐ গোয়ালঘর থেকে একটা চাটাইয়ের মত এনে বঙ্গবন্ধুর মরদেহকে আড়াল ক`রে গোসলের কাজ চলতেছিল।

 

আব্দুল হাই শেখ, টুঙ্গিপাড়া,  গোপালগঞ্জ

চারজন লোকে গোসল দিছে, বাড়ির ভিতর থেকে পানি এনে দিয়েছে, এখানে যে দোকান ছিল সেখান থেকে ৫৭০ ঐ সাবান নিয়ে আসছে যে মাষ্টার ছিল তার সঙ্গে আরো দু’জন লোক ছিল ইদ্রিস কাজীও খুব সম্ভবত ছিল তারা সাবান নিয়ে আসে। তখন এখানে দোকানপাট ছিল না। তখন কাপড়ের দরকার হলে রেডক্রিসেন্ট হাসপাতালে আমি দৌড়িয়ে যাই ।

 

মোঃ নুরুল আলম, এস. ডি. পি. ও গোপালগঞ্জ

রেডক্রিসেন্ট হাসপাতাল থেকে কয়েকটা শাড়ি নিয়ে আসল। আমার মনে হয় চারটা হবে। তার দুইটা শাড়ির পাড় কেটে তখন কাফনের কাপড় তৈরি করা হল। এ কাপড় দিয়ে বঙ্গবন্ধুর মরদেহকে পরায়ে দেওয়া হল। তারপরে আমরা জানাজা পড়ার অনুমতি নিলাম। তখন জানাজা পড়ার জন্য সেখানে আমরা যারা ছিলাম তারা দাঁড়িয়ে যাচ্ছি। এ সময়ে অখাঙ্কার নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত ইসহাক ফকির পুলিশ ইন্সপেক্টর উনি এসে বললেন যে, পাশে কিছু লোক অপেক্ষা করছে,  জানাজায় অংশগ্রহণ করার জন্য অনুমতি থাকলে তারা আসবে। আমি যখন অনুমতি নিতে গেলাম মেজর সাহেব আবারও রেগে গেলেন। উনি বললেন যে, “কোন লোকজন এখানে আসবে না। এবং জানাজায় বাইরে থেকে লোক এসে জানাজা পড়ার দরকার নেই। যারা আছে তাদের দিয়ে পড়ায়ে মাটি দেবার ব্যবস্থা করেন। বাইরের লোক আসলে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে।” এই আদেশের পরে আর আমরা দেরি না ক’রে তখন সবাই জানাজার জন্য দাঁড়াই যাই।

 

মোঃ ইলিয়াস মোল্লা, টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ।  

এখানকার হুজুর ছিলেন আমাদের শিক্ষক। মৌলভি আবদুল হালিম। উনি এ জানাজা পড়ান।

মোঃ নুরুল আলম, এস. ডি. পি. ও গোপালগঞ্জ

সবাই মিলে ওখানে যাঁরা ছিলেন, প্রায় ২৪-২৫ জন, জানাজায় অংশ নিছেন।  সেখানে কবর যারা খুঁড়েছেন তারা আছেন, মরদেহ যারা বহন করেছেন তাঁরাও ছিলেন। সবাই ধরাধরি ক`রে ডালাসহ লাশকে কবরের পাড়ে নিয়ে যাওয়া হল। এই সময়ে কববরের পারে নিয়ে যাবার পর আমরা সবাই ধরাধরি করে কবরের মধ্যে লাশকে কবরে নামানো হল। এ সময় বঙ্গবন্ধুর বাড়ির পশ্চিম দক্ষিণ কোণে দাঁড়িয়ে একজন মহিলা খুব উচ্চস্বরে কান্নাকাটি করতেছিলেন। উনি বঙ্গবন্ধুর মুখ দেখার জন্য দাবি জানাচ্ছিলেন। এ সময় পিরোজপুর থেকে এ এস পি আনোয়ারুল ইকবাল এসে পৌঁছেছেন। উনিও এসে আমাকে বললেন যে, “আমিও একটু মুখ দেখতে চাই।” তখন লাশ কবরে শুইয়ে দেয়া হয়েছে। তারপর আবার মেজর সাহেবকে গিয়ে বললাম, “স্যার এখানে বঙ্গবন্ধুর একজন আত্মীয় আছেন, যিনি লাশ দেখতে চান,  তো এখন লাশটা দেখানো যেতে পারে।” যখন আমি এরকমভাবে বললাম তখন উনি বললেন যে, “দেখান।” তখন ঐ মহিলাকে কবরের পাড়ে আনা হল এবং এ এস পি আনোয়ারুল ইকবালকেও কবরের পাড়ে আনা হল এবং কবরে শায়িত অবস্থায়ই লাশের মুখ খুলে অনাদেরকে দেখানো হল। তারপরে বঙ্গবন্ধুকে চিরশয়নে শায়িত করা হল।  

আব্দুল হাই শেখ, টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ 

জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর লাশ কবরে নিছি। কবরে দাফন করার পরে ওনার জন্য মোনাজাত করা হয়। তাঁর রুহের মাগফেরাত কামনা করার পরে আমরা অখান থেকে চলে আসব, এ-সময় পথে ঐ বাড়ি থেকে,  আবদুল মন্নাফ নাম,  বঙ্গবন্ধুর বংশের লোক,  ওনাকে ডেকে নিয়ে যায়। নেয়ার পরে ওনার কাছ থেকে তারা একটা সই নেয় যে, “মুজিবুর রহমানের লাশ আমি দিয়ে গেলাম,  আপনি সই করে রাখেন।”

 

মোঃ ইলিয়াস মোল্লা, টুঙ্গিপাড়া,  গোপালগঞ্জ  

কোন লোককেই কবরের কাছে যেতে দেয়া হল না। ডিউটিতে লোক ছিল সিকিউরিটি ফোর্স ছিল যাতে  উনার কবর কেউ জিয়ারত করতে না পারে। কেউ মিলাদ না পরাইতে পারে সেজন্য ধারে-কাছে কাউকেই ঘেঁষতে দেয়া হয় নি।  

  নির্মল, টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ। 

সবাই চইলে যায় বাড়ি কারফিউ দিয়ে দেয়, তারপরে আর্মিগের ভিতর দিয়ে আমি ছিলাম, চারদিনের দিন বঙ্গবন্ধুর ভাই এর বউ ছিল আমার আম্মা আর হাজী সাহেবের স্ত্রী উনি টাকা দিয়ে গেছিল পাঁচশো সেই টাকা দিয়ে মিলেদ দিয়া চার দিনের দিন ছয় জ মুন্সীরে খায়ায়ছিল, সে মিলাদ দিতে দেছিল না পুলিশে, আমাগে মিলাদ দিতে দেছিল না অন্য জাগা অন্য মসজিদে দিছেলাম। চার দিনের পর সেই মিলাদ দিয়া তাঁর পর পুলিশের কি ভাবে কি অত্যাচার অবশ্য মারে নাই কিন্তু তাঁর চেয়ে বেসি গালিগালাজ করছে, কিন্তু কিভাবে যে রয়েছি। তারপর এক বছর পর ১৫ ই আগস্টের পরে ২১ এ ফেব্রুআরি আসলো তখন ফুল দিছিল।    

 

ভিডিও লিংক https://www.youtube.com/watch?v=I17GXQvpscU

১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দের ২৩ জুন “বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ” গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সরকার গঠন করার পর বঙ্গবন্ধু কন্যা বঙ্গকন্যা শেখ হাসিনা তৎকালীন বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের সদস্যগণকে হত্যার বিরুদ্ধে ২ অক্টোবর ধানমন্ডি থানায় এজাহার দায়ের করেন। ১২ নভেম্বর সাংবিধানিক ভাবে জাতীয় সংসদে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়। অবশেষে বহুল আকাঙ্ক্ষিত হত্যাকাণ্ডের বিচার ১ মার্চ ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বিচারকার্য শুরু হয়। বাঙালি জাতি পুনরায় আশায় বুক বাধে। অপেক্ষায় থাকে ইতিহাসের এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচারের। 

শোনো, একটি মুজিবরের থেকে

লক্ষ মুজিবরের কন্ঠস্বরের ধ্বনি, প্রতিধ্বনি
আকাশে বাতাসে ওঠে রণি।
বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ।।

সেদিনের সে হত্যাকাণ্ডের ফলে অপূরণীয় ক্ষতি বাঙালি জাতি আজো ভুলে নাই আজো শোনা যায় এক মুজিব লুকান্তরে, লক্ষ্য মুজিব ঘরে ঘরে।

১৯৭৬ সালে,৭৫ এর ১৫ অগাস্টের পরযুক্তরাজ্যে পালিয়ে যাওয়া খুনি ফারুক-রশিদ হত্যাকাণ্ডের কথাস্বীকার করে যে টেলিভিশন সাক্ষাৎকারদিয়েছিলেন, সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের ধারণ করা সেই সাক্ষাৎকারের ভিডিওসহ ৪৬ ধরনের আলামত অভিযোগপত্রের সঙ্গে আদালতে জমা দেওয়া হয়। সাক্ষী করা হয় ৭৪ জনকে।

১৪ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার তিন প্রধান আসামি লে. কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী তাহের উদ্দিন ঠাকুরকে গ্রেপ্তার করা হয়।

১৯৯৭ সালের ১৫ জানুয়ারি সিআইডি এই মামলায় ২০ জনকে অভিযুক্ত করে মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে চার্জশিট দাখিল করে এবং একই বছরের ১২ মার্চ ছয় আসামির উপস্থিতিতে আদালতে বিচার শুরু হয়। মামলার বিচারের ২০২ কার্যদিবসে মোট ৬১ জনের সাক্ষ্য নেয় আদালত।

বিচারের সব প্রক্রিয়া শেষে ১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর তৎকালীন ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ কাজী গোলাম রসুল (মৃত্যু: ১১ ডিসেম্বর, ২০১৪) বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন। ১৭১ পৃষ্ঠার রায়ে বিচারক ১৮ আসামির মধ্যে ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন। বাকিদের খালাসের রায় দেন তিনি। নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আসামিদের আপিলে ২০০০ সালের ১৪ ডিসেম্বর হাই কোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ বিভক্ত রায় দেয়। বিভক্ত রায় হওয়ায় নিয়মানুযায়ী মামলাটি তৃতীয় বেঞ্চে পাঠান তৎকালীন প্রধান বিচারপতি। তৃতীয় বেঞ্চের রায়ে ১২ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকে।

মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা১২ আসামি- সাবেক মেজর বজলুল হুদা, লে. কর্নেল (বরখাস্ত) ফারুক রহমান, কর্নেল সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, একেএম মহিউদ্দিন (ল্যান্সার), লে. কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ (আর্টিলারি), লে. কর্নেল (বরখাস্ত) খন্দকার আব্দুর রশিদ, মেজর (বরখাস্ত) শরিফুল হক ডালিম, মেজর (অব.) নূর চৌধুরী, রিসালদার মোসলেহ উদ্দিন খান, লে. কর্নেল (অব.) রাশেদ চৌধুরী, ক্যাপ্টেন (অব.) আব্দুল মাজেদ ও লে. কর্নেল আজিজ পাশা (অব.)।

রায়ের আদেশে বলা হয়, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোর ৫টার দিকে ধানমণ্ডির নিজ বাসভবনে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান, তার পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন ও অন্যদের ষড়যন্ত্র ও পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী গুলি করে হত্যা করার অপরাধে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

রায়ে আরও বলা হয়, `ঘটনার পর কোনো কোনো আসামি দেশ-বিদেশে নিজেদের আত্মস্বীকৃত খুনি হিসেবেও পরিচয় দিয়ে দাম্ভিকতা প্রকাশ করে। ঘটনাটি কেবল নৃশংস নয়, এই অপরাধ এমন একটি ক্ষতির কার্য যা শুধু ব্যক্তি বিশেষের জন্য নয়, বরং সমাজ ও রাষ্ট্রের পক্ষেও এটা মারাত্মক ক্ষতি। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহ পরিণতির বিষয় স্বজ্ঞানে তারা ষড়যন্ত্রমূলক ও পরিকল্পিতভাবে এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।`

`সুতরাং, তাদের প্রতি কোনো প্রকার সহানুভূতি ও অনুকম্পা প্রদর্শনের যুক্তি নেই। এই অনুকম্পা পাওয়ার কোনো যোগ্যতাও তাদের নেই। তাদের অপরাধের জন্য তাদের প্রত্যেককে দণ্ডবিধি ৩০২/৩৪ ধারা মতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলো।`

৮ নভেম্বর ১৯৯৮ জেলা ও দায়রা জজ কাজী গোলাম রসুল ১৫ জন খুনির মৃত্যুদণ্ড প্রদান  করেন। হাইকোর্টে মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিলে দুই বিচারক বিচারপতি মোঃ রুহুল আমিন এবং বিচারপতি এ.বি.এম. খায়রুল হক ১৪ নভেম্বর ২০০০ খ্রিস্টাব্দে দ্বিমতে বিভক্ত রায় ঘোষণা করেন। তারপর তৃতীয় বিচারপতি মোঃ ফজলুল করিম ১২ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেন।

ঘটনার নিষ্ঠুর পরিক্রমায় বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় ২০০২-২০০৬ পর্যন্ত মামলাটি কার্যতালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়। জাতির বিবেকের কাছে প্রশ্ন বলতে পারেন কেন ইতিহাসের এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়া কার্যতালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়? বিচারিক প্রক্রিয়া কি চলমান থাকার প্রয়োজন ছিল না?২০০৭ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এরপর পাঁচজন আসামি আপিল বিভাগে হাই কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল করে।