ঢাকা, রোববার, ১৭ অক্টোবর ২০২১, ২ কার্তিক ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পূরণে শেখ হাসিনার সংগ্রাম-তৃতীয় পর্ব

সাযিদ আল মামুন
প্রকাশিত: ০৮ আগস্ট ২০২১ রবিবার, ০৮:০৫ এএম
বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পূরণে শেখ হাসিনার সংগ্রাম-তৃতীয় পর্ব

আবারো অপেক্ষা করতে হয় বাঙালি জাতিকে।

২০০৯ খ্রিস্টাব্দে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে “বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ” ২য় বার সরকার গঠন করার পর মামলাটি শুনানির জন্য বেঞ্চ গঠিত হয়। ২০০৯ খ্রিস্টাব্দের ১৯ নভেম্বর প্রধান বিচারপতিসহ পাঁচজন বিচারপতি রায় ঘোষণায় আপিল খারিজ করে ১২ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন।    

২০১০ খ্রিস্টাব্দের ২ জানুয়ারি আপিল বিভাগে আসামিদের রিভিউ পিটিশন দাখিল এবং তিন দিন শুনানি শেষে ২৭ জানুয়ারি চার বিচারপতি রিভিউ পিটিশনও খারিজ করেন। ঐদিন মধ্যরাতের পর ২৮ জানুয়ারি পাঁচ ঘাতকবজলুল হুদা, ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, একেএম মহিউদ্দিন ও মহিউদ্দিন আহমেদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

বজলুল হুদাকে থাইল্যান্ড ও মহিউদ্দিন আহমেদকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরিয়ে এনে দণ্ড কার্যকর করা হয়। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ঘাতকদের একজন বিদেশে পলাতক অবস্থায় মিত্যু বরণ করেণ এবং ছয়জন বিদেশে পলাতক থাকে।

ফাঁসি কার্যকরের পর  পুলিশের কমিশনার সাবেক আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফোন করে খবরটা জানালেন। শুনে ভারী কন্ঠে শেখ হাসিনা তাকে বললেন, ‘সব দিকে খেয়াল রেখো। মৃতদেহগুলো ঠিকমতো পৌঁছে দিও।’

কিছুটা কলঙ্কমুক্ত হয় ১৫ আগস্টের সেই কালো রাত।

গোয়েন্দা নজরদারিতে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ৭ এপ্রিল ২০২১ ভোরে ঢাকার গাবতলী বাস টার্মিনাল এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় ৭২ বছর বয়সী পলাতক মাজেদকে।

স্বাধীন প্রজন্মের প্রতিনিধি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের বছর ২০২১ খ্রিস্টাব্দের ১২ এপ্রিল ১২টা ১ মিনিটে কেরানীগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মাজেদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়।

মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আগে বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি ক্যাপ্টেন (বরখাস্ত) মাজেদের জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়।

ভিডিও জবানবন্দিতে আত্মস্বীকৃত খুনি মাজেদ বলেন, ‘১৫ আগস্ট ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে জিয়াউর রহমান সাহেব ১০-১১টার দিকে ক্যান্টনমেন্ট অডিটোরিয়ামে সব অফিসার এবং জওয়ানদের এড্রেস করেন। ওখানে উনি মোটিভেট করেন, যে ঘটনা গত রাতে ঘটে গেছে তোমরা সেসব নিয়ে কোনো মাথা ঘামাবে না। তোমরা সব চেইন অব কমান্ডে ফিরে যাও। তোমরা সবাই ফিরে যাও, তোমরা কাজকর্ম কর। এটা জাতির ব্যাপার, আমাদের ব্যাপার না।’

প্রসঙ্গত তিনি উল্লেখ করেন, ‘জিয়াউর রহমানের সমর্থন আছে, না হলে উনি আগ বাড়িয়ে এসব মোটিভেশন কেন করবেন? উনার সমর্থন ছিল তা পরিষ্কার কথা। রেগুলার ওরাই ডিরেক্ট করতো সবকিছু, হুকুম চালাতো ওখান থেকে। ওরা যা চাইতো জিয়াউর রহমান তাই করে দিতেন। এ ধরনের অবস্থা ছিল তখন। এতেই তো সব পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। এরা সব ভিআইপি অবস্থায় ছিল। প্রেসিডেন্টের গেট দিয়ে এরা প্রবেশ করতো। প্রেসিডেন্টের পাশের ভিআইপি স্যুটে মোশতাক সাহেব যে রুমে থাকতেন, সেই পাশে ওরা থাকতো। ওখানেই ওদের সাথে জিয়াউর রহমান সাহেবের কথোপকথন হতো। আর্মির চেইন অব কমান্ড বলতে তখন কিছু ছিল না। ওরাই চালাতো প্র্যাকটিক্যালি। পরে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে আমার একবার সাক্ষাৎ হয়েছিল। আমি সেনা হেড কোয়ার্টারে উনার কাছে সাক্ষাৎকার দিতে যাই। সেখানে উনাকে বললাম, আমার একটা সার্ভিসের বিষয়ে। আমি উনাকে বাইরে সিভিল সার্ভিসের বিষয়ে অনুরোধ করেছিলাম। তখন উনার সাথে আলোচনা হয়েছিল। তখন উনি এ হত্যাকাণ্ড (ক্যু) এর পক্ষপাত সুলভ কথাবার্তা বলছেন। এবং এটাই বোঝা গেছে ক্যুর সমর্থক। ওদের সঙ্গে উনার সবকিছু যোগাযোগ ছিল। পরে বঙ্গভবনে অবস্থানকারী সব সেনা অফিসার ছিল তাদের বিদেশে পাঠানোর সব ব্যবস্থা করেন জিয়াউর রহমান। আমি এগুলো দূর থেকে দেখেছি। উনি সব কাগজপত্র তৈরি করতে মিলিটারি সেক্রেটারি তখনকার ব্রিগেডিয়ার মাশহুর হককে নির্দেশ দিয়েছেন। যেহেতু আমরা বঙ্গভবনে ডিউটিরত ছিলাম সেখানকে আমাদেরকেও ব্যাংককে পাঠিয়ে দিয়েছেন। ব্যাংকক থেকে আমাদের আর ফেরত আনার ব্যবস্থা করা হয়নি। পরে শুনলাম জিয়াউর রহমান সাহেব পুরো ক্ষমতায়। পরে তাদের লিবিয়ায় আশ্রয়ের বন্দোবস্ত করেছেন। পরে শুনলাম তারা জেলখানাতেও জাতীয় চার নেতাকে মেরে ফেলেছে।’

খুনি মাজেদ বলেন, ‘লিবিয়াতে আমরা গিয়েছিলাম। তারপর বলে যে ফরেন সার্ভিস হবে সবার। আমরা শুনি জিয়াউর রহমান সাহেব ফরেন সার্ভিস দেবেন সবাইকে প্রাইজ হিসেবে। সেই সঙ্গে একটা করে প্রমোশন দিয়ে দেবেন। কিছুদিন পরে জিয়াউর রহমান জেনারেল নুরুল ইসলামকে পাঠান। তিনি ওদের সাথে মিটিং করে। জিয়াউর রহমানের পক্ষ থেকে কার কার ফরেন পোস্টিং হবে সেই সব চয়েজ নিতেই উনি গেছেন। জিয়াউর রহমানের ডাইরেক্ট মদদ ছিল ওদের প্রতি। উনি ওদের টোটাল পেট্রোনাইজড করেছেন। একটা করে প্রমোশন জাম্পড করে একটা করে ফরেন প্রাইজ পোস্টিং দিয়েছেন। এসব অফিসার ফরেন সার্ভিসের জন্য উপযুক্ত নয়। তারা গ্রাজুয়েটও না। এতেই বোঝা যায় জিয়াউর রহমান পুরোপুরি ওদের সাথে জড়িত ছিলেন। তাদের জন্য বঙ্গভবন থেকে পাসপোর্ট এমনকি পরিবারও তাদের সাথে পাঠিয়ে দেয়া হয়। যারা বিয়ে করেননি তাদের হবু স্ত্রী, গার্লফ্রেন্ড সবাইকে পাঠিয়ে দেয়া হয়। মেজর শাহরিয়ার বিয়ে করে নাই এক ভদ্রলোকের স্ত্রীকে নিয়ে চলে যান। সেইসব কাগজপত্র তাদের বানিয়ে দেয়া হয়েছে। এই সব সুযোগ সুবিধার জন্য বোঝা যাচ্ছে তিনি (জিয়াউর রহমান) এর সঙ্গে জড়িত। যেহেতু তিনি আর্মি চিফ আর এরা আর্মি অফিসার।’

গ্রেফতারের পর আপিলের সুযোগ হারানো মাজেদ রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করলেও রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ তা খারিজ করে দেন।

মাজেদের ফাঁসিরদণ্ড কার্যকর প্রধান জল্লাদ ছিলেন শাহজাহান, যিনি ২০১০ খ্রিস্টাব্দের ২৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পাঁচ আসামির ফাঁসি কার্যকর করেছিলেন।

এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালে বলেন, “বঙ্গবন্ধুর এই পলাতক খুনিকে গ্রেপ্তার করে শাস্তি নিশ্চিত করতে পারার বিষয়টি মুজিববর্ষে জাতির জন্য শ্রেষ্ঠ উপহার”। 

নির্মম হলেও সত্য ইতিহাসের এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবি জন্য বাঙালি জাতিকে অপেক্ষা করতে হয় ৩৪ টি বছর।

বাকি থাকলো বাঙালি জাতির পিতার পাঁচ হত্যাকারী খন্দকার আবদুর রশিদ, এ এম রাশেদ চৌধুরী, শরিফুল হক ডালিম, এসএইচএমবি নূর চৌধুরী, রিসালদার মোসলেম উদ্দিন খান।  

ইতিহাসে এই দিবসটি জাতীয় শোক দিবস হিসাবে বাঙালি জাতি  অত্ত্যন্ত সুন্দরভাবে পালন করে আসছে। প্রতিটি ১৫ ই আগস্ট বাঙালি জাতি শ্রদ্ধাভরে সরণ করে মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে।

বিচারের পূর্ণ কার্যকারিতার অপেক্ষায় আজো পথ চেয়ে আছে তোমার স্বপ্নের স্বাধীন সোনার বাংলার মানুষ। যারা আজ বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাড়িয়ে তোমারি রেখে যাওয়া নেতৃত্বের হাত ধরে।

পরিশেষে বলতে ইচ্ছে হয়

আজ এই বাংলায় তুমি নেই ওহে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু,

আহা, আহা একি অপূর্ণতা

দৈহিক বিদায়ে তুমি অনুপস্থিত চিরসত্য,

চিরকাল হেথা বাঙ্গালির মণিকোঠায় তুমি মোদের সম্পূর্ণতা। 

 

সাযিদ আল মামুন

লেখক ও গবেষক

জীবন সদস্য নং ১৬৪৩

বাংলাদেশ ইতিহাস সমিতি