ঢাকা, রোববার, ১৭ অক্টোবর ২০২১, ২ কার্তিক ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

কারা মুজিবের হত্যাকারী?- দ্বিতীয় পর্ব

এ, এল, খতিব
প্রকাশিত: ১০ আগস্ট ২০২১ মঙ্গলবার, ০৮:০০ এএম
কারা মুজিবের হত্যাকারী?- দ্বিতীয় পর্ব

মোশতাকের প্রারম্ভ

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় মুজিব যখন তার দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাকে পাকিস্তানী সৈন্যরা তাকে ধরতে আসার পূর্বেই বাড়ী থেকে চলে যেতে বললেন, রেহানা তাঁর পিতাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “আমি যাবো না, আমাদের যদি মরতেই হয় তবে সবাই একসাথেই মরব।” উনাকে জোর করে তাঁর পিতার কাছ থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।

রেহানা এখন বিদেশ ভূয়ে।

হাসিনা যখন বাংলাদেশে সংঘটিত ‘ক্যু’র কতা শুনলেন তখন তার প্রতিক্রিয়া ছিল ‘ কেউ বোধহয় বাঁচবে না।” কিন্তু সেখানে একটি ভুয়া সংবাদ পৌছালো যে তার মা এবং ভাই রাসেল বেঁচে আছেন। তিনি এসব খড়কুটো আঁকড়ে ধরে রইলেন।

১৬ আগষ্ট শেখ মুজিবের মেয়ের স্বামী ওয়াজেদের কাছে ঢাকা থেকে একটি টেলিফোন গেল। মিসেস আবু সাঈদ চৌধুরী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার জন্য খুব উৎকণ্ঠিত ছিলেন। তিনি তাদের সবরকমের সাহায্যের প্রস্তাব দিলেন এবং তারা যেখানে অবস্থান করছেন সেখানেই তাদের অবস্থান করতে বললেন।

মিসেস চৌধুরী আরও বলেন, মিঃ চৌধুরী জোট-নিরপেক্ষ সম্মেলনে লিমা যাবার পথে তাদের সাথে মিলিত হবেন। তিনি বললেন, “আমরা তোমাদের পক্ষে দাঁড়াবো।” টেলিফোন তাদের হতবুদ্ধিতা ভেঙ্গে দিল।

আবু সাঈদ চৌধুরী তাদের সাথে ঘনিষ্ঠ ছিলেন না। কোন কারণে তিনি বর্তমান মোশতাক সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রীর পদে আসীন এবং তিনি তাদের সাহায্য করার প্রস্তাব দিচ্ছেন। এই আহ্বান হয়ত একমাত্র নতুন শাসকগোষ্ঠীর পরামর্শানুসারে হয়েছিল অথবা হয়ত তাদের অনুমোদিত।

তাদের খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নেবার প্রয়োজন ছিল। তারা ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয়ের চেষ্টা করলেন। ওয়াজেদ যখন এক বাক্য বিশিষ্ট রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদনটি লিখছিলেন তখন তার হাত কাঁপছিল।

বন তাদের জন্য নিরাপদ ছিল না। ঢাকা থেকে একজন তাদের কাছে পৌছলেন। তারা কালসরুহে (বনে) যেখানে ওয়াজেদের একটি ফ্লাট ছিল সেখানে অপেক্ষা করছিলেন, তারা ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়ে যে অনুরোধ করেছিলেন তার উত্তরের জন্য।

মুজিব নিহত হওয়ার পরদিন একটি বালক যে খবরের কাগজ বিলি করছিল সে শেখ মুজিবের জন্য কাঁদতে লাগল। জনৈক ভারতীয় সাংবাদিক তাকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বললেন, “ তোমরা এখন বঙ্গবন্ধুর চরম সমালোচনা করছ।” বালকটি কোন প্রকার ইতস্ততা ছাড়াই উত্তর দিল, “আমরা কে কাকে দোষারোপ করতে পারি? তিনি ভাল কিংবা মন্দ যাই হোন, তাঁর মতো লোক শুধুমাত্র তিনিই ছিলেন, এখন আর আমাদের সে রকম কেউ নেই।”

সেখানে তার মতো অনেকেই ছিল যারা মুজিবের অনুপস্থিতিতে নিজেদের এতিম ভাবছিল। জনগনের মানসিকতা এমন অন্ধকারাচ্ছন্ন ও ভীতিকর ছিল ঠিক যেন তারা বঙ্গোপসাগরের দমিয়ে রাখা সন্তান-সন্ততি, হয়ত এটা একটা সাইক্লোন কিংবা ধ্বংসে উন্নীত হতে পারে। বিপদ সতর্ক থাকার জন্য মোশতাক হত্যাকান্ডে তার জড়িত থাকা থেকে বিচ্যুত হবার ব্যাপারে উদ্বিগ্ন ছিল। যদি কেউ জনগণের রোষাগ্নিতে পতিত হয় তা হলে মেজররাই হবে।

মোশতাকের কিছু বন্ধু ও সহযোগী জনগণকে বিশ্বাস করানোর চেষ্টায় ব্যস্ত হল যে মেজররা তাদের নিজ দায়িত্বে অভ্যুত্থান ঘটিয়েছো, মোশতাকের এ সম্পর্কে কোন সঠিক ধারণাই ছিল না। তার এক বন্ধু বলল, “যখন একজন মেজর কিছু সৈন্য নিয়ে মোশতাকের এ সম্পর্কে কোন সঠিক ধারণাই ছিল না। তার এক বন্ধু বলল, “যখন একজন মেজর কিছু সৈন্য নিয়ে মোশতাক ভাইয়ের বাসায় গেল তিনি ভাবলেন তারা তাকে ধরে নিয়ে যেতে এসেছে, হয়ত তাকে হত্যাও করা হবে।” এসব সত্ত্বেও মোশতাকের বন্ধুরা বুঝতে পারল তাদের মনগড়া গল।প কেউ সম্পূর্ণ বিশ্বাস করছে না।

তারা দাবী করল যে মোশতাকের বিশ্বাস ছিল এটা একটা রক্তপাতহীন অভ্যুত্থান হবে। এটার প্রমাণ এই যে মোশতাক যখন হত্যাকান্ড সম্পর্কে শুনতে পেল তখন সে বলেছিল, “এ ব্যাপারে আমার কোন বক্তব্য নেই।”

তাদের মতে, মোশতাক মুজিবকে টুঙ্গপিাড়ায় কবর দিতে তার প্রতি সম্মান দেখিয়েছে। তাদের মধ্যে একজন ধর্মীয় দৃষ্টিতে বলল, “ মোশতাক বাই একজন খোদাভক্ত মুসলমান, যিনি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন।”

প্রার্থনার অংশ?

পরিকল্পনাকারীরা সিদ্ধান্ত নিল যে মুজিবকে যেতে হবে। রশীদ যে তার মামা মোশতাকের চেয়ে কম ভন্ড নয়। সে ভাবল “কিন্তু”, তাকে (মুজিব) নির্বাসনে পাঠানো যাবে না কিংবা জেলে পোরা যাবেনা। সে হলো অত্যন্ত চতুর ও ভীষণ ক্ষমতাবান, তাকে হত্যা করতেই হবে।”

মজিবের জনপ্রিয়তা এতই ছিল যে কারাগারে অথবা নির্বাসনে পাঠানো যাবে না। তাকে সরানোর একমাত্র উপায় হল তাকে হত্যা করা।

মোশতাকের কিছু তোসামোদকারী জনগণকে বিশ্বাস করানোর জন্য একটি গল্প প্রচার করল, কিন্তু অনেকেই বিশ্বাস করল যে ভারতীয় যে হেলিকপ্টারটি ১৩/১৪ আগষ্ট বিধ্বস্ত হয়েছে তা ছিল উদ্ধার কাজে নিয়োজিত।

হেলিকপ্টারের বিধ্বস্ত হওয়া নিয়ে সেখানে কোন শোক ছিল না। কিন্তু ভারতীয় হেলিকপ্টার পার্বত্য চট্টগ্রামে পরিদর্শন কাজে নিয়োজিত ছিল। কপ্টার বিধ্বস্ত হওয়া সংক্রান্ত একটি প্রেসনোট ১৪ আগষ্টে মুজিব কর্তৃক অনুমোদিত হয়েছিল, যা পরদিন প্রকাশিত হবার কথা ছিল।

ভারতের অনেকেই বিশ্বাস করেন যে ভারতীয় বিমানটি উদ্ধার কাজে গিয়েছিল। ‘ক্যু’ সংঘটিত হবার আগের দিন কপ্টার বিধ্বস্ত হল। যদিও মজিব “রেসকিউ মিশন” সম্পর্কে কিচুই জানতেন না। ১৫ আগষ্ট ভোরের আগেই সৈন্যরা তার বাড়ী ঘেরাও করে তাকে বিস্মিত করে।

বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাই কমিশনার মিঃ সমর সেন ‘ক্যু’-র দিন নয়াদিল্লীতে ছিলেন। ভারতের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে মুজিব শেষ বার্তা দুটি পাঠিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি ফখরুদ্দীন আলী আহমেদ এবং প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নিকট।

১৬ আগষ্ট সাংবাদিকরা বঙ্গভবনে তাহের উদ্দিন ঠাকুরের প্রেস ব্রিফিংয়ের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। দুজন মেজর গোবর গাদায় মোরগের মতো আত্মগরিমায় সেখানে অবস্থান করছিল। তাহের ক্রাচে ভর দিয়ে হাটাহাটি করছিল, হুদা নিজের মনে একা একা উপর নীচ করে বেড়াচ্ছিল। স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছিল যে সে নিজের চিন্তায় নিবিষ্ট। যখন কেউ তার সাথে কথা বলছিলেন, সে অন্যমন্সকভাবে সে সব কথার উত্তর দিচ্ছিল। ফারুক সাংবাদিকদের কাছে এগিয়ে এসে বন্ধুত্বপূর্ণ হাসিমুখে বলল, “ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের জন্য আমি কি কিছু করতে পারি?

এধরনের আনন্দিত কন্ঠের অধিকারী ব্যক্তি কি রক্তপাতের পরিকল্পনা করতে পারে? সাংবাদিকদের একজন উপলব্ধি করে ভয়ে কেঁপে উঠলেন।

মুজিবের মৃত্যু সংবাদ ভারতের গভরি শোকের কারণ হল। কেউ কেউ ভাবল মুজিব নিজেই তার সর্বনাশ ডেকে এনেছিলেন, কিন্তু অধিকাংশ ভারতীয় মুজিব ও তার পরিবারের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি ছিলেন বন্ধুভাবাপন্ন একজন মহান দেশপ্রেমিকের প্রতীক।

১৬ আগষ্ট ভারতের একজন সরকারী মুখপাত্র শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকান্ডের জন্য গভীর শোক প্রকাশ করলেন। তিনি বলেন, “আমাদের সময়ে আমরা তাঁর বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের জন্য তাকে সর্বোচ্চ সম্মানের স্থানে রাখবো।” ‘ক্যু’ বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার, কিন্তু প্রতিবেশী রাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিস্থিতি উন্নয়নে ভারত অসংক্রমিত থাকতে পারে না।

যুগোশ্লাভিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “বাঙালী জনগণের মহান নেতা যুগোশ্লাভিয়ার অবিভাজ্য সহানুভূতি গ্রহণ করুন। তার মৃত্যুতে পৃথিবী একজন বিখ্যাত রাষ্ট্র প্রধান ও শান্তির যোদ্ধাকে হারালো। এমনকি জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন জোটনিরপেক্ষ দেশের একজন সুবিখ্যাত রাষ্ট্র নায়ককে হারালো।”

মুজিবের করুণ পরিণতিতে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবদুল রাজ্জাক শোকাভিভূত হলেন। কুয়েতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ সালাহ মুজিবের মৃত্যুতে দুঃখ প্রকাশ করেন। 

দি নিউ ইয়র্ক টাআমিস’ শেখ মুজিবের আলোকিক ধর্ম নিরপেক্ষ নীতি বিস্তারিতবাবে প্রকাশ করল। কিন্তু অন্ধ ধর্ম বিশ্বাসীদের কাছে ধর্মনিরপেক্ষতা হল ধর্মে অবিশ্বাসীদের চরম মন্দ রূপ। এস,আর ঘোউরী করাচী থেকে লন্ডনের গার্ডিয়ান পত্রিকাায় পাঠানো বার্তায় বলেন, মুজিবের “বাংলাদেশকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র’ হিসেবে গড়ে তোলা ছিল পাকিস্তানী জনগণের কাছে মহা হতাশাপূর্ণ।

লন্ডনের টাইমস পত্রিকা প্রকাশ করে বলে, উন্নয়নশীল দেশের জন্য সামরিক স্বৈরশাসন হল অমঙ্গলজনক, কিন্তু এই মুহুর্তে একই পত্রিকা বলে ‘সামরিক শাসন মঙ্গলজনক এবং এর দ্বারা দেশের রাজনৈতিক অস্থিরাত দূর করা সম্ভব।” এবং লন্ডনের গার্ডিয়ান পত্রিকার কূটনৈতিক সংবাদদাতা আশা প্রকাশ করে বলেন, “মুজিব সরকার যে সব বাম ঘেঁসা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল নতুন সরকার তার পরিপন্থী কাজ করবে।”
১৬ আগষ্ট সুদানের রাষ্ট্রপতি গাফ্্ফার নিমেইরী চারদিনের রাষ্ট্রীয় সফরে রিয়াদ পৌছল। ঐ দিন সৌদী আরব ও সুদান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিল।

সৌদী আরবের বাদশাহ খালেদ মোশতাকের নিকট পাঠানো এক বার্তায় বললেন, “আমার প্রিয় ভাই, নতুন ইসলামিক প্রজাতন্ত্র বাংলাদেশের নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করায় আপনাকে আমি আমার নিজের এবং সকল সৌদী আরবীয় জাতির পক্ষ থেকে অভিনন্দন জানাচ্ছি। আমি খোদার কাছে প্রার্তনা করছি তিনি যেন আপনাকে আপনার পদক্ষেপ সফল করতে সাহায্য করেন এবং খোদা আপনাকে ইসলামের খেদমত করার এবং ঐক্যবদ্ধ মুসলিম বিশ্বের জন্য কাজ করার তওফিক দেন।” 

পূর্বে সৌদী আরব কর্তৃক বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেবার পূর্বশর্ত ছিল বাংলাদেশকে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। বাংলাদেশ তার মুক্তিযুদ্ধকালীন সংগ্রামকে অস্বীকার করা ছাড়া নিজেকে ইসলামিক প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরিত করতে পারে না। মুজিবের আগে থেকেই ধারণা ছিল যে কেউ কেউ বাংলাদেশকে একটি ইসলামিক প্রজাতন্ত্র করার ব্যাপারে তাকে পরামর্শ দেবে।

১৯৭৫ সালের ১৮ এপ্রিল, ভূট্টো কাবুলে পাকিস্তান মিলিটারী একাডেমীতে বলেছিলেন, আমি ১৯৭২ সালে সিমলা গিয়েছিলাম,  কারণ আমাদের শান্তির প্রয়েঅজন ছিল। পাকিস্তান যা করেছে ভারত এখন তার চেয়েও বেশী শান্তি চায়। ভারত এবং বাংলাদেশ এজন্য পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক স্বাভাকিক করণের আগ্রহ দেখাচ্ছে।” তিনি আরও বললেন, ” এই উপমহাদেশে অতি শীঘ্রই কিছু পরিবর্তন হতে যাচ্ছে।” এটা হয়ত খুব শীঘ্র কষ্টার্জিত কোন সিদ্ধান্ত, কেউ কিছু ঘটাবে, কেমন করে ভূট্টো বাংলাদেশে ১৫ আগষ্ট ‘ক্যু’ ঘটার পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। এমনকি তিনি শুধুমাত্র মোশতাক সরকারকে অশোভন রকমের তাড়াতাড়ি স্বীকৃতি দিলেন এবং সে এটাকে টিকিয়ে রাখার জন্য সবকিছু করতে পারে।
একজন সাংবাদিক যিনি ১৯৭৪ সালের জুনে ভূট্টোর ১০৭ সদস্য বিশিষ্ট দলের সাথে ঢাকায় এসেছিলেন, তিনি সফরের পর করাচীর ডেইলী নিউজ-এ বাংলাদেশে সেনাবাহিনীর ক্ষমতা গ্রহণের বেশ অস্পষ্ট সম্ভাবনার আভাস দেন। এটা একটা উদ্ভট ধারণা বলে প্রতীয়মান হয়েছিল। একজন পাকিস্তানী হিসেবে তিনি বাংলাদেশের সরকার পরিবর্তনে সামরিক অভ্যুত্থান ছাড়া আর কিছু কল্পনা করতে পারেন না; একজন ভেবেছিল।

অধিকাংশ পাকিস্তানী বাংলাদেশের করুণ ঘটনায় তাদের ধর্ষকামমূলক আনন্দ লুকাতে পারেনি। যখন ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মিত্র বাহিনীর কাছে পাকিস্তানী সশস্ত্র বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছিল তাদের মধ্যে কেউ কেউ একন সে অপমানের প্রতিমোধ হয়েছে বলে অনুভব করল। কয়েকটি পাকিস্তানী সংবাদপত্র মুজিবকে বিশ্বাসঘাতক বলে আখ্যায়িত করল। কয়েকটি পাকিস্তানী সংবাদপত্র মুজিবকে বিশ্বাসঘাতক বলে আখ্যায়িত করল। এবং তার মৃত্যুকে “পাপের ফল” হিসাবে বর্ণনা করল। জেড, এ, সুলেরী পাকিস্তানের সর্বোচ্চ ব্যক্তিদের মুখপাত্র হিসেবে সে আনন্দিত হল, কারণ এই মুজিবই বিশ্বাসঘাতকতা করে পাকিস্তান ভেঙ্গে দিয়েছিলেন, তিনি নিহত হয়েছেন।

লাহোরের একটি দৈনিক পত্রিকাকে দেয়অ বিবৃতিতে সে বলল পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে পারত না। যদি শেখ মুজিব দীর্ঘদিন বেঁচে থাকতেন।’ তার বিশ্বাস বাংলাদেশে আটক পাকিস্তানী যুদ্ধবন্দীদের মুক্তির ব্যাপারে নিশ্চিত না হয়ে মুজিবকে ছেড়ে দেয়া ভুল ছিল। পাঞ্জাব মুজিবের নিঃশর্ত মুক্তিদান মেনে নেয়নি।

সুলেরী বলল, মুজিব ছাড়া বাংলাদেশ গঠিত হতে পারত না। হংকং-এর ফার ইস্টার্ন ইকনমিক রিভিউ পত্রিকার ইসলামাবাদ সংবাদদাতা সালামত আলী বলল, “মুজিব পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক রাখতে পারেনি ভারতীয় চাপের বিরুদ্ধে যুক্তিসঙ্গত পদক্ষেপ না নেবার জন্য, কারণ সে মনে করত এতে পাকিস্তান পন্থীদের সাহসী করা হবে এবং তার অবস্থান দূর্বল হয়ে পড়বে। 

মোশতাক ভিন্নধর্মী।

বাংলাদেশ ইসলামিক প্রজাতন্ত্র হয়ে গেছে এ ঘোষণা দেয়ার পরও সেখানে যে পরিবর্তন ঘটেছে তা উল্লেখ করা হল না। ইসলামাবাদ চাইছিল ঢাকা থেকে বিষয়টি পরিস্কার করা হবে। সপ্তাহ শেসে এই দুই রাজধানীর মধ্যে দীর্ঘসময় ধরে আলোচনা চলে। ঢাকা থেকে যে বর্ণনা এবং নিশ্চয়তা দেয়া হল ইসলামাবাদ সে ব্যাপারে পুরোপুরি তৃপ্ত হল।

মোশতাকের হাত শক্তিশালী হতে হবে। সে কৌশলগত কারণে বাংলাদেশকে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা দেয়া হতে বিরত রইল, কিন্তু সে বাংলাদেশকে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠতায় আনবে। ১৯৫৫ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে যখন ‘মুসলিম’ শব্দটি মুছে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, তখন কি মোশতাক অধিবেশন থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল? ১৬ বছর পর ১৯৭১ সালে সে পাকিস্তান সরকারের সাথে একটা রাজনৈতিক সমাধানে পৌছাতে আগ্রহী হয়েছিল, যখন তার সহকর্মীরা বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য কোনরকম ছাড় দিতেই প্রস্তুত ছিলেন না। রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার প্রথম সম্প্রচারিত ভাষণে সে ‘জয় বাংলা’ শব্দটি উচ্চারণ করল না।

পাকিস্তানের একজন সাংবাদিক বললেন, মোশতাক বলেছে বাংলাদেশ নিজেকে একটি ইসলামিক প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করুক বা না করুক ঐ ধরনেরই একটি রাষ্ট্র হবে। সাংবাদিকটি আরও বলেন, পাকিস্তানের উচিত তার ( মোশতাকের) এই ভাবনার সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখা।

এটা এখন ‘মুসলিম বাংলা’। ভুট্টোর এই চিন্তাধারাকে কয়েকজন পাকিস্তানী বাহবা দিল।

সাবেক পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর প্রধান অধ্যাপক গোলাম আজম সমস্ত মুসলিম দেশের কাছে নতুন বাংলাদেশের সরকারকে সমর্থন দেয়ার অনুরোধ করল।

ঢাকা মুক্ত হবার পূর্ব মুহুর্তে বুদ্ধিজীবীদের হত্যাকারী কুখ্যাত আল-বদর জামায়াতে ইসলামী থেকে সৃষ্টি হয়েছিল। স্বাধীনতার পরপরই দলটিকে নিষিদধ করা হয়। খাজা খয়েরউদ্দিন বাংলাদেশ সম্পর্কে পদক্ষেপ নেয়ায় ভুট্টোকে অভিনন্দন জানাল, সে বলল “এখান থেকে শুরু হোক।” আল্লাহ খন্দকার মোশতাক আহমেদকে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র বাংলাদেশকে ইসলামের প্রাচীর বানাতে সাহায্য করবেন।’

স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় খাজা খয়েরউদ্দিন মুক্তিযোদ্ধাদের নিশ্চিহ্ন করার জন্য পাকিস্তানী সামরিক সরকার কর্তৃক গঠিত কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটির আহবায়ক ছিল। স্বাধীনতার পর সে বন্দী হয়। যখন সে মুক্তি পেল, মুজিব তাকে একটি পাসপোর্ট দিলেন যাতে সে লন্ডন যেতে পারে। অবশ্যই খয়েরউদ্দিনের গন্তব্য ছিল পাকিস্তান, কিন্তু মুজিব একজন পুরাতন বন্ধুর অনুরোধ ফেলতে পারলেন না।

পাকিস্তানের কয়েকজন রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিক পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের মধ্যে কনফেডাপরেশন যতখানি সম্ভব করার কথা ভাবছিল, যদিও তা সর্বাধিক দূরবর্তী অধিকার।

এসব সত্ত্বেও সেখানে অনেক পাকিস্তানীও ছিলেন যারা মুজিবের হত্যায় দুঃখ পেয়েছিলেন।

করাচীর আল ফাতাহ সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদক ওয়াহাব সিদ্দিকী বলেন, “তিনি (মুজিব) আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন তার দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি করতে।’ কিন্তু দুঃখজনক যে তার নিজের লোকরাই তাকে হত্যা করেছে। তাকে হত্যা করাই ছিল অপরিহার্য কেননা, শেখ ছিলেন বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা এবং তার গ্রেফতার কিংবা নির্বাসন নতুন সরকারের জন্য মারাত্মক অসুবিধার সৃষ্টি করত।” এমন একটি সাপ্তাহিকের সম্পাদক একথা বলেছেন যে পত্রিকা ছিল চীন পন্থী এবং ভূট্টোরসমর্থক।

অনেকেই ধারণা এই ‘ক্যু’র পিছনে সিআইএ’র হাত রয়েছে এবং ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ওয়াশিংটনের সাথে যে সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল তার সাথে এই ‘ক্যু’র যোগসুত্র রয়েছে। সিদ্দিকী আরও উল্লেখ করে বলেন, “বাংলাদেশের বর্তমান পরিবর্তন সিআইএ’র পূর্ব পরিকল্পিত; যা ১৯৬৯ সাল থেকে বাস্তবায়নের অপেক্ষায় ছিল।”

রেডিও’র প্রথম ঘোষণায় বলা হয়েছিল মোশতাকের নেতৃত্বে ক্ষমতা দখল করেছে, কিন্তু মোশতাক এটা বুঝাতে চাচ্ছিল সে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকেই এই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। ১৫ আগষ্ট জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে সে বলে, “সশস্ত্রবাহিনী প্রয়োজনেই সরকার পরিবর্তনে এগিয়ে এসেছিল।’ কিন্তু মাত্র ছয়জন নীচু সারির কর্মকর্তা, এমনকি তাদের মধ্যে সবাই চাকরিতে ছিলনা এবং মাত্র দুই থেকে তিনশত সৈন্য এ ক্যু’তে জড়িত ছিল সৈন্যদের মধ্যে হাতে গোনা কয়েকজন মুজিবকে হত্যা করার পরিকল্পনার বিষয়ে অবগত ছিল।

ষড়যন্ত্রকারী ছোট দলটির লক্ষ্য ছিল মুখোশ খুলে ফেলে অভ্যুত্থঅন ঘটিয়ে বলপূর্বক ক্ষমতা দখল করা। মোশতাক একজন চতুর লোক এবং মেজররা ছিল উচ্চাভিলাসী দুঃসাহসিক তরুণ। তাদের কোন রাজনৈতিক ভিত ছিল না এবং তারা জানত যে তারা কখনোই জনগণের সমর্থন লাভ করতে পারবে না। তাদের সুবিধা ছির মোশতাক একজন জনপ্রিয় নেতা ও ধার্মিক এবং মেজররা ছিল আদর্শবাদী তরুণ।

১৭ আগষ্ট জয়প্রকাশ নারায়ণ তার বন্দীর দিনলিপিতে লিখল, অন্যান্য নেতাদের মতো ভারতে থাকাকালীন মোশতাকও প্রচন্ড মুজিব ভক্ত ছিল।

যখন জে,পি’র ঘনিষ্ঠ সহযোগী এ,সি, সেন বাংলাদেশ থেকে ফিরে জে,পি,কে রিপোর্ট করল যে, মোশতাক ছিল মুজিবের প্রতিদ্বন্দ্বী এবং আওয়ামী লীগ এবং দেশে কেউ যদি মুজিবের নেতৃত্বের প্রতি চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে সে হল মোশতাক।

জয় প্রকাশ মন্তব্য, “ শেষ কথা হলঃ আমি আহমেদের দুটি দিক তুরে ধরব, সে হল একজন পশ্চিমা পন্থী এবং একজন খাঁটি মুসলমান-অন্যদের চেয়েও ধর্মীয় গোড়ামীপূর্ণ। জে,পি সীমা মেনে চলর।

এ,পি, সেন মোশতাকের দিকে আস্তে ঝুঁকে পড়ল এবং সে তার ঢাকায় অবস্থানের অধিকাংশ সময় মোশতাকের লোকদের সাথে কাটায়, কিন্তু এটা তার কাছে স্বাভাবিক কারণেই অবিশ্বাস্য ঠেকল মোশতাককে মুজিবের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিশ্বাস করতে। এটা কি সেনের অভিলাষী চিন্তার ফসল নাকি সে জে,পি কে ইচ্ছা করেই ভ্রান্ত করতে চেয়েছিল?

কর্ণেল তাহের তার জবানবন্দীতে ঠিকই বললেন, ‘এটা পরিস্কার যে মোশতাকের কোন রাজনৈতিক ভিত ছিলনা, কিন্তু একটি ক্ষুদ্র অংশ ছাড়া সমগ্র সেনাবাহিনীতে তার সমর্থন ছিল না এবং সমগ্র জনগণের মধ্যেও তার সমর্থন ছিল না।”

 মোশতাক তার নিজ এলাকাতেও নিজের দেশের কথা বলার ক্ষেত্রে জনপ্রিয় ছিল না। ১৯৭৩ সালের সাধারণ নির্বাচনে সে পরাজয়ের অতি নিকটে ছিল। যখন সে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হল তখন তার যে জীবন বৃত্তান্ত প্রকাশিত হয় সে এ সম্পর্কে কোন ব্যাখা দেয়নি। এতে বলা হয়, ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে সে কুমিল্লার দাউিদকান্দি- হোমনা এলাকা থেকে নির্বাচিত হয়েছিল। তার কৃতিত্ব ছিল সে ঐ নির্বাচনে পাকিস্তানের সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর জামানত বাজেয়াপ্ত করেছিল। ১৯৭৩ সালে সাধারণ নির্বাচনে মোশতাক তার জীবনে আবারও দাউদকান্দি (কুমিল্লা) নির্বাচনী এলাকা থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিল।

১৯৭৩ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯১টি আসন মোট প্রাপ্ত ভোটের ৭২ শতাংশ লাভ করে। এমনকি মোশতাক মাত্র ৭০০ ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করে। এবং যদিও তার বিজয়ের সম্ভাবনা ছিলনা। সে পরাজিত হতে পারত যদিনা শেখ মুজিব শেষ মুহুর্তে তার নির্বাচনী এলাকা সফর করতেন।

মুজিবের এক বন্ধু প্রশ্ন করেছিলেন, “আপনি কি মোশতাককে জয়লাভের ব্যাপারে সাহায্য করবেন?’ মুজিব হাসিমুখে প্রত্যুত্তর করেছিলেন,’ সে একজন পুরনো সহকর্মী। 

মুজিব মোশতাকের বিজয় নিশ্চিত করতে পেরে খুব খুশী ছিলেন। কিন্তু মোশতাকের কাছে মুজিবের এই জনপ্রিয়তা খুব অপমানজনক ছিল এবং নিশ্চিত পরাজয়ের হাত থেকে রক্ষা পেয়ে মুজিবের ওপর আরো ক্ষুদ্ধ হল।

মুজিব কি এমন করেছে যার জন্য তার এত জনপ্রিয়তা? মোশতাক তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের সাথে আলাপকালে অনেক সময় বলত ‘আমিও আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন এবং ৭ বছর কারাগারে কাটিয়েছি।

ক্ষমতা সবসময়ই নতুন বন্ধু ও ভক্ত জোটায়, কিন্তু মোশতাকের নিজস্ব গন্ডির বাইরে রাষ্ট্রপতি হবার পরও কোন ভক্ত জুটল না। অভ্যুত্থানের এক সপ্তাহ পরে দাউদকান্দি ঘাটে একজন মধ্যবয়স্ক ব্যক্তি মোশতাকের গুণকীর্তন করে ভুলই করল। সাথে সাথেই কয়েকজন যবক তাকে ঘুষি মারল। মোশতাকের নিজ এলাকায় ঘাটে উপস্থিত লোকজনের মধ্যে কেউই মোশতাকের পক্ষ নিল না। মধ্যবয়স্ক ব্যক্তিটি সবার কাছে ক্ষমা চাইতে বাধ্য হল।

মেজররা বঙ্গভবনে তাদের আবদ্ধ রেখেছিল এবং তারা এমন আচরণ করত যেন তারা পাকিস্তানী সামরিক জান্তার উত্তরসূরী। তারা সহ্যের সীমা অতিক্রম করে যেত এবং সবার কাছে নিজেদেরকে খুব বিরক্তিকর ও অসহনীয় করে তুলল। তারা তাহের উদ্দিন ঠাকুরসহ দু’একজন মন্ত্রীকে বাহবা দিল অন্যদিকে যাদের চেহারা পছন্দ হয়নি তাদের আটক, কয়েকজন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে জোরপূর্বক টাকা আদায় এবং মাঝেমধ্যে রাষ্ট্রপতির আদেশকে অমান্য করত। এরপরও তারা ভাবত তাদের আরো অনেক পাওনা বাকী রয়েছে। তারা নিজেদের বিরুদ্ধে নিজেরাই ঐক্যবদ্ধ ছিল কিন্তু তাদের নিজেদের তিক্ত অনুভূতির মধ্যে পার্থক্য ছিল।

তাদের হতামার কারণে কয়েকজন মেজর একসময় লাথি দিয়ে মোশতাকের ঘরের দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করে মোশতাকের উপস্থিতিতে চেচিয়ে উঠে। তারা আরও রাজনৈতিক নেতাকে হত্যার হুমকি দেয়। জনগণের প্রতিক্রিয়ার কথা চিন্তা করে মোশতাক তাদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা করে। কিন্তু তারা যেন আরও রক্ত ঝরানোর জন্য উদগ্রীব। একজন মেজর জোর গলায় বলল, “আমরা যখন শেখ মুজিবকে হত্যা করতে পেরেছি তখন যে কাউকেই হত্যা করতে পারি। “তার কথার অর্থ পরিস্কার। কিন্তু রাষ্ট্রপতির প্রতিরক্ষা ছাড়া তারা কোন ঝুকি নিতে রাজী নয় এবং তাদের ছাড়া মোশতাকও সাহায্যহীণ হয়ে পড়বে। মোশতাক এবং মেজররা একে অপরের সাথে আঁটির লাঠির মতো দড়ি দিয়ে একপাকে বাঁধা।

যখন মোশতাক মেজরদের ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করছিল তখন সে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সমর্থন লাভের জন্য জোর প্রচেষ্টা চালায়। সে মেজরদের এও বলল যে ক্ষমতা যদি তার জন্য না হয় তবে সশস্ত্র বাহিনী যেন পুরোপুরি ক্ষমতা গ্রহণ করে।

মোশতাক ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (মোজাফ্্ফর) সভাপতি মোজাফ্্ফর আহমেদকে অভুত্থান সংঘটিত হবার কয়েকদিন পর বলল, “যখন আমরা রেডিও ষ্টেশনে ছিলাম তারা ( মেজররা) আমাকে বাংলাদেশকে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ঘোষণা দেয়ার জন্য চাপ দিচ্ছিল। আমি তাদের বলেছি ‘বাবা, এত শীঘ্র নয়। এমনকি আমরা এ মুহুর্তে এখানে বসে দেখতে পাচ্ছি আওয়ামী লীগররা এবং অন্যান্যরা রেডিও ষ্টেশনের দিকে একটি বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে এগিয়ে আসছে।’

মোশতাক বাংলাদেশকে ইসলামিক প্রজাতন্ত হিসেবে ঘোষণা করত যদিনা সে বুঝতে পারত যে গৃহযুদ্ধ আরম্ভ করতে যাচ্ছে। তার কোন রাজনৈতিক ভিত ছিলনা এবং সেনাবাহিনীর ক্ষুদ্র একটি অংশ তাকে সমর্থন করছিল। সে তার অবস্থান সুসংহত করে ধীরে সুস্থে এগোতে চাইছিল।

মোশতাক আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যদের সাথে আলোচনা করার সময় মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ বলে সম্বোধন করল। সে বলল যখন কোন পরিবারের প্রধান মারা যায় তখন তার পরিবারের সবাই মোকে মুহ্যমান থাকে, কিন্তু আমরা এখন জরুরী বিষয়ে আলোচনার জন্য এখানে উপস্থিত হয়েছিল। সে বঙ্গবন্ধুর জন্য দুঃখও প্রকাশ করল। তার এখন অনেক দায়িত্ব। মেজররা দাবী করছিল সংসদ বাতিল ঘোষণা করতে। সে তাদের বহুসময় নিবৃত্ত রাখতে সক্ষম হয়েছে, কিন্তু সে আরো দীর্ঘ সময় তা করতে সমর্থ থাকবে না, যদিনা তার, দলীয় সহকর্মীরা তার সাথে সহযোগিতা না করে।

আওয়ামী লীগের অধিকাংশ সংসদ সদস্যই মোশতাকের সহযোগিতার আহবানে রাগতভাবেই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলেন। যখন সে তাদের জয় করতে ব্যর্থ হল, সে তখন অন্যান্যদের কাছে নতুন দল  গঠনের জন্য সাহায্য চাইল।

ইত্তেফাকের সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি মইনুল হোসেন পর্দার অন্তরালে থেকে মোশতাকের জন্য সমর্থন যোগানোর চেষ্টায় ব্যস্ত ছিলেন, কেননা তিনি রাজনৈতিকভাবে মোশতাকের ঘনিষ্ঠ ছিলেন।

এটা পরিস্কার যে নতুন সরকার তার নিজস্ব লোকদের ক্ষমতার শীর্ষে বসাল। সফিউল আযমকে বিশেষভাবে তৈরী রাষ্ট্রপতির মহাসচিব এবং মাহবুবুল আলম চাষীকে রাষ্ট্রপতি মোশতাকের মুখ্য সচিব বানানো হল। তবারক হোসেন হল নতুন পররাষ্ট্র সচিব। এই তিনজনই শক্তিশালী পাকিস্তানী হিসেবে পরিচিত এবং তারা তাদের নিজ নিজ পথে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল। এই তিনজন শীর্ষ ব্যক্তির নিযুক্তি নতুন সরকারের চেহারা উ¤েœাচিত করে দিল। পাকিস্তান থেকে তাদের অনুমোদন দেয়া হয়।

সফিউল আযম ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্য সচিব ছিল। কয়েকজন সাংবাদিকের ভুল ধারণা ছিল যে সেই প্রথম বাঙালী সে এই পদে নিযুক্ত হবার যোগ্যতা অর্জন করেছিল। আইয়ুব খানের সামরিক শাসনামলে দশ বছর পূর্বে কাজী আনোয়ারুল হক যিনি আইপিএস ক্যাডার হতে পূর্ব পাকিস্তানের মূখ্য সচিবের পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। হক ছিলেন একজন ন¤্র-ভদ্র স্বভাবের মানুষ যার শিল্প-সাহিত্য ও সঙ্গীতের প্রতি ঝোঁক ছিল। যদিও পাকিস্তানী মিলিটারী ইনটিলিজেন্স-এর আস্থা ছাড়া কোন বাঙালীর পক্ষেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মূখ্য সচিব হওয়া সম্ভবপর ছিল না।

৭৫-এর ১৫ আগষ্ট সামরিক অভ্যুত্থানের পর কাজী আনোয়ারুল হক পুনরায় উপস্থিত হয়ে প্রথমে সামরিক সরকারে উপদেষ্টা এবং পরবর্তীতে মন্ত্রী হন।

১৯৭১ সালের ২ মার্চ, শেখ মুজিব অসহযোগিতার ডাক দিলে সর্বক্ষেত্রে থেকে তার সাড়া এসেছিল। সরকারী চাকরীজীবীরা মুজিবকে সমর্থন জানালেন, এমনকি ঢাকা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি জেনারেল টিক্কা খানকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্ণর হিসেবে শপথ গ্রহণ করাতে অস্বীকার করলেন। কিন্তু সফিউল আযম তার পদে অধিষ্ঠত রইল এবং ১৯৭১ সালের ২৫/২৬ মার্চ বাঙালীদের উপর পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর গণহত্যার পরবর্তী সময়েও সে পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্য সচিব পদে বহাল ছিল।

তরুণ সিএপি শামসুদ্দিন ১৯৭১ সালের মার্চে ছিলেন সিরাজগঞ্জের সাব ডিভিশনাল অফিসার (এসডিও)। একজন সংগ্রামী জাতীয়তাবাদী, মার্চের শেষে যখন পাকিস্তানী সৈন্যরা সিরাজগঞ্জ দখল করে তখন তিনি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সংগঠিত করেছিলেন। কিন্তু বৈবাহিক সূত্রে তার আত্মীয় সফিউল আযম তাকে ঢাকায় এসে সামরিক কৃর্তপক্ষের কাছে নিজেকে তুলে দিতে প্ররোচিত করেছিল।

শাসসুদ্দিনকে কোন শাস্তি  দেয়া হবে না বলে তার বন্ধু মেজর জেনালে রাও ফরমান আলী তার কাছে যে প্রতিজ্ঞা করেছিল সফিউল আযম তার বিশ্বাস করে। কিন্তু মৃদুভাষী রাও ফরমান আলী ছিল জোরালো ভাষী ‘বাধা’ নিয়াজীর চেয়ে অনেক বড় শামসুদ্দিনকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়, এমনকি কবর দেয়ার জন্য লাশও তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি।

সফিউল আযম এ ঘটনায় যদি আঘাতও পেয়ে থাকে তবুও সে তা প্রকাশ করেনি। সে তার দায়িত্ব পালন করে যায়, এবং সে তার পাকিস্তানী চাকরির পূর্ববর্তী রেকর্ডের দাগ মুছে ফেলে।

সফিউল আযম পশ্চিম পাকিস্তানে বদলী হয়ে যায়। এটা ছিল তার জন্য সৌভাগ্য, যদি সে ঢাকায় থেকে যেত তবে তার মৃত্যু ছিল নিশ্চিত-মুক্তিবাহিনীর হাতে নিহত পূর্ব পাকিস্তানের সাবেক গভর্নর মোনায়েম খানের মতো।

সফিউল আযম ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করে। তার মতো অনেকেই ছিল যারা তার শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার জন্য তাকে নেয়ার জন্য ওকালতি করেছিল। কিন্তু সে ছিল মুজিবের কাছে অগ্রহণযোগ্য।

মাহবুবুল আলম চাষী একজন আধুনিক ও আকর্ষণীয় মানুষ। সে সফিউল আযমের মতো নয়, সে একজন ভাল মিশুক এবং সহজেই পরিচিত তৈরী করত। সে পঞ্চাশের দশকে ওয়াশিংটনস্থ পাকিস্তান দুতাবাসে একজন কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করার সময় আমেরিকায় পদস্থ কর্মকর্তা এবং শিক্ষিত চক্রের সাথে যে যোগাযোগ তৈরী করেছিল তা সে সবসময় বজায় রেখেছে।

১৯৬৭ সালে সে পাকিস্তান পররাষ্ট্র দফতরের চাকরিতে ইস্তাফা দিয়ে কৃষিকাজে আত্মনিয়োগ করে। সে এমন একজন মানুষ যে ক ৃষি কাজের জন্য তার প্রতিশ্রুতি শীল কূটনৈতিক ভবিষ্যত ত্যাগ করে। কেউ কেউ তাকে আদর্শবাদী বলে ডাকত, কেউ কেউ ভাবত এটা একটা পাগলাটে খেয়াল। কিন্তু সত্যি ঘটনা হল সে পাকিস্তান পররাষ্ট্র দফতর থেকে বাদ্য হয়ে পদত্যাগ করেছিল।

১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের সময় এবং পরবর্তীতে পাকিস্তানী বিশেষজ্ঞরা যেটাকে ‘নিউট্রাল স্টানস’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন সেটাকে আইয়ুব খান এক প্রকার দত্তক হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। সেই সময়ও সে ছিল আমেরিকান পন্থী।

মাহবুবুল আলমের বিরুদ্দে অনেক অভিযোগ ছিল। কিন্তু সেগুলোর বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি, এজন্য সে তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব আজিজ আহমেদের নিকট কৃতজ্ঞ। (কাকতালীয়ভাবে, বাংলাদেশে আগষ্ট অভ্যুত্থানের সময় আজিজ আহমেদ পাকিস্তান পররাষ্ট্র মন্ত্রীর দায়িত্বে ছিল।)

যখন উন্নয়নশীল দেশসমূহের অসুস্থতা দূর করার জন্য সবুজ বিপ্লবকে প্রতিষেধকক হিসেবে প্রচার করা হচ্ছিল, তখন মাহবুবুল আলম কৃষিকাজ শুরু করে এবং সে কারণে সে আন্তর্জাতিক উৎসাহ পেয়েছিল।

যে ব্যক্তি নিজের অথবা অন্যের ক্ষুদ্র জমি বর্গা চাষ করে তাকে ‘চাষী’ বলা হয়ে থাকে। মাহবুবুল আলম একজন ভদ্র চাষী, কিন্তু প্রচলিত এব্যাপারিট রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশের জন্য সুবিধাজনক হলেও তা পাকিস্তানের ক্ষেত্রে সঠিক নয়। রাজনৈতিক নেতারা সাধারণতঃ মধ্যবিত্ত কিংবা নিম্নবিত্ত শ্রেণী থেকে আসেন। মাহবুবুল আলম চাষাবাদ প্রকল্প করে এ কারণে যে এতে তার রাজনৈতিক ভিত হয়তোবা পোক্ত হবে। প্রথম প্রথম তার বন্ধু বান্ধবরা তার এই নতুন ভূমিকা নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করত। কিন্তু সে নিজেকে এক পরিকল্পিতভাবে চাষাবাদের সাথে খাপ খাইয়ে নিয়েছিল যে তাকে পরে লোকে মাহবুবুল আলম চাষী ডাকতে শুরু করে।

১৯৭১ সালের ২৫/২৬ মার্চ পাকিস্তানী সেনাবাহিনী যখন বাংগালীদের গণহত্যা আরম্ভব করে, তখন মাহবুবুল আলম চাষী সময়িকভাবে কৃষিকাজ বন্ধ রাখার সিদ্ধান নেয়। সে তার কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং যোগাযোগ ব্যবহার করতে পারবে বলে মনে করে। যখন সফিউল আযম তার পদ আাঁকড়ে রইল মাহবুবুল আলম চাষী তখন সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে চলে গেলেও এ দু’জনের মধ্যে তেমন কোন পার্থক্য নেই। ১৯৭১ সালের এপ্রিলে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয়, মোশতাক অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি অথবা প্রধানমন্ত্রী এ দুটো পদ চেয়েছিল, কিন্তু না পেয়ে অনিচ্ছাসত্ত্বেও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ গ্রহণ করে। কিন্তু পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিসেবে সে খুব শীঘ্রই ধারণাতীত সুবিধা পেতে সফল হয়। মাহবুবল আলম চাষী ছিল পররাষ্ট্র সচিব। মোশতাক ও মাহবুবুল আলম চাষীর অপূর্ব সমন্বয়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিনষ্ট করার প্রচেষ্টাকারী আমেরিকান প্রশাসনের সাথে যোগাযোগের জন্য মাহবুবুল আলম চাষী হল আদর্শ মধ্যস্থাতাকারী এবং মোশতাক তার সহকর্মীদের অজান্তে পাকিস্তান সামরিক সরকারের সাথে একটা গোপন সমঝোতা করার চেস্টা করেছিল।
স্বাধীনতা সংগ্রাম চুড়ান্ত পর্যায়ে পৌছার সময় ষড়যন্ত্র প্রকাশ হয়ে পড়ে। মাহবুবুল আলম চাষীকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। মোশতাককে যদিও পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিসেবে রাখা হয়, কিন্তু প্রতিদানে তাকে নিস্ক্রিয় করে রাখা হয়।

এটা ছিল ষড়যন্ত্রকারী ও তাদের বন্ধুদের জন্য বিরাট আগাত। কিন্তু তারা শুধু প্রাথমিক পর্যায়েই হেরেছে। কিন্তু ভবিষ্যতে তারা সময়ের সদ্ব্যবহার করবে।

১৯৫৮ সালের অক্টোবরে সামরিক আইন জারি করা হলে পাকিস্তানী আমলারা দুর্দাশা ভোগ করতে শুরু করে, কিন্তু আইয়ুব খান তাদের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে এবং পরবর্তীতে আমলারা পূর্বের চেয়েও বেশী ক্ষমতাবান হয়ে উঠে। বাংলাদেশে অভ্যুত্থানকারীদের কোন ক্ষমতার ভিত ছিল না। তাদের কর্তৃত্ব প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে পড়ত। এমনকি যদি এটা তখনও তেমন সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়নি, কারণ তারা শুরু থেকেই আমরাদের উপর অধিকমাত্রায় নির্ভর হয়ে পড়েছিল।

নতুন সরকার সশস্ত্রবাহিনীর মূল পদগুরো তাদের নিজস্ব লোক দিয়ে পূর্ণ করে। ২৪ আগষ্ট সরকার জেনারেল (অবঃ) এম, এ, জি ওসমানীকে রাষ্ট্রপতির প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা পদে নিয়োগ করে এবং জেনারেল শফিউল্লাহর স্থলে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে সেনাবাহিনী প্রধান নিযুক্ত করে। ব্রিগেডিয়ার এ,এইচ, এম এরশাদকে মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি দেয়া হয় এবং সেনাবাহিনীর উপপ্রধান নিয়োগ করা হয়।

ওসমানী ১৯৭০ সালে এবং ১৯৭৩ সালে পুণরায় আওয়ামী লীগের টিকেটে জাতীয় সংসদে নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৭১ সালে তিনি বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনাযক এবং পরবর্তীকালে মুজিব সরকারের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। যখন বাংলাদেশে এক দলীয় ব্যবস্থার সিদ্ধান্তের ঘোষণা দেয়া হয়, তখন তিনি জাতীয় সংসদের সদস্য পদে ইস্তফা দেন। তিনি নিজে এটা করেছিলেন এবং তাকে কেউ বাধ্যও করেনি। তিনি দূরদৃষ্টি সম্পন্ন এবং সৎ হিসেবে পরিচিত ছিলেন, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে তিনি এতই সাদাসিধা ছিলেন যে অনেক সময় তিনি তার বন্ধুদের কাছে হাসির পাত্র হয়ে যেতেন।

যদি তার কোন জ্ঞান থাকত তবে তিনি অনুভব করতে পারতেন যে ষড়যন্ত্রকারীরা শুধু তার নামই ব্যবহার করতে চেয়েছিল এবং তাকে তাদের কোন কাজে রাখতে চায়নি। মোশতাকের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার পদে যোগদানে রাজী হয়ে তিনি অনেক বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেন এবং নিজেকে সন্দেহজনক প্রতিপন্ন করেন। তিনি যখন তার পদ থেকে পদত্যাগ করলেন তখন যা ক্ষতি হবার তা ইতিমধ্যেই হয়ে গেছে।

জিয়াউর রহমান যে সেনাবাহিনীর নতুন প্রধান হবেন এটি আগেই অনুমান করা গিয়েছিল। জিয়া এবং সফিউল্লাহ দু’জনেই ছিলেন এক ব্যাচের, কিন্তু জিয়া তার উচ্চতর যোগ্যতার জন্য জেষ্ঠ্যতা দাবী করতে পারতেন।

এরশাদের উন্নতি ছিল ষড়যন্ত্রমূলক, কিন্তু এটি সবার অলক্ষ্যেই পাস করা হয়। যেসব কর্মকর্তা স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিলেন তারা খুব দ্রুত পদোন্নতি লাভ করেছিলেন এবং কয়েকজন মেজর দু’তিনবছর পরই মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি পেয়েছিলেন। এরশাদ স্বাধীনতা যুদ্ধের অনেক পরে ১৯৭৩ সালে পাকিস্তান হতে পুনর্বাসিত হয়। তাছাড়া সে কোন সামরিক একাডেমী থেকে পাস করেনি, পাস করেছিল অফিসার ট্রেনিং স্কুল (ওটিএস) থেকে। অন্যভাবে বলতে গেলে সে সামরিক বাহিনীর সেরা অংশের অঙ্গীভুত ছিল না। যদিও সে ১৯৭৫ সালে তিন মাসের ব্যবধানে দুটি পদোন্নতি পেয়েছিলো, জুনে ভারতে ষ্টাফ ট্রেনিংয়ে থাকাকালীন ব্রিগেডিয়ার এবং আগষ্টে মেজর জেনারেল হয়। 
এমনকি বাংলাদেশে যেখানে দ্রুত পদোন্নতি হচ্ছিল তবুও এরশাদের উত্থান ছিল বিস্ময়কর। এয়ার ভাইস মার্শাল তোয়াব খানকে পশ্চিম জার্মানী থেকে আনানো হলো। সেখানে সে ন্যাটো বিমানবাহিনী স্কুলের প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পর জার্মান স্ত্রীর সাথে স্থায়ীভাবে বসবাস করছিল। অভ্যুত্থানের দুই মাস পর ১৬ অক্টোবর তাকে বিমানবাহিনী প্রধান বানানো হয়।

১৫ আগষ্ট সকালে সামরিক আইন জারির ঘোষণা দেয়া হলেও তার কোন কার্যকারিতা ছিল না, সরকারীভাবে সামরিক আইনের কোন ঘোষণা দেয়া হয়নি।

২০ আগষ্ট মোশতাক নিজের হাতকে আরো শক্তিশালী করার জন্য সামরিক আইনের বিধিবিধান জারি এবং বিশেষ আদালত স্থাপন করে।

সরকার দু’দিন পর উপলব্ধি করে যে তাদের কয়েকটি বিষয় পরিস্কার করা প্রয়োজন। বলা হয় সংবিধান এখনও বলবৎ রয়েছে এবং জাতীয়তাবাদ, ধর্ম নিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্র-চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতির কোন পরিবর্তন হয়নি, এমনকি সংসদও বাতিল করা হয়নি।

মোশতাক ১৯৭১ সালের প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের তার চার সহকর্মী নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমেদ, মনসুর আলী এবং কামরুজ্জামানকে তাদের কোন অসুবিধা হবেনা-এই আশ্বাস দিয়ে ভোলানোর চেষ্টা করে তার মন্ত্রিসভায় যোগ দিতে বলে। তাদেরকে ভোলাতে না পেরে হুমকি প্রদান করা হয়। কিন্তু তাতেও কোন লাভ হয়নি। কেউই রাজী হলেননা।

১৯৭৫ সালের ২৩ আগষ্ট সামরিক আইনের আওতায় চারনেতাসহ আরও কয়েকজন নেতাকে গ্রেফতার করা হয়।

জনৈক পাকিস্তানী সাংবাদিক একাজকে এক প্রকার অনুমোদন দিয়ে বলে, মোশতাক ভারতের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন হওয়ার কারণে তার মুজিবনগরের চারসহকর্মীকে গ্রেফতার করে।

যদিও ১৫ আগষ্ট মোশতাক তার ভাষণে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে পার্শ্ববর্তী একটি রাষ্ট্রের কথা উল্লেখ করে, তবুও সে স্বাধীনতা যুদ্ধে বহু ভারতীয় সৈন্যের জীবন উৎসর্গ করার কথা উল্লেখ করেনি। যদিও পরবর্তীকালে সে ভারতের সুনাম করেছিল। ২০ আগষ্ট ভারত এবং সোভিয়েত রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-এ তিনটি দেশের দূত মোশতাকের কাছে এলে সে ভারত ও সোভিয়েত রাশিয়াকে খুব ‘ভাল বন্ধু’ বলে উল্লেখ করে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে একিট ‘বন্ধু’ রাষ্ট্র আখ্যায়িত করে।

২৫ আগষ্ট মিসে ইন্দিরা গান্ধীর কাছে প্রেরিত এক বার্তায় বলে, “স্বাধীনতা যুদ্ধে ত্যাগ এবং সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এই দুই দেশের যে ভিত্তি স্থাপিত হয় তা এখনও অটুট রয়েছে। এই দুই দেশের বন্ধুত্বের কথা বাংলাদেশের জনগণ অত্যন্ত মূল্যবান মনে করে।” দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক চুক্তির প্রতি সম্মান প্রদান করে মোশতাক উপসংহারে আশাবাদ ব্যক্ত করে  বলে যে এই দুই দেশের সরকারের মধ্যে বন্ধুসুলভ, শান্তিমূলক সুসম্পর্ক থাকবে এবং কোন উত্তেজনা কিংবা উস্কানীমূলক সম্পর্ক থাকবে না।

দেশের চারদিক থেকে মোশতাকের উপর প্রবল চাপ আসতে থাকে। এর উপর সীমান্তে কোন ধরনের উত্তেজনা তার গদির জন্য হুমকি স্বরূপ হবে।

মিসেস গান্ধী প্রত্যুত্তরে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলে, “এই দুই দেশ এই অঞ্চলের উন্নতির জন্য একত্রে কাজ করবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের সবসময় দুই দেশের ত্যাগের কথা স্বরণ রাখতে হবে।” মিসেস গান্ধীর এই সঠিক এবং ঠান্ডা উত্তরকে বাংলাদেশের বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় ফলাও করে পরিবেশন করা হয় এবং একজন রেডিওর ধারাভাষ্যকার বাংলাদেশের নবসূচনার প্রতি ভারতের সাড়া দেয়ার প্রশংসা করে।

১৮৭৪ সাল পর্যন্ত চীন বাংলাদেশকে জাতিসংঘের সদস্য পদ লাভে বাধা প্রদান করে, যদিও তারা বলে মুজিবের বিরুদ্ধে কোন কিছু নেই। চীন মুজিব হত্যার ১৬ দিন পর ৩১ আগষ্ট বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়।

চীনের স্বীকৃতি বাংলাদেশে সম্ভাষিত হয়। সংবাদপত্রগুলো ভারতের বিরুদ্ধে চীনকে একটি বাধাপ্রদানকারী দেশ হিসেবে আখ্যায়িত করে। 
ঢাকার একটি দৈনিকে প্রথম পাতায় প্রকাশিত এক সম্পাদকীয়তে বলা হয় “এখন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত হল।”

পুরাতন জাতীয় পোষাক আর চলেনা। তাই অধিক ‘ইসলামসম্মত’ পোষাকের প্রয়োজন হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের জাতীয় পোষাক নির্ধারণ করার জন্য মন্ত্রিসভার বৈঠক চলাকালে মোশতাক তার টুপিটি টেবিলের উপর রাখে। মোশতাকের আভাস উপলব্ধি করতে পেরে একজন মন্ত্রী লম্বা গলাবদ্ধ কোট এবং টুপির পরামর্শ দেয়। সাথে সাথে তা গৃহীত হয়। 

জিন্নাহ’র টুপির স্থলে মোশতাকের টুপি ব্যাতীত সবই ছিল পাকিস্তানের জাতীয় পোষাক।

এত স্বল্প সময়ের মধ্যে কয়েকশ’ মোশতাক টুপি পাওয়া যায় কি করে? ভারতের নিকট ফরমাস দেয়া হয়।

সরকারী সব প্রকাশনাগুলোতে মোশতাক টুপির প্রদর্শনী করা হয়। শুরু হয় ক্ষমতার জন্য একধরনের যুদ্ধ এবং কেউ জানে নাে যে কে আসল শাসক। মেজররা রাষ্ট্রপতির নির্দেশ অমান্য করতে থাকে এবং সেনাবাহিনীর প্রধান দফতর থেকে রাষ্ট্রপতির কর্তৃত্ব এবং মেজরদের ব্যাপারে প্রশ্ন তোলা হয়।

একজন কর্মকর্তা সেনা সদর দফতর থেকে সরকারী সংবাদ মাধ্যম “বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার’ (বিএসএস) কার্যালয়ে একটি সংবাদদের ব্যাপারে ফোন করে কে সংবাদটি প্রেরণ করেছে তা জানতে চান। সংবাদটি রাষ্ট্রপতির তথ্য সচিবের কাছ থেকে এসেছিল। কর্মকর্তাটি সেই মুহেুর্তেই সংবাদটি প্রত্যাহার করতে আদেশ করেন। কার নির্দেশ মানা হবে? পাঁচ ওয়াক্তের স্থলে মোশতাক দৈনিক আরও বেশী সময় নামাজ পড়তে লাগল।

সূত্র : কারা মুজিবের হত্যাকারী? পৃষ্ঠা ২৩-৩৫