ঢাকা, রোববার, ১৭ অক্টোবর ২০২১, ২ কার্তিক ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

কারা মুজিবের হত্যাকারী?- তৃতীয় পর্ব

এ, এল, খতিব
প্রকাশিত: ১১ আগস্ট ২০২১ বুধবার, ০৮:০০ এএম
কারা মুজিবের হত্যাকারী?- তৃতীয় পর্ব

পাকিস্তানী সুর 
অধিকাংশ ক্ষেত্রে ‘গৃহযুদ্ধের’ দোহাই দিয়ে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতা থেকে হটিয়ে দিয়েছে।

‘ইসলাম বিপন্ন”- একথাটি পাকিস্তানে খুব বেশী শোনা যেত। ইসলামের দোহাই আজ থেকে নয়, পাকিস্তান বিভক্তির সময় থেকেই প্রচলিত এবং এ কারণেই মিশরের বাদশাহ ফারুক একবার বাধ্য হয়ে বলেছিলেন, ‘মনে হয় পাকিস্তান সৃষ্টি হবার পূর্বে ইসলাম বলতে কিছু ছিল না।’ বাদশাহ ফারুকের এই মন্তব্যকে একটু ঘুরিয়ে ঢাকার একজন সম্পাদক বলেন, “ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও বৃটিশদের সাহায্যে গড়া পাকিস্তান সৃষ্টির পূর্বে “ইসলাম কখনোই বিপন্ন ছিল না।” 

পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই ইসলাম বিপন্নের’ দোহাই দিয়ে সামরিক বাহিনীই আগে বা পরে ক্ষমতা গ্রহণ করবে এটাই ছিল পাকিস্তানের নিয়তি।

জেনারেল জিয়াউল হক খুব গর্বের সাথে বলেন, “পাকিস্তানে ঐতিহ্যগতভাবে সবসময় শান্তিপূর্ণ সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে আসছে।” পাকিস্তানের ঐতিহ্যই সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন করা।

অপরদিকে, বাংলাদেশের জনগণের সুদীর্ঘ রাজনৈতিক সঙগ্রামের ঐতিহ্য রয়েছে। সেই নেতা ও সামরিক জান্তাকে তারা কোনদিনই মেনে নেয়নি যারা সাম্প্রদায়িকতার দোহাইয়ের বিনিময়ে রাজনীতি করতে চেয়েছে। মুজিব নিহত হবার পর বাংলাদেশেও পাকিস্তানের মতো ‘ইসলাম বিপন্ন’ কিংবা ‘গৃহযুদ্ধের’ সুর শোনা যেতে লাগল।

স্বাধীনতার পূর্ব থেকেই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে এই ষড়যন্ত্রের শুরু এবং যারা মুজিবকে হত্যার ছক একেছিল তারাই হল সেই ষড়যন্ত্রকারী।

স্বাধীনতার বিরুদ্ধে তারা গোপনে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল কিন্তু সবার বিশ্বাস তারাও স্বাধীনতা সংগ্রামের সপক্ষে কাজ করেছে যা পরবর্তীকালে সামান্য সন্দেহের সৃষ্টি করলেও এটা ষড়যন্ত্রকারীদের দারুণভাবে সাহায্য করেছিল। এই ‘ক্যু’ যদি স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রকাশ্য বিরোধী শক্তি নিজেরাই করত, তবে খুব তাড়াতাড়ি বিরুদ্ধে তার প্রতিরোধ সৃষ্টি হতো। তাই তারা তা না করে এমন লোকদের দিয়ে অভ্যুত্থান ঘটিয়েছে যাতে সাধারণ মানুষের বুঝতে অসুবিধা হয়।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্টে মেজরদের নেতৃত্বাধীন আক্রমণকারী তিনটি দলই ছিল পাকিস্তানী সৃষ্টি এবং অন্যান্য পাকিস্তানী সামরিক কর্মকর্তাদের মতো তারাও মনে করত তাদের জন্মই হয়েছে ক্ষমতায় বসার জন্যে। এবং তারা জাঁকজমক মোহের শিকার-ফারুকের মধ্যে এ মনোবাব ছিল সবচেয়ে বেশী।
এই মেজরদেরই কয়েকজন ছিল পাকিস্তানের ‘অপারেশন ফনিক্স’ এর অংশ।

পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ইসলামের নামে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের উপর এতই জঘন্য অত্যাচার করেছিল যে দেশ স্বাধীন হবার পর অনেক মুক্তিযোদ্ধা প্রতিদিন প্রচলিত ‘ইনশাল্লাহ’ এবং ‘আস্্সালামু আলাইকুম’ শব্দ দুটি শুনলেও রাগে ফেটে পড়তো। তাদের এ ধরনের মনোভাব ব্যক্ত করার কারণ হল ইসলামের রক্ষক বলে দাবীদারদের হাতেই তাদের ভাই নিহত হয়েছে এবং লুন্ঠিত হয়েছে বোনের ইজ্জত।

পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর অতিমাত্রা অত্যাচার সম্পর্কে একজন খ্যাতনামা পাকিস্তানী সাংবাদিক অসহ্য হয়ে বলেন, “ এই সব ইসলামের রক্ষক বলে দাবীদাররা...... হলো খুনী, লুন্ঠনকারী এবং ধর্ষণকারী।”

কিন্তু পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে তাদের অপরাধ সম্পর্কে উল্লেসিত বোধ করে। পাকিস্তানী সেনা কর্মকর্তাদের দৃঢ় বিশ^াস ছিল তারা বাঙালীদের উপর হাজার বছর ধরে শোষণ চালিয়ে যাবে। ১৯৭১-এর এপ্রিলে যখন পাক হানাদাররা মনে করেছিল তারা বাঙালীদের চিরতরে স্তব্ধ করে দিয়েছে তখন পাকিস্তানী এক কর্ণেল মন্তব্য করে বলেন, পাকিস্তান এখন আর কায়েদে আযমের পাকিস্তান নেই। এটি একটি দখলকৃত অঞ্চল মাত্র। বাঙালীরা উপনিবেশের কথা বলছে। তারা একদিন এর অর্থও বুঝতে পারবে এবং তারা আর কোনদিন একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের কথা স্বপ্নেও কল্পনা করবে না।”

১৯৭১ সালে “ ডের স্পিগেল” নামে একটি সংবাদপত্রকে পাকিস্তানের একজন কর্ণেল বলেন, ‘এরকম ত্রাস সৃষ্টি করে ছড়িয়ে দিতে হবে যাতে করে আগামী তিন প্রজন্মের বাঙালীরাও স্বাধীনতার কথা চিন্তা না করে।”

যদিও চার বছর পূর্ণ হবার আগেই বাঙালীদের ওপর ইসলামের নামে পাক বাহিনীর বর্বরতার স্মৃতি ফারুক ও রশীদ বেমালুম ভুলে বসে।

১৯৭৬ সালের ৩০ মে ইংল্যান্ডের সানডে টাইমস পত্রিকাকে ফারুক বলে, মুজিব তার আস্তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। ইসলামই হচ্ছে আমার জনগণের ধর্ম এবং ইসলামই আমাদের এগিয়ে নিয়ে যেতে উদ্দীপনা যোগাবে।

ফারুক বলে যে, তার মতে বাংলাদেশের জন্য ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা সংগ্রামে ২০ লক্ষ লোক প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিল সাড়ে চার বছরের স্বল্প পরিসরেই সেই বাংলাদেশকে মুজিব প্রায় ধ্বংস করে দিয়েছিল। সংখ্যাটি ২০ লক্ষ নয় ৩০ লক্ষ।

কিন্তু ফারুক ভুল করে মুজিবের শাসনকাল একবছর বাড়িয়ে বলল যা একদম বেমানান। ফারুক বোধ হয় ভুলক্রমে ১৯৭২-এর ১০ জানুয়ারী পরিবর্তে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ থেকে হিসেব করেছিল। সেদিন মুজিব তার ঐতিহাসিক ভাষণে বলেন, “এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ 

ফারুকও কি ইয়াহিয়া খানের মতো স্বাধীনতা সংগ্রামে বাঙালীদের কষ্ট ও দুর্দশার জন্য মুজিবকে দায়ী করতে চায়, এ কতা বলার মতো সাহসও যেন তার না হয়?

যারা নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য ধর্মের দোহাই দিয়ে ক্ষমতায় আসত, ফারুক তাদের মতো অতিমাত্রায় কৃত্রিম বাগাড়ম্বরপূর্ণ বক্তৃতা দিতে লাগল। এমনকি মানসিক চেতনা আচ্ছন্ন পাকিস্তানী জেনারেল এবং নৈতিক চরিত্র কলুষিত অনেক রাজনীতিবিদরা একথা বলার ধৃষ্টতা দেখেয়েছিল বাঙালী নেতারা সত্যিকার মুসলমান নন।

তাহেরউদ্দিন ঠাকুর কুয়েতের দৈনিক আল রাই আল আমান পত্রিকাকে বলে, “ শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাই বাংলাদেশের গৃহযুদ্ধ রুখে দিয়েছে।”
 দেশকে গৃহযুদ্ধের হাত থেকে রক্ষার্থে নারী এবং এমনকি নিস্পাপ শিশুদেরও হত্যা করা এ যেন ভূতের মুখে রাম নাম।

ঠাকুর পরিতৃপ্ত ভঙ্গীতে আরও বলে, “শুধুমাত্র সরকারের ধরন পরবর্তনের জন্যই অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে, এজন্য আমরা স্বীকৃতি চাচ্ছিনা।’ এটি আর তেমন বেশী কিছু নয়।

এটি ছিল একটা ভিন্নধর্মী অভ্যুত্থানঃ জোরালোভাবে পরিবর্তন হল না, কিন্তু অবিরাম চলতে থাকল। ষড়যন্ত্রকারীরা তাদের, যারা তাদের শক্তি প্রয়োগের বিরোধিতা করতে পারে এবং চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে তাদের বিশ^াস করাতে চাইছিল যে তারা তাদের স্পর্শ করতে পারবে না- বরঞ্চ এতে করে ষড়যন্ত্রকারীদেরই লাভ হবে।

রশীদ এমনই একজন মুখপাত্র চাইছিল যে জনগনকে বোঝাতে সক্ষম হবে “আমাদের অপেক্ষা করে দেখতে হবে কি ঘটে।” একবার যদি তারা ইতস্ততার মধ্যে পড়ে যায় তাহলেই তাদের এ অভ্যুত্থানের গ্রহণযোগ্যতা আসবে এবং এতে করে ষড়যন্ত্রকারীরা খুব নিশ্চিতভাবে তাদের গন্তব্য পৌছাতে সক্ষম হবে।
১৫ আগষ্ট সকালে মেজররা যখন তাড়াতাড়ি মুজিবের নিহত হবার ঘোষণা দেবার ব্যাপারে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিল, ঠাকুর তাদের শিঘ্রী তা ঘোষণা করতে বলে। মুজিব নিহত হবার সংবাদ প্রচার করা একদিকে যেমন ঝুঁকিপূর্ণ অপরদিকে দেরীতে ঘোষণা দেয়া হলে তা হবে আরো বিপজ্জনক। সাধারণ জনগণের মধ্যে যদি এ বিশ্বাস ছড়িয়ে পড়ে যে মুজিব বেঁচে আছে, তাহলে তারা সামরিক আইন ভঙ্গ করে রাস্তায় নেমে পড়বে যেমনিভাবে রাস্তায় নেমেছিল পাকিস্তান আমলে।

ঠাকুরের হিসেব নিকেশ ঠিকই ছিলঃ মুজিব নিহত হবার খবর সবাইকে হতভম্ভ ও বোকা বানিয়ে দেয় এবং যারা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারত-অবশ্য কয়েকজন বাদেতারাও মনোবল হারিয়ে ফেলে। অধিকাংশই পালাবার চেষ্টা না করে নিজগৃহেই থাকার সিদ্ধান্ত নিল; যদিও তারা জনত তাদেরও নিহত হবার সম্ভাবনা রয়েছে।

আগষ্টের হত্যালীলা সম্পর্কে জনৈক ব্যক্তি তার এক বন্ধুকে বলেন, “ সেদিন সকালে আমার স্নায়ু বিকল হয়ে গিয়েছিল। বঙ্গবন্ধু নিহত হয়েছেন এটাই বড় কথা, আমার যা হয় হবে। পুরো ব্যাপারটাই আমার কাছে কেমন যেন এক প্রকারের ব্যর্থ ও অর্থহীন বলে মনে হল।” অথচ মন্তব্যকারী এই মানুষটি সম্পর্কে তার বন্ধু বলেছেন, ইনি ছিলেন একজন দৃঢ়চেতা ব্যক্তি।

অভ্যুত্থান সংঘটিত হবার পরে দৈনিক ইত্তেফাকের তরুণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন মঞ্জু দু’জন বিদেশী সংবাদদাতাকে বলেন, অভ্যুত্থানটি আমার কাছে মোটেই আকস্মিক ছিল না। কূটনৈতিক মহলে অনেকেই বেশ কিছুদিন যাবৎ এ নিয়ে আলাপ-আলোচনা করত। জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে আমাকে একজন কূটনীতিক জিজ্ঞেস করেছিলেন যে এটা কি ডানপন্থী অভ্যুত্থান না বামপন্থী অভুত্থান হবে।”

অদিকমাত্রার বামপন্থী বলে দাবীদার কিংবা কট্টর ডানপন্থীদের দ্বারাই একটি অভ্যুত্থানের প্রচেষ্টা নেয়া হতে পারে।

একই নদীর মধ্যে উৎপন্ন হয়েও যেমন স্রোতের গতিপথ পরিবর্তিত হয়, ঠিক তেমনি এই দুই দলের উদ্দশ্য এক হলেও পথ ছিল ভিন্ন।

মঞ্জু কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর আরও বলেন, “ শেখ মুজিব যখন উপলব্ধি করতে পারলেন যে তিনি দেশের সমস্যাগুলোর মোকাবেলা করতে পারবেন না তখনই তিনি আর বাঁচতে চাননি।”

মুজিব অধিকাংশ সময় মৃত্যুর কথা বলতেন। ঐতিহাসিক অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেয়ার পরদিন অর্থাৎ ৭১ সালের ৩ মার্চ ছাত্রলীগ আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় তার ভাষণে বলেন: আপনারা মনে রাখবেন যদি আমাকে মৃত্যুও বরণ করে নিতে হয়, তবুও আমি কোনদিন বাংলাদেশের জনগণের কল্যাণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবো না।”

১৯৭০ সালের ১৭ মার্চ মুজিব সেদিন ইয়াহিয়া খানের সাথে বৈঠকে বসেছিলেন সেদিন কয়েকজন সাংবাদিক মুজিবকে তার জন্মদিন উপলক্ষে শুভেচ্ছা জানান। সেদিন মুজিব সেই সব সাংবাদিকদের বলেন “আমার জন্মদিন কিংবা হোক আমার মৃত্যুদিন, আমি আমার জনগনের সাথেই আছি। আমার জনগণের কোন নিরাপত্তা নেই-তারা মারা যাচ্ছে।”

এই সময় মুজিবের কয়েকজন বন্ধু ইয়াহিয়া খানের সাথে তার বৈঠক ব্যর্থ হলে তাকে আত্মগোপন করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। মুজিব প্রত্যুত্তর করলেন “তারা যদি আমাকে খুঁজে না পায় তবে তারা ঢাকা শহর ধ্বংস করে দেবে।” তিনি এ  ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলেন। তার একজন ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহযোগী তাকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, “এবার তারা আপনাকে হত্যা করতে পারে।” মুজিব প্রতুত্তর করেন, “আমি আমার জনগণের স্বাধীনতার জন্য মরতেও প্রস্তুত আছি।” তিনি মনঃস্থির করে ফেলেন। তার বন্ধুদের বলার মতো আর কিছু ছিল না।

মুজিব নিজের প্রাণের বিনিময়ে হলেও তার জনগনকে হতাশ করবেন না। তার কোন মৃত্যুভয় ছিল না। তিনি একজন যোদ্ধা, কিন্তু পিছু হটবার পাত্র নন। বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনার জন্য তিনি যে বিপদের মুখোমুখি  হতে পারেন এব্যাপারে তিনি পুরোপুরি অবগত ছিলেন। তার এক বন্ধু সাবধান করে দিয়ে বলেন যে, তার দলের কয়েকজন সহকর্মীও তার এই দ্রুত পরিবর্তনের সিদ্ধান্তের কারণে তার বিপক্ষে যেতে পারেন। মুজিব প্রত্যুত্তরে বলেন, “পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু হলে তারা কোণঠাসা হয়ে পড়বে”। বন্ধুটি বলেন, “তারা আমার গলায় ফাঁসির দড়ি পরেছি। কিন্তু আমাদের একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেব বাঁচতে হলে আমাকেতো একটা কিছু করতেই হবে।”

আনোয়ার হোসেন (মঞ্জু) মানিক মিয়া নামে জনপ্রিয় তোফাজ্জল হোসেনের যিনি দ্বিতীয় পুত্র। মঞ্জু স্বাধীনতার পূর্বে একজন সংগ্রামী ছাত্র লীগার ছিলেন এবং ১৯৬৮ সালে আইয়ুব বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের চরম পর্যায়েও জড়িত ছিলেন। এমনকি তিনি শেখ কামালের সাথে রাতের বেলা ঢাকা সেনানিবাসে প্রবেশ করে দেয়ালে চিকা লিখতেন এবং পোষ্টার লাগাতেন।

মঞ্জু মুজিবকে ‘চাচা’ বরে ডাকতেন এবং তিনি মাঝে মাঝেই মুজিবের বাড়ীতে যেতেন। সেখানে তিনি পরিবারেরই একজন হিসেবে পরিগণিত হতেন।
মঞ্জু কয়েকদিন কলকাতায় কাটিয়ে ১২ আগষ্ট ঢাকায় ফিরে এলে মুজিবের রাজনৈতিক সহকারী তোফায়েল আহমেদ তাকে বলেন “বঙ্গবন্ধু তোমার উপর খুব রেগে আছে। তোমার উচিত তার সাথে দেখা করা।”

মঞ্জু পরেরদিন গণভবনে গেলেন। মুজিব তাহেরউদ্দিন ঠাকুরের সাথে লনে পায়চারী করছিলেন। মুজিব মঞ্জুর দিকে লাঠি নিয়ে একপ্রকার তেড়ে আসেন, মনে হচ্ছিল লাঠিটি যেন মঞ্জুর মুখেই পড়বে। মুজিব বলেন, ‘ তোর বন্ধুদের বলিস আমি ভয় পাইনা।’ বাঁশ মচকায় কিন্তু ভাঙ্গেনা, মুজিব ভাঙ্গবেন কিন্তু মচকাবেন না।

এটি ১৩ আগষ্ট অভ্যুত্থানের মাত্র দু’দিন পূর্বের ঘটনা।

ফারুক ১৩ আগষ্ট গণভবনে মুজিবের সাথে সাক্ষাৎ করছিল।

পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সৃষ্টি ফারুক ছিল সেরা অংশের মনোভাবাচ্ছন্ন এবং অধিকমাত্রায় চটপটে। তার অধীন ল্যান্সাররা ১৫ আগষ্টের অভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছিল, কালো ওভার অল, জ্যাক বুট এবং রিবেট পরিহিত এই ন্যান্সারদের পোষাক ছিল সেনাবাহিনীর অনন্য ইউনিটের চেয়ে ভিন্নধর্মী।

মুজিবের সাথে সাক্ষাৎ করে ফারুক তাকে পরামর্শ দেয় যে রাষ্ট্রপতির দেহরক্ষীদের উচ্চতা ৫ ফুট ৭ ইঞ্চি এবং একটু ভিন্নধর্মী পোষাক হওয়া উচিত। সে আরও বলে, শুধুমাত্র তখনই তাদের আকর্ষণীয় লাগবে। মুজিব প্রত্রুত্তর করলেন, ‘না।’ এটা বেশীরভাগ বাঙালীকে বাছাই থেকে বিরত রাখবে এবং তাদের অনুভূতিতে আঘাত করবে। এমনকি পাকিস্তানী সেনাবাহিনী, যা অনেক বছর পর্যাপ্ত সংখ্যক বাঙালীকে খাটো গড়নের জন্য স্থলবাহিনীতে ভর্তি করেনি, তারাও বাঙালী জোয়ানদের ভর্তির ক্ষেত্রে খাটোদের নিতে বাধ্য হয়েছিল।

 মোশতাক ১৩ আগষ্ট সন্ধ্যায় দেখা করতে মুজিবের বাসভবনে যায় এবং অধিকমাত্রায় রাসেলের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করে যা ছিল অন্যান্য দিনের চেয়ে ব্যতিক্রম।

১৩ আগষ্ট হাসিনা ব্রাসেলস থেকে তার মাকে ফোন করেন। বেগম মুজিব বলেন, ‘তাড়াতাড়ি ফিরে এসো। তোমাকে তোমার আব্বার প্রয়োজন। 
টেলিফোনে আমি তোমাকে এর বেশী বলতে পারবো না।” হাসিনার চার বছরের ছেলে জয় আলাপ-আলোচনা’র মাঝখানে বাধা দিয়ে তার নানীর কাছে মায়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানায়। তার মেয়েকে তাকে মেরো না,” বলেই বেগম মুজিব ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন।

মায়ের সাথে হানিার সেই ছিল শেষবারের মতো কথা বলা। সেই সন্ধ্যায় তার মায়ের ফুপিয়ে কাঁদার মতো এমন কি ঘটেছিল তা ভেবে হাসিনা কিছুক্ষনের জন্য বিস্মিত হয়ে পড়েন।

মুজিব ১৩ আগষ্ট আবদুর রাজ্জাককে বলেন, “ তোমার পুলিশ গার্ড রাখা উচিত।” বাকশালেল কার্যনির্বাহী পরিষদের একজন সদস্য হিসেবে রাজ্জাক মন্ত্রী পদমর্যাদার বলে তার পুলিশ প্রহরা রাখার অধিকার রয়েছে। দলের একজন নেতা হিসেবে তার বাড়ীতে পুলিশ প্রহরা রাখার অধিকার রয়েছে। দলের একজন নেতা হিসেবে তার বাড়ীতে পুলিশ প্রহরা রাখার ধারণা তার কাছে পুরানো ধাচের বলে মনে হয়। মুজিব  বলেন, আমি ইতিমধ্যেই মনিকে গার্ড রাখতে বলে দিয়েছি। তোমাদের দুজনেরই পূর্ব সতর্কতা রাখা উচিত। কারণ তোমাদের জীবনের প্রতি হুমকি রয়েছে।”

অভ্যুত্থানের অনেক পরে রাজ্জাক মুজিবের কথাগুলো স্মরণ করে আমাকে (এ,এল,খতিব) বলেন, “বঙ্গবন্ধু অন্যদের সাবধান করেছিলেন, কিন্তু তিনি নিজের জন্য পূর্ব সতর্কতা অবলম্বন করেননি।” কিছুক্ষণ বিরতির পর তিনি কথায় ফিরে এলেন, হয়তো বা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বঙ্গবন্ধুকে অপ্রাসঙ্গিক রাখার জন্যেই আমাদের বিপদের কথা বলেছিল।”

দেরীতে সর্বনাশের উপলব্ধি।

গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মৌচাকের মতো এমন ব্যক্তিদের দ্বারা পূর্ণ যাদের সাথে ছিল বিদেশী যোগাযোগ। ১৯৭৪ সালের জুনে ভুট্টো যখন ঢাকা সফরে আসেন তখন কয়েকজন গোয়েন্দা কর্মকর্তার হাবভাব ছিল দেখার মতো।

এটি ছিল ১৯৭৪ সালে গ্রীস্মকাল। এসময়েই ফারুক ও রশীদ মুজিবকে হত্যা করার জন্য প্রথম পরিকল্পনা করেছিল।

কয়েকজন উর্ধ্বতন বাঙালী গোয়েন্দা কর্মকর্তা স্বাধীনতার পূর্বে মুজিবকে বিভিন্ন তথ্য জানাতেন। যদিও এ তথ্যগুলোর মূল্য ছিল খুব সামান্যই-এমনকি অনেক সময় তার ভ্রান্ত পথেও চালিত করত, সম্ভবত কর্মকর্তারা তাদের প্রভুদের নির্দেশেই এ কাজ করত। কেননা তারা সবাই বিদ্রোহ ব্যর্থ করার প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছিল। বাস্তবিকই তারা বিরোধী লোক।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ রাতে পুলিশ ছিল পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর অন্যতম প্রধান লক্ষবস্তু। একজন সংগ্রামী বাঙালী জাতীয়তাবাদী মনে করার কারণে একজন বাঙালী পুলিশ সুপারিনটেনডেন্ট পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর হাতে নির্যাতিত হয়ে মারা যান, সামান্য কয়েকজন উর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দিয়েছিলেন, কিন্তু গোয়েন্দা কর্মকর্তারা শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানী সামরিক জান্তার অনুগতভাবে কাজ করেছে। এমনকি বাঙালী কূটনীতিকরা পাকিস্তানের দৃষ্টিভঙ্গীর সাথে দ্বিমত পোষণ করে পক্ষ বদল করলেও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা পাকিস্তানের প্রতিই বিশ্বস্ত থাকে। তারা পরিকল্পনা এবং ষড়যন্ত্রের সাথে এতই সম্পৃকক্ত ছিল যে তারা যে কোন মুহুর্তেই দলবদল করতে পারত। যদিও এতে তাদের মারা যাবার কিংবা মুখোশ খুলে যাবার ভয় ছিল।

মেজর জেনারেল (অবঃ) ফজল মুকিম খান তার ‘পাকিস্তানে নেতৃত্বের সংকট’ গ্রন্থে বলেছেন,“ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার অনেকে ব্যক্তিগতবাবে নিশ্চিত করতে চাইত যে মুজিব যেন  কখনও ক্ষমতায় না আসতে পারে।”

 গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর উচু পদগুলোতে খুব স্বল্প সংখ্যক ছিল বাঙালী। বাঙালীরা পাকিস্তানের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক। কিন্তু প্রশিক্ষণ এবং অধীনতার কারণে তারা ছিল পাকিস্তানী এবং তারা তাদের প্রভুদের প্রতি তাদের আনুগত্য প্রমাণ করতে অত্যুৎসাহী ছিল।

এ,বি,এস সফদার ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনের সময় পূর্ব পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান ছিল সে ছিল স্বল্প সংখ্যক বাঙালীদের মধ্যে একজন যাকে পাকিস্তানী সামরিক জান্তা পুরোপুরি বিশ^াস করতো।

পূর্ব পাকিস্তানে অনুষ্ঠিতব্য এই নির্বাচনের একমাস পূর্বে সফদার ধারণা দিয়েছিল যে, মুজিবের আর আগের সেই জনপ্রিয়তা নেই এবং তা ক্রমশ:ই কমে যাচ্ছে। তার নির্বাচনী ভবিষ্যদ্বাণী ছিল যে আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদের পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ৬০ শতাংশ অর্জন করবে। সে কয়েকজন বাঙালী কর্মকর্তাকে বলেছিল যে, আওয়ামী লীগ কোনক্রমেই পূর্ব পাকিস্তানের আসনগুলোর ৭০ শতাংশের বেশী পাবেনা। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা বিভাগে পাঠানো তার রিপোর্টে হয়তোবা সে আওয়ামী লীগের আরও স্বল্প সংখ্যক আসন পাবে বলে মত পোষণ করে থাকতে পারে।

আওয়ামী রীগ ১৬৭টি আসন লাভ করে। এটি আওয়ামী লীগকে ৩০০ আসন বিশিষ্ট জাতীয় পরিষদে নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পদান করে এবং সামরিক জান্তার পুরো হিসাবকে ভ্রান্ত প্রমাণিত করে। এরপরই জনগনের রায়কে রদ করার জন্য ষড়যন্ত্র শুরু হয়।

সাধারণ নির্বাচনের সময় পূর্ব পাকিস্তানের জনগনের মনোভাব বুঝতে ব্যর্থ হওয়া সফদারই একমাত্র গোয়েন্দা কর্মকর্তা ছিলেন না। কিন্তু সে তার ধারণা সত্য প্রমাণিত করার জন্য দু’একটি দলের মধ্যে কাজও করেছিল। সে ব্যর্থ হলেও পাকিস্তানের উভয় অংশের জন্য আতংক কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা ব্যুরোর (সিবিআই) পরিচালক এম,এ,রিজভীর আস্থা হারায় নি। সফদারকে পুনরায় বিদ্রোহ দমনের প্রশিক্ষণ গ্রহণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ পাকিস্তানী সেনাবাহিনী যখন বাঙালীদের উপর গণহত্যা শুরু করে সফদার তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আন্তর্জাতিক পুলিশ একাডেমীতে টেকনিক্যাল ইনভেস্টিগেশন কোর্ষ করছিল। তাকে পাকিস্তানে ফিরে আসতে নির্দেশ দেয়া হয় কিন্তু পাকিস্তানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জননিরাপত্তা কর্মসূচীর প্রধান জোসেফ কোর এব্যাপারে হস্তক্ষেপ করে তাকে তার কোর্স সম্পন্ন করার অনুমতি দিলেন। বিদ্রোহ দমনে পাকিস্তান যে যুদ্ধ দমনে পাকিস্তান যে যুদ্ধ করছিল তার প্রশিক্ষণ ঐ কাজের সহায়ক হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বন্ধুভাবাপন্ন দেশগুলোর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পুলিশ কর্মকর্তারা এ কোর্সের জন্য মনোনীত  হয়ে থাকে। এই প্রশিক্ষণের ব্যয়ভার বহন করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (ইউএসএইড) এবং সিআইএ-র প্রশিক্ষকদের দ্বারা মাঠ পর্যায়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়ে থাকে।

যারা এই প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছে তাদের মধ্যে কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা সতর্ক প্রহরারত গুপ্তঘাতক দল হিসেবে চিহ্নিত গুয়েতমালার “অজো পোর অজো” ( চোখের বদলে চোখ) এবং ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্রের লা ব্যান্ড-এর মতো দলের সদস্য ছিল। 

১৯৭১ সালের গ্রীস্মকালে স্বাধীনতা সংগ্রাম জয়ের দিকে এগোবার মুহুুর্তে তখন সফদার পূর্ব পাকিস্তানে প্রত্যাবর্তন করে তার গোয়েন্দা কার্যক্রম শুরু করে।

কেউ কেউ ভেবেছিল স্বাধীনতার পর সফদার নিজেকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে খুব অসুবিধায় পড়বে। কিন্তু আওয়ামী লীগের ভেতর তার বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী বন্ধু ছিল যারা কুখ্যাত আলবদর এবং রাজাকারদের স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি বলে পরিচিত তাদের চেয়েও বামপন্থী যে ব্যক্তিরা মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিল তাদের ব্যাপারে আরো বেশী সচেতনতা অবলম্বন করতো।

স্বাধীনতার পর সফদার প্রধানমন্ত্রীর প্রহরী দলের সদস্য নিযুক্ত হয়। তিক্তস্বরে একজন সরকারী কর্মচারী অভিযোগ বলেন, “একজন দালাল আমাদের বিচার করতে বসবে।”

প্রহরী দল ছির দুর্নীতি দমন কাজে নিয়োজিত। কিন্তু সফদারের উৎসাহ ছিল গোয়েন্দা কর্মকান্ড। তাই সে তার গোয়েন্দা সূত্র সমূহের সাথে যোগাযোগ অব্যাহত রাখে।

মুজিব বিশ^াস করতেন যে, যাদেরকে তিনি পুনর্বাসিত করতে সাহায্য করেছেন তিনি তাদের মন জয় করতে পেরেছেন এবং তারা তার প্রতি অনুগত থাকবে। কিন্তু পূর্বের মতো এসব সন্দেহভাজনক ব্যক্তিদের উচু পদে বসানো ছিল অনেকটা ফণা তোলা গোখরাকে পিঠ চুলকাতে দেয়ার মতো।

মুজিব নিহত হবার পরপরই মোশতাক সফদারকে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) মহাপরিচালক নিযুক্ত করে। অবশ্য ১৯৭৭ সালের ২ অক্টোবরের ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পর তাকে তার পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়।

পশ্চিম পাকিস্তানে কর্মরত আবু তাহের, জিয়াউদ্দিন, মঞ্জুর আহমেদ এবং আরও স্বল্প সংখ্যক বাঙালী সেনা কর্মকর্তঅ ১৯৭১ সালের এপ্রিলে পূর্ব পাকিস্তানে পালিয়ে আসেন। ‘ মেজরদের’ একজন মেজর শাহরিয়ার কোয়েটায় বালুচ রেজিমেন্টে কর্মরত থাকার সময় জুলাইতে সেখান থেকে পালিয়ে আসে।

যে খুব বড়াই করে মুজিবকে হত্যা করার আদেশ দিয়েছিল বলে বলে বেড়ায় সেই ফারুক’৭১ সালের অক্টোবরের দিকে যখন মোশতাক ও তার লোকদের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পথে এগিয়ে যাচ্ছে তখন বাংলাদেশের প্রতি ফারুক তার আনুগত্য প্রদর্শন করে।

নিজ জবানবন্দীতে মুজিবকে হত্যা করার কথা স্বীকার করা হাবিলদার মোসলেহউদ্দিন ১৯৭৩ সালে পাকিস্তান থেকে পুনর্বাসিত হয়। মুজিবের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে হুদা হতবুদ্ধি হয়ে গিয়েছিল এবং বঙ্গবন্ধুর প্রতি তার যে শ্রদ্ধা ছিল তা তাকে বন্দুকের গুলী ছোড়া থেকে বিরত রেখেছিল। মোসলেহউদ্দিন মুজিবকে পিছন থেকে গুলী করে। মোশতাকের শাসনামলের শুরুতেই মোসলেহউদ্দিন মুজিবকে পিছন থেকে গুলী করে। মোশতাকের শাসনামলের শুরুতেই মোসলেহউদ্দিন তার কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ ক্যাপ্টেন পদে পদোন্নতি পায়। ২/৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে পাল্টা অভ্যুত্থান সংঘটিত হবার পর সে দেশ ছেড়ে চলে যায়, কিন্তু একটা তার জঘন্য কাজের জন্য যথাযোগ্য পুরস্কার ছিল না। সে নিজেকে প্রতারিত মনে করল এবং রুষ্ট হল। সে আবারও নিজেকে সামনে নিয়ে আসার জন্য সে যে পথ জানত সেই পথে অর্থাৎ আরেকটি অভ্যুত্থানে অংশ গ্রহণ করে। দ্বিতীয়বারে সে ছিল হতভাগা।

১৯৭৭ সালের ২ অক্টোবর ব্যর্থ অভ্যুত্থানে সহযোগিতার অভিযোগে ঢাকা সেনানিবাসের বিশেষ সামরিক আদালতে তার বিচার শুরু হয়। সে দোষী প্রমাণিত হয় এবং তাকে সাথে সাথে ফাঁসিতে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়।

বিশেষ সামরিক আদালতে তার দেয়া সর্বশেষ জবানবন্দীতে সে স্বীকার করে যে ডালিম তাকে মুজিবের বিরুদ্ধে পরিকল্পনায় নিয়ে এসেছিল এবং মুজিবকে হত্যা করার জন্য ফারুক তাকে প্ররোচিত করেছিল। সে তখন মাতাল অবস্থায় ছিল এবং মুজিবের পরিবারের চারজন সদস্যকেও সে হত্যা করেছে।

মাতাল অবস্থায় সে কি করেছেতা সে জানত না?

মোসলেহউদ্দিন বলে যে তার মৃত্যুদন্ড হলো শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করার প্রতিদান এবং সবসময় তার দেশবাসী তাকে ঘৃণ্য খুনী হিসেবেই দেখবে। কিন্তু এটি পাপের জন্য মর্মপীড়ার আচরণ ছিল না। সে ছিল একজন কলংকিত খুনী, যদি ১৯৭৭ সালের ২ অক্টোবরের অভ্যুতথান সফল হতো তবে তার কথার সুর হতো ভিন্ন।

ফারুক ইসলামের নামে ল্যান্সারদের উত্তেজিত করেছিল এবং মোসলেহউদ্দিন বাংলাদেশে ইসলাম রক্ষার্তে মাতাল অবস্থায় আগাত করেছিল।

মুজিবের বাড়ীতে আক্রমনকারী দলকে নেতৃত্বদানকারী হুদা মুজিব ও তার পরিবারের হত্যাকান্ডের কয়েকদিন পর কিছু দিনের জন্যে উন্মাদগ্রস্থ হয়ে যায়। সে মানসিক চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়, এমনকি এখনও সে ১৫ আগষ্টের কথা বলার সময় নিজেকে জড়িয়ে ফেলে। সে শপথ করে বলেছে যে সে শেখ মুজিবকে হত্যা করার পরিকল্পনা জানত না। মুজিবকে শুধু নেমে আসতে বলা হয়েছিল। তারপর? নিরুত্তর।

মোসলেহউদ্দিনের মতো হুদাও বলেছে সে দেশবাসীর চোখে সবসময় ঘৃণ্য খুনী হিসেবে চিহ্নিত হবে। অভ্যুত্থানের তিন বচর পর একজন স্বদেশীর সাথে আলাপকালে সে স্বীকার করেছিল যে মুজিব বাঙালীর জাতীয় আত্মমর্যাদা পরিপূর্ণ করার জন্য চিন্তা করতেন। তবে সে কেন তা জনসমক্ষে বলে নি? হুদা প্রত্যুত্তরে বলে কিছুতেই তার অপরাধের প্রায়শ্চিত হবে না, তাকে (হুদা) কেউ বিশ্বাস করবে না এবং কখনোই ক্ষমা করা হবে না।

হুদার বক্তব্য হলো সে যখন মুজিবকে উপর থেকে নীচে নামিয়ে আনছিল তখন পিছন থেকে গুলীর শব্দ শুনতে পেয়ে সে মাটিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সে বলে তার সামরিক প্রশিক্ষণ তাকে রক্ষা করেছে। সে যে সিড়ি দিয়ে নীচে নামছিল তা ভুলে গিয়েছিল। নিশ্চিতভাবেই মুজিবের পুত্রেরা পিছন থেকে গুলি করেনি, মুজিব ছিলেন হুদার চেয়ে লম্বা এবং গুলী করলে তা তাদের পিতাকে আগাত  করতে পারতো।

‘হ্যাঁ, হুদা স্বীকার করল, এবং সে এব্যাপার নিয়ে আর কোন কথা বলতে চাইছিল না। শেষে সে বলে, “আমি মারা যেতে পারতাম, আমি মারা যেতে পারতাম।”

 সেদিন মুজিবের বাড়ীতে প্রহরার দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশ কর্মকর্তা মতের, হুদা উপর থেকে নীচে নেমে এসে বলে ‘আমি এটা করতে পারবো না, আমি এটা করতে পারবো না।’ সেই সমসয়ে ছাদ থেকে নেমে আসা মোসলেহউদ্দিন পিছন থেকে গুরী করা শুরু করল।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ একজন পাকিস্তানী সৈনিক মুজিবের কাঁধের পিছনে বন্দুকের নল ঠেকিয়েছিল। একজন পাকিস্তানী কর্মকর্তা আদেশ করে বলেছিল, “গুলী করো না।”

হুদা একটা বিষয় ব্যাখা করে যে সে তখন চাকরিতে ছিল। এটিও গুরুত্বপূহীন নয়। যে সেনাবাহিনীতে ছিল না তার শাহরিয়ারের সাথে হুদা সেরনিয়াবতের বাড়ীতে গিয়েছিল, শাহরিয়ার সেনাবাহিনীতে ছিল না। সে ছিল নুরুল ইসলাম মঞ্জুরের ভাই।

নুরুল ইসলাম মঞ্জুরকে দুর্নীতির অভিযোগে ১৯৭৫ সালের ২১ জুলাই যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রীর পধ থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। পরদিন সে বাকশাল থেকেও প্রাথমিকভাবে বহিস্কৃত হয়।

আক্রমণকারী দল কতখানি নিষ্ঠার সাথে তাদের দায়িত্ব পালন করেছে তা নিজ চোখে দেখার জন্য সে ১৫ আগষ্টের মহিমাপূর্ন সকালে সেরনিয়াবতের বাসভবনে উপস্থিত হয়। যখন সে বুঝতে পারল সেরনিয়াবতের ছেলে হাসনাত রক্ষা পেয়েছে তখন সে আক্রমনকারী দলকে অভিশাপ দিল।

নুরুল ইসলাম মঞ্জুর মোশতাকের মন্ত্রী সভায় যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী হিসেবে ফিরে আসল। হত্যাকা-ের পর সে বলে, তার পীর তাকে বলেছিল যে তার শত্রুরা আবর্জনায় নিক্ষিপ্ত হবে।

কয়েকজন ষড়যন্ত্রকারী ইত্তেফাক সম্পাদনা পরিষদের সভাপতি মইনুল হোসেন এবং মুজিব সরকারের প্রতিমন্ত্রী কে,এম, ওবায়দুর রহমানের বাসভবনে কয়েকবার মিলিত হয়। ওবায়দুর রহমানকে ত্রান তহবিল তসরুপ এবং তার জেলার দালালদের আশ্রয় দেয়ার অভিযোগে ১৯৭২ সালে আওয়ামী লীগের সমাজকল্যাণ সম্পাদকের পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়। তবুও তাকে ১৯৭৩ সালে প্রতিমন্ত্রী বানানো হল। অনেক আওয়ামী লীগার বলেন যে এটা একটা ভুল সিদ্ধান্ত ছিল, কিন্তু তারা কেউই ব্যাখা করতে সমর্থ হলেন না সীমাহীন অভিযোগের কারণে দল থেকে বহিস্কারের এক বছরের মধ্যে কিভাবে সে রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসিত হয়।

১৯৭৪ সালে ওবায়দুর রহমান তার বন্ধু ও ভক্তদের বলেছিল যে, সে শীঘ্রই পূর্ণমন্ত্রী হবে, কিন্তু সে পদোন্নতি আশা করছিল তা সে যখন পেলনা তখন সে ক্ষুব্ধ হয়।

তাহেরউদ্দিন ঠাকুরও তার প্রতিমন্ত্রী থেকে পূর্ণমন্ত্রীর পদে পদোন্নতি লাভের আমা করেছিল। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে মুজিব তাকে আওয়ামী লীগ প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয়ার সময়ও সে ইত্তেফাকের প্রধান সংবাদদাতা হিসেব বহাল ছির। মুজিব ১৯৭৩ সালে তাকে তথ্য প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ করেন। 
তথ্য মন্ত্রণালয় ছিল মুজিবের অধীনে। কিন্তু তাহেরউদ্দিন ঠাকুর স্বাধীনভাবে এর দায়িত্ব পালন করতো। দেশে পত্রিকার সংখ্যা কমানোর পদক্ষেপ তার দ্বারাই গৃহীত হয়েছিল। যার পলে যেসব সাংবাদিকরা তথ্য প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তার নিযুক্তিতে তাকে সম্বর্ধনা জানিয়েছিল তারাও তার বিরুদ্ধে চলে গেল।

এমন একটা ধারণা পোষন করা হতো যে ঠাকুর ছিল মুজিবের ঘনিষ্ঠ। যখন তিনি লাহোরে ইসলামী সম্মেলনে যোগ দিতে যান তখন তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ঠাকুরকে তার সাথে নিয়ে যান। কিন্তু মুজিব তার কয়েকজন বন্ধুকে বলেন যে ঠাকুর নিজেই নিজেকে বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতিতে ফেলেছে। মুজিব যখন ১৯৭৫ সালের ২৬ জানুয়ারী মন্ত্রীসভা পুনগঠিত করেন তখন তিনি পুরানো আওয়ামী লীগার কোরবান আলীকে তথ্যমন্ত্রী বানান। বড় হবার আশাকারী ঠাকুর বুঝতে পারল তার গুরুত্ব কমে গেছে। সে ক্ষুদ্ধ হয়ে পড়ে। তার একজন বন্ধু এতই হতাশ হয়ে গিয়েছিল যে সে মন্তব্য করে, দ্বিতীয় বিপ্লব যা ২৫ জানুয়ারী শুরু হয়েছিল তা ২৬ জানুয়ারীতেই সমাপ্ত হয়েছে।”

তারা যে পদোন্নতি সম্বন্ধে বলে বেড়াত তা না পাওয়াতে ওবায়দুর রহমান ও তাহেরউদ্দিন ঠাকুর মুজিবের বিরুদ্ধে গিয়েছিল-এ কথা চিন্তা করাটা হয়তোবা ভুল। কারণ ১৯৭৫ সালের ২৬ জানুয়ারী মন্ত্রী সভা পুনর্গঠনের কয়েকমাস পূর্ব থেকেই মুজিবকে ক্ষমতাচ্যুত করার ষড়যন্ত্রে তারা পুরোপুরি জড়িত ছিল।
স্বাধীনতার পূর্বে মোহাম্মদউল্লাহ আওয়ামী লীগের দফতর সম্পাদক ছিল। ১৯৭২ সালে সে জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পীকার হয়। স্পীকার আবদুল হামিদ চৌধুরী মৃত্যুবরণ করলে মোহাম্মদউল্লাহ তার স্থলাভিষিক্ত হয়। যখন আবু সাঈদ চৌধুরী রাষ্ট্রপতি পদ থেকে অব্যাহতি নেন তখন মুজিব ১৯৭৪ সালের ২৪ জানুয়ারী মোহাম্মদউল্লাহকে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ করেন। এটা ছিল তার জন্যে এমন কিছু যা সে স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি।

রাষ্ট্রপতি হওয়ার দিন মোহাম্মদউল্লাহ বলে, “আমি বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পরিপূর্ণ দেখতে চাই। আমি সারা বাংলাদেশের জনগণের মুখে হাসি দেখতে চাই।”

 মোহাম্মদউল্লাহ এক বছরের জন্য রাষ্ট্রপতি ছিল। যখন বাংলাদেশ রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির সরকার প্রবর্তিত হয়, মোহাম্মদউল্লাহ রাষ্ট্রপতি মুজিবের মন্ত্রীসভার মন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হয়। যে ব্যক্তি ভাগ্যচক্রে রাষ্ট্রপতির পদে উঠেছিল এটা ছিল তার জন্যে শোচনীয় এক অবতরণ।

মোশতাক ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট মোহাম্মদউল্লাহকে উপ-রাষ্ট্রপতি নিয়োগ করে। আবু সাঈদ চৌধুরী রাষ্ট্রপতির জন্য স্বস্তিকর ছিলেন না এবং তাকে তার পদ থেকে অব্যাহতি দেয়ার জন্য চাপ দিচ্ছিলেন, কিন্তু তিনি রয়েই গেলেন। তিনি জমি নির্মাণ বিলে এবঙ তার যে বাড়িতে জমি রয়েছে সে ব্যাপারে সম্মতি জানাতে ততক্ষণ দেরী করলেন, যতক্ষণ না তিনি ক্ষমতাচ্যুত হলেন।

চৌধুরীকে বিশেষ মর্যাদায় সাবেক রাষ্ট্রপতির মানানসই ভ্রাম্যামাণ রাষ্ট্রদূত নিয়োগ করা হয়। ১৫ আগষ্টের বড়জোর একসপ্তাহ পূর্বে তাকে মুজিব মন্ত্রীসভায় নেয়া হয়েছিল। 

যখন সরকার সিদ্ধান্ত নেয় যে, জাতীয় পরিষদের যেসব সদস্য নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাকশালে যোগদান করবে না তারা তাদের আসন হারাবে, জেনারেল (অবঃ) এম,এ,জি ওসমানী এবং মইনুল হোসেন জাতীয় পরিষদ থেকে পদত্যাগ করেন। জনৈক চিকিৎসক, যিনি এত তাড়াতাড়ি নতুন দল  গঠন করায় অসুখী ছিলেন তিনি মন্তব্য করলেন, “যখনই ওসমানী কোন কিছু অগ্রাহ্য মনে করতেন, তিনি তাড়াতাড়ি দল থেকে অথবা পদ থেকে পদত্যাগ করার চিন্তা করতেন। কিন্তু মইনুল হোসেনের গণতান্ত্রিক নীতি আগাতপ্রাপ্ত হবার কারণে তিনি পদত্যাগ করেননি। তিনি তার প্রভুর আশীবাদেই তা করেছিলেন।”

মোশতাক মন্ত্রীসভার একমাত্র নতুন মন্ত্রী  শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, যার নাম মুজিবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের সাথে গনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত ছিল। সে ছিল আওয়ামী লীগ সংসদীয় দলের চীফ হুইপ, কিন্তু একসময় সে মুজিবের গনিষ্ঠ ছিল ভাবা হলেও তাকে কখনোই মন্ত্রী বানানো হয়নি।

 মোশতাক মোয়াজ্জেম হোসেনকে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ করে।

আশ্চর্যজনকভাবে, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনই প্রথথশ পদস্থ আওয়ামী লীগার যে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের আমন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্র সফরে যায়। ১৯৭৩ সালের ২৮ অক্টোবর থেকে ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত তার সফর-সফল হয়েছে।

 মোশতাকের মতো মোয়াজ্জেম হোসেনও সবসময় আওয়ামী লীগের মধ্যে ডানপন্থী ছিল। যখন মোশতাক আওয়ামী লীগারদের জয় করার আশা ছেড়ে দিল এবং ডেমোক্রেটিক পার্টি গঠন করলো তখনও শাহ মোয়াজ্জেম তার সাথে ছিল। অপর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হলেন মইনুল হোসেন। এ তিনজন সবসময় একই রাজনৈতিক মৈত্রীতে আবদ্ধ।

মুজিব নিহত হবার সংবাদ রেডিওতে শোনার পূর্বে ভারতীয় একজন কূটনীতিক কিভাবে চিন্তা করেছিলেন যে মুজিব নিহত হয়েছেন? যখন এ প্রশ্নটি রাখা হয়, তিনি বলেন, “ সেখানে উত্তেজনা ছিল, সাধারণভাবে এটাই অনুমিত হচ্ছিল যে চরম কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে।” সামান্য বিরতির পর তিনি আরও বলেন, “বাঙালী পঞ্জিকা বাংলাদেশের একজন নেতা মারা যাবার ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল।

হয়তো ভবিষ্যদ্বাণীটি পড়েছিলেন। তিনি চিন্তা করলেন, কে হতে পারেন? ৮০ বছর বয়স্ক মওলানা ভাসানী আবারও হাসপাতালে। মুজিব হাসিনাকে বলেন, “ তোমার পিতাও হতে পারে?” হাসিনা প্রতিবাদের সুরে বলেন, “আপনার এধরনের কথা বলা উচিত নয়।” মুজিব ভালবাসার হাসি হাসলেন।

হাসিনাও চিন্তামগ্ন হন। ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর পাকিস্তানে সামরিক আইন আরোপিত হবার পর থেকেই তিনি তার বাবাকে প্রায়ই বলতে শুনেছেন পাকিস্তানী সেনাবাহিনী তাকে মেরে ফেলতে পারে। মুজিব তার মেয়েকে (হাসিনা) তার জন্মদাগগুলোর সাতে পরিচিত হতে বলেন, “কারণ তারা (পাকিস্তানীরা) আমাকে মেরে ফেলতে পারে এবং আমার মৃতদেহ আমার পরিবারের কাছে হস্তান্তর নাও করতে পারে। যার ফলে তোমাকে লাশ সনাক্ত করতে হতে পারে, কিন্তু তুমি যদি আমার জন্মদাগগুলো সাথে পরিচিত না থাকো তাহলে আমার লাশ সনাক্ত করতে অসুবিধা হতে পারে। কারণ আমার লাশ হবে ক্ষত-বিক্ষত।”

বাকশাল নেতাদের সরকার উচ্ছেদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়ে অভ্যুথানের পূর্বে যেসব উড়ো চিটি পাঠানো হয়েছিল তারা সেসব চিঠিগুলোকে গুরুত্ব দেননি। জনৈক এমপি যিনি মোশতাকের বাড়ীতে কি হচ্ছিল সে ব্যাপারে সন্দেহ করেন এবং তিনি তার ভয়ের কারণ শেখ মনিকে জানান। কিন্তু কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলো না।

মুজিব নিহত হবার বহুদিন পর একজন বাকশাল নেতা বিষন্নভাবে বলেন, “আমরা একটি চিলির মতো ষড়যন্ত্রের কথা বলতাম কিন্তু আমরা ভাবতাম, এটা কোনক্রমেই বাংলাদেশ কোনদিন ঘটতে পারে না।” এটা এমন কিছু যা শুধু বাংলাদেশে নয়, অন্যান্য জায়গাতেও ঘটেছিল।

১৯৭৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যে দিন চিলিতে আলেন্দে নিহত হন সেদিন জিল্লুর রহমান, শেখ মনি এবং আলতাফ হোসেন সমন্বয়ে গঠিত তিন সদস্যের প্রতিনিধিদল হ্যানয়ের পথে যাত্রাকালে রেঙ্গুনে ছিলেন। শেখ মণির তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ছিল “তারা এ ধরনের কিছু একটা বাংলাদেমেও ঘটাতে চেষ্টা করবে, এজন্যই আমাদের অস্ত্র আমাদের কাছ থেকে নিয়ে নেওয়া হয়েছে।”

প্রতিনিধিদলের সদস্যরা ঢাকায় ফিরে এসে মুজিবের সাথে সাক্ষাৎ করেন। মুজিবের পুরানো বন্ধু আলতাফ হোসেন তাকে বলেন, “আপনি যদি সতর্ক না হন তবে আপনিও আলেন্দের মতো একই ভাগ্য বরণ করবেন।” মুজিব  এটাকে কৌতুক ভেবে হেসে উড়িয়ে দেন। তিনি বলেন, “বাংলাদেশ চিলি নয়। আমি আমার জনগণকে চিনি।”

ফিদেল ক্যাষ্ট্রো মুজিবকে সতর্ক করে দিলেন,“আপনি যদি আপনার শত্রুদের সাথে বলিষ্ঠভাবে মোকাবেলা না করেন,তবে তারা আপনাকে সরিয়ে দেবে।” মুজিব ক্যাষ্ট্রোর কথার পুনরাবৃত্তি করলেও তিনি এ ব্যাপারে কোন পদক্ষেপই গ্রহণ করেন নি।

তার বিরুদ্ধে যে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে তা এব্যাপারে মিসেস গান্ধী ক্যাষ্ট্রোর চেয়েও অধিক স্পষ্টভাবে মুজিবকে বেশ কয়েকবার সতর্ক করে দিয়েছিলেন।
কিন্তু এসব সতর্কতাকে মুজিব হালকাভাবে নিলেন।

স্বাধীনতার পরে মুজিব অনেক সময় বলতেন, “একটি গুলী আমাকে ধাওয়া করছে।” কিন্তু তিনি তার মৃত্যু আশংকাকে মেনে নেননি। একজন মানুষ যদি মৃত্যুকে ভয় পায়, তবে কোথায় রইল তার মর্যাদা?

সাধারণ জনগণের সাথে মুজিবকে সহজভাবে মিশতে হবে।

“আমাকে আমার জনগণ ভালবাসে” মুজিব একথাটি প্রায়ই বলে ভাবতেন যে এটা হয়তো যাদুমন্ত্রের মতো তার জীবনে নেমে আসা যেকোন হুমকি থেকে তাকে রক্ষা করবে।

সূত্র : কারা মুজিবের হত্যাকারী? লেখক- এ,এল, খতিব, পৃষ্ঠা ৩৬-৪৭