ঢাকা, রোববার, ১৭ অক্টোবর ২০২১, ২ কার্তিক ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

কারা মুজিবের হত্যাকারী? -পঞ্চম পর্ব

এ, এল, খতিব
প্রকাশিত: ১৩ আগস্ট ২০২১ শুক্রবার, ০৮:০০ এএম
কারা মুজিবের হত্যাকারী? -পঞ্চম পর্ব

পারিবারিক ব্যাপার:
১৯৫৭ সালের ডিসেম্বরে পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর চোরাচালান বিরোধী ‘রুদ্ধদ্বার কার্যক্রম’ ছিল ১৯৫৮ সালের অক্টোবরে পাকিস্তানে সামরিক আইন জারীর মহড়া।

১৯৭৪ সালের শুরুতে সেনাবাহিনীকে চোরাচালান দমনে নিয়ে এসে মুজিব সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি বাড়িয়ে দিলেন এবং সেনা কর্মকর্তাদের ক্ষমতার স্বাদ দিলেন। কি করে মুজিব এটা করলেন, যিনি দর্ঘি বিশ বছরেরও বেশী সেনা শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন, তিনিই এ ভুলটি কি করে করলেন?

সামান্য কয়েকজন সম্মানিত ব্যক্তি বাদে, সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তা ও লোকদের সৎ হিসেবে খ্যাতি ছিল না। স্বাধীনতার পর পরই কিছু কর্মকর্তা ও সৈন্যরা ছিনতাইস নানা ধরনের অসামাজিক কাজে জড়িত ছিল বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। স্বাধীনতার পর পরই “ মেজরদের একজন’ বলপূর্বক একজন তরুণ মুক্তিযোদ্ধার গাড়ী নিয়ে নেয়। যখন তরুণটি তার গাড়ী ফেরত দেয়ার আবেদন জানান তখন মেজর তাকে ভীতি প্রদর্শন করে বলে, “আমি এই গাড়ীটিকে পছন্দ করেছি। ভদ্রলোকের মতো তোমার জন্য আরেকটি কিনে নিও।”

সশস্ত্র বাহিনী চোরাচালান দমন কাজে বর্বরতার সৃষ্টি করে। বিশেস করে কুমিল্লা জেলায়। তারা কয়েকজন বিশিষ্ট আওয়ামী লীগ নেতাকে গ্রেফতার করে। কুমিল্লা জেলায় বাড়ি হওয়ায় মোশতাকও উদ্বিগ্ন হয়। আওয়ামী লীগারদের মদ্যে সেও একজন যে সশস্ত্র বাহিনীকে এই কাজে নিয়োগ করা সমর্থন করেছিল, কিন্তু এখন সে তাদের প্রত্যাহার করতে চাইলে। সে এ ব্যাপারে সৈয়দ নজরুল ইসলামের কাছে সাহায্য চাইল।ৎতারা দুজন মুজিবকে বুঝাতে সক্ষম হলেন যে সেনাবাহিনী সরাসরি আওয়ামী রীগের বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে। রশীদ ছিল আর্টিলারীর দ্বিতীয় অধিনায়ক এবং ফারুক ছিল প্রকৃত প্রস্তাবে বেঙ্গল ল্যান্সারের অধিনায়ক। ১৯৭৪ সালের শেষ দিকে তারা সেনাবাহিনী সদর দপ্তরের কাছে ল্যান্সর এবং আর্টিলারীর সম্মিলিতভাবে নিয়মিত বিরতি দিয়ে ঢাকা বিমান বন্দরের নিকট রাত্রিকালীন অনুশীলন করার অনুমতি প্রার্থনা করে। সেখানে কোন সমস্যা ছিল না। অনুমতি পাওয়া গেল এবং এটি সরাসরি পশ্চাতের কারসাজি বলে প্রতিভাত হয়।

ট্যাংগুলোতে কোন গোলাবারুদ ছিলনা। রশীদের ভাষ্য অনুযায়ী সমস্ত ল্যান্সার কর্মকর্তাদের মধ্যে সামান্য কয়েকজনই তা জানত। বাজে কথা। ৭০০ ল্যান্সার যদি এই সত্যাটা জানত-তবে এটি খুব বেশীদিন ঢাকায় গোপন থাকত না। অন্ততঃ সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা এবং রক্ষীবাহিনীর কয়েকজন কর্মকর্তার এটি জানা উচিত ছিল। মুজিবের কয়েকজন রাজনৈতিক সহযোগী দাবী করেছেন যে, তারা মুজিবকে ট্যাংক সম্বন্ধে সাবধান করেছিলেন। তিনি যখন নিজেই ট্যাংকের ব্যাপারে সুখী ছিলেন না তবে কে তিনি তাদের বলেননি যে, ট্যাকংগুলোতে কোন গোলাবারুদ ছিলনা। মিশরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদত এই ট্যাংকগুলো মুজিবকে দিয়েছিলেন উপহার?

ফিল্ড ইন্টেলিজেন্স পরিচালক ব্রিগেডিয়া রউফ একমাস ছুটি কাটিয়ে ব্রিগেডিয়ার জামিলকে দায়িত্ব হস্তান্তর করতে দেরী করেন। ১৯৭৫ সালের এপ্রিলে এই ইউনিটের কয়েকজন কর্মকর্তা—হয় বই সংগ্রহ কিংবা ছবি দেখার বাহানায় ঢাকার বিভিন্ন কূটনৈতিক মহলে যাতায়াত করতেন। কিন্তু আসলে তারা মুজিব সরকার সম্পর্কে কূটনৈতিক মহলের ধারণা কি তা জানতে যেতেন। একজন কূটনীতিক আমাকে (খতিব) বলেন, “সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের একজন মেজর আমার কাছে কিছু ছবির বাহানা দিয়ে দেখা করতে চান। সে আসার পর আমার সাথে দেশের পরিস্থিতি নিয়েই আলাপ-আলোচনা করে। 

শেষের দিকে তার ছবির প্রসঙ্গ মনে পড়ে, সে ছবিগুলোর জন্য পরে আসবে বলে আমার কাছ থেকে বিদায় নেয়। সে আর কোনদিন আসেনি।

অনেকেই বিশ্বাস করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ১৪ আগষ্ট যে গ্রেনেড বিস্ফোরিত হয় তা ছিল কিচু গোয়েন্দা কর্মকর্তারা ছিল চরম অযোগ্য অথবা তারাও ষড়যন্ত্রের সাথে ছিল জড়িত। তারা যে মুজিব হত্যার দুস্কর্মে সহযোগী ছিল এটি সন্দেহ করার অনেক কারণ রয়েছে।

ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্য ডঃ মতিন চৌধুরী ১৫ আগষ্ট মুজিব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আগমন করলে তাকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একসেট চিত্রকর্ম উপহার দিবার সিদ্ধান্ত নেন। আগষ্টের প্রথম সপ্তাহে কলকাতা থেকে আসার পর এগুলো মিলিটারী ইন্টেলিজেন্সের দায়িত্বে ছিল। ডঃ চৌধুরী রাগান্বিত হলেন। একজন সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা তাকে বলেন,‘রাষ্ট্রপতির বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শনের সাথে সংযুক্ত সবকিছু আমাদের মাধ্যমে অনুমোদিত হতে হবে।’

অভ্যুত্থানের দুইদিন পূর্বে ঢাকা হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে (বর্তমান ঢাকা শেরাটন) ব্রিগেডিয়ার রউফ উচ্চস্বরে মুজিব বিরোধী কথা বলেছিলেন। সে দিন যারা তার সাথে মদ্যপান করছিলেন তারা তাকে নিবৃত করার চেষ্টা করলে তিনি বলেন, “ তোমাদের বঙ্গবন্ধুর সমাপ্তি হবে দুঃজনক।”

ফারুক বলেছে তার হিসেব ছিল সে পাগলের মতো জি,এইচ,কিউ এবং রক্ষীবাহিনীর দিকে গোলাবারুদ বিহীন একটি ট্যাংকের সারি নিয়ে যাবে এটি কেউ চিন্তাও করবে না। সব বিচারেই ফারুক দুঃসাহসী কর্মকর্তা হলেও সন্দেহাতীতবাবেই সে মূর্খের মতো সাহসী ছিল না। তার অধীনে মাত্র ৭০০ লোক ছিল এং যদি ঢাকা ব্রিগেড এবং রক্ষীবাহিনী যুদ্ধ করে এটাকে প্রতিহত করতে চাইত, তবে তার দাঁড়াবার কোন সমর্থই ছিল না। সে মোটামুটি নিশ্চিত ছিল যে, যারা জানত ট্যাঙকগুলো ছিল গোলাবারুদ বিহীন তারাও এটাকে ধোঁকা বলবে না। সে এব্যাপারটি নিশ্চিত করেছিল। 

সহায়ক বাহিনী আনসারের পরিচালক জহুরুল হক ১৫ আগষ্ট সকালে তার সহকারীদের এব্যাপারে জড়িয়ে না পড়ার উপদেশ দেয়। সে ছিল একজন দালাল স্বল্প সময় জেলখাটার পর সে পুনর্বাসিত হয়েছিল। এমনকি কয়েকজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা যারা স্বাধীনতা যুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন তারাও এ ব্যাপারটি থেকে নিজেদের সরিয়ে রাখতে চাইলেন। হয়তোবা তারা নিরাপদ থাকার এবং এই অভ্যুত্থান তাদের জন্য আরো লাভজনক হতে পারে বলে হিসেব করেছিলেন। এমনকি যদিও হাতেগোনা কয়েকজন নীচুসারির কর্মকর্তা অভ্যুথান সংঘটিত করে। নতুন শাসক গোষ্ঠীকেও তাদের উপর অনেকখানি নির্ভর করতে হবে। বিশ্বাস করার মতো অনেক কারণ রয়েছে যে কয়েকজন উধ্বৃতন কর্মকর্তাকে ‘নিরস্ত্র’ করা হয়েছিল। যাদের কেনা সম্ভব হয়নি।

‘নিরস্ত্রীকরণ’ কথাটা হুদা বারবার ব্যবহার করেছে। সে দাবী করেছে যে তার প্রধান কাজ ছিল মুজিবের বাড়ীতে প্রহরার দায়িত্বে নিয়োজিত সৈনিকদের ‘নিরস্ত্র করা।’ সে প্রহরীদের নিরস্ত্র করেছিল কিন্তু ১৫ আগষ্টের সকালে নয় সে বারবার বলেছে তারা তাকে ভালবাসতো, তার প্রতি ওদের ভালবাসার জন্য নিশ্চিতভাবে তার তাকে মুজিবের বাসার ভেতরে বিনা চ্যালেঞ্জে হাঁটাহাটি করার অনুমতি দেয়নি?

সামরিক বাহিনী এবঙ আধা সামরিক বাহিনীর কয়েকজন কর্মকর্তা ল্যান্সারদের মোকাবেলা করতে চাইছিলেন। সামান্য কয়েকজন বিমান বাহিনী কর্মকর্তা বলেন যে, তার ট্যাংকগুলোতে বোমা মারতে পারেন। ঢাকা ব্রিগেডের অধিনায়ক কর্ণেল সাফায়াত জামিল যুদ্ধ করে এটি প্রতিহত করার পক্ষে ছিলেন। তার লোকরাও তার সাথে ছিল। কিন্তু তার উর্ধ্বতন বলেন, ‘অপেক্ষা কর’, ষড়যন্ত্রকারীরা নিশ্চিতভাবে এটিই প্রত্যাশা করছিল।

কয়েকজন তাদের নিস্ক্রিয়তার ব্যাখ্যাদানের চেষ্টা করে বলেছে,“ট্যাংকগুলোতে যে গোলাবারুদ ছিল না তা আমরা জানতাম না।’ এমনকি ট্যাংকগুলোতে যদি গোলাবারুদ থাকতও তাহলেও ল্যান্সাররা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখিহতে পারত। যুদ্ধ করার জন্য তাদের শুধু মনোবলেরই অভাব ছিল।

ল্যান্সারা ছিল মো ৭০০ জন এবং খুব স্বল্প সংখ্যাক প্রশস্ত রাস্তা বিশিষ্ট ঢাকা ট্যাংক পরিচালনার জন্য উপযুক্ত ছিল না। কারণ ট্যাংকগুলো শহরের অলিতে-গলিতে যেতে পারবে না।

পাকিস্তানী ট্যাক এবং বন্দুক মুক্তিযোদ্ধাদের হতোদ্যম করতে পারেনি, রক্ষী বাহিনীরা ছিল মুক্তিযোদ্ধা। তাদের ভেতরে ছিল দলাদলি, কিন্তু তারা সবাই ছিল মুজিবের প্রতি অনুগত। তাদের শুধু প্রয়োজন ছিল নির্দেশের। তাদের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার নরুজ্জামান তখন লন্ডনের পথে এবং তার দু’জন সহকারীও ছিল ছুটিতে। কিবাবে চার প্রধান ব্যক্তির তিনজনই একই সময়ে ঢাকার বাইরে থাকতে পারে এ রকারণ নির্ণং অসাধ্য।

 তোফায়েল আহমেদ যিনি রক্ষী বাহিনীকে যুদ্ধের আদেশ দিতে দ্বিধা করেছিলেন তিনি বলেন, “তারা যদি সত্যিই যুদ্ধ করতে চাইতো এবং আমি যদি তাদের যুদ্ধের আদেশ দিতে অস্বীকার করতাম তবে তারা আমাকে হত্যা করতো।” তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী তিনি নেজেই শেরে বাংলা নগরে রক্ষীবাহিনীর ক্যাম্পে গিয়েছিলেন এবং কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা যারা প্রতিহত করতে চাইছিলেন তাদে রসাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেন। সে যদি ঐ মূহুর্তেই ক্যাম্প ত্যাগ না করে তবে তাকে হত্যা করা হবে বলে তাদের একজন তাকে হুমকি দেয়।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট অভ্যুত্থান সংঘটিত হবার চারবছর পর লরেন্স লিফসুল্্জ বলেন যে, কোন রাজনৈতিক পরিকল্পনা ছাড়াই তারা নিজেরাই যে এটি করেছে নীচি সারির কর্মকর্তাদের যে বক্তব্য- সেটি একটি ইতিকথা বলেও তাই পরে সত্য হিসেবে দাড়িয়ে যায়।’ বিদেশেী সাংবাদিকরা এই তিকথা ছড়াতে সাহায্য করেছেন।

মুজিব প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে গণভবনে কিংবা রাষ্ট্রপতি হবার পর বঙ্গভবনে বাস করতেন না। তবুও অনেক বিদেশী সংবাদদাতা যারা অভ্যুত্থানের পূর্বে বহুবার ঢাকায় এসেছিলেন ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্টের অধ্যায় সম্পর্কে তারা ধারণা করে লিখেছিলেন যে, মুজিব বঙ্গভবনে বাস করতেন। এটার মতো আরও কিছু ভুল উপেক্ষা করা হয়, এমনকি তাদের মৃত্যুর পরও। কয়েকটি পত্রিকা ও কিছু সংবাদদাতা হত্যাকারীদের এই অপকর্মকে বীরত্ব ও তাদেরকে আদর্শবাদী বলে আখ্যায়িত করে।

লন্ডনের ‘সানডে টাইমস’ পত্রিকা ফারুকের একিট প্রতিবেদনের ভূমিকায় বুঝাতে চেয়েছিল যে, মেজররা ‘জাতির জনকে শক্তিপ্রয়োগে হত্যা করতে বাধ্য হয়েছিল, কারণ তারা সংগ্রাম করে দেশে একটি উন্নত সংশোধন আনতে চেয়েছে।” এটা কোন সংগ্রাম নয়-ষড়যন্ত্র। ওদের চিন্তাধারা ছিল শুধু মুজিবকে হত্যা ও ক্ষমতা দখল করা।

লন্ডনের অপর একটি ৮দিনের সাময়িক পত্রিকা ফারুক ও রশীদকে আদর্শবাদী বলে প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, ইসলামিক বাংলাদেশ গতরাতে (রাতারাতি) বিলুপ্ত হয়েছে, ৭ কোটি মুসলমান নৈতিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষতায় ফিরে এসেছে। ধর্মপালনে পাশ্চাদপদ হয়ে অধর্ম ও অন্ধকারে? এমনকি যে, এসব তরুণ সেনা কর্মকর্তাদের অর্থ ও ক্ষমতার প্রতি ব্যক্তিগত উচ্চাভিলাস থাকতে পারে এটি এসব সাংবাদিকদের মনেই হয়নি।

লিফসুলজের সফলতা এই যে, তিনি তার ভুল স্বীকার করেছেন এবং তার ‘দি আনফিনিসড রেভ্যুলেশন’ গ্রন্থে সেই ভুল সংশোধন করার চেষ্টা করেছেন। তিনি বিনয়ের সাথে আকুল হয়ে বলেন,‘মূলতঃ অন্য কারো চেয়ে আসল অঙশগ্রহণকারীরাই জানত কি হয়েছে।’

প্রথমে যা ধারণা করা হয়েছিল-ষড়যন্ত্র ছিল তার চেয়েও অনেক ব্যাপক। কিন্তু এটি শুধুমাত্র কয়েকজন নীচুসারির সেনা কর্মকর্তার কাজ ঢাকার কেউই এক মুহুর্তের জন্যেও তা বিশ্বাস করেননি। ঢাকার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া ছিল যে, মোশতাকই এই হোতা। এমনকি আগষ্টের শেষ সপ্তাহে যেসব বিদেশী সাংবাদিক ঢাকায় এসে হোটেলে অবস্থানরত ছিলেন, তাদের তথ্যের জন্য বাধ্য হয়ে নির্ভর করতে হয়েছিল তাদের সাথে সাক্ষাৎকারী একজন স্থানীয় সাংবাদিকের ওপর। তারা ধোঁকা খেয়ে কোন প্রশ্ন করা ছাড়াই ষড়যন্ত্রকারীদের দ্বারা মিথ্যা প্রচারিত তথ্য গ্রহণ করেছিলেন।

এদের মধ্যে অনেকেই বাংলাদেশে যে কোন একটি দুর্যোগ ঘটবে স্বাধীনতার সময় থেকেই এসম্বন্ধে বহু প্রতিবেদন প্রকাশ করেন এবং তারা মিথ্যা গুজব প্রচার করতে কোন নৈতিক দ্বিধা অনুভব করেননি।

মার্কিন দূতাবাসের এজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা লিফসুলজের কাছে স্বীকার করেন যে, ১৯৭৪ সালে কয়েকজন কর্মকর্তা মুজিব সরকারকে উৎখাত পরিকল্পনার প্রস্তাব মার্কিন দূতাবাসে নিয়ে আসে এবং পরিকল্পনাকারী ও মার্কিন কর্মকর্তাদের মধ্যে কয়েক দফা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশে যদি কোন রাজনৈতিক পরিবর্তন হয় সেক্ষেত্রে মার্কিন সরকারের দৃষ্টিভঙ্গী কি হবে সে ব্যাপারে নিশ্চিত হবার জন্যই এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশে যদি কোন রাজনৈতিক পরিবর্তন হয় সেক্ষেত্রে মার্কিন সরকারের দৃষ্টিভঙ্গী কি হবে সে ব্যাপারে নিশ্চিত হবার জন্যই এই বৈঠকগুলো হয়েছিল। কিন্তু ঐ সময়ে ওয়াশিংটনে সিআইএ কর্তৃক বিদেশী নেতা হত্যার ব্যাপারে চার্চ ও পাইক কংগ্রেস কমিটির শুনানি চলছিল- যা সমস্ত মার্কিন কূটনীতিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের উদ্বিগ্ন রেখেছিল। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারীতে ঢাকার মার্কিন দূতাবাস পরিকল্পনাকারীদের সাতে যোগাযোগ ছিন্ন এবং নিজেদের এ ব্যাপার থেকে বাইরে রাখার সিদ্ধান্ত নেয়।

এটা একটি বিশ্বাসযোগ্য গল্প নয়। মোশতাক ১৯৭১ সালে আমেরিকার সাথে তার গোপন ব্যর্থ আঁতাতের কথা ব্যাখ্যাকালে অনুরূপ গল্প ফেদেছিল।

রিচার্ড নিক্সন ১৯৭৬ সালে সিনেট গোয়ন্দা কমিটিকে বলেছেন যে তিনি সালভাদর আলেন্দের ১৯৭০ সালের নির্বাচন বন্ধ করতে সিআইএকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি সবসময় বলতেন যে তিনি আলেন্দের নির্বাচনের পর সিআইকে সেখানকার বিরোধ সৃষ্টিকারী গুপ্ত কার্যক্রম বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ১৯৭৬ সালের ২২ জানুয়ারী সিআইএ’র প্রাক্তন পরিচালন রিচার্ড হেলম বিদেশ সংক্রান্ত সিনেট কমিটির কাছে স্বীকার করেন যে, তিনি আলেন্দের শাসনামলে চিলির রাজনীতিতে সিআইএর জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে কংগ্রেসকে ভ্রান্তির পথে পরিচালিত করেন।

১৯৭৫ সালের ৫ ডিসেম্বর ওয়াশিংটনে সিনেট গোয়েন্দা কমিটির চেয়ারম্যান সিনেটর ফ্রঙ্ক চার্চ বলেন যে, রিচার্ড নিক্ষনের প্রশাসনের সময়ে হোয়াইট হাউজের সাম্রাজ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গী ঔদ্ধত্যের সর্বোচ্চ সীমায় পৌছেছিল। চার্চ অভিযোগ করেন যে, আলেন্দের ক্ষমতাচ্যুত করার ব্যাপারে হায়াইট হাউজের মনোভাব ছিল দেখার মতো। “ভিয়েতনামের পর্যায়ে যদি এব্যাপারটি গড়ায় আমি সেখানে নৌবাহিনী পাঠাতে পারবো না, তাহরে আমি সিআইএ পাঠাবো।”

চাটের সমালোচনা হোয়াইট হাউজের ‘সা¤্রাজ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গীতে’ সামান্যই প্রভাব ফেলেছিল। নিক্সন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (সিআইএ) এবং সহযোগী সংগঠনগুলোকে ‘হীনবল’ করার জন্য কমিটির শক্তিপ্রয়োগের সমালোচনা করেন। যদিও তিনি ক্ষমতায় ছিলেন না তবুও তিনি উদ্ধতভাবে বলেন যে, এ শক্তিপ্রয়োগ ‘অবিশ্বাস্যরকম অদূরদর্শী’ যার কারণে “সমস্ত স্বাধীন জাতির নিরাপত্তায় সম্ভাব্য বিপদ হতে পারে।

যখন মার্কিন দূতাবাস পরিকল্পনাকারীদের থেকে দূরে থাকার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন হয়তো কয়েকজন কর্মকর্তা পরিকল্পনাকারীদের সাথে সরাসরি না হলেও অন্য কারো মাধ্যমে যোগাযোগ রাখতেও পারে।

যাই হোক, মার্কিন কর্মকর্তারা নিজে পরিকল্পনাকারীদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নিতে দেরী করে ফেলে। তারা তখন গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছিল।

অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা যেখানেই হয়ে থাকে না কেন, তা সম্পাদন করার সিদ্ধান্ত কিছুটা ঢাকা ও কিছুটা কুমিল্লাতে নেয়া হয়। ঢকা থেকে একশত কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কুমিল্লা ছিল পরিকল্পনাকারীদের বৈঠকের জন্য একটি সুবিধাজনক স্থান।

ডালিম কয়েক বছর ছাত্র হিসেবে এবং পরে একজন সেনা কর্মকর্তা হিসেবে কুমিল্লায় কাটিয়েছে। অভ্যুত্থানের সময় হুদা চিল কুমিল্লায় কর্মরত। ১৫ আগষ্টের নিয়তি নির্দিষ্ট সকালে মুজিবের বাড়ী প্রহাররত সৈন্যরাও ছিল কুমিল্লা সেনানিবাস থেকে আগত।

মেজররা ১৫ আগষ্ট বৈপ্লবিক অভ্যুথান ঘটানোর জন্য কুমিল্লায় অনেকগুলো বৈঠক করেছিল এবং সে সময়ে তাদের আলোচনাগুলো ছিল খুব উত্তপ্ত।
মোশতাক তাহেরউদ্দিন ঠাকুরের বাড়ী কুমিল্লা জেলায়। মাহবুবুল আলম চাষী ছিল কুমিল্লার বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমীর (বিএআরডি) উপ-পরিচালক।

যাট দশকের শুরুতে পাকিস্তানে প্রথম সামরিক শাসনাকালে আমেরিকার মূলধনে এই একাডেমী স্থাপন করা হয়। এটার প্রথম পরিচালক ডঃ আখতার হামিদ খান ছিলেন একজন পাঠান, তিনি কাদি পরিধান করতেন, ভালো বাংলা বলতেন এবং একাডেমীর আশেপাশের গ্রামগুলোতে প্রায়ই ঘুরে বেড়াতেন। তিনি কুমিল্লা সমবায় সমিতি চালু করেন এবং ধারণা করা হয়েছিল পল্লী উন্নয়ন নকশা হিসেবেই এটাকে ধারণা করা হয়। সমবায় সমিতিগুলোর পক্ষ থেকে প্রচুর পরিমাণে প্রচার চালানো হয় এবং আখতার হামিদ খানের কর্ম পাকিস্তান এবং তার বাইরেও স্বীকৃতি লাভ করে। কুমিল্লাতে পরীক্সা করার জন্য যে প্রচুর টাকার প্রয়োজন তা পাওয়া যাচ্ছিল না। এমনকি কুমিল্লা সমিতির সাফল্যও ছিল সাময়িক-যদিও এর পেছনে প্রচুর টাকা ব্যয় করা হয়েছিল। ভূমিহীন কৃষকদের সমবায় সমিতিতে নেয়া হয়নি এবং ছোটখাট চাষীদেরও ‘ম্যানেজমেন্ট’কে কিছু বলার ছিলনা।

ফ্রান্সের খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ ড্যানিয়েল থোরনার ১৯৭৩ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জঅতিক অর্থনীতি সমিতির সম্মেলনে বলেন যে, ১৯৭০ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৯৭১ সালের জানুয়ারী পর্যন্ত প্রতিষ্ঠাতা আখতার হামিদ খান যে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন তা ছিল “একটি জনতার আদালতে চীনা ধাঁচের স্বীকারোক্তি।

কিন্তু আখতার হামিদ খান মাহবুবুল আলমের চেয়ে বেশী সমাজসেবী ছিলেন না-কেননা সে ছিল ‘চাষী’। তারা দু’জনই উদ্বৃত্ত কৃষকদের সুবিধা রক্ষা করতে চাইছিল যাদের মধ্যে অনেকেই ছিল আইয়ুব খানের মৌলিক গণতন্ত্রের ব্যবস্থার একনিষ্ঠ সমর্থক। 

আইয়ুব শাসনামলের প্রদর্শনবস্তু কুমিল্লা একাডেমী ছিল ১৯৭৪ ও ১৯৭৫ সালে মোশতাক, তাহের উদ্দিন ঠাকুর ও মাহবুবুল আলম চাষীর মিলিত হবার স্থান। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বিশ্বাসঘাতকের ভূমিকা পালনকারী এ তিন জন সেখানে অনেকগুলো বৈঠক করেছে যার সন্দেহ জাগা উচিত ছিল। কিন্ত  যারা ১৯৭১ সালে তাদের পাকিস্তনী প্রভুদের বালোর জন্য কাজ করত সেসব ব্যক্তিদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর শীর্ষ পদগুলোতে আসীন রাখা হয়েছিল।

১৫ আগষ্ট একাডেমী প্রাঙ্গণে যে স্বনির্ভর বৈঠকগুলো হয়েছিল মাহবুবল আলম চাষীর সহকর্মীরা সে ব্যাপারে অবগত ছিল।

‘স্বনির্ভর’ অর্থ হলো ‘আত্মপ্রত্যয়ী’, এই স্বনির্ভর  ‘আন্দোলন’ শুরু হয়েছিল ১৯৭৪ সালের ১০ জানুয়ারী যখন ‘ সোনালী শত’ নামে একটি কর্মসূচী চালূ করা হয়। ১৯৭৪ সালের দ্বিতীয়ার্ধে বাংলাদেশের সতেরটি জেলার মধ্যে তেরটি জেলা বন্যায় আক্রান্ত হয়ে বিধ্বস্ত হয়। কুমিল্লার বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমী (বিএআরডি) বন্যা দুর্গতদের জন্য পূনর্বাসন কর্মসূচী চালু করে।

এ কর্মসূচীর নাম দেয়া হয় ‘সবুজ’। এটার নামদেয়া উচিত ছিল ‘কালো’। কেননা জাতীয় চরম দুর্দিনের এ সময়েই মুজিব হত্যার ছঁক ডানা মেলতে শুরু করেছিল।

১৯৭৪ সালের ২৭ জুন ভুট্টোর ঢাকায় পৌছার দিন মোশতাকের একজন প্রকৌকশলী বন্ধু প্রেসক্লাবের বাইরে অপেক্ষারত কয়েকজন সাংবাদিককে বলে যে বাংলাদেশে পাকিস্তানী বর্বরদের ছবি প্রকাশ করার অনুমতি দেয়ায় মোশতাক তাহেরউদ্দিন ঠাকুরের ওপর খুব রেগে গেছে। প্রকৌশলী বলেন, “তাহেরউদ্দিন ঠাকুর কেন হঠাৎ করে পাকিস্তান বিরোধী হলো। ভুট্টোর প্রতি বাংলাদেশের লোকের সম্বর্ধনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে তারা তাদের পাকিস্তানী ভাইদের সাথে আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়। আমি আশা করি তাহেরউদ্দিন এসব দেখে তার পূর্ব অবস্থানে ফিরে আসবে। এখন যদি সে মুজিবের আনুকূল্য লাভ করার কারণে মোশতাকের ঋন ভুলে যায় তবে তাকে এজন্য একদিন দুঃখ প্রকাশ করতে হবে। প্রকৌশলীটি কানে কম শুনত, তবুও সে প্রশংসা করে উচ্চস্বরে ও বিস্কৃতভাবে কথা বলছিল। তখন সেটানে উপস্থিত কেউই তাকে গুরুত্ব দেয়নি।

পরবর্তীতে ধারণা করা হয় যে মোশতাক ও ঠাকুরের মধ্যে বিভেদ এক ধূম্রজাল সৃষ্টি করার জন্য করা হয়েছিল। কিন্তু তা যদি সত্যি হয়ও, খুব শীঘ্রই তা মিটিয়ে ফেলা হয়েছিল।

১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ ছিল আমাদের চিন্তা শক্তিকে আচ্ছন্ন করে দেবার মত একটি করুণ ঘটনা। একদিন ঠাকুরর আমাকে (খতিব) জিজ্ঞেস করে, “আপনি কি মনে করেন আমরা এই চরম দুর্দশায় টিকে থাকতে পারব?” আমি (খতিব) বললাম, “ কেন নয়।”পরিস্থিতি খুব ভয়ানক হলেও হতাশার কোন কারণ ছিল না। কিন্তু ঠাকুরের হয়ত অন্য রকম চিন্তা ছিল। এখন আমার কাছে তার প্রশ্নের একটি ভূতাপেক্ষ অর্থ হয়ে রইর।

১৯৭৪ সালের জুনে ভূট্টোর সফরের সময় মুজিবের ভূট্্েরাকে প্রত্যাখ্যান করার পর পাকিস্তান বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ব্যাপক নোংরা প্রচার আরম্ভ করে। এই প্রচারের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল বাংলাদেশ যখন দুর্ভিক্ষ মোকাবেলা করছিল তখন। ১৯৭৪ সালের ১০ নভেম্বর বাহওয়ালপুরে ভুট্রো নিজেই বিদ্বেষ পরায়নভাবে বলে-বাংলাদেশে হাজার হাজার মানুষ ‘স্বাধীনতার ফল উপভোগ’ করছে।

মরে যাবার চিন্তাকারী মোশতাক ও তাহেরউদ্দিন ঠাকুরও সম্ভবত উপহার করছিল। তার দু’জন স্বনির্ভর আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য ব্যগ্রভাবে কাজ শুরু করে এবং দু’জন ঘনঘন একসাথে বিচরণ করতে থাকে। ১৯৭৫ সালের শুরু থেকে তারা আন্দোলনে এতই নির্বিষ্ট হয়ে পড়ে যে তারা তাদের মন্ত্রণালয়ে খুব কম সময়ই অবস্থান করতো।

তারা যে বীজ বুনেছিল তার তত্ত্বাবধান করতে থাকেঃ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট তারা ফসল তুলবে।

মুজিব হত্যার চল্লিশ দিন পর ২৫ সেপ্টেম্বরে স্বনির্ভর আন্দোলন ঢাকায় চালু করা হয়। এর একটি লক্ষ্য ছিল “সর্বত্র আত্মরক্ষার বন্দোবস্তের জন্য আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নতি করা।”

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় পাকিস্তানী সামরিক শাসকের অনেক দালালকে “আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা পদ্ধতিতে নেয়া হয়। তারা হল মোশতাক সরকারের প্রকৃত সহযোগী।

১৯৭৪ সালের গ্রীস্মকালে মুজিবকে সরানোর পরিকল্পনা শুরু হয়। এটি ভুট্রোর ঢাকা সফরের সমকালীন। অনেকেই এই সফরকে বাংলাদেশের ইতিহাসের চরম সন্ধিক্ষণ হিসেবে দেখেন। তখন পর্যন্ত সফরের প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিতটি সুস্পষ্ট না হওয়ায় তা ছিল উদ্বেগের। তা সত্ত্বেও সফরটি ছিল ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারীতে লাহোরে অনুষ্ঠিত ইসলামী কনফারেন্সের ‘ফলোআপ’।

১৯৭২ সালে জেদ্দা মুসলিম সম্মেলনে ইসলাম বিরোধী আন্তর্জাতিক শক্তির ষড়যন্ত্রের ফল হিসেবে বাংলাদেশের উত্থানকে খারিজ করে দেয়া হয়। ১৯৭৩ সালে মুসলিম দেশগুলোর কায়রো সম্মেলনে বাংলাদেশের কথা উল্লেখ করা হয়নি। কিন্তু ১৯৭৪ সালে মুসলিম দেশগুলো হঠাৎ করে বাংলাদেশকে ইসলামী বন্ধনে আনতে ব্যাকুল হয়ে পড়ে। পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিক এটিই তারা চাইছিল। ভুট্টো খুশী হয়ে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিল।

আনোয়ার সাদাত বলেন, মুসলিম দেশগুলো বাংলাদেশ এবং ‘ভ্রাতা মুজিবকে’ সম্মেলনে উপযুক্ত স্বাগত জানাবার ফলে ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারীর লাহোর ইসলামী সম্মেলনের ফলাফল শুভ হয়েছে।

কিন্তু একজন রাজনৈতিক ভাষ্যকার বাংলাদেশ সংবাদ চিঠিতে (মার্চ/এপ্রিল ১৯৭৪) লেখেন, “ভবিষ্যতে হয়তোবা ইসলামী সম্মেলন অধিক  অমঙ্গল সৃষ্টিকারী হিসেবে অথবা ইতিহাস গ্রন্থে পাদটীকা হিসেবে নির্বাসিত হয়ে যে কোন একভাবে স্মরণীয় হবে। আমাদের আশা করতে হবে এটা যাতে দেরীতে হয়, এজন্যে যে কোথায় এটা সঠিকভাবে অঙ্গীভূত হয়।

দরজা-বিশেষ দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মকে ফিরিয়ে আনা হয়। সমাবেশ ভালবাসা মুজিব, ইসলামী সম্মেলনে যোগ দিতে লাহোরে গিয়ে যে অভ্যর্থনা পেলেন তাতে তিনি অভিভ’ত হয়ে পড়েন। কিন্তু সম্মেলন তাঁর জন্য সম্পূর্ণ সুখকর ছিলনা এবং এটি হয়ত পরে তিনি ভেবেছিলেন।

ইসলামী সম্মেলনের পরপরই মুজিব অসুস্থ হয়ে পড়লেন, বেগম মুজিব লন্ডন থেকে পোষ্ট করা পাকিস্তানী ঠিকানা থাকা একটি চিঠি পেলেন। লেখক নিজেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন পদস্থ চিকিৎসক বলে দাবী করে বলেছে, তিনি ভীষণ ঝুঁকি নিয়ে লিখেছেন, কারণ তিনি মনে করেছেন তাকে ( বেগম মুজিব) সতর্ক করে দেয়া তার দায়িত্ব। তাকে এমন একটি ভাইরাস যোগাড় করতে বলা হয়েছিল যা মুবিকে স্বাগত জানাবার সময় কোলাকুলি কালে ভুট্টো যেন তা (ভাইরাস) মুজিবের শরীরে প্রবেশ করাতে পারে। তিনি রাজী হননি। কিন্তু তার ভয় ছিল যে অন্য কেউ হয়তোবা এই বাইরাসটি যোগাড় করবে। তিনি মুজিবের সুস্বাস্থ্যে কামনা করে ইতি টানেন।

শেখ মণি চিঠির একটি অনুলিপি গ্রহণ করেন।

পাকিস্তানী সেনাবাহিনীতে এনামের একজন চিকিৎসক ছিলেন, কিন্তু যে নিজের নামে চিঠি পাঠায় সে নিশ্চয়ই পাগল। এটি অবশ্যই একটি ক্ষতিকর চিঠি ছিল।

বেগম মুজিব মুজিবের লাহোর যাওয়ার বিরোধী ছিলেন বলে তিনি চরম উদ্বিগ্ন হলেন। এবং ঠিক এ সময়ে মুজিবের গ্রীবা আরোগ্য না হওয়ায় তার উদ্বিগ্নতা আরও বৃদ্ধি পায়।

মুজিব নিহত হবার একবছর পর ১৯৭৬ সালের আগষ্টে কলম্বোতে জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে আনোয়ার সাদাত বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে জিজ্ঞেস করেন, “আপনারা মুজিবকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারতেন, কিন্তু তাকে এবং তার পরিবারের সদস্যদের হত্যা করার কি দরকার ছিল?” রাষ্ট্রপতি সায়েম সব দায়িত্ব অস্বীকার করেন। সায়েম বলেন, “এটা পূর্ববর্তী সরকার করেছে। আমরা এব্যাপারে কিছুই করিনি।” কিন্তু সাদাত এমনভাবে অনবরত বলতে থাকেন যেন তিনি সায়েমের কথা শুনতেই পাননি, “আমি বাংলাদেশকে ঐসব অব্যবহারযোগ্য ট্যাংকগুলো দিয়েছি বলে দুঃখিত। আপনারা সেগুলো দিয়ে আমার বন্ধু মুজিবকে হত্যা করেছেন।”

যখন মুজিবের একজন আত্মীয় আনোয়ার সাদাত কি বলেছিলেন তা শুনলেন, তিনি তিক্তভাবে বলেন, “আনোয়ার সাদাত তার বন্ধু মুজিবের জন্য দুঃখ বোধ করছেন। তিনি এসব পুরাতন ট্যাংকগুলো থেকে দায়মুক্ত হবার জন্য উদ্বিগ্ন ছিলেন এবং বাংলাদেশকে উপহার হিসেবে এগুলো দেন। কিন্তু কার অনুরোধে তিনি এসব ট্যাংক বাংলাদেশে পাঠিয়েছিলেন?”

ট্যাংকগুলো রওয়ানা হবার পূর্ব মুহুর্তেও মুজিব এ সম্বন্দে কিছুই জানতেন না। কিন্তু এ ব্যাপারে সম্পর্কিত কিছু সই করার পর তিনি বলেন, “এটা পুনরায় ঘটা উচিত নয়।’ একবারই ছিল যথেষ্ট।

সিনাই মরুভূমিতে ব্যবহার করা পুরাতন ট্যাংগুলো ছিল বাংলাদেশে অব্যবহারযোগ্য। ১৯৭৪ সালে যখন তেলের মুল্য চতুর্গূণ হয়ে যায় তখন তাদের রক্ষণাবেক্ষণ করা ছিল বিলাসিতা যা বাংলাদেশের মতো একটি দেশ নির্বাহ করতে সক্ষম ছিল না।

একজন ব্রিগেডিয়ার বিকৃতভাবে মন্তব্য করেন, “ট্যাংকগুলো হয়ত যুদ্ধে ব্যবহারঅযোগ্য ছিল, কিন্তু সেগুলো মেজরদের অভীষ্ট সাধনে ব্যবহৃত হয়েছে।”

মুজিবের একজন তরুণ আত্মীয় বলেন, মামী ( বেগম মুজিব) বঙ্গবন্ধু মারা যাবার জন্য দায়ী। তিনি গণভবনে বাস করতে যেতে চাইতেন না। তার শ্রদ্ধার পাত্র মুজিবের মৃত্যু ছিল তার জন্য ধ্বংসের অভিজ্ঞতা। এবং কি ঘটেছিল তার জন্য তিনি ব্যাখ্যা চাইছিলেন। তিনি যা বুঝাতে চেয়েছিলেন তা তিনি বলতে পারেননি এবং পরবর্তীতে তিনি তার ভুল উক্তির জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন।

অনেকে যাদের মধ্যে কয়েকজন বিদেশীও রয়েছেন তারা মন্তব্য করেন মুজিব বেশীরভাগ সময় সুরক্ষিত গণভবনেই কাটাতেন। কিন্তু রাতের বেলা তার ধানমন্ডির নিজস্ব বাড়ীতে প্রত্যাবর্তন করতেন। যা ছিল সবদিকেই খোলা এবং খুব বিপজ্জনক।

যেকোন পাগল লোক মুজিবের বাড়ীল অসংখ্য জানালা দিয়ে শোয়ার ঘরে গুরীবর্ষণ করতে কিংবা লাগায়ো বাড়ী থেকে তাদের উপর বোমা ছুঁড়তে পারত।

১৯৭২ সালে বিদেশীরা মুজিবের সাথে সাক্ষাৎকালে গণভবন কিংবা তার বাড়ীতে শক্ত কোন নিরাপত্তা বেষ্টনী না দেখতে পেয়ে বিস্মিত হন। এমনকি একজন সাক্ষাৎপ্রার্থী কাঁধে ব্যাগ নিয়ে হেটে মুজিবের কাছে যেতে পারতেন। এমনকি পরবর্তীতেও নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল অপর্যাপ্ত।

১৯৭৫ সালের ৩০ মার্চ মুজিবের পিতা লুৎফর রহমান মারা গেলে সেদিন জনগণ মুজিবের শোয়ার ঘরসহ বাড়ীর সর্বত্র মৌমাছির ঝাঁকের মতো বিচরণ করেছিল।

মুজিব ব্যক্তিগত নিরাপ্তাকে সামান্যই গ্রাহ্য করতেন।

কেউ কেউ বিশ্বাস করেন মুজিব যদি গণভবনে বাস করতেন তবে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্টের অভ্যুত্থান ব্যর্থ হতে পারত। তাদের যুক্তি হল অভ্যুত্থানের অগ্রভাগের লোকরা গণভবন ভাঙ্গার জন্য খুব সামান্যই সময় পেত এবং এদিকে সাহায্য পৌছে যেতে পারত। তারা যুক্তি দেখান যে রক্ষী বাহিনীর ক্যাম্প অতি নিকটে ছিল।

কিন্তু এসব মতভেদ কি সত্যি হতে পারে যেখানে প্রায় সমস্ত প্রহরীদের ‘নিরস্ত্র’ করা হয়েছিল?

বেগম মুজিব তার স্বামীকে বলতেন ‘তুমি প্রধানমন্ত্রী হবার আগে এটা ছিল আমাদের বাসা। এ সময় ছেলেমেয়েরা গণভবনে বসবাস করতে অভ্যস্ত হতে গেলে তাদের ভিন্নধরনের জীবনে খাপ খাওয়াতে অসুবিধা হবে।’

যদিও তার গণভবনে স্থানান্তরের অনিচ্ছুকতার কারণ অজ্ঞগত। গণভবনে বসবাসে তিনি পুরোপুরি সহজ হতে পারতেন না। ঐতিহ্যগতভাবে তিনি ছিলেন তাদের মতো মহিলা ঘরই হয় যাদের জীবনের কেন্দ্র। তিনি কখনোই মুজিবের সরকারী ভ্রমনের সঙ্গী হতেন না।

মুজিব নিজেই গণভবন কিংবা বঙ্গভবনে বসবাসে খুশী ছিলেন এটিও অনিশ্চিত। একজন বাঙালী উপন্যাসিক সপ্রশংসভাবে বলেন, “অন্যান্য মধ্যবিত্ত বাঙালরি মতো মুজিবও তার বাড়ী ভালবাসতেন। তিনি যখন প্রধানমন্ত্রী হন তখনও তার বসবাসের ধরন পরিবর্তিত হয়নি। তার বাড়ীতে কোন গালিচা কিংবা নতুন আসবাবপত্র ছিল না। তিনি মাছ, মুড়ি,দই এবং গুড় পছন্দ করতেন। তিনি লুঙ্গি ও গেঞ্জী পরে বাসায় বিশ্রাম নিতেন। তিনি একজন মধ্যবিত্ত বাঙালীই থেকে যান।”

১৯৭০ সালে ছাত্ররা যখন মুজিবকে তার বাড়ীতে মাল্যভূষিত করে তখন তিনি মালাটি নিয়ে সয়েহে তার স্ত্রীর গলায় পরিয়ে দেন। মুজিব বলেন, “মালাটা তার পাওয়া উচিত।” যা ছিল তার মেধার প্রওতি সপ্রশংসে স্বীকৃতি। তিনি সারাজীবন শুধু তার স্বামীর রাজনৈতিক জীবনে শুধু পাশে থেকে উৎসাহই যোগাননি তিনি (মুজিব) জেলে থাকাকালীন সময়ে দলের কর্মীদের বিভিন্নবাবে সাহায্রও করেছেন।

১৯৬৮ সালের ডিসেম্বরে অনেক আওয়ামী লীগ নেতা উদ্বিগ্নভাবে চাইছিলেন আইয়ুব খান লাহোরে যে গোল টেবিল বৈঠক ডেকেছে তাতে প্যারোলে হলেও মুজিব অংশগ্রহণ করুক।

কিন্তু বেগম মুজিব এটি শুনতে পেয়ে তিনি তাড়াতাড়ি ঢাকা সেনানিবাসে গেলেন, যেখানে মুজিব ও আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যান্য আসামীদের রাখা হয়েছিল। তিনি বলেন, “তুমি তখনই বৈঠকে উপস্থিত হতে পারবে যখন মামলারসব আসামীকে মুক্তি দেয়া হবে।” সরকার যে তাদেরকে মুক্তি দেবে এ ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত ছিলেন। কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা বেগম মুজিবকে অভিশাপ দিল। কিন্তু আইয়ুব খানের সাথে যে কোনভাবে একটি সমঝোতায় পৌছাতে উদ্বিগ্ন দুর্বল জানুর রাজনীতিকদের চেয়েও তিনি যে অধিক রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সাহসের অধিকারিনী তাই তিনি দেখিয়ে দিলেন। মুজিব যদি তাদরে পরামর্শে মনোযোগ দিতেন তবে তিনি হয়তো রাজনৈতিক আত্মহত্যা করতেন।

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করা হলো। এটি ছিল পাকিস্তানের রাজনীতিতে নাটকীয় মোড়।

কয়েকজন বেগম মুজিবের দুঃসাহসিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের জন্য নিজেরা কৃতিত্ব নেয়ার অপচেষ্টা করে। এটা সত্যি যে কয়েকজন ছাত্রনেতা তার সাথে কথা বলেছিলেন কিন্তু তার কোন প্ররোচণার প্রয়োজন ছিল না। মুজিবের প্যারোলে গোল টেবিল বৈঠকে উপস্থিত হওয়া উচিত নয়-এসিদ্ধান্ত ছিল তার নিজস্ব। তার রাজনৈতিক প্রেরণা ছিল গভীর।

তা সত্ত্বেও উদ্বিগ্নের বছর-বিশেষ করে সে মাসগুলোতে যখন পাকিস্তানে দ্রুত নিয়ে যাওয়া তার স্বামীর ভাগ্য ছিল অজ্ঞাত,তখনও বেগম মুজিবের প্রাণশক্তি ছিল প্রবল। স্বাধীনতার পর তিনি সবকিছুর উর্ধ্বে থেকে শান্তি চাইলেন এবং তার নিজ পথেত থেকে তিনি তার স্বামীকে কোন দপ্তর রাখতে অনুমতি দেননি। তিনি অনেক সময় মুজিবকে বলতেন, “তুমি সবসময় যা করতে চাইতে তা করেছ। যেহেতু এখন বাংলাদেশ স্বাধীন অন্যদের দেশ দেখাশোনা করতে দাও।” মুজিব তর্ক করে বলতেন, তিনি তার দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারেন না। হাসিনা তার বাবাকে সমর্থন করতেন। বেগম মুজিব হাসিনার দিকে ফিরে বলতেন, ” তুমি তার পক্ষ নিয়ে কতা বলছ কেন?”

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ মুজিব গ্রেফতার হবার পর তার পরিবারের সদস্যরা কয়েকদিনের জন্য পালিয়ে  ছিলেন।

এক বন্ধু তাদের সীমান্ত পার হয়ে ভারতে চলে যাওয়া উচিত বলে পরামর্শ দিয়েছিলেন। তাদের কয়েকদিন হাঁটতে হবে। হাসিনা প্রথম সন্তানের প্রতীক্ষা করছিলেন,হাঁটার ব্যাপারে তিনি ছিলেন খুবই দূর্বল। বেগম মুজিব সিদ্ধান্ত নেন যাই ঘটুক না কেন তার পরস্পর একসাথে থাকবেন। তিনি তার এক সন্তানকেও পিছনে ফেলে যাবেন না।

তারা প্রতি ১৫ দিনের মধ্যে তিন থেকে চারবার স্থান পরিবর্তন করতেন, কেউ তাদের বেশী দিনের জন্য আশ্রয় দেয়া নিরাপদ ভাবেননি। ঢাকার একটি “দৈনিকের একনজ সম্পদক তাদের ঠিকানা খুঁজে পাবার পরদিন সামরিক কর্তৃপক্ষ তাদের খোঁজ পেয়েছিল, কিন্তু হয়তো এটি নিছক সদৃশ্য মাত্র।

নয় মাস ছিল দুঃস্বপ্নের অনুসরণ। প্রহারারত সৈন্যরা সারা রাত চত্বরে হাঁটাচলা করত,তারা যখন চাইতো বাড়ীর বাতি জ¦ালাত কিংবা নেভাতো এবং কোন কিছুর ছুতায় বা অন্য কারণে যে কোন সময়ে যে ে কান ঘরে প্রবেশ করতো।

কিছু সেন্য বেগম মুজিবকে প্রার্থনা করতে দেখে তার মেয়েদের জিজ্ঞেস করে,“ তোমাদের মা কি হিন্দু নয়?” তাঁরা বলেছেন যে তাদের বাবার মতো তিনিও টুঙ্গপিাড়া থেকে আগত একজন শেখ। সৈন্যরা বলেছে, “ আমরা জানতাম তিনি কলকাতা থেকে আসা একজন হিন্দু।” এমনকি যদিও তারা তাকে প্রার্থনা করতে এবঙ রমজান মাসে রোজা পালন করতে দেখেছিল-তবুও তাদের মধ্যে কয়েকজন শেষ পর্যন্ত বিশ্বাস করতো যে বেগম মুজিব হিন্দু ছিলেন। এসব লোকগুলো এতই গুনসম্পন্ন ছিল যে তারা প্রায় উদ্ভট মিথ্যাকেও বিনা প্রশ্নে গ্রহণ  করতো।

বেগম মুজিব সেনাবাহিনীর লোকদের ভীষণ ভয় করতেন এবং তিনি তাদের চেহারা দেখা সহ্য করতে পারতেন না, এটি সত্যিই বিস্ময়কর। এমনকি স্বাধীনতার পরও তার সেনাবাহিনীর লোকদের ভীষণ ভয় পাওয়াটা ছিল অপরিবর্তত।

মুজিবের বাড়ীতে প্রহরা দেয়া সৈন্যদের সম্বন্ধে তিনি তার স্বামীকে অনেক সময়  বলেছেন, “এসমস্ত লোকরা একদিন তোমর বিরুদ্ধে তাদের বন্দুক প্রয়োগ করবে।”

সূত্র : কারা মুজিবের হত্যাকারী? লেখক- এ,এল, খতিব, পৃষ্ঠা ৫২-৬২