ঢাকা, মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২০, ২৬ শ্রাবণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

পতিত হওয়া এক নক্ষত্রের জন্মদিন আজ

স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৭ জুলাই ২০২০ মঙ্গলবার, ১০:০৭ এএম
পতিত হওয়া এক নক্ষত্রের জন্মদিন আজ

বলবয় থেকে একটি দেশের ক্রিকেটের পোস্টার বয় হয়ে ওঠার গল্পটা আমরা সিনেমাতে দেখতে পারি, কিংবা কোন গল্পের জন্যেও মানানসইও। তবে বাস্তবতা কতটুকু? বাস্তবতা সম্পূর্ণ। বাউন্ডারি লাইনের পাশে বল কুড়িয়ে ফেরত দেওয়া ছেলেটাই উইলো হাতে একটি দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তাঁর ব্যাটেই নির্ভর করেছে টাইগারদের ম্যাচ জয়ের সম্ভাবনা। কট্টর সমালোচকরাও বিশ্বাস করতেন ২২ গজে সে টিকে গেলে সম্ভব যে কোন কিছু। উজ্জ্বল সম্ভাবনা নিয়ে আবির্ভূত সেই ক্রিকেটারের নাম মোহাম্মদ আশরাফুল। বাংলাদেশের ক্রিকেটের প্রথম তারকার জন্মদিন আজ। শুভ জন্মদিন আশরাফুল।

১৯৮৪ সালের ৭ই জুলাই ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন আশরাফুল। তার ডাকনাম মতিন। তবে ভক্তদের নিকট এই নামটি অপরিচিতই বটে। অ্যাশ নামেই সমধিক পরিচিত তিনি। ২০০০ সালে প্রথম শ্রেনীর ক্রিকেটে অভিষেক হওয়া এই ডানহাতি ব্যাটসম্যান ঠিক পরের বছরে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে পা রাখেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে। শুরু থেকেই কিশোর আশরাফুলের তারকাখ্যাতি দর্শক-সমর্থকদের প্রত্যাশার পরিমাণটা বাড়িয়ে দিলেও বাংলাদেশ ক্রিকেটের প্রথম তারকা নিজের জাত চেনাতে সময় নেন খানিকটা।

শ্রীলংকার বিপক্ষে ২০০১ সালে কলম্বো টেস্টে ১১৪ রানের এক ঝলমলে ইনিংস খেলেন আশরাফুল। যদিও সেই ম্যাচে বাংলাদেশ হেরেছিল ইনিংস ও ১১৫ রানের বিশাল ব্যবধানে, আশরাফুল কিন্তু ঠিকই তার প্রতিভার জানান দিয়েছিলেন। এরপর আবার এক দীর্ঘ অপেক্ষা। ২০০৪ সালে ঢাকায় ভারতের বিপক্ষে টেস্টে ১৯৪ বলে ১৫৮ রানের এক বিস্ময়কর ইনিংস খেলে পুরো ক্রিকেট বিশ্বকেই তাক লাগিয়ে দেন অ্যাশ। তৎকালীন ভারতীয় অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলি আশরাফুলের সেই ইনিংসটিকে তাঁর দেখা ‘অন্যতম সেরা ইনিংস’ বলে অভিহিত করেন।

পরের বছর ২০০৫ সালে আশরাফুল তার ক্যারিয়ারের তো বটেই, সম্ভবত বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসেরই অন্যতম সেরা ইনিংসটি খেলে ফেলেন। ১৮ জুন কার্ডিফে ন্যাটওয়েস্ট সিরিজে রিকি পন্টিংয়ের নেতৃত্বে হেইডেন, গিলক্রিস্ট, ম্যাকগ্রা, ব্রেট লি আর গিলেস্পিদের নিয়ে গড়া সেই অস্ট্রেলিয়া দলটিকে ক্রিকেট ইতিহাসেরই অন্যতম সফল দল বলা হয়। একের পর এক সিরিজ জিতে উড়তে থাকা অস্ট্রেলিয়াকেই ন্যাটওয়েস্ট সিরিজের সেই ঐতিহাসিক ম্যাচে মাটিতে নামিয়ে আনে বাংলাদেশ দল। আর এই দুঃসাধ্য সাধনে যিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন তিনি মোহাম্মদ আশরাফুল।

তারকাখচিত ব্যাটিং লাইনআপ নিয়েও সেদিন বাংলাদেশ এর মিতব্যয়ী বোলিং এর বিপক্ষে ২৫০ এর বেশি রান করতে পারেনি অস্ট্রেলিয়া। জবাবে শুরুটা একেবারেই জয়সুলভ ছিল না বাংলাদেশের। কিন্তু অধিনায়ক হাবিবুল বাশারের সাথে ১৩০ রানের জুটি গড়ে দলকে জয়ের বন্দরে পৌছে দেন আশরাফুল। তার ১০১ বলে ১০০ রানের মহাকাব্যিক ইনিংসে ভর করেই অজিদের হারিয়ে দেয় টাইগাররা। আজও ক্রিকেটপ্রেমীদের চোখে ভাসে অ্যাশের সেই অনবদ্য ইনিংসটি।

ন্যাটওয়েস্ট সিরিজটি স্মরণীয় করে রাখতে কার্ডিফের ইনিংসটিই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু অ্যাশ তা মানবেন কেন? তাই তো পরের ম্যাচেই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আবার জ্বলে ওঠে তার ব্যাট। ইংলিশ বোলারদের নাস্তানাবুদ করে ৫২ বলে ৯৪ রানের এক অতিমানবীয় ইনিংস খেলেন বাংলাদেশের লিটল মাস্টার। ১৬৮ রানের বিশাল ব্যবধানে সেদিন টাইগাররা হারলেও ব্যাক্তিগতভাবে অ্যাশ সফল ছিলেন পুরোপুরি। ন্যাটওয়েস্ট সিরিজের পর তার ব্যাটে আবার একটি আশরাফুলীয় ইনিংস দেখতে অপেক্ষা করতে হয় ২০০৭ সাল পর্যন্ত।

২০০৭ সালের একদিনের ক্রিকেট বিশ্বকাপের কথা। ভারতকে হারিয়ে অঘটনের জন্ম দিয়ে সুপার এইটে বাংলাদেশ। প্রত্যাশা সেখানেই পূরণ হয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশের। কেবল যেন অপেক্ষা ছিল একটি আশরাফুলীয় ইনিংসের। ৭ এপ্রিলে গায়ানার প্রভিডেন্স স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ বনাম দক্ষিণ আফ্রিকার ম্যাচটি যেন ছিল শুধু আশরাফুলের একটি অসাধারণ ইনিংসেরই জন্যই। আশরাফুলের ৮৩ বলে ৮৭ রানের চোখ ধাঁধানো ইনিংসে সব ধারণা পাল্টে গেলো। একের পর এক অসাধারণ সব শট খেলে বাংলাদেশের স্কোরকার্ড সচল রাখেন তিনি একাই। সেঞ্চুরি না করতে পারলেও বাংলাদেশকে এনে দেন ২৫১ রানের লড়াকু এক স্কোর। জবাবে ১৮৪ রানেই অলআউট হয় দক্ষিণ আফ্রিকা। বাংলাদেশ পায় ৬৭ রানের এক ঐতিহাসিক জয়।

মূলত ২০১০ থেকেই দলে অনিয়মিত হয়ে পড়েন আশরাফুল। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ‘আশার ফুল’ খ্যাত এই ক্রিকেটারের গড় ছিল দৃষ্টিকটু। বাজেভাবে উইকেট দিয়ে আসা কিংবা উইকেটে থিতু না হতা পারার মানসিকতা কখনো কখনো তাঁকে খলনায়কে পরিণত করেছে। কিন্তু তার মধ্যে যে আরো কিছু দেবার মতো বাকি ছিল সেটা তিনি প্রমাণ করেন ২০১৩ এর শ্রীলংকা সফরে। গল টেস্টে ৪১৭ বলের ১৯০ রানের চোখ ধাঁধানো ইনিংসটি খুব সহজেই তার টেস্ট ক্যারিয়ারের সেরা ইনিংস হয়ে থাকবে।

গল টেস্টে অ্যাশের সেই ইনিংসটি থেকে তার পুনরুত্থানের স্বপ্ন দেখছিলেন অনেকেই। কিন্তু সেটাই যে তার শেষ সুখস্মৃতি হবে তা কে জানত? ২০০১ সালে শুরু করেছিলেন যে ক্যারিয়ার, ২০১৩ সালের এপ্রিলে জিম্বাবুয়ে সিরিজেই অঘোষিতভাবে তার ইতি টানেন অ্যাশ। কেননা সে বছরই তিনি নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন স্পট ফিক্সিং কেলেঙ্কারিতে। বাংলাদেশ ক্রিকেটের উজ্জ্বল এক তারকার পতন ঘটে হুট করে, সবাইকে হতবাক করে দিয়ে।

ঢাকা গ্লাডিয়েটরসের হয়ে খেলা আশরাফুলের বিরুদ্ধে ম্যাচ গড়াপেটার অভিযোগ ওঠে ২০১৩ বিপিএলের আসর শেষ হবার পরপরই। আকসুর তথ্য ও আশরাফুলের সহজ স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে আগস্ট মাস থেকেই তাকে সবধরণের ক্রিকেট থেকে তাকে সাময়িকভাবে নির্বাসিত করে বিসিবি। ২০১৪ এর জুলাই মাসে বিসিবির দুর্নীতি দমন ট্রাইব্যুনাল তার উপর ১০ লাখ টাকা জরিমানা সহ ৮ বছরের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। পরে অবশ্য আশরাফুলের আবেদনের ভিত্তিতে সাজা কমিয়ে ৫ বছর করা হয়। সেই নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে আশরাফুল ঘরোয়া ক্রিকেট খেলছেন। খেলেছেন বিপিএলও। নিজেকে ফিট রাখার প্রাণান্ত চেষ্টা করে এখনো অপেক্ষায় আছেন জাতীয় দলে ফেরার। তবে সময় কি মানুষকে দ্বিতীয় সুযোগ দেয়? বাংলাদেশ ক্রিকেটের প্রথম তারকাকেও দেয়নি। এখন আশরাফুক মানেই এক সোনালি অতীত, এক হতাশা, এক আক্ষেপের নাম।