ঢাকা, রোববার, ২৫ অক্টোবর ২০২০, ১০ কার্তিক ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

অবসরেই যেন হতাশা

জিনিয়া শেখ
প্রকাশিত: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ রবিবার, ০৯:০৮ এএম
অবসরেই যেন হতাশা

প্রায়শই বলা হয়ে থাকে যে স্পোর্টস তারকা দু`বার মারা যান, যখন সে অবসর নেয় এবং যখন সে নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এই সকল খেলোয়াড়দের তারকাখ্যাতি যতদিন থাকে ততদিনই চলে তাদের নিয়ে হৈহুল্লোড়। চাকচিক্যের জীবন শেষে যখন তারা অবসরে যায় কেমন হয় তাদের মানসিক অবস্থতা?

অবসরের পর তাদের অনেক খেলোয়াড়রা ভুগেন হতাশায় এবং বিষণ্ণতায়। হতাশায় ভুগে কেউ কেউ করেছেন আত্মহত্যাও। ২০১৭ সালে, অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ক্রিকেটারদের নিয়ে করা এক জরিপ থেকে দেখা গেছে, শতকরা প্রায় ২৫ ভাগ ক্রিকেটারই প্রফেশনাল ক্যারিয়ার শেষ করার পর ডিপ্রেশন কিংবা অসহায়ত্ববোধ করেন।

অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটার্স অ্যাসোসিয়েশন (এসিএ) জরিপ করেছে ২০০৫ সাল বা এরপর অবসর নেওয়া খেলোয়াড়দের উপর। সেখানে দেখা গেছে,

শতকরা ৩৯ ভাগ খেলোয়াড়ই উচ্চ পর্যায়ের স্ট্রেস এবং উদ্বিগ্নতার স্বীকার হয়েছেন। শতকরা ২৫ ভাগ খেলোয়াড় ডিপ্রেশন কিংবা অসহায়ত্ব অনুভব করছেন এবং শতকরা ৪৩ ভাগ খেলোয়াড়ই মনে করছেন ক্রিকেট ছেড়ে দেওয়ার পর তাঁরা নিজের পরিচয় হারিয়ে ফেলেছেন।

অবসর পরবর্তী যে সব কারণ তাদের হতাশায় ভুগায় তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল-

পরিচয় হারানোর ভয়

যেকোনো দেশের হয়ে খেলাটা ওই অ্যাথলেটিকের জন্য অনেক সম্মানের। যখন তারা খেলে হাজারো দর্শক তাদের চেনে কিন্তু অবসরের পর তাদের এই জনপ্রিয়তা কমে সেখানে নতুন খেলোয়াড় জায়গা করে নেয় তাই অবসরের পর এককালের প্রভাবশালী বা পছন্দের তারকারা একধরনের নাম খোয়াবার ভয়ে থাকে। অনেকেই অশান্তি বা দুর্ভাবনায় বেঁচে থাকার ইচ্ছা পর্যন্ত হারিয়ে ফেলে।

১৯৯৮ সালের ৫ জানুয়ারি ইংল্যান্ডের জনপ্রিয় একজন ক্রিকেটার ডেভিড বেয়ারস্টোকে তাঁর নিজের বাসায় ঝুলন্ত অবস্থায় আত্মহত্যা করেন।

সুনির্দিষ্ট জীবনযাপনের থেকে বের হয়ে যাওয়া

একজন অ্যাথলিট ক্যারিয়ারের প্রথম থেকেই প্রশিক্ষণ, কোচ, প্রশিক্ষণ পেশাদার স্পোর্টস এজেন্ট এবং নিয়মতান্ত্রিক বিষয়ের সাথে জীবন পরিচালনায় অভ্যস্ত থাকেন। অবসরের পর অ্যাথলিটরা প্রায়শই তাদের জীবনকে অন্য ক্যারিয়ারের পথে অনুসরণ করতে পারে না। অবসর গ্রহণের সাথে সাথেই একটি শূন্যতা ভর করে তাদের জীবনে।

ব্রিটেনের ডাবল অলিম্পিক রোয়িং চ্যাম্পিয়ন জেমস ক্র্যাকনেল বলেছিলেন, "আমি মনে করি খেলাধুলা থেকে অবসর নেওয়ার পরে লোকেরা হতাশায় ভুগছেন কারণ তারা এই খেলাধুলার ফোকাসটি কোথায় প্রয়োগ করবেন তা নিশ্চিত নন।

শারীরিক জটিলতার কারণে

খেলোয়াড়দের অবসর গ্রহণের পর শরীরে জৈবিক কারণবশত অনেক পরিবর্তন আসে। এই পরিবর্তনের জন্য তাদের লড়াই করতে হয়। খেলোয়াড়দের খেলার জন্য বহু বছর ধরে প্রতিদিন সেরোটোনিনের নিয়মিত ডোজ নিতে হয়, যখন এটি হঠাৎ হ্রাস বা সরাসরি বন্ধ হয়ে যায় তখন তাদের দেহে রসায়নের জন্য এক বিরাট বিপর্যয় ঘটে। সেরোটোনিন স্তরের ভারসাম্যহীনতার কারণেও তারা হতাশায় ভুগেন বলে বিভিন্ন গবেষক অনুসন্ধানে দেখা গেছে।

ইংল্যান্ডের উইকেটকিপার কিংবা অসাধারণ ব্যাটসম্যান নিজের মুখেই স্বীকার করেছিলেন অবসরের পর চরমভাবে ডিপ্রেশনে ভোগার কথা। এর কয়েকমাস বাদেই তিনি আত্মহত্যা করেন।

এমন আরো অন্তত ১৫০জন ক্রিকেটারের খোঁজ পাওয়া যায়, যারা আত্মহত্যা করেছিলেন। এদের মধ্যে ২০জন ছিলেন অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং

নিউজিল্যান্ডের টেস্ট খেলোয়াড়। ওই দেড়শজনের মধ্যে অধিকাংশই চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ বছর বয়সের মধ্যেই আত্মহত্যা করেন।

স্বভাব অনুসারে জনসাধারণ ক্রীড়াবিদদের মানসিকভাবে কঠোর ব্যক্তি, অন্যদের চেয়ে সুস্থ, স্বাস্থ্যবান এবং সুখী বলে মনে করেন। জনসাধারণের গতানুগতিক এই মনোভাবের কারণে লজ্জা ও বিব্রত হওয়ার ভয়ে তারা অন্যদের কাছ থেকে মানসিক সাহায্যও চায়না। সুতরাং তাদের নিকটতম পরিবার, বন্ধুবান্ধব, দলের সঙ্গী এবং কোচদের পক্ষে এটি বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অবসরের পর তাদের সমর্থন দেয়াটাও গুরুত্বপূর্ণ।