ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২০, ১৪ কার্তিক ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

২০০৭: বাঘদের দাঁত গজানোর গল্প

জিয়াউল হাসান
প্রকাশিত: ১৭ অক্টোবর ২০২০ শনিবার, ০৮:৫৫ এএম
২০০৭: বাঘদের দাঁত গজানোর গল্প

১১ মার্চ গ্রীনফিল্ড স্টেডিয়ামে জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শুরু হওয়া এটি ছিল আইসিসির নবম বিশ্বকাপ আসর।আয়োজক দেশ ছিল ক্যারিবিয়ান দীপপুঞ্জের ওয়েস্ট ইন্ডিজ। অন্যদিকে এটা ছিল বাংলাদেশের জন্য তৃতীয় বিশ্বকাপ মিশন। ১০টি পূর্ণাঙ্গ সদস্য দেশ আর ৬টি সহযোগী সদস্য সহ মোট ১৬টি দেশ নিয়ে চারটি গ্রুপে ভাগ করে ৫১টি ম্যাচের ফিক্সার নিয়ে পর্দা উঠে এই আসরের। বাংলাদেশ `বি` গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত হয়। অন্য দল হিসেবে গ্রুপে ছিল ভারত, শ্রীলঙ্কা এবং বারমুডা।

হাবিবুল বাসার সুমনের নেতৃত্বে ১৫ সদস্যের বিশ্বকাপ স্কোয়াড ঘোষণা করে বিসিবি। যার ১০ জনেরই বিশ্বকাপ খেলা হয়নি কখনো। মাত্রই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে হাটতে শুরু করা তামিম, সাকিব, মুশফিকদের সাথে স্কোয়াডে ছিলেন দলের প্রধান প্রাণভোমরা মাশরাফি, স্পিনগুরু রফিক, হার্ডহিটার আফতাব এবং আশার আলো খ্যাত আশরাফুল। 

১৭ মার্চ কুইন্স পার্ক ওভালে, টাইগাররা গ্রুপ পর্বে নিজেদের প্রথম ম্যাচে মুখোমুখি হবে বিশ্বকাপের অন্যতম মোস্ট ফেভারিট ভারতের। বাংলাদেশও এই ম্যাচে ফেভারিটের তালিকায় ছিল। থাকবেই নাহ কেন? বিশ্বকাপের আগে খেলা মোট ২৬ ম্যাচের ৭০% জয় পেয়েছিল বাংলাদেশ। ২০০৬ সালে সবচেয়ে বেশি জয় পাওয়া দ্বিতীয় দলটাই ছিল টাইগারদের। তাছাড়া প্রেস ব্রিফিংয়ে টাইগার কোচ বলেছিলেন "আমাদের দলে একটা নতুন ওপেনার থাকবে৷ সে যদি ১০টি ওভার টিকে যায় তবে একাই ভারতের বোলিং তছনছ করে দিবে।" এটা বলে কোচ ভারতকে চাপে ফেলতে চেয়েছিলেন। কিন্ত কোচের সেই কথাই পরবর্তীতে নতুন ওপেনার হিসেবে সত্যি প্রমাণ করেছিলেন তামিম ইকবাল। বাংলাদেশ যখন ভারতের ম্যাচ নিয়ে ভীষণ আবহের মধ্যে সময় কাটাচ্ছিলো, তার ঠিক আগের দিন হঠাৎ করেই সেই ম্যাচ শুরুর আবহটা চরম বিষাদে বিষিয়ে উঠে টাইগার ক্যাম্পে। খবর আসে দেশের অন্যতম সেরা বামহাতি স্পিনার মানজারুল ইসলাম রানা এবং সেতুর সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংবাদ। এই মৃত্যুর সংবাদে হাবিবুল বাসাররা শোককে শক্তি আর প্রতিজ্ঞায় নিতে শুরু করে। 

এদিকে ম্যাচ শুরুর আগে মাশরাফি দেন আলোচিত এক বক্তব্য। বলেন, "যদি উইকেটে কিছু থাকে আর আমরা টস জিতে ওদেরকে ব্যাটে পাঠাতে পারি তবে ভারতকে ধরে দিবানি।" ম্যাশের এই বক্তব্য পুরো বিশ্বকাপে টাইগারদের স্লোগান হয়ে দাঁড়ায়। ভারতের অধিনায়ক রাহুল দ্রাবিড় টস জিতে ব্যাটিংয়ের সিদ্বান্ত নিলে টসে হেরেও উজ্জীবিত থাকে বাংলাদেশ। উদ্বোধনী বোলিংয়ে আসেন মাশরাফি। দলের তৃতীয় ওভার আর ম্যাশের দ্বিতীয় ওভারেই শেভাগকে বোল্ড করে স্ট্যাম্প উড়িয়ে `ধরে দিবানি`র শুরুটা করেন ম্যাশ। মাশরাফির পরে জ্বলে উঠেন দুই টাইগার স্পিনার রফিক এবং রাজ্জাক। দলের ৪০ রানের মাথায় শচীনকে ফিরিয়ে দেন রাজ্জাক এবং দ্রাবিড়কে রফিক। জয়ের বীজ রোপন যেন সবে শুরু। সৌরভ আর যুবরাজ যখন মাটি কামড়ে দলকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন তখন দলীয় ১৫৮ রানের মাথায় সৌরভের আশাভঙ্গ করেন রফিক। এরপরেই অসহায় হয়ে পড়ে ভারত। পঞ্চম থেকে নবম উইকেট; এই পাচঁটি উইকেট হারায় তারা মাত্র দুই রানের ব্যবধানে। শেষ পর্যন্ত ইনিংসের তিন বল বাকি থাকতেই ১৯১ রানে অলআউট হয়ে যায় যুবরাজরা। 

১৯২ রানের লক্ষ্য নিয়ে জহির খানদের সামনে দাঁড়ায় তামিম নাফিসরা। নবাগত তামিম প্রথম থেকেই দ্রুত চালিয়ে খেলতে থাকেন৷ জহির খানকে ডাউন দ্য উইকেটে এসে তামিমের মারা ছক্কা তো এদেশের ক্রিকেট প্রেমীদের জন্য মধুমাখা! সাতটি চার আর দুইটি ছক্কায় সাজানো ইনিংস খেলে তামিম ফিরে যাওয়ার আগে করেন ৫৩ বলে ৫১ রান। কোচের সেই কথার আস্থাই যেন রেখে দেন খান সাহেব। অর্ধশতক আসে অন্য দুই নবীন টাইগার; প্রথম বিশ্বকাপ খেলা সাকিব এবং মুশফিকের ব্যাট থেকে৷ চতুর্থ উইকেটে এই দুই খেলোয়াড় করেন ৮৪ রানের মূল্যবান জুটি। ৫৩ রান করে শেওয়াগের বলে সাকিব ফিরে গেলে উইকেটে আসেন আশরাফুল। ততক্ষণে আশরাফুলকে সাথে নিয়ে  মুনাফ প্যাটেলের বলে চার মেরে ভারত বধের মহাকাব্য রচনা করে ফেলেন মুশফিক। ম্যান অব দ্য ম্যাচ নির্বাচিত হন ভারতকে ধরে দিতে চাওয়া সেই মাশরাফিই। এই ম্যাচের জের ধরেই বিশ্বকাপে ভারত গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নেয়।

পরের ম্যাচে টাইগাররা শ্রীলঙ্কার সাথে হেরে গেলেও তৃতীয় ম্যাচে সাকিব-আশরাফুলের ব্যাটিং কল্যাণে বারমুডাকে হারিয়ে সুপার এইট নিশ্চিত করে। টাইগাররা পরবর্তী রাউন্ড সুপার এইটের পর্বে ইংল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, সাউথ আফ্রিকা, আয়ারল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়ার মুখোমুখি হয়। সব কয়টি ম্যাচ হেরে গেলেও তারা সাউথ আফ্রিকাকে ৬৭ রানের বিশাল ব্যবধানে হারায়। আর এভাবেই প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির মিশেলে শেষ হয় টাইগারদের ধরে দিবানির বিশ্বকাপ মিশন।