ঢাকা, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২০, ৬ কার্তিক ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

ফিফার সর্বকালের সেরা বিশ্বকাপ একাদশ

জিয়াউল হাসান
প্রকাশিত: ১৮ অক্টোবর ২০২০ রবিবার, ০৯:০০ এএম
ফিফার সর্বকালের সেরা বিশ্বকাপ একাদশ

For the good of the game এই নীতিবাক্য নিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে নিয়ন্ত্রণ করার উদ্দেশ্যে ১৯০৪ সালের ২১মে ফ্রান্সের প্যারিস শহরে গঠিত হয় Federation Internationale de Football Association যা সংক্ষেপে FIFA বা ফিফা। বর্তমানে এর সদর দপ্তর সুইজারল্যান্ডের জুরিখ শহরে। আন্তর্জাতিক ফুটবল নিয়ন্ত্রণ এবং বিশ্বকাপ সহ বিভিন্ন আসর আয়োজনের পাশাপাশি ফিফা বিভিন্ন সময়ে সম্মাননা ও পুরস্কার প্রদান করে থাকে। তারই ধারাবাহিকতায় ফিফা ১৯৯৪ সালে ফিফা বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বসেরা ফুটবল একাদশ ঘোষণা করে। 

দেখে নেওয়া যাক সর্বকালের সেরা একাদশের খেলোয়াড়দের। 

গোলকিপারঃ লেভ ইয়াশিন (সোভিয়েত ইউনিয়ন)
লেভ ইয়াশিন সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের মস্কোয় ১৯২৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫৩ সালে ক্যারিয়ার শুরু করা ইয়াশিন খেলেছিলেন সর্বমোট ৮১২ ম্যাচ। এর মধ্যে ৫০০টি ম্যাচেই প্রতিপক্ষকে নিজের জালে কোন বল গড়াতে দেননি। ১৫১টি পেনাল্টি শট রুখে দেওয়া এই গোলরক্ষক ছিলেন সর্বকালের সেরা গোলরক্ষক। চারটি বিশ্বকাপ খেলা ইয়াশিন সব সময়েই কালো জার্সি বা কালো পোষাক পড়তেন। একারণেই তাকে বলা হতো ব্ল্যাক স্পাইডার কিংবা ব্ল্যাক প্যান্থার। এখন পর্যন্ত ইতিহাসে একমাত্র গোলকিপার হিসেবে ফিফা ব্যালন ডি`অর জিতেছেন। কিংবদন্তি এই ফুটবলার ১৯৯০ সালে মারা যান। 

ডিফেন্ডারঃ দালমা সান্তোস (ব্রাজিল)
সর্বকালের সেরা রাইটব্যাক হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া সান্তোস ১৯২৯ সালে সাও পাওলোতে জন্মগ্রহণ করেন। ব্রাজিলের হয়ে চারটি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করে দুইটিতে চ্যাম্পিয়ন হন। ব্রাজিলের হয়ে সর্বপ্রথম একশো অধিক ম্যাচ খেলেন তিনি। একজন ডিফেন্ডার হয়ে ১০৭৪টি ম্যাচ খেলেও ক্যারিয়ারে কখনই লাল কার্ড দেখেননি এই ব্রাজিলিয়ান। ২০১৩ সালে মারা যান তিনি।

ডিফেন্ডারঃ বেকেনবাওয়ার (জার্মানি)
জার্মানির সর্বকালের সর্বসেরা এই খেলোয়াড়ের জন্ম ১৯৪৫ সালে। জার্মানরা তাকে কাইজার বলেই ডাকে। যার অর্থ সম্রাট। তিনিই একমাত্র খেলোয়াড় যিনি অধিনায়ক এবং কোচ হিসেবে বিশ্বকাপ জিতেছেন। একজন ডিফেন্ডার হয়েও ১৯৬৬ বিশ্বকাপে তৃতীয় সর্বোচ্চ গোলধারী হন। জাতীয় দলের পাশাপাশি বায়ার্ন মিউনিখকে বহু সাফল্য এনে দিয়ে ইউরোপের পরাক্রমশালী ক্লাবে রুপান্তর করেন বেকেনবাওয়ার।

ডিফেন্ডারঃ ববি মুর (ইংল্যান্ড)
ইংল্যান্ডের এই ফুটবলার জন্মেছেন ১৯৪১ সালে। তিনি ১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ডের একমাত্র বিশ্বকাপ জয়ী দলের অধিনায়ক ছিলেন। খেলেছিলেন ওয়েস্টহ্যাম ইউনাইটেড ক্লাবে। এই ক্লাবে তিনি ১০ বছরেরও বেশি সময় অধিনায়কত্ব করেন। ১৯৯৩ সালে মাত্র ৫২ বছরে পৃথিবী ছেড়ে চলে যান এই ডিফেন্ডার। 

ডিফেন্ডারঃ পল ব্রেইটনার (জার্মানি)
১৯৫১ সালে জন্মগ্রহণ করা ব্রেইটনার ছিলেন ইতিহাসের অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার। `৭৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানের পক্ষে সমতাসূচক গোল করেন তিনি। একই বছর বিশ্বকাপ এবং উচল জেতা নয়জনের প্লেয়ারের অন্যতম এক খেলোয়াড়। স্ট্রাইকার হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেও পরবর্তীতে বনে যান সেরা ডিফেন্ডারে। ক্যারিয়ারে করেছিলেন একাধিক হ্যাট্রিক। তিনি একজন প্রতিবাদী খেলোয়াড়ও ছিলেন। বায়ার্ন মিউনিখে খেলেছিলেন অধিনায়ক হিসেবে।

মিডফিল্ডারঃ ইয়োহান ক্রুইফ (নেদারল্যান্ড)
টোটাল ফুটবলের জনক ক্রুইফ জন্মেছিলেন ১৯৪৭ সালে। তিনবার ব্যালন ডি`অর জয়ী এই মিডফিল্ডার দলের প্রয়োজনে যেকোন পজিশনে খেলতে পারতেন।ক্রুইফের কল্যাণেই নেদারল্যান্ড বিশ্বকাপে দুইবার রানার্সআপ হয়। তার অধীনেই বার্সেলোনা প্রথম বারের মত চ্যাম্পিয়নস লীগ জিতে। ফুসফুস ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ২০১৬ সালে মারা যান এই ডাচ ফুটবলার। 

মিডফিল্ডারঃ মিশেল প্লাতিনি (ফ্রান্স)
১৯৫৫ সালে ফ্রান্সে জন্মগ্রহণ করা এই ফুটবলার ছিলেন ইতিহাসের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার। তিনি ১৯৮৪ সালে ফ্রান্সকে প্রথম বারের মত কোন আন্তর্জাতিক ট্রপি হিসেবে ইউরোপিয়ান ট্রপি জেতাতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করেন। জুভেন্টাসের হয়ে জিতেছিলেন চ্যাম্পিয়নস লীগ এবং দুইবার ব্যালন ডি`অর জয় করে নেন। উয়েফার প্রেসিডেন্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন এই ফুটবলার। তবে সংগঠক হিসেবে তিনি বহু বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন। 

মিডফিল্ডারঃ ববি চার্লটন (ইংল্যান্ড)
মধ্যভাগের এই খেলোয়াড় ১৯৩৭ সালে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপ এবং ব্যালন ডিঅর জয়ী 
এই খেলোয়াড় ক্যারিয়ারের প্রায় পুরো সময়টা ম্যানইউতেই কাটিয়েছিলেন। ম্যানইউ`র পক্ষে এখনো সর্বোচ্চ গোলের মালিক তিনি। ম্যানইউ`র পরিচালনা বোর্ডের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ১৯৯৪ সালে নাইট উপাধি পান ম্যানইউর সাবেক এই অধিনায়ক। 

ফরওয়ার্ডঃ গ্যারিঞ্চা (ব্রাজিল)
ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে সেরা ড্রিবলার গ্যারিঞ্চা ১৯৩৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন। পেলের পরে ব্রাজিলের দ্বিতীয় সেরা এই খেলোয়াড় ব্যানানা শট দিয়ে কর্নার থেকে গোল করতেন অবলীলায়। তার বাকানো পায়ের জাদুতেই নিজের প্রথম দুই বিশ্বকাপ জিতে নেন। পরের বিশ্বকাপে খেলেন শুধু দুইটি ম্যাচ। ইঞ্জুরির কাছে হেরে যান৷ পেলে এবং গ্যারিঞ্চা একই সময়ে দলে খেলতেন। তারা দুইজন খেলেছে এমন কোন ম্যাচে ব্রাজিল কখনো হারেনি। এছাড়া গ্যারিঞ্চা ব্রাজিলের হয়ে ৫০টি ম্যাচ খেলেন। যেখানে তিনি শুধু মাত্র একটি ম্যাচ হারেন। হেরে যাওয়া সেই ম্যাচটিই ছিল তার জীবনের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ। ১৯৬২ সালের বিশ্বকাপে তিনি  সেরা খেলোয়াড়ের গোল্ডেন বল এবং টপ স্কোরার হিসেবে গোল্ডেন বুট জিতেন। ১৯৮৩ সালে পরপারে পাড়ি জমান এই ব্রাজিলিয়ান। 

ফরওয়ার্ডঃ পেলে (ব্রাজিল)
সর্বকালের সেরা ফুটবলার পেলে জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪০ সালে। তিনি একমাত্র ফুটবলার হিসেবে ৩টি বিশ্বকাপ জয়লাভ করেন৷১৬ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক ম্যাচে সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার হিসেবে গোল করেন পেলে৷ যা আজো বহাল তবিয়তেই আছে। ফরওয়ার্ডের পাশাপাশি অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবেও খেলেন ব্রাজিলের পক্ষে সর্বোচ্চ গোলদাতা এই খেলোয়াড়। এছাড়া তিনি একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে হাজার গোলের মাইলফলক স্পর্শ করেন। ২১ বছরের ক্যারিয়ারে তিনি ১২৮৩টি গোল করেন। কেউ কেউ এটাকে বলেন ১২৮২টি। তবে উইকিপিডিয়া বলছে ১২৮১টি গোল করেছেন পেলে। 

ফরওয়ার্ডঃ ফেরেন্স পুস্কাস (হাঙ্গেরী)
১৯২৭ সালে বুদাপেস্টে জন্মগ্রহণ করেন সর্বকালের অন্যতম সেরা এই ফরওয়ার্ড। আন্তর্জাতিক ৮৪ ম্যাচে ৮৩টি গোল করেন পুস্কাস। যা যেকোনো খেলোয়াড়ের পক্ষে ম্যাচপ্রতি গোল করার সর্বোচ্চ গড়। ক্লাব ক্যারিয়ারে তিনি ৫২১ ম্যাচ খেলে গোল করেন ৫০৮টি। যা সর্বকালের তালিকায় এখন চতুর্থ। চ্যাম্পিয়নস লীগ সহ একাধিক ট্রপি জেতা পুস্কাসের দল হাঙ্গেরী হট ফেভারিট হয়েই ১৯৫৪ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠলেও জার্মানির কাছে ৩-২ গোলে হেরে যায়। তিনি হন ট্র‍্যাজিক হিরো। যদিও বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে তার দল জার্মানিকে ৮-৩ গোলে হারিয়েছিল। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে ১০টি শিরোপা জিতেন পুস্কাস। ফিফা ২০০৯ সাল থেকে তার প্রতি সম্মান দেখিয়ে বছরের সবচেয়ে সুন্দর গোলের পুরস্কারের নাম রাখে পুস্কাস এওয়ার্ড। ২০০৬ সালে ইতিহাসের সেরা এই ফুটবলার মারা যান।

ফিফা সর্বকালের সেরা বিশ্বকাপ একাদশ বাদেও আরো অন্যান্য একাদশ ঘোষণা করেছে। তার মধ্যে আছে ড্রিম একাদশ। সেখানে ভিন্ন ভিন্ন খেলোয়াড়রা যায়গা করে আছেন।