ঢাকা, রোববার, ০৫ এপ্রিল ২০২০, ২২ চৈত্র ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

দুর্নীতি দমনে শেখ হাসিনা কি ব্যর্থ!

সায়েদুল আরেফিন
প্রকাশিত: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০ মঙ্গলবার, ০৯:০০ পিএম
দুর্নীতি দমনে শেখ হাসিনা কি ব্যর্থ!

গুলশানের পাঁচ তারা হোটেল ঘিরে গড়ে ওঠা অবৈধ ব্যবসা বাণিজ্য আর অনৈতিক কাজের র‍্যাকেটের মূল হোতা যুবলীগ নেত্রী পাপিয়া আটক হবার পরে ভয়াবহ তথ্য আসতে শুরু করেছে। সব চেয়ে চমক দেওয়া খবর হলো, পাপিয়ার ডেরায় সেবাগ্রহীতাদের মধ্যে ১১ জন মন্ত্রী আর ৩৩ এমপি আছেন। আছেন অনেক সিনিয়র আমলা ও সিনিয়র রাজনীতিক, ধর্ম বর্ণ গোত্র নির্বিশেষে। তাই এখন ‘পাপিয়া ভাইরাস’ জ্বরে আক্রান্ত গোটা বাংলাদেশ। বিদেশে থাকা বাংলার বাঙ্গালিরাও এর হাত থেকে নিস্তার পাননি। 

ঘটনা যাই হউক না কেন, একটা অবিশ্বাস আর হতাশাও লক্ষ্য করা গেছে অধিকাংশ মানুষের মাঝে সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁদের দেওয়া বক্তব্যে, চায়ের দোকান আর পাড়া মহল্লার আড্ডাতেও। পাপিয়াদের ব্যবহার করে যারা অনৈতিক সুবিধা নিয়েছে, টাকার পাহাড় গড়েছে, তাঁদের কিছুই হবে না। কারণ তারা সংখ্যায় আর শক্তিতে অনেক অনেক বেশি। আর বাংলাদেশে এমন বিচারের নজির খুব কম।             

কিন্তু নতুন খবর হচ্ছে, ক্যাসিনো–কাণ্ডে জড়িত দুই ভাই এনামুল হক ও রূপণ ভূঁইয়ার ওয়ারীর লালমোহন সাহা স্ট্রিট এলাকার বাসায় অভিযান চালিয়ে ফের নগদ ২৬ কোটি টাকা উদ্ধার করেছে র‌্যাব-৩। এছাড়া পাঁচ কোটি টাকার এফডিআর, ডলার, স্বর্ণালঙ্কার ও ক্যাসিনোর সরঞ্জাম পাওয়া গেছে। সোমবার গভীর রাত থেকে মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত অভিযান চালানো হয়। অভিযানে সিআইডিও অংশ নেয়। এই উদ্ধার আগের উদ্ধারের অতিরিক্ত।

এতে বুঝা যাচ্ছে যে, সীমিত আকারে হলেও দুর্নীতি বিরোধী অভিযান এখনো চলমান। কেউ কেউ এর সমালোচনা করে বলেছেন চুনোপুঁটি ধরা হচ্ছে রাঘব বোয়াল বাদ দিয়ে। বাস্তবেও দেখা যাচ্ছে যে, দুর্নীতিতে নামি দামি যাঁদের নাম এসেছে তাঁদের ব্যাপারে বিচার বা তদন্ত খুব ধীর। তবে একটা জিনিষ খুব স্পষ্ট যে, দুর্নীতিতে যার নাম আসছে তিনি চুপসে যাচ্ছেন, তাঁর হাঁক ডাক আর শুনা যাচ্ছে না। সামাজিক ভাবেও তাঁদের তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে সোশ্যাল মিডিয়ায় এমন সব কথা প্রচার হচ্ছে যে, নূন্যতম লজ্জাবোধ থাকলেও তারা রাস্তায় শুধু না ঘরেও ছেলে মেয়েদের কাছে মুখ দেখাতে পারার কথা না। কিন্তু দুর্নীতিবাজ বা অপরাধীদের বিরাট একটা অংশই পাপিয়াদের মত দরিদ্র বা হত-দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা।  যাঁদের কাছে ২/৫ বছরের সুখই অনেক বেশি পাওনা।   

কিছু সাধারণ মানুষ আছেন যাঁদের সাথে অনেক বড় বড় মানুষের যোগাযোগ থাকে। এমন একাধিক মানুষের কাছে প্রশ্ন করে হয়েছিলো মুখে বললেও সরকার প্রধান কেন বাস্তবে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থানে যাচ্ছেন না। এটা কী তাঁর ইচ্ছাকৃত না কী আইনি সমস্যা বা কৌশলগত কারণ! দলের বাইরের লোক তো বটেই নিজ দলের অনেকেই সন্দেহ করেন যে, আসলেই কি নেত্রী দুর্নীতিবাজদের বিচার চান না!           

একজন বললেন, শেখ হাসিনা দলে পলিটিক্যাল ক্রেডিট সিস্টেম চালু করেছেন। দলের রাজনৈতিক নেতা কর্মীদের একটা নতুন ধরণের মূল্যায়ন পদ্ধতি। দলের নেতা কর্মীদের প্রতিটি ভালো কাজের জন্য তাঁদের ব্যক্তিগত ফাইলে যোগ হয় পজিটিভ পয়েন্ট আর খারাপ কাজ করলে যোগ হয় নেগেটিভ বা মাইনাস পয়েন্ট। সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ে দলের নেতা কর্মীরা দলের জন্য, সমাজের কল্যাণে, নিজের পারবারের জন্য, নিজ শরীরের জন্য, ইত্যাদি কী কী কাজ করছেন তাঁর ভালো-মন্দ দিকের হিসাব রাখা হচ্ছে বিভিন্ন কৌশলে, যাকে বলা যায় নতুন পলিটিক্যাল ক্রেডিট সিস্টেম। বিভিন্ন পেশাজীবী যেমন, সাংবাদিক, শিল্পী, ব্যবসায়ী, শ্রমিক, ইত্যাদি সব শ্রেণী আর পেশার মানুষের দালিলিক খোঁজ রাখছেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কে কোথায় কত টাকা খেয়ে বা স্বজনপ্রীতি করে দলের বা দলের সহযোগী সংগঠনের উপজেলা, জেলা কমিটি করে দিয়েছেন। কে কে কত টাকা নিয়ে চাকরী দিয়েছেন, সেই টাকার ভাগ কে কে পেয়েছে, ঠিকাদারি কাজ পেতে কী কী অনৈতিক কাজ করা হয়েছে মোটা দাগে সব জানা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। এমপি, সিটি কর্পোরেশন, উপজেলা, ইউপি নির্বাচনে কে কে বেইমানী করে দলকে হারাতে চাচ্ছে বা হারাচ্ছে তাঁর হিসাব কী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে নেই মনে করেন?

তিনি আরও বলেন, ঢাকা আর বিশেষ করে চট্টগ্রামের মেয়র নির্বাচনে মনোনয়নে শেখ হাসিনার ভূমিকা কী ছিল! কতজন আ জ ম নাসিরের পক্ষে মনোনয়নের কথা বলেছেন, কিন্তু লাভ কি হয়েছে? এটা কি দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান না!   

হলি আর্টিজানের সন্ত্রাসী হামলা মোকাবিলায় যাওয়া পুলিশ অফিসারগন বিশেষ করে এসি আর বনানী থানার ওসি সন্ত্রাসীদের শক্তি সম্পর্কে আন্ডার এস্টিমেট করে প্রাণ হারান। এটা কী ভুল কৌশল ছিল না!  

গন জাগরণ মঞ্চের মত আন্দোলন ছিল সোশ্যাল মিডিয়ার এক্টিভিস্টদের আন্দোলন। যা মানবতা-বিরোধী অপরাধীদের বিচারে বিশাল ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু এটা সত্য যে দেলোয়ার হোসেন সাঈদী  চাঁদে গেছেন এমন গুজবকে বিশ্বাস করেই বাংলাদেশে জানমালের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।  তাই তো পরবর্তীতে যখন খালেদা জিয়ার নামে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি হয় তখন তা পুরাতন ঢাকা থেকে গুলশানে পৌঁছাতে বহুদিন সময় লেগেছিল। তা না হলে তখনকার প্রেক্ষাপটে কয়েক শত বা হাজার মানুষের প্রাণ যাবার ঘটনা ঘটতে পারতো। খালেদা জিয়াকে এমন সময় জেলে নেওয়া হয়েছে যখন আর একজনেই প্রাণ-বলি দেবার ছিলেন না। তখনো অনেকে সমালোচনা করে বলেছিলেন, সরকার চান না খালেদা জিয়ার দুর্নীতির বিচার হউক।  এটাই ছিল শেখ হাসিনার কৌশল।

নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের কারণেই সরকার আজ কিছুটা হলেও পরিবহণ খাতে শৃঙ্খলা আনার চেষ্টায় কিছু ভালো পদক্ষেপ নিতে পারছেন, অপেক্ষার ফল আসা শুরু হয়েছে।  

তিনি মনে করিয়ে দেন যে, ২০ বার শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা হয়েছে। যাঁদের গড-ফাদারদের কেউ কেউ হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করে বসে বসে খেলাচ্ছেন নানান রকম খেলা। নিজ দলে মুস্তাকের অভাব নেই। তাই সতর্ক পদক্ষেপ ছাড়া সীমাহীন বিপর্যয় অপেক্ষা করছে দল আর দেশের জন্য। তাই দুর্নীতির বিচারে সরকারকে সহায়তা করতে চাই আরেকটি গণজাগরণ মঞ্চের মত গন আন্দোলন। তাহলেই আসবে অনেক সফলতা।

টিকে থাকার জন্য উপযুক্ত কৌশল না নেওয়ায় ডাইনোসরের মত প্রাণীও পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেছে। তাই দুর্নীতি বিরোধী যুদ্ধে শেখ হাসিনার রণকৌশল হয়তো ভিন্ন এবং তা আমাদের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করেই তিনি ঠিক করেছেন। তাতে আমাদের ভিন্নমত থাকতেই পারে। শেখ হাসিনার বিকল্প কি আওয়ামী লীগে বা সরকারে আছে? তাই আমাদের অপেক্ষা করা ছাড়া কি কোন বিকল্প আছে!      


বাংলা ইনসাইডার