এডিটর’স মাইন্ড

নির্বাচন নিয়ে পশ্চিমাদের ফাঁদে পড়েছিল বিএনপি?

প্রকাশ: ১০:০০ পিএম, ০৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪


Thumbnail

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করা, আন্দোলনের ব্যর্থতা ইত্যাদি নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন বিএনপির নীতিনির্ধারকরা। আর এই চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তাদের মধ্যে প্রশ্নের উদয় হয়েছে তারা কি পশ্চিমাদের ফাঁদে পড়েছিল? যেমন তারা ফাঁদে পড়ে ছিল ২০১৮ সালে ড. কামাল হোসেনের। এই প্রশ্নটি এখন বিএনপির মধ্যে আলোচিত হচ্ছে। পশ্চিমা দেশগুলো, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নকে অন্ধ বিশ্বাস তাদের ভুল কৌশল ছিল—এমন মন্তব্য করছে বিএনপি তার আত্মসমালোচনা পর্বে। 

উল্লেখ্য যে, ২০১৮ নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করেছিল জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতা ছিলেন ড. কামাল হোসেন। ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে ঐক্য করাটা ভুল ছিল এবং এটি একটি পাতানো ফাঁদ ছিল—এ কথা ২০১৮ নির্বাচনের পর বিএনপির ‘ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং’ কমিটি আবিষ্কার করে। তারা দেখায় যে, আওয়ামী লীগের রাজনীতির ধারক বাহক ড. কামাল হোসেন। অথচ আওয়ামী বিরোধী যে রাজনৈতিক গোষ্ঠী তাদেরকে উপেক্ষা করে ড. কামাল হোসেনের সাথে ঐক্য করে বিএনপি তার নিজের আদর্শকে যেমন বিচ্যুতি দিয়েছে তেমনি পাতা ফাঁদে পা দিয়ে তারা তাদের সর্বনাশ ডেকেছিল। 

২০১৮’র নির্বাচনের পর থেকে ড. কামাল হোসেনকে এগিয়ে যাচ্ছে বিএনপি। ড. কামাল হোসেনের প্রকাশ্য সমালোচনাও করেছেন বিএনপির অনেক নেতা। সেই অভিজ্ঞতা থেকে তারা এবার জোটবদ্ধ ভাবে আন্দোলন করছে না। কারণ জোটের সঙ্গীরা কখন কী করে তার দায় বিএনপি নিতে চায় না। আর এরকম বাস্তবতায় ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে বিএনপি নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। প্রথম থেকেই এই আন্দোলনে এক ধরনের প্রচ্ছন্ন সমর্থন দিচ্ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো। মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন এবং প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিতে বিএনপি আন্দোলনে অনড় অবস্থানে চলে যায়। কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গত দু বছর ধরে বলছিল যে বাংলাদেশে নির্বাচন হতে হবে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ। এই নির্বাচনে যদি কারচুপি করা হয় এবং যদি অংশগ্রহণমূলক না হয় সে ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কী কী বিধিনিষেধ প্রয়োগ করবে সে ব্যাপারেও হুমকি দিচ্ছিল। একাধিক মার্কিন প্রতিনিধি বাংলাদেশ সফর করেছিলেন এবং তারা সরকার এবং বিএনপির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। বিএনপি নেতারা এখন আত্মবিশ্লেষণ করতে গিয়ে মনে করছেন, এটি ছিল একটি পাতানো ফাঁদ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আসলে ভারতের কূটনৈতিক নীতি বাংলাদেশে অনুসরণ করে। 

বিএনপি যদি এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করত তাহলে আওয়ামী লীগের জন্য দুটি চ্যালেঞ্জ হত। প্রথমত, নির্বাচনে কারচুপি করা তাদের জন্য কঠিন হত। কোন অবস্থাতে ২০১৮’র মতো ঘটনা ঘটতে পারত না। দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ইত্যাদি নিয়ে যে সমস্যা তাতে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে বিএনপি অত্যন্ত ভালো ফল করত। আর এই কারণেই ভারত চায়নি যে বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করুক। অন্তত বিএনপির একাধিক শীর্ষ নেতা এখন তাই মনে করছেন। 

ভারতের পরামর্শেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই সাজানো নাটক মঞ্চস্থ করে। যেখানে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করা হয় যে, বিএনপি মনে করে যে নির্বাচনে না গেলেই তাদের জন্য ভালো এবং নির্বাচনে না গেলে সরকারের পতন ঘটবে। মূলত বিএনপিকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখা নিশ্চিত করার জন্যই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহায়ক শক্তি হিসেবে ভূমিকা পালন করেছিল বলে বিএনপির অন্তত দুইজন নেতা মন্তব্য করেছে। তারা বলছেন যে, পুরো বিষয়টি ছিল ২০১৮’র মতো সাজানো নাটক। ২০১৮-তে যেমন বিএনপিকে নির্বাচনে এনে বেইজ্জত করা হয়েছিল তেমনি এবার বিএনপিকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখার কৌশল নিয়েছিল ভারত। আর সেই কৌশল প্রয়োগের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নকে ব্যবহার করেছিল। 

বিএনপির একজন নেতা বলেছেন, এই অঞ্চলে ভারতের বাইরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যাবে না। পুরোটাই হয়েছিল একটি পরিকল্পিত ভাবে যেন বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে। তবে বিএনপির এই সমস্ত আত্ম বিশ্লেষণ এখন পর্যন্ত দলীয় অবস্থান নয় বলে বিএনপির একজন দাবি করেছেন। তিনি বলেছেন, আমাদের আন্দোলনের ব্যর্থতা এবং অন্যান্য বিষয়গুলো আমরা চুলচেরা বিশ্লেষণ করছি আমাদের নিজেদের স্বার্থে, ভবিষ্যতের জন্য।

নির্বাচন   বিএনপি   মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র   ভারত   বাংলাদেশের নির্বাচন  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

নেতাদের মুক্তি, বিএনপির মুক্তি কবে

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ২৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪


Thumbnail

একে একে কারাগার থেকে মুক্তি পাচ্ছেন বিএনপির শীর্ষ নেতারা। ২৮ অক্টোবর বিএনপির সমাবেশে যে তাণ্ডব হয়, তার পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপির বহু নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হন। দলের মহাসচিবসহ স্থায়ী কমিটির গুরুত্বপূর্ণ একাধিক নেতার বিরুদ্ধে সন্ত্রাস এবং নাশকতার অভিযোগে মামলা হয়েছিল। এসব গ্রেপ্তারে বিএনপির আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়ে। আন্দোলন পথ হারায়। ৭ জানুয়ারি নির্বাচন প্রতিহত করার ডাক দিয়েছিল ১৭ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটি। কিন্তু তাদের নির্বাচন বর্জন আন্দোলন সফল হয়নি। অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়ে বিএনপি তার অক্ষমতা ও দুর্বলতা প্রকাশ করে। বিএনপি এবং তার মিত্রদের নামমাত্র আন্দোলন নির্বাচনে বাধা সৃষ্টি করতে পারেনি। ৭ জানুয়ারির নির্বাচনের পর ১১ জানুয়ারি নতুন সরকার শপথ নেয়। টানা চতুর্থবারের মতো দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ। নির্বাচনের পর বিএনপি নেতারা আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন। বিএনপির কালো পতাকা বা লিফলেট বিতরণ কর্মসূচি পানসে। এসব কর্মসূচিতে জনসম্পৃক্ততা নেই। বিএনপির নেতাকর্মীরাও স্বীকার করেন আন্দোলন পথহারা। মুখে তারা যাই বলেন না কেন, তাদের হতাশার দীর্ঘশ্বাস এখন সর্বত্র শোনা যায়। বিএনপির নেতারা যখন হতাশ, ক্লান্ত, বিধ্বস্ত; ঠিক তখনই বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ আটক নেতারা মুক্ত হচ্ছেন। নেতারা স্বীকার করেছেন, তাদের মুক্তি আন্দোলনকে বেগবান করবে। মির্জা ফখরুল, মির্জা আব্বাস, আমীর খসরুর মুক্তিতে বিএনপি কর্মীদের মধ্যে একধরনের উচ্ছ্বাস লক্ষ করা যাচ্ছে। বিএনপি নেতাদের মুক্তির পর আমার মনে যে প্রশ্নটি ঘুরপাক খাচ্ছে তা হলো—নেতাদের তো মুক্তি হলো, কিন্তু রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি কি মুক্ত?

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একটি রাজনৈতিক দল একটি স্বাধীন সত্তা। রাজনৈতিক সংগঠন যদি নিজ ইচ্ছায় গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তখন সেই দল বা সংগঠনকে মুক্ত বা স্বাধীন বলা যায়। অন্যদিকে একটি রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্ত যদি বাইরের কোনো রাষ্ট্র, ব্যক্তি বা দল নির্ধারণ করে, দলটির সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া যদি গণতান্ত্রিক না হয় এবং দলের অভ্যন্তরে যদি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা না থাকে, তাহলে সেই দলটি মুক্ত থাকে না। মুক্ত গণতন্ত্রের জন্য মুক্ত রাজনৈতিক সংগঠন জরুরি। মুক্ত গণতন্ত্র ও মুক্ত রাজনৈতিক সংগঠনের ধারণাটি এসেছে মূলত কমিউনিস্ট পার্টির উত্থানের পর থেকে। উদার ও মুক্ত গণতন্ত্রে বিশ্বাসী রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা দেশে দেশে কমিউনিস্ট পার্টিগুলোকে রাজনৈতিক দলের স্বীকৃত দিতে অস্বীকৃতি জানায়। এ ক্ষেত্রে তাদের প্রধান যুক্তি ছিল বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কমিউনিস্ট পার্টিগুলো সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত। এসব দলের নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা নেই। দলের ভেতর মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নেই এবং গণতান্ত্রিক চর্চা নেই। জার্মানিতে নাৎসি পার্টির উত্থানের পর দলের ভেতর গণতন্ত্রের চর্চা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একটি দলে যদি গণতন্ত্র না থাকে তাহলে রাজনৈতিক দলটি ফ্যাসিস্ট দলে পরিণত হতে পারে। নাৎসিবাদের উত্থান ও বিপর্যয় নিয়ে বিশ্বে যত গবেষণা হয়েছে, তাতে একক সিদ্ধান্ত, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্র চর্চার বিষয়টি সামনে এসেছে। গ্লাসনস্ত ও পেরেস্ত্রোইকা তত্ত্বের মাধ্যমে বিশ্বে কমিউনিস্ট আন্দোলন বিপর্যয়ে পড়ে। এ সময় গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত হিসেবে রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের চর্চার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একটি দলের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার বিষয়টিও সামনে আসে। এভাবে গণতন্ত্রের সংজ্ঞা এবং তার পরিধি বিস্তৃত হয়। একটি দেশে গণতন্ত্র মানে শুধু নির্বাচন নয়; রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরে গণতন্ত্র চর্চার বিষয়টি স্বীকৃত পায়। এ তত্ত্বকে সামনে রেখে আমরা প্রশ্ন করতেই পারি, বিএনপি কি স্বাধীন, মুক্ত?

আমার বিবেচনায় বিএনপি পরাধীন, শৃঙ্খলিত এক রাজনৈতিক দল। একটি মুক্ত স্বাধীন রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরে জবাবদিহিতা থাকাটা জরুরি। নেতারা যদি নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ হন তাহলে তাদের সরে দাঁড়াতে হয়। দেশে দেশে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এই চর্চা প্রচলিত। বেশি দূরে যাওয়ার দরকার নেই, ভারতের ন্যাশনাল কংগ্রেসের কথাই ধরা যাক। ঐতিহাসিকভাবে এই দলটি নেহরু পরিবার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। ২০১৪ সালের নির্বাচনের শোচনীয় পরাজয়ের পর সোনিয়া গান্ধী দলের নেতৃত্বে থেকে সরে দাঁড়ান। রাহুল গান্ধীকে করা হয় ঐতিহ্যবাহী দলটির সভাপতি। ২০১৯ সালের নির্বাচনেও কংগ্রেস বিজেপির কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। এবার সভাপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ান রাহুল গান্ধীও। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে কংগ্রেস নতুন সভাপতি নির্বাচন করে। মল্লির্কাজুন খড়গে এখন কংগ্রেসের সভাপতি। কংগ্রেসে রাহুল গান্ধীর জনপ্রিয়তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। তরুণরা তাকেই সভাপতি হিসেবে রাখতে চেয়েছিল। কিন্তু গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে রাহুল তার পদত্যাগের সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন। বিএনপি ২০০৮-এর নির্বাচনে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। পরাজয়ের পরও খালেদা জিয়া দলের নেতৃত্বে থেকে সরে দাঁড়াননি। ২০১৪ সালে বিএনপির আন্দোলনের কৌশল ব্যর্থ হয়। পাঁচটি সিটি নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পরও বিএনপি কেন সংসদ নির্বাচন বর্জন করল—সেই প্রশ্নের উত্তর নেই। নেই জবাবদিহি। একইভাবে ২০১৫ সালের আন্দোলনেও বিএনপি শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হলো। এ নিয়েও দলে কোনো সমালোচনা নেই। নেই নেতৃত্বের পরিবর্তন। ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগেই দুটি দুর্নীতির মামলার দণ্ডিত হন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। যে কোনো গণতান্ত্রিক দলের নিয়ম হলো দুর্নীতির দায়ে কেউ দণ্ডিত হলে তিনি তার দলীয় পদে থাকার অধিকার হারান। বিএনপির গঠনতন্ত্রেও এমন বিধান ছিল। কিন্তু খালেদা জিয়া কারান্তরীণ হওয়ার আগেই কোনোরকম কাউন্সিল ছাড়াই তড়িঘড়ি করে গঠনতন্ত্রের বিধানটি বাতিল করা হয়। বিএনপির শীর্ষ দুই নেতাই দণ্ডিত। ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির শোচনীয় বিপর্যয়ে পড়ে। এরপর দলের ভেতর কিছু আত্মসমালোচনা লক্ষ করা যায়। নেতৃত্ব পরিবর্তনের দাবি তোলেন অনেক নেতা। ‘জাতীয় ঐক্য ফ্রন্টে’ যোগদান, ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে নির্বাচন ইত্যাদি ‘ভুল’ সিদ্ধান্ত নিয়ে কথাবার্তা হয়। কিন্তু এত ভুলের পর একজন নেতাও পদত্যাগ করেননি। একজনও পদ হারাননি। এবারও বিএনপির আন্দোলন এবং নির্বাচন বর্জনের কৌশল ভুল প্রমাণিত হয়েছে। লন্ডন থেকে যে আন্দোলনের কর্মসূচি দেওয়া হয়েছিল, তা ছিল বাস্তবতা-বিবর্জিত। আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ নেতারা কি পদত্যাগ করবেন? তারা যদি পদত্যাগ করে নতুন নেতৃত্ব সামনে আনেন তাহলে বিএনপি মুক্ত হবে।

একটি মুক্ত রাজনৈতিক দলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো দলের ভেতর গণতন্ত্র চর্চা। দলের ভেতর কতটুকু গণতন্ত্র আছে তা বোঝা যায়, সাংগঠনিক বিন্যাসে, নিয়মিত সম্মেলনে। আট বছর ধরে বিএনপির কেন্দ্রীয় কাউন্সিল হয় না। দলের স্থায়ী কমিটিতে শূন্য পদ পূরণের কোনো উদ্যোগ নেই। প্রায় অর্ধেক জেলায় কমিটি নেই। অঙ্গ সহযোগী সংগঠনগুলো এখনো জেলায় জেলায় পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করতে পারেনি। এরকম অবস্থায় একটি দল কীভাবে চলছে, সেটাই এক বড় প্রশ্ন। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী বিএনপির নীতিনির্ধারণী সংস্থা হলো স্থায়ী কমিটি। কিন্তু বিএনপির স্থায়ী কমিটি এখন অকার্যকর, অসম্পূর্ণ। একে তো স্থায়ী কমিটির পাঁচটি পদ খালি, অন্যদিকে যারা আছেন তাদের কয়েকজন অসুস্থ। দলীয় কাজকর্মে অংশগ্রহণের মতো অবস্থা তাদের নেই। স্থায়ী কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় না। সিদ্ধান্ত আসে লন্ডন থেকে। গত দুই বছর বিএনপির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এক ব্যক্তির ইচ্ছায় সবকিছু হচ্ছে। লন্ডন থেকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান যা নির্দেশ দিচ্ছেন, নেতারা বিনা প্রশ্নে তা প্রতিপালন করছেন। একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক, আলোচনা, সমালোচনার সুযোগ নেই বিএনপিতে। বিএনপির অনেক প্রবীণ নেতাই ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় স্বীকার করেন, বেগম জিয়া যখন দলের চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পালন করতেন তখন যে কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে তর্ক-বিতর্ক হতো। বেগম জিয়া কথা বলতেন কম, শুনতেন বেশি। এখন বিএনপিতে ঠিক উল্টো ধারা চলছে। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানই শুধু কথা বলেন, বাকিরা শোনেন এবং নির্দেশ প্রতিপালন করেন। যে কোনো রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব দিতে হয় সামনে থেকে। বাংলাদেশের বাস্তবতা, জনগণের মনোভাব ইত্যাদি অনুধাবন করার জন্য প্রয়োজন সার্বক্ষণিক নেতৃত্ব। বিএনপি এখন চলছে খণ্ডকালীন নেতৃত্বে। দূর থেকে পরিস্থিতি বিবেচনা না করেই দেওয়া হচ্ছে কর্মসূচি। এসব কর্মসূচি বুমেরাং হচ্ছে দলটির জন্য। বিএনপির ভেতরই গণতন্ত্রকে বন্দি করে রাখা হয়েছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নেই দলের ভেতর। ভিন্নমতকে দমন করা হচ্ছে কঠোরভাবে। বিএনপি কি এক ব্যক্তির ইচ্ছার কারাগার থেকে মুক্তি পাবে? বিএনপিতে অনেক পোড়খাওয়া ত্যাগী নেতা রয়েছেন। তাদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা প্রমাণিত, বাংলাদেশে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে যারা রাজনীতি করেছেন, জেল-জুলুম সহ্য করেছেন। এরকম কাউকে দলের নেতৃত্ব দিলে সমস্যা কোথায়? কেন দূর থেকে রিমোর্ট কন্ট্রোলে দল চালাতে হবে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে বিএনপিকেই।

বিএনপি যে আন্দোলনের কর্মসূচি পালন করছে, নির্বাচনে যাওয়ার বা বর্জনের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, তা কি স্বাধীন চিন্তার ফসল নাকি কারও আশ্বাসে বিএনপি এসব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। দলটি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কতটা স্বাধীন, মুক্ত? ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত বিএনপি নিয়েছিল কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের পরামর্শে। বিএনপির অন্তত দুজন প্রয়াত নেতা একাধিক সাক্ষাৎকারে এরকম অভিযোগ করেছেন। তারা বলেছেন, বিএনপিকে নির্বাচন থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছিল কোনো বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা। বিএনপি নির্বাচন না করলেই ১৯৯৬ বা ২০০৭ সালের মতো ঘটনা ঘটবে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটবে—এমন নিশ্চিত আশ্বাস ছিল তাদের পক্ষ থেকে। আবার ২০১৮ সালে বিএনপিকে নির্বাচনে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিল বিদেশি রাষ্ট্র। তাদের বুদ্ধিতেই ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে জোট করে বিএনপি। বিএনপির অনেক নেতাই এ সিদ্ধান্তে বিস্মিত ও হতবাক হয়েছিলেন। অনেকেই এ সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেননি। গত দুই বছর বিএনপি আন্দোলন করেছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের পরিস্থিতি দেখে। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে যেভাবে সরব হয়েছিল, তাতেই বিএনপি আশাবাদী হয়ে উঠেছিল। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মনোভাব দেখেই বিএনপির আন্দোলনের কর্মসূচি বেগবান হচ্ছিল। নিজেদের ইচ্ছা, লাভ-ক্ষতি হিসাব, প্রতিপক্ষের শক্তি কিংবা বিশ্ব মেরূকরণ ইত্যাদি কোনো কিছুই মাথায় নেয়নি দলটি। অনেক সময় মনে হয়েছে, বিএনপি বোধহয় পশ্চিমাদের ইচ্ছে পূরণের হাতিয়ার কিন্তু স্বাধীনভাবে দলের কৌশল নির্ধারণ না করলে যে শেষতক হতাশার সাগরে হাবুডুবু খেতে হয়, বিএনপির এবারের আন্দোলন তার প্রমাণ।

এখন বিএনপি নতুন করে হিসাব কষছে। অনেকে মনে করেন, দলের সিনিয়র নেতারা মুক্ত হয়েছেন, নিশ্চয়ই তারা নতুন করে আন্দোলন শুরু করবেন। আমার কিন্তু তা মনে হয় না। আমি মনে করি, বিএনপিকে আগে মুক্ত হতে হবে। দলে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। ব্যর্থদের সরে দাঁড়াতে হবে। নতুন নেতৃত্ব সামনে আনতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, বিএনপিতে মতপ্রকাশের, চিন্তার এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা দিতে হবে। না হলে দল হিসেবে বন্দি বিএনপির মৃত্যু হবে নিজেদের তৈরি কারাগারেই। নেতারা মুক্ত হলো, বিএনপি কি মুক্ত হবে।


লেখক: নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত

ইমেইল: poriprekkhit@yahoo.com



মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

মৃত্যু বাংলাদেশে, সমাধি পাকিস্তানে

প্রকাশ: ১১:০০ পিএম, ২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪


Thumbnail

৮ ফেব্রুয়ারি ঘটনা বহুল নির্বাচনের পর পাকিস্তানের ‘দ্যা ন্যাশন’ পত্রিকার সম্পাদকীয় শিরোনাম ছিলো ‘ডেথ অফ কেয়ার টেকার গর্ভরমেন্ট সিস্টেম’ (তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার মৃত্যু)। সম্পাদকীয় শিরোনাম দেখে চমকিত হলাম। পাকিস্তানের জাতীয় নির্বাচন নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে দেশে-বিদেশে। এই বিতর্কিত নির্বাচন নিয়ে আরও কিছু দিন চর্চা হবে, নির্বাচনে নজির বিহীন কারচুপির পরও ইমরান খানের দল ভোট বিপ্লব ঘটিয়েছে। নওয়াজ আর বিলওয়ালের ঐক্য পাকিস্তানের জনগণ কতটা গ্রহণ করেছে? এই প্রথম সেনাবাহিনী নির্বাচনী পরিকল্পনায় হোঁচট খেয়েছে। পাকিস্তানে ভেস্তে গেছে মার্কিন পরিকল্পনা-ইত্যাদি নানা বিষয় নিয়ে বিভিন্ন জনের মত উঠে আসছে বিশ্বের গণমাধ্যমে। কিন্তু আমার চোখ আটকে আছে পাকিস্তানে কেয়ার টেকার সরকার ব্যবস্থার মৃত্যুর খবরে। তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার জন্ম হয়েছিল পাকিস্তানে। জামায়াতের তত্বাবধানে পাকিস্তান থেকে এই মডেল আমদানি করা হয়েছিল বাংলাদেশে। এক যুগ আগেই বাংলাদেশ তত্বাবধায়ক সরকারকে বিদায় দিয়েছে। পাকিস্তানি এই ‘গণতন্ত্রের মডেল’ অবশ্য বাংলাদেশে পাকিস্তান পন্থীরা এখনও আঁকড়ে ধরে আছে। এবার পাকিস্তানের নির্বাচনের পর বাংলাদেশে তত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষের উকিলরা কি বলবেন?  

বিশ্বে কেয়ার টেকার বা তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার প্রবর্তক হলেন সামরিক একনায়ক জিয়াউল হক। ১৯৮৮ সালে মোহাম্মদ জুনেজুকে অপসারণ করেন। তার অনুগতদের মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দিয়ে যে নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করেন তার নাম দেন ‘কেয়ার টেকার সরকার’। সামরিক এক নায়কের আবিস্কৃত এই তত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি দেশটিতে স্থায়ী রূপ পায় ১৯৯০ সালের ৬ আগস্ট। পাকিস্তানে গোলাম মোস্তফা জাতুই প্রথম তত্বাবধায়ক সরকার প্রধান। তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের বাহ্যিক লক্ষ্য হিসেবে বলা হয়েছিল অবাধ, সুষ্ঠু এবং প্রভাবমুক্ত নির্বাচন আয়োজন নিশ্চিত করা। কিন্তু এর অর্ন্তনিহিত তাৎপর্য ছিলো নির্বাচনের পুরো নিয়ন্ত্রণ সেনাবাহিনীর কাছে রাখা। তত্বাবধায়ক সরকারের নামে একটি পুতুল সরকারকে নির্বাচনকালীন সময়ে ক্ষমতায় বসানো হয়। যার রিমোট কন্ট্রোল থাকে সেনাবাহিনীর সাথে। সেনাবাহিনী যাকে নির্বাচনে জেতাতে চায়-তত্বাবধায়ক সরকার এবং নির্বাচন কমিশন তাদের হয়ে কাজ করে এবং জিতিয়ে আনে। তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতার চিরস্থায়ী মালিকানা নেয় পাকিস্তানের সেনাবাহিনী। 

এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে ফ্যাসিষ্ট জামায়াত রাজনৈতিক দল হিসেবে মূলধারার রাজনীতিতে ফিরে এসেছিল। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের এক পর্যায়ে জামায়াত কৌশলে কেয়ার টেকার সরকারের পাকিস্তানি মডেল রাজনীতির মাঠে ছেড়ে দেয়। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির তখন প্রধান লক্ষ্য ছিলো এরশাদকে ক্ষমতা থেকে হটানো। জামায়াতের কেয়ার টেকার সরকারের অস্পষ্ট ধারণাকে পূর্ণতা দেয় আওয়ামী লীগ। পান্থপথের জনসভায় আওয়ামী লীগ সভাপতি তত্বাবধায়ক সরকারের এক পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা ঘোষণা করেন। ৭৫ এর পর বাংলাদেশের রাজনীতিও পাকিস্তানি ধারায় চলতে শুরু করে। ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নেয় সেনাবাহিনী। বার বার সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে পাঠানো হয় নির্বাসনে। রাজনীতিবিদ, আমলাদের চেয়ে সেনাবাহিনী হয়ে ওঠে অনেক বেশী ক্ষমতাবান। ঐ বাস্তবতায় গণতন্ত্রে উত্তরণে ‘তত্বাবধায়ক’ সরকার ছিলো একটি সাময়িক সমাধান। ৯১ এর নির্বাচনে বাংলাদেশে প্রথম তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু হয়। পাকিস্তানের কেয়ার টেকার সরকার ব্যবস্থার কয়েক মাস পর। কিন্তু শুরুতেই তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা গণতন্ত্রের মৌলিক চেতনাকে আঘাত করে। সংবিধান লঙ্ঘন করে। একজন প্রধান বিচারপতিকে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব দেয়া হয়। বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হয়ে প্রধান বিচারপতির পদ ছাড়েননি। উপরন্ত নির্বাচনের পর তাকে প্রধান বিচারপতি পদে ফেরাতে রাজনৈতিক দলগুলো সংবিধান সংশোধন পর্যন্ত করে। এটি নজির বিহীন অন্যায়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশে সুশীল সমাজের সুপ্ত ক্ষমতার লোভ জাগ্রত হয়। তারা অনুভব করে, রাজনৈতিক দলগুলো এই তত্বাবধায়ক সরকারের মাধ্যমে একান্ত অনুগত রাখা যায়। 

৯১, ৯৬ এবং ২০০১ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের রাজনীতিতে সুশীল সমাজের প্রভাব বাড়ে। তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা আসলে এমন এক ব্যবস্থা যেখানে ৯০ দিনের জন্য বসা ক্ষমতাবানরা পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য জাতির ভাগ্য নির্ধারণ করে। এই ব্যবস্থায় নির্বাচন বাইরে থেকে সুন্দর পরিপাটি, ভেতরে পরিকল্পিত কারচুপি। তত্বাবধায়ক সরকার কাকে নির্বাচিত করতে চায়, তার একটি বার্তা তারা আগে থেকেই পায়। সুশীল এবং বিদেশী প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলো যার ব্যাপারে সবুজ সংকেত দেয়, নির্বাচনে তারই জয় হয়। বাংলাদেশে তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় বিরাজনীতিকরণ বাস্তবায়নে নতুন কৌশল নেয়া হয়। একটি রাজনৈতিক দল যেন পরপর দুবার ক্ষমতায় না আসে, সেটি নিশ্চিত করা হয় এই ব্যবস্থায়। বিএনপির পর আওয়ামী লীগ আবার বিএনপি। ৫ বছর পরপর ক্ষমতার পট পরিবর্তনের রীতি চালু হয়। একটি রাজনৈতিক দল, একটি সুনির্দিষ্ট কর্মসূচী এবং পরিকল্পনা নিয়ে ভোটে যায়। জয়ী হবার পর মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে সেই কর্মসূচী সম্পন্ন করা কিংবা তার ইতিবাচক ফলাফল জনগণের সামনে তুলে ধরা অসম্ভব। আবার বাংলাদেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের অবস্থান দুই মেরুতে। একটি দল সরকার গঠন করে যে সব উদ্যোগ গ্রহণ করে, অন্যদল পাঁচ বছর পর এসে সব বাতিল করে দেয়। ফলে কোন রাজনৈতিক দলের কর্মসূচীর ধারাবাহিকতা থাকে না। সুফল পায় না। কমিউনিটি ক্লিনিক কার্যক্রমের কথাই ধরা যাক। আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৯৭ সালে কমিউনিটি ক্লিনিক কার্যক্রম শুরু করে। প্রান্তিক জনগণ এর সুফল পেতে শুরু করার আগেই বিএনপি-জামায়াত জোট ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে কমিউনিটি ক্লিনিক বন্ধ করে দেয়। এরকম অনেক উদাহরণ দেয়া যায়। সে বিতর্কে আমি এখন যেতে চাই না। একটি সরকারের ধারাবাহিকতা না থাকলে, বাংলাদেশের মতো দেশ গুলোতে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকে না। এর ফলে গণতন্ত্র এবং রাজনৈতিক সরকারের ওপর জনগণের অনীহা তৈরী হয়। রাজনৈতিক সরকার গুলো দেশ পরিচালনায় দক্ষ নয়, এমন একটি মনোভাব সৃষ্টি হয়। এই পরিস্থিতির সুযোগ নেয়, অনির্বাচিত গোষ্ঠী। 

পাকিস্তানে কেয়ার টেকার পদ্ধতির মাধ্যমে যেমন রাষ্ট্র ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নেয় সেদেশের সেনাবাহিনী। ঠিক তেমনি বাংলাদেশে তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নেয় বিদেশী প্রভু এবং তাদের অনুগত সুশীল সমাজ। বাংলাদেশে তত্বাবধায়ক সরকারের কাঠামো করা হয় এমন ভাবে যে, তা আসলে সুশীলদের অনির্বাচিত সরকার। সংবিধান তাদের রুটিন কাজের দায়িত্ব দিলেও অপছন্দের দলকে হারাতে এরা সব কিছু করে। জনগণের ভোট নয়, তত্বাবধায়ক সরকারে কারা থাকছে তার ওপর নির্ভর করে নির্বাচনের ফলাফল। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এসে ক্ষমতায় থাকার এই সূত্রটি প্রথম আবিস্কার করে। তত্বাবধায়ক সরকার প্রধান হিসেবে বিচারপতি কে.এম. হাসানকে অভিষিক্ত করতে ক্ষমতাসীন জোট সংবিধান সংশোধন করে। তিন স্তরে দলীয় ক্যাডার দিয়ে প্রশাসন সাজায়। একটি প্রহসনের নির্বাচন কমিশন গঠন করে। দেড় কোটি ভুয়া ভোটার সৃষ্টি করা হয়। সার্বিক ভাবে এমন একটি আবরণ তৈরী করা হয় যে, নির্বাচন যেভাবেই হোক বিএনপি আবার ক্ষমতায় আসবে। বাংলাদেশে তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার মৃত্যু হয় তখনই। বিএনপি-জামায়াত জোট পুতুল রাষ্ট্রপতি ড. ইয়াজউদ্দিন আহমেদকে তত্বাবধায়ক সরকার প্রধান করে, এই ব্যবস্থার কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেয়। রাজনৈতিক দলগুলোর অনঢ় অবস্থান, ক্ষমতায় টিকে থাকার উদগ্র বাসনা সুশীলদের জন্য অভাবনীয় সুযোগ সৃষ্টি করে। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সেনা সমর্থনে বাংলাদেশে একটি সুশীল কু সংগঠিত হয়। দুই বছর জগদ্দল পাথরের মতো চেপে থাকে অক্ষম, অযোগ্য একটি সুশীল সরকার। এসময় বাংলাদেশে তত্বাবধায়ক সরকারের বিরুদ্ধে একটি জাতীয় ঐক্যমত তৈরী হয়। আওয়ামী লীগ-বিএনপি সবাই তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে কাঠগড়ায় দাড় করায়। সীমাহীন নানা সংকটের মুখে সুশীল সরকার একটি নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়। এসময় বাংলাদেশ সুপ্রীম কোট এক ঐতিহাসিক রায়ে তত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতিকে বাতিল ঘোষণা করে।

বাংলাদেশ সব কিছুতেই পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে। ৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধের পর গত ৫২ বছরে বাংলাদেশ নানা ঘাতপ্রতিঘাত পেরিয়ে যতটা এগিয়েছে, পাকিস্তান ঠিক ততোটাই পিছিয়েছে। বিশ্বে বাংলাদেশ যতটা অনুকরণীয় সম্ভাবনাময় রাষ্ট্র, পাকিস্তান ঠিক ততোটাই বর্জনীয় ব্যর্থ রাষ্ট্র। পাকিস্তানিদের কেয়ার টেকার পদ্ধতি ডাষ্টবিনে ফেলে দিয়ে বাংলাদেশ প্রমাণ করেছে, গণতান্ত্রিক চেতনাতেও তারা পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে। কিন্তু বাংলাদেশে পাকিস্তানের প্রেত্মাত্বারা এখনও সজাগ, সক্রিয়। সর্বোচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তের পরও কেউ কেউ তত্বাবধায়ক সরকার পূণ:বহালে দাবী করে আসছে। ২০১৪ সালে এই দাবীতে বিএনপি নির্বাচন বর্জন করে। এর পেছনে ছিলো পাকিস্তানপন্থীদের ভুল রাজনৈতিক হিসেব। ২০২৪ সালে নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি ২০১৪ সালের চেয়েও বড় ভুল করে। সুশীলরা কেন তত্বাবধায়ক সরকার চায়, তা সহজেই বোঝা যায়। এর মাধ্যমে জনরায় ছাড়াই সুশীলরা ক্ষমতার হালুয়া রুটির ভাগ পায়। কিন্তু বিএনপি কেন তত্বাবধায়ক সরকার চায় তা অনুভব করতে হলে দলটির জন্ম ও মনস্তত্ব বুঝতে হবে। বিএনপি মূলত: পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের গর্ভজাত সন্তান। বাংলাদেশে পাকিস্তানের স্বার্থ সংরক্ষণই দলটির প্রধান এজেন্ডা। গভীর মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, পাকিস্তানে যখন সেনাবাহিনী তরতাজা থাকে, তখন বিএনপির মধ্যেও তেজী ভাব লক্ষ্য করা যায়। এখন অর্থনেতিক সংকটে জর্জরিত পাকিস্তান। নিজের দেশেই কোণঠাসা পাকিস্তানের সেনাবাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থা। বিএনপিকে তারা চাঙ্গা করবে কিভাবে। পাকিস্তানে অস্থিরতা মানেই বিএনপি পথ হারা। পাকিস্তান যত দেউলিয়া এবং ব্যর্থ হবে ততোই বিএনপি ক্ষয়িষ্ণুও হবে। এটাই সমীকরণ। পাকিস্তানের বহুল আলোচিত, বিতর্কিত নির্বাচনের পর সেদেশের তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রশ্নের মুখে। সাধারণ গণতন্ত্রকামী মানুষ এই ব্যবস্থাকে সেনাবাহিনীর ‘পুতুল’ বলছে। পাকিস্তানে যদি গণতন্ত্র অব্যাহত রাখতে হয় তাহলে সেখানে কেয়ার টেকার পদ্ধতি বাতিল করতেই হবে। পাকিস্তানে তত্বাবধায়ক সরকার বাতিল হলে, বাংলাদেশের সুশীলরা কি করবে? কি করবে বিএনপি-জামায়াত? তত্বাবধায়ক সরকারের মৃত্যুতে তারা একটি শোক প্রস্তাব নিতেই পারে। যে ব্যবস্থাটি গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর, সেই ব্যবস্থা বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে চায় কারা? নিশ্চয়ই গণতন্ত্রের শত্রুরা।

সৈয়দ বোরহান কবীর, নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত
poriprekkhit@yahoo.com


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে হেভিওয়েট নেতাকে আনা হচ্ছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে?

প্রকাশ: ১০:০০ পিএম, ২০ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪


Thumbnail

সরকারের এখন সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ দ্রব্যমূল্য। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের জন্য একের পর এক পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার। বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে কথা বলছে, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এখন দম ফেলার সময় নেই। তারা বিভিন্ন রকমের উদ্যোগ, কর ছাড়, শুল্ক ছাড় সহ নানামুখী পদক্ষেপ নিচ্ছে। কিন্তু তারপরও এখন পর্যন্ত তারা দ্রব্যমূল্যে লাগাম টেনে ধরতে পারেনি। দ্রব্যমূল্যের লাগাম টেনে ধরাই সরকারের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। 

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও বলেছেন, তার সরকার বসে নেই। দ্রব্যমূল্য মূল্য নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকার চেষ্টা করে যাচ্ছে। রমজান আসতে অল্পদিন বাকি রয়েছে। এর মধ্যে যদি দ্রব্যমূল্যকে সহনীয় না রাখা যায়, অন্তত স্থিতিশীল রাখা না যায় তাহলে পরিস্থিতি সামনের দিকে খারাপ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এরকম বিষয়টি নিয়ে সরকারের নীতি নির্ধারক মহলে আলোচনা হচ্ছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মতো একটা স্পর্শকাতর মন্ত্রণালয়ে একজন তরুণ প্রতিমন্ত্রীকে দেওয়াটা কতটুকু নিরাপদ এবং যুক্তিসঙ্গত সেটি নিয়েও কোন কোন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। 

নতুন প্রতিমন্ত্রী অবশ্য যথেষ্ট পরিশ্রম করছেন এবং আগের পূর্ণমন্ত্রীর চেয়ে এখন পর্যন্ত তিনি সংযত এবং তার দৃশ্যমান চেষ্টা লক্ষণীয়। কিন্তু বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং বাজারে যারা বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী আছে তাদের সঙ্গে দর কষাকষি করে তাদের লাভের লাগাম টেনে ধরার মতো কঠিন কাজটা একজন আওয়ামী লীগের তরুণ নেতার পক্ষে কতটুকু সম্ভব এ নিয়ে কোন কোন মহলে ব্যাপক প্রশ্ন উঠেছে। আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারক মহলেও এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এই কারণেই দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে একজন হেভিওয়েট নেতাকে দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে এমন গুঞ্জন রয়েছে। 

আওয়ামী লীগের মধ্যে আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র বলছে, আওয়ামী লীগের প্রায় সবাই মনে করেন যে, মন্ত্রিসভায় আছেন বা মন্ত্রিসভার বাইরে আছেন এমন একজন ব্যক্তি গুরুত্বপূর্ণ জনপ্রিয় নেতাকে এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কারণ এই মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের সাথে কথাবার্তা বলতে হয়, তাদের সঙ্গে দর কষাকষি করতে হয় এবং একজন রাজনৈতিক নেতার পক্ষে এটাই যতটা সহজ অন্য কারও পক্ষে ততটা সহজ নয়। 

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা তোফায়েল আহমেদের উদাহরণ দিয়েছেন। দুই মেয়াদে তোফায়েল আহমেদ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন এবং এসময় দ্রব্যমূল্যকে নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষেত্রে তিনি যথেষ্ট সফল ছিলেন। ব্যক্তিগতভাবে বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সঙ্গে তার সুসম্পর্ক থাকাটাকে তিনি কাজে লাগিয়েছিলেন। আর অন্যদিকে টিপু মুনশি এবং ২০০৮ এর আংশিক সময়ে ফারুক খান এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হিমশিম খেয়েছেন, রীতিমতো ব্যর্থ হয়েছেন। 

ফারুক খানকে একটা পর্যায়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে দেওয়া হলেও টিপু মুনশি পাঁচ বছর ধরে এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করে সরকারের এবং নিজের বদনাম করেছেন মাত্র। এখন দলের যদি কোন সিনিয়র নেতাকে এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় তাহলে সরকারের পক্ষ থেকে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকার যে কতটা আগ্রহী এবং সর্বাত্মক সেরকম একটি বার্তা দেওয়া সম্ভব হবে। 

বিভিন্ন মহল মনে করেন এখন যারা মন্ত্রিসভায় আছেন তাদের মধ্যে অন্তত তিনজন আছেন যারা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের চেহারা দৃশ্যমান ভাবে পালন করতে পারবেন। আবার অনেকে মনে করেন মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত হননি এমন কোন নেতারাও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়ে চালাতে পারবেন। তবে কোন টেকনোক্র্যাট বা আমলা নন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে একজন জনপ্রিয় গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিবিদের আসা উচিত বলে মনে করেন অধিকাংশ সাধারণ মানুষ।

দ্রব্যমূল্য   বাণিজ্য মন্ত্রণালয়  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

চুক্তির ভারে নুয়ে পড়েছে প্রশাসন

প্রকাশ: ০৫:০০ পিএম, ১৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪


Thumbnail

আরও একজন সচিব চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেলেন। রেলওয়ের সচিব ড. মোঃ হুমায়ুন কবীরের চাকরির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি। তার আগেই গত ১৫ ফেব্রুয়ারি তাকে এক বছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সচিব হিসেবে ড. মোঃ হুমায়ুন কবীর খুব একটা দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন, এমন কোন প্রমাণ নেই। জনমনে তার কোন কর্মকাণ্ড নিয়ে উচ্ছ্বাস-উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে, এমন কোন দৃষ্টান্তও নেই। ছাত্রজীবনে তার রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তার সহকর্মীরা অনেকেই দাবি করেন যে, তিনি ছাত্রজীবনে বিরুদ্ধ মতের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তারপরও রেলপথ মন্ত্রণালয়ে তিনি আরও এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেলেন। এর ফলে মোট সচিবদের প্রায় অর্ধেকই এখন চুক্তিতে নিয়োগ পেয়েছেন। সচিবালয়ে এ নিয়ে তোলপাড় চলছে। 

একজন সচিব চুক্তিতে নিয়োগ পেলে অন্তত এক ডজন ব্যক্তির পদোন্নতি রুদ্ধ হয়ে যায়। এখন ১৫তম ব্যাচ সচিব হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। প্রশাসন ক্যাডারের অনেকগুলো ব্যাচ রয়েছে যারা এখনও পর্যন্ত পদোন্নতির অপেক্ষায় আছেন। তাছাড়া ১০, ১১ এবং ১৩ ব্যাচের অনেক যোগ্য কর্মকর্তা রয়েছেন যারা সচিব হওয়ার অপেক্ষায়। এই পর্যায়ে নির্বাচনের পর পর নতুন সরকার রেলওয়ের সচিবকে কোন যোগ্যতায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিলেন তা নিয়ে সচিবালয়ে বিস্ময় সৃষ্টি হয়েছে। 

বর্তমানে প্রশাসনের শীর্ষ সব কর্মকর্তাই চুক্তিতে নিয়োগপ্রাপ্ত। আর এই চুক্তির কারণে চিলে চ্যাপটা হয়েছে প্রশাসন। চুক্তির ভারে প্রশাসন যান এখন চলতে ফিরতে পারছে না। 

বর্তমানে যে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারা চুক্তিতে আছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোঃ মাহবুব হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মোঃ তোফাজ্জল হোসেন মিয়া, প্রধানমন্ত্রীর এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক মো. আখতার হোসেন, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ বা এনবিআরের চেয়ারম্যান আবু হেনা মোঃ রহমাতুল মুনিম, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মাসুদ বিন মোমেন, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চলের নির্বাহী চেয়ারম্যান সিনিয়র সচিব পদমর্যাদায় শেখ ইউসুফ হারুন, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান লোকমান হোসেন মিয়া, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব তপন কান্তি ঘোষ, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব গোলাম মোঃ হাসিবুল আলম, বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব কে এম আব্দুস সালাম, জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব জনাব মোস্তাফিজুর রহমান, রাষ্ট্রপতির সচিব সম্পদ বড়ুয়া, রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে সংযুক্ত ওয়াহিদুল ইসলাম খান, বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের চেয়ারম্যান প্রদীপ রঞ্জন চক্রবর্তী, বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত সচিব জনাব মোকাম্মেল হোসেন, ইরাকে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ফজলুল বারী, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের চেয়ারম্যান এ বি এম আজাদ, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এ বি এম আমিন উল্লাহ নুরী, গৃহায়ন পূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিন, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান যিনি সচিব পদমর্যাদায় আছেন জনাব মো. আনিসুর রহমান মিয়া। 

এছাড়াও এডিবির বিকল্প নির্বাহী পরিচালক ফাতেমা ইয়াসমিন এবং বিশ্ব ব্যাংক ওয়াশিংটন থেকে সদ্য পদত্যাগ করা প্রধানমন্ত্রী সাবেক মূখ্য সচিব ড. আহমেদ কায়কাউস এখন চুক্তির তালিকায় রয়েছেন। কারণ, ড. কায়কাউসের পদত্যাগপত্র বিশ্ব ব্যাংকের বোর্ডসভায় এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত অনুমোদিত হয়নি। 

গুরুত্বপূর্ণ সব মন্ত্রণালয়সহ সচিবদের অর্ধেকই এখন চুক্তিতে নিয়োগপ্রাপ্ত। আর এই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের হিড়িকে মেধাবী-দক্ষ কমকর্তারা পিছিয়ে পড়ছেন। নতুন করে হুমায়ুন কবীরের চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া নিয়ে সচিবালয়ে প্রশ্ন উঠেছে, বিতর্ক উঠেছে, বিষয়টি সমালোচিত হচ্ছে।

চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ   প্রশাসন  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

ড. ইউনূসই কি আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিপক্ষ

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ১৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪


Thumbnail

সাড়ে তিন মাস কারাভোগের পর গত ১৫ ফেব্রুয়ারি মুক্তি পান বিএনপির শীর্ষ দুই নেতা। মির্জা ফখরুল-আমীর খসরুর মুক্তির দিনে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বাংলাদেশের প্রধান খবর ছিল ড. ইউনূস। ওইদিন সকালে গ্রামীণ কল্যাণ অফিসে গিয়ে ড. ইউনূস অভিযোগ করেন, তার আটটি প্রতিষ্ঠান জবরদখল হয়েছে। নির্বাচনের পর বিএনপির চেয়ে বেশি আলোচনায় শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস। শ্রম আদালতের একটি মামলায় তিনি ছয় মাসের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন। অর্থ পাচার ইস্যুতে তার বিরুদ্ধে চার্জশিট দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন। আদালতের অনুমতি ছাড়া তার বিদেশযাত্রার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। সর্বশেষ ‘গ্রামীণ কল্যাণ’কে তার আসল মালিক ‘গ্রামীণ ব্যাংকে’র কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এসব আইনি প্রক্রিয়া স্বাভাবিক এবং সহজাত। কিন্তু ড. ইউনূস এবং তার দেশি-বিদেশি বন্ধুরা এটিকে আক্রোশ হিসেবেই মনে করছেন। ড. ইউনূস প্রসঙ্গে উদ্বেগ জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। ড. ইউনূসের প্রথম স্ত্রীর কন্যা সিএনএনকে এক সাক্ষাৎকারে সরকারের সঙ্গে সমঝোতার যে প্রস্তাব দিয়েছিলেন, সেটিও সরকার আমলে নেয়নি। ড. ইউনূস ক্রমেই আন্তর্জাতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছেন। ৭ জানুয়ারির নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ সরকার বিএনপির ব্যাপারে যত উদার ও নমনীয়, ড. ইউনূসের ব্যাপারে ততই কঠোর, কঠিন। আওয়ামী লীগের এ কৌশলের রাজনৈতিক তাৎপর্য অনুধাবন করাটা জরুরি। সরকার বিএনপি বা অন্য বিরোধী দলের চেয়ে ড. ইউনূসের ব্যাপারে বেশি মনোযোগী কেন? নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পর থেকে আওয়ামী লীগের পরিবর্তিত এই রাজনৈতিক কৌশল থেকে সরকারের আসল প্রতিপক্ষ কে তার একটা ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কাগজে-কলমে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিপক্ষ জাতীয় পার্টি। সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দলই ক্ষমতাসীনদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু মাত্র ১১ জন সংসদ সদস্য নিয়ে জাতীয় পার্টি নিজেই নিজেদের বিরোধী দল ভাবতে লজ্জা পায়। জাতীয় পার্টির যে অবস্থা তাতে তাদের পক্ষে সরকারকে চ্যালেঞ্জ জানানো অসম্ভব। ছায়া সরকার গঠনের মতো সদস্যও তাদের সংসদে নেই। আওয়ামী লীগের অনুগ্রহ নিয়েই তারা বেঁচে আছে। সংসদের বাইরে আওয়ামী লীগের একমাত্র রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপি এবং তার মিত্ররা। নির্বাচন এবং নতুন সরকার গঠনের পরও বিএনপি আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েই চলেছে। লিফলেট বিতরণ, কালো পতাকা কর্মসূচি নিয়ে দলটি হতাশা আর ব্যর্থতার বৃত্ত থেকে বেরোনোর চেষ্টা করছে। ২৮ অক্টোবরের পর বিএনপির বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। অনেকেই ছিলেন পলাতক। নির্বাচনের পর তারা কারাগার এবং আত্মগোপন থেকে বেরিয়ে আসছেন। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও মুক্তি পেয়েছেন। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটি নতুন করে আন্দোলন শুরু করতে চায়। কিন্তু ভুল কৌশল এবং ব্যর্থ নেতৃত্বের কারণে এখন বিএনপি পথহারা। নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা। দলের সাংগঠনিক অবস্থা শোচনীয়। দলের ভেতর থেকেই এখন ব্যর্থ নেতৃত্বের সরে দাঁড়ানোর দাবি উঠেছে। বিদেশি বন্ধুরা আগের মতো বিএনপিকে আশা-ভরসা দিচ্ছে না। সবকিছু মিলিয়ে দলটি এলোমেলো, বিধ্বস্ত, বিপর্যস্ত। এই বিএনপি আওয়ামী লীগকে এখনই চাপে ফেলতে পারে—এমনটি তাদের নেতারাও আশা করেন না। গত বৃহস্পতিবার মির্জা ফখরুল ও আমীর খসরু মাহমুদের মুক্তিতে কর্মীরা কিছুটা হলেও উজ্জীবিত। কিন্তু মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একটি নতুন সরকারের বিরুদ্ধে চটজলদি বড় আন্দোলন গড়ে তুলতে পারবেন না। সামনে রমজান, তারপর ঈদুল আজহা, এরপর বর্ষাকাল। আগামী কিছুদিন আন্দোলনের সময় নয়। আওয়ামী লীগ বুঝেশুনেই বিএনপিকে দল গোছানোর সুযোগ দিয়েছে। বিএনপির নেতাদের মুক্তির ব্যাপারেও সরকার উদার। নির্বাচনী কৌশলে বিএনপিকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেছে আওয়ামী লীগ। এখন বিএনপির প্রতি আওয়ামী লীগের এক ধরনের উপেক্ষা এবং করুণা লক্ষ করা যায়। বিএনপি এখন আওয়ামী লীগের ভয়ংকর শত্রু না। বরং বিএনপি ধুঁকে ধুঁকে বাঁচলে আওয়ামী লীগের লাভ। না হলে দেশ রাজনীতিশূন্য হবে। জঙ্গিবাদ ও উগ্র সন্ত্রাসী শক্তির উত্থান ঘটবে। বিএনপির সঙ্গে কথার বাহাস না করলে আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই বেকার হয়ে যাবেন। বিএনপির বলয়ের বাইরে যেসব বাম ও উগ্র ডান কট্টর মৌলবাদী দলগুলো আছে, তাদের শক্তি সম্পর্কে আওয়ামী লীগ ভালোভাবেই অবগত। ইসলামী দলগুলো বশীভূত রাখার কৌশলও আওয়ামী লীগ রপ্ত করেছে বহু আগেই। নির্বাচনের আগে যেমনটি মনে করা হয়েছিল যে আন্তর্জাতিক চাপ আসবে। একতরফা নির্বাচন সরকারকে চাপে ফেলবে, সেটি হয়নি। বাংলাদেশের ব্যাপারে ভারতের বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। নতুন সরকারের সঙ্গে অংশীদারত্বের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বার্তা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। ফ্রান্স, যুক্তরাজ্যের অভিনন্দন আওয়ামী লীগকে করেছে চাপমুক্ত। নিষেধাজ্ঞা, স্যাংশন নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের চেহারায় যে আতঙ্কের চাপ দেখা যেত, সেটাও এখন নেই।

দ্রব্যমূল্য, অর্থনীতি ছাড়া এ সরকারের সামনে দৃশ্যত কোনো সংকট নেই। আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষরা এখন বাঘ থেকে বিড়ালে পরিণত হয়েছে। দেশে টানা চতুর্থবারের মতো ক্ষমতায় আসা দলটিকে চ্যালেঞ্জ জানানোর কেউ নেই। একজন ছাড়া, তিনি ড. ইউনূস। আওয়ামী লীগ সভাপতি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দূরদর্শী রাজনীতিবিদ। আওয়ামী লীগ যে টানা ক্ষমতায় আছে তার প্রধান কারণ শেখ হাসিনার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা। তার রাজনৈতিক কৌশলেই বেগম খালেদা জিয়া এবং বিএনপি ধরাশায়ী হয়েছে। তিনি দূর ভবিষ্যৎ দেখতে পান। শত্রু-মিত্র চিনতে খুব একটা ভুল করেন না। শেখ হাসিনা জানেন তাকে এবং আওয়ামী লীগকে যদি কেউ চাপে ফেলতে পারে সেটা ড. ইউনূস। বাংলাদেশে রাজনৈতিক আন্দোলন করে সরকার পতনের দিন শেষ হয়ে গেছে বহু আগেই। মানুষ এখন ভীষণ আত্মকেন্দ্রিক। চায়ের আড্ডায় কিংবা টকশো দেখে ড্রইংরুমেই তারা রাজা-উজির মারেন। রাস্তায় গিয়ে আন্দোলন করতে আগ্রহী নন। তরুণ প্রজন্ম রাজনীতিবিমুখ। তাই নব্বইয়ের মতো আন্দোলন বাংলাদেশে এখন অলীক কল্পনা। হত্যা-ক্যু-ষড়যন্ত্র করে সরকার হটানো এখন অসম্ভব। আমাদের সশস্ত্র বাহিনী এখন পেশাদার, আন্তর্জাতিক মানের। তারা পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর মতো সবকিছুতে নাক গলায় না। তা ছাড়া সংবিধানের ‘৭ক’ অনুচ্ছেদের মাধ্যমে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের পথ চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পেছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতা দখল করলে, একদিন তাকে কাঠগড়ায় ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ হিসেবে দাঁড়াতেই হবে। সরকারকে একমাত্র চাপে ফেলতে পারে বিদেশি শক্তি। যুক্তরাষ্ট্র এবং তার পশ্চিমা মিত্ররা যে বাংলাদেশের মতো একটি রাষ্ট্রে কী করতে পারে তা তো আমরা প্রতিনিয়তই দেখছি। গত দুই বছর মার্কিন চাপে আওয়ামী লীগ রীতিমতো আতঙ্কে ছিল। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি নিজেই বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যে কোনো দেশে ক্ষমতার ওলটপালট ঘটাতে পারে।’ তিনি মার্কিন চাপ সম্পর্কে এটাও বলেছিলেন, ‘তারা হয়তো চায় না আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকুক।’ দেশে দেশে মার্কিন স্বার্থরক্ষায় নিজস্ব ব্যক্তি রয়েছেন। এসব ব্যক্তির প্রভাব মার্কিন নীতিনির্ধারকদের মধ্যে প্রবল। এমনই একজন ড. ইউনূস। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ খেতাবপ্রাপ্ত। হিলারি ও বিল ক্লিনটন তাকে নোবেল পাইয়ে দিয়েছেন, এই তথ্য বিল ক্লিনটন তার লেখা বইতেই স্বীকার করেছেন। বয়সের কারণে যখন ড. ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ হারান, তখন হিলারি যেভাবে ড. ইউনূসের পক্ষে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, তাতেই বোঝা যায় ড. ইউনূস তাদের কত আপন। তিনি এবং তার অনুসারীরা সুযোগ পেলেই আওয়ামী লীগকে বেকায়দায় ফেলতে চান—এমন অভিযোগ আওয়ামী লীগ সবসময়ই করে। বাংলাদেশে একটি দীর্ঘমেয়াদি অনির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতায় বসানোর মূল পরিকল্পনা ড. ইউনূস ও তার বন্ধুদের। সুশীল গোষ্ঠী ক্ষমতায় বসলে বঙ্গোপসাগর, সেন্টমার্টিন, তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের ঠিকাদারি সব পাবে যুক্তরাষ্ট্র। তাই কখনো প্রকাশ্যে বা কখনো গোপনে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের নিরন্তর চেষ্টা চালান ড. ইউনূসের নেতৃত্বে সুশীল সমাজ। এর সংঘবদ্ধ রূপ ছিল ২০০৭ সালের এক-এগারো। ২০০৬ সালে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পরপরই ড. ইউনূস বাংলাদেশে মার্কিন এজেন্ডা বাস্তবায়নে মাঠে নেমেছিলেন। প্রথমে রাজনৈতিক দল করে তিনি ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু ড. ইউনূস ঝানু ব্যবসায়ী। সুদ-আসলের হিসাব তিনি ভালো বোঝেন। জনগণের ভোটে জেতা তার পক্ষে অসম্ভব এটা বুঝতে তিনি সময় নেননি। এরপরই আসে এক-এগারো। অনেকেই মনে করেন, এক-এগারোর মাস্টারপ্ল্যান ড. ইউনূসের মস্তিষ্কপ্রসূত। মঈন ইউ আহমেদের আত্মজীবনীমূলক ‘শান্তি স্বপ্নে, সময়ের স্মৃতিচারণ’ গ্রন্থে ড. ইউনূসের উচ্চাভিলাষের একঝলক প্রমাণ পাওয়া যায়। বইটির ৩২৮ ও ৩২৯ পৃষ্ঠায় মঈন ইউ লিখেছেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান হওয়ার অনুরোধ জানিয়ে তিনি (মঈন) ড. ইউনূসকে ফোন করেছিলেন। উত্তরে শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশকে তিনি যেমন দেখতে চান সেরকম বাংলাদেশ গড়তে খণ্ডকালীন সময় যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশকে তিনি আরও দীর্ঘ সময় ধরে সেবা দিতে চান।’ তিনি নিজে অনির্বাচিত সরকারপ্রধান না হয়ে ড. ফখরুদ্দীন আহমদকে এ দায়িত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন। ড. ইউনূসের দীর্ঘমেয়াদে দেশ সেবার মহাপরিকল্পনা এখনো বাতিল হয়নি। ক্লিনটন পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সূত্রে ড. ইউনূস মার্কিন নীতিনির্ধারকদেরও ঘনিষ্ঠ হয়েছেন। জাতিসংঘেও তার প্রভাব রয়েছে। এই ঘনিষ্ঠতা তিনি বাংলাদেশের বিরুদ্ধে একাধিকবার কাজেও লাগিয়েছেন। বিশেষ করে পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন বন্ধে ড. ইউনূসের ভূমিকার কথা আওয়ামী লীগ প্রকাশ্যেই অভিযোগ করে। যদিও ড. ইউনূস তা অস্বীকার করেন। কিন্তু বাংলাদেশের প্রতি তার একধরনের অবজ্ঞা, উপেক্ষা সবসময়ই দেখা যায়। শান্তিতে নোবেলজয়ী এই ব্যক্তি কখনো শহীদ মিনারে প্রভাতফেরিতে যান না। ৭১-এর বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করতে তাকে দেখিনি। এমনকি বন্যা, খরা দুর্বিপাকে তিনি নীরব। সামান্য সমবেদনা জানানোর সৌজন্যতাও দেখাননি। বাংলাদেশের প্রতি তার তাচ্ছিল্যের প্রকাশ পাওয়া যায় দেশের আইনকানুনকে তোয়াক্কা না করার মধ্য দিয়ে। ড. ইউনূস ছিলেন যুগ্ম সচিব পদমর্যাদায় গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। এ চাকরিতে যখন তিনি যোগ দেন, তখনই জানতেন অবসরের বয়স কত। কিন্তু বয়স অতিক্রান্ত হওয়ার পরও তিনি দায়িত্বে বহাল ছিলেন। গ্রামীণ ব্যাংককে তিনি ব্যবহার করেছেন পারিবারিক প্রতিষ্ঠানের মতো। গ্রামীণ ব্যাংকের মাধ্যমে এবং এই ব্যাংকের টাকাতেই গ্রামীণ কল্যাণ গঠন করা হয়। ১৯৯৬ সালের ২৫ এপ্রিল গ্রামীণ ব্যাংকের বোর্ড সভায় ‘গ্রামীণ কল্যাণ’ গঠনের প্রস্তাব আনা হয়। প্রস্তাবে বলা হয়, গ্রামীণ ব্যাংকের সদস্য ও কর্মীদের কল্যাণে ‘কোম্পানি আইন ১৯৯৪’-এর আওতায় গ্রামীণ কল্যাণ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গঠন করা। গ্রামীণ ব্যাংকের বোর্ড সভা এ প্রস্তাব অনুমোদন করে। এটি গ্রামীণ ব্যাংকেরই অঙ্গ প্রতিষ্ঠান। গ্রামীণ কল্যাণ যে গ্রামীণ ব্যাংকেরই শাখা প্রতিষ্ঠান, তা আরও স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় এর মূলধন গঠন প্রক্রিয়ায়। গ্রামীণ কল্যাণে গ্রামীণ ব্যাংকের সোশ্যাল অ্যাডভান্সমেন্ট ফান্ড (এসএএফ) থেকে ৬৯ কোটি টাকা প্রদান করা হয়। গ্রামীণ কল্যাণের মেমোরেন্ডাম অব আর্টিকেলেও গ্রামীণ ব্যাংকের সঙ্গে এর সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মেলে। মেমোরেন্ডাম অব আর্টিকেল অনুযায়ী গ্রামীণ কল্যাণের ৯ সদস্যের পরিচালনা পরিষদের ২ জন সদস্য গ্রামীণ ব্যাংকের মনোনীত প্রতিনিধি। এ ছাড়া গ্রামীণ কল্যাণের চেয়ারম্যান হবেন গ্রামীণ ব্যাংকের মনোনীত প্রতিনিধি। গ্রামীণ ব্যাংকের মনোনীত প্রতিনিধি হিসেবে ড. ইউনূস গ্রামীণ কল্যাণের চেয়ারম্যান হন। গ্রামীণ কল্যাণের মাধ্যমে তিনি গড়ে তোলেন একাধিক প্রতিষ্ঠান।

তাই ড. ইউনূস গ্রামীণ কল্যাণের মালিক হন কীভাবে? গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠানই তিনি এতদিন অবৈধভাবে দখল করেছিলেন। ড. ইউনূস মনে করেছিলেন, তিনি প্রচণ্ড ক্ষমতাবান, আইনের ঊর্ধ্বে। যুক্তরাষ্ট্র তার পক্ষে। বিশ্বে সব দেশেই তিনি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তাই অবলীলায় রাষ্ট্রীয় সম্পদ দখল করে নিজের পৈতৃক সম্পত্তির মতো ব্যবহার করেছেন। গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ হারিয়ে ড. ইউনূস সারা বিশ্বে তুলকালাম করেছিলেন। এখন শ্রম আদালতের দণ্ড, দুর্নীতির মামলা আর গ্রামীণ কল্যাণের ঘটনায় তিনি নিশ্চয়ই সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবেন। আওয়ামী লীগের আসল প্রতিপক্ষ এখন ড. ইউনূসই।

 

লেখক: নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত

ইমেইল: poriprekkhit@yahoo.com


কারাভোগ   বিএনপি   আন্তর্জাতিক  


মন্তব্য করুন


বিজ্ঞাপন