এডিটর’স মাইন্ড

নির্বাচন কমিশনের জন্য একটি মেরুদণ্ড প্রয়োজন

প্রকাশ: ১২:০০ এএম, ০৯ অক্টোবর, ২০২১


Thumbnail

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অবশেষে নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটালেন। দীর্ঘদিন পর প্রধানমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলন করলেন। স্বতঃস্ফূর্ত, খোলামেলা এবং অকপটে তিনি সব প্রশ্নের উত্তর দিলেন। গণমাধ্যমকর্মীদের সাফ জানিয়ে দিলেন ‘রাষ্ট্রপতি একটি সার্চ কমিটি গঠন করবেন। এ সার্চ কমিটির মাধ্যমেই নতুন নির্বাচন কমিশন গঠিত হবে।’ কিছুদিন ধরেই নির্বাচন নিয়ে রাজনীতির আড়মোড়া ভাঙছে। মাঠে রাজনীতি শুরু না হলেও কথার লড়াই ইতিমধ্যে জমে উঠেছে। সার্চ কমিটি-সংক্রান্ত প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পরপরই বিএনপির পক্ষ থেকে একে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। বিএনপি এখন পর্যন্ত সুস্পষ্টভাবে বলেনি নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন প্রক্রিয়ার ব্যাপারে তাদের ভূমিকা কী। কিন্তু সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এজন্য সংবিধানের আওতায় নতুন আইন প্রণয়নের কথা বলেছে। বিএনপি এখন নির্বাচন কমিশন নয় বরং নতুন করে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি তুলেছে। দলটির মহাসচিবসহ একাধিক নেতা বলেছেন, দলীয় সরকারের অধীনে আর কোনো নির্বাচন হতে দেওয়া হবে না। শেষ পর্যন্ত বিএনপি নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিকে আন্দোলনে রূপ দিতে পারবে কি না তা ভিন্ন প্রসঙ্গ। এ নিয়ে রাজনীতির জল কোথায় গড়ায় দেখার অপেক্ষায় থাকলাম। কিন্তু এ মুহুর্তে আমাদের সামনে প্রধান রাজনৈতিক দুটি প্রশ্ন হলো- নতুন নির্বাচন কমিশন কেমন হবে। দ্বিতীয় প্রশ্ন, কেবল নির্বাচন কমিশনই কি পারে একটি অবাধ সুষ্ঠু নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করতে?

আমরা বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর এ পর্যন্ত ১২ জন প্রধান নির্বাচন কমিশনারের অধীনে ১২টি নির্বাচন কমিশন পেয়েছি। সব নির্বাচন কমিশনই কম-বেশি বিতর্কিত। ‘নির্বাচন কমিশন’ নামের এই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি সবচেয়ে প্রশ্নবিদ্ধ একটি প্রতিষ্ঠান। এদের মধ্যে কেউ কেউ কম বিতর্কিত ছিলেন। কেউ ব্যক্তিত্বহীনের মতো আচরণ করে নির্বাচন কমিশনকেই তামাশার বস্তুতে পরিণত করেছেন। বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন এবং ১২ জন প্রধান নির্বাচন কমিশনের কার্যকলাপ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ‘মেরুদণ্ড’ সমস্যাই নির্বাচন কমিশন এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারের জন্য একটি বড় সমস্যা। মেরুদণ্ড ছাড়া একজন মানুষ যেমন শিরদাঁড়া সোজা করে হাঁটতে-চলতে পারে না, তেমনি আমাদের প্রায় সব নির্বাচন কমিশনই স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেনি বা চায়নি। এ কারণে নির্বাচন কমিশনই কেবল বিতর্কিত হয়নি, নির্বাচনও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের মেরুদণ্ডহীন আচরণই এ দেশে সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রধান বাধা। আমাদের দুর্ভাগ্য আমরা টি এন সেশানের মতো একজন মেরুদণ্ডসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব পাইনি প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে। সুজন নির্বাচন নিয়ে কাজ করে। এ সংগঠনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। তাঁর অধিকাংশ মতের সঙ্গে আমি একমত নই। বিশেষ করে তাঁর অনেক কথাবার্তাই বিরাজনীতিকরণ চিন্তাকে উসকে দেয়। কিন্তু নির্বাচন নিয়ে বিরামহীনভাবে কাজ করছে এ সংগঠনটি। নির্বাচনসংক্রান্ত যে কোনো বিষয়ে তাদের মতামত, গবেষণা এবং তথ্য-উপাত্ত আছে। কদিন আগে ড. বদিউল আলম মজুমদারের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম- আমাদের নির্বাচন কমিশন কতটা ক্ষমতাবান। উত্তরে তিনি যে কথা বললেন তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ড. মজুমদারের মতে ‘আমাদের নির্বাচন কমিশন ছেলেকে মেয়ে বানানো এবং মেয়েকে ছেলে বানানো ছাড়া সব পারে। নির্বাচন আইন তাকে পর্যাপ্ত ক্ষমতা দিয়েছে। এমনকি কমিশন যে কোনো নির্বাচন বাতিল করে দিতে পারে।’ তাহলে সমস্যা কোথায়? এত ক্ষমতা থাকার পরও আমাদের নির্বাচন কমিশনগুলো কেন অসহায় আত্মসমর্পণ করে? কেন সরকারের সন্তুষ্টির জন্য নিজেদের বিবেক বন্ধক দেয়? কেন তারা জনগণের ভোটের অধিকার রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়?

বাংলাদেশে প্রথম নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছিল ৭ জুলাই ১৯৭২। এম ইদ্রিস ছিলেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। জাতির পিতার জনপ্রিয়তা ছিল আকাশসম। নির্বাচন নিয়ে কোনো নয়ছয় দরকার ছিল না। তার পরও ১৯৭৩-এর নির্বাচনে কিছু কিছু আসনে অযাচিত ঘটনা ঘটেছিল। খুনি মোশতাক কুমিল্লার একটি আসনে হারতে বসেছিলেন। তাকে একরকম জোর করেই জয়ী করা হয়েছিল। লক্ষণীয় ব্যাপার হলো, ’৭৫-এর ১৫ আগস্টের নৃশংস নারকীয়তার পরও প্রধান নির্বাচন কমিশনার এম ইদ্রিস সপদে বহাল ছিলেন। খুনি মোশতাককে জয়ে সহযোগিতার পুরস্কার হিসেবেই তাকে দায়িত্বে রাখা হয়েছিল? দেশে দ্বিতীয় প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিযুক্ত হন এ কে এম নূরুল ইসলাম। তিনি বিচারপতি ছিলেন। বাংলাদেশের নির্বাচনব্যবস্থা সবচেয়ে কলঙ্কিত হয়েছিল এই সরীসৃপ সিইসির হাতে। নূরুল ইসলামই বাংলাদেশে ভোটবিহীন গণভোটের ভৌতিক ফল প্রকাশ করেন। একনায়ক জিয়া ছিলেন এ গণভোটের আয়োজক। জিয়ার জন্য এ গণভোটে প্রথমে ভোট দেখানো হয়েছিল ১০০ ভাগের ওপর। পরে নূরুল ইসলাম কমিশন হ্যাঁ ভোট কিছু কমিয়ে ৯৮ দশমিক ৬ শতাংশ দেখিয়েছিল। স্বৈরাচাররা সব সময় মেরুদণ্ডহীন মোসাহেবদের পছন্দ করে। জিয়ার হ্যাঁ-না ভোট, সাত্তারের প্রহসনের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে নূরুল ইসলামের আনুগত্যে মুগ্ধ হয়েছিলেন এরশাদ। এজন্য প্রধান নির্বাচন কমিশনার থেকে বিদায় নেওয়ার পর এরশাদ তাঁকে উপরাষ্ট্রপতি বানিয়েছিলেন। নূরুল ইসলামের পর এ সাংবিধানিক পদে আনা হয় আরেক মেরুদণ্ডহীন ব্যক্তিকে। তাঁর নাম চৌধুরী এ টি এম মাসুদ। ’৮৬-এর সংসদ নির্বাচনে মিডিয়া ক্যু করে মাসুদ চমক দেখান। এরশাদের প্রশংসায় ধন্য হন। বিচারপতি মাসুদের পর এরশাদ আরেকজন একান্ত অনুগত ব্যক্তিকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। তিনি বিচারপতি সুলতান হোসেন খান। কিন্তু তাঁর আয়ু ছিল এক বছরের কম। ১৯৯০-এর ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেন তিনি। কিন্তু ৬ ডিসেম্বর এরশাদের পতনের পর ২৪ ডিসেম্বর বিদায় নেন বিচারপতি সুলতান। তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান নতুন প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দেন বিচারপতি আবদুর রউফকে। বিচারপতি রউফ দায়িত্ব নিয়ে বেশ হুলুস্থূল করেন। ’৯১-এর নির্বাচনে ত্রুটি ছিল। তার পরও আগের তুলনায় মানুষের মতামত নির্বাচনে প্রতিফলিত হয়। বিএনপির নেতৃত্বে একটি সরকার গঠিত হয়, যারা ’৭৫-এর পর প্রথমে জনগণের ভোটে নির্বাচিত, কিন্তু ’৯১-এর নির্বাচনে যে বিচারপতি রউফের কোনো কৃতিত্ব নেই তা বোঝা গেল কদিন পরই। প্রথমে মাগুরা এবং তারপর মিরপুর নির্বাচনের তামাশা দেখল দেশের জনগণ। মাগুরা নির্বাচন দেখতে গিয়ে পালিয়ে এসে বললেন, ‘আমি অসহায়!’ বোঝা গেল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের লাঠিতে ভর করেই তিনি সব সাহস আর ক্ষমতা দেখাতেন। পরে অবশ্য বিচারপতি রউফের আসল পরিচয় জাতির কাছে উন্মোচিত হয়েছিল। ’৯১-এর বাহ্যিক সুষ্ঠু নির্বাচনে জামায়াত কীভাবে ১৮ আসনে জয়ী হয়েছিল তা-ও বুঝতে পেরেছিলেন দেশের ভোটাররা। নির্বাচন কমিশনে মেরুদণ্ডহীন ব্যক্তি বসানোর রেওয়াজ চালু করেছিল জিয়া এবং এরশাদ। তবে এ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে কৌতুকাভিনেতা বা জোকার বসানোর প্রথা চালু করেন বেগম জিয়া। ১৯৯৫ সালের ২৭ এপ্রিল বেগম জিয়া এ কে এম সাদেককে প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দেন। সঙ্গে একগুচ্ছ ক্লাউন। এদের তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশের ইতিহাসে নিকৃষ্টতম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬। ’৯৬-এর মার্চে বেগম জিয়ার পতন হলে সাদেক যুগের অবসান হয়। নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেন মোহাম্মদ আবু হেনাকে। আমার বিবেচনায় বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনের ইতিহাসে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন এবং মেরুদণ্ডসহ সিইসি ছিলেন আবু হেনা। এ নির্বাচন কমিশনের পর আওয়ামী লীগ আবার সিইসি হিসেবে সাবেক আমলাকে বেছে নেয়। এম এ সাঈদের অধীনে ২০০১-এর ১ অক্টোবরের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এম এ সাঈদও আবু হেনার পদাঙ্ক অনুসরণ করেন। তবে তাঁর মধ্যে একটি দলকে হারানোর আক্রোশ-উল্লাস চোখে পড়েছিল। নির্বাচন কমিশনে বেগম জিয়ার সব সময় পছন্দ কৌতুকাভিনেতা। পরপর দুটি অপেক্ষাকৃত কম বিতর্কিত নির্বাচন কমিশনের পর বেগম জিয়া আবার ভাঁড়ের সন্ধানে নামেন। এম এ আজিজকে করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে রসে টইটম্বুর সিইসি ছিলেন এম এ আজিজ। এজন্য হয়তো তিনি ইতিহাসে অমরত্ব পেতে পারেন। ওয়ান-ইলেভেনের মাধ্যমে এ টি এম শামসুল হুদা প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নেন। বাংলাদেশের নির্বাচনব্যবস্থায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ এবং যুগান্তকারী সংস্কার হয়েছে তাঁর নেতৃত্বে। ছবিসহ ভোটার তালিকা, স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স, নির্বাচন আচরণবিধি কঠোর করাসহ বেশ কিছু সিদ্ধান্ত সাহসের সঙ্গে নিয়েছিল শামসুল হুদা কমিশন। এরপর আরেক সিএসপি কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব নেন। তিনি অবশ্য পরীক্ষা দেওয়ারই সুযোগ পাননি। ২০১৪ সালের নির্বাচন বিএনপি-জামায়াত বর্জন করলে নির্বাচন কমিশনের কিছুই করার ছিল না। তবে সিটি নির্বাচনগুলো সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করে তিনি প্রমাণ করেছিলেন নির্বাচন কমিশন চাইলে দলীয় সরকারের অধীন ভালো নির্বাচন সম্ভব। এর মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল হয়েছে। অবাধ, সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনের দায়িত্ব বর্তায় রাজনৈতিক দল এবং নির্বাচন কমিশনের ওপর। নূরুল হুদার নেতৃত্বে নির্বাচন কমিশন সে দায়িত্ব পালনে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ২০১৮-তে সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন অনুষ্ঠানে যে যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ নূরুল হুদা কমিশন পেয়েছিল তা কাজে লাগাতে সীমাহীন ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। লাগামহীন খেলো কথাবার্তার জন্য এ কমিশনকে অনেকে আজিজ কমিশনের সঙ্গে তুলনা করেছেন। সবচেয়ে বড় কথা নির্বাচন কমিশনাররা দলীয় নেতাদের মতো আচরণ করে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটির মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করেছেন।

এ ১২ জনের নেতৃত্বে ১২টি নির্বাচন কমিশনের কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ক্ষমতাসীন সরকারের অভিপ্রায় নির্বাচনের ওপর বড় প্রভাব ফেলে। যেমন চারটি নির্বাচন হয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের যেহেতু কোনো প্রকাশ্য রাজনৈতিক আকাঙ্খা ছিল না, তাই নির্বাচন কমিশন মোটামুটি স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করেছে। আবার রাজনৈতিক সরকারের আওতায় যখন নির্বাচন হয়েছে তখন নির্বাচন কমিশনের মধ্যে রাজনৈতিক সরকারকে খুশি করার একটি সুস্পষ্ট প্রবণতা দেখা গেছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচনই হলো ক্ষমতায় যাওয়ার একমাত্র পথ। যে কোনো রাজনৈতিক দল নির্বাচনে জয়ী হওয়ার জন্য বৈধ সব কৌশল অবলম্বন করবেই। বৈধ কৌশলে যেন কোনো অবৈধ পন্থার অনুপ্রবেশ না ঘটে সেজন্যই নির্বাচন কমিশন গুরুত্বপূর্ণ। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচন কমিশন হলো রেফারির মতো। একটি খেলায় যেমন নির্মোহ এবং নিরপেক্ষ রেফারি দুই পক্ষকে ‘রুলস অব দ্য গেম’ মানতে বাধ্য করে নির্বাচন কমিশনের ঠিক সে কাজটিই করার কথা। প্রশ্ন উঠতেই পারে, খেলার মাঠে একজন রেফারি বা আম্পায়ারের যে ক্ষমতা থাকে নির্বাচন কমিশনের কি সে ক্ষমতা আছে? ২০০৮ নির্বাচনসংক্রান্ত আইন, আচরণবিধি এবং অন্যান্য বিধিবিধান কমিশনকে পর্যাপ্ত ক্ষমতা দিয়েছে। দলীয় সরকারের অধীনেই যে অবাধ সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব ২০১৩-এর সিটি নির্বাচনগুলো তার প্রমাণ। ওই নির্বাচন প্রমাণ করেছে নির্বাচন কমিশন চাইলেই পারে। তারপরও নির্বাচন কমিশন কেন সরকার বা ক্ষমতাসীন দলকে খুশি রাখার এক প্রাণান্ত চেষ্টা করে? এ প্রশ্নের উত্তরে এক কথায় বলা যায় নির্বাচন কমিশনের মেরুদণ্ডের অভাব। স্বাধীনতার ৫০ বছর পর অনির্বাচিত কিছু ব্যক্তি (প্রয়াত বিএনপি নেতা সাইফুর রহমানের ভাষায় ১০ জন ফেরেশতা) দেশের গণতন্ত্রের ভাগ্যবিধাতা হবেন তা মেনে নেওয়া যায় না। নির্বাচন কমিশন কেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের লাঠি দিয়ে চলবে? কেন নিজের পায়ে দাঁড়াবে না?

বাংলাদেশের সংবিধানে এবং নির্বাচন-সংক্রান্ত আইন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, নির্বাচনকালীন নির্বাচন কমিশনই হলো তত্ত্বাবধায়ক সরকার। সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালনে সহায়তা করা সব নির্বাহী কর্তৃপক্ষের কর্তব্য। নির্বাচনকালীন প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কমিশনের অধীনে থাকবে। তাহলে ১০ জন সফেদ ভদ্রলোক কী করবেন? রাজনীতিবিদদের ব্যর্থ প্রমাণ করবেন? রাজনীতিবিদরা একটি নির্বাচন করতে পারেন না, এটি বলে রাজনীতির দৈন্য নিয়ে উপহাস করবেন? নিরপেক্ষ, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, সৎ, শিক্ষিত মানুষই যদি নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব নেন তাহলে তাদের নেতৃত্বে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হতে পারে। তারা শুধু আইন অনুসরণ করবেন। কাউকে খুশি করার চেষ্টা করবেন না। বাংলাদেশে কি এ রকম মানুষ পাওয়া দুষ্কর? অবশ্যই না। খুব শিগগিরই হয়তো সার্চ কমিটি গঠিত হবে। সার্চ কমিটির প্রধান কাজ হবে মেরুদণ্ডসম্পন্ন কয়েকজন মানুষকে খুঁজে বের করা।

তার অতীতের পদপদবির চেয়ে তার ব্যক্তিত্ব এবং সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সাহসটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ রকম ব্যক্তিত্ববান মানুষ খুঁজে পাওয়া মোটেও কঠিন হবে না। বিএনপি এবং অন্য রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত নির্বাচন কমিশন গঠন প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখা। সবাই মিলে একটি ভালো নির্বাচন কমিশন গঠন গণতন্ত্রের জন্য জরুরি। কিন্তু সার্চ কমিটি যদি বাবুরাম সাপুড়ের মতো সাপ খোঁজে তাহলে নির্বাচন নিয়ে মানুষের হতাশা আরও বাড়বে। মানুষ আরও নির্বাচনবিমুখ হবে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে এমন একজন মানুষকে বেছে নেওয়া হোক যাকে দেখলেই মানুষ উৎসাহী হবে। ভোট খরা কাটাতে এটাই হতে পারে সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ। সার্চ কমিটির কাছে দেশের জনগণ নির্বাচন কমিশনের জন্য একটি মেরুদণ্ড চায়। আর কিছু না।

লেখক : নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত।



মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

ইরান-ইসরায়েল ইস্যু: শেখ হাসিনাই হতে পারেন শান্তির দূত

প্রকাশ: ০৯:০০ পিএম, ১৩ এপ্রিল, ২০২৪


Thumbnail

ইরান-ইসরায়েল ইস্যু ক্রমশ উত্তপ্ত হচ্ছে। তৈরি হয়েছে যুদ্ধ পরিস্থিতি। ইরান যে কোন সময় ইসরায়েল হামলা করতে পারে। এমন একটি পরিস্থিতিতে সারা বিশ্ব উৎকণ্ঠিত। এক অস্থির যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে। ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো জানিয়েছে, ইরানের আক্রমণের ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যের ভূখণ্ড তারা ব্যবহার করতে দেবে না। সব কিছু মিলিয়ে একটি বিভাজন এবং বৈরি পরিবেশ তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে অবাক করার ব্যাপার হলো এই বৈরি পরিবেশে সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য একজন উদার নৈতিক নেতা নেই যিনি এই পরিস্থিতিতে সকল পক্ষকে আস্থায় নিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। আর এরকম শূন্যতার মধ্যে শেখ হাসিনাই হতে পারেন আলোকবর্তিকা। 

উল্লেখ্য, ২০১২ সালে শেখ হাসিনার বিশ্বশান্তির দর্শন জাতিসংঘ অনুমোদিত হয়েছে। এই বিশ্বশান্তি দর্শনের আলোকেই ইসরায়েল ইস্যুতে একটি রাজনৈতিক সমাধান হতে পারে। 

বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে কঠোর এবং যৌক্তিক অবস্থান গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ গাজায় নিরীহ মানুষের ওপর অবিচার, হত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য সবসময় নিন্দা জানাচ্ছে। মহামান্য রাষ্ট্রপতি তার ঈদের শুভেচ্ছা ভাষণেও মধ্যপ্রাচ্যের মানবিক বিপর্যয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা 'মাদার অব হিউম্যানিটি' হিসেবে পরিচিত। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে তিনি বিশ্ব মানবতার কণ্ঠস্বর হয়েছেন। আর এ কারণেই বিশ্বে জ্যেষ্ঠ নেতাদের মধ্যে তিনি অন্যতম। উদার মুসলিম দেশের নারী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কারণে তিনি আলাদা একটি অবস্থানে রয়েছেন। বাংলাদেশ একদিকে যেমন ইসরায়েলের আগ্রাসনের নিন্দা করে, অন্যদিকে ধর্মান্ধ মৌলবাদ এবং ধর্মের নামে উগ্র সন্ত্রাসবাদকে প্রত্যাখ্যান করে। আর এটি বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ করেছে। শেখ হাসিনা এই মুহূর্তে বিশ্বের এমন একজন নেতা যিনি মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে সংকট সমাধানের আলোকবর্তিকা হয়ে সামনে দাঁড়াতে পারেন। তার শান্তির মডেলকে সামনে রেখে যদি বিবদমান পক্ষগুলো আলোচনার টেবিলে বসে তাহলে ইসরায়েল ইস্যুতে শান্তি অসম্ভব নয়।

বিশ্বে যারা নেতৃবৃন্দ আছেন তারা প্রায় অনেকেই বিতর্কিত এবং পক্ষপাতে দুষ্ট। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বিশ্ব নেতার অবস্থানে থাকতে পারছেন না। চীন এই বিষয়ে নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ ভাবে পক্ষ করতে চায় না। তাছাড়া বিভাজিত বিশ্বে চীনের নেতৃত্ব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপ মেনে নেবে না এটা বলাই বাহুল্য। পাশাপাশি রাশিয়া এখন নিজের ঘর সামলাতে ব্যস্ত। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বে সমঝোতায় নেতৃত্ব দেওয়া পুতিনের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। 

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান সমঝোতার উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু এরদোয়ান ব্যাপারে ইসরায়েল সহ অন্যান্য দেশগুলোর একটি অবস্থান রয়েছে। তাছাড়া তুরস্ক এই বিতর্কে কতটুকু সহনীয় অবস্থায় থাকতে পারবে তা নিয়ে ব্যস্ত।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী এখন নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত। এই অবস্থায় বিশ্বকে যুদ্ধাবস্থা থেকে সামাল দিতে পারেন একমাত্র শেখ হাসিনাই। তার শান্তির বার্তা যদি বিবাদমান পক্ষগুলো অনুধাবন করে তাহলে এই জটিল কঠিন পরিস্থিতিতে বিশ্ব শান্তি অসম্ভব নয়। আর এই শান্তির জন্য শেখ হাসিনাই হতে পারেন বিশ্ব নেতা। তার শান্তির দর্শন এবং তার শান্তির উদ্যোগের মাধ্যমে এই অসহনীয় পরিস্থিতি থেকে মুক্তি হতে পারে বিশ্ব।

ইরান-ইসরায়েল   শেখ হাসিনা   শান্তির দূত   জো বাইডেন   ইরান  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

আওয়ামী লীগে ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছেন যারা

প্রকাশ: ০৬:০০ পিএম, ১৩ এপ্রিল, ২০২৪


Thumbnail

আওয়ামী লীগে নীরবে নিভৃতে পালাবদল ঘটছে। এক সময় আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ নেতা মানে ছিলেন আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, মোহাম্মদ নাসিম, শেখ সেলিম, মতিয়া চৌধুরী। এখন তাদের অধ্যায় আস্তে আস্তে যবনিকা ঘটেছে। শারীরিক ভাবে তারা অনেকেই অসুস্থ। অনেকে এখন রাজনীতিতে অপাঙ্ক্তেয় হয়ে গেছেন। বরং একটি নতুন প্রজন্মকে আওয়ামী লীগ সভাপতি সামনে নিয়ে আসছেন। তাদেরকে নীতি নির্ধারক হিসেবে জায়গা করে দিচ্ছেন। আওয়ামী লীগের এই পালাবদলটি শেখ হাসিনার দূরদর্শী রাজনীতির একটি অংশ বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। 

পুরনোদেরকে অসম্মান না করে নতুনদের জন্য জায়গা করে দেওয়ার যে কৌশল সেটি রাজনীতিতে একটি শিক্ষণীয়। কিছু দিন আগেও যারা আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তাদের বদলে এখন আস্তে আস্তে আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছেন বেশ কিছু নেতা। যারা আওয়ামী লীগে ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছেন। বিশেষ করে ১১ জানুয়ারি টানা চতুর্থবারের মতো আওয়ামী লীগ সরকার গঠিত হওয়ার পর যাদেরকে বেশি পাদপ্রদীপে দেখা যাচ্ছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন;

১. ড. হাছান মাহমুদ: ড. হাছান মাহমুদের পদোন্নতি ঘটেছে। এর আগে তিনি ছিলেন তথ্যমন্ত্রী। এবার তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। স্পষ্টতই আওয়ামী লীগ সভাপতি তাকে পাদপ্রদীপে নিয়ে আসছেন। তিনি আওয়ামী লীগের এক নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকও বটে। কোন কারণে সাধারণ সম্পাদকের পদ খালি হলে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকই গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করে। আগামী দিনে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও ড. হাছান মাহমুদের সম্ভাবনা উজ্জ্বল বলেই অনেকে মনে করছেন। আর এই সমস্ত বিবেচনা থেকেই আওয়ামী লীগে এখন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে সামনে আসছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। 

২. জাহাঙ্গীর কবির নানক: জাহাঙ্গীর কবির নানক আওয়ামী লীগে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন নিজ যোগ্যতায়। মাঠের নেতা হিসেবে তার দীর্ঘদিনের সুনাম ছিল। ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক, যুবলীগের চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি তৃণমূলের রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। রাজনীতিতে চড়াই উতরাই এর মধ্য দিয়েই তিনি এগিয়ে গেছেন তার আদর্শের কারণে। বিশেষ করে ২০১৮ সালের নির্বাচনে মনোনয়ন না পাওয়ার পর তিনি ভেঙে পড়েননি। বরং সংগঠনকে শক্তিশালী করার জন্য কাজ করে গেছেন। তার পুরস্কার তিনি পেয়েছেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক থেকে তিনি আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য পদে উন্নীত হন। এবার নির্বাচনে মনোনয়ন পেয়ে মন্ত্রিত্ব পেয়েছেন। আওয়ামী লীগের এই নেতা এখন আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আস্থাভাজন এবং বিশ্বস্ত হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছেন। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তার সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তিনি এখন আওয়ামী লীগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নীতি নির্ধারক হয়ে উঠেছেন। 
৩. আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম: আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হলেও কর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক কর্মী বান্ধব হওয়ার কারণে তার অবস্থান আস্তে আস্তে দৃঢ় হচ্ছে। আওয়ামী লীগের তৃণমূলের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতাদের অন্যতম বাহাউদ্দিন নাছিম কর্মীদের কাছে আওয়ামী লীগ সংগঠনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আওয়ামী লীগ সভাপতির আস্থাভাজন, বিশ্বস্ত এবং সংগঠনের প্রশ্নে অকুতোভয় এবং একনিষ্ঠ এই নেতা মন্ত্রী না হয়েও আওয়ামী লীগের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন নীতি নির্ধারক হয়ে উঠছেন নিজ যোগ্যতায়। 

৪. আব্দুর রহমান: আব্দুর রহমান জাহাঙ্গীর কবির নানক এর মতোই তিনি ২০১৮ সালের নির্বাচনে মনোনয়ন পাননি। কিন্তু তারপরও তিনি ভেঙে পড়েননি। সংগঠনের জন্য কাজ করেছেন এবং আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য হিসেবে নিজের জায়গা করে নিয়েছেন। এবার নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর তিনি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করছেন এবং আওয়ামী লীগ সভাপতির আস্থার প্রতিদান তিনি ভালো ভাবেই দিচ্ছেন।

আওয়ামী লীগের একটি পালা বদল ঘটছে। তোফায়েল আহমেদ, আমির হোসেন আমু কিংবা শেখ ফজলুল করিমের জায়গা আস্তে আস্তে এই সমস্ত নেতারা জায়গা করে নিচ্ছেন। আওয়ামী লীগের একটা পাইপলাইন তৈরি করেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি। যেখানে পর্যায়ক্রমে নেতারা অপেক্ষমান অবস্থায় আছেন। নেতৃত্বের শূন্যতা আওয়ামী লীগে যেন না হয় সেজন্য একটি দূরদর্শী রাজনৈতিক কৌশল গ্রহণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

আব্দুর রহমান   জাহাঙ্গীর কবির নানক   ড. হাছান মাহমুদ   আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

অন্ধকার ছয়দিন

প্রকাশ: ১০:৩০ পিএম, ১২ এপ্রিল, ২০২৪


Thumbnail

বাংলাদেশে এখন সংবাদপত্রের লোডশেডিং চলছে। গত বুধবার থেকে সংবাদপত্র বের হচ্ছে না। টানা ৬ দিন সংবাদপত্র বন্ধের বিশ্ব রেকর্ড করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। না কোন প্রতিবাদে নয়, দাবী আদায়ের জন্য নয়। ছুটির ফাঁদে সংবাদপত্র বন্ধ আছে। সংবাদপত্রকে বলা হয় জরুরী সেবা। চিকিৎসক, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা যেমন জরুরী সেবা দেন, তেমনি সংবাদকর্মীদের কাজও হলো দেশের মানুষকে সার্বক্ষণিকভাবে সঠিক, বস্তুনিষ্ঠ তথ্য দেয়া। বিশেষ করে ছুটির সময় এটার প্রয়োজন আরো বেশী। এবার দেশে একটা দীর্ঘ ছুটি। এসময় সংবাদপত্র অনেক জরুরী। আচ্ছা ভাবুন তো, ছয়দিন যদি হাসপাতালে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হতো, কিংবা আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যদি বলতো ছয়দিন তারা দায়িত্ব পালন করবে না। তাহলে কি হতো? আমিতো মনে করি, সংবাদপত্র বন্ধ রাখার বিষয়টিও তেমনি আঁতকে ওঠার মতো। কিন্তু সংবাদপত্রের মালিকদের এনিয়ে বিকার নেই।  

এবার বাংলাদেশ দু’টি বড় উৎসব কাছাকাছি সময় উদ্যাপন করছে। ঈদ-উল-ফিতর উদযাপন করতে না করতেই, আগামীকাল (রোববার) ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ। বাঙালীর সবচেয়ে বড় উৎসব। এদেশের প্রায় ৯০ ভাগ মানুষ মুসলমান। আর ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদ-উল-ফিতর। তবে বাংলাদেশে ঈদ-উল-ফিতর কেবল মুসলমানদের জন্য সবচেয়ে বড় উৎসব নয়। এ অঞ্চলে বসবাসরত অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরাও এই উৎসবে আনন্দ করে। সম্প্রীতির বাংলাদেশে ‘ধর্ম যার যার উৎসব সবার’-এই রীতি চলে এসেছে দীর্ঘদিন। ইদানিংকার মতো সাম্প্রদায়িক দৃষ্টি ভঙ্গিতে কোন ধর্মীয় উৎসবকেই দেখা হতো না। ঈদের দিন অন্য ধর্মের বন্ধুরাও বাসায় আসতো সেমাই মিষ্টি এক সাথে খাওয়া হতো। আবার হিন্দুদের পূজাতেও আমরা যেতাম। অনেক মজা হতো। যতো দিন যাচ্ছে আমাদের ধর্মীয় উদার নৈতিক চেতনাকে গ্রাস করে ফেলছে ধর্মান্ধ সংকীর্ণতা। এখন ঈদ উৎসব যেন অনেকটাই ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে শৃঙ্খলিত। রমজান মাস জুড়ে এক ধরনের কঠোর বিধি নিষেধ থাকে যা স্বতঃস্ফূর্ত না। আরোপিত এবং লোক দেখানো। এই আরোপিত বিধি নিষেধ নিয়ে বাড়াবাড়ি করেন কিছু ‘বক ধার্মিক’। এদের কারণে গত তিন ঈদে পহেলা বৈশাখ নির্বাসিত ছিলো। পবিত্র রমজানের সাথে পহেলা বৈশাখের কোন বিরোধ নেই। কিন্তু তারপরও অতি উৎসাহী কট্টরবাদীদের দাপটে শৃঙ্খলিত হয় পহেলা বৈশাখ। অথচ বাঙালী হিসেবে পহেলা বৈশাখীই আমাদের প্রথম এবং প্রধান সর্বজনীন উৎসব। বাংলা বর্ষ বরণ বাঙালীর প্রাণের উৎসব। এই উৎসব অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি। বেশ কয়েক বছর পর এবার পহেলা বৈশাখ উদ্যাপিত হবে বাঁধাহীন ভাবে। বাঙালী জাতি বর্ষবরণ করবে মুক্ত ভাবে। এটা আমাদের জন্য বড় আনন্দের উপলক্ষ্য তো বটেই। কিন্তু এত বড় উৎসব হবে সংবাদপত্রহীন! কি অদ্ভুত! সংবাদপত্র কি দায়িত্বহীন মালিকানার শিকার?

ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের মানুষ অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে লালন করে। সম্প্রীতির বন্ধনে অটুট। কিছু মানুষ যতোই কট্টর মৌলবাদী হোক না কেন, সাধারণ মানুষ এখনও উগ্র পন্থাকে সমর্থন করে না। এজন্য একই সময়ে একাধিক ধর্মাবলম্বীদের উৎসব এদেশে নির্বিঘ্নে অনুষ্ঠিত হয়। এবার রমজানের কথায় ধরা যাক না কেন। এবার রমজানের মধ্যেই খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের ‘ইস্টার সানডে’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। রোজার মধ্যেই দোল উৎসবে হিন্দু সম্প্রদায় রং উৎসবে মেতেছে। কোথাও কোন অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। কোথাও সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানরা বলেননি যে, রোজার জন্য ইস্টার সানডে করা যাবে না কিংবা দোল উৎসব বন্ধ রাখতে হবে। ধর্মকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চায় কিছু উপরের তলার মানুষ। যারা ধর্ম প্রতিপালনের চেয়ে লোক দেখানোতে বেশী আগ্রহী। এদের হাতে ধর্ম এবং সংস্কৃতি কোনটাই নয়। এবার ঈদের পরপরই পহেলা বৈশাখ অনুষ্ঠিত হচ্ছে-এজন্য আমি আনন্দিত। বাংলাদেশের মানুষের সামনে এটি এক অনন্য সুযোগ। এর মাধ্যমে প্রমাণ হতে পারে আমরা বাঙালী, আমরা অসাম্প্রদায়িক, আমরা উদার। এদেশের মানুষ যেমন ঈদ উৎসব করলো তেমনি বাংলা নববর্ষকেও বরণ করবে। এই বর্ষ বরণের উৎসব যেন ঢেকে দিচ্ছে সংবাদপত্রে ছুটি। এবার ঈদের ছুটিতে সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনা ঘটিয়েছে বাংলাদেশ সংবাদপত্র মালিকরা। ঈদ এবং পহেলা বৈশাখ মিলিয়ে মোট ৬ দিন সংবাদপত্র বন্ধ রাখার এক অগ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সংবাদপত্র মালিকরা। পহেলা বৈশাখে কেন সংবাদপত্র বন্ধ থাকবে? কর্পোরেট নিয়ন্ত্রিত বাংলাদেশের সংবাদপত্রগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটি ‘ঈদ সংখ্যা’ সাময়িকী প্রকাশ করেছে। এটা ভালো উদ্যোগ। সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে এই সব সাময়িকী গুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আমি আশা করেছিলাম এবার যেহেতু কাছাকাছি সময়ে ঈদ এবং বর্ষবরণ তাই সংবাদপত্রগুলো পহেলা বৈশাখে একটা ছোট সাময়িকী করবে। আলাদা আলাদা সাময়িকী না করুক ঈদ সংখ্যা এবং নববর্ষ সংখ্যা মিলিতভাবে করবে। কিন্তু কোথায় কি, এবার পহেলা বৈশাখে কোন সংবাদপত্রই বেরুচ্ছে না। শুধু পহেলা বৈশাখ কেন? বাংলাদেশে এখন চলছে অন্ধকার সময়। ১০ এপ্রিল থেকে ১৫ এপ্রিল দেশে কোন সংবাদপত্র প্রকাশিত হবে না। এটি নজীর বিহীন। 

অবশ্য কেউ বলতে পারেন, এ যুগে সংবাদপত্র ৬ দিন না ৬ মাস বন্ধ থাকলো কার কি? এখন সংবাদের জন্য কে আর দৈনিক পত্রিকার অপেক্ষা করে? অনলাইন, টেলিভিশন, সোশাল মিডিয়ার এই যুগে কেউ আর খবরের জন্য সকালের সংবাদপত্রের অপেক্ষা করে না। সকাল বেলা এক কাপ চায়ের সাথে একটি সংবাদপত্র এখন উত্তেজনাপূর্ণ রোমাঞ্চ নয়। এসব ঘটনা প্রিন্ট মিডিয়ার অপ্রয়োজনীয় হয়ে ওঠারই ইঙ্গিত। কিন্তু তারপরও প্রিন্ট মিডিয়া এখনও বিশ্বস্ততা এবং আস্থার প্রতীক। একজন পাঠক টেলিভিশনে বা অনলাইনে যতো সংবাদই দেখুক বা পড়ুক না কেন, দিনের শেষে তার নির্ভরতা ছাপা কাগজ। অনলাইনে কোন সংবাদ পাঠ করার পর তার সত্যতা যাচাই করে ছাপা কাগজে। তাই এখনও সংবাদ, সঠিক তথ্যের জন্য প্রধান নির্ভরতার জায়গা হলো সংবাদপত্র। তথ্যের এই বিশ্বস্ত উৎস বন্ধ আছে। টানা ছয়দিনের জন্য দেশের মানুষ সংবাদপত্র পাবে না। এই ছয়দিনকে বলা যায় অন্ধকার সময়। সংবাদপত্র বিহীন একটা দিন মানে অন্ধকার দিন-রাত্রি। গত ১০ এপ্রিল থেকে অন্ধকার ছয়দিন শুরু হয়েছে। আমরা যারা সেকেলে মানুষ। ঘুম থেকে উঠেই পত্রিকা খুঁজি তাদের জন্য এই ছয়দিন দূর্বিসহ, অবর্ননীয়। 

প্রশ্ন হলো সংবাদপত্রের মালিকরা কেন এরকম সিদ্ধান্ত নিলো? এই সিদ্ধান্ত দেশের সংবাদপত্র শিল্পকে আরো সংকটে ফেলবে। বাংলাদেশে এখন সংবাদপত্রের মালিকানা শিল্পপতি এবং ব্যবসায়ীদের দখলে। প্রধান সব সংবাদপত্রই কোন না কোন শিল্প গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে। বড় শিল্পপতিদের কাছে সংবাদপত্র হলো মর্যাদার প্রতীক। মুক্ত সাংবাদিকতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, পাঠকের কাছে দায় বদ্ধতা ইত্যাদি ব্যবসায়ীদের কাছে মূখ্য বিষয় নয়। সংবাদপত্র এখনকার মালিকদের কাছে ‘ক্ষমতা’ এবং ‘অস্ত্র’। এই ক্ষমতা দেখিয়ে তারা তাদের ব্যবসাকে সম্প্রসারিত করে। সুদৃঢ় করে। সরকার সংবাদপত্র মালিকদের ভয় পায়। ব্যাংক তো তটস্থ থাকে। তাই পত্রিকা থাকা মানে ব্যবসায়ীদের সব মুশকিল আসান। কর্পোরেট হাউসে এখন সাংবাদিকতা নেই, এক ঝাঁক ক্রীতদাস আছে। যাদের একমাত্র কাজ মালিকদের মনোরঞ্জন করা। এদের মধ্যে যিনি সম্পাদক তিনি হলেন সবচেয়ে বড় ক্লাউন। মালিকদের খুশী করাই তার একমাত্র কাজ। পেশাগত উৎকর্ষতা চুলোয় যাক। যিনি মালিকের স্বার্থ যতো নিবিড়ভাবে সুরক্ষিত করেন তিনি ততো বড় সম্পাদক। এই অস্ত্র প্রয়োগ করে মালিকরা প্রতিপক্ষকে ভয় দেখায়। যারা তাদের কথা শোনে না তাদের এই অস্ত্র দিয়ে ঘায়েল করে। সংবাদপত্রের মালিকানা ব্যবসায়ীদের কাছে একধরনের বর্মের মতো। নিজেদের অপকর্ম, স্বেচ্ছাচারিতা জায়েজ করার জন্য সংবাদপত্রকে তারা ব্যবহার করে। সংবাদপত্রের মালিক হবার কারণে কেউ তাদের অপকর্মের বিরুদ্ধে টু শব্দটি করেনি। এভাবেই চলছে সংবাদপত্র শিল্প। সংবাদপত্র এখন কর্পোরেট ক্রীতদাস। তাই মালিকরা সংবাদপত্র দুই দিন বন্ধ থাকলো না ছয়দিন বন্ধ থাকলো তা নিয়ে ভাবেন না। তারা তাদের ব্যবসা সুরক্ষা পত্রিকা দিয়ে কতটা হলো তা নিয়েই ব্যস্ত। সংবাদপত্র মালিকরা পাঠকের কাছে জবাবদিহিতার বিশ্বাসী নন। তারা দেখেন এই সংবাদপত্র তাদের স্বার্থ কতটা রক্ষা করতে পারছে। ছাপা কাগজ একদিন বের না হলে অনেক সংবাদপত্রের অনেক টাকা সাশ্রয়। এসব বিবেচনা করেই মালিকরা মনে করেছেন পত্রিকা যদি কয়েকটা দিন বন্ধই থাকে, কি এমন ক্ষতি। কিন্তু এই ছয়দিন সংবাদপত্র বন্ধ যে এক ভয়ংকর বার্তা দিলো তাকি মালিকরা অনুধাবন করেন? সংবাদপত্র ছাড়াও যে দেশ চলে, এমন এক ঘোষণাই কি দিলেন না মালিকরা। ভবিষ্যতে এর মূল্য দিতে হবে সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকেই। 

সৈয়দ বোরহান কবীর, নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত
ই-মেইল: poriprekkhit@yahoo.com


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

সরকারের তিন মাস: সেরা অর্জন

প্রকাশ: ০৮:০০ পিএম, ১০ এপ্রিল, ২০২৪


Thumbnail

প্রথম তিন মাস বর্তমান সরকারের জন্য ছিল অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। বিশেষ করে ৭ জানুয়ারি নির্বাচনে বিরোধী দল অংশগ্রহণ না করার ফলে এই নির্বাচন জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে কতটুকু গ্রহণযোগ্য হয়, নির্বাচনের পর কী ধরনের প্রভাব এবং প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় সেটি ছিল সকলের কাছে একটি দেখার বিষয়। তবে সরকার প্রথম তিন মাসে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সংকট গুলোকে ভালোভাবেই মোকাবেলা করতে পেরেছি। এখন পর্যন্ত সরকারের চেষ্টা নিয়ে সাধারণ মানুষের কোন রকম অভিযোগ নেই। 

সরকার এই প্রথম তিন মাসে বেশ কিছু ক্ষেত্রে সফলতা অর্জন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে;

১. নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা আদায়: ৭ জানুয়ারি নির্বাচন জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। এটি সরকারের একটি প্রধান অর্জন। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো এই নির্বাচনকে কীভাবে দেখবেন? নির্বাচনের পরে কী ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে তা নিয়ে বিভিন্ন মহলের নানা রকম আগাম পূর্বাভাস ছিল, সংশয় ছিল। কিন্তু এই সংশয় উড়িয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সফলতা অর্জন করেছে। নির্বাচনের পর প্রায় সব দেশই নতুন সরকারের সঙ্গে অংশীদারিত্বের সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বার্তা দিয়েছে। এটি সরকারের জন্য একটি বিরাট অর্জন। এই সরকার যে এত তাড়াতাড়ি জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করবে এটা অনেকেই ভাবতে পারেননি। 

২ স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে অনিয়ম দূর করার জন্যই সাঁড়াশি উদ্যোগ: নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে কিছু বেদনাদায়ক ঘটনা ঘটেছে। সুন্নতে খতনা করতে গিয়ে একাধিক শিশুর মৃত্যু, অবৈধ হাসপাতালে রোগীদের ভুল চিকিৎসার মৃত্যুর পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যেভাবে প্রতিক্রিয়া দিয়েছে তার সকল মহলে প্রশংসিত হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে হাসপাতালগুলোতে সাঁড়াশি অভিযান শুরু হয়েছে। অবৈধ বেশ কিছু ক্লিনিক হাসপাতাল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যে দুর্নীতির মধ্যে ডুবে ছিল তা এখন হারে হারে টের পাচ্ছে সাধারণ মানুষ। মানুষ সরকারের এই অবস্থানকে সাধুবাদ জানিয়েছে এবং আশা করছে যে, এই ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। নতুন স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে অনিয়ম, দুর্নীতি বন্ধের ক্ষেত্রে তার অবস্থান অটুট রাখবেন এটাই সাধারণ মানুষ প্রত্যাশা করে।

৩. সুলভ মূল্যে পণ্য বিক্রি: এবার দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সরকার এখন পর্যন্ত সফল হতে পারেনি বটে, তবে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে সরকার সুলভ মূল্যে পণ্য বিক্রির যে বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে তা বিভিন্ন মহলে প্রশংসিত হয়েছে। বিশেষ করে ভ্যান রমজান মাসে সুলভ মূল্যে দুধ, ডিম, মাংস বিতরণ ব্যাপকভাবে ঢাকা এবং আশেপাশের এলাকাগুলোর মানুষকে সুবিধা দিয়েছে। এই উদ্যোগের সঙ্গে মিলে দেশের ৩৫ টি জেলায় রাজনীতিবিদ, প্রশাসন নিজস্ব উদ্যোগে সুলভ মূল্যে রমজানের পণ্য বিতরণ করার মাধ্যমে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তরমুজ নিয়ে যখন কিছু মধ্যসত্ত্বভোগী লাগামহীন স্বেচ্ছাচারিতা শুরু করেছে তখন কৃষি মন্ত্রণালয় কৃষকের বাজারের মাধ্যমে সুলভ মূল্যে তরমুজ বিক্রি করে একটি নজির স্থাপন করেছে। এটি সরকারের জন্য একটি বড় শিক্ষা যে, বিকল্প চ্যানেলের মাধ্যমে সুলভ মূল্যে পণ্য দিলে বাজার নিয়ন্ত্রণ করার জন্য তা খুব উপকার দেয়।

৪. ব্যাংক একীভূত করা: ব্যাংক একীভূতকরণ উদ্যোগটি নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরেই করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বলা হয়েছে, যে সমস্ত দুর্বল ব্যাংক আছে, সেই দুর্বল ব্যাংকগুলোকে সকল ব্যাংক একীভূত করবে এবং ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় সীমা বেঁধে দিয়েছে। এই নির্দেশনার আলোকে ইতোমধ্যে পদ্মা ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, রাজশাহী, কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক সহ একাধিক ব্যাংক একীভূত হচ্ছে। এর ফলে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে। তবে সকলে প্রত্যাশা করেন এ সমস্ত ব্যাংকগুলোকে দেউলিয়া বানানোর ক্ষেত্রে যারা দায়ী তাদেরকেও শাস্তির আওতায় আনতে হবে। তাদেরকে ছাড় দেওয়ার জন্য যেন ব্যাংক একীভূত না হয় সে ব্যাপারে সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে।

৫. অবৈধ দালান-কোঠার বিরুদ্ধে অভিযান: বিশেষ করে বেইলি রোডের অগ্নিকাণ্ডের পর গৃহায়ন পূর্ত মন্ত্রণালয় অবৈধ দালান এবং অনুমোদিত ভবনের বিরুদ্ধে যে অভিযান শুরু করেছে তা বিভিন্ন মহলে প্রশংসিত হয়েছে। এই উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে হবে। সরকারের নতুন গৃহায়ন পূর্ত মন্ত্রী দায়িত্ব নিয়েছেন। তার কাছে মানুষের প্রত্যাশা অনেক। বিশেষ করে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ একটি দুর্নীতিমুক্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড়াবে এই প্রত্যাশা। এখন পর্যন্ত যে অভিযান চলছে সেই অভিযান সরকারের সফল উদ্যোগের একটি বলেই অনেকে মনে করছেন। এছাড়াও সরকার সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু ভালো কাজ করছে, যে কাজগুলো ফলাফল পেতে সাধারণ মানুষকে অপেক্ষা করতে হবে। 


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

তোফায়েল আহমেদ: রাজনীতিতে অস্তমিত সূর্য

প্রকাশ: ১১:০০ পিএম, ০৯ এপ্রিল, ২০২৪


Thumbnail

তোফায়েল আহমেদ কি রাজনীতিতে এক অস্তমিত সূর্য? তিনি কি নিভে যাচ্ছেন? বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে তিনি কি নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে অবসরে চলে যাচ্ছেন—এমন প্রশ্নগুলো এখন খুব বড় করে সামনে এসেছে। কারণ সাম্প্রতিক সময়ে যারা তোফায়েল আহমেদকে দেখেছেন তারা আগের তোফায়েল আহমেদের ছায়াকেও দেখতে পারেননি। যে তোফায়েল আহমেদ ছিল সরব, যার ভরাট কণ্ঠস্বরে জাতীয় সংসদ প্রকম্পিত হত, যিনি সবসময় সবাইকে চমকে দিতেন বিভিন্ন দিন তারিখের হিসেব মুখস্থ বলে দিয়ে, যার সবসময় শত শত টেলিফোন নম্বর, বাড়ির ঠিকানা মুখস্থ থাকত, যা স্মৃতিশক্তি নিয়ে সকলে প্রশংসা করত, রাজনীতিতে যিনি একজন যুবরাজের মত পদচারণা করতেন, নানা রকম বিতর্কের পরও তিনি স্বমহিমায় উজ্জ্বল ছিলেন সেই তোফায়েল আহমেদ এখন কোথায়? 

এবার দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তোফায়েল আহমেদ জয়ী হয়েছেন। সংসদে তাকে দেখা যায় কদাচিৎ। তবে তিনি এখন শারীরিক অসুস্থতার কারণে অনেকটাই বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছেন। বিশেষ করে একাধিক অসুস্থতা তাকে এখন স্বাভাবিকভাবে হাঁটা চলা করতে দেয় না। তার কণ্ঠস্বরের তেজও কেড়ে নিয়েছে তার একের পর এক অসুখ। 

তোফায়েল আহমেদের এক পাশ অনেকটাই অবশ হয়ে গেছে। আর এ কারণেই তিনি স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারেন না। তবে এখনও তিনি লেখালেখি করেন এবং নানারকম রাজনৈতিক আলোচনায় তাকে আগ্রহীও দেখা যায়। তবে আগের যে তোফায়েল আহমেদ, যিনি যে কোন রাজনৈতিক আড্ডা এবং রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে মধ্যমণি হিসেবে সবাইকে মাতিয়ে রাখতেন, যার দিকে তাকিয়ে থাকত লক্ষ লক্ষ জনতা সেই তোফায়েল আহমেদ এখন নেই। 

অনেকেই মনে করেন যে, রাজনৈতিক অসুস্থতার চেয়ে মানসিক ভাবেই তোফায়েল আহমেদ বেশি বিপর্যস্ত। বিশেষ করে পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের পর তার ভূমিকা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরুর প্রেক্ষাপটেই রাজনীতিতে তিনি নিজেকে আস্তে আস্তে গুটিয়ে ফেলতে শুরু করেছেন। 

গত বছর আগস্টে আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় শোক দিবসের স্মরণে এক লেখায় কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য উপস্থাপন করেছিলেন। সেখানে আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লিখেছিলেন যে, বঙ্গবন্ধু যখন আক্রান্ত হন, ৩২ নম্বর যখন খুনিরা ঘিরে ফেলে তখন তিনি বেশ কয়েক জনকে ফোন করেছিলেন। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন তোফায়েল আহমেদে। হতাশাজনক হলেও তোফায়েল আহমেদ সেই টেলিফোনের পর যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেননি। এই লেখাটির পর আওয়ামী লীগের মধ্যে তা নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছিল। অনেকে এটা নিয়ে হৈ চৈ করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কাজের কাজ কিছুই হয়নি। তোফায়েল আহমেদ এর প্রতিবাদও করতে পারেনি। কারণ আওয়ামী লীগ সভাপতিকে যারা চেনেন তারা সকলেই জানেন যে, বঙ্গবন্ধুর প্রশ্নে তিনি তথ্য প্রমাণ ছাড়া কোন বক্তব্য দেন না। এই ঘটনার পর আকস্মিকভাবে তোফায়েল আহমেদ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তাকে চিকিৎসার জন্য বাইরেও নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। অনেকে মনে করেছিলেন তিনি হয়ত নির্বাচন করবেন না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছেন এবং বিজয়ী হয়েছেন অসুস্থ শরীর নিয়ে। 

এখন তিনি জাতীয় সংসদে আসেন বটে তবে আগের মত সরব উপস্থিতি তার নেই। হয়ত রাজনীতির জীবনে তিনি শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছেন। তবে রাজনীতির ইতিহাসে তোফায়েল আহমেদ চিরকাল বেঁচে থাকবেন। তার রাজনৈতিক জীবনের দুটি ভাগ সবসময় আলোচিত থাকবে। একটি হল স্বাধীনতা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর একান্ত বিশ্বস্ত সহচর হিসেবে তরুণ তুখোড় ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদ। আরেকটি হল পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টে তার বিতর্কিত এবং রহস্যময় ভূমিকা। কোন তোফায়েল আহমেদ ইতিহাসে বেশি আলোচিত থাকবেন তা সময়ই বলে দেবে।



তোফায়েল আহমেদ  


মন্তব্য করুন


বিজ্ঞাপন