এডিটর’স মাইন্ড

নির্বাচন কমিশনের জন্য একটি মেরুদণ্ড প্রয়োজন

প্রকাশ: ১২:০০ এএম, ০৯ অক্টোবর, ২০২১


Thumbnail

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অবশেষে নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটালেন। দীর্ঘদিন পর প্রধানমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলন করলেন। স্বতঃস্ফূর্ত, খোলামেলা এবং অকপটে তিনি সব প্রশ্নের উত্তর দিলেন। গণমাধ্যমকর্মীদের সাফ জানিয়ে দিলেন ‘রাষ্ট্রপতি একটি সার্চ কমিটি গঠন করবেন। এ সার্চ কমিটির মাধ্যমেই নতুন নির্বাচন কমিশন গঠিত হবে।’ কিছুদিন ধরেই নির্বাচন নিয়ে রাজনীতির আড়মোড়া ভাঙছে। মাঠে রাজনীতি শুরু না হলেও কথার লড়াই ইতিমধ্যে জমে উঠেছে। সার্চ কমিটি-সংক্রান্ত প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পরপরই বিএনপির পক্ষ থেকে একে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। বিএনপি এখন পর্যন্ত সুস্পষ্টভাবে বলেনি নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন প্রক্রিয়ার ব্যাপারে তাদের ভূমিকা কী। কিন্তু সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এজন্য সংবিধানের আওতায় নতুন আইন প্রণয়নের কথা বলেছে। বিএনপি এখন নির্বাচন কমিশন নয় বরং নতুন করে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি তুলেছে। দলটির মহাসচিবসহ একাধিক নেতা বলেছেন, দলীয় সরকারের অধীনে আর কোনো নির্বাচন হতে দেওয়া হবে না। শেষ পর্যন্ত বিএনপি নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিকে আন্দোলনে রূপ দিতে পারবে কি না তা ভিন্ন প্রসঙ্গ। এ নিয়ে রাজনীতির জল কোথায় গড়ায় দেখার অপেক্ষায় থাকলাম। কিন্তু এ মুহুর্তে আমাদের সামনে প্রধান রাজনৈতিক দুটি প্রশ্ন হলো- নতুন নির্বাচন কমিশন কেমন হবে। দ্বিতীয় প্রশ্ন, কেবল নির্বাচন কমিশনই কি পারে একটি অবাধ সুষ্ঠু নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করতে?

আমরা বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর এ পর্যন্ত ১২ জন প্রধান নির্বাচন কমিশনারের অধীনে ১২টি নির্বাচন কমিশন পেয়েছি। সব নির্বাচন কমিশনই কম-বেশি বিতর্কিত। ‘নির্বাচন কমিশন’ নামের এই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি সবচেয়ে প্রশ্নবিদ্ধ একটি প্রতিষ্ঠান। এদের মধ্যে কেউ কেউ কম বিতর্কিত ছিলেন। কেউ ব্যক্তিত্বহীনের মতো আচরণ করে নির্বাচন কমিশনকেই তামাশার বস্তুতে পরিণত করেছেন। বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন এবং ১২ জন প্রধান নির্বাচন কমিশনের কার্যকলাপ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ‘মেরুদণ্ড’ সমস্যাই নির্বাচন কমিশন এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারের জন্য একটি বড় সমস্যা। মেরুদণ্ড ছাড়া একজন মানুষ যেমন শিরদাঁড়া সোজা করে হাঁটতে-চলতে পারে না, তেমনি আমাদের প্রায় সব নির্বাচন কমিশনই স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেনি বা চায়নি। এ কারণে নির্বাচন কমিশনই কেবল বিতর্কিত হয়নি, নির্বাচনও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের মেরুদণ্ডহীন আচরণই এ দেশে সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রধান বাধা। আমাদের দুর্ভাগ্য আমরা টি এন সেশানের মতো একজন মেরুদণ্ডসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব পাইনি প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে। সুজন নির্বাচন নিয়ে কাজ করে। এ সংগঠনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। তাঁর অধিকাংশ মতের সঙ্গে আমি একমত নই। বিশেষ করে তাঁর অনেক কথাবার্তাই বিরাজনীতিকরণ চিন্তাকে উসকে দেয়। কিন্তু নির্বাচন নিয়ে বিরামহীনভাবে কাজ করছে এ সংগঠনটি। নির্বাচনসংক্রান্ত যে কোনো বিষয়ে তাদের মতামত, গবেষণা এবং তথ্য-উপাত্ত আছে। কদিন আগে ড. বদিউল আলম মজুমদারের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম- আমাদের নির্বাচন কমিশন কতটা ক্ষমতাবান। উত্তরে তিনি যে কথা বললেন তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ড. মজুমদারের মতে ‘আমাদের নির্বাচন কমিশন ছেলেকে মেয়ে বানানো এবং মেয়েকে ছেলে বানানো ছাড়া সব পারে। নির্বাচন আইন তাকে পর্যাপ্ত ক্ষমতা দিয়েছে। এমনকি কমিশন যে কোনো নির্বাচন বাতিল করে দিতে পারে।’ তাহলে সমস্যা কোথায়? এত ক্ষমতা থাকার পরও আমাদের নির্বাচন কমিশনগুলো কেন অসহায় আত্মসমর্পণ করে? কেন সরকারের সন্তুষ্টির জন্য নিজেদের বিবেক বন্ধক দেয়? কেন তারা জনগণের ভোটের অধিকার রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়?

বাংলাদেশে প্রথম নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছিল ৭ জুলাই ১৯৭২। এম ইদ্রিস ছিলেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। জাতির পিতার জনপ্রিয়তা ছিল আকাশসম। নির্বাচন নিয়ে কোনো নয়ছয় দরকার ছিল না। তার পরও ১৯৭৩-এর নির্বাচনে কিছু কিছু আসনে অযাচিত ঘটনা ঘটেছিল। খুনি মোশতাক কুমিল্লার একটি আসনে হারতে বসেছিলেন। তাকে একরকম জোর করেই জয়ী করা হয়েছিল। লক্ষণীয় ব্যাপার হলো, ’৭৫-এর ১৫ আগস্টের নৃশংস নারকীয়তার পরও প্রধান নির্বাচন কমিশনার এম ইদ্রিস সপদে বহাল ছিলেন। খুনি মোশতাককে জয়ে সহযোগিতার পুরস্কার হিসেবেই তাকে দায়িত্বে রাখা হয়েছিল? দেশে দ্বিতীয় প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিযুক্ত হন এ কে এম নূরুল ইসলাম। তিনি বিচারপতি ছিলেন। বাংলাদেশের নির্বাচনব্যবস্থা সবচেয়ে কলঙ্কিত হয়েছিল এই সরীসৃপ সিইসির হাতে। নূরুল ইসলামই বাংলাদেশে ভোটবিহীন গণভোটের ভৌতিক ফল প্রকাশ করেন। একনায়ক জিয়া ছিলেন এ গণভোটের আয়োজক। জিয়ার জন্য এ গণভোটে প্রথমে ভোট দেখানো হয়েছিল ১০০ ভাগের ওপর। পরে নূরুল ইসলাম কমিশন হ্যাঁ ভোট কিছু কমিয়ে ৯৮ দশমিক ৬ শতাংশ দেখিয়েছিল। স্বৈরাচাররা সব সময় মেরুদণ্ডহীন মোসাহেবদের পছন্দ করে। জিয়ার হ্যাঁ-না ভোট, সাত্তারের প্রহসনের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে নূরুল ইসলামের আনুগত্যে মুগ্ধ হয়েছিলেন এরশাদ। এজন্য প্রধান নির্বাচন কমিশনার থেকে বিদায় নেওয়ার পর এরশাদ তাঁকে উপরাষ্ট্রপতি বানিয়েছিলেন। নূরুল ইসলামের পর এ সাংবিধানিক পদে আনা হয় আরেক মেরুদণ্ডহীন ব্যক্তিকে। তাঁর নাম চৌধুরী এ টি এম মাসুদ। ’৮৬-এর সংসদ নির্বাচনে মিডিয়া ক্যু করে মাসুদ চমক দেখান। এরশাদের প্রশংসায় ধন্য হন। বিচারপতি মাসুদের পর এরশাদ আরেকজন একান্ত অনুগত ব্যক্তিকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। তিনি বিচারপতি সুলতান হোসেন খান। কিন্তু তাঁর আয়ু ছিল এক বছরের কম। ১৯৯০-এর ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেন তিনি। কিন্তু ৬ ডিসেম্বর এরশাদের পতনের পর ২৪ ডিসেম্বর বিদায় নেন বিচারপতি সুলতান। তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান নতুন প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দেন বিচারপতি আবদুর রউফকে। বিচারপতি রউফ দায়িত্ব নিয়ে বেশ হুলুস্থূল করেন। ’৯১-এর নির্বাচনে ত্রুটি ছিল। তার পরও আগের তুলনায় মানুষের মতামত নির্বাচনে প্রতিফলিত হয়। বিএনপির নেতৃত্বে একটি সরকার গঠিত হয়, যারা ’৭৫-এর পর প্রথমে জনগণের ভোটে নির্বাচিত, কিন্তু ’৯১-এর নির্বাচনে যে বিচারপতি রউফের কোনো কৃতিত্ব নেই তা বোঝা গেল কদিন পরই। প্রথমে মাগুরা এবং তারপর মিরপুর নির্বাচনের তামাশা দেখল দেশের জনগণ। মাগুরা নির্বাচন দেখতে গিয়ে পালিয়ে এসে বললেন, ‘আমি অসহায়!’ বোঝা গেল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের লাঠিতে ভর করেই তিনি সব সাহস আর ক্ষমতা দেখাতেন। পরে অবশ্য বিচারপতি রউফের আসল পরিচয় জাতির কাছে উন্মোচিত হয়েছিল। ’৯১-এর বাহ্যিক সুষ্ঠু নির্বাচনে জামায়াত কীভাবে ১৮ আসনে জয়ী হয়েছিল তা-ও বুঝতে পেরেছিলেন দেশের ভোটাররা। নির্বাচন কমিশনে মেরুদণ্ডহীন ব্যক্তি বসানোর রেওয়াজ চালু করেছিল জিয়া এবং এরশাদ। তবে এ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে কৌতুকাভিনেতা বা জোকার বসানোর প্রথা চালু করেন বেগম জিয়া। ১৯৯৫ সালের ২৭ এপ্রিল বেগম জিয়া এ কে এম সাদেককে প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দেন। সঙ্গে একগুচ্ছ ক্লাউন। এদের তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশের ইতিহাসে নিকৃষ্টতম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬। ’৯৬-এর মার্চে বেগম জিয়ার পতন হলে সাদেক যুগের অবসান হয়। নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেন মোহাম্মদ আবু হেনাকে। আমার বিবেচনায় বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনের ইতিহাসে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন এবং মেরুদণ্ডসহ সিইসি ছিলেন আবু হেনা। এ নির্বাচন কমিশনের পর আওয়ামী লীগ আবার সিইসি হিসেবে সাবেক আমলাকে বেছে নেয়। এম এ সাঈদের অধীনে ২০০১-এর ১ অক্টোবরের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এম এ সাঈদও আবু হেনার পদাঙ্ক অনুসরণ করেন। তবে তাঁর মধ্যে একটি দলকে হারানোর আক্রোশ-উল্লাস চোখে পড়েছিল। নির্বাচন কমিশনে বেগম জিয়ার সব সময় পছন্দ কৌতুকাভিনেতা। পরপর দুটি অপেক্ষাকৃত কম বিতর্কিত নির্বাচন কমিশনের পর বেগম জিয়া আবার ভাঁড়ের সন্ধানে নামেন। এম এ আজিজকে করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে রসে টইটম্বুর সিইসি ছিলেন এম এ আজিজ। এজন্য হয়তো তিনি ইতিহাসে অমরত্ব পেতে পারেন। ওয়ান-ইলেভেনের মাধ্যমে এ টি এম শামসুল হুদা প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নেন। বাংলাদেশের নির্বাচনব্যবস্থায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ এবং যুগান্তকারী সংস্কার হয়েছে তাঁর নেতৃত্বে। ছবিসহ ভোটার তালিকা, স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স, নির্বাচন আচরণবিধি কঠোর করাসহ বেশ কিছু সিদ্ধান্ত সাহসের সঙ্গে নিয়েছিল শামসুল হুদা কমিশন। এরপর আরেক সিএসপি কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব নেন। তিনি অবশ্য পরীক্ষা দেওয়ারই সুযোগ পাননি। ২০১৪ সালের নির্বাচন বিএনপি-জামায়াত বর্জন করলে নির্বাচন কমিশনের কিছুই করার ছিল না। তবে সিটি নির্বাচনগুলো সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করে তিনি প্রমাণ করেছিলেন নির্বাচন কমিশন চাইলে দলীয় সরকারের অধীন ভালো নির্বাচন সম্ভব। এর মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল হয়েছে। অবাধ, সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনের দায়িত্ব বর্তায় রাজনৈতিক দল এবং নির্বাচন কমিশনের ওপর। নূরুল হুদার নেতৃত্বে নির্বাচন কমিশন সে দায়িত্ব পালনে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ২০১৮-তে সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন অনুষ্ঠানে যে যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ নূরুল হুদা কমিশন পেয়েছিল তা কাজে লাগাতে সীমাহীন ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। লাগামহীন খেলো কথাবার্তার জন্য এ কমিশনকে অনেকে আজিজ কমিশনের সঙ্গে তুলনা করেছেন। সবচেয়ে বড় কথা নির্বাচন কমিশনাররা দলীয় নেতাদের মতো আচরণ করে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটির মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করেছেন।

এ ১২ জনের নেতৃত্বে ১২টি নির্বাচন কমিশনের কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ক্ষমতাসীন সরকারের অভিপ্রায় নির্বাচনের ওপর বড় প্রভাব ফেলে। যেমন চারটি নির্বাচন হয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের যেহেতু কোনো প্রকাশ্য রাজনৈতিক আকাঙ্খা ছিল না, তাই নির্বাচন কমিশন মোটামুটি স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করেছে। আবার রাজনৈতিক সরকারের আওতায় যখন নির্বাচন হয়েছে তখন নির্বাচন কমিশনের মধ্যে রাজনৈতিক সরকারকে খুশি করার একটি সুস্পষ্ট প্রবণতা দেখা গেছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচনই হলো ক্ষমতায় যাওয়ার একমাত্র পথ। যে কোনো রাজনৈতিক দল নির্বাচনে জয়ী হওয়ার জন্য বৈধ সব কৌশল অবলম্বন করবেই। বৈধ কৌশলে যেন কোনো অবৈধ পন্থার অনুপ্রবেশ না ঘটে সেজন্যই নির্বাচন কমিশন গুরুত্বপূর্ণ। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচন কমিশন হলো রেফারির মতো। একটি খেলায় যেমন নির্মোহ এবং নিরপেক্ষ রেফারি দুই পক্ষকে ‘রুলস অব দ্য গেম’ মানতে বাধ্য করে নির্বাচন কমিশনের ঠিক সে কাজটিই করার কথা। প্রশ্ন উঠতেই পারে, খেলার মাঠে একজন রেফারি বা আম্পায়ারের যে ক্ষমতা থাকে নির্বাচন কমিশনের কি সে ক্ষমতা আছে? ২০০৮ নির্বাচনসংক্রান্ত আইন, আচরণবিধি এবং অন্যান্য বিধিবিধান কমিশনকে পর্যাপ্ত ক্ষমতা দিয়েছে। দলীয় সরকারের অধীনেই যে অবাধ সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব ২০১৩-এর সিটি নির্বাচনগুলো তার প্রমাণ। ওই নির্বাচন প্রমাণ করেছে নির্বাচন কমিশন চাইলেই পারে। তারপরও নির্বাচন কমিশন কেন সরকার বা ক্ষমতাসীন দলকে খুশি রাখার এক প্রাণান্ত চেষ্টা করে? এ প্রশ্নের উত্তরে এক কথায় বলা যায় নির্বাচন কমিশনের মেরুদণ্ডের অভাব। স্বাধীনতার ৫০ বছর পর অনির্বাচিত কিছু ব্যক্তি (প্রয়াত বিএনপি নেতা সাইফুর রহমানের ভাষায় ১০ জন ফেরেশতা) দেশের গণতন্ত্রের ভাগ্যবিধাতা হবেন তা মেনে নেওয়া যায় না। নির্বাচন কমিশন কেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের লাঠি দিয়ে চলবে? কেন নিজের পায়ে দাঁড়াবে না?

বাংলাদেশের সংবিধানে এবং নির্বাচন-সংক্রান্ত আইন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, নির্বাচনকালীন নির্বাচন কমিশনই হলো তত্ত্বাবধায়ক সরকার। সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালনে সহায়তা করা সব নির্বাহী কর্তৃপক্ষের কর্তব্য। নির্বাচনকালীন প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কমিশনের অধীনে থাকবে। তাহলে ১০ জন সফেদ ভদ্রলোক কী করবেন? রাজনীতিবিদদের ব্যর্থ প্রমাণ করবেন? রাজনীতিবিদরা একটি নির্বাচন করতে পারেন না, এটি বলে রাজনীতির দৈন্য নিয়ে উপহাস করবেন? নিরপেক্ষ, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, সৎ, শিক্ষিত মানুষই যদি নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব নেন তাহলে তাদের নেতৃত্বে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হতে পারে। তারা শুধু আইন অনুসরণ করবেন। কাউকে খুশি করার চেষ্টা করবেন না। বাংলাদেশে কি এ রকম মানুষ পাওয়া দুষ্কর? অবশ্যই না। খুব শিগগিরই হয়তো সার্চ কমিটি গঠিত হবে। সার্চ কমিটির প্রধান কাজ হবে মেরুদণ্ডসম্পন্ন কয়েকজন মানুষকে খুঁজে বের করা।

তার অতীতের পদপদবির চেয়ে তার ব্যক্তিত্ব এবং সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সাহসটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ রকম ব্যক্তিত্ববান মানুষ খুঁজে পাওয়া মোটেও কঠিন হবে না। বিএনপি এবং অন্য রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত নির্বাচন কমিশন গঠন প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখা। সবাই মিলে একটি ভালো নির্বাচন কমিশন গঠন গণতন্ত্রের জন্য জরুরি। কিন্তু সার্চ কমিটি যদি বাবুরাম সাপুড়ের মতো সাপ খোঁজে তাহলে নির্বাচন নিয়ে মানুষের হতাশা আরও বাড়বে। মানুষ আরও নির্বাচনবিমুখ হবে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে এমন একজন মানুষকে বেছে নেওয়া হোক যাকে দেখলেই মানুষ উৎসাহী হবে। ভোট খরা কাটাতে এটাই হতে পারে সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ। সার্চ কমিটির কাছে দেশের জনগণ নির্বাচন কমিশনের জন্য একটি মেরুদণ্ড চায়। আর কিছু না।

লেখক : নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত।



মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

খালেদার সাবেক সহকারী প্রেস সচিবও মিথ্যাবাদী বললেন ফখরুলকে

প্রকাশ: ০২:০০ পিএম, ২৬ Jun, ২০২২


Thumbnail খালেদার সাবেক সহকারী প্রেস সচিবও মিথ্যাবাদী বললেন ফখরুলকে

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দাবি করেছিলেন যে পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। তার এই দাবির সমর্থনে বিএনপির কোনো নেতাই এখন পর্যন্ত এগিয়ে আসেনি। উল্টো বেগম খালেদা জিয়া যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তখনকার তার সহকারী প্রেস সচিব মহিউদ্দিন খান মোহন এক নিবন্ধে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে মিথ্যাবাদী বলেছেন। 

তিনি তার নিবন্ধে লিখেছেন, 'অত্যন্ত দুঃখজনক হলো, পদ্মা সেতু উদ্বোধনের আগ মুহূর্তে বিরোধী দল বিএনপির পক্ষ থেকে একটি অহেতুক বিতর্কের অবতারণা করেছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সম্প্রতি তিনি বলেছেন, পদ্মা সেতুর প্রথম ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। বলে নেওয়া দরকার মির্জা আলমগীর সাহেব যে সময়ের কথা বলেছেন, তখন আমি প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সহকারী প্রেস সচিব ছিলাম। ওই মেয়াদে বেগম খালেদা জিয়া চারবার মুন্সীগঞ্জ জেলায় গিয়েছিলেন। একবার মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার মোল্লাকান্দি ইউনিয়নে ‘রজতরেখা’ নামে একটি গুচ্ছগ্রাম উদ্বোধন করতে, দ্বিতীয়বার মুক্তারপুরে, তৃতীয়বার লৌহজংয়ে নতুন উপজেলা ভবন উদ্বোধন করতে এবং চতুর্থবার গজারিয়ায় ইঞ্জিনিয়ারিং স্টাফ কলেজের ভিত্তি স্থাপন করতে। এর কোনোবারই তিনি মাওয়া পয়েন্টে পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেননি। সবচেয়ে বড় কথা হলো, তার সহকারী প্রেস সচিব হওয়ায় তিনি মুন্সীগঞ্জ সফরে গেলে আমি তাঁর সফরসঙ্গী হতাম। বেগম খালেদা জিয়া পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন এমন কোনো ঘটনা আমার জানা নেই। বিষয়টি নিয়ে আমি কথা বলেছি তাঁর তৎকালীন সহকারী একান্ত সচিব মো. আবদুল মতিনের সঙ্গে। তিনি ওই সময়ে প্রধানমন্ত্রী প্রতিশ্রুত উন্নয়ন প্রকল্পগুলো দেখভাল করতেন। মতিন সাহেবও তেমন কোনো ঘটনার কথা স্মরণ করতে পারলেন না।' 

তার এই নিবন্ধে তিনি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে প্রশ্ন করেছেন যে, তিনি এমন একটি ভিত্তিহীন তথ্য কোথায় পেলেন? মহিউদ্দিন খান মোহনের এই লেখা থেকে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দাবি মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন। এখন পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর খালেদা জিয়া স্থাপন করেছেন এরকম বক্তব্যের দাবিদার মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পাশে কেউ নেই। আর সত্য কথা বলতে মিথ্যার সঙ্গে কেউ থাকেও না। বর্তমানে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের অবস্থা তারই প্রমাণ। 

পদ্মা সেতু   বিএনপি   মির্জা ফখরুল  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

পদ্মা সেতু: ক্যারিয়ার বদলে দিলো এক আমলার

প্রকাশ: ০৬:০০ পিএম, ২৫ Jun, ২০২২


Thumbnail

আজ আনুষ্ঠানিকভাবে পদ্মা সেতুর উদ্বোধন হলো। পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান পরিচালনা করেছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম। খন্দকার আনোয়ার পদ্মা সেতুর কারণেই তার ক্যারিয়ারের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছেছেন বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। পদ্মা সেতু নিয়ে ঘটনাপ্রবাহের আগে তিনি অনেকটাই আলোচিত এবং উপেক্ষিত ছিলেন। ১৯৮৩ সালের ব্যাচের কর্মকর্তা খন্দকার আনোয়ার। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর এই ব্যাচের সবচেয়ে আলোচিত আমলা ছিলেন নজরুল ইসলাম খান। তিনি প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন, যখন শেখ হাসিনা বিরোধী দলের নেতা। এ কারণে নজরুল ইসলাম খান অনেক বিপদসংকুল পরিস্থিতির মধ্যে ছিলেন, অনেক কঠিন সময় পার করেছেন। এমনকি তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত সরকার তাকে তার প্রাপ্য গাড়িটিও দেননি। এরকম কষ্ট, নির্যাতন এবং পদোন্নতি বঞ্চিত থাকা অবস্থায় ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে এন আই খান প্রথমে প্রধানমন্ত্রীর একান্ত একান্ত সচিব, পরবর্তী প্রধানমন্ত্রীর সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

এই ব্যাচের সম্পর্কে একটি কথা প্রচলিত ছিল যে, এই ব্যাচকে বলা হতো টিকচিহ্ন ব্যাচ। হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ যখন প্রথম উপজেলা ব্যবস্থা চালু করেন তখন উপজেলায় ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের জন্য তড়িঘড়ি করে একটি বিসিএস পরীক্ষার আয়োজন করা, যে বিসিএস ব্যাচটি টিকমার্ক দিয়ে বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। তখন কথা ছিলো যে, শুধুমাত্র তারা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। কিন্তু পরবর্তীতে এই ব্যাচের পক্ষ থেকে হাইকোর্টে রিট করা হয় এবং এই রিটে তারা বিজয়ী হয়ে প্রশাসন ক্যাডারের সঙ্গে যুক্ত হয় ৮৩ এর এই ব্যাচটি। এই ব্যাচের অনেক মেধাবী কর্মকর্তা ছিলেন এবং আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে অনেকেই এই ব্যাচ থেকে নানাভাবে আলোচিত হন। আবার এই ব্যাচ থেকেই মুক্তিযুদ্ধের সার্টিফিকেট জালিয়াতি বা বিভিন্ন অভিযোগে একাধিক ব্যক্তি স্বেচ্ছায় অবসরেও গিয়েছিলেন। এসব আলোচনা-সমালোচনা বিতর্কের উর্ধ্বে ছিলেন খন্দকার আনোয়ার। তিনি নিভৃতে কাজ করতেন। কিন্তু যখন পদ্মা সেতু নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপিত হয় এবং তৎকালীন যোগাযোগ সচিব মোশারফ হোসেন ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপন করা হয়, তাকে গ্রেপ্তার করা হয়, ঠিক সেই সময়ে খন্দকার আনোয়ারকে দেওয়া হয় সেতু বিভাগের দায়িত্বে।

খন্দকার আনোয়ার একজন সৎ, পরিশ্রমী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। অনেকেই তাকে কোনো ঘরোনার নয়, কর্ম পাগল একজন ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করতো। কিন্তু সেতু মন্ত্রণালয়ের পান তিনি পদ্মা সেতু নিয়ে সংকটাপন্ন অবস্থায় মধ্যে। এরকম পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নিয়ে তিনি তার ক্যারিয়ারের সেরা সময়টি পার করেন। মূলত তার বিচক্ষণতা, কর্ম তৎপরতা এবং সততার কারণে পদ্মা সেতু নিয়ে নতুন কোনো বিতর্ক হয়নি বলে অনেকে মনে করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার ওপর যে আস্থা রেখেছিলেন সেই আস্থার প্রতিদান তিনি খুব ভালমতোই দেন। আর এই এটিই তার ক্যারিয়ার বদলে দেয়। পদ্মা সেতুর সাফল্যের কারণেই সেতু বিভাগ থেকে তিনি মন্ত্রিপরিষদ সচিব হন, যদিও আমলাতান্ত্রিক হিসাব-নিকাশে তার মন্ত্রিপরিষদ সচিব হওয়ার কথা ছিল না। মন্ত্রিপরিষদ সচিব হওয়ার পর তিনি প্রধানমন্ত্রীর আরও আস্থাভাজন হন। এজন্য তিনি দুদফা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছেন। একজন সৎ, পরিশ্রমী কর্মকর্তা হিসেবে তিনি পরিচিত। তার সততা, যোগ্যতাই তাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। যেটি সম্ভব হয়েছে পদ্মা সেতুর কারণে।

পদ্মা সেতু   মন্ত্রিপরিষদ সচিব   খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

সব হারিয়ে সব পাওয়ার গল্প

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ২৫ Jun, ২০২২


Thumbnail সব হারিয়ে সব পাওয়ার গল্প

আজ বাংলাদেশের গৌরবের দিন। অহংকারের দিন। বাংলাদেশ যত দিন বেঁচে থাকবে তত দিন ২৫ জুনকে স্মরণ করবে। আত্মমর্যাদা ও সাহসের উন্মোচনের দিন হিসেবে উদ্যাপন করবে। পদ্মা সেতু যতটা না সামষ্টিক অর্জন, তার চেয়ে বেশি শেখ হাসিনার নেতৃত্বের স্বীকৃতি। তাঁর দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মনোবল, জনগণের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতীক পদ্মা সেতু। একজন নেতা কী অসাধ্য সাধন করতে পারেন তার বড় বিজ্ঞাপন পদ্মা সেতু। প্রশ্ন উঠতেই পারে, পদ্মা সেতু কি শেখ হাসিনার সেরা অর্জন? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের একটু পেছনে ফিরে যেতে হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জীবন-দর্শন ও রাজনীতি খানিকটা হলেও বিশ্লেষণ করতে হবে।

দীর্ঘ ৪১ বছর ধরে আওয়ামী লীগের মতো জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলের প্রধান নেতা শেখ হাসিনা। ২৩ জুন আওয়ামী লীগ ৭৩ বছরে পা রাখল। শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ও শক্তিশালী রাজনৈতিক সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের ৭৩ বছরের আয়ুষ্কালে শেখ হাসিনাই দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ৪১ বছর। আওয়ামী লীগের মতো একটি সংগঠনের শুধু প্রধান নেতা হিসেবে নয়, সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যক্তি হিসেবেও শেখ হাসিনা প্রতিষ্ঠিত। আওয়ামী লীগে তাঁর কোনো বিকল্প নেই। এটি যে কোনো রাজনীতিবিদের জন্য অনন্য অর্জন। টানা ৪১ বছর দলের নেতা-কর্মীদের কাছে জনপ্রিয় থাকা কঠিন কাজ। সে কঠিন কাজটিই তিনি করেছেন অবলীলায়। এজন্যও শেখ হাসিনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে অমরত্ব পাবেন।

তবে আওয়ামী লীগ বা দেশের রাজনীতিতে তাঁর অপরিহার্য হয়ে ওঠার গল্পটা খুব সোজাসাপটা ছিল না। দুর্গম পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। অনেক প্রতিকূল পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়েছে। ১৯৮১ সালের ১৭ মে শেখ হাসিনা দেশে ফিরেছিলেন এক প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে। সামরিক শাসনের শৃঙ্খলে গণতন্ত্র বন্দি। বুটের তলায় পিষ্ট মানুষের অধিকার। আওয়ামী লীগ বিভক্ত, ক্ষতবিক্ষত। দেশে ফিরেই শেখ হাসিনা গণতন্ত্রের ডাক দিলেন। মানুষের মুক্তির কথা বললেন। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গড়ে তুললেন গণজাগরণ। শেখ হাসিনা যদি বাংলাদেশে না আসতেন তাহলে বাংলাদেশ হয়তো আরেকটি পাকিস্তান হতো। অথবা ব্যর্থ, পরাজিত এক রাষ্ট্র হিসেবে ধুঁকতে থাকত। দেশে সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন করে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা শেখ হাসিনার আরেকটি বড় অর্জন। অং সান সু চি পারেননি। ব্যর্থ হয়েছেন বেনজির ভুট্টো। মিয়ানমারে সু চি সামরিক জান্তার সঙ্গে সমঝোতা করে শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রকেই বলি দিয়েছেন। কিন্তু শেখ হাসিনা সামরিক জান্তাদের বিরুদ্ধে গণজাগরণ সৃষ্টি করেছেন। শেষ পর্যন্ত উর্দিতন্ত্রের কবর দিয়েছেন চিরতরে। একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের প্রধান নেতা হিসেবেও শেখ হাসিনা অবলীলায় ইতিহাসে অমরত্ব পাবেন।

গণতন্ত্রের জন্য একটি শক্তিশালী বিরোধী দল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষমতাসীন দলকে জবাবদিহিতার মধ্যে রাখার জন্য একটি কার্যকর শক্তিশালী বিরোধী দল জরুরি। ১৯৮৬ ও ’৯১ সালের সংসদে আওয়ামী লীগ ছিল বিরোধী দল। শেখ হাসিনা ছিলেন বিরোধী দলের নেতা। আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে ছিল এজন্যই গণতন্ত্রের পথ সুগম হয়েছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ কেবল সরকারের সমালোচনা করেনি। বিকল্প পথ দেখিয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে সফল বিরোধী দল আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ দেখিয়েছে বিরোধী দলের কাজ কী। বিরোধী দলকে কীভাবে রাজনীতি করতে হয়। এজন্য এ দেশের রাজনীতির ইতিহাসে চিরকাল বেঁচে থাকবেন শেখ হাসিনা। দলে-বাইরে নানা প্রতিকূলতা পার হয়ে ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ দীর্ঘ ২১ বছর পর দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পায়। এ সময় তিনি রাষ্ট্র পরিচালনায়ও এমন কিছু পদক্ষেপ নেন, যার যে কোনো একটির জন্যই তিনি অমরত্ব পেতে পারেন। গঙ্গার পানিচুক্তি ছিল ১৯৯৬-২০০১ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সাফল্যের প্রথম পালক। পার্বত্য শান্তির মতো একটি উদ্যোগ অন্য কোনো দেশের সরকারপ্রধান গ্রহণ করলে সেজন্য নিশ্চিত নোবেল শান্তি পুরস্কার পেতেন। কিন্তু পাহাড়ে শান্তি ফিরিয়েও শেখ হাসিনা ওই অঞ্চলের মানুষের ভালোবাসা ছাড়া কিছুই পাননি। তবে পার্বত্য শান্তিচুক্তির জন্যও শেখ হাসিনা অমরত্ব পাবেন। ’৯৬ সালে রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে কল্যাণকামী রাষ্ট্রের অবয়ব দিতে শুরু করেন। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, কমিউনিটি ক্লিনিক, একটি বাড়ি একটি খামার, আশ্রয়ণ ইত্যাদি প্রতিটি উদ্যোগ মানবিক বাংলাদেশ গঠনের একটি করে স্তম্ভ। এ উদ্যোগগুলোর জন্য শেখ হাসিনা চিরকাল বেঁচে থাকবেন। দরিদ্র প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আপন মানুষ হয়ে উঠেছিলেন তিনি এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে। শেখ হাসিনার মতো বাংলাদেশে আর কেউ কি এত দরিদ্রবান্ধব কর্মসূচি নিয়েছিল? এ অর্জনগুলো খাটো করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। এ সবই হলো আর্থসামাজিক উন্নয়ন। অনেক সময় আর্থসামাজিক উন্নয়ন অবকাঠামো উন্নয়নের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ২০০১ সালে বাংলাদেশে প্রথম শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন শেখ হাসিনা। সে বছর বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসে। শুরু হয় সংখ্যালঘু ও বিরুদ্ধমতের ওপর তান্ডব। ১ অক্টোবর থেকে সারা দেশে জ্বালাও-পোড়াও, হত্যা-সন্ত্রাসের এক ভয়ংকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এ সময় বাংলাদেশ প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সাহসী এক লড়াকু যোদ্ধাকে দেখে। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত যেভাবে নিপীড়ন-নির্যাতনের মধ্যে শেখ হাসিনা অটল, দৃঢ়চিত্তে দলের হাল ধরেছেন, নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন সেটিও তাঁর বড় এক অর্জন। ২০০১-এর মাস্টারপ্ল্যান ছিল আওয়ামী লীগকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা। আর এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চূড়ান্ত রূপ ছিল ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা। অলৌকিকভাবে সেদিন বেঁচে যান আওয়ামী লীগ সভানেত্রী। এ ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েও হাল ছাড়েননি শেখ হাসিনা। বরং জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আরও সোচ্চার হয়েছেন। এ সাহস আর অকুতোভয় চরিত্রের কারণেই শেখ হাসিনা অমরত্ব পাবেন। সেদিন যদি তিনি ভয় পেয়ে গুটিয়ে যেতেন তাহলে আজকের বাংলাদেশ আমরা পেতাম না। দানবের বিরুদ্ধে লড়াই করার সাহস খুব কম মানুষের থাকে। তার চেয়েও কম মানুষ এ লড়াইয়ে জয়ী হয়। শেখ হাসিনা সে রকমই এক বিরল বিজয়ী যোদ্ধা। ওয়ান-ইলেভেনের সময়টা ছিল বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের জন্য এক অগ্নিপরীক্ষা। সে পরীক্ষায় জয়ী হয়েছেন মাত্র একজন রাজনীতিবিদ। তাঁর নাম শেখ হাসিনা। এক-এগারো ছিল বাংলাদেশে বিরাজনীতিকরণের সবচেয়ে পরিকল্পিত দীর্ঘমেয়াদি নীলনকশা। সেনাবাহিনীর ঘাড়ে সওয়ার হয়ে সুশীল রাজত্ব কায়েম হয়েছিল বাংলাদেশে। বাংলাদেশের রাজনীতির দৈন্যের করুণ চেহারাটা সে সময় উন্মোচিত হলো। কেউ পালিয়ে গেলেন, কেউ আপস করলেন, কেউ দিগ্ভ্রান্ত, হতবিহ্বল। রুখে দাঁড়ালেন একজন। শেখ হাসিনা। সেদিন যদি নির্বাচনের দাবিতে, দ্রুত জনগণের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য তিনি সোচ্চার না হতেন, তাহলে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হতো অধিকারহীন এক করপোরেট দাসতন্ত্র। এ সময় শেখ হাসিনার ওপর নেমে এসেছিল অত্যাচারের স্টিম রোলার। একের পর এক বানোয়াট মামলা, নির্যাতনে এতটুকু টলাতে পারেনি সাহসী এই রাষ্ট্রনায়ককে। এ সময় দেশের মানুষ দেখেছে ক্লান্তিহীন লড়াকু এক নেতাকে। একাই যুদ্ধ করে হারিয়েছেন ক্ষমতালিপ্সুদের। ফিরিয়ে এনেছেন গণতন্ত্র।

বাংলাদেশে শেখ হাসিনার বর্তমান টানা ১৩ বছরের শাসনামল নিয়েই চর্চা বেশি হয়। অতীতে তাঁর সংগ্রাম, অসম্ভবের বিরুদ্ধে একাকী যুদ্ধ অনেকটাই আড়ালে থেকে যায়। কিন্তু ১৯৮১ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ শেখ হাসিনাকে করেছে অনন্য, অসাধারণ, তুলনাহীন। সোনা যেমন পুড়েই খাঁটি হয়, শেখ হাসিনাও ঘাত-প্রতিঘাতেই আজকে রাষ্ট্রনায়ক থেকে বিশ্বনেতা হয়েছেন। এ ১৩ বছরে ১০০ কারণে শেখ হাসিনা অমরত্ব পাবেন। ১০০ কারণে আগামী ১০০ বছরেও বাংলাদেশ শেখ হাসিনার মতো একজন নেতা পাবে না। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার সম্পন্ন করে রায় কার্যকর। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করে জাতির কলঙ্ক মোচন। বিডিআর বিদ্রোহ দমন। কোন অর্জনকে খাটো করবেন? সমুদ্রে বাংলাদেশের অধিকার প্রতিষ্ঠা। ভারতের সঙ্গে স্থলসীমান্ত বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান। ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীকে মানবিক বিবেচনায় আশ্রয় দান। স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের উত্তরণ। প্রায় সব সূচকে ভারত-পাকিস্তানকে পেছনে ফেলা। টানা প্রবৃদ্ধি। কোন অর্থনৈতিক অর্জনকে আপনি উপেক্ষা করবেন?

পদ্মা সেতু নিঃসন্দেহে অনন্য, অসাধারণ এক অর্জন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল কিংবা রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প, একটিও কম? কবে বাংলাদেশ একসঙ্গে এতগুলো স্বপ্ন পূরণের পথে হেঁটেছে।

পদ্মা সেতু ব্যতিক্রম এবং আলাদা মর্যাদায় অন্য কারণে। কেবল একটি নান্দনিক আধুনিক অবকাঠামোর জন্য নয়, পদ্মা সেতু বাংলাদেশকে অপমানের প্রতিশোধ। আমাদের সম্মান ও মর্যাদার প্রতীক। পদ্মা সেতু সব সময় আমার আরেকটি মুক্তিযুদ্ধ মনে হয়। বাংলাদেশের দামাল ছেলেরা যেমন প্রায় নিরস্ত্র অবস্থায় যুদ্ধ করে একটা দেশ স্বাধীন করেছে; তেমনি দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রামরত একটা দেশ বিশ্বের অন্যতম চিত্তাকর্ষ এক সেতু বানিয়ে ফেলল নিজের টাকায়। এর পেছনে শক্তিটা কী? শক্তিটা হলো সাহস। এ সাহস তাকে দিয়েছে অফুরন্ত প্রাণশক্তি, সবকিছু জয়ের অদম্য স্পৃহা।

শেখ হাসিনার জীবনের গল্পটা সিনেমার চিত্রনাট্যের চেয়েও রোমাঞ্চকর। মাঝেমধ্যে তা রূপকথার চেয়েও বিস্ময়কর। একজন মানুষ যদি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়, লক্ষ্য অবিচল থাকে, চিন্তা পরিচ্ছন্ন হয় তাহলে যে তিনি বিজয়ী হবেন শেখ হাসিনাই তার প্রমাণ। ’৭৫-এ মানুষটি সব হারিয়েছেন। বাবা, মা, ভাই সবাইকে। এ রকম একজন মানুষের তো উন্মাদ হয়ে যাওয়ার কথা। অথবা হতাশার গহিন অরণ্যে হারিয়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু শেখ হাসিনা দেখালেন সব হারিয়েও সব পাওয়া যায়। মনোবল, সততা ও নিষ্ঠা দিয়ে কাজ করলে অসম্ভব শব্দটাকে সহজেই পরাজিত করা যায়। শেখ হাসিনা বাংলাদেশে জাতির পিতাকে পুনর্বার প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এ দেশে আর কেউ কোনো দিন বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে ফেলতে পারবে না।

’৭৫-এর পর কজন ভেবেছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু আবার তাঁর মর্যাদার আসনে বসবেন। কেউ কি ভেবেছিল বাংলাদেশ আবার বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের পথে হাঁটবে? ’৮১ সালে যখন শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফিরলেন অসহায়, রিক্ত, সিক্ত অবস্থায় তখন কজন ভেবেছিল তিনি হয়ে উঠবেন বাঙালির কান্ডারি। তার হাত ধরেই বাংলাদেশ বিশ্বদরবারে পাবে মর্যাদার আসন। ’৯১ সালের নির্বাচনে যখন আওয়ামী লীগ হেরে গেল, তখন শেখ হাসিনার রাজনীতির যবনিকা দেখেছিলেন বেশির ভাগ পন্ডিত। ২০০১-এ আওয়ামী লীগের পরাজয়ের পর আওয়ামী লীগের নেতারাই ঘুরে দাঁড়ানো অসম্ভব ভেবেছিলেন। ২০০৭ সালে তো নৌকা থেকে ঝাঁপ দিয়ে নিরাপদ দূরত্বে থাকতে চেয়েছিলেন হেভিওয়েট নেতারা। কিন্তু শেখ হাসিনা হাল ছাড়েননি। লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হননি এতটুকু। তিনি আস্থা রেখেছিলেন আওয়ামী লীগের তৃণমূলের ওপর, কোটি মানুষের ওপর। তাদের নিয়ে লড়াই করে গেছেন সব হারানো মানুষটি। লড়াই করেছেন অসত্যের বিরুদ্ধে, অপশাসনের বিরুদ্ধে, দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে। বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথেই তিনি হেঁটেছেন। নতুন পথ বানাতে চাননি। জাতির পিতার ছায়ায় থেকেই নিজেকে বিস্তৃত করেছেন। শেখ হাসিনার গল্পটা তাই সব হারিয়ে সব পাওয়ার গল্প। শুধু শেখ হাসিনার গল্প নয়, বাংলাদেশ পদ্মা সেতুর গল্পটাও যেন একই চিত্রনাট্যের অনুপম বাস্তবায়ন। এক অসম যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে বাংলাদেশ পায় এক স্বাধীন রাষ্ট্র। জাতির পিতার স্বপ্ন ছিল এক স্বনির্ভর, আত্মমর্যাদার দেশ। কিন্তু ’৭৫-এ জাতির পিতাকে হারিয়ে বাংলাদেশ যেন সব হারায়। বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন স্বাধীনতা, চেয়েছিলেন অর্থনৈতিক মুক্তি। নিজ অর্থায়নে পদ্মা সেতুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ যেন অর্থনৈতিক মুক্তির পতাকা ওড়াল। ’৭৫-এ সব হারানো বাংলাদেশ ২০২২-এ এসে সব পেল। পদ্মা সেতুর গল্পটাও একই রকম। বিপুল আড়ম্বরে এ সেতু নির্মাণের যাত্রা হয়েছিল। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের কথিত দুর্নীতির অভিযোগ সব স্বপ্ন লন্ডভন্ড করে দেয়। সব হারায় পদ্মা সেতু প্রকল্প। কিন্তু শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পদ্মা সেতু এখন বাংলাদেশের উন্নয়নের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন।

পদ্মা সেতু নিঃসন্দেহে শেখ হাসিনার সবচেয়ে বড় অর্জনগুলোর একটি। কিন্তু শেখ হাসিনার আসল অর্জন হলো তাঁর রাজনীতি, সাহস ও সততা। এ কারণেই লক্ষ্য অর্জনে পাহাড়সম বাধা তিনি পার হয়ে যান অবলীলায়। সব হারিয়ে তিনি বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছেন। এটাই তাঁর সব পাওয়া। রাজনীতির এ দৃঢ় আদর্শের জন্য শেখ হাসিনা অমরত্ব পাবেন। বেঁচে থাকবেন হাজার বছর।

লেখক : নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত।
Email : poriprekkhit@yahoo.com
সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন।

পদ্মা সেতু উদ্বোধন   পদ্মা সেতু   উদ্বোধন   শেখ হাসিনা  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

ফখরুল ৫০০, রিজভী ২০০ টাকা

প্রকাশ: ০৫:০০ পিএম, ২৩ Jun, ২০২২


Thumbnail

বন্যা নিয়ে বিএনপি'র আহাজারির কমতি নেই। প্রতিদিন বিএনপি সরকারের সমালোচনায় মুখর। সরকার ত্রাণ তৎপরতা ঠিকমতো করতে পারছে না, বন্যার চেয়ে পদ্মা সেতুর উদ্বোধন নিয়ে সরকার ব্যস্ত এমন সমালোচনা বিএনপির পক্ষ থেকে প্রতিনিয়তই করা হচ্ছে। কিন্তু দেশের অন্যতম প্রধান বিরোধী দল হিসেবে বন্যাদুর্গতদের সাহায্যের জন্য বিএনপি কি করছে? সম্প্রতি বিএনপির নেতারা নিজস্ব উদ্যোগে দূর্গত মানুষকে সহায়তার জন্য অর্থ আহরণ করা শুরু করেছে। দলের নেতাকর্মীদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, দলীয় প্রধান কার্যালয়ে যে যেটুকু পারে সেটুকু টাকা যেন জমা দেয়। আর টাকা জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত গত তিনদিনে বিএনপি'র কেন্দ্রীয় ত্রাণ তহবিলে টাকা উঠেছে ৩৬ হাজার ৭৫০ টাকা মাত্র। আর এই ত্রাণ তহবিলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দিয়েছেন ৫০০ টাকা আর বিএনপি'র সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী দিয়েছেন ২০০ টাকা। স্থায়ী কমিটির অধিকাংশ সদস্যই কোনো টাকা জমা দেননি। সবচেয়ে বেশি ৩০০০ টাকা জমা দিয়েছেন একজন ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতা। বিএনপির নেতারা বলছেন যে, তারা আরও অপেক্ষা করবেন এবং আগামী দুইদিন পর এই টাকা দিয়ে ত্রাণ তৎপরতা শুরু করবেন। 

তবে বিএনপির এই ৩৬ হাজার ৭৫০ টাকা দিয়ে দুর্গত মানুষের জন্য কি ত্রাণ সহায়তা করা হবে, সে নিয়ে বিএনপির মধ্যেই নানারকম কৌতুক শুরু হয়েছে। বিএনপির একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, এ টাকা দিয়ে সবার জন্য ১ বোতল করে পানিও দেওয়া সম্ভব না। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সরকারের কঠোর সমালোচনা করে বলেছেন যে, সরকার অপ্রতুল ত্রাণ সহায়তা দিচ্ছে এবং দুর্গত মানুষদের জন্য তেমন ত্রাণ দিচ্ছে না। কিন্তু এখন পর্যন্ত বিএনপি'র পক্ষ থেকে তেমন কোনো ত্রাণ তৎপরতা চোখে পড়েনি। স্থানীয় পর্যায়ে সিলেটের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী নিজের ব্যক্তিগত উদ্যোগে কিছু ত্রাণ সহায়তা দিয়েছেন। আরিফুল হক চৌধুরী বিএনপি নেতাদেরকে ত্রাণ সহায়তায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানালেও সেই আহ্বানে এখনও সাড়া দেয়নি বিএনপি নেতারা।

বিএনপিতে ধর্নাঢ্য-বিত্তবান ব্যক্তির সংখ্যা কম নয়। বিএনপি নেতাদের মধ্যে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী একজন ধর্নাঢ্য শিল্পপতি। আব্দুল আউয়াল মিন্টুও বিত্তশালী একজন ব্যক্তি। এছাড়াও বিএনপিতে বহু ব্যবসায়ী এবং ধনী লোক আছেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য মির্জা আব্বাসও একটি ব্যাংকের মালিক এবং পরিবহন ব্যবসায় রয়েছেন। অথচ এত ধনী ব্যক্তি থাকার পরও বিএনপি নিজস্ব উদ্যোগে তহবিল গঠন করতে পারছে না কেন, এটি বিএনপি'র জন্য একটি বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে। বিএনপি'র একজন কর্মী বলেছেন যে, দলের মহাসচিব যদি ৫০০ টাকা দেন তাহলে অন্য কর্মীরা কি করবেন? আর এর প্রেক্ষিতেই নতুন করে বিএনপি'র মধ্যে সমালোচনা শুরু হয়েছে। বন্যা শুরুর এক সপ্তাহ হলেও এখন পর্যন্ত বিএনপি'র স্থায়ী কমিটির কোনো গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে ত্রাণ তৎপড়তার জন্য সিলেট অঞ্চলে যেতে দেখা যায়নি। ফলে প্রশ্ন উঠেছে যে, বন্যা নিয়ে কি বিএনপি রাজনীতি করতে চায় নাকি দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াতে চায়? 


ফখরুল   রিজভী   বিএনপি   বন্যা   ত্রাণ  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

ভিলেনরা কি যাবেন পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে?

প্রকাশ: ০৫:০০ পিএম, ২২ Jun, ২০২২


Thumbnail ভিলেনরা কি যাবেন পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে?

পদ্মা সেতুর উদ্বোধন হচ্ছে আগামী ২৫ জুন। ওই দিন সকাল ১০টায় আনুষ্ঠানিকভাবে এই সেতুর উদ্বোধন করবেন এই সেতুর স্বপ্নদ্রষ্টা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আজ প্রধানমন্ত্রী গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলন করেছেন। এই সংবাদ সম্মেলনে দেশের বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়, তবে বাকি সময়টা ছিল পদ্মা সেতু নিয়ে নানারকম আলোচনা। প্রধানমন্ত্রী খোলামেলাভাবে সব প্রশ্নের উত্তর দেন। প্রধানমন্ত্রী এই সময় পদ্মা সেতু নিয়ে বিভিন্ন মহলের বিরোধিতার প্রসঙ্গটি উত্থাপন করেন। বিশ্বব্যাংক যখন পদ্মা সেতুতে অর্থায়নে অস্বীকৃতি জানিয়ে সরে আসে, তখন বিভিন্ন বিশিষ্টজনেরা যেসব মন্তব্য করেছিল, সেই সমস্ত মন্তব্যগুলো প্রধানমন্ত্রী তুলে ধরেন সংবাদ সম্মেলনে। তিনি কয়েকজন সুনির্দিষ্ট ব্যক্তির বিরোধীতার কথাও উল্লেখ করেন তার সংবাদ সম্মেলনে। এই সমস্ত ব্যক্তিদেরকে আমন্ত্রণ জানানো হবে বলেও প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন। এখন প্রশ্ন হলো যে, যারা সেই সময় পদ্মা সেতুর বিরোধিতা করেছিলেন এবং পদ্মা সেতু হবে না বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন তারা কি আগামী ২৫ জুন পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যাবেন? 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যাদের কথা উল্লেখ করেছেন, তাদের মধ্যে প্রথমে নাম ছিল বেগম খালেদা জিয়ার। বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন যে, এই সরকার পদ্মা সেতু কাজ শুরু করছে, কিন্তু এই সরকার তা শেষ করতে পারবে না। বেগম খালেদা জিয়া পদ্মা সেতুর নির্মাণের ক্রটির কথাও উল্লেখ করেছিলেন। বেগম খালেদা জিয়া এখন শারীরিকভাবে অসুস্থ। তাই তার পক্ষে পদ্মা সেতুর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে যাওয়া সম্ভব না বলে তার পারিবারিক সূত্র বলেছে। যদিও পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে, বেগম খালেদা জিয়া এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক দাওয়াত পান নাই। যদিও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন যে, বেগম খালেদা জিয়াকে দাওয়াত করার ক্ষেত্রে যদি আইনি কোনো বাধ্যবাধকতা না থাকে, তাহলে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হবে। তবে বেগম খালেদা জিয়া যে পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যাচ্ছেন না এটা মোটামুটি নিশ্চিত।

ড. মুহাম্মদ ইউনূস: প্রধানমন্ত্রী সবচেয়ে বেশি পদ্মা সেতুর বিরোধিতাকারী হিসেবে যাকে চিহ্নিত করেছেন তিনি হলেন শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ড. মুহাম্মদ ইউনূস পদ্মা সেতুর বিরোধিতা করার ক্ষেত্রে কি কি করেছিলেন তার বিবরণও তুলে ধরেন শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী বলেন যে, একজন ব্যক্তির একটি পদ আঁকড়ে রাখার জন্য দেশের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দেওয়ার ঘটনা নজিরবিহীন। গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে থাকার জন্যই তিনি পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাধা দিয়েছিলেন বলে প্রধানমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন। ড. মুহাম্মদ ইউনূস পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যাবেন কিনা এ সম্পর্কে যোগাযোগ করা হলে ইউনূস সেন্টারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্য কর্মসূচিতে ব্যস্ত থাকার কারণে তিনি যাবেন না। তবে এ ব্যাপারে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। 

ড. আকবর আলি খান: পদ্মা সেতু নিজ অর্থে করার সমালোচক হিসেবে ড. আকবর আলী খানের একটি বক্তব্য প্রধানমন্ত্রী আজ সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেছেন। ড. আকবর আলি খানের পারিবারিক সূত্র বলছে, তিনি অসুস্থ এবং পদ্মা সেতু পর্যন্ত যাওয়ার মতো শারীরিক সক্ষমতা তার নেই। এজন্য তিনি পদ্মা সেতুতে যাবেন না। যদিও তার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, তিনি পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণপত্র পেয়েছেন।

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য: সিপিডির সম্মানিত ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বিশ্বব্যাংকের সরে যাওয়া এবং নিজ অর্থায়নে পদ্মা সেতু করার কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এটির ফলে অর্থনৈতিক বিপর্যযয়ের কথাও বলেছিলেন। তবে জানা গেছে যে, ড. দেবপ্রিয় পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যাচ্ছেন না। সেতু বিভাগ সূত্র জানা গেছে যে, তাকে ইতোমধ্যে আমন্ত্রণপত্র পাঠানো হয়েছে। 

শাহদীন মালিক: শাহদীন মালিকও পদ্মা সেতুর সমালোচনা করেছিলেন। সেখানে তিনি সুশাসনের অভাবের কথা বলেছিলেন এবং বিশ্বব্যাংককে সরে যাওয়াটাকে দুর্ভাগ্যজনক বলেছিলেন। শাহদীন মালিকেও পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের দাওয়াত দেওয়া হয়েছে। কিন্তু শাহদীন মালিকের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বলছেন তিনি পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যাবেন না। 

অর্থাৎ যারা যারা পদ্মা সেতু হবে না, নিজে অর্থায়নে পদ্মা সেতু করা সম্ভব নয় বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন, তারা কেউই আসলে পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যাচ্ছেন না। তবে এটি কি লজ্জায়, না হতাশায় সেটি অবশ্য জানা যায়নি।

ভিলেন   পদ্মা সেতু   উদ্বোধন   প্রধানমন্ত্রী   শেখ হাসিনা  


মন্তব্য করুন


বিজ্ঞাপন