এডিটর’স মাইন্ড

হেরে যাবে বাংলাদেশ?

প্রকাশ: ১২:০০ এএম, ২৩ অক্টোবর, ২০২১


Thumbnail

টি-২০ বিশ্বকাপ চলছে। এ বিশ্বকাপে বাংলাদেশ কেন গ্রুপ পর্বে খেলবে এ নিয়ে আমাদের প্রচণ্ড অভিমান। উদ্বোধনী খেলা দেখতে বসলাম আয়োজন করে। বাংলাদেশের জার্সি গায়ে চড়ালাম। স্কটল্যান্ডকে কত সহজে হারাবে, সেটাই যেন খেলা দেখার মূল উপলক্ষ। কিন্তু কী আশ্চর্য। বাংলাদেশ হেরে গেল। মন খারাপ করেই পরের ম্যাচ দেখতে বসলাম। এবার প্রতিপক্ষ ওমান। সে খেলায় শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ জিতল। খেলা এমনই। কখনো কোনো দল জিতবে, কখনো হারবে। একটি রাষ্ট্রেরও উত্থান-পতন হয়। সুসময়-দুঃসময় আসে। কিন্তু একটি রাষ্ট্র যখন তার লক্ষ্যচ্যুত হয়, যখন আদর্শচ্যুত হয় তখন সেই রাষ্ট্র চিরস্থায়ীভাবে হেরে যায়। ‘বাংলাদেশ’ নামের রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যে মৌলিক লক্ষ্য এবং আদর্শ নিয়ে তার অন্যতম হলো ‘অসাম্প্রদায়িকতা’ ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’। কিন্তু গত কয়েক দিনে বাংলাদেশে যা ঘটেছে তাতে অনেকের প্রশ্ন, বাংলাদেশ কি তার লক্ষ্যে আছে? নাকি আদর্শচ্যুত বাংলাদেশ হেরে যাচ্ছে? জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু এ জাতিরাষ্ট্রের স্বপ্নদ্রষ্টা, প্রতিষ্ঠাতা। সারা জীবন তিনি ধর্মান্ধতা ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। বঙ্গবন্ধু কেমন বাংলাদেশ চেয়েছিলেন তা তাঁর লেখা এবং বক্তব্যেই পাওয়া যায়।

‘এ দেশে ইসলাম, মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবই থাকবে এবং বাংলাদেশও থাকবে। হিন্দু ও বৌদ্ধদের ওপর গত এক দশক যে অত্যাচার হয়েছে তারও অবসান হবে।’ (জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, ৩১ ডিসেম্বর ১৯৭০। সূত্র : শেখ মুজিব বাংলাদেশের আরেক নাম, আতিউর রহমান। পৃষ্ঠা : ২১৯)

‘জনগণকে ইসলাম ও মুসলমানের নামে স্লোগান দিয়ে ধোঁকা দেওয়া যায় না। ধর্মপ্রাণ বাঙালি মুসলমানরা তাদের ধর্মকে ভালোবাসে, কিন্তু ধর্মের নামে ধোঁকা দিয়ে রাজনৈতিক কার্যসিদ্ধি তারা করতে দিবে না...’ (জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃষ্ঠা ২৫৮) ।

বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতার এ দুটি উক্তিই আমাদের রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের প্রেক্ষাপট বলে দেয়। এক অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের স্বপ্ন বুকে ধারণ করেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল। ‘বাংলার হিন্দু, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার খ্রিস্টান, বাংলার মুসলমান। আমরা সবাই বাঙালি।’ এ অমর স্লোগান বুকে ধারণ করেই ৩০ লাখ বাঙালি জীবন দিয়েছিল। ৩ লাখ মা-বোন সম্ভ্রম হারিয়েছিলেন। স্বাধীনতার ৫০ বছর পর এ প্রশ্নের মুখোমুখি আমাদের দাঁড়াতেই হয়- সেই বাংলাদেশ কি আমরা পেয়েছি? এ রাষ্ট্র কি সবার? বাংলাদেশ কি পথভ্রষ্ট? আমরা কি হেরে যাচ্ছি? ১৩ অক্টোবর থেকে কুমিল্লা, চাঁদপুর, নোয়াখালীতে যা ঘটল, তা কি আমাদের বাংলাদেশ? মুহুর্তে কিছু মানুষের সব লুট হলো, পুড়ে ছাই হয়ে গেল ভালোবাসার ঠিকানা। সন্ত্রাসের তাণ্ডবে পালিয়ে গেল মানবতা। কিছু মানুষ অনুভব করল এ রাষ্ট্রে তারা অনাহুত, নিরাপত্তাহীন। তাদের পাশে কেউ নেই। এ রকম একটি ঘটনা যতটা না দুঃখজনক তার চেয়েও দুর্ভাগ্যজনক হলো ঘটনা-পরবর্তী রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া। বিশ্বে সব গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আমরা দেখি নানা ইস্যুতে রাজনৈতিক দলের মতপার্থক্য থাকে। কিন্তু সংকটে এবং মৌলিক প্রশ্নে, দেশের স্বার্থে সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়। ভারতে তীব্র বিভাজনের রাজনীতিতেও বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রশ্নে সব দল একাট্টা। নিউজিল্যান্ডে উগ্রবাদী সন্ত্রাসবাদ, সেখানকার রাজনৈতিক বিভেদকে উপড়ে ফেলে। ব্রিটেনে এমপির মৃত্যু সব মত ও পক্ষের পার্থক্য মুছে ফেলে। কিন্তু সংকটে বাংলাদেশ এক হতে পারে না। জাতীয় স্বার্থে সব রাজনৈতিক দল একই সুরে কথা বলতে পারে না। হোক না তা রোহিঙ্গা ইস্যু, করোনা মোকাবিলা কিংবা সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস। দেশে কোনো অস্থিতিশীল, জনগণের স্বার্থহানিকর উত্তেজনা সৃষ্টি হলে রাজনৈতিক বিভক্তির কদর্য, কুৎসিত রূপ যেন আরও বীভৎস রূপ ধারণ করে। বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে বিভাজন দেখা যায় সাম্প্রদায়িক ইস্যুতে। যে ধর্মান্ধতা, মৌলবাদ এবং সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পকে উপড়ে দিয়ে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি তাকে আবার নতুন করে লালন করার এক অদ্ভুত প্রবণতা আমাদের রাজনীতিতে দৃশ্যমান। তার চেয়েও ভয়ঙ্কর হলো সাম্প্রদায়িকতা যেন রাজনীতিতে প্রতিপক্ষ ঘায়েলের এক অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। এবার শারদীয় দুর্গোৎসবের সময় থেকে সাম্প্রদায়িকতার যে তাণ্ডব বাংলাদেশ দেখল, সেখানে রাজনীতিবিদদের সহানুভূতির চেয়ে প্রতিপক্ষকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর এক বিদঘুটে প্রবণতা দগদগে ঘায়ের মতো দৃশ্যমান। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ব্লেইম গেইমে যেন ধর্মান্ধ দুর্বৃত্তরা আড়ালে থেকে যাচ্ছে।

ঘটনার পর আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক থেকে শুরু করে মন্ত্রী-উপমন্ত্রী, নেতা-পাতিনেতা সবাই হইহই করে উঠলেন। সবার আঙুল বিএনপির দিকে। বলা হলো, রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য বিএনপি-জামায়াতের মদদে এসব ঘটানো হয়েছে। যে বিএনপি নিজেদের নেতাকে মুক্ত করার জন্য একটি আন্দোলন করতে পারে না সেই বিএনপি এমন সুচারুভাবে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টি করতে সক্ষম? আমরা যদি তর্কের খাতিরেও ধরে নিই এটা ‘বিএনপির ষড়যন্ত্র’, তা হলে প্রশ্ন আসে সরকার কী করল? সরকার নিয়ন্ত্রিত গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কী করল? ফেসবুকে ঘোষণা দিয়ে, মাইকিং করে, সমাবেশের মাধ্যমে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ করা হয়েছে। পুলিশ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পর্যাপ্ত সময় পেয়েছে। তারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখল কেন? একটি রাষ্ট্রে সব নাগরিকের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব সরকারের। বিএনপির ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে দায় এড়ানো কি যাবে? যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জঙ্গিদের গোপন পরিকল্পনার খবর পেয়ে মুহুর্তেই আস্তানা ঘিরে ফেলে, ফেসবুকে আপত্তিকর স্ট্যাটাস দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ‘অপরাধী’কে অসম্ভব দক্ষতায় গ্রেফতার করে  সেই চৌকস, দক্ষ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিছুই জানল না, কিছুই বুঝল না। কী করে সম্ভব? বাংলাদেশে সর্বজনীন শারদীয় দুর্গোৎসব শুরু হওয়ার আগেই বিভিন্ন মহল থেকে নিরাপত্তা রক্ষার কথা বলা হয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল দুর্গাপূজায় নাশকতার কোনো শঙ্কা নেই। তাহলে এটি কি গোয়েন্দা ব্যর্থতা? কুমিল্লার ঘটনার পর অনেকেই আশঙ্কা করেছিল এর জেরে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা হতে পারে। শেষ পর্যন্ত সে শঙ্কাই সত্য পরিণত হলো। প্রশ্ন উঠতেই পারে এ রকম পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কী প্রস্তুতি নিয়েছিল? প্রশাসনিক ব্যর্থতার কথা বাদই দিলাম, দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে এসব ঘটনায় আওয়ামী লীগ কী দায়িত্ব পালন করছে? দেশে এখন আওয়ামী লীগের অভাব নেই। ইউনিয়ন নির্বাচন থেকে সংসদ উপনির্বাচন সর্বত্র প্রার্থীর ছড়াছড়ি। কুমিল্লা, চাঁদপুর, নোয়াখালী, রংপুরে এত আওয়ামী লীগ কোথায় গেল? কোথাও তো রাজনৈতিক প্রতিরোধ দেখলাম না। রাজনৈতিক প্রতিরোধ পরের কথা, ঘটনার পর দুর্গত এলাকায় ছুটে যাওয়ার ক্ষেত্রেও আওয়ামী লীগের আড়ষ্টতা! কেন? ১৩ বছর আওয়ামী লীগ টানা ক্ষমতায়। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার জন্য আওয়ামী লীগ হেফাজতের সঙ্গে চোর-পুলিশ খেলে। আওয়ামী লীগে জামায়াত-যুদ্ধাপরাধীরা বাসা বাধে। এবার দেখলাম নাসিরনগরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় জড়িত দুজন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পর্যন্ত পেয়েছেন। তবে আশার কথা হলো, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বিষয়টি জানার সঙ্গে সঙ্গে তাদের মনোনয়ন বাতিল করেছেন। শুধু নাসিরনগর কেন, দেশের বহু স্থানে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে স্বাধীনতাবিরোধী পরিবারের পুনরুত্থান ঘটেছে। শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সভানেত্রী তাঁর উদ্যোগে এ-সংক্রান্ত অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা করেছেন। সেখানে হাজার হাজার অভিযোগ জমা পড়েছে। আওয়ামী লীগ নেতারাই বলেছেন, তৃণমূল থেকে অর্থের বিনিময়ে এসব নাম পাঠানো হয়েছে। আওয়ামী লীগের ভিতরই এখন সাম্প্রদায়িক, ধর্মান্ধ, মৌলবাদের ভূত ঢুকে গেছে। যে শর্ষে দিয়ে ভূত তাড়াবে সেই শর্ষের মধ্যেই ভূত। আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর নামে স্লোগান দিয়ে চাটুকাররা গলা ফাটিয়ে ফেলে। কিন্তু তাঁর নির্দেশগুলো আওয়ামী লীগের কজন জানে?

শেখ হাসিনা বারবার অনুপ্রবেশ ঠেকাতে নির্দেশ দিচ্ছেন। আর এ নির্দেশ শুনে কিছু কিছু আওয়ামী লীগ নেতা দ্বিগুণ উৎসাহে জামায়াত-যুদ্ধাপরাধীদের আওয়ামী লীগে ঢোকাচ্ছেন। তাদের পদ দিচ্ছেন, মনোনয়ন দিচ্ছেন। ফলে জাতির পিতা সারা জীবন যে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ, অসাম্প্রদায়িক আওয়ামী লীগের জন্য লড়াই করলেন সেই অসাম্প্রদায়িক চেতনাই আজ আওয়ামী লীগে বিলীনপ্রায়। আওয়ামী লীগ নেতারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের কথা মুখে বলেন কিন্তু বাস্তবে কজন তা মানেন। এ রকম সাম্প্রদায়িক উসকানি ও সহিংসতায় বঙ্গবন্ধু নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে আর্তমানবতার সেবায় ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে এর কিছু নিদর্শন আমরা পাই। ভারত বিভক্তির পর কলকাতায় ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছিল। সে দাঙ্গায় বঙ্গবন্ধু কী করেছিলেন একটু দেখে নেওয়া যাক-

‘কলকাতা শহরে শুধু মরা মানুষের লাশ বিক্ষিপ্তভাবে পড়ে আছে। মহল্লার পর মহল্লা আগুনে পুড়ে গিয়েছে। এক ভয়াবহ দৃশ্য। মানুষ মানুষকে এভাবে হত্যা করতে পারে, চিন্তা করতেও ভয় হয়।... লেডি ব্রাবোর্ন কলেজে রিফিউজিদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। দোতলায় মেয়েরা, আর নিচে পুরুষ। কর্মীদের ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। আমাকেও মাঝে মাঝে ডিউটি করতে হয়। মুসলমানদের উদ্ধার করার কাজও করতে হচ্ছে। দু-এক জায়গায় উদ্ধার করতে গিয়ে আক্রান্তও হয়েছিলাম। আমরা হিন্দুদের উদ্ধার করে হিন্দু মহল্লায় পাঠাতে সাহায্য করেছি।’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃষ্ঠা ৬৬)। জাতির পিতা শিখিয়েছেন রাজনীতি মানে শুধু প্রতিপক্ষকে পরাজিত করা নয়। রাজনীতি মানে মানুষের সেবা। দুঃসময়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানো। বঙ্গবন্ধু সারাটা জীবন এ কাজটি করেছেন। কিন্তু আজ আওয়ামী লীগের কজন সে পথে হাঁটেন? একটা করে ঘটনা ঘটছে। আওয়ামী লীগের নেতাদের কথার খই ফুটছে। দুর্গত মানুষের পাশে ছুটে যাওয়ার আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। আওয়ামী লীগের কেউ কেউ মনে করেন এ ঘটনার দায় কোনোভাবে বিএনপির ঘাড়ে চাপাতে পারলেই হলো, ব্যস। বিএনপিকে আরও সহজেই ঘায়েল করা যাবে। বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার পর আওয়ামী লীগের কিছু নেতার এ প্রবণতা অগ্রহণযোগ্য এবং দায় এড়ানোর কৌশল। এসব ঘটনায় বিএনপি-জামায়াতের কেউ জড়িত থাকতেই পারে। সেটি আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, বিচারব্যবস্থা দেখবে। কিন্তু সরকার হিসেবে অবশ্যই আওয়ামী লীগকেই এর দায় নিতে হবে। জনগণের জানমালের হেফাজতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। এটা ষড়যন্ত্র বলে পার পাওয়া যাবে না। যারা ষড়যন্ত্র করেছে তাদের আইনের আওতায় আনা সরকারের কাজ। প্রশ্ন উঠতেই পারে- ১৩ বছর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়, তারপরও কেন সাম্প্রদায়িকতার বিষাক্ত সাপ ছোবল মারল। আওয়ামী লীগ কি তাহলে জাতির পিতার আদর্শের অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়তে পারেনি? আওয়ামী লীগ কি তাহলে ক্ষমতায় থাকার জন্য দুধকলা দিয়ে ধর্মান্ধ মৌলবাদের সাপ পুষছে?

কুমিল্লার ঘটনার পর থেকেই বিএনপি নেতারা উল্লসিত। তাদের উল্লাস এখন আর চাপা থাকছে না। বিএনপি নেতাদের কথাবার্তা আজকাল অসংলগ্ন, দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং অমার্জিত। তাদের কথা শুনে মনে পড়ে সেই অক্ষম, অযোগ্য ব্যক্তিদের যারা কিছু করতে না পেরে খিস্তি করেন। বিএনপি নেতাদের কথা শুনলে মনে হয় সাম্প্রদায়িকতার কার্ড নিয়ে তারা আওয়ামী লীগকে পরাজিত করে ফেলেছেন। বিএনপি নেতাদের সাম্প্রদায়িক সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ নেই, সহানুভূতি নেই। ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে আওয়ামী লীগের ঘাড়ে দোষ চাপাতে বিএনপির সর্বাত্মক চেষ্টা। বিএনপির একজন নেতাও দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াননি। অবশ্য এ ব্যাপারে বিএনপি খুব স্পষ্ট এবং রাখঢাকহীন। কারণ সাম্প্রদায়িকতা জিইয়ে রাখার মাধ্যমেই বিএনপি বিকশিত হয়েছে। জিয়া ক্ষমতায় এসে সংবিধান থেকে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ উপড়ে ফেলেছিলেন। যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমকে দেশে ফিরিয়ে এনেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ফ্যাসিস্ট শক্তি জামায়াতকে রাজনীতিতে পুনরুত্থিত করেছিলেন। রাজাকার শাহ আজিজকে প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছিলেন। রাজাকার, যুদ্ধাপরাধীদের জেল থেকে বের করে নতুন জীবন দিয়েছিলেন। জিয়ার সময় এ রাষ্ট্রে দুই শ্রেণির নাগরিক ব্যবস্থা তৈরি হয়। মুসলমানরা প্রথম শ্রেণির নাগরিক, অন্যরা দ্বিতীয় শ্রেণির। জিয়া সর্বত্র সমঅধিকারের বদলে সংখ্যালঘুদের জন্য সীমিত কোটার ব্যবস্থা চালু করেছিলেন। আজ বাংলাদেশে যে ধর্মান্ধ মৌলবাদের দাপট তার স্রষ্টা জিয়াউর রহমান। বিএনপি একে লালন করেছে, পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে। এখনো বিএনপি ও জামায়াতের লিভ-টুগেদার অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রধান বিষফোঁড়া। বিএনপির মতো মূলধারার জনপ্রিয় দল মৌলবাদ, উগ্র সাম্প্রদায়িকতাকে সমর্থন করার কারণেই এখনো সাম্প্রদায়িকতা ফণা তুলে আছে। বিএনপি যখনই ক্ষমতায় এসেছে তখনই সাম্প্রদায়িক, স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তিকে লালন করেছে। বিএনপিই যুদ্ধাপরাধী নরঘাতক মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মুজাহিদকে শহীদের রক্তে ভেজা জাতীয় পতাকা উপহার দিয়েছে। বিএনপি বাংলা ভাই, জেএমবি সৃষ্টি করেছে। উগ্র সাম্প্রদায়িকতাকে বিএনপি সব সময় স্বাগত জানায়। প্রকাশ্যে অথবা গোপনে। বিএনপি নেতাদের সাম্প্রতিক আহ্লাদে সেই ধারণাটি আরও প্রতিষ্ঠিত হয়। বিএনপি মনে করে সাম্প্রদায়িক বিভাজনই তাদের ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি। মানুষ যত উগ্র মৌলবাদকে আলিঙ্গন করবে, বিএনপি তত হৃষ্টপুষ্ট হবে- এটা বিএনপির অনেকের বিশ্বাস। তাই কুমিল্লা, চাঁদপুর, নোয়াখালী ও রংপুরের ঘটনায় বিএনপি নেতারা যেন ‘হারানো যৌবন’ ফিরে পাচ্ছেন। এ ঘটনায় তারা আওয়ামী লীগকে নকআউট করেছেন! জয়ের আনন্দে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্যের মতো প্রলাপ বকছেন। অথচ এইট দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দল হলে বিএনপি এসব ঘটনার নির্মোহ, নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করতে পারত। ঘটনাস্থলে মানবিক সহায়তার হাত বাড়াতে পারত। কিন্তু এসব না করে বিএনপি নেতারা আওয়ামী লীগের ওপর দোষ চাপাতে ব্যস্ত। এর ফলে প্রকৃত অপরাধীরা আড়ালে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।

সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক সহিংসতার পর আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দোষারোপের রাজনীতি চলছে। কথার তুফান মেইলে জাতি দিশাহারা। এর মধ্যে খবর পাওয়া গেল কুমিল্লার পূজামণ্ডপে কোরআন শরিফ রাখা ব্যক্তি ইকবাল হোসেন (৩৫)। একজন মুসলমান। তার মানে কী? কোনো হিন্দু ইসলাম ধর্মকে অবমাননা করেনি। একজন মুসলমান এ অপকর্ম করেছে। তার লক্ষ্য ছিল অশান্তি সৃষ্টি। ইকবালের রাজনৈতিক পরিচয় কী তা আমরা এখনো জানি না। আমি জানতে আগ্রহী নই। তিনি একজন অমানুষ। মানুষরূপী পশু, দানব। এসব সহিংসতার কারণ এই জানোয়াররা। সাম্প্রদায়িক এ বীভৎস খেলায় এরাই আসল খেলোয়াড়। এরা কার পক্ষে? আওয়ামী লীগ না বিএনপি- সে প্রশ্নের উত্তর সময়ই বলে দেবে। তবে নিশ্চিতভাবে এরা বাংলাদেশের বিপক্ষে।

টি-২০ বিশ্বকাপ দিয়ে লেখা শুরু করেছিলাম। খেলায় হারলে ঘুরে দাঁড়ানো যায় সহজে। বাংলাদেশ তা বারবার প্রমাণ করেছে। রাষ্ট্রের অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, উন্নয়ন সংকটও কাটিয়ে ওঠা যায়। কিন্তু আদর্শ হারালে ঘুরে দাঁড়ানো যায় না। বাংলাদেশ যদি আদর্শচ্যুত হয় তাহলে আমাদের স্বাধীনতা অর্থহীন হয়ে যায়। আমরা হেরে যাই। সাম্প্রদায়িকতার এই তীব্র লেলিহান শিখায় আমরাও কি পুড়ে যাচ্ছি? বাংলাদেশ কি হেরে যাচ্ছে?

লেখক : নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত।
Email : poriprekkhit@yahoo.com



মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

খালেদার সাবেক সহকারী প্রেস সচিবও মিথ্যাবাদী বললেন ফখরুলকে

প্রকাশ: ০২:০০ পিএম, ২৬ Jun, ২০২২


Thumbnail খালেদার সাবেক সহকারী প্রেস সচিবও মিথ্যাবাদী বললেন ফখরুলকে

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দাবি করেছিলেন যে পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। তার এই দাবির সমর্থনে বিএনপির কোনো নেতাই এখন পর্যন্ত এগিয়ে আসেনি। উল্টো বেগম খালেদা জিয়া যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তখনকার তার সহকারী প্রেস সচিব মহিউদ্দিন খান মোহন এক নিবন্ধে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে মিথ্যাবাদী বলেছেন। 

তিনি তার নিবন্ধে লিখেছেন, 'অত্যন্ত দুঃখজনক হলো, পদ্মা সেতু উদ্বোধনের আগ মুহূর্তে বিরোধী দল বিএনপির পক্ষ থেকে একটি অহেতুক বিতর্কের অবতারণা করেছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সম্প্রতি তিনি বলেছেন, পদ্মা সেতুর প্রথম ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। বলে নেওয়া দরকার মির্জা আলমগীর সাহেব যে সময়ের কথা বলেছেন, তখন আমি প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সহকারী প্রেস সচিব ছিলাম। ওই মেয়াদে বেগম খালেদা জিয়া চারবার মুন্সীগঞ্জ জেলায় গিয়েছিলেন। একবার মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার মোল্লাকান্দি ইউনিয়নে ‘রজতরেখা’ নামে একটি গুচ্ছগ্রাম উদ্বোধন করতে, দ্বিতীয়বার মুক্তারপুরে, তৃতীয়বার লৌহজংয়ে নতুন উপজেলা ভবন উদ্বোধন করতে এবং চতুর্থবার গজারিয়ায় ইঞ্জিনিয়ারিং স্টাফ কলেজের ভিত্তি স্থাপন করতে। এর কোনোবারই তিনি মাওয়া পয়েন্টে পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেননি। সবচেয়ে বড় কথা হলো, তার সহকারী প্রেস সচিব হওয়ায় তিনি মুন্সীগঞ্জ সফরে গেলে আমি তাঁর সফরসঙ্গী হতাম। বেগম খালেদা জিয়া পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন এমন কোনো ঘটনা আমার জানা নেই। বিষয়টি নিয়ে আমি কথা বলেছি তাঁর তৎকালীন সহকারী একান্ত সচিব মো. আবদুল মতিনের সঙ্গে। তিনি ওই সময়ে প্রধানমন্ত্রী প্রতিশ্রুত উন্নয়ন প্রকল্পগুলো দেখভাল করতেন। মতিন সাহেবও তেমন কোনো ঘটনার কথা স্মরণ করতে পারলেন না।' 

তার এই নিবন্ধে তিনি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে প্রশ্ন করেছেন যে, তিনি এমন একটি ভিত্তিহীন তথ্য কোথায় পেলেন? মহিউদ্দিন খান মোহনের এই লেখা থেকে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দাবি মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন। এখন পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর খালেদা জিয়া স্থাপন করেছেন এরকম বক্তব্যের দাবিদার মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পাশে কেউ নেই। আর সত্য কথা বলতে মিথ্যার সঙ্গে কেউ থাকেও না। বর্তমানে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের অবস্থা তারই প্রমাণ। 

পদ্মা সেতু   বিএনপি   মির্জা ফখরুল  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

পদ্মা সেতু: ক্যারিয়ার বদলে দিলো এক আমলার

প্রকাশ: ০৬:০০ পিএম, ২৫ Jun, ২০২২


Thumbnail

আজ আনুষ্ঠানিকভাবে পদ্মা সেতুর উদ্বোধন হলো। পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান পরিচালনা করেছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম। খন্দকার আনোয়ার পদ্মা সেতুর কারণেই তার ক্যারিয়ারের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছেছেন বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। পদ্মা সেতু নিয়ে ঘটনাপ্রবাহের আগে তিনি অনেকটাই আলোচিত এবং উপেক্ষিত ছিলেন। ১৯৮৩ সালের ব্যাচের কর্মকর্তা খন্দকার আনোয়ার। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর এই ব্যাচের সবচেয়ে আলোচিত আমলা ছিলেন নজরুল ইসলাম খান। তিনি প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন, যখন শেখ হাসিনা বিরোধী দলের নেতা। এ কারণে নজরুল ইসলাম খান অনেক বিপদসংকুল পরিস্থিতির মধ্যে ছিলেন, অনেক কঠিন সময় পার করেছেন। এমনকি তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত সরকার তাকে তার প্রাপ্য গাড়িটিও দেননি। এরকম কষ্ট, নির্যাতন এবং পদোন্নতি বঞ্চিত থাকা অবস্থায় ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে এন আই খান প্রথমে প্রধানমন্ত্রীর একান্ত একান্ত সচিব, পরবর্তী প্রধানমন্ত্রীর সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

এই ব্যাচের সম্পর্কে একটি কথা প্রচলিত ছিল যে, এই ব্যাচকে বলা হতো টিকচিহ্ন ব্যাচ। হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ যখন প্রথম উপজেলা ব্যবস্থা চালু করেন তখন উপজেলায় ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের জন্য তড়িঘড়ি করে একটি বিসিএস পরীক্ষার আয়োজন করা, যে বিসিএস ব্যাচটি টিকমার্ক দিয়ে বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। তখন কথা ছিলো যে, শুধুমাত্র তারা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। কিন্তু পরবর্তীতে এই ব্যাচের পক্ষ থেকে হাইকোর্টে রিট করা হয় এবং এই রিটে তারা বিজয়ী হয়ে প্রশাসন ক্যাডারের সঙ্গে যুক্ত হয় ৮৩ এর এই ব্যাচটি। এই ব্যাচের অনেক মেধাবী কর্মকর্তা ছিলেন এবং আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে অনেকেই এই ব্যাচ থেকে নানাভাবে আলোচিত হন। আবার এই ব্যাচ থেকেই মুক্তিযুদ্ধের সার্টিফিকেট জালিয়াতি বা বিভিন্ন অভিযোগে একাধিক ব্যক্তি স্বেচ্ছায় অবসরেও গিয়েছিলেন। এসব আলোচনা-সমালোচনা বিতর্কের উর্ধ্বে ছিলেন খন্দকার আনোয়ার। তিনি নিভৃতে কাজ করতেন। কিন্তু যখন পদ্মা সেতু নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপিত হয় এবং তৎকালীন যোগাযোগ সচিব মোশারফ হোসেন ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপন করা হয়, তাকে গ্রেপ্তার করা হয়, ঠিক সেই সময়ে খন্দকার আনোয়ারকে দেওয়া হয় সেতু বিভাগের দায়িত্বে।

খন্দকার আনোয়ার একজন সৎ, পরিশ্রমী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। অনেকেই তাকে কোনো ঘরোনার নয়, কর্ম পাগল একজন ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করতো। কিন্তু সেতু মন্ত্রণালয়ের পান তিনি পদ্মা সেতু নিয়ে সংকটাপন্ন অবস্থায় মধ্যে। এরকম পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নিয়ে তিনি তার ক্যারিয়ারের সেরা সময়টি পার করেন। মূলত তার বিচক্ষণতা, কর্ম তৎপরতা এবং সততার কারণে পদ্মা সেতু নিয়ে নতুন কোনো বিতর্ক হয়নি বলে অনেকে মনে করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার ওপর যে আস্থা রেখেছিলেন সেই আস্থার প্রতিদান তিনি খুব ভালমতোই দেন। আর এই এটিই তার ক্যারিয়ার বদলে দেয়। পদ্মা সেতুর সাফল্যের কারণেই সেতু বিভাগ থেকে তিনি মন্ত্রিপরিষদ সচিব হন, যদিও আমলাতান্ত্রিক হিসাব-নিকাশে তার মন্ত্রিপরিষদ সচিব হওয়ার কথা ছিল না। মন্ত্রিপরিষদ সচিব হওয়ার পর তিনি প্রধানমন্ত্রীর আরও আস্থাভাজন হন। এজন্য তিনি দুদফা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছেন। একজন সৎ, পরিশ্রমী কর্মকর্তা হিসেবে তিনি পরিচিত। তার সততা, যোগ্যতাই তাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। যেটি সম্ভব হয়েছে পদ্মা সেতুর কারণে।

পদ্মা সেতু   মন্ত্রিপরিষদ সচিব   খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

সব হারিয়ে সব পাওয়ার গল্প

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ২৫ Jun, ২০২২


Thumbnail সব হারিয়ে সব পাওয়ার গল্প

আজ বাংলাদেশের গৌরবের দিন। অহংকারের দিন। বাংলাদেশ যত দিন বেঁচে থাকবে তত দিন ২৫ জুনকে স্মরণ করবে। আত্মমর্যাদা ও সাহসের উন্মোচনের দিন হিসেবে উদ্যাপন করবে। পদ্মা সেতু যতটা না সামষ্টিক অর্জন, তার চেয়ে বেশি শেখ হাসিনার নেতৃত্বের স্বীকৃতি। তাঁর দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মনোবল, জনগণের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতীক পদ্মা সেতু। একজন নেতা কী অসাধ্য সাধন করতে পারেন তার বড় বিজ্ঞাপন পদ্মা সেতু। প্রশ্ন উঠতেই পারে, পদ্মা সেতু কি শেখ হাসিনার সেরা অর্জন? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের একটু পেছনে ফিরে যেতে হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জীবন-দর্শন ও রাজনীতি খানিকটা হলেও বিশ্লেষণ করতে হবে।

দীর্ঘ ৪১ বছর ধরে আওয়ামী লীগের মতো জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলের প্রধান নেতা শেখ হাসিনা। ২৩ জুন আওয়ামী লীগ ৭৩ বছরে পা রাখল। শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ও শক্তিশালী রাজনৈতিক সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের ৭৩ বছরের আয়ুষ্কালে শেখ হাসিনাই দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ৪১ বছর। আওয়ামী লীগের মতো একটি সংগঠনের শুধু প্রধান নেতা হিসেবে নয়, সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যক্তি হিসেবেও শেখ হাসিনা প্রতিষ্ঠিত। আওয়ামী লীগে তাঁর কোনো বিকল্প নেই। এটি যে কোনো রাজনীতিবিদের জন্য অনন্য অর্জন। টানা ৪১ বছর দলের নেতা-কর্মীদের কাছে জনপ্রিয় থাকা কঠিন কাজ। সে কঠিন কাজটিই তিনি করেছেন অবলীলায়। এজন্যও শেখ হাসিনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে অমরত্ব পাবেন।

তবে আওয়ামী লীগ বা দেশের রাজনীতিতে তাঁর অপরিহার্য হয়ে ওঠার গল্পটা খুব সোজাসাপটা ছিল না। দুর্গম পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। অনেক প্রতিকূল পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়েছে। ১৯৮১ সালের ১৭ মে শেখ হাসিনা দেশে ফিরেছিলেন এক প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে। সামরিক শাসনের শৃঙ্খলে গণতন্ত্র বন্দি। বুটের তলায় পিষ্ট মানুষের অধিকার। আওয়ামী লীগ বিভক্ত, ক্ষতবিক্ষত। দেশে ফিরেই শেখ হাসিনা গণতন্ত্রের ডাক দিলেন। মানুষের মুক্তির কথা বললেন। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গড়ে তুললেন গণজাগরণ। শেখ হাসিনা যদি বাংলাদেশে না আসতেন তাহলে বাংলাদেশ হয়তো আরেকটি পাকিস্তান হতো। অথবা ব্যর্থ, পরাজিত এক রাষ্ট্র হিসেবে ধুঁকতে থাকত। দেশে সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন করে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা শেখ হাসিনার আরেকটি বড় অর্জন। অং সান সু চি পারেননি। ব্যর্থ হয়েছেন বেনজির ভুট্টো। মিয়ানমারে সু চি সামরিক জান্তার সঙ্গে সমঝোতা করে শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রকেই বলি দিয়েছেন। কিন্তু শেখ হাসিনা সামরিক জান্তাদের বিরুদ্ধে গণজাগরণ সৃষ্টি করেছেন। শেষ পর্যন্ত উর্দিতন্ত্রের কবর দিয়েছেন চিরতরে। একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের প্রধান নেতা হিসেবেও শেখ হাসিনা অবলীলায় ইতিহাসে অমরত্ব পাবেন।

গণতন্ত্রের জন্য একটি শক্তিশালী বিরোধী দল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষমতাসীন দলকে জবাবদিহিতার মধ্যে রাখার জন্য একটি কার্যকর শক্তিশালী বিরোধী দল জরুরি। ১৯৮৬ ও ’৯১ সালের সংসদে আওয়ামী লীগ ছিল বিরোধী দল। শেখ হাসিনা ছিলেন বিরোধী দলের নেতা। আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে ছিল এজন্যই গণতন্ত্রের পথ সুগম হয়েছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ কেবল সরকারের সমালোচনা করেনি। বিকল্প পথ দেখিয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে সফল বিরোধী দল আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ দেখিয়েছে বিরোধী দলের কাজ কী। বিরোধী দলকে কীভাবে রাজনীতি করতে হয়। এজন্য এ দেশের রাজনীতির ইতিহাসে চিরকাল বেঁচে থাকবেন শেখ হাসিনা। দলে-বাইরে নানা প্রতিকূলতা পার হয়ে ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ দীর্ঘ ২১ বছর পর দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পায়। এ সময় তিনি রাষ্ট্র পরিচালনায়ও এমন কিছু পদক্ষেপ নেন, যার যে কোনো একটির জন্যই তিনি অমরত্ব পেতে পারেন। গঙ্গার পানিচুক্তি ছিল ১৯৯৬-২০০১ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সাফল্যের প্রথম পালক। পার্বত্য শান্তির মতো একটি উদ্যোগ অন্য কোনো দেশের সরকারপ্রধান গ্রহণ করলে সেজন্য নিশ্চিত নোবেল শান্তি পুরস্কার পেতেন। কিন্তু পাহাড়ে শান্তি ফিরিয়েও শেখ হাসিনা ওই অঞ্চলের মানুষের ভালোবাসা ছাড়া কিছুই পাননি। তবে পার্বত্য শান্তিচুক্তির জন্যও শেখ হাসিনা অমরত্ব পাবেন। ’৯৬ সালে রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে কল্যাণকামী রাষ্ট্রের অবয়ব দিতে শুরু করেন। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, কমিউনিটি ক্লিনিক, একটি বাড়ি একটি খামার, আশ্রয়ণ ইত্যাদি প্রতিটি উদ্যোগ মানবিক বাংলাদেশ গঠনের একটি করে স্তম্ভ। এ উদ্যোগগুলোর জন্য শেখ হাসিনা চিরকাল বেঁচে থাকবেন। দরিদ্র প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আপন মানুষ হয়ে উঠেছিলেন তিনি এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে। শেখ হাসিনার মতো বাংলাদেশে আর কেউ কি এত দরিদ্রবান্ধব কর্মসূচি নিয়েছিল? এ অর্জনগুলো খাটো করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। এ সবই হলো আর্থসামাজিক উন্নয়ন। অনেক সময় আর্থসামাজিক উন্নয়ন অবকাঠামো উন্নয়নের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ২০০১ সালে বাংলাদেশে প্রথম শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন শেখ হাসিনা। সে বছর বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসে। শুরু হয় সংখ্যালঘু ও বিরুদ্ধমতের ওপর তান্ডব। ১ অক্টোবর থেকে সারা দেশে জ্বালাও-পোড়াও, হত্যা-সন্ত্রাসের এক ভয়ংকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এ সময় বাংলাদেশ প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সাহসী এক লড়াকু যোদ্ধাকে দেখে। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত যেভাবে নিপীড়ন-নির্যাতনের মধ্যে শেখ হাসিনা অটল, দৃঢ়চিত্তে দলের হাল ধরেছেন, নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন সেটিও তাঁর বড় এক অর্জন। ২০০১-এর মাস্টারপ্ল্যান ছিল আওয়ামী লীগকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা। আর এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চূড়ান্ত রূপ ছিল ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা। অলৌকিকভাবে সেদিন বেঁচে যান আওয়ামী লীগ সভানেত্রী। এ ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েও হাল ছাড়েননি শেখ হাসিনা। বরং জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আরও সোচ্চার হয়েছেন। এ সাহস আর অকুতোভয় চরিত্রের কারণেই শেখ হাসিনা অমরত্ব পাবেন। সেদিন যদি তিনি ভয় পেয়ে গুটিয়ে যেতেন তাহলে আজকের বাংলাদেশ আমরা পেতাম না। দানবের বিরুদ্ধে লড়াই করার সাহস খুব কম মানুষের থাকে। তার চেয়েও কম মানুষ এ লড়াইয়ে জয়ী হয়। শেখ হাসিনা সে রকমই এক বিরল বিজয়ী যোদ্ধা। ওয়ান-ইলেভেনের সময়টা ছিল বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের জন্য এক অগ্নিপরীক্ষা। সে পরীক্ষায় জয়ী হয়েছেন মাত্র একজন রাজনীতিবিদ। তাঁর নাম শেখ হাসিনা। এক-এগারো ছিল বাংলাদেশে বিরাজনীতিকরণের সবচেয়ে পরিকল্পিত দীর্ঘমেয়াদি নীলনকশা। সেনাবাহিনীর ঘাড়ে সওয়ার হয়ে সুশীল রাজত্ব কায়েম হয়েছিল বাংলাদেশে। বাংলাদেশের রাজনীতির দৈন্যের করুণ চেহারাটা সে সময় উন্মোচিত হলো। কেউ পালিয়ে গেলেন, কেউ আপস করলেন, কেউ দিগ্ভ্রান্ত, হতবিহ্বল। রুখে দাঁড়ালেন একজন। শেখ হাসিনা। সেদিন যদি নির্বাচনের দাবিতে, দ্রুত জনগণের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য তিনি সোচ্চার না হতেন, তাহলে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হতো অধিকারহীন এক করপোরেট দাসতন্ত্র। এ সময় শেখ হাসিনার ওপর নেমে এসেছিল অত্যাচারের স্টিম রোলার। একের পর এক বানোয়াট মামলা, নির্যাতনে এতটুকু টলাতে পারেনি সাহসী এই রাষ্ট্রনায়ককে। এ সময় দেশের মানুষ দেখেছে ক্লান্তিহীন লড়াকু এক নেতাকে। একাই যুদ্ধ করে হারিয়েছেন ক্ষমতালিপ্সুদের। ফিরিয়ে এনেছেন গণতন্ত্র।

বাংলাদেশে শেখ হাসিনার বর্তমান টানা ১৩ বছরের শাসনামল নিয়েই চর্চা বেশি হয়। অতীতে তাঁর সংগ্রাম, অসম্ভবের বিরুদ্ধে একাকী যুদ্ধ অনেকটাই আড়ালে থেকে যায়। কিন্তু ১৯৮১ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ শেখ হাসিনাকে করেছে অনন্য, অসাধারণ, তুলনাহীন। সোনা যেমন পুড়েই খাঁটি হয়, শেখ হাসিনাও ঘাত-প্রতিঘাতেই আজকে রাষ্ট্রনায়ক থেকে বিশ্বনেতা হয়েছেন। এ ১৩ বছরে ১০০ কারণে শেখ হাসিনা অমরত্ব পাবেন। ১০০ কারণে আগামী ১০০ বছরেও বাংলাদেশ শেখ হাসিনার মতো একজন নেতা পাবে না। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার সম্পন্ন করে রায় কার্যকর। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করে জাতির কলঙ্ক মোচন। বিডিআর বিদ্রোহ দমন। কোন অর্জনকে খাটো করবেন? সমুদ্রে বাংলাদেশের অধিকার প্রতিষ্ঠা। ভারতের সঙ্গে স্থলসীমান্ত বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান। ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীকে মানবিক বিবেচনায় আশ্রয় দান। স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের উত্তরণ। প্রায় সব সূচকে ভারত-পাকিস্তানকে পেছনে ফেলা। টানা প্রবৃদ্ধি। কোন অর্থনৈতিক অর্জনকে আপনি উপেক্ষা করবেন?

পদ্মা সেতু নিঃসন্দেহে অনন্য, অসাধারণ এক অর্জন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল কিংবা রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প, একটিও কম? কবে বাংলাদেশ একসঙ্গে এতগুলো স্বপ্ন পূরণের পথে হেঁটেছে।

পদ্মা সেতু ব্যতিক্রম এবং আলাদা মর্যাদায় অন্য কারণে। কেবল একটি নান্দনিক আধুনিক অবকাঠামোর জন্য নয়, পদ্মা সেতু বাংলাদেশকে অপমানের প্রতিশোধ। আমাদের সম্মান ও মর্যাদার প্রতীক। পদ্মা সেতু সব সময় আমার আরেকটি মুক্তিযুদ্ধ মনে হয়। বাংলাদেশের দামাল ছেলেরা যেমন প্রায় নিরস্ত্র অবস্থায় যুদ্ধ করে একটা দেশ স্বাধীন করেছে; তেমনি দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রামরত একটা দেশ বিশ্বের অন্যতম চিত্তাকর্ষ এক সেতু বানিয়ে ফেলল নিজের টাকায়। এর পেছনে শক্তিটা কী? শক্তিটা হলো সাহস। এ সাহস তাকে দিয়েছে অফুরন্ত প্রাণশক্তি, সবকিছু জয়ের অদম্য স্পৃহা।

শেখ হাসিনার জীবনের গল্পটা সিনেমার চিত্রনাট্যের চেয়েও রোমাঞ্চকর। মাঝেমধ্যে তা রূপকথার চেয়েও বিস্ময়কর। একজন মানুষ যদি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়, লক্ষ্য অবিচল থাকে, চিন্তা পরিচ্ছন্ন হয় তাহলে যে তিনি বিজয়ী হবেন শেখ হাসিনাই তার প্রমাণ। ’৭৫-এ মানুষটি সব হারিয়েছেন। বাবা, মা, ভাই সবাইকে। এ রকম একজন মানুষের তো উন্মাদ হয়ে যাওয়ার কথা। অথবা হতাশার গহিন অরণ্যে হারিয়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু শেখ হাসিনা দেখালেন সব হারিয়েও সব পাওয়া যায়। মনোবল, সততা ও নিষ্ঠা দিয়ে কাজ করলে অসম্ভব শব্দটাকে সহজেই পরাজিত করা যায়। শেখ হাসিনা বাংলাদেশে জাতির পিতাকে পুনর্বার প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এ দেশে আর কেউ কোনো দিন বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে ফেলতে পারবে না।

’৭৫-এর পর কজন ভেবেছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু আবার তাঁর মর্যাদার আসনে বসবেন। কেউ কি ভেবেছিল বাংলাদেশ আবার বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের পথে হাঁটবে? ’৮১ সালে যখন শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফিরলেন অসহায়, রিক্ত, সিক্ত অবস্থায় তখন কজন ভেবেছিল তিনি হয়ে উঠবেন বাঙালির কান্ডারি। তার হাত ধরেই বাংলাদেশ বিশ্বদরবারে পাবে মর্যাদার আসন। ’৯১ সালের নির্বাচনে যখন আওয়ামী লীগ হেরে গেল, তখন শেখ হাসিনার রাজনীতির যবনিকা দেখেছিলেন বেশির ভাগ পন্ডিত। ২০০১-এ আওয়ামী লীগের পরাজয়ের পর আওয়ামী লীগের নেতারাই ঘুরে দাঁড়ানো অসম্ভব ভেবেছিলেন। ২০০৭ সালে তো নৌকা থেকে ঝাঁপ দিয়ে নিরাপদ দূরত্বে থাকতে চেয়েছিলেন হেভিওয়েট নেতারা। কিন্তু শেখ হাসিনা হাল ছাড়েননি। লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হননি এতটুকু। তিনি আস্থা রেখেছিলেন আওয়ামী লীগের তৃণমূলের ওপর, কোটি মানুষের ওপর। তাদের নিয়ে লড়াই করে গেছেন সব হারানো মানুষটি। লড়াই করেছেন অসত্যের বিরুদ্ধে, অপশাসনের বিরুদ্ধে, দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে। বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথেই তিনি হেঁটেছেন। নতুন পথ বানাতে চাননি। জাতির পিতার ছায়ায় থেকেই নিজেকে বিস্তৃত করেছেন। শেখ হাসিনার গল্পটা তাই সব হারিয়ে সব পাওয়ার গল্প। শুধু শেখ হাসিনার গল্প নয়, বাংলাদেশ পদ্মা সেতুর গল্পটাও যেন একই চিত্রনাট্যের অনুপম বাস্তবায়ন। এক অসম যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে বাংলাদেশ পায় এক স্বাধীন রাষ্ট্র। জাতির পিতার স্বপ্ন ছিল এক স্বনির্ভর, আত্মমর্যাদার দেশ। কিন্তু ’৭৫-এ জাতির পিতাকে হারিয়ে বাংলাদেশ যেন সব হারায়। বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন স্বাধীনতা, চেয়েছিলেন অর্থনৈতিক মুক্তি। নিজ অর্থায়নে পদ্মা সেতুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ যেন অর্থনৈতিক মুক্তির পতাকা ওড়াল। ’৭৫-এ সব হারানো বাংলাদেশ ২০২২-এ এসে সব পেল। পদ্মা সেতুর গল্পটাও একই রকম। বিপুল আড়ম্বরে এ সেতু নির্মাণের যাত্রা হয়েছিল। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের কথিত দুর্নীতির অভিযোগ সব স্বপ্ন লন্ডভন্ড করে দেয়। সব হারায় পদ্মা সেতু প্রকল্প। কিন্তু শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পদ্মা সেতু এখন বাংলাদেশের উন্নয়নের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন।

পদ্মা সেতু নিঃসন্দেহে শেখ হাসিনার সবচেয়ে বড় অর্জনগুলোর একটি। কিন্তু শেখ হাসিনার আসল অর্জন হলো তাঁর রাজনীতি, সাহস ও সততা। এ কারণেই লক্ষ্য অর্জনে পাহাড়সম বাধা তিনি পার হয়ে যান অবলীলায়। সব হারিয়ে তিনি বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছেন। এটাই তাঁর সব পাওয়া। রাজনীতির এ দৃঢ় আদর্শের জন্য শেখ হাসিনা অমরত্ব পাবেন। বেঁচে থাকবেন হাজার বছর।

লেখক : নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত।
Email : poriprekkhit@yahoo.com
সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন।

পদ্মা সেতু উদ্বোধন   পদ্মা সেতু   উদ্বোধন   শেখ হাসিনা  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

ফখরুল ৫০০, রিজভী ২০০ টাকা

প্রকাশ: ০৫:০০ পিএম, ২৩ Jun, ২০২২


Thumbnail

বন্যা নিয়ে বিএনপি'র আহাজারির কমতি নেই। প্রতিদিন বিএনপি সরকারের সমালোচনায় মুখর। সরকার ত্রাণ তৎপরতা ঠিকমতো করতে পারছে না, বন্যার চেয়ে পদ্মা সেতুর উদ্বোধন নিয়ে সরকার ব্যস্ত এমন সমালোচনা বিএনপির পক্ষ থেকে প্রতিনিয়তই করা হচ্ছে। কিন্তু দেশের অন্যতম প্রধান বিরোধী দল হিসেবে বন্যাদুর্গতদের সাহায্যের জন্য বিএনপি কি করছে? সম্প্রতি বিএনপির নেতারা নিজস্ব উদ্যোগে দূর্গত মানুষকে সহায়তার জন্য অর্থ আহরণ করা শুরু করেছে। দলের নেতাকর্মীদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, দলীয় প্রধান কার্যালয়ে যে যেটুকু পারে সেটুকু টাকা যেন জমা দেয়। আর টাকা জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত গত তিনদিনে বিএনপি'র কেন্দ্রীয় ত্রাণ তহবিলে টাকা উঠেছে ৩৬ হাজার ৭৫০ টাকা মাত্র। আর এই ত্রাণ তহবিলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দিয়েছেন ৫০০ টাকা আর বিএনপি'র সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী দিয়েছেন ২০০ টাকা। স্থায়ী কমিটির অধিকাংশ সদস্যই কোনো টাকা জমা দেননি। সবচেয়ে বেশি ৩০০০ টাকা জমা দিয়েছেন একজন ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতা। বিএনপির নেতারা বলছেন যে, তারা আরও অপেক্ষা করবেন এবং আগামী দুইদিন পর এই টাকা দিয়ে ত্রাণ তৎপরতা শুরু করবেন। 

তবে বিএনপির এই ৩৬ হাজার ৭৫০ টাকা দিয়ে দুর্গত মানুষের জন্য কি ত্রাণ সহায়তা করা হবে, সে নিয়ে বিএনপির মধ্যেই নানারকম কৌতুক শুরু হয়েছে। বিএনপির একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, এ টাকা দিয়ে সবার জন্য ১ বোতল করে পানিও দেওয়া সম্ভব না। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সরকারের কঠোর সমালোচনা করে বলেছেন যে, সরকার অপ্রতুল ত্রাণ সহায়তা দিচ্ছে এবং দুর্গত মানুষদের জন্য তেমন ত্রাণ দিচ্ছে না। কিন্তু এখন পর্যন্ত বিএনপি'র পক্ষ থেকে তেমন কোনো ত্রাণ তৎপরতা চোখে পড়েনি। স্থানীয় পর্যায়ে সিলেটের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী নিজের ব্যক্তিগত উদ্যোগে কিছু ত্রাণ সহায়তা দিয়েছেন। আরিফুল হক চৌধুরী বিএনপি নেতাদেরকে ত্রাণ সহায়তায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানালেও সেই আহ্বানে এখনও সাড়া দেয়নি বিএনপি নেতারা।

বিএনপিতে ধর্নাঢ্য-বিত্তবান ব্যক্তির সংখ্যা কম নয়। বিএনপি নেতাদের মধ্যে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী একজন ধর্নাঢ্য শিল্পপতি। আব্দুল আউয়াল মিন্টুও বিত্তশালী একজন ব্যক্তি। এছাড়াও বিএনপিতে বহু ব্যবসায়ী এবং ধনী লোক আছেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য মির্জা আব্বাসও একটি ব্যাংকের মালিক এবং পরিবহন ব্যবসায় রয়েছেন। অথচ এত ধনী ব্যক্তি থাকার পরও বিএনপি নিজস্ব উদ্যোগে তহবিল গঠন করতে পারছে না কেন, এটি বিএনপি'র জন্য একটি বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে। বিএনপি'র একজন কর্মী বলেছেন যে, দলের মহাসচিব যদি ৫০০ টাকা দেন তাহলে অন্য কর্মীরা কি করবেন? আর এর প্রেক্ষিতেই নতুন করে বিএনপি'র মধ্যে সমালোচনা শুরু হয়েছে। বন্যা শুরুর এক সপ্তাহ হলেও এখন পর্যন্ত বিএনপি'র স্থায়ী কমিটির কোনো গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে ত্রাণ তৎপড়তার জন্য সিলেট অঞ্চলে যেতে দেখা যায়নি। ফলে প্রশ্ন উঠেছে যে, বন্যা নিয়ে কি বিএনপি রাজনীতি করতে চায় নাকি দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াতে চায়? 


ফখরুল   রিজভী   বিএনপি   বন্যা   ত্রাণ  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

ভিলেনরা কি যাবেন পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে?

প্রকাশ: ০৫:০০ পিএম, ২২ Jun, ২০২২


Thumbnail ভিলেনরা কি যাবেন পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে?

পদ্মা সেতুর উদ্বোধন হচ্ছে আগামী ২৫ জুন। ওই দিন সকাল ১০টায় আনুষ্ঠানিকভাবে এই সেতুর উদ্বোধন করবেন এই সেতুর স্বপ্নদ্রষ্টা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আজ প্রধানমন্ত্রী গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলন করেছেন। এই সংবাদ সম্মেলনে দেশের বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়, তবে বাকি সময়টা ছিল পদ্মা সেতু নিয়ে নানারকম আলোচনা। প্রধানমন্ত্রী খোলামেলাভাবে সব প্রশ্নের উত্তর দেন। প্রধানমন্ত্রী এই সময় পদ্মা সেতু নিয়ে বিভিন্ন মহলের বিরোধিতার প্রসঙ্গটি উত্থাপন করেন। বিশ্বব্যাংক যখন পদ্মা সেতুতে অর্থায়নে অস্বীকৃতি জানিয়ে সরে আসে, তখন বিভিন্ন বিশিষ্টজনেরা যেসব মন্তব্য করেছিল, সেই সমস্ত মন্তব্যগুলো প্রধানমন্ত্রী তুলে ধরেন সংবাদ সম্মেলনে। তিনি কয়েকজন সুনির্দিষ্ট ব্যক্তির বিরোধীতার কথাও উল্লেখ করেন তার সংবাদ সম্মেলনে। এই সমস্ত ব্যক্তিদেরকে আমন্ত্রণ জানানো হবে বলেও প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন। এখন প্রশ্ন হলো যে, যারা সেই সময় পদ্মা সেতুর বিরোধিতা করেছিলেন এবং পদ্মা সেতু হবে না বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন তারা কি আগামী ২৫ জুন পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যাবেন? 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যাদের কথা উল্লেখ করেছেন, তাদের মধ্যে প্রথমে নাম ছিল বেগম খালেদা জিয়ার। বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন যে, এই সরকার পদ্মা সেতু কাজ শুরু করছে, কিন্তু এই সরকার তা শেষ করতে পারবে না। বেগম খালেদা জিয়া পদ্মা সেতুর নির্মাণের ক্রটির কথাও উল্লেখ করেছিলেন। বেগম খালেদা জিয়া এখন শারীরিকভাবে অসুস্থ। তাই তার পক্ষে পদ্মা সেতুর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে যাওয়া সম্ভব না বলে তার পারিবারিক সূত্র বলেছে। যদিও পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে, বেগম খালেদা জিয়া এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক দাওয়াত পান নাই। যদিও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন যে, বেগম খালেদা জিয়াকে দাওয়াত করার ক্ষেত্রে যদি আইনি কোনো বাধ্যবাধকতা না থাকে, তাহলে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হবে। তবে বেগম খালেদা জিয়া যে পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যাচ্ছেন না এটা মোটামুটি নিশ্চিত।

ড. মুহাম্মদ ইউনূস: প্রধানমন্ত্রী সবচেয়ে বেশি পদ্মা সেতুর বিরোধিতাকারী হিসেবে যাকে চিহ্নিত করেছেন তিনি হলেন শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ড. মুহাম্মদ ইউনূস পদ্মা সেতুর বিরোধিতা করার ক্ষেত্রে কি কি করেছিলেন তার বিবরণও তুলে ধরেন শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী বলেন যে, একজন ব্যক্তির একটি পদ আঁকড়ে রাখার জন্য দেশের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দেওয়ার ঘটনা নজিরবিহীন। গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে থাকার জন্যই তিনি পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাধা দিয়েছিলেন বলে প্রধানমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন। ড. মুহাম্মদ ইউনূস পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যাবেন কিনা এ সম্পর্কে যোগাযোগ করা হলে ইউনূস সেন্টারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্য কর্মসূচিতে ব্যস্ত থাকার কারণে তিনি যাবেন না। তবে এ ব্যাপারে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। 

ড. আকবর আলি খান: পদ্মা সেতু নিজ অর্থে করার সমালোচক হিসেবে ড. আকবর আলী খানের একটি বক্তব্য প্রধানমন্ত্রী আজ সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেছেন। ড. আকবর আলি খানের পারিবারিক সূত্র বলছে, তিনি অসুস্থ এবং পদ্মা সেতু পর্যন্ত যাওয়ার মতো শারীরিক সক্ষমতা তার নেই। এজন্য তিনি পদ্মা সেতুতে যাবেন না। যদিও তার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, তিনি পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণপত্র পেয়েছেন।

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য: সিপিডির সম্মানিত ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বিশ্বব্যাংকের সরে যাওয়া এবং নিজ অর্থায়নে পদ্মা সেতু করার কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এটির ফলে অর্থনৈতিক বিপর্যযয়ের কথাও বলেছিলেন। তবে জানা গেছে যে, ড. দেবপ্রিয় পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যাচ্ছেন না। সেতু বিভাগ সূত্র জানা গেছে যে, তাকে ইতোমধ্যে আমন্ত্রণপত্র পাঠানো হয়েছে। 

শাহদীন মালিক: শাহদীন মালিকও পদ্মা সেতুর সমালোচনা করেছিলেন। সেখানে তিনি সুশাসনের অভাবের কথা বলেছিলেন এবং বিশ্বব্যাংককে সরে যাওয়াটাকে দুর্ভাগ্যজনক বলেছিলেন। শাহদীন মালিকেও পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের দাওয়াত দেওয়া হয়েছে। কিন্তু শাহদীন মালিকের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বলছেন তিনি পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যাবেন না। 

অর্থাৎ যারা যারা পদ্মা সেতু হবে না, নিজে অর্থায়নে পদ্মা সেতু করা সম্ভব নয় বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন, তারা কেউই আসলে পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যাচ্ছেন না। তবে এটি কি লজ্জায়, না হতাশায় সেটি অবশ্য জানা যায়নি।

ভিলেন   পদ্মা সেতু   উদ্বোধন   প্রধানমন্ত্রী   শেখ হাসিনা  


মন্তব্য করুন


বিজ্ঞাপন