ঢাকা, বুধবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৪ ফাল্গুন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

অভ্যাস-বদঅভ্যাসের প্রশ্নে ফরিদীর উত্তর

বিনোদন ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০ বৃহস্পতিবার, ০৮:০০ এএম
অভ্যাস-বদঅভ্যাসের প্রশ্নে ফরিদীর উত্তর

চলচ্চিত্রে কিভাবে এলেন? 

পরিচালক খোকনের সাথে।

প্রশ্নকর্তা শুধরে দিলেন, না মানে এফডিসিতে কিভাবে?

‘বেবীটেক্সিতে করে’- তার সোজা সাপ্টা উত্তর।

এরকম অকপট সোজাসাপ্টা উত্তর সবসময় দিতেন হুমায়ুন ফরিদী।

বেসরকারী এক টেলিভিশনে একবার হুমায়ুন ফরিদীর একটি সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। উপস্থাপক ছিলেন লেখক ইমদাদুল হক মিলন। সেই সাক্ষাৎকার থেকেই কিছু কথা তুলে ধরছি। প্রথমেই তাকে জিজ্ঞাসা করা হয় যে, তিনি নাকি দিনে ৪-৫ বার ভাত খান। এ প্রশ্নের জবাবে ফরিদী বলেন, তিনি আসলে অল্প আহার করেন। মানুষ তিন বেলায় যা খায়, তিনি অল্প অল্প করে ৪-৫ বারে তা খান। তবে প্রতিবার যে ভাত খান তা ঠিক নয়। আইটেম হিসেবে রুটি, সবজিও খান তিনি।

এরপর প্রশ্ন করা হয় তার নাম নিয়ে। তিনি বলেন ‘ফরিদী’ লেখা সহজ বলেই তিনি শব্দটি এভাবে লেখেন, এছাড়া বিশেষ কোন কারণ নেই। আর তার মার নাম ছিল ফরিদা ইসলাম, সেখান থেকেই তার নামকরণ হয়েছে।

এরপর তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, তার অভিনয় করাটা তার পরিবার দ্বারা কোনভাবে প্রভাবিত কিনা। তিনি এর উত্তরে ‘না’ বলেন। এবং আরও বলেন, তার বাবা একবার অভিনয় করেছিলেন। তবে তার পরিবার থেকে তিনি প্রভাবিত হননি।

যুদ্ধের পর নৈরাশ্য থেকেই তিনি অভিনয়ে যোগ দেন। অনেকে বলে তিনি যাত্রায় অভিনয় করতেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন, তিনি শুধু এক মৌসুম যাত্রায় কাজ করেছেন। যাত্রার মাধ্যমে তার অভিনয় জীবন শুরু এটা ভুল কথা।

একজন ভালো অভিনেতা দিনের চব্বিশ ঘণ্টাই অভিনয় করে চলেন,’ বলতেন তিনি। কিন্তু তিনি আমাদের ছেড়ে ওপারে চলে গেলেন চিরতরে, এটা কোন অভিনয় নয়। সত্যিই তিনি চলে গেলেন আমাদের উদাস করে। তাকে আর আমরা কখনও ফিরে পাব না।

নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ আক্ষেপ করে প্রয়াত নন্দিত অভিনেতা হুমায়ুন ফরিদী সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘আচ্ছা, এই মানুষটি কী অভিনয়কলায় একটি একুশে পদক পেতে পারেন না! এই সম্মান কী তার প্রাপ্য নয়?’ বেঁচে থাকতে ফরিদী তা পাননি। তবে মরণোত্তর একুশে পদক পেয়েছেন।

"আপনি সিগারেট খান কেন ?" তিনি প্রতিউত্তর করলেন, "এনজয় করি, তাই" উপস্থাপিকা বললেন, "কিন্তু আপনি তো জানেন, ধূমপান খারাপ। তারপরও কেন করেন ?" একটুক্ষণ চুপ থেকে তিনি বললেন, "মানুষ তো অনেক সময় জেনে শুনেও খারাপ কিছু করে। ক্ষতিকারক জেনেও খায়। আমার ব্যাপারটাও অনেকটা ওরকম।

অভিনয় দিয়ে সমস্ত মানুষের মন জয় করা চাট্টিখানি কথা নয়। কিন্তু সে কাজটি অবলীলায় করে দেখিয়েছেন ফরিদী। খলচরিত্রে অভিনয় করেও মানুষের মন জয় করতে পেরেছেন এমন অভিনেতা বাংলাদেশে হাতেগোনা যে কয়েকজন আছেন, তাদের মধ্যে হুমায়ুন ফরিদী অন্যতম। একজন অসাধারণ মানুষের হয়েও খুব সাধারণ জীবনযাপন, জীবন সম্পর্কে পরিষ্কার বোধ তাকে মানুষের আরও কাছে নিয়ে গিয়েছিল। নির্দ্বিধায় সবার সাথে মিশতে পারার গুণ সবার থাকেনা। হুমায়ুন ফরিদীর সেই গুণ ছিল। এসব কারণে অভিনেতা হিসেবে তো বটেই, মানুষ হিসেবেও হুমায়ুন ফরিদী ছিলেন সবার শ্রদ্ধার পাত্র। বলা যায়, একজন আইকন।

নিজেই বলেছেন যে তার জীবন সম্বন্ধে অনেকের ভুল ধারণা আছে। সে ভুল ধারণা ভেঙ্গে দিতেও চেয়েছিলেন। বলেছিলেন "প্রেমে পড়া" জীবনের সব চেয়ে মধুর উপাদানগুলোর মধ্যে অন্যতম। নিজেও স্বীকার করেছেন, জীবনে বহুবার প্রেমে পড়েছেন। জীবনের শেষ দিকেও প্রেমে পড়েছিলেন, কিন্তু সেটা প্রকাশ করতে চাননি। এব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলেও বলেছিলেন হয়ত আমরা তাকে চিনি ।

বই পড়ার অনেক নেশা ছিল তার। কিংবদন্তীসম অভিনেতা হওয়া সত্ত্বেও অভিনয়ের বই পড়তেন সময় পেলে। খুব আনন্দের সময় গান গাওয়ার অভ্যাস থাকলেও, কবিতা আবৃত্তিও ভালোবাসতেন। জীবনানন্দ, রবীন্দ্রনাথের প্রতি আকর্ষণ ছিল ।

নায়ক হিসেবে কেন অভিনয় করেননি এমন প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন, "আমার চেহারা নায়কের মত না। অত সুন্দর না। ওরকম উঁচা লম্বাও না। তাই নায়কের চরিত্রে অভিনয় করিনি ।"

ইচ্ছাকৃত ভাবে খলচরিত্রে অভিনয় কেন করেন, এমন প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, "খলচরিত্রে অভিনয় করলে যা খুশি তা করা যায়। কিন্তু নায়ক চরিত্রে অভিনয় করলে করা যায় না ।"

বাবা ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা। সে কারণে দেশের বহু জায়গা ঘুরেছেন। ১৯৬১ সালে দিলিপ কুমারের এক ছবি দেখছিলেন এক হলে। নায়কের আবির্ভাব হলে মানুষ হাততালি দিত, শিস বাজাত। এসব দেখে হুমায়ুন ফরিদীর মাঝেও ইচ্ছে জাগে অভিনেতা হওয়ার ।

টিভিতে অভিনয় করতে করতে খ্যাতির চূড়ায় উঠলেও, স্রেফ টাকার জন্য চলচিত্রে অভিনয়ে নামেন। এ তার নিজের কথা। জীবনধারনের জন্য টাকার দরকার। আর সে জন্যই চলচিত্রে অভিনয়। অভিনয় ছাড়া আর কিছু পারতেন না বলে মন্তব্য করেছিলেন এই অভিনয় গুরু।

স্বাধীনতার পর রমনায় প্রথম স্ত্রী মিনু ওরফে নাজমুন আরা বেগমের সাথে বেলী ফুলের মালা বদল করে বিয়ে করে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন। সে মালা ছিড়ে বিয়ে করেছিলেন সুবর্ণা মুস্তফাকে। মিনু ছিলেন সহপাঠীর বোন।হুমায়ুন ফরীদি এ প্রসঙ্গে বলেছিলেন, শুধু সহপাঠীর বোনই নন, তিনি প্রথমত প্রেমিকা, দ্বিতীয়ত ছিলেন স্ত্রী। মিনু আমার জীবনে না এলে হয়তো বোহেমিয়ান জীবন থেকে ফিরে আসা হতো না। হতে পারতাম না আজকের ফরীদি। জীবনের শেষ অংকে এসে ২০০৮ সালে স্ত্রী সূবর্ণা মুস্তফার সাথেও ছাড়াছাড়ি হয়। প্রথম স্ত্রীর গর্ভে একটি সন্তান রয়েছে, তার নাম সারারাত ইসলাম দেবযানী।

প্রাক্তন স্ত্রী সুবর্ণা মুস্তাফা সম্পর্কে কোন মন্তব্য বা প্রশ্নের উত্তর দিতে অপারগতা প্রকাশ করতেন শেষের দিকে। কিন্তু বোঝা গিয়েছিল, নিজেকে মৃত্যুর আগে বড় বেশি একা বোধ করেছিলেন এই দিকপাল অভিনেতা ।

মৃত্যুকে ভয় নয়, বরং বরন করে নিতে বলতেন তিনি। তার মতে, জন্মিলে মরিতে হবেই। তাহলে এ অবশ্যম্ভাবীকে ভয় করে কি লাভ। মৃত্যুকে আনন্দের সাথে বরন করে নিতে বলতেন তিনি ।

এক সাক্ষাৎকারে মৃত্যু নিয়ে তিনি বলেছিলেন, মৃত্যুর মতো এতো স্নিগ্ধ, এতো গভীর সুন্দর আর কিছু নেই। কারণ মৃত্যু অনীবার্য, তুমি যখন জন্মেছো তখন মরতেই হবে। মৃত্যুর বিষয়টি মাথায় থাকলে কেউ পাপ করবে না। যেটা অনীবার্য তাকে ভালোবাসাটায় শ্রেয়।

তিনি ওই অনুষ্ঠানে আরও বলেন, মৃত্যুকে ভয় পাওয়াটা মূর্খতা। জ্ঞানীরা মৃত্যুকে ভয় পায় না। মৃত্যুকে আলিঙ্গন করো। গ্রহণ করো, বরণ করে নাও তাহলে দেখবে জীবন কত সুন্দর।

মানুষের অসময়ে চলে যাওয়া নিয়ে কষ্ট প্রকাশ করে বলেন, মানুষের খুব তাড়াতাড়ি চলে যাওয়াটা কষ্টের। সঠিক সময় মানুষের মৃত্যু বরণ করাটায় আন্দোলিত হয়,তবে খুশি হয় না। মানুষ কখনও বৃদ্ধ হয় না। মানুষ মনে মনে ২৮ বছরে থেকে যায়। দূরআশা ভালো জিনিস না। আশা করো ক্ষমতার ভিতরে। যা অর্জন করতে পারবে তাই করো। এই আশা নিয়েই মানুষ বাঁচে।

২০১২ সালের ১৩ই ফেব্রুয়ারি, ৬০ বছরে বসন্তের প্রথম সকালে পাড়ি জমান না ফেরার দেশে। সেই থেকে শোবিজ অঙ্গনে এক আফসোসের নাম হুমায়ুন ফরিদী। এই স্থায়ী আফসোসটা ক্ষনে ক্ষনেই জেগে উঠে। কান পাতলেই শোনা যায়। কি অভিনেতা কি পরিচালক, হোক সেটা সিনেমা, নাটক, টেলিফিল্ম অথবা মঞ্চের- সবারই এক আফসোস- এমন শক্তিমান অভিনেতা ছাড়া মনের মতো চরিত্র ফুটিয়ে তোলা মুশকিল। সেই মনের মতো চরিত্রটি ফুটিয়ে তোলার মানুষটি আর নেই! সবার দীর্ঘশ্বাস- ‘এ দেশে এ ক্যারেক্টার কেবল ফরিদী ভাই-ই পারতেন। কিন্তু ফরিদী ভাই তো…