ইনসাইড থট

আস্থাশীল, টেকসই পুঁজিবাজার গড়তে চাই


Thumbnail

রূপকথা নয়, রূপান্তরের বাংলাদেশ। ক্ষুধা, দারিদ্র্যের বৃত্ত ভেঙে, সব আশঙ্কা পেছনে ফেলে বর্তমান বাংলাদেশ অপরাজেয়-অপ্রতিরোধ্য এক নতুন বাংলাদেশ। শ্যামল-সুন্দর নদীতীরের কোটি মানুষের অদম্য শক্তির উন্মাদনাই স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে রূপান্তরের বাংলাদেশের নতুন পরিচয়। অর্থনীতি, উদ্যোগ, শিল্প, সংস্কৃতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যে প্রশ্নাতীত সাফল্যের হাত ধরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অপূর্ব মেলবন্ধন এখন বাংলাদেশ।

তবে মহামারি করোনাভাইরাসের আঘাত শেষ না হতেই ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ, বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির  থাবা পুরো বিশ্বের অর্থনীতিকে টালমাটাল করে দিয়েছে। এর উত্তাপ লেগেছে বাংলাদেশেও। এরই মধ্যে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ঝড়ে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট অর্থনীতিকে চরম ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে সর্বস্তরের মানুষের জীবনযাপনে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষ এখন চরম ভোগান্তিতে রয়েছে। তাদের আয় নেই, অথচ খরচ বেড়েছে।

মূল্যস্ফীতি আর বাড়তি খরচের এই ক্রান্তিকালে সাধারণ মানুষ ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের নিরাপদ আয়ের কেন্দ্র হতে পারত পুঁজিবাজার। একটি পরিণত, আধুনিক ও স্থিতিশীল পুঁজিবাজার থাকলে মূল্যস্ফীতি বাড়লেও একে মোকাবেলার শক্তি পেত মানুষ। দুঃখজনক হলেও সত্য, সেটি করা সম্ভব হয়নি।   

তবে এখনো সব কিছু শেষ হয়ে যায়নি। আমাদের সামনে সুযোগ এসেছে ঘুরে দাঁড়ানোর। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সমৃদ্ধ-স্বনির্ভর সোনার বাংলা গড়তে হলে আর্থিক খাতের অন্যতম অংশ পুঁজিবাজারকে আমূল বদলে দিতে হবে। এ অবস্থায় ত্রাতা হয়ে এগিয়ে আসতে চাই আমরা। সেই লক্ষ্য সামনে রেখে বসুন্ধরা গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান এবিজি লিমিটেড চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার বা কৌশলগত বিনিয়োগকারী হওয়ার আগ্রহ দেখায়। আনন্দের বিষয় হলো, আমরা সেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য পূরণের দিকে পা বাড়াতে যাচ্ছি। এখন আমাদের লক্ষ্য থাকবে, কিভাবে এই পুঁজিবাজারকে সর্বসাধারণের জন্য সমান সহায়ক আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়।

দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী হিসেবে বসুন্ধরা গ্রুপ শুধু ব্যবসা নয়, মানুষের ভালো-মন্দ বিবেচনায় রাখে। আমাদের স্লোগানই হলো ‘দেশ ও মানুষের কল্যাণে’। আমার বড় ভাই বসুন্ধরা গ্রুপের কো-চেয়ারম্যান সাদাত সোবহান তানভীর এই স্লোগানটি ঠিক করে দিয়েছিলেন।

সেই থেকে আমরা সবাই এই বাক্যটিকে ব্রত হিসেবে নিয়েছি। আমাদের একটি বড় লক্ষ্য হলো, দেশের মানুষের কল্যাণ সাধন করা। নানাভাবে আমরা তা করে যাচ্ছি। তবে আর্থিক খাত তথা পুঁজিবাজারের মাধ্যমে মানুষের কল্যাণে কিছু কাজ করার সুযোগ পেয়ে ভালো লাগছে। আশা করি, এখানেও আমরা লক্ষ্য পূরণে সমর্থ হব।

এরই মধ্যে আমরা কাজ শুরু করে দিয়েছি। সিএসইকে প্রযুক্তিবান্ধব করে তুলতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজে লাগানো হচ্ছে। বিশেষ করে আধুনিক কারিগরি ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে উন্নত ও প্রযুক্তিবান্ধব করে পুঁজিবাজারকে দেশের প্রত্যেকটি মানুষের হাতের মুঠোয় এনে দেওয়া আমাদের অন্যতম লক্ষ্য, যাতে করে মানুষ তাদের সঞ্চিত ৫-১০ হাজার টাকাও দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগ করতে পারে। এখান থেকে মুনাফা করতে পারে। কোনো ব্যাংকেও যেন অলস টাকা পড়ে না থাকে। অলস টাকা অর্থনীতির জন্য স্বস্তিদায়ক বিষয় নয়।

বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশের মানুষ ব্যাংক-বীমার পাশাপাশি পুঁজিবাজারে দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগ করে, যা তাদের আয়ের ভিন্ন একটি উৎসও বটে। এই আয় থেকে বছর শেষে বা হলিডেতে ঘুরতে বাড়তি টাকা ব্যয় করতে পারে তারা। কিন্তু আমাদের পুঁজিবাজারে ১৯৯৬ ও ২০১০ সালের বড় দুটি ধসের ঘটনা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ভীতসন্ত্রস্ত করে তুলেছে। মানুষ চরমভাবে ঘাবড়ে গেছে। এমনকি পুঁজিবাজারের নাম শুনলেই অনেকের মনে নেতিবাচক প্রশ্নের উদয় হয়। বেশির ভাগ মানুষই এখন পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে আস্থা পায় না। এমনকি বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও আমাদের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে ভয় পায়। মূলত পর্যাপ্ত তথ্যের ঘাটতি, দুষ্টচক্রের কারসাজির ভীতি ও অপরাধীদের শাস্তি না হওয়ায় এমনটি হচ্ছে।

দুটি ঘটনা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আতঙ্কগ্রস্ত করলেও তাদের আস্থা ফেরানোর খুব কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি। আমরা সুষ্ঠু কর্মপরিকল্পনা করে, সহজ পদ্ধতিতে মানুষের মনে হারানো ভরসার প্রদীপ জ্বালিয়ে দিতে চাই। তারা যেন আবারও পুঁজিবাজারকে বিশ্বাস করে, বিনিয়োগ করে। এটি যেন তাদের কায়ক্লেশের সংসারজীবনে নিয়ামকের ভূমিকা রাখে। চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার বা কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসেবে এবিজি লিমিটেড সবার আগে তথ্যের সহজ প্রাপ্তি নিশ্চিতে কাজ করবে। পাশাপাশি সিএসইর দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পুঁজিবাজারের নিয়মিত লেনদেনে নজরদারির ব্যবস্থা করবে। যেন কেউ কৌশলে বিনিয়োগকারীদের টাকা হাতিয়ে নিতে না পারে। এ জন্য অবশ্যই পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সহযোগিতা প্রয়োজন হবে।

আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জে (এনএসই) দৈনিক গড়ে ২২ হাজার ৭২৪ কোটি রুপি লেনদেন হয়। অথচ বাংলাদেশের দুটি স্টক এক্সচেঞ্জে দৈনিক গড় লেনদেন হাজার কোটিরও নিচে। এখন অনেকেই বলবেন, তাদের জনসংখ্যা প্রায় ১৪০ কোটি, ওদের অর্থনীতির পরিধি বড়, ওদের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কম্পানির সংখ্যা বেশি। কিন্তু আমাদের জনসংখ্যাও তো সাড়ে ১৬ কোটি ছাড়িয়ে। আমরা তো বিনিয়োগের জনসংখ্যার আনুপাতিক হারের দিক থেকেও পিছিয়ে আছি! তাহলে আমাদের লেনদেন কেন তাদের সাত ভাগের এক ভাগ হবে না? আমাদের পুঁজিবাজারে কেন বড় মূলধনী কম্পানিগুলো তালিকাভুক্ত হবে না? আমাদের পুঁজিবাজারে কেন বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে না? কেন আস্থা ফেরানো যাবে না? আমি মনে করি এটা সম্ভব।

এনএসই নিয়ে একটি তথ্য জানাই, ২০২১ সালে করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতির মধ্যেও বিশ্বের বৃহত্তম ‘ডেরিভেটিভ এক্সচেঞ্জ’ হয়েছিল ভারতের ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ (এনএসই)। আন্তর্জাতিক সংস্থা ফিউচারস ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন (এফআইএ) পরিচালিত পরিসংখ্যানে ওই তথ্য উঠে এসেছিল। পাশাপাশি ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন অব এক্সচেঞ্জেসের পরিসংখ্যানেও ট্রেডের সংখ্যার ভিত্তিতে নগদ ইকুইটিতে এনএসই বিশ্বের চতুর্থ স্থানে রয়েছে। আমরা আছি তালিকার একেবারে শেষের দিকে। এর কারণ হচ্ছে পরনির্ভরশীলতা। প্রযুক্তির জন্য আমাদের উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। নতুন কিছু শুরু করতে গেলে প্রথমেই বলা হয়, আমাদের দিয়ে সম্ভব নয়। কিন্তু কেউ তো মায়ের গর্ভ থেকে সব কিছু শিখে আসে না। নতুন কাজ, নতুন চ্যালেঞ্জ, নতুন অভিজ্ঞতা। প্রয়োজনে আমরা কাউকে পরামর্শক নিয়োগ দিয়ে হলেও কাজ আদায় করে নেব। কিন্তু কাজটির দায়িত্বে আমাদের থাকতেই হবে। না হলে আমাদের দেশে আয় করে, এ দেশের টাকা বিদেশে পাচার করে নিয়ে যাবে বহুজাতিক কম্পানিগুলো।

খেয়াল করে দেখুন, বাংলাদেশে ব্যবসারত টেলিকম কম্পানিগুলোর মধ্যে গ্রামীণফোনের গ্রাহকসংখ্যা আট কোটি ৪০ লাখ, রবি আজিয়াটার গ্রাহকসংখ্যা পাঁচ কোটি ৪৮ লাখ, বাংলালিংক ডিজিটাল কমিউনিকেশন লিমিটেডের তিন কোটি ৮৫ লাখ। সেখানে বাংলাদেশ সরকারের মালিকানাধীন টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেডের গ্রাহকসংখ্যা মাত্র ৬৭ লাখ। বাংলাদেশ সরকারের আইনের পরিপালন করে অন্য বহুজাতিক কম্পানিগুলো টেলিকম ব্যবসা করে কোটি কোটি টাকা বিদেশে নিয়ে গেলেও টেলিটক সেই প্রতিযোগিতায় নেই। এর মূল কারণই হলো ‘আমরা পারব না’—এই ভীতি। একই সঙ্গে বিদেশি কম্পানিগুলোর প্রতি আমাদের বাড়তি আগ্রহ।

বর্তমানে দেশে সীমাহীন ডলারসংকটের পেছনেও বহুজাতিক কম্পানিগুলো দায়ী। এই প্রতিষ্ঠানগুলো দেশে হাজার কোটি টাকার মুনাফা করলেও নতুন বিনিয়োগের পরিমাণ সীমিত। ফলে টাকা চলে যাচ্ছে বিদেশে। অথচ বিদেশি বহুজাতিক কম্পানিগুলোকে দেওয়া বিনিয়োগের সুবিধার অর্ধেকও যদি দেশীয় কম্পানিগুলোকে দেওয়া হতো, তবে আজকের পরিস্থিতি অন্য রকম থাকত। কারণ, আমরা ব্যবসা থেকে যে মুনাফা করি তা আবার দেশেই বিনিয়োগ করি। দেশীয় শ্রমবাজারই আমাদের প্রধান শক্তি।

বসুন্ধরা গ্রুপ সব সময়ই আমদানি বিকল্প দেশীয় পণ্য তথা দেশজ উৎপাদনে গুরুত্বারোপ করে আসছে। দেশের মানুষের প্রয়োজন মেটাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় অসংখ্য পণ্য এখানে উৎপাদন করে আসছে। শুধু তা-ই নয়, বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বহু পথ খুলেছে। দেশের ক্রান্তিকালে অন্যতম নিয়ামক হিসেবে ভূমিকা রাখতে আমরা বদ্ধপরিকর। দেশের আইন ও নীতিমালার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে আমরা গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে ভূমিকা রাখছি। একইভাবে পুঁজিবাজারেও আমরা ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে চাই, যাতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা আবার তাদের হারানো আস্থা ফিরে পায়।

কিন্তু বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোর বড় কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। সেরকম পদক্ষেপ নিতে চাইলে গেল বছরই ছিল অত্যন্ত মোক্ষম সময়। ২০২০ সালে করোনা সংক্রমণ শুরু হলে সব কিছু স্থবির হয়ে পড়ে। ওই পরিস্থিতির মধ্যেও ২০২১ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৩৬৮টি কম্পানি ও ফান্ডের মধ্যে দর বেড়েছিল ৩০০টির। এর মধ্যে ৭০টি কম্পানি ও ফান্ডের শেয়ারদর বেড়েছিল ১০০ শতাংশের বেশি। পুঁজিবাজারের এমন নজিরবিহীন উত্থানের পরও আমরা বিনিয়োগকারীদের আগ্রহী করে তুলতে পারিনি। বা যারা ওই সময় পুঁজিবাজারে এসেছে তারাও পরবর্তী সময়ে জুজুর ভয়ে সাইডলাইনে চলে গেছে। কিন্তু আমরা যদি পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকে নিরাপদ করতে পারতাম তবে মধ্যবিত্তদের বাড়তি আয়ের উৎস হতে পারত চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ।

আমাদের দেশে বিনিয়োগ করে বহুজাতিক কম্পানিগুলো মুনাফা করে হাজার কোটি টাকা সরিয়ে নিলেও বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগের তেমন আধিক্য নেই। সর্বশেষ গত সেপ্টেম্বরে সিএসইতে মাত্র এক কোটি ৪১ লাখ টাকার বিনিয়োগ এসেছে। একই সময়ে ডিএসইর বিদেশি বিনিয়োগ নেমে আসে গেল সাত বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে। এই অবস্থার পরিবর্তন আনতে হবে। সিএসইতে কমোডিটি এক্সচেঞ্জ পাশাপাশি ডেরিভেটিভ ও অপশন মার্কেটও চালু করার জন্য প্রস্তুত করা হবে। আজ যে স্বপ্নের যাত্রা শুরু হচ্ছে তার পুরোপুরি বাস্তবায়ন হতে সময় লাগবে তিন বছর। ৩৬ মাস পর আপনারা নতুন এক সিএসই দেখবেন। যেটা হবে আরো আধুনিক, আরো নিরাপদ। থাকবে পুরোপুরি ডিজিটালাইজড অটোমেশন।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগের সঙ্গে সঙ্গেই তা সেটলমেন্ট হয়ে যায়। অর্থাৎ ক্রেতা শেয়ার বুঝে পান, আর বিক্রেতা বুঝে পান অর্থ। কিন্তু আমাদের সেটলমেন্ট সাইকেল এখনো টি-২। অর্থাৎ শেয়ার কেনার দুই দিন পর শেয়ারটি বিক্রি করা যায়। একইভাবে শেয়ার বিক্রির টাকাও দুদিন পর বিনিয়োগকারীর অ্যাকাউন্টে পৌঁছায়। মাঝের সময়ে টাকাটা থাকে ব্যাংকিং চ্যানেলে। এই সময়ে অর্থগুলো ব্যবহার করে মুনাফা হাসিল করছে ব্যাংকগুলো। অথচ বিনিয়োগকারীরা এই অর্থের কোনো সুবিধাই পান না। আমাদের ট্রেড সাইকেল পরিবর্তন করা উচিত। এবিজি লিমিটেড এই অবস্থা পরিবর্তনে কাজ করবে। বিনিয়োগকারীরা নিজেদের ইচ্ছামতো যখন খুশি শেয়ার কিনবেন, যখন খুশি বিক্রয় করবেন। এতে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা পুঁজিবাজারে আসবেন।

সেকেন্ডারি মার্কেটের পাশাপাশি আমাদের প্রাইমারি মার্কেট ও স্মলক্যাপ (ছোট মূলধনী কম্পানি) মার্কেটেও সংস্কার আনতে হবে। কারণ, নামসর্বস্ব কম্পানিগুলো ভুয়া প্রসপেকটাস দাখিল করে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। এর সঙ্গে ইস্যু ম্যানেজার ও অডিট কম্পানিগুলোর সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে অনেকেই মনে করেন। কিন্তু সঠিক তদন্তের মাধ্যমে এই ইস্যুগুলো বিনিয়োগকারীদের সামনে উপস্থাপন করা হয়নি। ফলে অনেক কম্পানি পুঁজিবাজারে আসার পর দেউলিয়া হয়ে গেলেও বিনিয়োগকারী অর্থ ফেরত পাননি। এমন পরিস্থিতিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি ছাড়া মানুষের আস্থা ফেরানো সম্ভব নয়। এবিজি লিমিটেড ও সিএসই যৌথভাবে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থরক্ষায় কাজ করবে।

দেশে সরকারি-বেসরকারি বহু কম্পানি হাজার কোটি টাকা মুনাফা করলেও প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে পুঁজিবাজারে আসছে না। কারণ পুঁজিবাজারে এলে বছরে চারটি প্রান্তিকে আর্থিক হিসাব দিতে হবে, বিনিয়োগকারীদের সম্পদ ও আয়-ব্যয়ও দেখাতে হবে। বছর শেষে করতে হবে বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম)। ফলে ইচ্ছা করলেও কম্পানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অর্থপাচার কিংবা আত্মসাৎ করতে পারবেন না। স্বচ্ছতার আওতায় আসতে হবে। এটা তাঁরা করতে চান না। তাই সরকারের পক্ষ থেকে বড় মুনাফাধারী বহুজাতিক কম্পানির কর সুবিধা কমিয়ে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করা উচিত। এতে পুঁজিবাজারের মূলধন বাড়ার পাশাপাশি গভীরতাও বাড়বে। বিনিয়োগকারীরাও পুঁজিবাজারে আগ্রহ পাবে।

বড় কম্পানিগুলো যেমন পুঁজিবাজারে আসতে চায় না, ঠিক তেমনি কিছু কম্পানি পুঁজিবাজারে আসতে চাইলে তাদের নানা চড়াই-উতরাই পার হতে হয়। যেমন ধরুন—কোনো কম্পানি ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য অর্থ উত্তোলনের জন্য বিএসইসিতে আবেদন করেছে। কিন্তু কম্পানিটিকে অর্থ উত্তোলনের অনুমোদন দেওয়া হয় ২০২২ সালে। কিন্তু এর মধ্যেই কম্পানি ব্যাংকে ধারদেনা করে সম্প্রসারণের কাজ শেষ করেছে। এমনটি হওয়া উচিত নয়। নতুন কম্পানি তালিকাভুক্তির জন্য ওয়ানস্টপ সার্ভিস চালু করা উচিত। পাশাপাশি শুধু এনআইডি ও মোবাইল নম্বর দিয়ে অ্যাপের মাধ্যমে বিও অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ থাকা উচিত। এতে করে নতুন নতুন বিনিয়োগকারী যুক্ত হবেন।

সাধারণ বিনিয়োগকারীর পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্যও বিনিয়োগপ্রক্রিয়া সহজ করা উচিত। তাঁদের পুঁজিবাজারে আনতে শক্তিশালী একটি ইউনিট খুলতে হবে। এই ইউনিট থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে সরাসরি বিনিয়োগের জন্য প্রলুব্ধ করা হবে। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পুঁজিবাজারের বিনিয়োগ কৌশল শেখানোর পাশাপাশি তাঁদের সহজ শর্তে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের সুযোগ রাখতে হবে।

মোটাদাগে, বাংলাদেশ যেভাবে উন্নয়নের সোপানে নতুন নতুন সাফল্যের ভিত রচনা করছে, তার ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে একটি সুষম, সুশৃঙ্খল ও টেকসই পুঁজিবাজার গড়ে তুলতে হবে। আর এই লক্ষ্যে যত ধরনের সেবা ও সহায়তা প্রয়োজন সব নিয়েই বিনিয়োগকারীদের পাশে থাকতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বসুন্ধরার এবিজি লিমিটেড।

উন্নত বিশ্বের অর্থনীতি আজ ডিজিটাল অর্থনীতি। বাংলাদেশ সরকারের ভিশন-২০৪১ পূরণের লক্ষ্যে মূল ভূমিকা রাখবে এই ডিজিটাল অর্থনীতি। আর এ ক্ষেত্রে এবিজি লিমিটেড পুঁজিবাজারে প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ডিজিটাল অর্থনীতির দেশে রূপান্তরিত করতে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখবে। পুঁজিবাজার ডিজিটাইজেশনের মাধ্যমে আমরা চাই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করতে, যার মাধ্যমে অংশীদার হতে চাই ডিজিটাল অর্থনীতির বাংলাদেশ গড়তে।



মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

যেভাবে আওয়ামী লীগকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন শেখ মুজিব


Thumbnail

আওয়ামী লীগের ইতিহাস সংগ্রাম, সৃষ্টি, অর্জন ও উন্নয়নের ইতিহাস। আওয়ামী লীগ ছিল পাকিস্তানে প্রথম কার্যকর কোনো বিরোধী দল। শুধু তাই নয়, আওয়ামী লীগের যাত্রাই শুরু হয় বাঙালিদের স্বার্থের সত্যিকার ও আপসহীন প্রতিনিধি হিসেবে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার এক বছর ১০ মাসের মধ্যে পুরানো ঢাকায় ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন অনুষ্ঠিত এক রাজনৈতিক কর্মী সম্মেলনে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা। প্রতিষ্ঠার পর থেকে আওয়ামী লীগ গত ৭৩ বছর ধরে রাজনীতির অগ্রভাগে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। সে সময়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রে কোনো বিরোধী দল গঠন কিছুতেই সহজসাধ্য ছিল না। শাসকগোষ্ঠীর রক্ত চক্ষু আর সকল বাধা-প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে বিরোধী দল হিসেবে আওয়ামী লীগের শুধু প্রতিষ্ঠা লাভই সেদিন ঘটেনি, অতি দ্রুত এর জনপ্রিয়তাও বৃদ্ধি পেতে থাকে। কী করে এটি সম্ভব হলো? এর প্রতিষ্ঠার পটভূমিই বা কী? আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করতে ও এর মূল লক্ষ্য অর্জনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান কী ছিল?

৪০ এর দশকে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগ অভ্যন্তরীণভাবে দ্বি-ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়ে— সোহরাওয়ার্দী-হাশিম গ্রুপ বনাম ঢাকার নবাব পরিবারের খাজা নাজিমুদ্দীনের নেতৃত্বাধীন গ্রুপ, যা খাজা গ্রুপ নামে পরিচিত ছিল। এর একদিকে মধ্যবিত্ত, অন্যদিকে অভিজাত-জমিদারি স্বার্থের দ্বন্দ্ব। অনেকে একে ‘জনগণ’ বনাম ‘প্রাসাদ’ দ্বন্দ্ব হিসেবে আখ্যায়িত করেন। প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি ও দৈনিক আজাদ পত্রিকার স্বত্বাধিকারী মওলানা আকরম খাঁ ছিলেন খাজা গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত। মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় অবাঙালি নেতৃত্বের সমর্থন-সহানুভূতিও ছিল এদের প্রতি। সোহরাওয়ার্দী-হাশিম গ্রুপের পেছনে ছিল বাঙালি মধ্যবিত্ত ও ছাত্র-তরুণদের নিয়ে গঠিত এক বিশাল কর্মীবাহিনী। এ ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এরাই ছিলেন বাংলায় পাকিস্তান আন্দোলনের মূল শক্তি। সোহরাওয়ার্দীর প্রত্যক্ষ সমর্থন নিয়ে ১৯৪৩ সালে আবুল হাশিম বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের জেনারেল সেক্রেটারি নির্বাচিত হয়েছিলেন। এরপর বাংলায় লীগকে সুদৃঢ় সাংগঠনিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে তিনি নিজেকে সার্বক্ষণিকভাবে নিবেদিত করেন। তার প্রগতিশীল নেতৃত্বের কারণে শতশত ছাত্র-যুবক দলের সার্বক্ষণিক কর্মী হিসেবে দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসে। তাদের কাজ-কর্ম, থাকা-খাওয়া চালিয়ে নেওয়ার জন্য ছিল ‘পার্টি হাউজ’। ঢাকার ১৫০ মুগলটুলী পার্টি হাউজ ছিল পূর্ব বাংলার তরুণ লীগ কর্মীদের প্রধান কেন্দ্র। ১৯৪৪ সালে আবুল হাশিমের নির্দেশে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। খাজা গ্রুপের হেডকোয়ার্টার্স ঢাকার ‘আহসান মঞ্জিল’-এর বিপরীতে ‘মুগলটুলী ওয়ার্কার্স ক্যাম্প’ বা ‘পার্টি হাউজ’ গড়ে ওঠেছিল।

১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিম প্রথমে পাকিস্তানে না এসে ভারতে থেকে যান। এর মূলে ছিল মুসলিম লীগ কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বিদ্বেষী আচরণ। আনুষ্ঠানিকভাবে ভারত বিভক্তি ও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পূর্বেই ১৯৪৭ সালের ৫ আগস্ট কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নির্দেশে পূর্ব বাংলার জন্য মুসলিম লীগ সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে সোহরাওয়ার্দীর স্থলে লীগ হাইকমান্ডের প্রিয়ভাজন খাজা নাজিমুদ্দীন নতুন নেতা নির্বাচিত হয়ে পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হন। এমনকি, ১৯৪৮ সালের জুন মাসে সোহরাওয়ার্দী পেশাগত কারণে একবার ঢাকা এলে, তাকে জোর করে স্টিমারে তুলে ভারতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পাকিস্তানের গণপরিষদ থেকে তার সদস্যপদ পর্যন্ত বাতিল ঘোষণা করা হয়। যাহোক, এ সময় ১৫০ মুগলটুলী ওয়ার্কার্স ক্যাম্প বা পার্টি হাউজ ছিল সোহরাওয়ার্দী-হাশিম সমর্থক ছাত্র ও তরুণ কর্মীদের মিলন কেন্দ্র। এখান থেকে তারা ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মপন্থা স্থির করেন। এভাবে ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে গণতান্ত্রিক যুবলীগ এবং ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগ ও নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা লাভ করে (১৯৫৩ সালে সংগঠনের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দ বাদ দেওয়া হয়)। উল্লেখ্য, দেশ বিভাগের পর সেপ্টেম্বর মাসে (১৯৪৭) বঙ্গবন্ধু কলকাতা থেকে ঢাকায় ফিরে আসেন এবং প্রথমে ১৫০ মুগলটুলী পার্টি হাউজে ওঠেন।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর রাষ্ট্রের শাসকগোষ্ঠী সরকারি দল মুসলিম লীগকে কার্যত একটি ‘পকেট সংগঠন’ বানিয়ে রাখে। লীগের ত্যাগী, পরীক্ষিত নেতা-কর্মী, যাদের অধিকাংশ সোহরাওয়ার্দী-হাশিম গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত ছিল, তাদের দলে বা সরকারের কোথাও কোনো স্থান হলো না। উদ্ভূত অবস্থায় করণীয় স্থির করার লক্ষ্যে টাঙ্গাইল ও নারায়ণগঞ্জে প্রগতিশীল মুসলীম লীগ কর্মীদের দু’টি সভাও ডাকা হয়েছিল।

২. যে আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে পাকিস্তান আন্দোলনে বাঙালিরা সর্বাত্মক সমর্থন জ্ঞাপন ও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছিল, ১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান তাদের সেই প্রত্যাশিত রাষ্ট্র ছিল না। পাকিস্তান আন্দোলনের মধ্যে তাদের রাষ্ট্রভাবনা ছিল ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব অনুযায়ী ভারতের পূর্বাঞ্চলে (বর্তমান বাংলাদেশ ও তদ্সংলগ্ন এলাকা) একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। সে লক্ষ্যে দেশ বিভাগের প্রাক্কালে অবিভক্ত বাংলার সর্বশেষ মুখ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বঙ্গীয় মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশিম এবং কংগ্রেসের এককালীন কেন্দ্রীয় নেতা ও নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর অগ্রজ শরৎ চন্দ্র বসু, প্রাদেশিক কংগ্রেসের পার্লামেন্টারি দলের নেতা কিরণ শংকর রায়, কংগ্রেস নেতা ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, জে এম সেন গুপ্ত প্রমুখদের সঙ্গে নিয়ে পাকিস্তান ও ভারতের বাইরে তৃতীয় ‘স্বাধীন অখণ্ড বাংলা রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রতিশ্রুতিশীল ছাত্র-তরুণ নেতা হিসেবে এ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত থেকে কলকাতায় স্বাধীন বাংলার পক্ষে একাধিক ছাত্র-জনতার সমাবেশে বক্তব্য রাখেন। শর্তসাপেক্ষে ব্রিটিশ সরকারের ‘স্বাধীন অখণ্ড বাংলা রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠায় এক ধরনের সম্মতি থাকলেও, কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ নেতৃত্বের অবাঙালি হাই কমান্ডের মধ্যে ঐকমত্যের অভাবে সে উদ্যোগ সফল হতে পারেনি।

শুরু থেকেই পাকিস্তান রাষ্ট্রে বাঙালিদের ওপর নেমে আসে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শাসন-শোষণ, আঞ্চলিক বৈষম্য ও জাতি-নিপীড়ন। পাকিস্তানের স্বাধীনতাকে বঙ্গবন্ধু আখ্যায়িত করেছিলেন ‘ফাঁকির স্বাধীনতা’ বলে। সামগ্রিকভাবে পাকিস্তান রাষ্ট্রে বাঙালিদের অবস্থা দাঁড়ায়, বঙ্গবন্ধুর ভাষায়, ‘এক শকুনির হাত থেকে আরেক শকুনির হাতে পড়া’র মতো। বাংলাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’— পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর এই ভাষানীতি ঘোষণার মধ্য দিয়ে তাদের বাংলা ও বাঙালি বিদ্বেষী ঔপনিবেশিক চরিত্রের প্রকাশ ঘটে। এদিকে রাজনৈতিক ভিন্ন মতাবলম্বীদের ওপর শাসকগোষ্ঠীর জুলুম-নির্যাতন চলছিলই। এ অবস্থায়, বিভাগ-পূর্ব বঙ্গীয় মুসলিম লীগের সোহরাওয়ার্দী-হাশিম সমর্থকরা একটি পৃথক রাজনৈতিক সংগঠনের আবশ্যকতা উপলব্ধি করতে থাকেন। অবিভক্ত বাংলায় মুসলিম লীগ ও পাকিস্তান আন্দোলনের প্রধান সংগঠক হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এ সময়ে ভারতে অবস্থান করলেও, ঢাকার মুগলটুলী ওয়ার্কার্স ক্যাম্পের কর্মী-সংগঠকদের সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। এদিকে, পাশাপাশি সময়ে আরও দু’টি ঘটনা বিরোধী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠাকে ত্বরান্বিত করেছিল। এর একটি হলো, ১৯৪৯ সালের এপ্রিল মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের আন্দোলনে নেতৃত্বদানের কারণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ অন্য ছাত্র নেতাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার, অন্যটি, একই মাসে টাঙ্গাইলের উপনির্বাচনে ক্ষমতাশীল মুসলীম লীগের প্রার্থী জমিদার পরিবারের খুররম খান পন্নীকে পরাজিত করে ১৫০ নম্বর মুগলটুলী পার্টি হাউজের প্রগতিশীল লীগ কর্মীদের প্রধান সংগঠক শামসুল হকের (টাঙ্গাইলের শামসুল হক নামে খ্যাত) বিজয় অর্জন। শেষের ঘটনাটি মুসলীম লীগ সরকারবিরোধী লীগ নেতা-কর্মীদের বিপুলভাবে অনুপ্রাণিত করে।

৩. পুরানো ঢাকায় যে রাজনৈতিক কর্মী সম্মেলনে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা, তার জন্য ঢাকা শহরের কোথাও হল বা স্থান না পাওয়া যাওয়ায় কে এম দাস লেনের কে এম বশির ওরফে হুমায়ুন সাহেবের প্রাইভেট বাড়ি ‘রোজ গার্ডেন’-এ ১৯৪৯ সালের ২৩ ও ২৪ জুন ওই কর্মী সম্মেলন আহ্বান করা হয়। আসাম প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সাবেক সভাপতি ও মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খাঁন ভাসানী মুসলীম লীগ সরকারবিরোধী ত্যাগী নেতাকর্মীদের সঙ্গে পূর্বেই একাত্মতা ঘোষণা করেন। সম্মেলন যেন সফল না হতে পারে, সেজন্য সরকার ও ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের অপচেষ্টার অন্ত ছিল না। পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক মুসললিম লীগের সাধারণ সম্পাদক ইউসুফ আলী চৌধুরী, ঢাকা জেলা মুসলিম লীগের সভাপতি নবাব খাজা হাবিবুল্লাহ এবং সিটি মুসলিম লীগের সভাপতি সৈয়দ সাহেবে আলম ২১ এক বিবৃতিতে সম্মেলনের উদ্যোক্তাদের ‘ক্ষমতালোভী’, ‘পাকিস্তানের সংহতি বিনষ্টকারী’, ‘মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টিকারী’ ইত্যাদি অখ্যায়িত করে ওই সম্মেলনে যোগদান বা কোনোরূপ সংশ্লিষ্টতা না রাখার জন্য পূর্ব বাংলার মুসলমান জনগণ বিশেষ করে ঢাকাবাসীর উদ্দেশে যৌথ আহ্বান জানিয়ে বলেন—

‘মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সাহেবের দ্বারা আগামী ২৩ ও ২৪ জুন তারিখে ঢাকায় মুসলিম লীগ কর্মী সম্মেলনের নামে যে সভা আহূত হইয়াছে তাহার সহিত মুসলিম লীগের কোনো সম্পর্ক নাই। বস্তুত ইহা দলগত স্বার্থ ও ক্ষমতালাভের জন্য মুসলমানদের মধ্যে বিভেদের সৃষ্টির দ্বারা মুসলমান সংহতি নষ্ট করিয়া পাকিস্তানের স্থায়ীত্ব এবং অগ্রগতির পথে বাধা সৃষ্টি করিবার উদ্দেশ্যে আহূত হইয়াছে (আজাদ, ২২ জুন ১৯৪৯, পৃ ৬)।’

কর্মী সম্মেলনের পাঁচ দিন আগে তড়িঘড়ি করে ১৮ থেকে ২০ জুন কার্জন হলে (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক মুসলিম লীগের কাউন্সিল সম্মেলন আহ্বান করা হয়। ওই সম্মেলনেও সরকারবিরোধী লীগ কর্মী-সম্মেলন আহ্বানের নিন্দা ও মুসলমানদের তাতে যোগদান করা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়।

যা হোক, আতাউর রহমান খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত রোজ গার্ডেনের কর্মী সম্মেলনে প্রায় ৩০০ প্রতিনিধি যোগ দেন। অনেক রাজনৈতিক নেতাও যোগ দিয়েছিলেন, যাদের মধ্যে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, খয়রাত হোসেন এম এল এ, বেগম আনোয়ারা খাতুন এম এল এ, আলী আহমেদ খান এম এল এ, আল্লামা রাগীব আহসান, হাবিবুর রহমান চৌধুরী ওরফে ধনু মিয়া উল্লেখযোগ্য। সম্মেলনের প্রথম দিনেই মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে সভাপতি, টাঙ্গাইলের শামসুল হককে সাধারণ সম্পাদক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে (জেলে বন্দি অবস্থায়) যুগ্ম-সম্পাদক ও ইয়ার মোহাম্মদ খানকে কোষাধ্যক্ষ করে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ নামে নতুন রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করা হয় (বিস্তারিত দ্রষ্টব্য, হারুন-অর-রশিদ, মূলধারার রাজনীতি: বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কাউন্সিল ১৯৪৯-২০১৬, বাংলা একাডেমি ২০১৬)। ‘আওয়াম’ শব্দের অর্থ জনগণ, আর ‘লীগ’ মানে ঐক্য বা সম্মিলনী। অর্থাৎ সরকারি মুসলিম লীগের বিপরীতে জনগণের প্রতিষ্ঠান হিসেবে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা। দলের প্রতিষ্ঠাকালীন সহ-সভাপতিরা ছিলেন আতাউর রহমান খান, আব্দুস সালাম খান, আলী আহম্মদ খান, আলী আমজাদ খান ও সাখাওয়াত হোসেন।

নতুন এ দলের জন্য ৪০ সদস্যের একটি ওয়ার্কিং কমিটি গঠন করা হয়। দলের নবনির্বাচিত কর্মকর্তা ছাড়াও বেগম আনোয়ারা খাতুন এম এল এ, খয়রাত হোসেন এম এল এ, আব্দুল হামিদ চৌধুরী, মোল্লা জালাল উদ্দিন আহমদ, খন্দকার মোশতাক আহমেদ, নারায়ণগঞ্জের আব্দুল আউয়াল, আলমাস আলী, শামসুজ্জোহা প্রমুখ এর সদস্য ছিলেন। সরকারি হয়রানি-গ্রেফতারের ভয়ে কমিটির বেশকিছু সদস্য অচিরেই বিবৃতি দিয়ে পদত্যাগ করেন। এদের মধ্যে সাখাওয়াত হোসেন ও এ কে এম রফিকুল ইসলাম ছিলেন। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য ছিলেন। তার আর্থিক অসুবিধা ও সরকারের অ্যাডভোকেট জেনারেলের চাকরিটি তার প্রয়োজন এ কথা বলে তিনিও ওয়ার্কিং কমিটি থেকে অব্যাহতি নেন।

রাজনৈতিক কর্মী সম্মেলন, নতুন দলের প্রতিষ্ঠা ও এর সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর নিজের সম্পৃক্ততা সম্বন্ধে এভাবে বর্ণনা করেন—

…পুরানা লীগ কর্মীরা মিলে এক কর্মী সম্মেলন ডাকল ঢাকায়, ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা ঠিক করার জন্য। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন সে সভা আহ্বান করা হয়েছিল… আমরা জেলে বসেই সে খবর পাই… আমরা সম্মেলনের ফলাফল সম্বন্ধে খুবই চিন্তায় দিন কাটাচ্ছিলাম। আমার সাথে যোগাযোগ করা হয়েছিল, আমার মত নেওয়ার জন্য। আমি খবর দিয়েছিলাম, “আর মুসলিম লীগের পিছনে ঘুরে লাভ নাই, এ প্রতিষ্ঠান এখন গণবিচ্ছিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এরা আমাদের… নিতে চাইলেও যাওয়া উচিত হবে না। কারণ এরা কোটারি করে ফেলেছে। একে আর জনগণের প্রতিষ্ঠান বলা চলে না। এদের কোনো কর্মপন্থাও নাই।” আমাকে আরও জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, আমি ছাত্র প্রতিষ্ঠান করব, না রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গঠন হলে তাতে যোগদান করব? আমি উত্তর পাঠিয়েছিলাম, ছাত্র রাজনীতি আমি আর করব না, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানই করব। কারণ বিরোধী দল সৃষ্টি করতে না পারলে এ দেশে একনায়কত্ব চলবে… সকলেই একমত হয়ে নতুন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গঠন করলেন; তার নাম দেওয়া হলো, ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী [মুসলীম] লীগ।’ মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি, জনাব শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক এবং আমাকে করা হল জয়েন্ট সেক্রেটারি। খবরের কাগজে দেখলাম, আমার নামের পাশে লেখা আছে, ‘নিরাপত্তা বন্দি’। (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃ. ১২০-১২১)।

‘মুসলিম’ শব্দ যুক্ত করে নব প্রতিষ্ঠিত দলের নামকরণ সম্বন্ধে বঙ্গবন্ধু বলেন—

আমি মনে করেছিলাম, পাকিস্তান হয়ে গেছে সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের দরকার নাই। একটা অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হবে, যার একটা সুষ্ঠু ম্যানিফেস্টো থাকবে। ভাবলাম, সময় এখনও আসে নাই। তাই যারা বাইরে আছেন তারা চিন্তাভাবনা করেই করেছেন (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃ ১২১)। উল্লেখ্য, আলোচ্য রাজনৈতিক কর্মী সম্মেলন সফল করতে পুরান ঢাকার দুই কৃতী সন্তান ও নিবেদিতপ্রাণ লীগ কর্মী শওকত আলী ওরফে শওকত মিয়া (১৫০ মুগলটুলী পার্টি হাউজের স্বত্বাধিকারী) ও ইয়ার মোহাম্মদ খান (কারকুন বাড়ি লেন) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। শুরুর দিকে শওকত আলীর বাড়িই ছিল আওয়ামী মুসলিম লীগের অফিস।

আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা উপলক্ষে আয়োজিত কর্মী সম্মেলনে শামসুল হক ‘মূল দাবি’ নামে একটি পুস্তিকা ছাপিয়ে বিবেচনার জন্য তা পেশ করেন। পরবর্তীতে কিছু পরিবর্তন-পরিমার্জন করে খসড়া ম্যানিফেস্টো আকারে তা গৃহীত হয়। এর প্রধান দিকসমূহ ছিল— পাকিস্তানের জন্য ফেডারেল বা যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা, পূর্ণ গণতন্ত্র, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান নিয়ে গঠিত দু’টি পৃথক আঞ্চলিক ইউনিট এবং এর জন্য পূর্ণ আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার, জনগণের সার্বভৌমত্ব, সকল সম্প্রদায়ের জন্য ধর্মীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও শিক্ষার সমান অধিকার, সভা-সমাবেশ-সংগঠনসহ পূর্ণ বাক-স্বাধীনতা, সার্বজনীন ভোটাধিকার, রাষ্ট্র কর্তৃক প্রত্যেকের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসার ও শিক্ষার ব্যবস্থা, প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করা, বিভিন্ন স্থানে পর্যাপ্ত কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন ও বিপুল সংখ্যক যুবকদের কারিগরি শিক্ষাদানের ব্যবস্থা, মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদান, সারাদেশে দাতব্য চিকিৎসালয় ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গরীবদের জন্য চিকিৎসার ব্যবস্থা, বৃদ্ধ, অনাথ, অক্ষম, দুঃস্থদের রক্ষণাবেক্ষণে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা, সর্বক্ষেত্রে নারীর সম অধিকার, মাতৃমঙ্গল, শিশু সদন ও শিশু-শিক্ষালয় প্রতিষ্ঠা, মাতৃত্বকালীন ছুটি, বিচার বিভাগকে শাসন বিভাগ থেকে পৃথক করা ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মুসলিম দেশসমূহের পাশাপাশি প্রতিবেশি রাষ্ট্রসমূহের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন, বিশ্ব শান্তি রক্ষা, পাট, চা, ব্যাংক, বীমা, যান-বাহন, বিদ্যুৎ, খনিজ সম্পদসহ প্রাথমিক শিল্প জাতীয়করণ, সমবায় ও যৌথ কৃষি ব্যবস্থা প্রবর্তন, ইসলামের সত্যিকার শিক্ষা ও নৈতিক মূল্যবোধ গ্রহণ, ইত্যাদি।

এছাড়া আশু লক্ষ্য ও কর্মসূচি হিসেবে বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ, কৃষকদের মধ্যে ভূমি বণ্টন, মূল শিল্প জাতীয়করণ, প্রশাসন ও সমাজ থেকে দুর্নীতি দূরীকরণ, প্রশাসনের ব্যয় হ্রাস, কেন্দ্র ও প্রদেশের মধ্যে রাজস্বের ন্যায্য বণ্টন ইত্যাদি তাতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

কর্মী সম্মেলনের পর দ্রুত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সাংগঠনিক বিস্তৃতি ঘটতে থাকে। পাকিস্তান সৃষ্টির পূর্বে বঙ্গীয় মুসলিম লীগের মধ্যে যে দু’টি ধারার সৃষ্টি হয়েছিল (যা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে), এর মধ্যে সোহরাওয়ার্দী-হাশিম সমর্থক হিসেবে পরিচিত মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আগত, পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত, বয়সে অপেক্ষাকৃত তরুণ প্রগতিশীল অংশের নেতাকর্মীরা জেলায়-জেলায় এ সময়ে নতুন প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতি সমর্থন জানিয়ে সংগঠিত হতে থাকে। স্বল্প সময়ের মধ্যে দেশজুড়ে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক রূপ লাভের ক্ষেত্রে এই বিশেষ অবস্থা খুবই অনুকূল হয়েছিল। এছাড়া বিভিন্ন গণদাবি, যেমন— বিদ্যমান খাদ্য সংকট নিরসনের ব্যাপারে সভা-সমাবেশ, ভুখা মিছিল ইত্যাদির মাধ্যমে সরকারের ওপর অব্যাহত চাপ প্রয়োগের নীতি গ্রহণ করায় নতুন এ দলের প্রতি দ্রুত জনসমর্থন বাড়তে থাকে।

পাকিস্তানি রাষ্ট্র কাঠামোর ভেতর প্রতিষ্ঠা লাভ করায় আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার শুরুতে নামের সঙ্গে ‘মুসলিম’ শব্দ যুক্ত রাখতে হয়েছিল। তবে ১৯৫৫ সালে বঙ্গবন্ধুর উদ্যোগে (তখন তিনি দলের সাধারণ সম্পাদক) দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দ বাদ দিয়ে সংগঠনের সদস্য পদ সবার জন্য উন্মুক্ত করা হয়। বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে একটি বিস্তারিত কর্মসূচিও গ্রহণ করা হয়, যা আগে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাই ছিল বাঙালিদের দল হিসেবে। এর চেতনামূলে ছিল বাঙালির জাতীয় মুক্তি বা স্বাধীনতা। স্বল্প সময়ের মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দলের নেতৃত্বের অগ্রভাগে চলে আসেন। ১৯৫২ সালে তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯৫৩-১৯৬৫ সাল পর্যন্ত ১৩ বছর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ১৯৬৬ সালে তিনি আওয়ামী লীগ কাউন্সিলে সভাপতি নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগকে তৃণমূল পর্যায় থেকে শক্তিশালী ভিতের ওপর দাঁড় করিয়ে বাঙালির জাতীয় মুক্তির মঞ্চে পরিণত করতে তিনি সর্বশক্তি নিয়ে আত্মনিয়োগ করেন। এমনকি এ জন্য ১৯৫৭ সালে মন্ত্রিত্বের পদ পর্যন্ত ছেড়ে দিয়ে তিনি দলের সাধারণ সম্পাদকের পদে নিজেকে বহাল রেখেছিলেন। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধোত্তর তার বাঙালির মুক্তি সনদ ৬-দফা কর্মসূচি (১৯৬৬) (দ্রষ্টব্য হারুন-অর-রশিদ, ‘আমাদের বাঁচার দাবি’ ৬-দফা’র ৫০ বছর, বাংলা একাডেমি ২০১৬), তার বিরুদ্ধে আগরতলা মামলা (১৯৬৮) মোকাবিলা, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ৭০-এর নির্বাচনে ৬-দফা প্রশ্নে বাঙালিদের আওয়ামী লীগের পক্ষে গণরায় বা ম্যান্ডেট লাভ ও বিপুল বিজয় অর্জন, ‘নির্বাচনের রায় বানচাল করতে ইয়াহিয়ার সামরিক জান্তার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর ২-২৫ মার্চ ১৯৭১ অসহযোগ আন্দোলনের ডাক, ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে স্বাধীনতার লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণে বাঙালিদের প্রতি আহ্বান, ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হওয়ার পূর্ব মুহূর্ত বঙ্গবন্ধুর সরাসরি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা, তাকে রাষ্ট্রপতি করে ১০ এপ্রিল ১৯৭১ গঠিত মুজিবনগর সরকারের নেতৃত্বে ৯ মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের মধ্যদিয়ে স্বাধীন বাঙালি জাতি ও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়। এরই সঙ্গে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার অন্তর্নিহিত চেতনা এবং বাঙালি ও বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ লালিত নিজস্ব স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্নের সফল বাস্তবায়ন ঘটে। আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও তাৎপর্য এখানেই।

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ আমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই ২০৪১ সালে বাংলাদেশ হবে ক্ষুধা, দারিদ্র, অশিক্ষা, সাম্প্রদায়িকতামুক্ত, উন্নত-সমৃদ্ধ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’। দেশের ঐতিহ্যবাহী, বৃহত্তম ও জনগণের দল আওয়ামী লীগের ৭৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এটিই দেশবাসীর প্রত্যাশা।

লেখক: সাবেক উপাচার্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়


আওয়ামী লীগ   শেখ মুজিব  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

স্বেচ্ছা পদাবনতি, এত ট্রল কেন?


Thumbnail

স্বেচ্ছায় ক্যাডার চাকুরী ছেড়ে দেয়ার অনেক নজির রয়েছে। কিন্তু স্বেচ্ছায় পদাবনতি। স্বেচ্ছায় ক্যাডার চাকুরী ছেড়ে নন ক্যাডার চাকুরী গ্রহণ। এসব খবর সচরাচর শোনা যায় না। সম্প্রতি বিসিএস তথ্য ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা ক্যাডার চাকুরী ছেড়ে দিয়ে সাব রেজিস্ট্রার হয়েছেন। সাব রেজিস্ট্রার পদটি নন ক্যাডার ভুক্ত। পদোন্নতির সম্ভাবনা সীমিত। কিন্তু এখানে নিজের অর্থনৈতিক উন্নতির অপার সম্ভাবনা। বিয়ের বাজারেও খুব দাম। অফিস কক্ষটিতে একটা আদালত ভাব রয়েছে। সভা কক্ষটি যেন একটি এজলাস। শান শওকত মন্দ নয়। আশে পাশে শুধু টাকা আর টাকা। বোধ করি সেজন্যই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিরাট হৈচৈ। সবাই তাকে নিয়ে ট্রল করছে। অনেকেই বলছেন, তিনি বুদ্ধিমান, তিনি স্মার্ট। টাকার খনির মালিক হবার জন্য তার এ স্বেচ্ছায় পদাবনতি।

স্বেচ্ছায় ক্যাডার চাকুরী অনেকেই ছাড়েন। তিনিও ছেড়েছেন। তাতে অবাক হবার কিছু নেই। তিনি ক্যাডার হবেন নাকি নন ক্যাডার হবেন, সেটি তার একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার। এখানে না জেনে শুনে ট্রল করার কোন যৌক্তিকতা দেখি না। ট্রলকারীদের বক্তব্যের সারাংশ হচ্ছে, তিনি দুর্নীতি করার জন্য সাব রেজিস্ট্রার হচ্ছেন। কারণ সাব রেজিস্ট্রার অফিসের দুর্নীতি সর্বজন বিদিত। বছর দুয়েক আগে টিআইবি'র এক জরিপে দেখা গেছে, ভূমি খাতের দুর্নীতি দেশে ষষ্ঠ স্থান অধিকার করেছে। প্রথম স্থানে রয়েছে পুলিশ বিভাগ। ভূমি খাতে সেবা নিতে এসে দুর্নীতির শিকার হয়েছে ৪৬.৩ শতাংশ খানা। ঘুষ দিয়েছে এমন খানার সংখ্যা ৩১.৫ শতাংশ। গড় ঘুষের পরিমাণ ৭ হাজার ২৭১ টাকা।

এমন তো হতে পারে, ভূমি খাতের এ সব দুর্নীতির কথা শুনে তার বিবেক দংশিত হয়েছে। তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিহাদ করার জন্য রেজিস্ট্রি অফিসে যোগ দিচ্ছেন! জাতিসংঘের সংজ্ঞায় যাদের বয়স ১৫ থেকে ২৯ বছরের মধ্যে, তাদেরই তরুণ বলা হয়। সেই হিসাবে তিনি বয়সে তরুণ। ‘দুর্জয় তারুণ্য দুর্নীতি রুখবেই’- তিনি হয়ত এ স্লোগানে বিশ্বাস করেন! তিনি হয়ত নিজ কর্মক্ষেত্র থেকে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যেতে চান! নিজের অর্থনৈতিক উন্নয়ন নাকি দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের জন্য তিনি স্বেচ্ছায় পদাবনতি বেছে নিয়েছেন, সেটি এখন একটি মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। আমরা ভালটাই বিশ্বাস করতে চাই। বিশ্বাস করতে চাই যে, এই তরুণ দুর্নীতির জন্য নয়, দুর্নীতি প্রতিরোধের জন্য স্বেচ্ছায় পদাবনতি বেছে নিয়েছেন।

বর্তমান সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছে। দুদক এ ব্যাপারে খুবই সজাগ। আয়কর বিভাগও পিছিয়ে নেই। সবার প্রত্যাশা, দুদক ও আয়কর বিভাগ স্বেচ্ছায় পদাবনতি গ্রহনকারী কর্মকর্তাকে শুরু থেকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখুক। তাহলে ভবিষ্যতে বোঝা যাবে তিনি কি দুর্নীতির করার মোহে আকৃষ্ট হয়ে স্বেচ্ছা পদাবনতি নিলেন, নাকি দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেহাদ করতে সাব রেজিস্ট্রার হলেন।

আবার কেউ কেউ বলছেন, তথ্য ক্যাডারে নাকি ১০ বছরেও পদোন্নতি হয় না। তাতে আর্থিক সংকটে ভুগতে হয়। মর্যাদা সংকটও হয়। শুধু তিনি এক নন, আরো অনেকেই নাকি তথ্য ক্যাডারের চাকুরী ছাড়ার কথা ভাবছেন। বিষয়টি সত্য হলে সেটি ভাবনার বিষয়, দুঃখজনকও বটে। সেক্ষেত্রে সরকারের উচিত ক্যাডার বৈষম্য কমানোর উদ্যোগ নেয়া। উক্ত কর্মকর্তার স্বেচ্ছায় পদাবনতিকে একটি কেস হিস্ট্রি হিসাবে গ্রহণ করে সরকারের উচিত এটির ময়না তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। 

লেখকঃ প্রবাসী চিকিৎসক, কলামিস্ট 


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

এখুনি না বলি, সাবাস মায়ের দোয়ার দল!


Thumbnail

টি-২০ ফরম্যাটে যে কোন দল অন্য দলকে হারাতে পারে। তাই বলে র‌্যাংকিং এর ৮৮ নম্বরের একেবারে তলানির দল ক্রোয়েশিয়া, এক নম্বর দল ভারতকে হারাবে সেটি নিশ্চয়ই কেউ বিশ্বাস করবে না। ব্যতিক্রম যে হয় না, তা নয়। যেমন ৭ নম্বর দল পাকিস্তান সেদিন ১৭ নম্বর দল আমেরিকার কাছে হেরেছে। সেসব ব্যতিক্রম সব সময় হয় না, কালে ভদ্রে হয়।  

র‌্যাংকিং এ বাংলাদেশের অবস্থান এখন ৯ নম্বরে (রেটিং ২২৬)। এবারের টি-২০ বিশ্বকাপ আসরে তারা খেলছে ৫ নম্বর দল সাউথ আফ্রিকা (রেটিং ২৪৯), ৮ নম্বর দল শ্রীলংকা (রেটিং ২৩০), ১৫ নম্বর দল নেদারল্যান্ড (রেটিং ১৮৫) ও ১৮ নম্বর দল নেপালের সাথে (রেটিং  ১৭০)। বাংলাদেশ সাউথ আফ্রিকার সাথে  হারবে, নেদারল্যান্ড ও নেপালের সাথে  জিতবে, সেটা স্বাভাবিক। এটির ব্যতিক্রম হলে সেটা অস্বাভাবিক, সেটা কারো জন্য চমক, কারো জন্য দুর্ভাগ্য। র‌্যাংকিং এ বাংলাদেশ ও শ্রীলংকা সমানে সমান, ৮ আর ৯। রেটিং ব্যবধান মাত্র ৪। শ্রীলংকার সাথে জিতেছে, প্ৰশংসা করা যায়। তবে তাতে মাথায় তোলার মত কিছু হয়নি।

গত রাতে ৯ নম্বর বাংলাদেশ দল যখন ১৫ নম্বর দল নেদারল্যান্ডের বিরুদ্ধে খেলছিল, তখন ভয় আতংকে গা হাত পা কাঁপছিল। এক পর্যায়ে উইন প্রিডিক্টর বলছিল, নেদারল্যান্ডের জেতার সম্ভাবনা ৫৭ শতাংশ। সেটি হলে, তা হতো নেদারল্যান্ডের জন্য চমক, বাংলাদেশের জন্য দুর্ভাগ্য।  

গা হাত পা কাঁপাকাপি শেষে ঘুমের পর সকালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখি আমরা প্রায় বিশ্বকাপ পেয়ে গেছি। দেশীয় মিডিয়াতে দেখি বাংলাদেশ কি সব অর্জন করেছে। ক্রিকেটে অর্জনের যেন কিছু আর বাকি নেই। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে নেপালের সাথে জেতার পর জাতির পা আর মাটিতে পড়বে না, এভারেস্টের চূড়ায় উঠে যাবে। 

জাতি হিসাবে আমরা আসলে অল্পতে তুষ্ট। যে দুটি খেলায় জেতার কথা, সে দুটোতে জিতলে আমরা আবার শান্তদের মাথায় তুলবো।  তাসকিনদের বেতন বাড়াবো। হাতুরীদের সুযোগ সুবিধা বাড়াবো, চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধি করব। ছাদখোলা বাসে সম্বর্ধনা দিব। সাকিবরা দেশে ফিরে এমপি মন্ত্রী হবে। খেলা বাদে সব কিছুই করবে। তাই আমাদের ক্রিকেটে উন্নতি হয় না। বিশ বছর আগে যা ছিল, এখনো তাই। এখনো তাদের খেলা দেখতে বসলে সমস্ত শরীর কাঁপে। প্রেসারের ওষুধ খেতে হয়। নিজেরা দোয়া পড়ি।  মায়েদের দোয়া করতে অনুরোধ করি। মায়েদের দোয়ায় কাজ যে হয় না, তা নয়। হয়। দোয়ায় দোয়ায় র্যাংকিং এর নিচের দলকে মায়ের দোয়ার দলটি হারিয়েছে সৌম্য শান্তর উপর্যুপুরি একক ব্যর্থতার পরও।  

মায়ের দোয়ার দলটির উন্নতি চাইলে র‌্যাংকিং এর নিচের দলকে হারালে অতি তুষ্টতা পরিহার করা উচিত। অভিনন্দনের মধ্যেই থাকি, মাথায় না তুলি। পার্শবর্তী সব ক্রিকেট খেলুড়ে দেশগুলো থেকে আমার অনেক সহকর্মী রয়েছে। স্বাভাবিক জয়ের পর তাদের মধ্যে কখনোই উচ্ছাস দেখি না। উদ্বেলিত হয় বিশ্বকাপ জিতলে। তবে হাঁ, আমরা যদি র্যাংকিং এর উপরের কোন দলকে হারাই, তবেই বলি, সাবাস বাংলাদেশ। সাবাস মায়ের দোয়ার দল। 

লেখক: প্রবাসী চিকিৎসক, কলামিস্ট 


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

দূর-নিরীক্ষণ স্বাস্থ্য সেবা


Thumbnail

আজ থেকে চার বছর আগে করোনা ভাইরাস সংক্রমণের মোকাবেলায় প্রায় সব দেশেই জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষা একটি চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়েছিল যার জের আজও চলছে। কোভিড-১৯ সংক্রমণের মাত্রা এতোই তীব্র যে, কে কখন আক্রান্ত হয়েছে বা কে নীরব আক্রান্তের ঝুঁকির মধ্যে আছে তা তাৎক্ষণিক যাচাই করাও কঠিন ছিল। পরীক্ষার সীমিত ব্যবস্থাদি বা সুযোগের সীমাবদ্ধতার প্রধান কারণ সবগুলো দেশ প্রায় একই সাথে আক্রান্ত হয়েছে ও পরীক্ষার কীট ও যন্ত্রপাতি সব দেশে সমান্তরাল রীতিতে বিতরণ নিশ্চিত করা যাচ্ছিল না। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্যে এই সঙ্কট আরও জটিল কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় সময়োচিত পদক্ষেপ নেয়ার ফলে বাংলাদেশ পরিস্থিতিকে আয়ত্তাধীন রাখতে সক্ষম হয়েছে।  

কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল বাংলাদেশের সাধারণ স্বাস্থ্য ও হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থার নিয়মগুলো সঠিকভাবে বজায় রাখা। কোভিড ও নন-কোভিডের পার্থক্য নিরূপণ প্রথম শর্ত না কি মানুষের স্বাস্থ্য জটিলতার আপাত নিরসণ কাম্য – এই নিয়ে সরব তর্ক চলেছে দেশ জুড়ে। কিন্তু আমাদের চিকিৎসক সমাজকে সংখ্যানুপাতে বেশী মানুষের সেবা দিতে হয় ও তাঁদের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ঝুঁকিও কোন অংশে কম নয়। শুধু চিকিৎসকই নয়, স্বাস্থ্য সেবায় নিয়োজিত অন্যান্য জনশক্তির সংখ্যা সামর্থ্যও আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে। বাংলাদেশে করোনায় আক্রান্ত হয়েছে স্বাস্থ্য সেবায় নিয়োজিত একটি বিপুল জনগোষ্ঠী ও অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের পরিবারের সদস্যগণও আক্রান্ত হয়েছেন। অনেক চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য কর্মী মারাও গেছেন যা বাংলাদেশের জন্যে অপূরণীয় ক্ষতি। আমাদের এ-ও বিবেচনায় রাখতে হবে পরিবারের কোন সদস্য আক্রান্ত হলে বা দুর্ভাগ্যবশত মারা গেলে সমগ্র পরিবারেই তার প্রভাব পড়ে ফলে স্বাস্থ্য সেবায় নিয়োজিত চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্মীদের পারিবারিক দুর্গতি ও মানসিক স্বাস্থ্যের কথাও আমাদের ভাবতে হবে। 

ফলে আমরা চিকিৎসা কেন্দ্রে তখন রোগী কম দেখে বা চিকিৎসকদের একটি নিয়মের মধ্যে সেবা দিতে দেখে পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে বলে যে হইচই করেছি তা বাস্তবসম্মত ছিল না। যেমন ধরুন, করোনা পরিস্থিতির আগে আমাদের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোর যে উপচে পড়া ভিড়ের চিত্র আমরা দেখেছি শেষের দিকে তা ছিল না। এর অন্যতম প্রধান কারণ আমাদের স্বাস্থ্য সচেতনতা বেড়েছে ও বেশিরভাগ মানুষ উপসর্গ অনুযায়ী বাড়ি বসে চিকিৎসা নিয়েছে ও যথাসম্ভব ভালো থেকেছে। সামান্য উপসর্গে মানুষের চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার যে সাধারণ প্রবণতা তা অনেক কমে এসেছে ও তাতে চিকিৎসকদের উপর চাপও কমেছে। আমার বন্ধু চিকিৎসকদের অনেকেই বলেছেন তখন শান্তিতে অন্তত মনোযোগ দিয়ে চিকিৎসা সেবা দিতে পেরেছি, আগে এতো ভিড়ের চাপে রোগী সামলানো কঠিন ছিল। সবচেয়ে বড়ো কথা, চিকিৎসকগণ সানন্দে এগিয়ে এসেছেন যাতে সাধারণ মানুষ ঘরে বসেই ফোনের মাধ্যমে তাঁদের পরামর্শ সেবা পেয়ে ভালো থাকেন। বাংলাদেশের অনেক চিকিৎসক বিনামূল্যে এই সেবা দিয়েছেন এমন কি মোবাইল ফোনের ভিডিওতেও রোগীর সাথে কথা বলে, লক্ষণের সামগ্রিক বিবরণ শুনে ব্যবস্থাপত্র দিয়েছেন ও ফলো-আপ করছেন। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে রোগীকে চিকিৎসা কেন্দ্রে যাবার পরামর্শও দিয়েছেন।

এই বাস্তবতা মাথায় রেখে আমাদের বুঝতে হবে চিকিৎসা কেন্দ্রে বেশী মানুষের উপস্থিতি চিকিৎসার মান মোটেও নিশ্চিত করে না বা ব্যবস্থাপনার সাফল্য নির্দেশ করে না। অসুস্থ বা রোগপ্রায় মানুষ চিকিৎসা সেবা পেয়ে ও যথাযথ চিকিৎসা সেবা দিতে পেরে যুগপৎ জনসাধারণ ও চিকিৎসক সমাজ  কতখানি নিশ্চিত বোধ করছেন সেখানেই স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সাফল্য নির্ভর করে। ফলে আমাদের সেই স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এখন নিশ্চিত করতে হবে যেখানে দেশের সব মানুষ সেবার আওতায় আসবে। আমার বিশ্বাস গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে দূর-নিরীক্ষণ পরামর্শ সেবা তা নিশ্চিত করতে পারে যা মোবাইল ফোন, ভিডিও কথোপকথন ওই ইন্টারনেটের অন্যান্য সুবিধা দিয়ে নিশ্চিত করা যায়।

স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় পরামর্শ সেবার বহির্বিভাগের চাপ কমাতে আরও বিনিয়োগ না বাড়িয়েও আমরা খুব সহজে ইন্টারনেটভিত্তিক সেবা সম্প্রসারণ করতে পারি কারণ সরকারের উদ্যোগে এখন প্রায় সব গ্রাম ও ইউনিয়ন পর্যায়ে উচ্চ গতির ইন্টারনেট সহজলভ্য হয়েছে। একটি গ্রামের প্রশিক্ষিত ও সরকার কর্তৃক নিবন্ধিত স্বাস্থ্যকর্মী ইন্টারনেট পরিষেবায় শারীরিক লক্ষণ অনুযায়ী চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ তৈরি করিয়ে দিতে পারে (শুধু লক্ষ্য রাখতে হবে সেসব চিকিৎসক যেন সরকার স্বীকৃত নিবন্ধনপ্রাপ্ত হয় নতুবা এই সেবায় এক শ্রেণীর ফড়িয়া চিকিৎসা সেবার নামে প্রতারণাও করতে পারে)। একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ থেকে চিকিৎসকের তথ্য নিয়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে সারা দেশে প্রাথমিক পরামর্শ সেবা ছড়িয়ে দেয়া সম্ভব। আর এই সেবার বাস্তবায়ন, তত্ত্বাবধান ও মনিটরিং-এর দায়িত্ব দেয়া যাবে নানা স্তরে- কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র ও উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোকে। 

ইন্টারনেট ব্যবহার করে স্তন ক্যান্সার চিকিৎসায় এরকম একটি দূর-নিরীক্ষা চিকিৎসা পরামর্শ সেবা ২০০৯ সাল থেকে চালু আছে খুলনা ও বাগেরহাটের গ্রামাঞ্চলে। ‘আমাদের গ্রাম’ পরিচালিত এই প্রকল্পটি ইতোমধ্যে দেশে বিদেশে একটি মডেল হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে। পরামর্শের জন্যে আগত সকল রোগীর বিস্তারিত তথ্য একটি নির্ধারিত ইন্টারনেটভিত্তিক সফটওয়্যারে সংরক্ষিত থাকে। এরকম ক্ষেত্রে কেবল চিকিৎসার দ্বিতীয় ধাপে সন্দেহভাজন বা সম্ভাব্য রোগীকে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হয়। ডিজিটাল বাংলাদেশের এরকম আরও অনেক অভিজ্ঞতা দেশের নানা স্থানে ছড়িয়ে আছে যেগুলো পর্যবেক্ষণ করে ও আধুনিক ভাবনার সাথে মিলিয়ে আমরা একটি নতুন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারি। এখানে একটি বিষয় হয়তো সামনে আসবে সে হলো চিকিৎসার নৈতিক শর্ত যা হলো রোগীকে উপস্থিত স্পর্শ করে পরীক্ষা করা যাকে আমরা ‘ইন্টারমেডিয়ারী’ বলি তা কেমন করে নিশ্চিত হবে। এ ক্ষেত্রে আমাদের মনে রাখতে হবে প্রযুক্তির হাতে তাপমাত্রা নিরীক্ষণ বা নাড়ী নিরীক্ষণ-সহ অনেক চিকিৎসা সেবা ব্যবস্থা অনেক আগেই আমরা ছেড়ে দিয়েছি। সে ক্ষেত্রে একজন প্রশিক্ষিত ও নিবন্ধিত স্বাস্থ্য কর্মী শর্ত অনুযায়ী যেটুকু নিরীক্ষা করা সঙ্গত তার একটি প্রাথমিক নীতিমালা/গাইডলাইন নিশ্চয়ই আমরা তৈরি করে নিতে পারি।

দেশের বেশিরভাগ মানুষের জন্যে একটি উপযুক্ত দূর-নিরীক্ষণ প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা প্রক্রিয়া গঠন ও তা মানসম্মত উপায়ে সমুন্নত রাখা এখন অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়েছে। সদাশয় সরকার ও আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থা পরিকল্পনার সাথে যুক্ত সকলে মিলে এই ভাবনার বাস্তব ও নীতিসঙ্গত উপায় তৈরি করে নেয়া এখন জরুরি। আশা করি সংশ্লিষ্ট সবাই বিষয়টি ভেবে দেখবেন।    


--রেজা সেলিম

পরিচালক, আমাদের গ্রাম গবেষণা প্রকল্প



দূর-নিরীক্ষণ   স্বাস্থ্য সেবা   রেজা সেলিম   মতামত   মাটির টানে  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ও আশ্রয়ণ প্রকল্পের আম্পায়ারিং


Thumbnail

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ক্রিকেট শুরু হয়েছে। প্রথমবারের মত টুর্নামেন্টটি চলছে আমেরিকায়। এবারই প্রথম সবচেয়ে বেশি ২০টি দল খেলছে এ টুর্নামেন্টে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে দুটি খেলেছে। একটিতে জয়। আরেকটিতে হার। জয়টি নিয়ে যতটা না আলোচনা, হারটি নিয়ে আলোচনা সমালোচনা তার চেয়ে ঢের বেশি। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষের খেলাটির আম্পায়ারিং নিয়ে তুমুল সমালোচনা। আম্পায়ার কেন মাহমুদউল্লাহকে আউট দিল। ভুল আউট টি না দিলে বাংলাদেশ চার রান পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয় না। চার রান পেলে বাংলাদেশ ম্যাচটি জিতে যেত। আম্পায়ার কেন কয়েকটি ওয়াইডও দেয়নি যা ওয়াইড ছিল। এসবের মধ্যে আরেকটি ক্রিকেট ম্যাচ দেখলাম ছিন্নমূল, ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের মাঝে দলিলসহ জমি-ঘর হস্তান্তর অনুষ্ঠানে। অন্যান্য ক্রিকেট ম্যাচের মত এ অনুষ্ঠানটিও টিভিতে সরাসরি সম্প্রচার হচ্ছিল। সেখানেও ছিল বিতর্কিত আম্পায়ারিং ।

জমি-ঘর হস্তান্তর অনুষ্ঠানটিতে গণভবন থেকে সরাসরি অনলাইন কনফারেন্সের মাধ্যমে যুক্ত হন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একপ্রান্তে গণভবন। আরেক প্রান্তে লালমনিরহাট জেলার কালীগঞ্জ থানার মহিষামুড়ি আশ্রয়ণ প্রকল্প। ম্যাচটিতে আম্পায়ার ছিলেন স্থানীয় টিএনও। আশ্রয়ণ প্রকল্পের খেলোয়াড় (বক্তা) টিএনও ঠিক করে রেখেছিলেন কি না জানিনা। তবে এসব অনুষ্ঠানে স্থানীয় প্রশাসন সাধারণত আগে থেকে বক্তা ঠিক করে রাখেন।

ক্রিকেট খেলার কিছু মহান ঐতিহ্য রয়েছে। এমনই একটি ঐতিহ্য হল একজন খেলোয়াড়ের আবেদন করার পদ্ধতি। প্রায়ই খেলোয়াড়দের "হাউজাট" বলে চিৎকার করতে দেখা যায়। কখনও কখনও যতটা জোরে পারেন, ডাকেন। প্রশ্ন হচ্ছে, এর মানে কি? হাউজাট (Howzat) শব্দটি হাউ ইজ দ্যাট (How's that) এর একটি সংক্ষিপ্ত রূপ, যা একজন ব্যাটসম্যান আউট হয়েছে কি না তা একজন আম্পায়ারকে জিজ্ঞাসা করার একটি উপায় হিসাবে বিবেচিত হয়। আপিল ছাড়া একজন আম্পায়ার কিছু কিছু ক্ষেত্রে একজন ব্যাটসম্যানকে আউট দিতে পারে না। ক্রিকেটের আপীল সংক্রান্ত প্রবিধান ৩১ নম্বর অনুচ্ছেদে এমনটা উল্লেখ আছে। সেখানে বলা হয়েছে যে, ফিল্ডিং দলকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য আম্পায়ারের কাছে আবেদন করতে হবে। সেজন্য বোলার, কিপার এবং ফিল্ডিং দলের অন্যান্য সদস্যরা 'হাউজাট' বলে চিৎকার করেন।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রান্তিক জনগণের কথা শুনতে পছন্দ করেন। সেদিন তিনি খুব মনযোগের সাথে শুনছিলেন মহিষামুড়ি আশ্রয়ণ প্রকল্পের বিধবা বৃদ্ধা শাহেরুন এর কথা। বৃদ্ধা খুবই আবেগের সাথে নিজের দুঃখ দুর্দশার কথা বলছিলেন। মমতাময়ী প্রধানমন্ত্রী বৃদ্ধার মর্মস্পর্শী বক্তব্য হৃদয় দিয়ে অনুধাবন করছিলেন। বক্তব্য শেষে বৃদ্ধা মোনাজাত ধরলেন। এরই মধ্যে আম্পায়ার আউট দিয়ে দিলেন। বৃদ্ধা তো আর 'হাউজাট' জানেন না। তিনি আপীল করেন। ডান হাতের মাইক্রোফোন বা হাতে নিয়ে আপীলের জানান দেন। আম্পায়ার নাছোড়বান্দা। তিনি বৃদ্ধার কাছ থেকে মাইক্রোফোন কেড়ে নিয়ে আবার আউট দিলেন।

এ ঘটনায় অনলাইনে সরাসরি যুক্ত থাকা প্রধানমন্ত্রী উষ্মা প্রকাশ করেন। তিনি বলে ওঠেন ‘এটা কী, একজন মানুষ মোনাজাত করছেন, আর হাত থেকে সেটা (মাইক্রোফোন) কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। হোয়াট ইজ দিস। এটা কী?’ প্রধানমন্ত্রী আবারও বলেন, 'এই এই এটা কী করো, এটা কেমন কথা হলো। মোনাজাত করছে আর তার হাত থেকে মাইক্রোফোনটি কেড়ে নিল। হোয়াট ইজ দিস?' এ সময় প্রধানমন্ত্রী যা বলেন, তা ক্রিকেটীয় পরিভাষায় বললে দাঁড়ায়, হাউজাট বা হাউ ইজ দ্যাট। প্রধানমন্ত্রী ক্রিকেট খেলা দেখেন। সময় পেলে দেশের ক্রিকেট সরাসরি দেখেন। এমনকি মাঝে মাঝে তাঁকে স্টেডিয়ামে যেয়েও খেলা দেখতে দেখা যায়। তিনি ক্রিকেটীয় পরিভাষার 'হাউ ইজ দ্যাট' বোঝেন। কিন্তু তিনি সেদিন দাপ্তরিক পরিভাষায় 'হোয়াট ইজ দিস’ বলেন। বারবার আপিল করাতে আম্পায়ার আউটটি বাতিল করেন। বৃদ্ধা শাহেরুন মাইক্রোফোন ফিরে পেয়ে মোনাজাত সম্পন্ন করে তার ইনিংস শেষ করেন।

ক্রিকেটের সৌন্দর্য আম্পায়ারিং এ। আম্পায়ারিং ভাল না হলে খেলাটি তার সৌন্দর্য হারায়। খেলায় ছন্দপতন হয়। জয় পরাজয় নির্ধারণে স্বাভাবিকতা থাকে না। তেমনি আম্পায়ারের অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্তের কারণে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে ছিন্নমূল, ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের লাইভ অনুষ্ঠানটি দৃষ্টিকটু লেগেছে। এসব আম্পায়ারদের আরো বেশি দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজন 'আম্পায়ারিং' এর উপর আরো বেশি বেশি প্রশিক্ষণ। 

লেখক: প্রবাসী চিকিৎসক, কলামিস্ট

আশ্রয়ণ প্রকল্প   বিতর্ক   আম্পায়ারিং  


মন্তব্য করুন


বিজ্ঞাপন