ইনসাইড থট

আওয়ামী লীগে রাজাকারের অনুপ্রবেশ ভবিষ্যতের জন্য অশনিসংকেত

প্রকাশ: ১১:০০ এএম, ০৪ নভেম্বর, ২০২১


Thumbnail

সম্প্রতি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়ক উপকমিটির এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জনাব ওবায়দুল কাদের আওয়ামী লীগে ‘রাজাকার’ ইস্যু নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরাই এখন একে অন্যের দিকে রাজাকারের তকমা লাগানোর চেষ্টা করছেন।’ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘যার সঙ্গে বনবে না তাকে বলবে রাজাকারের ছেলে অথবা বলবে রাজাকারের নাতি বা শান্তি কমিটির সদস্য ছিল তারা।’ জনাব ওবায়দুল কাদের আরও বলেছেন, ‘এসব অভিযোগের স্তুপ হয়েছে আওয়ামী লীগে।’ওবায়দুল কাদের সাহেবের বক্তব্য সময়ের প্রেক্ষিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের যত প্রার্থীর বিরুদ্ধে রাজাকারের অভিযোগ উঠেছে তা যদি সত্যি হয় এবং সকলের বিরুদ্ধে যদি ব্যবস্থা নেয়া হয় তাহলে তা লোম বাছতে কম্বল উজাড়ের মতো ঘটনা হবে। অভিযোগের সবই যে মিথ্যা তা নয়। কারণ ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ড বেশ কিছু মনোনয়ন পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে। এ থেকে বোঝা যায় আওয়ামী লীগে ‘রাজাকার’ গোষ্ঠী ঢুকে পড়েছে।

আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্যের মূল সুর অনূধাবন করলে বোঝা যায়, অনেক অভিযোগই অসত্য, প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে করা। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার একটা সস্তা কৌশল। রাজাকার, বিএনপি বা জামায়াত বলে কাউকে কোণঠাসা করার কৌশলটি আওয়ামী লীগের কারও কারও পুরনো অভ্যাস।

তবে বিষয়টি বেশ জটিল এবং উভয় সংকট। ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীর বিরোধীতাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেওয়া হলো। এই সুযোগে বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকার প্রার্থীগণ নির্বাচনে বিরোধীতাকারীদের নামের সাথে পরবর্তি নির্বাচনে তার প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এমন সব নেতাদের এবং ঐ নেতাদের সমর্থকদের নামও অভিযোগের তালিকাভুক্ত করলেন। পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মীর নামে অভিযোগপত্র জমা হয়েছিল। অভিযোগসমূহ কোনপ্রকার তদন্ত না করে অভিযোগপত্রে তালিকাভুক্ত সকল নেতাকর্মীদের বহিস্কার করার সুপারিশ করা হয়েছিল এবং বহিস্কার করা হয়েছিলো। তন্মধ্যে কিছু দোষী থাকলেও  সবাই যে বহিস্কার হওয়ার মত অপরাধী তাদের নয়। বেশীরভাগ অভিযোগই প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থী নিধন করার জন্য করা হয়েছিল। ঐ ঘটনায় অসংখ্য নিবেদিতপ্রাণ নেতাকর্মী বিনাদোষে সংগঠনের কর্মী হিসেবে কাজ করার সুযোগ থেকে চিরদিনের জন্য বঞ্চিত হয়েছেন। উদাহরণ স্বরূপ, সাবেক ডেমরা থানা (বর্তমান যাত্রাবাড়ী, ডেমরা) আওয়ামীলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জনাব সফর আলী। তিনি ডেমরা থানাধীন সাবেক দনিয়া ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদকও ছিলেন। তৃণমূল আওয়ামী লীগ নেতা। ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ এর পর সাবেক ডেমরা থানা এলাকায় যখন স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তির রাজনীতির দুর্দিন। বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ করার সুযোগ ছিল না। তখন দোলাইরপাড় ব্রিজের ঢালে সফর আলী সাহেবের বাড়িতে এক কক্ষ বিশিষ্ট ছাপাখানা (প্রেস) ছিল। সাথেই ছোট একটি টেবিল ও একটি চেয়ার বসানো যায় এমনি ছোট্ট কক্ষে প্রেসের অফিস। সফর আলী সাহেব ভিতরে বসতেন। গ্রাহক বাইরে দাঁড়িয়ে কথা বলতেন। আমরা ছাত্রলীগ কর্মীরা বিকালে ওখানেই ভীড় করতাম। কন্ডেন্সমিল্কের কৌটায় চা এনে স্টিলের কাপে করে সকলেই চা খেতাম। বঙ্গবন্ধুবিহীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির এভাবেই পুনর্জাগরণ শুরু হয়। হাটি হাটি পা পা করে ডেমরা থানা এলাকায় আওয়ামী লীগ সংগঠিত হতে থাকে। সাংগঠনিক আলোচনা করার জন্য দলিল ভাই এর ছবি তোলার স্টুডিও এর গ্রীনরুম ব্যবহার করা হতো। ১৯৯৩ সালে জনাব হাবিবুর রহমান মোল্লাকে সভাপতি ও জনাব সফর আলীকে সাধারণ সম্পাদক করে ডেমরা থানা আওয়ামীলীগ কমিটি গঠিত হয়। ২০০১ এর জাতীয় নির্বাচনে উনারা দুজনেই প্রার্থী হয়েছিলেন। হাবিবুর রহমান মোল্লা সাহেব মনোনয়ন পেয়েছিলেন। ঐ নির্বাচনে তৎকালীন নির্বাচন কমিশনের সূসূক্ষ্ম কারচুপির কারনে আওয়ামী লীগ পরাজিত হয়। কিন্তু অভিযোগ দেওয়ার সুযোগ পেয়ে প্রতিদ্বন্ধী নেতা সফর আলী সাহেবের  বিরুদ্ধেও অভিযোগ দেওয়া হয়। নিবেদিতপ্রাণ তৃণমূল আওয়ামী লীগ নেতা চিরদিনের জন্য সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড থেকে বিদায় হয়ে গেলেন।

এর উল্টো পিঠও রয়েছে। ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের গ্রুপিং এর সুবাদে ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে নির্মমভাবে হত্যাকাণ্ডের বেনিফিশিয়ারি বিএনপি জামাতের নেতাকর্মীরাও সুপরিকল্পিতভাবে আওয়ামীলীগে অনুপ্রবেশ করেছে। ১৯৭১ এ মহান মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তির দোসররাই ১৯৭৫ এ আঘাত করেছে। ওরা বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যা করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা নস্যাৎ করতে চেয়েছিল। কিন্তু মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বিদেশে অবস্থান করার কারণে প্রাণে বেঁচে যান। শেখ হাসিনা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব হাতে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার জন্য আওয়ামীলীগকে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেন। ষড়যন্ত্রকারীরাও বসে থাকেনি। ওরা বিভিন্ন সুযোগে সুকৌশলে আওয়ামী লীগে যোগদান করে। মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ও মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক থাকাকালে গ্রুপিং এর কারণে থানা কমিটি ও ওয়ার্ড-ইউনিয়ন কমিটি গঠন কার্যক্রম বিলম্বিত হয়েছিল। স্বাধীনতা বিরোধী ও ৭৫ এর বেনিফিশিয়ারি বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার বিরোধী আন্দোলন শক্তিশালী করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মাননীয় সভাপতি শেখ হাসিনা ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের থানা, ওয়ার্ড, ইউনিয়ন কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। কেন্দ্রীয় নির্দেশে কমিটি গঠনে সময়ের সংক্ষিপ্ততায় সকল কমিটি গঠন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করতে না পারলেও, কোন যাচাই বাছাই না করে পদ ভাগাভাগি করে কয়েকটি কমিটি গঠন করেন। প্রবাদে আছে ‘ভাগের মা গঙ্গা পায় না’। পদ ভাগাভাগি করতে গিয়ে নিজ গ্রুপে যোগ্য নেতা না থাকলেও নিজের ভাগে পাওয়া পদে প্রতিদ্বন্দ্বির পক্ষের যোগ্য আওয়ামীলীগ নেতাদের না দিয়ে প্রয়োজনে ভিন্ন দলের লোককে সেই পদ দেওয়ার উদাহরণ রয়েছে। এই পদ ভাগাভাগির সুযোগে স্বাধীনতাবিরোধী, ১৯৭৫ এর বেনিফিশিয়ারিরা, সুবিধাবাদীরা সুপরিকল্পিতভাবে আওয়ামীলীগে অনুপ্রবেশ করেছে। ৭১ ও ৭৫ এর ষড়যন্ত্রকারীরা তাদের মিশন সম্পন্ন করার জন্য, স্বাধীনতার মূল্যবোধকে নস্যাৎ করার জন্য ছাত্রজীবনে ও কর্মজীবনে জিয়ার সৈনিক এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপি দলীয় জনপ্রতিনিধি হয়েও সুদুরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশ করেছে। পরবর্তিতে এই অনুপ্রবেশকারীরা আওয়ামী লীগে বিএনপি জামাতের নেতাকর্মীদের আওয়ামীলীগার বানিয়ে নিজস্ব গ্রুপ তৈরি করেছে। ওরা আওয়ামীলীগ দলীয় সংসদ সদস্য পদ ছাড়াও দলীয় অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। এখানেই ক্ষ্যান্ত হননি, বিএনপি জামাত থেকে অনুপ্রবেশকৃত তাদের নিজস্ব লোকদের তৃণমূল পর্যায়ে বিভিন্ন পদে অধিষ্ঠিত করেছেন। কিন্তু কী পরিকল্পনায় বা কোন ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের জন্য তারা বিএনপি সরকারের আমলে বিএনপি ছেড়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশ করলেন এবং সুকৌশলে গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হলেন, এটাই রহস্যজনক! এমনি অসংখ্য অনুপ্রবেশকারীর উদাহরণ রয়েছে।

মির্জা আজম এমপি একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ। তৃণমূল পর্যায় থেকে গড়ে উঠা গণমানুষের নেতা, ছয় বার নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্য। বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ এর সাধারণ সম্পাদক হিসাবে সারাদেশে ওয়ার্ড-ইউনিয়ন পর্যায়ে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মনের কথা বুঝতে শিখেছেন। বর্তমানে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ঢাকা বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। এই অভিজ্ঞ রাজনৈতিক নেতা ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামীলীগ এর এক কর্মীসভায় বলেছেন, বিএনপি ঘরানার এক শিল্পপতির দুই ছেলে (বয়স ১৯ ও ২১ বছর) মহানগর আওয়ামীলীগের দুইটি থানা কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই দুইজন কোনদিন কোথায়ও আওয়ামীলীগ বা  অংগ-সহযোগী সংগঠনের সাথে জড়িত ছিলেন না এবং বর্তমান সরকারের এমপি-মন্ত্রীদের সাথে সখ্যতা বজায় রেখে ভালভাবেই ব্যবসা-বাণিজ্য করছেন। এই সকল অনুপ্রবেশকারীরা দেশের সেবা করার উদ্দেশ্যে সংগঠন করতে আসেন নাই। তারা সরকারী দলের পদ ব্যবহার করে সরকারি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতেই সংগঠনের পদ ক্রয় করেছেন।

 

দলের দুঃসময়ে অবদান রেখেছেন এমন সাবেক ছাত্রনেতাদের মেধা ও শ্রমকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি দলকে সংগঠিত রাখতেই আওয়ামীলীগ এর সাংগঠনিক কাঠামোতে উপ-কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়। তবে নির্মম সত্য হলো বিভিন্ন উপায়ে বিভিন্ন ধরনের লোকেরা পায় উপ কমিটির পদ। অতীতে আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত না থাকলেও সাবেক ছাত্রনেতা পরিচয়ে অনেকেই কেন্দ্রীয় উপ-কমিটিতে জায়গা করে নিয়েছেন।

ক্ষমতাসীন দলের উপ-কমিটিতে থেকে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে সমালোচনার জন্ম দিয়েছেন শাহেদ, হেলেনার মতো ব্যক্তিরা। আর এসব কারণে শুরু থেকেই কম-বেশি বিতর্কে পড়েছে আওয়ামী লীগের বিষয়ভিত্তিক এসব উপ-কমিটি। ছদ্মবেশে আওয়ামী লীগে প্রবেশ করে সুবিধাবাদীরা সরকার ও সংগঠনের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করছেন। কোন যোগ্যতা না থাকলেও উপকমিটির কর্তাব্যক্তিদের পরিচিত, তাদের নিজ নির্বাচনী এলাকার লোক হিসেবে জায়গা পেয়েছে অনেকে। এইসব উপ কমিটিগুলোতে এমন অনেককেই রাখা হয়েছে, অতীতে যাদের আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ছিল না। তাদের জীবনের প্রথম রাজনৈতিক পদ এই উপকমিটির সদস্য। এরই ফলে উপ কমিটি গঠনে সাংগঠনিক কাঠামো শক্তিশালী না হয়ে বরং দুর্বল হয়েছে। সংগঠন ও সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে।

প্রশাসনে কোন একজন মেধাবী সরকারি কর্মকর্তা, কারও সাতেপাঁচে নেই। প্রতিপক্ষ তাকে রাজাকারের আত্মীয় বানিয়ে দিল। ব্যস, তার পদোন্নতি বন্ধ হয়ে গেল। কিন্ত এটাওতো ঠিক, বিসিএস অতিক্রম করে যারা প্রশাসনের বিভিন্ন পদে চাকুরী পায়, তারা সকলেই মেধাবী। উনিশ-বিশ হতে পারে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায়। ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগ করা একজন নেতা বা কর্মী চাকুরীজীবনে তার দলীয় নির্বাচনী মেন্যুফেস্টো বাস্তবায়নে সোচ্চার থাকবেন এটাই স্বাভাবিক। তবে এই মুহূর্তে চাকুরীজীবনে তারাই সাতেপাঁচে নেই, যারা ছাত্রজীবনে বর্তমান সরকার বিরোধী নীতি ও আদর্শের অনুসারী ছিলেন। এখন ঐ সকল শান্তশিষ্ট, সাতেপাঁচে নেই কর্মকর্তারা সরকারকে ভাল কোন পরামর্শ দিবে না, কোন অন্যায়ের প্রতিবাদ করবে না। শুধু জ্বী স্যার, জ্বী স্যার করবে এবং গোপনে নিজের মতাদর্শের লোকদের খুঁজে বেড়াবে, সংগবদ্ধ হবে। সুযোগ পেলেই সরকারকে বেকায়দায় ফেলার চেষ্টা করবে- এমন লোকদের সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত করা হচ্ছে। ওরাই সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নথি গায়েব করে সরকারকে বিব্রত করছে, রাজপথে আইনের মারপ্যাঁচে সমাজের সম্মানিত ব্যক্তিদের হেনস্তা করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার চেষ্টা করছে। এই নীতিমালা রাজনৈতিক সরকারের জন্য কল্যাণকর  হতে পারে না। রাজনৈতিক সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও একই নীতি আদর্শের অনুসারী হতে হবে। তবেই সরকার দ্বিধাহীনভাবে দেশ পরিচালনা করতে পারবে, যেটা করা হচ্ছে আমেরিকায়।

কদমতলী থানা আওয়ামীলীগের বর্তমান কমিটি গঠন প্রক্রিয়ায় থানা আওয়ামীলীগের সভাপতি মোহাম্মদ নাছিম মিয়া ও সাধারণ সম্পাদক মিলে যাচাই বাছাই করে একটি পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করেন। উভয়ের স্বাক্ষরিত পুর্নাঙ্গ কমিটি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামীলীগ এর দপ্তরে জমা দেওয়া হয়। কিন্তু ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক স্বাক্ষরিত  অনুমোদিত কমিটি ছিল ভিন্নরুপ। প্রস্তাবিত কমিটি থেকে ৩৩ জনের বাদ দিয়ে নতুন নাম সংযোজন করে কমিটি অনুমোদন করেছে। এই ৩৩ জনের মধ্যে বিএনপি  জামাতের অনেক লোক অনুপ্রবেশ করেছে। মির্জা আজম সাহেব একথাই মহানগর আওয়ামী লীগের কর্মীসভায় উল্লেখ করেছেন। এব্যাপারে আওয়ামী লীগ সভাপতির নিকট লিখিত অভিযোগপত্র জমা দেয়া হয়েছে।

এমন ঘটনা তৃণমূল পর্যায়ে অহরহ ঘটছে। হাইব্রিড নেতারা সংগঠনের মধ্যে নিজস্ব বলয় তৈরী করার জন্য  বিএনপি-জামাতের লোকদের আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশ করিয়েছে। তৃণমূলের অবস্থা কান পেতে শুনলে বুঝা যায় হাইব্রিডদের জয়জয়কার। কাজেই ‘আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরাই এখন একে অন্যের দিকে রাজাকারের তকমা লাগানোর চেষ্টা করছেন’-এই কথা বলে বিষয়টি হালকা না করে সংগঠনের স্বার্থে সঠিক ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অনুপ্রবেশকারী বিএনপি জামাত রাজাকারদের সংগঠন থেকে বের করে দেওয়া জরুরি। এছাড়া যেসকল কেন্দ্রীয় নেতা, এমপি, মন্ত্রী এই প্রক্রিয়ায় জড়িত, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। সময় থাকতে সাধু সাবধান!



মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

শেখ হাসিনার সমালোচনা করলেও কেউই তার বিকল্প খুঁজে পান না


Thumbnail

দার্শনিক রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা ৭ জানুয়ারির নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ের পর ১১ জানুয়ারি যে নতুন সরকার গঠন করেন আজ তার ১০০ তম দিন। এক কঠিনতম সময়ে তিনি এই সরকার গঠন করেছেন। কিছু বুদ্ধিজীবী নির্বাচনের আগে আগে নানান রকম কথাবার্তা বললেও সাধারণ মানুষ ঠিকই জানত যে, শেখ হাসিনাই আবার সরকার গঠন করবেন। কারণ তারা জানেন যে, শেখ হাসিনার বিকল্প শেখ হাসিনাই। সরকার গঠনের পরও কিন্তু তাকে কঠিনতম সময় পার করতে হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি সফলতা পাচ্ছেন। এজন্য একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমিও মনে করি যে, দার্শনিক রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার বিকল্প শেখ হাসিনাই। 

দার্শনিক শেখ হাসিনা এখন আগে দার্শনিক পরে রাষ্ট্রনায়ক। এতদিন তিনি ছিলেন আগে রাষ্ট্রনায়ক পরে এবং দার্শনিক। এখন তিনি আগে দার্শনিক পরে রাষ্ট্রনায়ক। কারণ তিনি একের পর এক দর্শনকে যেভাবে স্থায়ী রূপ দিয়ে যাচ্ছেন তাতে এদেশের সকলের মনোবলও বৃদ্ধি পাচ্ছে। নতুন মন্ত্রিসভাতেও তিনি দর্শনের প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। তিনি পুরনোদের সাথে নতুনদের যুক্ত করে নেতৃত্বের একটি চমৎকার ভারসাম্য তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। যা আমরা এই ১০০ দিনে বুঝতে পেরেছি এই নতুন মন্ত্রিসভার কাজকর্মে। সেদিক থেকে আমি অনুধাবন করতে পারি যে, এই ১০০ দিনে দার্শনিক রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা এখন পর্যন্ত শতভাগ সফল।

গোটা বিশ্ব এখন যুদ্ধের মধ্যে পড়েছে। করোনার পর থেকে ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ গোটা বিশ্ব অর্থনীতিতে টলটলয়মান করে দিয়েছে। এখন আবার নতুন করে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা শুরু হয়েছে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধে। বলা যায় বিশ্বে একটা মিনি বিশ্ব যুদ্ধ চলছে। গাজায় হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে প্রতিনিয়ত। এরকম পরিস্থিতিতে দার্শনিক শেখ হাসিনার সামনে বিরাট চ্যালেঞ্জ। তবে আশার কথা যে, এখন পর্যন্ত তিনি সঠিক পথে আছেন এবং সফল ভাবে পুরো পরিস্থিতি মোকাবিলা করে যাচ্ছেন। বিশ্বের অস্থির পরিস্থির কথা অনুধাবন করে তিনি প্রতিনিয়ত বিভিন্ন রকম নির্দেশনা দিচ্ছেন। যেমন-বিশ্ব বাজারে নতুন নতুন বাজারের সন্ধান। আমাদের যেন খাদ্য ঘাটতি পড়তে না হয় সেজন্য তিনি আগাম আমাদের সতর্ক করে দিচ্ছেন। পাশাপাশি আমাদের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়াতেও তিনি জোরালো ভাবে আহ্বান করেছেন। 

একজন জেনারেলকে কীভাবে বিচার করা হয়? তিনি কয়টি ব্যাটল জয় করলেন সেটা দিয়ে কিন্তু নয়। তাকে বিচার করা হয় যখন তিনি একটা ব্যাটলে হেরে যান এবং তার সৈন্যরা যখন পুরো ভেঙে পড়েন ঠিক সে সময় তিনি কীভাবে তার সৈন্যদের উজ্জীবিত করতে পারলেন সেটা বিবেচনায় নেওয়া হয়। দার্শনিক শেখ হাসিনাও সে রকম একজন জেনারেল, যে জেনারেল কঠিন সময়ে সাধারণ জনগণকে সবচেয়ে কম কষ্টে রেখে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন এবং ভবিষ্যতেও যেন তিনি সফল ভাবে নিয়ে যাবেন সেটা বলাই বাহুল্য। অনেকে তার সমালোচনা করছেন ঠিক কিন্তু কেউ তার বিকল্পের কথা বলতে পারছেন না। তিনি দলকে যেমন ধরে রেখেছেন বা নেতৃত্ব দিচ্ছেন ঠিক তেমনিভাবে সরকারকেও সঠিক পথে পরিচালনা করছেন। সুতরাং শেখ হাসিনার বিকল্প যে শেখ হাসিনাই এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। নতুন সরকারের প্রথম ১০০ দিনের মত সামনের দিনগুলোতে সাফল্য ধরে রাখবে এটাই আমরা প্রত্যাশা করি।



মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

কতিপয় সাংবাদিক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর চেয়েও ক্ষমতাধর


Thumbnail

বারো বছর আগের কথা। ডেভিড ক্যামেরুন তখন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী। সে সময় একদিন তিনি একটি হাসপাতালের ওয়ার্ডে ঢুকে পড়লেন। রোগীর অনুমতি সাপেক্ষে রোগীর সাথে ছবি তুলতে গেলেন। বাঁধ সাধলেন ওয়ার্ডের দায়িত্বে থাকা একজন চিকিৎসক। জীবাণু প্রতিরোধের কোন পদক্ষেপ না নিয়ে এবং চিকিৎসকের অনুমতি ব্যতিরেকে তিনি ওই কাজটি করছিলেন। ডেভিড ক্যামেরুন তাঁর ভুল বুঝতে পেরেছিলেন সাথে সাথে। ক্ষমা চাইলেন এবং ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে গেলেন।

ভিন্ন চিত্র দেখলাম শনিবার সকালে বরিশাল সদর হাসপাতালে। দায়িত্বরত চিকিৎসক ওয়ার্ডে রাউন্ড দিতে যেয়ে দেখেন দুজন টিভি সাংবাদিক ওয়ার্ডে ভিডিও করছেন। ভিডিও শেষ হবার পর চিকিৎসক তাঁর রাউন্ড শুরু করলেন। রাউন্ড শুরু করতেই দুজন সাংবাদিক আবার ক্যামেরা ধরে চিকিৎসকের সাথে কথা বলা শুরু করলেন। চিকিৎসক তাদের পরিচয় জানতে চাইলেন। বিনয়ের সাথে নিচু স্বরে একে একে ২০ বার (গুনে নিশ্চিত হয়েই বলছি) সাংবাদিকের নাম জিজ্ঞেস করলেন, পরিচয় জানতে চাইলেন। উক্ত সাংবাদিক নাম বলেননি, পরিচয় দেননি। বরং উচ্চস্বরে উল্টা পাল্টা কথা বলেছেন, পাল্টা প্রশ্ন করেছেন। অবশেষে কর্তব্যরত চিকিৎসক উর্ধতন কাউকে ফোন দেয়ার পর সাংবাদিক সাহেব তার নাম বলেছেন। এখানে দুটি প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে।  প্রথম প্রশ্ন হচ্ছে, সাংবাদিক দুজন কি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর চেয়েও ক্ষমতাধর হয়ে গেছেন ? দ্বিতীয় প্রশ্ন, সাংবাদিক দুজনকে কেন নাম বলতে হবে ? নাম, পদবি, পরিচয় থাকবে তাদের বুকে বা কোমরে প্রদর্শিত আই ডি কার্ডে। এখন দেখার বিষয়,  প্রদর্শিত স্থানে আই ডি ছিল কিনা ? না থাকলে থাকবে না কেন?

সাংবাদিক ও চিকিৎসকবৃন্দ ঘটনার ভিডিও চিত্র সমূহ পৃথকভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দিয়েছেন। সব গুলো ভিডিও কয়েকবার দেখেছি, পর্যালোচনা করেছি। দায়িত্বরত চিকিৎসক কখনোই উচ্চস্বরে কথা বলেননি। তিনি যথেষ্ট ধৈর্য্য, বুদ্ধিমত্তা ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। পক্ষান্তরে সাংবাদিক দুজন বারবার উচ্চস্বরে কথা বলেছেন। তাদের কথা বলার ধরণ দেখে মনে হয়েছে, এটি একটি মগের মুল্লুক। কর্তব্যরত চিকিৎসক ওয়ার্ড রাউন্ড শুরু করার আগে প্রতি রোগীর সাথে একজন এটেন্ডেন্ট ব্যাতিরেকে সবাইকে বের হবার কথা বলেছেন। সবাই বেরিয়ে না গেলে তিনি চিকিৎসা শুরু করতে পারবেন না বলে জানিয়েছেন। সেটাই নিয়ম।  সারা দুনিয়ায় সেটাই হয়ে থাকে। সাংবাদিকদ্বয় সেটি শুনতে নারাজ। এখানে তারা স্পষ্টতই সরকারি কাজে বাধা সৃষ্টি করেছেন, যা আইনত দণ্ডনীয়।  

দিন শেষে বেসরকারি টিভি চ্যানেলে দেখলাম সাংবাদিকদের হেনস্থা করেছে ডাক্তার। অথচ ভিডিও গুলি পর্যালোচনা করলে যে কেউ বলবেন, ডাক্তারকে হেনস্থা করেছে সাংবাদিকরা। আসলেই মগের মুল্লুক। ঘটনা কি ? আর সংবাদ শিরোনাম কি? এসব মগের মুল্লুকের রাজত্ব  থেকে জাতিকে পরিত্রান দেয়া প্রয়োজন।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, বিএমএ, এফডিএসএর, বিডিএফ ও সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ সমন্বয়ে একটি কমিটি করে দেয়া দরকার। কমিটি হাসপাতালে সাংবাদিক প্রবেশে ও তাদের দায়িত্ব নির্ধারণে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করবে। সে নীতিমালায় যাতে স্বাস্থ্য কর্মীদের কাজে বাধা প্রদান না করা হয়, রোগীর অনুমতি ব্যাতিরেকে তাদের ছবি, ভিডিও বা রোগ সংক্রান্ত কোন তথ্য প্রকাশ বা প্রচার না করা হয়, সেসব বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন। তা না হলে হাসপাতাল সমূহে এ ধরণের অরাজকতা হতেই থাকবে, বাড়তেই থাকবে।  

লেখকঃ প্রবাসী চিকিৎসক, কলামিস্ট।


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

প্রথম আলোর পর কী ডেইলি স্টারও বিক্রি হবে?


Thumbnail

এখন টক অফ দ্য কান্ট্রি হচ্ছে প্রথম আলো বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। যদি প্রথম আলো কে বা কারা কিনবে সেটা এখন পর্যন্ত নিশ্চিত না। তবে প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান চাইবেন কোথায় গেলে তার চাকরির নিশ্চয়তা থাকবে। সেভাবেই তিনি বিক্রি করার চেষ্টা করবেন।

প্রথম আলো বিক্রির বিষয়টির পাশাপাশি একই রকম আরেকটি প্রশ্ন সামনে আসছে। আর সেটা হলো প্রথম আলোর পরে কে? তাহলে কি প্রথম আলোর পরে ডেইলি স্টার? তবে এটা নির্ভর করবে প্রথম আলোর কি ভাগ্য হয় তার ওপর। আমার ধারণা যারাই প্রথম আলো কিনেন না কেন তারা প্রথম দিকে মতিউর রহমান সাহেবকে রাখলেও পরবর্তীতে ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে সম্পাদক পরিবর্তন করবে। আর প্রথম আলো যদি কোন যুক্তিপূর্ণ লোকের কাছে দেয় তাহলে আমার মতে এখানে সম্ভবত আনিসুল হক সাহেব সম্পাদক হবেন। কারণ তার প্রতি লোকের অনেক শ্রদ্ধাবোধ আছে এবং তিনি সবসময় একটা রেড লাইন রক্ষা করে চলেন। এটা আমরা সকলেই জানি। তার সাথে অনেকেরই  ভালো সম্পর্ক এবং তিনি খুবই জ্ঞানী লোক।

এর আগে মতিউর রহমান যখন একতা থেকে আজকের কাগজে যান, তখন তার উদ্দেশ্যই ছিল যে, একটি পত্রিকা কীভাবে চলে সেটা শেখা এবং এখান থেকে একসাথে সাংবাদিক নিয়ে বেরিয়ে যাওয়া। তিনি সেটা করেছিলেন। তারপর ভোরের কাগজ থেকে একই কাজ করেছেন। সুতরাং তার সত্যিকারের নীতিবোধ বলতে যেটা বোঝায় সেটা দুর্ভাগ্যবশত তিনি প্রমাণ করতে পারেননি।

তিনি এক সময় কমিউনিস্টদের সাথে থাকলেও এখন তার চেয়ে বড় দক্ষিণপন্থী পৃথিবীতে খুঁজে পাওয়াই কঠিন। এ কারণে প্রথম আলো যে বিক্রি হবে এই ব্যাপারে সাধারণ লোকের ভিতরে এখন আর কোন সন্দেহ নেই।

এখন প্রথম আলোর পরে ডেইলি স্টারের কী হবে এই নিয়ে আলাপ আলোচনা হচ্ছে এবং এই আলাপ আলোচনা খুব দীর্ঘদিন যে চলবে তা না। আমার মনে হয় জুন-জুলাই মাসের ভিতরেই এর একটা ফয়সালা হয়ে যাবে। কারণ স্বাভাবিক ভাবেই বুঝি যে, একটি পত্রিকা পাঠকপ্রিয়তা পেতে বেশ সময় লাগে। এটা একদিন দুইদিনের ব্যাপার না। আবার ঠিক তেমনিভাবে যখন পাঠকপ্রিয়তা কমতে থাকে সেটাও একদিন দুইদিনে হয় না। ধীরে ধীরে হয়। এই মিডিয়া জগতের নিয়মই তাই।

আমি ১৯৬১ সালে পত্রিকা বলতে শুধুমাত্র ইত্তেফাক এর কথাই জানতাম। সেই ধারণা থেকে বলতে পারি এখন প্রথম আলোর যদি কিছু কর্মী এর চেয়ে ভালো কোন সুযোগ সুবিধা দেখেন তাহলে তারা বিক্রি হওয়ার আগেই চলে যাবেন। কারণ স্বাভাবিকভাবেই একজন সাংবাদিকের একটা ক্যারিয়ার আছে এবং প্রথম আলোর মতো পত্রিকাতে কাজ করে তিনি তো যে কোন পত্রিকায় যেতেও পারবেন না। তার কারণ গেলে তার ওই লেখার যে মান সেটা মূল্যায়ন নাও হতে পারে। তবে আমার ধারণা প্রথম আলোতে কাজ করেছেন এমন যে কাউকে টেকনিক্যাল গ্রাউন্ডে অনেক গুরুত্ব দেওয়া হবে। এক্ষেত্রে আমি অবাক হব না যদি দু এক মাসের ভিতরে দেখা যায় যে আস্তে আস্তে প্রথম আলো বিভিন্ন কর্মী অন্য পত্রিকায় যাওয়া শুরু করে দিয়েছেন।

ব্যাংক মার্জারের যেমন একটি ঘটনা বর্তমানে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, ঠিক তেমনি পত্রিকা জগতেও শিল্প গোষ্ঠীর যে গন্ডগোলের ঘটনা ঘটেছে এটিও ব্যাংক মার্জারের ঘটনার পর্যায়ে চলে যাবে। ব্যাংকিং ক্ষেত্রে দেখা যায়, দুটি ব্যাংক একীভূত হচ্ছে। আর এদিকে দেখা যাবে, সংবাদকর্মীরা অন্য পত্রিকায় চলে যাচ্ছে।

তবে আমার মনে হয় না, এখন যে অবস্থা চলছে এতে প্রথম আলো আর আগের মতো প্রথম আলো থাকতে পারবে। এটা কিছুতেই সম্ভব না এটি মোটামুটিভাবে নিশ্চিত। তাই আমার মনে হয় প্রথম আলো সেই ব্যাংক মার্জারের পর্যায়ে চলে এসেছে। এখন অন্য পত্রিকা যাদের আছে, তারাও প্রথম আলো কিনে নিতে পারেন। এটি সম্ভব। এরকম শিল্পগোষ্ঠীর কোন কমতি বর্তমানে বাংলাদেশে নেই। যে কোন শিল্প গোষ্ঠীই এটা কিনবে।

তবে আমি আশা রাখব, যারাই প্রথম আলো কিনবে, তারা যেন অন্তত পক্ষে এটা খেয়াল রাখে যাতে সাংবাদিকদের কোন ক্ষতি না হয়। সুতরাং এদেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমার দাবী হচ্ছে সাংবাদিকরা যেন ক্ষতিগ্রস্থ না হয়।


প্রথম আলো   ডেইলি স্টার  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

ভুলের চোরাগলিতে আটকে গেছে বিএনপির রাজনীতি


Thumbnail

বিএনপির রাজনীতি এখন ভুলের চোরাগলিতে আটকে গেছে। রাজনীতিতে একের পর এক ভুল করার কারণে তারা এখন হতাশায় নিমজ্জিত। কোন কী বলতে হবে সেটার খেই হারিয়ে ফেলেছেন দলটির নেতাকর্মীরা। 

বিএনপি এখন দাবি করছে যে, তাদের ৬০ লাখ নেতাকর্মী জেলে আছেন। এখানে দুটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ। একটি হল যদি ৬০ লাখ কর্মী তাদের থাকত তাহলে এতদিনে তারা কেন আন্দোলনে ব্যর্থ হল? যদি এত সংখ্যক নেতাকর্মী থাকত তাহলে তো অনেক আগেই সরকারের পতন ঘটে যেত। কারণ সরকারের পতন ঘটানোর জন্য এক লাখ নেতাকর্মী হলেই যথেষ্ট। কিন্তু এত সংখ্যক নেতাকর্মী নিয়েও তারা ব্যর্থ কেন! এত বড় সংখ্যক নেতাকর্মী নিয়ে তারা তাদের নেত্রীকে জেল থেকে মুক্ত করতে পারেনি। কোন আন্দোলনই তারা করতে পারল না! বরং তাদের নেত্রীকে সরকারের অনুকম্পায় ফিরোজায় থাকতে হচ্ছে। ফলে স্বভাবতই বিএনপির নেতাকর্মীর সংখ্যা কত সেটা একটা বড় প্রশ্ন। আর এত নেতাকর্মী থাকা সত্বেও তাদের নেতাকে লন্ডনে পালিয়ে থাকতে হচ্ছে! 

দ্বিতীয় আরেকটি বিষয় হল বিএনপির ৬০ লাখ নেতাকর্মী যদি জেলে থাকেন তাহলে দেশের জেলখানা গুলোর ধারণ ক্ষমতা কত। এবং সেখানে যদি বিএনপির নেতাকর্মীর সংখ্যাই হয় ৬০ লাখ তাহলে এর মধ্যে সাধারণ কয়েদি কোথায় আছেন। তাদেরকেই বা কোথায় রাখা হয়েছে।

কথায় আছে, পথের মাঝে পথ হারালে আর কি পথ ফিরে পাওয়া যায়! বিএনপির অবস্থায় এখন তাই। তারা রাজনীতির পথের মাঝে রাজনীতির পথ হারিয়ে ফেলেছেন। কোনটা রাজনীতি আর কোনটা রাজনীতি নয় সেটাও বিএনপির নেতাকর্মীরা বোধহয় ভুলে গেছেন কিংবা বুঝতে পারছেন না। অন্য আরেকটি কথায় আছে যে, স্বপ্নে যখন কেউ কিছু খাবে তখন পান্তা খাবে কেন? পোলাও কোরমা খাওয়াই ভালো। বিরিয়ানিও খাওয়া যেতে পারে। সুতরাং ৬০ লাখ না বলে তাদের বলা উচিত ছিল বাংলাদেশে তো প্রায় ১৮ কোটি লোক আছে এর মধ্যে ৬ কোটি লোকই বিএনপির নেতাকর্মী। তাহলে অত্যন্ত লোকে আরও ভালো ভাবে বুঝত যে, বিএনপি আসলেই অনেক বড় একটি শক্তিশালী দল এবং তাদের আন্তর্জাতিক মুরব্বিরা বুঝতে পারত যে, বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থা অত্যন্ত ভালো। 

তবে বাস্তবতা হল বিএনপি ৬০ লাখ নেতাকর্মী দাবি করলেও আসলে তাদের কোন জনসমর্থনই নাই। যদি তাই থাকত তাহলে তারা নির্বাচন বিষয়টিকে এত ভয় পেত না। নির্বাচন বর্জনের মতো সিদ্ধান্ত নিত না। শুধু তাই নয়, বিদেশিও তাদের কোন বন্ধু নাই। যারা আছে সেই বন্ধুদের কথায় দলটি বরং এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে যাচ্ছে। দেশিয় বিএনপির যে সমস্ত বন্ধুরা ছিলেন, বিভিন্ন সময় বিএনপিকে সমর্থন দিয়ে কিছু লেখালেখি করতেন, তাদেরকে রাষ্ট্রক্ষমতার স্বপ্ন দেখাতেন তারাও এখন হারিয়ে গেছেন। সব কিছু মিলিয়ে দলটি এখন অনেকেটা এতিম হয়ে গেছে। এভাবে চলতে থাকলে হয়ত সামনে দলটির নাম নিশানাও থাকবে না। যারা নিজের দলের নেতাকর্মীর সঠিক সংখ্যা জানেন না তাহলে বুঝতে হবে সেই দলটি এখন কোন পর্যায় গেছে। কতটা দেউলিয়া হলে একটি দলের নেতাকর্মীর সংখ্যা নিয়ে তারা নিজেরাই বিভ্রান্ত হন। সুতরাং দলটি যে অচিরেই হারিয়ে যেতে বসছে সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না।


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

বৈশাখে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে

প্রকাশ: ০৮:০০ এএম, ১৪ এপ্রিল, ২০২৪


Thumbnail

‘এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ।/তাপসনিশ্বাসবায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে/ বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক/যাক পুরাতন স্মৃতি, যাক ভুলে-যাওয়া গীতি/ অশ্রুবাষ্প সুদূরে মিলাক/ মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা,/ অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।’ অর্থাৎ ১৪৩১ বঙ্গাব্দে পুরাতন স্মৃতি মুছে যাক, দূরে চলে যাক ভুলে যাওয়া স্মৃতি, অশ্রুঝরার দিনও সুদূরে মিলাক। আমাদের জীবন থেকে বিগত বছরের ব্যর্থতার গ্লানি ও জরা মুছে যাক, ঘুচে যাক; নববর্ষে পুরাতন বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক। রমজান ও ঈদের পর দেশের মানুষের জীবনে আরো একটি উৎসবের ব্যস্ততা নতুন বছরে মঙ্গল শোভাযাত্রায় উদ্ভাসিত।ফিলিস্তিনবাসীর উপর হামলা আর ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে এর মধ্যে মারা গেছেন অসংখ্য মানুষ।তবু মৃত্যুর মিছিলে জীবনের গান ফুল হয়ে ফুটেছে। যুদ্ধের সংকট আমাদের পরাস্ত করতে পারেনি কারণ পৃথিবীর মৃত্যু উপত্যকা পেরিয়ে এদেশে বৈশাখ এসেছে নতুন সাজে। 

১৪ এপ্রিল বাংলাদেশের নববর্ষ। টি এস এলিয়টের ভাষায় ‘এপ্রিল নিষ্ঠুরতম মাস’, দেখা যাচ্ছে কবির কথাই সত্য। তাপদাহে এই এপ্রিলই ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। তবে এই এপ্রিল আমাদের বৈশাখি/বৈসাবি/বিজু উৎসবের মাস- খররৌদ্র আর তীব্র ঝড়ের মাস হলেও। বৈশাখকে রবীন্দ্রনাথ প্রত্যক্ষ করেছিলেন ‘মোহন ভীষণ বেশে’, দেখেছিলেন ‘অতলের বাণী খুঁজে পাওয়া মৌনী তাপসরূপে’। অন্য কবি লিখেছেন- ‘রৌদ্রতপ্ত বৈশাখে তুমি চাতকের সাথে চাহ জল/আম কাঁঠালের মধুর গন্ধে জ্যৈষ্ঠে মাতাও তরুতল/ঝঞ্ঝার সাথে প্রান্তরে মাঠে কভু খেল লয়ে অশনি।’ বৈশাখে এই ‘অশনি’র খেলা নিশ্চয় কারো কাছে প্রত্যাশিত নয়।

বিশ্ব পরিস্থিতির সংকট আমাদের বৈশাখি আয়োজনের মধ্যে গরল উগড়ে দিলেও অতি সহজ-সরল, প্রশান্ত কিন্তু উদ্দীপনাময় আয়োজন এবারও। এখন আমরা প্রাণিত, আমাদের চিত্ত আনন্দিত এবং আমাদের চেষ্টা অব্যর্থ। অতীতের মতো এবারও সকালে হালখাতা খুলে দোকানে বসবে ব্যবসায়ী, বৈশাখি মেলায় নাগরদোলা, পুতুলনাচের উৎসবে শিশুদের কোলাহল শোনা যাবে। প্রতিবছর যেসব থিম অনুসারে সারাদেশে মঙ্গলশোভা যাত্রা অনুষ্ঠিত হতো তাও এবার হবে। রমনার বটমূলের প্রত্যুষের ছায়ায় আয়োজিত ছায়ানটের অনুষ্ঠান এবারও হচ্ছে।আর ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নতুন বছরকে বরণ করার জন্য তিনদিন ব্যাপী অনুষ্ঠানও শুরু হয়েছে।‘পাচন’ আর ‘পুণ্যাহে’র মতো নানাবিধ ব্রত ও বিধি পালনের সকল প্রথা অনুসৃত হচ্ছে।একসময় ভারতবর্ষে হিজরি পঞ্জিকা অনুসারে কৃষি ফলনের খাজনা আদায় করা হতো। ফলে প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল কৃষিকাজে ফসল না থাকলেও নির্দিষ্ট সময়ে খাজনা দিতে বাধ্য হতো কৃষকরা। খাজনা আদায়ের সময়টিকে কৃষকদের জন্য সহনীয় করতে প্রবর্তিত হয় ‘ফসলি’ সন। আসলে হিজরি সনের উপর ভিত্তি করে নতুন সনের নিয়ম প্রচলন করা হয়েছিল। ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দের ১০ মার্চ বা ১১ মার্চ থেকে বাংলা সন গণনার শুরু। তবে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর করা হয় আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় (৫ নভেম্বর, ১৫৫৬) থেকে। ক্রমান্বয়ে ফসলি সন বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিত লাভ করে। 

বাংলা নববর্ষ তথা পহেলা বৈশাখ বাঙালির সর্বজনীন উৎসব। বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনটি সূচনা হয় সূর্যোদয়ের প্রত্যুষে। কাজেই সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় বাঙালির পহেলা বৈশাখের উৎসব। ষাটের দশকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নিপীড়ন ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের প্রতিবাদে ১৯৬৭ সাল থেকে ২০২৩ অবধি ছায়ানটের রমনার বটমূলে বর্ষবরণ আয়োজন হয়ে এসেছে। অন্যদিকে নব্বই দশক থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে পহেলা বৈশাখ সকালে মঙ্গলশোভাযাত্রা বের হয়ে শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণের সূচনা হয়। মঙ্গল শোভাযাত্রাটি ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হওয়ার পর সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমানের উৎসাহে ২০১৩ সাল থেকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পহেলা বৈশাখের উৎসবের একটি অন্যতম আকর্ষণ হয়ে ওঠে। পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের অনেক অঞ্চলে চৈত্র সংক্রান্তির দিন পালিত হয় চড়কপূজা অর্থাৎ শিবের উপাসনা। একইসঙ্গে ওইদিন গ্রামবাংলায় আয়োজিত হয় চড়ক মেলা।

নববর্ষের সকল আনন্দ, উৎসব ও অনুষ্ঠান আয়োজনের কথা স্মরণ করেও আমরা আজ বলতে বাধ্য হচ্ছি, সংকটে আক্রান্ত বিশ্বে আমাদের কাছে এখন বেঁচে থাকার গৌরব অত্যন্ত বেশি। নিকট আত্মীয় হোক, দূরের বন্ধু হোক, দিনে হোক, দিনের অবসানে হোক, আমরা এখন ভালোভাবে বেঁচে থাকতে  চাই। সংকট এলে কী করি, কীভাবে অগ্রসর হই, কোথায় যাই, কোথায় সেবা করে আত্মবিসর্জন করতে হবে, এটাই শান্তচিত্তে আমরা খুঁজছি। ১৪ এপ্রিল শুরু হওয়া নতুন বছরের আগে ছিল কাজ, অকাজ, অকারণ কাজ, যে উপায়েই হোক, জীবনের শেষ নিমেষপাত পর্যন্ত ছুটাছুটি করে, মাতামাতি করে বেঁচে থাকা। ওই কর্ম-নাগরদোলার ঘূর্ণিনেশা আমাদের পেয়ে বসেছে বলেই পৃথিবী হয়েছে শান্তিতে পূর্ণ। অবশ্য দুর্গম হিমালয়শিখরের নিরুদ্বিগ্ন প্রাণিদের জীবন বিপন্ন; জনশূন্য তুষারমরুর বিশ্বস্তচিত্ত সীল এবং পেঙ্গুইনদের নির্বিরোধে প্রাণধারণ করার সুখটুকু বিলীন এখন। বাণিজ্যপুঁজি ও শিল্পপুঁজির দাপটে আফ্রিকা আর দক্ষিণ-আমেরিকার প্রত্যন্ত দরিদ্র অঞ্চলেও আধুনিকতার নামে মৃত্তিকাসংলগ্ন সভ্যতার তিরোধান ঘটেছে। বিচিত্র কর্মের পিছনে মানুষের ছুটে চলার বিপরীতে রয়েছে নির্জন প্রকৃতির স্তব্ধতা। তার রূপ অক্লিষ্ট অক্লান্ত, তার সাজগোজ বিস্তীর্ণ নীলাকাশ থেকে অরণ্যের সবুজে প্রসারিত। প্রকৃতি নিজেকে চিরকাল প্রকাশমান রেখেছে, মানুষের মতো ঊর্ধ্বশ্বাস কর্মের বেগে নিজেকে অস্পষ্ট করে তোলেনি। মানুষের কর্মের চতুর্দিকে অবকাশ ও চাঞ্চল্যকে ধ্রুবশান্তির দ্বারা মথিত করে সে চিরনবীনের বার্তাবাহক। এই একুশ শতকেও গ্রামীণ জীবনের প্রাধান্যের মধ্যে বাঙালি হিসেবে রাতদিনের কর্মযজ্ঞে ইউরোপ-আমেরিকার মতো আমাদের ব্যস্ত থাকার কথা নয়। এখনো প্রকৃতির উদার শান্তি, বিশাল স্তব্ধতার মধ্যে আমরা পরিভ্রমণ করতে পছন্দ করি। এজন্যই বৈশাখের তপ্ত আকাশ, তার শুষ্ক ধূসর প্রান্তরের নীরব মধ্যাহ্ন, নিঃশব্দ রাত্রি অথবা ঝড়ো হাওয়ার আলিঙ্গনে আমাদের জীবন মুখরিত হয়।

আজকের দিনের বহু আড়ম্বর, আস্ফালন, করতালি, মিথ্যাবাক্য, যা আমাদের স্বরচিত, যাকে বাংলাদেশের মধ্যে আমরা একমাত্র সত্য, একমাত্র বৃহৎ বলে মনে করছি, সেই কর্পোরেট কালচারের ঢেউ থেকে বের হয়ে আসতে হবে। কারণ নববর্ষ সকলকে একই কাতারে নিয়ে আসে। সেখানে শ্রমজীবী আর বুদ্ধিজীবী একসঙ্গে চলেন, প্রত্যেকে নিজকে এবং জগৎকে ঠিকভাবে দেখতে পান, উৎসবের মধ্য দিয়ে সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে মিলনলাভ সম্ভব হয়। উৎসবের আয়োজনে ব্যক্তিগত ভোগের নিবিড়তা নেই বরং বৈশাখি আনন্দ আত্মীয়-স্বজন-প্রতিবেশীর মধ্যে ব্যাপ্ত করে দিয়েছে মহত্ত্ব। নববর্ষের আনন্দ আমাদের ঘরকে, মনকে, সমাজকে কলুষের ঘনবাষ্প থেকে অনেকটা পরিমাণে নির্মল করে রাখে, দূষিত বায়ুকে বদ্ধ করে রাখে না এবং মলিনতার আবর্জনাকে একেবারে গায়ের পাশে জমতে দেয় না। পরস্পরের কাড়াকাড়িতে ঘেঁষাঘেঁষিতে যে রিপুর দাবানল জ্বলে উঠে উৎসবে তা প্রশমিত থাকে; কর্মের সঙ্গে শান্তিকে জড়িত করে রেখে বৈষম্যহীন সমাজ তৈরি করে। উৎসব আমাদের শিখিয়েছে মানুষ বড়ো, পদ বড়ো নয়; দারিদ্র্য লজ্জাকর নয়, সকল কর্মে, সকল অবস্থাতেই সহজে মাথা তুলে রাখা যায়। আমাদের দেশে স্বস্থানের নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে সকলেই আপনার নিশ্চিত অধিকারটুকুর মর্যাদা ও শান্তি লাভ করে। উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর ধনি হওয়ার প্রচেষ্টা অন্যকে ছোটো করে দেখার দৃষ্টি তৈরি করে দেয় না। এজন্য নববর্ষের উৎসব সর্বজনীন।

এসেছে পহেলা বৈশাখ, ৩০ চৈত্রে ১৪৩০ বঙ্গাব্দ বিদায় নিয়েছে। এজন্য- ‘উড়ে যাক, দূরে যাক বিবর্ণ বিশীর্ণ জীর্ণ পাতা/বিপুল নিঃশ্বাসে।’ রবীন্দ্রনাথ ‘নববর্ষ’ প্রবন্ধে লিখেছেন- ‘পুরাতনই চিরনবীনতার অক্ষয় ভাণ্ডার।...নূতনত্বের মধ্যে চিরপুরাতনকে অনুভব করিলে তবেই অমেয় যৌবনসমুদ্রে আমাদের জীর্ণ জীবন স্নান করিতে পায়।’ এই ‘চিরপুরাতন’ হলো আমাদের চিরায়ত ঐতিহ্য। আজকের এই নববর্ষের মধ্যে বাঙালির বহুসহস্র পুরাতন বর্ষকে উপলব্ধি করতে হবে। কারণ সেখানে রয়েছে সম্রাট আকবর কর্তৃক বঙ্গাব্দ প্রচলনের ইতিহাস, সেখানে আছে গ্রামীণ বাংলার হালখাতা আর বৈশাখি মেলার আয়োজন, আছে বাঙালি জমিদারদের পুণ্যাহের উৎসব। ফসলের ঘ্রাণে গড়ে ওঠা আমার নববর্ষ শাশ্বত ও গৌরবের। নববর্ষে বৈশাখের খররৌদ্রে অগ্নিস্নানে শুদ্ধ হয়ে উঠুক আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র। ‘হে নূতন, এসো তুমি সম্পূর্ণ গগন পূর্ণ করি/পুঞ্জ পুঞ্জ রূপে-/ ব্যাপ্ত করি, লুপ্ত করি, স্তরে স্তরে স্তবকে স্তবকে/ ঘনঘোরস্তূপে।’ ‘ঘনঘোরস্তূপে’ নতুনের এই আহ্বান প্রকৃতপক্ষে সংকট কবলিত বাঙালির জীবনে প্রত্যাশার অভিব্যক্তি। এ মুহূর্তে আমরা পৃথিবীতে যতটুকু কাজ করি তা যেন সত্যসত্যই দায়িত্ব পালনের জন্য করি, ভান না করি। কারণ অক্ষমরা বৃহৎ কাজ করতে পারে না বরং বৃহৎ ভানকে শ্রেয়স্কর জ্ঞান করে। জানে না যে মনুষ্যত্বলাভের পক্ষে বড়ো মিথ্যার চেয়ে ছোটো সত্য ঢের বেশি মূল্যবান। এই সত্য পথে হেঁটে আমরা নববর্ষের চেতনায় সংকট জয় করব। আর এই বৈশাখেই মানবজীবনকে অশান্তি মুক্ত করার শপথ নিতে হবে। কারণ- বৈশাখে ‘মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে’।

লেখক: ড. মিল্টন বিশ্বাস, বঙ্গবন্ধু গবেষক, অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, বাংলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিশিষ্ট লেখক, কবি, কলামিস্ট, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রগতিশীল কলামিস্ট ফোরাম, নির্বাহী কমিটির সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ email-drmiltonbiswas1971@gmail.com)



মন্তব্য করুন


বিজ্ঞাপন