ইনসাইড থট

শেখ রাসেল: অকালে ঝরা এক লালগোলাপ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১২:১৫ পিএম, ১২ নভেম্বর, ২০২১


Thumbnail

‘আমি মায়ের কাছে যাব’। শেখ রাসেলকে মায়ের কাছে নিয়ে যাওয়ার পর মায়ের লাশ দেখে অশ্রু সিক্ত কণ্ঠে মিনতি করেছিলেন- ‘আমাকে হাসু আপার (শেখ হাসিনা) কাছে পাঠিয়ে দিন’।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট প্রতুষ্যে হায়েনারুপী বিপদগামী একদল সেনা কর্মকর্তা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্য এবং তাঁর ব্যক্তিগত কর্মচারীদের সাথে শিশু শেখ রাসেলকেও হত্যা করে। হত্যার পূর্বে খুনীরা বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত কর্মচারী আব্দুর রহমান রমাসহ শেখ রাসেলকে আটক করে। আতঙ্কিত হয়ে শিশু রাসেল কান্নাজড়িত কণ্ঠে উপরোক্ত কথাগুলো বলেছিলেন, বাঁচার জন্য আকুলভাবে কাকুতি-মিনতি করছিলেন, কিন্তু পাষন্ড খুনীরা তাঁকে বাঁচতে দেয়নি।

পূর্ববঙ্গের রাজধানী ঢাকায় ১৯৬৪ সালের ১৮ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারে একজন নতুন অতিথির আবির্ভাব হয়। শেখ ফজিলাতুন্নেচ্ছা মুজিবের কোলে হেমন্তের প্রহরে ভূমিষ্ঠ হয় ফুটফুটে এক পুত্র সন্তান, আনন্দে উদ্ভাসিত পুরো শেখ পরিবার, খ্যাতিমান ব্রিটিশ লেখক ও দার্শনিক, নোবেল বিজয়ী ব্যক্তিত্ব বার্ট্রান্ড রাসেলের নামানুসারে ছোট্ট শিশুটির নাম রাখা হয় রাসেল আর শেখ পরিবারে জন্মগ্রহণ করায় তাঁর নাম হলো শেখ রাসেল। ১৮ অক্টোবর ২০২১, সরকারি উদ্যেগে প্রথমবারের মত ‘শেখ রাসেল দিবস’ উদযাপন করা হয় তাঁর আদর্শ, মানবিক গুণাবলি, মূল্যবোধ, আবেগ ও ভালোবাসা বর্তমান প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার জন্য। দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় ‘ শেখ রাসেল, দীপ্ত জয়োল্লাস, অদম্য আত্ববিশ্বাস’ এর মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁকে বিশেষভাবে উপস্থাপন করাই ছিল উদ্দেশ্য।

শিশু শেখ রাসেলের গন্ডি ছিল বাবা মা, অর্থাৎ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বেগম মুজিব। একই সাথে তাঁর সময় কাটাতো দুইবোন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা এবং দুইভাই শেখ জামাল ও শেখ কামালের সাথে। সেই আদরের শিশুটির জীবন খুব ছোট পরিক্রমার মধ্যে বেড়ে উঠছিলো। যে রাসেল ছোটবেলা থেকে খেলার সাথীদের নিয়ে প্যারেড করতো, স্বপ্ন দেখতো সে বড় ভাই শেখ জামালের মতো সেনা অফিসার হবে। আজ বেঁচে থাকলে হয়তো সে সেনাবাহিনীর বড় অফিসার হতো। বেঁচে থাকলে আজ ৮ নভেম্বর ২০২১ তাঁর বয়স ৫৭ পেরিয়ে আরো ২০ দিন হতো। কিন্তু সে চিরদিন ১১ বছরের শিশু শেখ রাসেল হয়েই বেঁচে থাকবেন ইতিহাসের পাতায় ।

১৯৭২ সালে জাপানী চলচ্চিত্রকার Nagisa Oshima নির্মিত `Rahman, Father of Bengal` স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে জাপানি সাংবাদিক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাক্ষাৎকার গ্রহণের সময় প্রশ্ন করেছিলেন-, ‘লক্ষ করছি একটি ছোট্ট ছেলে সবসময় আপনার চারপাশে ঘুরঘুর করে। ছেলেটি কে? কেন তিনি সবসময় আপনার চারপাশে থাকে?’

উত্তরে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন-,‘ছেলেটির বাবা সবসময়ই কারাগারে থাকতো। ফলে সে তার বাবার স্নেহ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। আমি তার বাবা, তাই সবসময় তাকে কাছে রাখি।’

শেখ রাসেল, এক অনন্ত বেদনার কাব্য আলেখ্য। জেলজীবনে বঙ্গবন্ধুর দৈনন্দিন স্মৃতিকথা ‘কারাগারের রোজনামচা’  গ্রন্থেও তাকে নিয়ে লেখা আছে অনেক দুঃখগাঁথা। ১৯৬৬ সালের ৬ জুলাই বঙ্গবন্ধু লিখেছেন-, ‘বাচ্চারা দেখতে চায় কোথায় থাকি আমি। বললাম, বড় হও, মানুষ হও, দেখতে পারবা।’ মায়ের কোলে চড়ে মাত্র দেড় বছর বয়সে বাবাকে একনজর দেখার জন্য ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার যেতো শেখ রাসেল। তার কাছে জেলখানাটি ছিল আব্বার বাড়ি। ১৫ দিন পরপর বেগম মুজিব তার সন্তানদের সঙ্গে নিয়ে তাদেও আব্বার বাড়ি অর্থাৎ জেলখানায় যেতেন। শেখ রাসেল বাবাকে রেখে আসতে চাইতো না। কিন্তু একবুক ব্যথা নিয়ে প্রতিবার তাকে ফিওে আসতে হতো, বাবা থেকে যেতেন তার বাড়িতে। একটি শিশু ও একটি পরিবারের ক্ষেত্রে এই গল্পগুলো অনেক কঠিন। এটি একটি পরিবারের হাসি কান্না, সুখ-দুঃখ এবং সেই পরিবারের মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র পেয়েছি।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু যখন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিলেন, প্রথমবারের মতো মুক্ত জীবনের স্বাদ পেলো শিশু শেখ রাসেল। ভর্তি হলো ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলে। কচিকাঁচার দলের সঙ্গে ছিল তার অবাধ মেলামেশা। সুস¤পর্ক ছিল শিক্ষক থেকে গৃহকর্মী, সবার সঙ্গে। জাতির পিতার সন্তান হিসেবে তার মধ্যে কোনো অহংকার ছিল না। স্কুলের গেট থেকে খানিকটা দুরে গাড়ি থেকে নেমে হেঁটে স্কুলে প্রবেশ করতেন যেন অন্য সতীর্থরা কষ্ট না পায়। বাড়ি থেকে দেওয়া টিফিন ভাগ করে খেতেন বন্ধুদের সঙ্গে।

শেখ রাসেলের জীবনকাল স্বল্প কিন্তু ঘটনাবহুল ও উদ্দীপনাময়। এ সময়ে তিনি কিছু লিখে যাননি বা বলে যাননি। কিন্তু তার দৈনন্দিন কর্মকান্ড ও আচার-আচরণ থেকে অনেক কিছু শেখার আছে বিশেষ করে শিশুদের। তিনি প্রধানমন্ত্রীর ছেলে হিসেবে তিনি কোনো সুবিধা নেননি বা প্রকাশ করেননি। এ ব্যাপারে তাঁর প্রিয় ‘হাসু আপা’ অর্থাৎ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একাধিক স্মৃতিচারণে তার বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী তুলে ধরেছেন। এ ছাড়া তাঁর গৃহশিক্ষক গীতালি দাশগুপ্তাও অনেক স্মৃতি রোমন্থন করেছেন।

২০১৯ সালে শেখ রাসেলের জন্মদিনের আলোচনা সভায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘বন্দিখানায় থাকা অবস্থায় যখন যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, সেই যুদ্ধের সময় যখন আক্রমণ হতো, রাসেল পকেটে সব সময় একটু তুলা রাখতো। নিজের কানে দেওয়ার পাশাপাশি ছোট্ট জয়ের কানেও তুলা দিয়ে দিতো, যেন ওই আওয়াজে জয়ের কোনও ক্ষতি না হয়। রাসেল জয়ের প্রতি খুব খেয়াল রাখতো । সব সময়ই তার সেদিকে বিশেষ নজর ছিল।’ অপর এক আলোচনায় রাসেলের জীবনের ইচ্ছে এবং তার কোমল হৃদয়ের চাওয়া নিয়ে বলতে গিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘রাসেলের খুব শখ ছিল সে বড় হয়ে আর্মি অফিসার হবে এবং সেভাবে কিন্তু সে নিজেকে তৈরি করতো। ছোট ছোট গরিব শিশুর প্রতি তার দরদ ছিল, যখন সে গ্রামে যেতো, গ্রামের অনেক শিশুকে সে জোগাড় করতো। সে কাঠের বন্দুক বানাতো। শিশুদের জন্য মাকে বলতো কাপড় কিনে দিতে হবে। মা ঠিকই কিনে দিতেন। বাচ্চাদের সে প্যারেড করাতো।’

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তি জীবনের অজানা-অদেখা গল্প নিয়ে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র ‘হাসিনা: অ্যা ডটারস টেল’-এ ছোট্ট রাসেল সম্পর্কে বলেছেন-, ‘রাসেল হওয়ার পরে আমরা ভাইবোনেরা খুব খুশি হই। যেন খেলার পুতুল পেলাম হাতে। ও খুব আদরের ছিল আমাদের। একটা ব্যক্তিত্ব নিয়ে চলতো। ওইটুকু একটা মানুষ, খুব স্ট্রং পার্সোনালিটি।’ শেখ হাসিনা রচিত আমাদের ছোট রাসেল সোনা বইয়ে স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন, ‘আমাদের পাঁচ-ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট রাসেল। ছোট্ট রাসেল আস্তে আস্তে বড় হচ্ছে। মা রাসেলকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে সংসারের কাজ করতেন, স্কুল বন্ধ থাকলে তার পাশে শুয়ে আমি বই পড়তাম। আমার চুলের বেণি ধরে খেলতে খুব পছন্দ করতো ও। আমার লম্বা চুলের বেণিটা ওর হাতে ধরিয়ে দিতাম। ও হাত দিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে হাসতো । কারণ, নাড়াচাড়ায় মুখে চুল লাগতো তাতে খুব মজা পেতো।’

অন্যদিকে শেখ রাসেলের গৃহশিক্ষক গীতালি দাশগুপ্তা তাঁর স্মৃতিচারণে বলেন-, ‘পড়ানোর জন্য একটু নিরিবিলি জায়গা পাওয়া সহজ ছিল না। তদুপরি রাসেল ছিল দূরন্ত। পড়ানো শুরুর মাস খানেক পর শেখ হাসিনা একটি শাড়ি গৃহশিক্ষকের হাতে তুলে দিয়ে বলেন, ‘রাসেলকে টানা এক মাস পড়াতে পারার জন্য এই নাও উপহার। এর আগে কোনো শিক্ষক এক মাস টেকে নাই।’

গীতালি দাশগুপ্তা বলেন, ‘একবার শেখ জামালের ঘরে পড়াচ্ছি। গৌতম বুদ্ধের একটি পিতলের মূর্তি দেখিয়ে তাঁর জীবনের নানা ঘটনা বলি। মহাপুরুষদের জীবনী খুব উৎসাহ নিয়ে শুনত। পরদিন পড়াতে গেলে বঙ্গবন্ধু আমাকে বলেন, ‘মাস্টর, এত বড় সর্বনাশ করলি।’ স্বাভাবকিভাবেই শিক্ষক উদ্বিগ্ন হয়েছিল প্রধানমন্ত্রীর ছোট ছেলেকে কোনো ভুল শিক্ষা দিয়েছে কী? বঙ্গবন্ধু তাকে কাছে ডেকে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলেন, তুই গৌতম বুদ্ধের জীবন কাহিনী রাসেলকে বলেছিস? ও গত রাতে একটা পর্যন্ত জেগেছিল। আমি কাজ শেষে ঘুমাতে গেলে বুদ্ধদেব সম্পর্কে আরও জানতে চায়।’ এমন অদম্য কৌতূহল ছিল শেখ রাসেলের।

১৯৭২ সালের জুলাই মাসে বঙ্গবন্ধু চিকিৎসার জন্য লন্ডন যান। সেখানে অস্ত্রোপচারের সময় পরিবারের অন্য সদস্যরাও উপস্থিত ছিল। বঙ্গবন্ধু সুস্থ হলে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বাজারে আসা নতুন সিনথেটিক শাড়ি কিনলে রাসেল বায়না ধরে তার শিক্ষকের জন্যও একটা কিনতে হবে। দুই বোন শাড়ি নিয়ে ফিরলে রাসেলের মনে হয় যে, তাঁর শিক্ষকের জন্য কেনা শাড়িটির চেয়ে দুই আপার শাড়ি সুন্দর। এ নিয়ে অভিমান করে, কান্নায় বুক ভাসায়। শিক্ষক শাড়ি পেয়ে খুব খুশি হয়েছে এটা জানানোর পরই কেবল রাসেলের মন ভাল হয়। শিক্ষকের প্রতি তার এই অগার শ্রদ্ধা ও  ভালোবাসা নতুন প্রজন্মের জন্য মাইলফলক হয়ে থাকবে।

শেখ রাসেলের হাসু আপু ১৫ আগস্টের ভয়াবহ কালরাতের মাত্র কয়েকদিন পূর্বেই সুদূর জার্মানে স্বামীগৃহে চলে যান, সাথে আরেক বোন শেখ রেহানাও। হাসু আপু জার্মান যাওয়ার সময়, ‘আমি হাসু আপুর সাথে যাবো, দেনা আপুর সাথে যাবো’ বলে খুব কেঁদেছিল রাসেল। শেখ রেহানাকে ‘দেনা আপু’ বলে ডাকতেন শেখ রাসেল। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তেও সেই হাসু আপুর কাছে যাওয়ার জন্যেই আকুতি-মিনতি করেছিল, মায়ের পর হাসু আপুকেই নিরাপদ আশ্রয় মনে করেছিলেন তিনি।

শেখ রাসেল দিবস ২০২১ উদযাপন উপলক্ষে কৃষি মন্ত্রণালয় আয়োজিত আলোচনা সভায় স্বাগত বক্তব্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক একান্ত সচিব ওয়াহিদা আক্তার মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, ‘শেখ রাসেল এর হাসু আপু স্বামীর কর্মস্থল জার্মানে গিয়ে ছোট ভাই রাসেলের পছন্দের খেলনা কিনেছিলেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজও ঐসকল খেলা সামগ্রী আগলে রেখেছেন।’

বাঙালি জাতির জাগরণকালে সৌভাগ্যের প্রতীক হয়ে জন্মেছিল যে শিশু, জান্তাদের দানবীয় ষড়যন্ত্র তাকে নিয়ে গেছে ইতিহাসের ভাগ্যহত নক্ষত্রদের কাতারে। সেই দেবশিশুর নাম শেখ রাসেল, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কনিষ্ঠ পুত্র। বন্দি পিতার দীর্ঘ জেলজীবনের সময়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে মায়ের কোলে চড়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়মিত যেতো ছোট রাসেল। কিন্তু বেগম ফজিলাতুন্নেচ্ছা মুজিবকে গোয়েন্দারা কোলের শিশু রাসেলকে নিয়ে জেরা করতেন। বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেচ্ছা বিরুক্তি ও প্রচন্ড ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘বাপের পিছনে গোয়েন্দা লেগেছিল ২৮ বছর বয়সে, আর ছেলের পেছনে লাগলো দেড় বছর বয়সেই?`

ছোট্ট রাসেলের আর বড় হওয়া হয়নি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কালরাতে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর রোডের ৬৭৭ নম্বর বাড়িতে, বাবা-মা ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। মাত্র দশ বছর দশ মাস বয়সের এক নি¯পাপ শিশু, কী দোষ ছিল রাসেলের! সেই বিভিষীকাময় রাতে, ঘাতকরা যখন বিশ্ব ইতিহাসের বর্বরতম হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছিলো, প্রাণে বাঁচার জন্য মিনতি জানিয়েছিল ছোট্ট রাসেল। মায়ের কাছে যাবে বলে যার আকুতি, গলা শুকিয়ে যাওয়া কান্না যার চোখেমুখে ছিল, ভয়ে থরথর করে যে কাঁপছিল তাকে মায়ের কাছে নিয়ে যাবে বলে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে ঠান্ডা মাথায় গুলি করে নরপিশাচদের একজন। বাঁচতে দিল না রাসেলকে, সীমারদের মনে বিন্দুমাত্র দয়ামায়া ছিল না।

সকলের এতো আদরের ছোট্ট শেখ রাসেল ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্টের কালো রাতের শেষ প্রহরে আতঙ্কিত হয়ে মায়ের কাছে যাওয়ার জন্য কাকুতি মিনতি করতে থাকলে নরপিশাচরা, মায়ের কাছে নিয়ে যাবে বলে, গৃহকর্মী আব্দুর রহমান রমার হাত থেকে হেঁচকা টান দিয়ে শেখ রাসেলকে ছিনিয়ে নেয়। এরপর মৃত্যু পর্যন্ত পরবর্তি সময়টুকু তাঁর কেমন কেটেছিল, কতটুকু মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক হয়েছিল তা ঐ ঘাতকেরাই জানে। তবে মনের চোখ দিয়ে যদি দেখি বা অনুমান করি তবে হয়তো এভাবে বলা যায়-, ‘মায়ের কাছে নিয়ে যাওয়ার পথে রাসেল দেখলো সিঁড়িতেই পড়ে আছে তাঁর পিতার লাশ । হতভম্ব সে। নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিলো না। এ কি করে হয়? স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে বাঙালি জাতির পিতা, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লাশ পরে আছে সিঁড়িতে? কিন্তু কিছু বুঝে ওঠার আগেই হায়েনারা তাঁকে টেনে হেঁচড়ে নিয়ে গেল মায়ের কাছে। মায়ের লাশ দেখে, মায়ের নিথর বুকে আছড়ে পড়ে মা, মা বলে বুক ফাটিয়ে চিৎকার করে আর্তনাদ করেছিল সে। না, মায়ের কোন সাড়া শব্দ নেই। মা তাঁকে বুকে জড়িয়ে আদর করে বলেনি, ‘ভয় নাই বাবা। কিচ্ছু হবে না। আমিতো আছি তোমার কাছে’। মা-বাবার পর ঐ ছোট্ট শিশু দেখলো তাঁর বড় ও মেঝ ভাই ও ভাবীদের লাশ।’

আমরা পরিবারের একজন নিকটাত্মীয়র মৃত্যুতে ভেঙ্গে পরি, চাপা ব্যথা অনুভব করি, সেই ব্যথা প্রশমনে আর্তনাদ করি, নীরবে অশ্রু ত্যাগ করি। তাহলে শিশু শেখ রাসেল অল্পক্ষণের মধ্যে বাবা-মা সহ নিজ পরিবারের এতজন সদস্যের মৃত্যু এবং তাঁদের সারিসারি লাশ দেখে কী অসহনীয় যন্ত্রণা সহ্য করেছেন? হয়তো ভেবেছেন, হাসু আপু, দেনা আপুর সাথে জার্মানি বেড়াতে গেলেই ভালো হতো। হয়তো ভেবেছেন, হাসু আপু আমাকে নিয়ে গেল না কেন? এমনি অবস্থায়ই হঠাৎ গর্জে উঠে ঘাতকের আগ্নেয়াস্ত্র, ঝাঁঝড়া হয়ে যায় শেখ রাসেলের বুক, ঘাতক বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে সাঙ্গ করে দেয় তাঁর জীবন প্রদীপ ।

 

স্বল্প ফুটেই সুরভী ছড়াতে শুরু করেছিল যে ফুল, সেটি অকালে ঝরে যাওয়ার শোকে আজও প্রতি ভোরে বাঙলার মাঠে-ঘাটে অজস্র বকুল ফুটে, ঝরে শেফালী-হাসনাহেনা। ঝরা বকুলের প্রতিবিম্বে বাংলার প্রতিটি শিশুর প্রাঞ্জল হাসির শব্দ ভেসে ওঠে- ভেসে ওঠে রাসেলের মায়াবী মুখখানি, শিশুদের ভেজা কপোল ছুঁয়ে নামে রাসেলের চোখের পানি। এ পানিতে পবিত্র হয়ে বর্তমান প্রজন্ম শহীদ শেখ রাসেলের আদর্শ, মানবিক গুণাবলী, মূল্যবোধের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে বাংলাদেশের শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি করবে, ব্যক্তি জীবনে বয়ে আনবে ইতিবাচক পরিবর্তন সেই প্রত্যাশা সকলের।

১৯৭৫ এর ১৫ আগস্টের কালো রাতের শেষ প্রহরে শেখ রাসেল আতঙ্কিত হয়ে মায়ের কাছে যাওয়ার জন্য কাকুতি-মিনতি করেছিল, সে দৃশ্য কল্পনায় আমার নিবেদন নিচের কাব্য-কথা।

আমি মায়ের কাছে যাবো

তোমরা আমাকে মেরো না

আমি মায়ের কাছে যাবো

তোমরা আমার দুবাহু ছাড়ো

আমি নিরুদ্দেশ হয়ে যাবো।

আমি ভোরের শিশির হবো

আগুনমুখার শুভ্র ঢেউ হবো

ধানের কচি ডগার বিন্দু হবো

স্নেহসুধায় বাংলাদেশকে ভরিয়ে দেবো।

তোমরা আমাকে মেরো না

আমি বন্ধুদের কাছে যাবো

নাড়ার আগুনে ছোলা পুড়িয়ে

বাংলার মাঠে বসে খাবো।

আজান দিয়েছে, ভোর হয়েছে

পড়াশোনার টাইম হয়েছে, স্কুলেতে যাবো

তোমরা আমাকে মেরো না

আমি আমার মায়ের কাছে যাবো।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক
সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, ঢাকা



মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

বাংলাদেশের নির্বাচন: ব্যাপক বয়কট নাকি সর্বজন গৃহীত?

প্রকাশ: ০১:৫৭ পিএম, ১০ এপ্রিল, ২০২৪


Thumbnail

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার সোনালী যুগ পার করছেন। ইতিমধ্যে টানা চার মেয়াদে তুমুল ম্যান্ডেটের সাথে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর, তিনি বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী মহিলা সরকার প্রধানের লরেল ধরে রেখেছেন। জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ের মধ্য দিয়ে তিনি পঞ্চম্বারের মত ক্ষমতা নিশ্চিত করে এই অঞ্চলের প্রায় সব মহল থেকে প্রশংসার কুড়িয়েছেন। বিশ্বে এমন ঘটনা বিরল যেখানে কারও নেতৃত্বে থাকার ব্যাপারে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ চীন এবং ভারত উভয়ই একমত। শেখ হাসিনা সেই বিরল একটি দৃষ্টান্ত। মত কিংবা রাজনৈতিক আদর্শ, নির্বিশেষে সকল আঞ্চলিক শক্তিগুলো তার আসন্ন প্রশাসনকে অভিনন্দন জানায়। তবে জানুয়ারির নির্বাচনের পরে বেশিরভাগেরই দৃষ্টি যুক্তরাষ্ট্রের দিকে স্থির ছিল। কারণ বাংলাদেশের গনতন্ত্র নিয়ে নির্বাচনের আগে থেকেই বেশ সরব ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট বাংলাদেশের নির্বাচন অবাধ এবং সুষ্ঠু হয়নি বললেও মার্কিন কর্মকর্তারা নতুন সরকারকে স্বীকৃতি দেয় এবং একসঙ্গে কাজ করারও আশাবাদ ব্যক্ত করে। নির্বাচনের আগে বাংলাদেশের উপর যে মার্কিন চাপ দৃশ্যমান ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের এমন বক্তব্যে শেখ হাসিনা সরকারের উপর সেই মার্কিন চাপ অনেকটাই কমছে এবং তার আগামী পথচলাকে অনেকটাই সহজ করে দিয়েছে।  

তবুও, অনেকেই বলছেন বাংলাদেশের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ব্যাপকভাবে বয়কট করা হয়েছে। এর মূল কাওন হিসেবে তারা বলছেন, বিরোধী দলে নির্বাচন বয়কট এবং বিরোধীদের বয়কটের আহ্বানের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে সাধারণ জনগণের ভোট বর্জন।

অংশগ্রহণ নাকি বয়কট?

দেশটির প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং তার মিত্ররা নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করলেও সব বিরোধী দল অবশ্য তাদের অনুসরণ করেনি। নিবন্ধিত ৪৪টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে সাতাশটি দল প্রার্থী দিয়েছিল। এছাড়া প্রায় ৩০০ আসনের বিপরীতে প্রায় ১৯০০ স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে। তাই নির্বাচনে বিএনপির অনুপস্থিতি লক্ষ্য করা গেলেও, একাধিক নির্বাচনী এলাকার ব্যাপক প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন হয়েছে এবং ভোটাররা তাদের পছন্দের প্রার্থীকে নির্বাচিত করেছে।

নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৪১.৮ শতাংশ। গত নির্বাচনের তুলনায় এই সংখ্যা কম হলেও সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এই সংখ্যাকে কম বলার সুযোগ নেই। অনেকে এটিকে বিরোধী দলের নির্বাচন বয়কট জনমনে প্রতিফলিত হয়েছে বলে দেখছে। বিরোধীদের বয়কট নিঃসন্দেহে ভোটার উপস্থিতিতে প্রভাব ফেলেলেও, কম ভোটার উপস্থিতি মানেই জনগণ ভোটকে প্রত্যাখ্যান করেছে এওনটি ভাবার কোন সুযোগ নেই। মূলত বিএনপির বিভিন্ন নির্বাচন বিরোধী কর্মসূচী, বিক্ষোভ, সমাবেশ, গাড়িতে ট্রেনে বাসে অগ্নিসংযোগ, ভোটের আগের দেশব্যাপী ৪৮ ঘণ্টার হরতাল-অবরোধের ডাক দেশের পরিস্থিতিকে অস্থির করে তোলে। যার ফলে নিজদের নিরাপত্তার জন্যই অনেক ভোটার নির্বাচনের দিন ভোটকেন্দ্রে না গিয়ে বাড়িতে থাকতে বাধ্য হয়েছে।

তবে যে সব নির্বাচনী এলাকায় একাধিক জনপ্রিয় প্রার্থী নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন সেসব এলাকায় ভোটার উপস্থিতি ছিল ৬০ শতাংশের বেশি। আবার যেস এলাকায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা কম ছিল সেসব এলাকায় ভোটার উপস্থতি ছিল কম। অর্থাৎ ভোটাররা বিএনপির সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে নির্বাচন বর্জন করেনি; প্রতিদ্বন্দ্বিতাই মূলত ভোটার উপস্থিতিকে প্রভাবিত করেছে।

তবে নির্বাচন কমিশনের রিপোর্ট করা ভোটারদের পরিসংখ্যান নিয়ে বিভ্রান্তি রয়ে গেছে। দুপুরে নির্বাচন কমিশনের করা প্রেস ব্রিফিংয়ে ভোটার উপস্থিতি মাত্র ২৭ শতাংশ ঘোষণা করা হলেও, শেষে ৪১.৮ শতাংশ চূড়ান্ত ভোটার উপস্থিত ঘোষণা করা হয়। এর কারণ হিসেবে নির্বাচন কমিশন জানায়, দুপুরের সংখ্যাটি প্রকৃত সময়ে ছিল না। যেহেতু বাংলাদেশে ম্যানুয়াল পেপার ব্যালট সিস্টেম ব্যবহার করা হয় যেখানে ভোটগুলি হাতে গণনা করা হয় এবং গ্রামীণ এলাকা থেকে ফলাফল প্রেরণে কয়েক ঘন্টা পিছিয়ে ছিল। যা দুপুরের ভোটার উপস্থতি এবং সর্বশেষ ভোটার উপস্থিতির মধ্যে ব্যবধান ব্যাখ্যা করে। সেক্ষেত্রে মোট ভোটের ১৪ শতাংশ শুধু শেষ সময়ে দেয়া হয়েছে এমন অভিযোগ সত্য নয়।  

নির্বাচন কমিশন হয়ত সঠিক। কিন্তু যেহেতু সন্দেহের তীর ছোড়া হয়েছে সেহেতু, নির্বাচন কমিশন সমস্ত ভোটকেন্দ্রের প্রতি ঘণ্টায় ভোট গণনার বিস্তারিত একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে সন্দেহের সমাধান করতে পারে। এ ধরনের স্বচ্ছতা ভোটদানের প্রশ্নে স্পষ্টতা প্রদান করবে এবং যেকারো বিভ্রান্তি দূর করতে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে কাজ করবে।

বাংলাদেশ কি একদলীয় রাষ্ট্র?

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের আরেকটি নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর অনেকেই বাংলাদেশ একটি একদলীয় রাষ্ট্রের দিকে ধাবিত হচ্ছে বলে সতর্ক করেছেন। ৩০০ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ২২৩টি আসনে এবং আওয়ামী লীগের অনুগত স্বতন্ত্ররা আরও ৬২টি আসনে জয়লাভ করে। যার ফলে সংসদে ৯৫ শতাংশ নির্বাচিত সংসদ সদস্যই আওয়ামী লীগের পক্ষে এবং সংসদে কোন অর্থবহ বিরোধী দলের অস্তিত্ব নেই।

তবে বিষয়টি এত সরল নয়। প্রথমত, সংসদের স্বতন্ত্র সদস্যদের আওয়ামী লীগের ল্যাপডগ বলে উপেক্ষা করা বাংলাদেশের রাজ্নৈতিক প্রেক্ষাপটে কতটা যৌক্তিক সে প্রশ্ন থেকে যায়। কারণ প্রত্যেক স্বতন্ত্র প্রার্থী আওয়ামী লী প্রার্থীর সাথে তীব্র নির্বাচনী লড়াইয়ের পরই বিজয়ী হয়েছেন। তারা সংসদে তাদের ভোট এবং তাদের বক্তৃতায়র পুরো স্বাধীনতা ভোগ করবেন। বাংলাদেশের সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে সংসদ সদস্যদের তাদের দলের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু স্বতন্ত্র প্রার্থী কোন দলের অধীনে না থাকায় তারা এই বিধিনিষেধের বাইরে। এই প্রেক্ষাপটে, শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকা সত্ত্বেও, নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করতে ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য আ.লীগ প্রশংসার যোগ্য। আ.লীগ দলের সিনিয়র ব্যক্তিদের স্বতন্ত্র হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অনুমতি দিয়ে, অবশ্যই সম্ভাব্য অন্তর্দলীয় বিরোধের ঝুঁকিতে পড়েছে। তবুও, এটি ভোটারদের প্রকৃত নির্বাচনী বিকল্প প্রদান এবং সংসদে মত বৈচিত্র্যকে প্রসারিত করেছে।

উপরন্তু, একটি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একটি অপ্রতিরোধ্য সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা একটি দল একদলীয় রাষ্ট্রের সমতুল্য নয়। বাংলাদেশকে একদলীয় রাষ্ট্র না বানিয়ে অতীতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি একই রকমের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। একইভাবে ভারত ও জাপান বহুদলীয় গণতন্ত্র না হারিয়ে একদলীয় আধিপত্য অর্জন করেছে। মূল প্রশ্ন হল আওয়ামী লীগ নিজে এই অতি সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদের আয়োজন করেছিল নাকি বিএনপির নির্বাচন বয়কটের কারণে এটি অনেকটা অনিবার্য ছিল।

বিএনপি যদিও যুক্তি দেবে—যে কোনো লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড কখনোই ছিল না এবং ২৮ অক্টোবরের সমাবেশের পর বিএনপি নেতাদের দমন-পীড়ন ও গণগ্রেপ্তার সুষ্ঠু নির্বাচনের পথ এবং তাদের অংশগ্রহণকে বাধাগ্রস্ত করেছে। তবে, ২৮ অক্টোবরের আগেও বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ প্রত্যাখ্যান করে ইতিমধ্যেই নির্বাচনে নিজেদের অপ্রাসঙ্গিক করে তুলেছিল। নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে নির্বাচন কমিশনের ডাকা একটি নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করার জন্যই ২৮ অক্টোবরের বিক্ষোভ করেছিল দলটি। ফলে সেই সময়ে কমিশনের কর্তৃত্বের অধীনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, অরাজকতা দমনে এবং নির্বাচনের অগ্রগতি নিশ্চিত করতে শক্তি প্রয়োগ করেছিল। এটি কোনভাবে নির্বাচন বর্জনের কারণ হতে পারে। বলপ্রয়োগের অসামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবহার আলাদা মূল্যায়নের প্রয়োজন, তবে এটি নির্বাচনী নয় বরং আইন-শৃঙ্খলার চোখে দেখাই উত্তম।

দায়বদ্ধতা

এমন উদ্বেগজনক দাবি করার পরিবর্তে, পর্যবেক্ষকদের জিজ্ঞাসা করা উচিত ছিল যে প্রাথমিক বিরোধী দল বিএনপি কেন মাঠ হারাল। সরকার যেমন শক্তিপ্রয়োগের জন্য যাচাই-বাছাইয়ের পরোয়ানা দেয়, তেমনি বিএনপিকে তার গণতান্ত্রিক দায়িত্ব পালনের জন্য জবাবদিহি করতে হবে।

১৭ কোটি মানুষের প্রতিনিধিত্বকারী একটি প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির দায়িত্ব ছিল সংসদে ভোটারদের আওয়াজ দেওয়া। নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না এমন অনুমানের উপর ভিত্তি করে নির্বাচন বর্জন করে, তারা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং জনগণের অধিকারকে উপেক্ষা করেছে। তর্কের খাতিরে আ. লীগের অধীনে নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে না ধরে নিলেও, বিএনপি’র তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালের দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত মে ২০১১ সালে এটিকে অসাংবিধানিক রায় দিয়েছিল। তাছাড়া, পূর্ববর্তী তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা তার ম্যান্ডেটকে অতিক্রম করেছিল, জাতীয় জরুরি অবস্থা জারি করেছিল এবং দলীয় নেতাদের বন্দী করেছিল রাজনীতিকে বাধাগ্রস্থ করেছিল।

নির্বাচন বয়কট শুধুমাত্র ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে সুফল এনে দিয়েছে। বিএনপি নির্বাচনের মাধ্যমে জনসাধারণের ম্যান্ডেট অনুসরণ করার চেয়ে তত্ত্বাবধায়ক শাসনের মধ্যে একটি সাংবিধানিক সঙ্কট তৈরির উচ্চাকাঙ্ক্ষা করেছিল। গণতন্ত্রের প্রতি ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গীকার নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও মূলত বিএনপি’র এই আত্ম বিধ্বংসী এবং অপরিপক্ক রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই আওয়ামী লীগের ক্ষমতার পথ সুগম করেছে।


বাংলাদেশের নির্বাচন   ব্যাপক   বয়কট   সর্বজন গৃহীত  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের অবিনাশী বাক্যাবলি

প্রকাশ: ১১:০১ এএম, ১০ এপ্রিল, ২০২৪


Thumbnail

১০ই এপ্রিল  ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ (প্রোক্লেমেশন অব ইন্ডিপেন্ডেন্স) -এর ৫৩ বছর পূর্তি।আজ থেকে পাঁচ দশক আগে এই দিন ঢাকা শহর থেকে দূরে নিভৃত এক গ্রামের আম্রকাননে উদ্ভাসিত হয়েছিল এর অবিনাশী বাক্যগুলো। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ গভীর রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী  নৃশংস পৈশাচিকতায় বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। আর সে রাতেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। পৃথিবীর বুকে যুদ্ধরত বাংলাদেশ আত্মপ্রকাশ করে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে। অন্যদিকে মাত্র ১৫ দিনের মাথায় ১৯৭১ সালের ১০ই এপ্রিল গঠিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার। ১৭ই এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ নেয় এই সরকার।এই সরকারের নেতৃত্বেই ৯ মাসের রক্তস্নাত মুক্তিযুদ্ধের পর ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানি সৈন্যদের সারেন্ডারের মাধ্যমে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়।

একাধিক গবেষণাগ্রন্থ ও পত্রিকান্তরে প্রকাশিত সূত্র মতে, ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ পাকিস্তানিদের হাতে গ্রেফতারের আগেই বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের তৎকালীন নেতাদের আলাদা দিকনির্দেশনা দিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর সেই নির্দেশনা অনুযায়ীই প্রথমে তাজউদ্দিন আহমেদ পাকিস্তানিদের চোখ ফাঁকি দিয়ে নিরাপদ অবস্থানে পৌঁছানোর জন্য ৩০ মার্চ ফরিদপুর-কুষ্টিয়ার পথে পশ্চিম বাংলার সীমান্তে পৌঁছান। সেখান থেকে মেহেরপুর মহকুমার প্রশাসক তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরীর সহায়তায় ব্যারিস্টার আমীরুল ইসলামকে নিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে প্রবেশ করেন। ভারতে প্রবেশের মুহূর্ত থেকে ৩ এপ্রিল ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির সঙ্গে বৈঠকে বসা পর্যন্ত পুরো সময়টাই ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ভোটে নির্বাচিত এবং স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি হিসেবে যথাযোগ্য সম্মান ও মর্যাদা দিয়েছিল। কারণ তাজউদ্দিন সেটা আদায় করে নিতে পেরেছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে শুরু থেকেই দৃঢ় অবস্থানের মাধ্যমে। ৩ এপ্রিল ইন্দিরা গান্ধির সঙ্গে বৈঠকে বসার আগে তাজউদ্দিন উপলব্ধি করেছিলেন বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে যুদ্ধ চালিয়ে নিয়ে যেতে হলে একটি প্রশাসনিক কাঠামো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই ১৯৭০ সালের নির্বাচনের ম্যান্ডেট অনুযায়ী বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি এবং নিজেকে আওয়ামী লীগের একজন প্রতিনিধি হিসেবেই ইন্দিরা গান্ধির সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং সাহায্য-সহযোগিতা করার জন্য আলোচনা করেন। যেহেতু দীর্ঘ সময় ধরে বঙ্গবন্ধু চূড়ান্ত স্বাধীনতার ক্ষেত্রে পূর্ব পরিকল্পনা এবং ভারতের নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন, সুতরাং স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া বাংলাদেশের নেতৃত্বের প্রতিনিধি হিসেবে তাজউদ্দিনের সঙ্গে ইন্দিরা গান্ধির এই বৈঠক ফলপ্রসূ হয়েছিল। আন্তর্জাতিক নানা হিসাব-নিকাশের কারণে তাৎক্ষণিক স্বীকৃতি না দিলেও ভারত বাংলাদেশের এই নতুন সরকারকে মুক্তিফৌজের আশ্রয়-ট্রেনিং-অস্ত্র থেকে শুরু করে সকল রকম সহযোগিতা দেওয়ার আশ্বাস দেয়। পালিয়ে আসা শরণার্থীদের জন্য আশ্রয় এবং সবধরনের সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়।

ইন্দিরা গান্ধির সঙ্গে এই বৈঠকের সূত্র ধরেই তাজউদ্দীন আহমদ আওয়ামী লীগের এমএনএ (M.N.A) এবং এমপিএ (M.P.A)-দের কুষ্টিয়া জেলার সীমান্তে অধিবেশন আহ্বান করেন। ওই অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে মুক্তিযুদ্ধ ও সরকার পরিচালনার জন্য মন্ত্রীপরিষদ গঠিত হয়। এই মন্ত্রীপরিষদ এবং এমএনএ এবং এমপিএ-গণ ১০ এপ্রিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি করে সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ঘোষণা করেন। তাজউদ্দিন আহমেদকে প্রধানমন্ত্রী, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপ-রাষ্ট্রপতি এবং বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করা হয়। ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী, খন্দকার মোশতাক আহমেদ ও এ এইচ এম কামরুজ্জামানকে মন্ত্রীপরিষদের সদস্য নিয়োগ করা হয়। ১১ এপ্রিল এম এ জি ওসমানীকে প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করা হয়।

১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল প্রণীত ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ ছিল বাংলাদেশের মুক্তিকাঙ্ক্ষী রাষ্ট্রের প্রথম সংবিধান। এই ঘোষণাপত্রটি বাংলাদেশের প্রথম সরকার বা মুজিবনগর সরকার কর্তৃক ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত হয়। ব্যারিস্টার এম. আমীর-উল ইসলাম লিখেছেন- ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র, মুজিবনগর সরকার ও স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় এ তিনটি ঘটনা একসূত্রে গাঁথা।’ তাঁর স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, ‘তাজউদ্দীন আহমদ ৭০’র নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে কুষ্টিয়া জেলার সীমান্তে অধিবেশন আহ্বান করেন। ১০ এপ্রিলের ওই অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে মুক্তিযুদ্ধ ও সরকার পরিচালনার জন্য মন্ত্রিপরিষদ গঠিত হয়। সর্বসম্মতিক্রমে স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালনা ও পাক হানাদার বাহিনীকে স্বদেশ ভূমি থেকে বিতাড়িত করে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত এবং নির্দেশিত পথে মুক্তিযুদ্ধের বিজয় অর্জনের জন্য প্রথম সরকার গঠন করা হয়।’ সেসময় যিনি এই ঘোষণাপত্রটি রচনা করেছিলেন তাঁর স্মৃতিতে ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র; যা ৪ জুলাই ১৭৭৬ সালে পেনসিলভানিয়া প্রাদেশিক আইনসভায় অনুষ্ঠিত ২য় কন্টিনেন্টাল কংগ্রেসে গৃহীত হয়। এর মাধ্যমে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে যুদ্ধরত তেরটি মার্কিন উপনিবেশ নিজেদের ব্রিটিশ শাসনের বাইরে স্বাধীন ও সার্বভৌম হিসেবে ঘোষণা করে এবং যুক্তরাষ্ট্র নামে নতুন রাষ্ট্র গঠিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস পালন করা হয় জুলাইয়ের ৪ তারিখ, যে তারিখে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র অনুমোদিত হয়েছিল সেই তারিখেই। ১০ এপ্রিলের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র অনুসারে ২৬ মার্চ আমাদের স্বাধীনতা দিবস। কারণ ঘোষণাপত্রে লেখা হয়েছে- ‘আমাদের এই স্বাধীনতার ঘোষণা ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে কার্যকর বলে গণ্য হবে।’

        ঘোষণাপত্রের একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো বঙ্গবন্ধুর ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণাকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং তাঁকে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে অভিহিত করা। অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা অনুমোদন করে আরও সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয় যে, শাসনতন্ত্র প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপ্রধান এবং সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপ-রাষ্ট্রপ্রধান পদে অধিষ্ঠিত থাকবেন। কোনো কারণে যদি রাষ্ট্রপ্রধান না থাকেন অথবা যদি রাষ্ট্রপ্রধান কাজে যোগদান করতে না পারেন অথবা তাঁর দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে যদি অক্ষম হন, তবে রাষ্ট্রপ্রধান প্রদত্ত সকল দায়িত্ব উপ-রাষ্ট্রপ্রধান পালন করবেন। বর্ণিত ঘটনা অনুসারে আমরা জানি, ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর থেকে ১৯৭১ সালের ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশে অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে শাসনতন্ত্র রচনার উদ্দেশ্যে প্রতিনিধি নির্বাচিত করা হয়েছিল এবং নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণ ১৬৯টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ দলীয় ১৬৭ জন প্রতিনিধি নির্বাচিত করেছিল; কিন্তু জেনারেল ইয়াহিয়া খান ১৯৭১ সালের  ৩ মার্চ শাসনতন্ত্র রচনার উদ্দেশ্যে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অধিবেশন আহবান করেও বেআইনিভাবে অনির্দিষ্টকালের জন্য তা বন্ধ ঘোষণা করেন। উপরন্তু জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে পারস্পরিক আলোচনাকালে ন্যায়নীতি বহির্ভূত এবং বিশ্বাসঘাতকতামূলক যুদ্ধ ঘোষণা করে গণহত্যা চালায়। উল্লিখিত বিশ্বাসঘাতকতামূলক কাজের জন্য উদ্ভূত পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার অর্জনের আইনানুগ অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ ঢাকায় যথাযথভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং বাংলাদেশের অখণ্ডতা ও মর্যাদা রক্ষার জন্য বাংলাদেশের জনগণের প্রতি উদাত্ত আহবান জানান। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার বা মুজিবনগর সরকারের জারিকৃত ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ নামের এই দলিল যতদিন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলেছে ততদিন মুজিবনগর সরকার পরিচালনার অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধান হিসেবে কার্যকর ছিল।ঘোষণাপত্রের পূর্ণ বিবরণ এরকম-

‘‘যেহেতু একটি সংবিধান প্রণয়নের উদ্দেশ্যে প্রতিনিধি নির্বাচনের জন্য ১৯৭০ সনের ৭ই ডিসেম্বর হইতে ১৯৭১ সনের ১৭ই জানুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশে অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, এবং

যেহেতু এই নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণ ১৬৯ জন প্রতিনিধির মধ্যে আওয়ামী লীগ দলীয় ১৬৭ জনকে নির্বাচিত করেন, এবং

যেহেতু সংবিধান প্রণয়নের উদ্দেশ্য জেনারেল ইয়াহিয়া খান জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিগণকে ১৯৭১ সনের ৩রা মার্চ তারিখে মিলিত হইবার জন্য আহ্বান করেন, এবং

যেহেতু এই আহূত পরিষদ-সভা স্বেচ্ছাচারী ও বেআইনিভাবে নির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয়, এবং

যেহেতু পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ তাহাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষার পরিবর্তে এবং বাংলাদেশের প্রতিনিধিগণের সহিত আলোচনা অব্যাহত থাকা অবস্থায় একটি অন্যায় ও বিশ্বাসঘাতকতামূলক যুদ্ধ ঘোষণা করে, এবং

যেহেতু এইরূপ বিশ্বাসঘাতকতামূলক আচরণের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের আইনানুগ অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৭১ সনের ২৬শে মার্চ তারিখে ঢাকায় যথাযথভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করেন এবং বাংলাদেশের মর্যাদা ও অখণ্ডতা রক্ষার জন্য বাংলাদেশের জনগণের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান, এবং

যেহেতু একটি বর্বর ও নৃশংস যুদ্ধ পরিচালনায় পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ, অন্যান্যের মধ্যে বাংলাদেশের বেসামরিক ও নিরস্ত্র জনগণের উপর নজিরবিহীন নির্যাতন ও গণহত্যার অসংখ্য অপরাধ সংঘটন করিয়াছে এবং এখনও অনবরত করিয়া চলিতেছে, এবং

যেহেতু পাকিস্তান সরকার একটি অন্যায় যুদ্ধ চাপাইয়া দিয়া, গণহত্যা করিয়া এবং অন্যান্য দমনমূলক কার্যকলাপের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রতিনিধিগণের পক্ষে একত্রিত হইয়া একটি সংবিধান প্রণয়ন এবং নিজেদের জন্য একটি সরকার প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব করিয়া তুলিয়াছে, এবং

যেহেতু বাংলাদেশের জনগণ তাহাদের বীরত্ব, সাহসিকতা ও বিপ্লবী উদ্দীপনার মাধ্যমে বাংলাদেশের ভূখণ্ডের উপর তাহাদের কার্যকর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করিয়াছে।

সেহেতু আমরা বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ, বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকার জনগণ কর্তৃক আমাদিগকে প্রদত্ত কর্তৃত্বের মর্যাদা রক্ষার্থে নিজেদের সমন্বয়ে যথাযথভাবে একটি গণপরিষদরূপে গঠন করিলাম, এবং পারস্পরিক আলোচনা করিয়া, এবং বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করণার্থ, সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী রূপে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা ঘোষণা করিলাম এবং এতদ্দ্বারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক ইতোপূর্বে ঘোষিত স্বাধীনতা দৃঢ়ভাবে সমর্থন ও অনুমোদন করিলাম, এবং এতদ্দ্বারা দৃঢ়ভাবে ঘোষণা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিতেছি যে, সংবিধান প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতি থাকিবেন এবং সৈয়দ নজরুল ইসলাম প্রজাতন্ত্রের উপ-রাষ্ট্রপতি থাকিবেন, এবং রাষ্ট্রপতি প্রজাতন্ত্রের সকল সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হইবেন, ক্ষমা প্রদর্শনের ক্ষমতাসহ সকল নির্বাহী ও আইন প্রণয়ন ক্ষমতা প্রয়োগ করিবেন, একজন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ এবং তাহার বিবেচনায় প্রয়োজনীয় অন্যান্য মন্ত্রী নিয়োগ ক্ষমতার অধিকারী হইবেন, কর আরোপণ ও অর্থ ব্যয়ন ক্ষমতার অধিকারী হইবেন, গণপরিষদ আহ্বান ও মূলতবিকরণ ক্ষমতার অধিকারী হইবেন, এবং  বাংলাদেশের জনগণকে একটি নিয়মতান্ত্রিক ও ন্যায়ানুগ সরকার প্রদানের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় অন্যান্য সকল কার্য করিতে পারিবেন।

আমরা বাংলাদেশের জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ আরও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিতেছি যে, কোন কারণে রাষ্ট্রপতি না থাকা বা রাষ্ট্রপতি তাহার কার্যভার গ্রহণ করিতে অসমর্থ হওয়া বা তাহার ক্ষমতা প্রয়োগ করিতে অসমর্থ হওয়ার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির উপর এতদ্দ্বারা অর্পিত সমুদয় ক্ষমতা, কর্তব্য ও দায়িত্ব উপ-রাষ্ট্রপতির থাকিবে এবং তিনি উহা প্রয়োগ ও পালন করিবেন।

আমরা আরও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিতেছি যে, জাতিমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে আমাদের উপর যে দায় ও দায়িত্ব বর্তাইবে উহা পালন ও বাস্তবায়ন করার এবং জাতিসংঘের সনদ মানিয়া চলার প্রতিশ্রুতি আমরা দিতেছি।

আমরা আরও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিতেছি যে, স্বাধীনতার এই ঘোষণাপত্র ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ তারিখে কার্যকর হইয়াছে বলিয়া গণ্য হইবে।

আমরা আরও সিদ্ধান্ত করিতেছি যে, এই দলিল কার্যকর করার লক্ষ্যে এবং রাষ্ট্রপতি ও উপ-রাষ্ট্রপতির শপথ পরিচালনার জন্য আমরা অধ্যাপক ইউসুফ আলীকে আমাদের যথাযথ ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধি নিয়োগ করিলাম।’’

উল্লেখ্য, এটি ১০ এপ্রিল ১৯৭১ তারিখে মুজিবনগরে ঘোষিত ও জারিকৃত এবং ২৩ মে, ১৯৭২ তারিখে বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় প্রকাশিত। বাংলাদেশ সংবিধানের ১৫০(১) অনুচ্ছেদ এবং চতুর্থ তফসিলে উল্লেখ করা হয়েছে যে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র বাংলাদেশের একটি ক্রান্তিকালীন অস্থায়ী বিধান হিসেবে সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত হবে।

পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতার এই ঘোষণাপত্রটি এখন সম্পূর্ণ আকারে বাংলাদেশের সংবিধানে সংযুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ {সংবিধানের ৭(খ) অনুচ্ছেদ} একটি মৌলিক কাঠামো রূপে সাংবিধানিক স্বীকৃতি পেয়েছে। ফলে ঘোষণাপত্রটি বাংলাদেশের সংবিধানের একটি অপরিবর্তনীয় বিধান। ৫৩ বছর আগে ঘোষিত ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ ছিল আত্ম-নিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠার মূলমন্ত্র। এজন্য একাত্তরে পাকিস্তানিদের গণহত্যার খবর বিশ্ব মিডিয়ায় প্রচারিত হলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার দাবিকে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন না বলে খুব অল্প সময়ের ব্যবধানেই আন্তর্জাতিক মহল থেকে স্বীকৃতি দান করা হয়।২৪ বছরের নিপীড়ন-অত্যাচারের পথ অতিক্রম করে জনগণের আত্ম-নিয়ন্ত্রণের অধিকারের দাবি গণতান্ত্রিক নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামের মাধ্যমে উত্থাপিত হয়েছিল বলেই আমাদের স্বাধীনতার লড়াই আইনসম্মত হয়ে উঠেছিল।আর স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ ছিল সেই আইনগত বৈধতা অর্জনের অন্যতম স্তম্ভ, যার বাক্যাবলি আজও অবিনাশী।

 

(লেখক : ড. মিল্টন বিশ্বাস, বঙ্গবন্ধু গবেষক, অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, বাংলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিশিষ্ট লেখক, কবি, কলামিস্ট, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রগতিশীল কলামিস্ট ফোরাম, নির্বাহী কমিটির সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ email-drmiltonbiswas1971@gmail.com



মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

ঈদের আনন্দ ও খাওয়া-দাওয়া


Thumbnail

এক মাস রমজানের সিয়াম সাধনার পর আসছে ঈদ, যা বয়ে আনবে সবার জন্য অনাবিল আনন্দ। ঈদ মানেই খুশি, ঈদ মানেই আনন্দ, খাওয়া-দাওয়া, নতুন জামা-কাপড় আর ঘোরাঘুরি। ছোট বাচ্চা থেকে বয়স্করা সবাই ঈদের আনন্দকে বরণ করে নেওয়ার জন্য উদগ্রীব। রোজার এক মাসে মানুষের খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনে যে পরিবর্তন আসে, সেটাতেই অনেকে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। মাসখানেক সিয়াম সাধনার পর ঈদের দিন সকালেই শুরু হয় ইচ্ছেমতো খাওয়া-দাওয়া। আর ঈদের দিনে আনন্দের অন্যতম আয়োজনটাই হলো নানা রকমের খাবার-দাবার। সকালবেলা উৎসবের শুরুটাই হয় মিষ্টি, সেমাই, পোলাও, কোর্মাসহ আরও কত রকমের খাবার দিয়ে।

অনেকে এই সুযোগে বেশ একটা ভূরিভোজ করে ফেলেন। আসলে ঈদের দিন এভাবে লাগামছাড়া খাওয়া-দাওয়া করাটা হতে পারে স্বাস্থ্যের জন্য ভীষণ ক্ষতিকর। হঠাৎ ঈদের দিনে অতি ভোজনের ফলে পাকস্থলী তথা পেটের ওপর চাপটা পড়ে বেশি। নিজের ঘরে হরেক রকমের খাবারের সঙ্গে বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজনের বাসায় বেড়াতে গেলেই ইচ্ছা-অনিচ্ছায় আরও বেশি খেতে হয়। ফলে অধিক চাপে অনেক সময় পাকস্থলীর এনজাইম ঠিকমতো কাজ করতে পারে না। এ কারণে পেট ব্যথা, গ্যাস্ট্রাইটিস, ডায়রিয়া, বমি, পেটফাঁপা ইত্যাদি হরহামেশাই দেখা যায়। সাধারণত ঈদের দিন প্রচুর তৈলাক্ত খাবার যেমন পোলাও, বিরিয়ানি, মুরগি, খাসি বা গরুর গোশত, কাবাব, রেজালা আর এর সঙ্গে মিষ্টি জাতীয় খাবার আমরা সবাই খাই।

একসঙ্গে বেশি খাওয়ার ফলে পেটে অস্বস্তিকর অনুভূতি, ভরা ভরা ভাব, বারবার ঢেঁকুর ওঠা এমনকি বুকে ব্যথা পর্যন্ত হতে পারে। যাদের পেপটিক আলসার আছে, তাদের রোজা রাখার ফলে দীর্ঘক্ষণ পেট খালি থাকার জন্য নিঃসরিত হাইড্রোক্লোরিক এসিড পাকস্থলী ও ডিওডেনামে ক্ষত করতে পারে। তৈলাক্ত ও ঝাল মসলাযুক্ত খাবার খাওয়ায় পাকস্থলী ও ডিওডেনামের ক্ষতে পুনরায় প্রদাহের সৃষ্টি হয়। ফলে বুক জ্বালা, পেট জ্বালা ইত্যাদি অনেক বেড়ে যায়। আইবিএস বা ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম রোগে যারা ভোগেন, তাদের সমস্যাটা আরও বেশি দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে দুধ ও দুগ্ধজাত খাবারগুলো যেমন পায়েস, সেমাই, হালুয়া ইত্যাদি খাবারে অস্বস্তি, ঘন ঘন মলত্যাগ ও অসম্পূর্ণ মলত্যাগের অনুভূতি হয়। আবার বিভিন্ন খাবার অন্ত্র থেকে অতিরিক্ত পানি শোষণ করে। ফলে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা বেড়ে যেতে পারে। যাদের অ্যানাল ফিশার ও পায়ুপথে জ্বালাপোড়া, ব্যথা ইত্যাদি আগে থেকেই আছে, তাদের এ সমস্যা আরও বেশি প্রকট হয়। যাদের হিমোরয়েড বা পাইলসের সমস্যা আছে, তাদের পায়ুপথে রক্তক্ষরণও হতে পারে।

আসলে ছোট বাচ্চাদের ঈদ আনন্দটা সবচেয়ে বেশি। তারা শখ করে দু-একটা রোজা রাখে, রোজা শেষে ঈদের দিন মজার মজার খাবার খেতে বেশি পছন্দ। তবে অতিভোজনে যে কারও মতো ছোটদেরও সমস্যা হতে পারে।

খাবার পরিমাণের দিকে নজর দিন : যে কোনো কিছু খেলেই সব সময় শরীরে সমস্যা হবে এমন কথা নেই। শুধু পরিমাণটা ঠিক রাখলেই হলো। কোনো শারীরিক সমস্যা না থাকলে হজমে সহায়ক সব ধরনের এনজাইম সঠিকভাবেই কাজ করে। এমনকি গুরুপাক তৈলাক্ত বা চর্বিযুক্ত খাদ্যগুলো সহজে হজম হয়ে যায়। তবে অবশ্যই অতিভোজন না করাই ভালো। ঈদের নামাজ পড়তে যাওয়ার আগে অল্প করে সেমাই বা পায়েস খাওয়া ভালো। এগুলোর সঙ্গে কিশমিশ, বাদাম, ফলের জুস, যেমন পেঁপে, আম ইত্যাদি খেতে পারেন। খাবার আধঘণ্টা পর দেড় থেকে দুই গ্লাস পানি খেয়ে ঈদের নামাজ পড়তে যাবেন। দিনে বিভিন্ন ধরনের খাবার খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে প্রচুর পানি ও অন্যান্য তরল খাবার খাওয়া ভালো। একবারে বেশি করে না খেয়ে অল্প করে বারবার খাবেন। পোলাও বা বিরিয়ানির সঙ্গে সালাদ জাতীয় খাবার এবং দই খেতে পারেন।

যাদের বেশি সতর্কতা দরকার : যারা মাঝবয়সি বা বয়োবৃদ্ধ বা যাদের অন্যান্য শারীরিক সমস্যা আছে, যেমন ডায়াবেটিস, হাই- ব্লাডপ্রেসার বা হৃদরোগ ইত্যাদি, তাদের খাবারের ব্যাপারে সতর্ক থাকা জরুরি। ডায়াবেটিস রোগীকে অবশ্যই মিষ্টি জাতীয় খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। তবে কৃত্রিম চিনি দিয়ে তৈরি খাবার খেতে পারেন এবং টক খাবারের মাধ্যমে রসনা পূরণ করতে পারেন। সবজি বা টক ফল দিয়ে মজাদার খাবার আগেই বানিয়ে রাখুন। এগুলো আপনাকে অন্য খাবার থেকে দূরে থাকতে সাহায্য করবে। নেহায়েত মিষ্টি খেতে চাইলে চিনির বিকল্প দিয়ে তৈরি করে নিবেন। পোলাও বিরিয়ানি কম খাবেন, ভাত খাওয়াই ভালো। তাই বলে অতিরিক্ত খাবার অবশ্যই পরিহার করবেন। মুরগি বা গরুর মাংস খাওয়া যাবে যদি অতিরিক্ত তেল বা চর্বি না থাকে। সঙ্গে কিডনির সমস্যা থাকলে মাংস পরিহার করতে হবে। খাসি, কলিজা, মগজ, চিংড়ি ইত্যাদি খাবেন না। খাবারের পরিমাণটা ডায়াবেটিস রোগীর জন্য সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ।

সবচেয়ে বড় কথা এসব খাবার একবেলাই খাওয়া উচিত, অন্য বেলা স্বাভাবিক খেতে হবে। রক্তের সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য এদিন একটু বেশি হাঁটাহাঁটি করতে পারেন, প্রয়োজনে ডায়াবেটিসের ওষুধ বা ইনসুলিনের মাত্রা একটু বাড়াতে হতে পারে। এ ব্যাপারে ঈদের আগেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। যাদের রক্তে কোলেস্টেরল বেশি বা উচ্চরক্তচাপ আছে অথবা হার্টের সমস্যা আছে অথবা যারা মুটিয়ে যাচ্ছেন, তাদের অবশ্যই তেল ও চর্বি এড়িয়ে যেতে হবে। তবে চর্বি ছাড়া গরুর মাংস খাওয়া যাবে পরিমাণ মতো। ভাজা পোড়া খাবেন না, বিশেষ করে বাইরের। মিষ্টিও পরিমাণের বেশি খাওয়া যাবে না। পোলাও কম খাবেন, ভাত হলেই ভালো। ফল বা ফলের রস, সালাদ ইত্যাদি বেশি করে খাবেন। বিশেষ করে খাবারের শুরুতে সালাদ খেলে অন্য খাবারের জন্য জায়গা কমে যাবে। এছাড়া টক দই খেলে উপকার পাবেন। কিডনির সমস্যা থাকলে প্রোটিন জাতীয় খাদ্য যেমন মাছ-মাংস অবশ্যই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ফল খাবার ব্যাপারেও নিষেধাজ্ঞা থাকে। তাদের অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে নেওয়া উচিত ঈদের আগেই।

মনে রাখতে হবে :

(১) খাবারের পরিমাণের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখাটা সবার জন্যই জরুরি। পেটপুরে খাওয়া মানসিক তৃপ্তি দিতে পারে বটে কিন্তু শরীরের জন্য ভয়ানক ক্ষতিকর। একবারে বেশি না খেয়ে বারে বারে কম পরিমাণে খাওয়া ভালো। সকালের নাশতা একটু বেশি হলেও দুপুরের খাবার হবে হালকা। রাতের খাবার মসলাদার না হওয়াই উচিত।

(২) গুরুপাক জাতীয় খাবার না খাওয়াই ভালো। যদি একান্তই খেতে ইচ্ছে হয়, তবে পরিমাণে কম খেতে হবে। যে খাবারে সমস্যা বেশি হয়, তা পরিহার করা উচিত। অতিরিক্ত পোলাও, বিরিয়ানি বা চর্বি জাতীয় খাবার পরিহার করবেন।

(৩) যারা গ্যাস্ট্রিক আলসার বা আইবিএস বা অন্যান্য পেটের রোগে ভোগেন, তারা ডমপেরিডন, ওমেপ্রাজল বা প্যান্ট্রোপ্রাজল জাতীয় ওষুধ খাবেন। এন্টাসিড জাতীয় ওষুধ এবং বিভিন্ন এনজাইম খেতে পারেন। যাদের আইবিএস আছে, তারা দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার পরিহার করবেন। যাদের কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা, এনাল ফিসার ও পায়ুপথে জ্বালাপোড়া বা ব্যথা ইত্যাদি সমস্যা আছে, তারা ইসবগুলের ভুসি, বেল, পেপে ইত্যাদি খেতে পারেন।

(৪) রাতে কোনো দাওয়াতে গেলে অল্প পরিমাণে খাবেন। খাওয়ার অন্তত দুই ঘণ্টা পর বিছানায় যাবেন।

(৫) ঈদের সময় সাধারণত সবাই একত্রে বসে খায় এবং অনেক গল্প গুজব করেন। এতে অতিরিক্ত বাতাস পাকস্থলীতে ঢুকে, ফলে বারবার ঢেঁকুর তোলার সমস্যা হয়। তাই খাবারের সময় যতটা সম্ভব কম গল্পগুজব করা উচিত এবং গোগ্রাসে না খেয়ে খাবার ভালো করে চিবিয়ে খেতে হবে।

(৬) খাবারের সময় একটু পর পর পানি না খাওয়া উচিত, এতে হজম রসগুলো পাতলা হয় এবং হজমের অসুবিধা হতে পারে। তাই খাওয়ার অন্তত আধা বা এক ঘণ্টা পর পানি পান করা উচিত।

(৭) কোমল পানীয়, চিনিযুক্ত পানীয় পরিহার করবেন। এসবের বদলে চিনি ছাড়া ফলের জুস, বোরহানি, টক দই, পুদিনা লাচ্ছি, ডাবের পানি ইত্যাদি খেতে পারেন।

(৮) কোনো সময় বেশি খেয়ে ফেললে বা দাওয়াত থাকলে অন্য সময় রুটি, সালাদ বা স্যুপ খেতে পারেন। ওজন নিয়ন্ত্রণের জন্য ভাত, চিনি, মিষ্টি জাতীয় খাবার কম খেতে হবে।

(৯) রাতে খাবারের পরপরই ঘুমাতে যাবেন না। সম্ভব হলে কিছুক্ষণ হাঁটাচলা করবেন এবং দু-তিন ঘণ্টা পর ঘুমাবেন।

(১০) ব্যায়াম অব্যাহত রাখুন। পরিবার-পরিজন, আত্মীয়স্বজন নিয়ে হাঁটাচলা করতে পারেন। এতে মন প্রফুল্ল থাকবে, শরীরও সুস্থ থাকবে।

(১১) মনে রাখতে হবে খাওয়া-দাওয়ার ফলে যদি শারীরিক সমস্যা হয়, তবে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।

ঈদ অবশ্যই আনন্দের, আর এর সঙ্গে মনে হয় ভূরিভোজ না করলে আনন্দটার পূর্ণতা পায় না। খাওয়া দাওয়ার সঙ্গে মনে রাখতে হবে, খাওয়াটা যেন হয় ভেজালমুক্ত, টাটকা, স্বাস্থ্যসম্মত, সহজপাচ্য এবং উপাদেয়। তা অবশ্যই হতে হবে পরিমিত এবং পরিকল্পিত। ঈদের সময় শারীরিকভাবে সুস্থ না থাকলে সব আনন্দই মাটি হয়ে যাবে। কেননা কথায় আছে ‘সুস্থ দেহে সুস্থ মন’। অতিভোজনের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। পুরোপুরি পেট ভরে না খাওয়াই উচিত। আমাদের প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘পেটের এক-তৃতীয়াংশ ভাগ আহারের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ ভাগ পানির জন্য আর এক-তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩৩৪৯)। এ কথাও মনে রাখতে হবে, অতিভোজন এমনকি স্বাভাবিক খাওয়া-দাওয়ার ফলেও যদি শারীরিক সমস্যা হয়, তবে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।


ঈদুল ফিতর  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

‘স্বাস্থ্য অধিকার’ নিশ্চিতে এসডিজি অর্জনের ২০৩০ সাল খুব বেশি দূরে নয়


Thumbnail

২০১৯ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্বাস্থ্য, উন্নয়ন এবং মানবিক কাজে নিয়োজিত ১৩টি বহুপাক্ষিক সংস্থাকে একত্রিত করে বিশ্বব্যাপী টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি বাস্তবায়নে গ্লোবাল অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করে যা ‘এসডিজি-৩ গ্লোবাল অ্যাকশন প্ল্যান’ নামে পরিচিত। এর লক্ষ্য হল দেশগুলিকে স্বাস্থ্য-সম্পর্কিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ও অগ্রগতি ত্বরান্বিত করতে সাহায্য করা। যাতে সবাই মিলে সুসমন্বিত পদক্ষেপ নেয়া যায় ও দেশে দেশে নেয়া জাতীয় পরিকল্পনাগুলিতে আরও সমন্বিত ও সারিবদ্ধ সমর্থন প্রদানের জন্য সংস্থাগুলির মধ্যে সহযোগিতা জোরদার করার প্রতিশ্রুতি নিশ্চিত থাকে। 

ধারণা করা হয়েছে, এতে যদি কোন দেশের অদক্ষতা থেকে থাকে তাদের নিয়ে একসাথে কাজ করার উপায়ও বের করে আনা যাবে। উন্নত স্বাস্থ্য সেবা কৌশল অর্জনে বাংলাদেশের মত আরো অনেক দেশগুলোর সুযোগ রয়েছে সেগুলো যেন যথাযথ সম্মান ও স্বীকৃতি পায় তা-ও নিশ্চিত রাখা যা এই অ্যাকশন প্ল্যানের অন্যতম উদ্দেশ্য। আমরা জানি ইতোমধ্যে জাতিসংঘের একটি রেজুলেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কর্তৃক স্বাস্থ্যখাতের অন্যতম উদ্ভাবন ‘কমিউনিটি ক্লিনিক’ একটি বিশেষ উদ্যোগ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে যা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি সফল কার্যক্রমের সম্মানজনক দৃষ্টান্ত হয়েছে।

কোভিড-১৯ মহামারীর আগেও, ২০৩০ সালের মধ্যে কোনো দেশই টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের পথে ছিল না। একাধিক চলমান সংকটের কারণে এই মহামারীটি এখন স্থবির হয়ে পড়েছে এবং এমনকি বৈশ্বিক লক্ষ্যের দিকে দেশগুলোর অগ্রগতিও বিপরীতমুখী হয়েছে। ২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ‘গ্লোবাল অ্যাকশন প্ল্যান ফর হেলদি লাইভস অ্যান্ড ওয়েল-বিয়িং ফর অল (SDG3 GAP)’-এর মাধ্যমে যে ১৩টি বহুপাক্ষিক সংস্থা তাদের সহযোগিতা জোরদার করার জন্য প্রতিশ্রুতি রেখেছে সেগুলো প্রধানত আন্ত-সহযোগিতার একটি প্ল্যাটফর্ম যা সবগুলো দেশের জন্য স্বাস্থ্য-সম্পর্কিত এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের মাধ্যমে একটি ন্যায়সঙ্গত এবং স্থিতিস্থাপক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সহায়ক। সহযোগিতার নতুন উপায়গুলিকে বের করে আনাও এই প্ল্যানের অন্যতম লক্ষ্য যাতে দেশগুলো গভীর কৌশলের সাথে তাদের সহায়তার সমন্বয়ে নিজেদের দক্ষতা উন্নত করতে পারে।

দেশগুলির এইসব প্রচেষ্টার মধ্যে রয়েছে সর্বজনীন স্বাস্থ্য কভারেজ অর্জনের জন্য টেকসই অর্থায়নকৃত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সিস্টেমকে শক্তিশালী করা, মা ও শিশু স্বাস্থ্যের উন্নয়ন করা, অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ করা এবং রোগের প্রাদুর্ভাব এড়াতে দেশগুলির সক্ষমতা শক্তিশালী করা। কোভিড-১৯ মহামারী প্রমাণ করেছে যে শক্তিশালী অংশীদারিত্বের মাধ্যমে অনেক কিছু অর্জন করা যেতে পারে, যার মধ্যে টেকসই উন্নয়নের জন্য ২০৩০ সালের যেসব এজেন্ডা রয়েছে, যা কাউকে পিছনে না রাখার সংকল্প নিশ্চিত করে। শক্তিশালী বহুপাক্ষিক সহযোগিতা স্বাস্থ্য-সম্পর্কিত এসডিজি অর্জনের দিকে দেশগুলির অগ্রগতি সমর্থন করার একটি উপায়ও বটে।

২০১৫ সালে যখন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ তার ২০৩০ এজেন্ডা নির্ধারণ করেছিল, তখন কেউ কল্পনাও করতে পারেনি যে বাংলাদেশ সময়ের আগেই স্বাস্থ্যের জন্য ‘কয়েকটি’ মাইলফলক লক্ষ্য অতিক্রম করবে। সুস্বাস্থ্যের জন্য বিশ্বব্যাপী এই টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য ৩-এ পাঁচ বছরের কম বয়সী মৃত্যুর হার এবং নবজাতক মৃত্যুর হারের শিশু-সম্পর্কিত সূচকগুলি, সেইসাথে মাতৃমৃত্যুর অনুপাত এবং সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর জন্য নারী-সম্পর্কিত লক্ষ্যগুলোও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

বাংলাদেশ ১৪ হাজারেরও বেশি কমিউনিটি ক্লিনিকের একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক স্থাপন করে তার কার্যকারিতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে, যা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা দিতে পারছে। আমরা জানি ও বিশ্বাস করি যে প্রাথমিক পরিচর্যার মাধ্যমে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা (সচেতনতা, জীবন-কৌশল ও ওষুধ) সব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের চাবিকাঠি।

নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এসডিজি লক্ষ্যগুলি অর্জনে আমাদের এখন দরকার বাড়ি পর্যায়ে সেবা নিশ্চিত করা কারণ মানুষ অসুস্থ হয় বাড়িতেই (হাসপাতালে এসে কেউ অসুস্থ হয় না); আর এই সেবা নিশ্চিত করতে গ্রাম-পাড়া-মহল্লা পর্যায়ে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সেবা কৌশলের উদ্ভাবনী উদ্যোগের সুযোগ রয়েছে। দ্বিতীয়তঃ কমিউনিটি ক্লিনিক ও উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোর মধ্যে তথ্য-প্রযুক্তির সেবা সমন্বয়ে জরুরী যত্ন পরিষেবাগুলি বিকাশ করা ও নিশ্চিত রাখা প্রয়োজন, যেখানে সেপসিস, রক্তপাত, স্ট্রোক এবং হার্ট অ্যাটাকের মতো সময়-গুরুতর ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা-সেবা যথাযথভাবে সরবরাহ করা সম্ভব। ২০১৯ সালে জেনেভায় ৭২তম বিশ্ব স্বাস্থ্য সমাবেশে এই বিষয়টি স্বীকৃত হয়েছিল, যখন রেজুলিউশন ৭২.১৬ গৃহীত হয়েছিল এই মর্মে যে সার্বজনীন স্বাস্থ্য কভারেজের জন্য জরুরি যত্ন ব্যবস্থা অপরিহার্য। এক বছরের মাথায় কোভিড মহামারিকালে এই ৭২.১৬ সিদ্ধান্ত কতোটা সঠিক ছিল তা প্রমাণিত হয়েছে।

এসডিজি ৩-এর লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য দেশে প্রাথমিক পরিচর্যা পরিষেবাগুলিকে শক্তিশালী করার জন্য অবশিষ্ট ছয় বছর যথেষ্ট সময় নাও হতে পারে, তবে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সারাদেশে স্বাস্থ্যকর্মী ও চিকিৎসকদের জন্য কমিউনিটি ক্লিনিকভিত্তিক জরুরি যত্ন প্রশিক্ষণ ও সংযোগ কর্মসূচি অনাকাঙ্খিত মৃত্যু কমাতে অবদান রাখবে। স্বাস্থ্য সমস্যার চলমান হারের অনুপাত বুঝাতে স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত সকলের জন্যে শিক্ষা কর্মসূচী থাকা দরকার। কোভিড-১৯ মহামারী ইতিমধ্যেই প্রমাণ করেছে যে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত চ্যালেঞ্জ নিতে প্রস্তুত, তা যত বড়ই হোক না কেন! আমাদের এখন যা দরকার তা হল উপযুক্ত নির্দেশনা, সহায়তা ও গ্রাম পর্যায়ে বাস্তবায়নের উৎসাহ দেয়া। 

লেখক: পরিচালক, আমাদের গ্রাম
ই-মেইলঃ rezasalimag@gmail.com


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

বদলি নয়, বঙ্গবন্ধুর ভাষণ পড়তে বাধ্য করুন


Thumbnail

আওয়ামী লীগ টানা দেড় দশক ক্ষমতায়। তাই দেশ জুড়ে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে পছন্দ করা মানুষগুলো 'আওয়ামী লীগ' হয়ে গেছে।  কথায় কথায় আওয়ামী লীগ বলতে বলতে মুখে ফেনা তোলে। বঙ্গবন্ধুর নাম বলতে বলতে তসবি টেপে। কিন্তু মনে প্রাণে আওয়ামী লীগের আদর্শ মানে না। বঙ্গবন্ধুকে বুকে ধারণ করে না। প্রশাসনেও একই অবস্থা। প্রশাসনের সর্বস্তর যেন এখন আওয়ামী লীগের প্রাণকেন্দ্র। বড় বড় অফিসারদের অফিস কক্ষে বা বাসার ড্রয়িং রুমে বঙ্গবন্ধুর লেখা দু তিনটি বই শোভা পায়। বইগুলা তাঁরা পড়ে দেখেছেন কিনা তাতে আমি সন্দিহান। পড়ে দেখলে বঙ্গবন্ধুর জীবনী থেকে শিক্ষা নিতেন, বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে বুকে ধারণ করতেন।

বঙ্গবন্ধু সরকারী কর্মচারীদের উদ্দেশ্যে বলে গেছেন, "মনে রেখো এটা স্বাধীন দেশ। এটা বৃটিশের কলোনি নয়, পাকিস্তানের কলোনি নয়। যে লোককে দেখবে তার চেহারাটা তোমার বাবার মতো, তোমার ভাইয়ের মতো, ওদেরই পরিশ্রমের পয়সা, ওরাই সম্মান বেশি পাবে। কারণ ওরা নিজেই কামাই করে খায়।" অথচ মানিকগঞ্জের শিবালয়ের কৃষি অফিসের দুজন কর্মকর্তা বাবার বয়সী, বড় ভাই এর মত দেখতে ৬৫ বছরের কৃষক ফজলুর রহমানের সাথে সম্মান দিয়ে কথা বলেননি। অসৌজন্যমূলক আচরণ করেছেন। অপমান করেছেন। অবজ্ঞা করেছেন। অফিস থেকে বের করে দিয়েছেন।

কৃষক ফজলুর রহমানের অপরাধ কি? তিনি তাঁর ক্ষেতের একগুচ্ছ পোকা ধরা ধানগাছ নিয়ে যান উপজেলা কৃষি অফিসে। ধান গাছের পোকার প্রতিকার চান। ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করেন। তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠেন একজন উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা। কৃষককে বলেন, ‘আমি কি আপনার কামলা দেই? আপনি কি দেশের প্রেসিডেন্ট হয়ে গেছেন? আপনি বললেই মাঠে যেতে হবে? যা পারেন করেন গা। আপনি বেরিয়ে যান। যদি বয়স্ক লোক না হতেন, তাহলে আপনাকে দেখে নিতাম।’ অথচ বঙ্গবন্ধু বলে গেছেন, "আপনি চাকরি করেন, আপনার মাইনে দেয় গরীব কৃষক, আপনার মাইনে দেয় ওই গরীব শ্রমিক, আপনার সংসার চলে ওই টাকায়….। ওদের সম্মান করে কথা বলুন। ইজ্জত করে কথা বলুন। ওরাই মালিক।… ওদের দ্বারাই আপনার সংসার চলে।" যাদের টাকায় কৃষি কর্মকর্তাদর সংসার চলে, যাঁরা দেশের মালিক, তাঁদেরকেই তিনি অস্বীকার করলেন।

ওই ঘটনায় উক্ত ভুক্তভোগী কৃষক দুই সাংবাদিককে সঙ্গে নিয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কাছে গেলে কৃষকের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন তিনিও। সাংবাদিকরা এর প্রতিবাদ করলে তাঁদের সঙ্গেও অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন কৃষি কর্মকর্তা। অথচ এসব অফিসার সাহেবদের জন্য বঙ্গবন্ধুর বাণী হচ্ছে, "কার টাকায় অফিসার সাব?.... কার টাকায় সব সাব? সমাজ যেন ঘুনে ভরে গেছে। এ সমাজকে আমি চরম আঘাত করতে চাই।" বঙ্গবন্ধুর সুরে সুর মিলিয়ে দরিদ্র কৃষক ফজলুর রহমান সমাজের এই ঘুনে আঘাত হেনেছেন। কৃষি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে পাওয়া অসম্মান দেশবাসীর নজরে এনেছেন। স্যালুট কৃষক ফজলুর রহমানকে।

সংবিধানের সপ্তম অনুচ্ছেদে স্পষ্ট বলা আছে, প্রজাতন্ত্রের মালিক জনগণ। এ কথাটা সব সময় মনে রাখা প্রয়োজন। জনগণের করের পয়সায় যাদের বেতন হয়, যারা কথায় কথায় বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার কথা বলে মুখে ফেনা তোলেন, তাঁরা বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণটি হয় শোনেননি অথবা পড়েননি। পড়লে বা শুনলেও এর অর্থ বোঝেননি। বুঝলে ফজলুর রহমানকে অফিস থেকে বের করে দিতেন না। সমস্যা নজরে আনার জন্য তাঁকে ধন্যবাদ দিতেন, সম্মান দিতেন। তাঁর কথার গুরুত্ব দিতেন। ধান ক্ষেত পরিদর্শনে যেতেন। তারপর প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতেন।

খবর পেলাম, অভিযুক্ত উপ সহকারী কৃষি কর্মকর্তাকে দিনাজপুরে বদলি করা হয়েছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে ফরিদপুরের সালথায়। কি লাভ তাতে? যা ঘটেছে শিবালয়ে, তা এবার ঘটবে সালথায় বা দিনাজপুরে। অফিসার সাহেবদের চরিত্র না বদলালে যাঁরা দেশের মালিক, তাঁদের কোন লাভ হবে না, উন্নতি হবে না। বরং শাস্তি যদি দিতে হয়, তাহলে তাঁকে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের ক'টি বই পড়াতে বাধ্য করা প্রয়োজন। বাজারে এমন বই অনেক পাওয়া যায়। বইগুলিতে ২৬ মার্চ ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর ভাষণে সরকারি কর্মচারীদের উদ্দেশ্যে উপরে উল্লেখিত কথাগুলো রয়েছে। সেগুলি উপহার দিন। বইগুলি পড়ার জন্য সময় বেঁধে দিন। উনারা পড়ুক। পড়া শেষে পরীক্ষা দিক। সে পরীক্ষায় পাশ করলে চাকুরীতে পুনর্বহাল করুন। তাতে অভিযুক্তদের চরিত্র বদলাবে। দেশের মালিকরা তাঁদের ন্যায্য সম্মান পাবে, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়া সম্ভব হবে। 



মন্তব্য করুন


বিজ্ঞাপন