ইনসাইড থট

ধন্যবাদ, সেই সমস্ত লকডাউন প্রবক্তাদের

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ২২ নভেম্বর, ২০২১


Thumbnail

২৮শে জুলাই ২০২১ তারিখে, বাংলাদেশ কোভিডের ১৬২৩৯ টি নতুন সংক্রামিত লোক নথিভুক্ত করেছে। তারপর ২রা আগস্ট বাংলাদেশ দ্বিতীয় সর্বোচ্চ, ১৫৯৮৯ টি নতুন সংক্রামিত লোক নথিভুক্ত করেছে। বাংলাদেশে ২৮ জুলাই থেকে কোভিড-এর কারণে বেশি সংখ্যক মৃত্যুর রেকর্ড করা শুরু হয়েছে এবং ৫ আগস্ট সর্বোচ্চ সংখ্যক মৃত্যু হয়েছে, প্রায় ২৬৪ জন। তখন যাদের পরীক্ষা করা হয়েছিল তাদের সংক্রমণের হার ২৪% এরও বেশি এবং কিছু সীমান্ত অঞ্চলের জেলাগুলিতে আরও বেশি ছিল। আমি বিশ্বাস করি যে এটি COVID-19 এর ডেল্টা রূপের কারণে ঘটেছে। এরপর ধীরে ধীরে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা কমতে থাকে। ২০শে নভেম্বর, বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো কোভিডের কারণে কোনও মৃত্যু নিবন্ধিত হয়নি, একই দিনে ১৭৮টি আক্রান্ত লোকের খবর পাওয়া গেছে এবং সংক্রমণের হার ছিল ১.১৮%।

হ্যাঁ, আমরা বলতে পারি আমরা ভালো করছি কিন্তু আমি এখনও বিজয় ঘোষণা করার জন্য অপেক্ষা করব (মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কথা পড়ে আমি একটু অবাক হলাম, সফল টিকাদান কর্মসূচির কারণেই নাকি এই সাফল্য অর্জন হয়েছে!)। হা, আমরা হয়ত বলতে পারি বাংলাদেশে কোভিড-১৯ এখন একটি স্থানীয় সংক্রমণ হয়ে উঠেছে, ঠিক মৌসুমি ফ্লু সংক্রমণের মতো। এই সমস্ত অর্জনের জন্য আমি তথাকথিত অকেজো লকডাউনের প্রবক্তাদের ধন্যবাদ জানাতে চাই যা বাংলাদেশে বারবার অসফলভাবে আরোপ করা হয়েছিল। আপনি বলবেন আমি কি মজা করছি? না আমি মজা করছি না। আমি সত্যিই তাদের ধন্যবাদ দিতে চাই। আমাকে ব্যাখ্যা করতে দিন। প্রধানমন্ত্রীর নিবেদিত প্রচেষ্টার জন্য টিকাদানের কভারেজ বেড়েছে, কিন্তু জনসংখ্যার ২০% এর কিছু বেশি যারা সম্পূর্ণ টিকা পেয়েছেন। ইউরোপে, এমনকি কিছু দেশে যেখানে সম্পূর্ণ টিকা দেওয়ার কভারেজ ৮০% (যেমন অস্ট্রিয়া) এর উপরে, সেখানেও সংক্রমণ বাড়ছে। হল্যান্ডে যেখানে ৭০% এরও বেশি লোককে সম্পূর্ণরূপে টিকা দেওয়া হয়েছে, ২০শে নভেম্বর তারা ২০,০০০ এরও বেশি নতুন সংক্রামিত লোক নথিভুক্ত করেছে, যা ইউরোপে প্রতি ১ মিলিয়ন জনসংখ্যার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সংখ্যা। যদিও আমরা একে টিকাবিহীনদের মধ্যে কোভিডের মহামারী বলছি। কোভিড ডেন্টা ভেরিয়েন্ট সম্পূর্ণরূপে টিকাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের মধ্যেও, বিশেষ করে বয়স্ক জনসংখ্যার মধ্যেও সংক্রামিত হচ্ছে (যাকে আমরা বলি ব্রেক থ্রু ইনফেকশন)। অস্ট্রিয়ায়, ৫ মিলিয়ন জনসংখ্যার মধ্যে ৪ মিলিয়ন লোক কে টিকা দেওয়া হয়েছে, তাই ১ মিলিয়ন লোক কে টিকা দেওয়া হয়নি বা তারা টিকা নিতে অস্বীকার করছেন এবং মূলত তারা এই রোগটি ছড়িয়ে দিচ্ছে। কারণ লোকেরা স্বাস্থ্যের পরামর্শ অনুসরণ করছে না, যেমন মুখোশ পরা, ভিড়ের অনুষ্ঠানে জড়ো না হওয়া। সুতরাং, বাংলাদেশে টিকাদানের কভারেজ কম, খুব কম লোকই মুখোশ পরে, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা যাচ্ছে না, এবং লোকেরা ভিড়ের মধ্যে ব্যবসা বা জীবন যাপন করছে। তাহলে, সংক্রমণ কমে যাচ্ছে কেন? এর বেশ কয়েকটি কারণ থাকতে পারে, বাংলাদেশের মানুষের হয়ত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশী বা ক্রস ইমিউনিটি আছে, প্রচুর সূর্যালোক, বিসিজি টিকা দেওয়ার উচ্চ কভারেজ বা বেশী তরুণ জনসংখ্যা থাকার কারণে হতে পারে। কিন্তু লকডাউনের প্রবক্তাদের আমি ক্রেডিট দিতে চাই, জ্ঞাতসারে বা অজান্তে অকেজো লকডাউনের কারণে, লাখ লাখ মানুষ, প্যাকেটজাত টিনযুক্ত সার্ডিনের মতো, শহর থেকে গ্রামে, আবার একই ভাবে কয়েক বার গ্রাম থেকে শহরে, সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে শহরগুলিতে এবং তারপরে অন্য জায়গায় এই রোগ ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। এটি ব্যাপকভাবে সম্প্রদায় সংক্রমণে সাহায্য করেছে, খুব দ্রুত বিপুল সংখ্যক লোককে সংক্রামিত করেছে। আমি নিশ্চিত যে যদি আমরা জনসংখ্যার মধ্যে একটি অ্যান্টিবডি জরিপ করি, আমরা দেখতে পাব যে ৬০-৭৫% বা তার বেশি জনসংখ্যা ইতিমধ্যে সংক্রামিত হয়েছে এবং প্রাকৃতিক অনাক্রম্যতা অর্জন করেছে। এবং তার সাথে সাথে ২০+% টিকা কভারেজের কারণে বেশিরভাগ লোকের এখন একরকম অনাক্রম্যতা রয়েছে। হয়ত আমরা পশুর অনাক্রম্যতা (herd immunity) অর্জন করেছি - বা পৌঁছে গেছি; ভবিষ্যতে বিজ্ঞান এবং গবেষণা আমাদের হয়ত তাই বলবে। বা জাপানের বিজ্ঞানীরা যেমন সেখানে হঠাৎ করে ডেলটা উধাও হয়ার পর যা ভাবছেন, বাংলাদেশেও কি তাই ঘটেছে, ডেল্টা ভেরিয়েন্টটি আবার নিজেকে পরিবর্তিত করতে যেয়ে (mutation) এমন একটি ভাইরাসে রূপান্তরিত হয়েছে যে নিজেকে নিজে হত্যা করেছে এবং সংক্রমণ বন্ধ হয়ে গেছে (জাপানি বিজ্ঞানীর মতে “জাপানে ডেল্টা ভেরিয়েন্টটি অত্যন্ত ট্রান্সমিসিবল ছিল এবং অন্যান্য ভেরিয়েন্টগুলিকে বাইরে রেখেছিল। কিন্তু মিউটেশনের স্তূপ হয়ে যাওয়ায়, আমরা বিশ্বাস করি এটি শেষ পর্যন্ত একটি ত্রুটিপূর্ণ ভাইরাসে পরিণত হয়েছে এবং এটি নিজের প্রতিলিপি তৈরি করতে অক্ষম হয়ে পরে।")। যা হোক, ভাগ্যক্রমে বাংলাদেশে ভালো ব্যাপার হল যে অনেক লোক উপসর্গবিহীন, হালকা উপসর্গহীন নিয়ে রোগে ভুগেছেন বা, অনেকের নিবিড় যত্নের প্রয়োজন ছিল না এবং মৃত্যুর হার তুলামুলক ভাবে অনেক কম ছিল। তবে আমি চাইবো যে লকডাউন প্রবক্তারা তাদের ভুল অকার্যকর লকডাউন ব্যবস্থার কারণে অতিরিক্ত মৃত্যু এবং দুর্ভোগের জন্য দেশবাসীর কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাইবেন।

কেন আমরা ইউরোপে বেশি সংখ্যক সংক্রমণ দেখছি? এর কারণ হতে পারে ১) টিকা সুরক্ষা কমে যাচ্ছে এবং শীঘ্রই বুস্টার প্রয়োজন, ২) লোকদের বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তিদের যাদের টিকা সুরক্ষা কমে গেছে এবং সংক্রামিত হচ্ছে কারণ বেশিরভাগ লোকেরা তথাকথিত ব্যক্তি স্বাধীনতা ফিরে পাওয়ার নামে স্বাস্থ্য পরামর্শ অনুসরণ করছেন না, বিশেষ করে মাস্ক পড়ছে না, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখছে না। ৩) তরুণরা যারা এখনও টিকা পাননি তারা সংক্রামিত হচ্ছে এবং রোগ ছড়াচ্ছে ৪) উপসর্গহীন সংক্রামিত লোকেরা অজান্তে, যারা স্বাস্থ্যের পরামর্শ অনুসরণ করছে না এবং ভিড়ের জায়গায় অন্যদের সাথে মিশে রোগটি ছড়াচ্ছে ৫) ৩০-৪০% লোক টিকা নিতে অস্বীকার করছে, অন্যের সাথে অবাধে মিশছে এবং মাস্ক পরছে না, রোগ ছড়াচ্ছে।

আসুন দেখি বিশ্বব্যাপী এবং বাংলাদেশে আমরা কোভিডের সাথে কোথায় যাচ্ছি? ইউরোপে, তাদের প্রাথমিক কঠোর পরিমাপের কারণে, তারা ব্যাপক সংক্রমণ রোধ করতে পারে এবং বেশিরভাগ জনসংখ্যা সংক্রমণের জন্য সংবেদনশীল থাকে, কারণ তাদের প্রতিরোধের মাত্রা খুব কম ছিল। তারা খুব সফল টিকা শুরু করেছিল, কিন্তু যথেষ্ট লোকেদের টিকা দেওয়ার আগেই, তথাকথিত ব্যক্তি স্বাধীনতা ফিরে পাওয়ার জন্য রাস্তায় আন্দোলন শুরু করার কারণে, রাজনীতিবিদরা দ্রুত সমস্ত বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করে নেয় এবং সবকিছু খুলে দেন। মুখোশ পরা এখন স্বতন্ত্র ইচ্ছা এবং হাতে গুনা কিছু লোক তা ব্যাবহার করছে (সম্পূর্ণরূপে টিকা দেওয়া সত্ত্বেও, আমি সবসময় দোকানে যাওয়ার সময় বা বাইরে যাওয়ার সময় মাস্ক ব্যবহার করি, হল্যান্ডে বা ইংল্যান্ডে অবাক হয়ে লোকেরা আমার দিকে তাকায়, যেন আমি অন্য কোন পৃথিবী থেকে এসেছি। তবে সুইজারল্যান্ড বা স্পেনে এমনকি টিকা দেওয়ার উচ্চ কভারেজ সহ মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক)। এখন বেশিরভাগ ইউরোপীয় দেশ হয় লকডাউন পুনরায় চাপিয়ে দিচ্ছে, মুখোশ পরা বাধ্যতামূলক করেছে, বা কোনও অনুষ্ঠান বা সুযোগ-সুবিধাগুলিতে যোগ দেওয়ার জন্য COVID পাস চালু করেছে। তাদের থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়া দরকার।

সুতরাং, এখনও কোন বিজয় নয়, কোন আত্মতুষ্টি নয়। এটি "শুধু টিকা" কৌশল হওয়া উচিত না, তবে "টিকাকরণ প্লাস" কৌশল হওয়া উচিত। যেখানে আমাদের টিকা দেওয়ার সাথে সাথে লোকেদের মুখোশ পরা, ভিড়ের জায়গা এড়িয়ে চলা, অফিস, স্কুল এবং শিল্পে ভাল বায়ুচলাচল বজায় রাখতে অনুপ্রাণিত করতে হবে, প্রয়োজনে সেগুলি বাধ্যতামূলক করতে হবে। সংক্রামিত ব্যক্তিদের বিচ্ছিন্ন করা নিশ্চিত করা (সংখ্যা কম হওয়ায় এটি এখন সহজ), রোগীর যোগাযোগের সন্ধান এবং মৃত্যু কমাতে সময়মত ভাল রোগ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। মার্ক এবং ফাইজার দ্বারা তৈরি নতুন মৌখিক ওষুধ ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার জন্য দয়া করে WHO বা অন্য কোনও দেশের জন্য অপেক্ষা করবেন না (ইউকে ইতিমধ্যেই মার্কের ওষুধ ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শীঘ্রই উভয় ওষুধ ব্যবহারের অনুমতি দেবে)। ভালো যে বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই মার্কসের ঔযদ তৈরি করছে এবং শীঘ্রই ফাইজারের ওষুধ তৈরি করতে পারবে। আবারও আমি পুনরাবৃত্তি করতে চাই, সকল স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে বঙ্গভ্যাক্সের মতো ঘরে উত্থিত ভ্যাকসিন উৎপাদনকে সমর্থন করুন। জীবন আর জীবিকা বাঁচাতে এই চমৎকার সুযোগ গুলো গ্রহণ করতে অযথা দেরী করবেন না।

অনেকে বলছেন, অনেক দরিদ্র দেশে এখনও সামান্য কিছু লোকদের টিকা দেওয়া হচ্ছে , ঠিক তখন পশ্চিমা দেশগুলিতে তারা বুস্টার ডোজ দিচ্ছে। এটা অনৈতিক। তবে ভেবে দেখুন, বাংলাদেশ বা ভারতে কোভিড স্থল সীমান্ত অতিক্রম করে আসেনি বরং ইউরোপ থেকে বিমানে উড়ে এসেছে। উচ্চ সংক্রমণের সাথে, এবং আরও ভয়ঙ্কর রূপের উদ্ভবের সম্ভাবনার সাথে, আমরা কি ইউরোপের লোকদের বাংলাদেশে বা অন্য দেশে উড়ে আসতে দিতে চাই বরং তাদের বলব দয়া করে আপনারা নিজেকে আরও ভালভাবে রক্ষা করুন এবং ভবিষ্যতে আমাদের সংক্রামিত করবেন না। অনুগ্রহ করে জরুরী প্রয়োজনে বুস্টার ডোজ দিন এবং আমাদের সংক্রমিত না করে আমাদের বাঁচান। আপনাদের ব্যক্তি স্বাধীনতা আমাদের মৃত্যুর কারণ হওয়া উচিত নয়। কোভিড-১৯ শীঘ্রই আমাদের ছেড়ে যাবে না। নতুন বৈকল্পিক রূপ আবির্ভূত হবে এবং ধীরে ধীরে এটি স্থানীয় হয়ে উঠবে বা ইতিমধ্যে পরিণত হচ্ছে। আমাদের ঘনিষ্ঠ নজরদারি প্রয়োজন, তরুণ এবং শিশুদের টিকা দেওয়া, রোগ ব্যবস্থাপনার আরো উন্নতি এবং প্রস্তুত থাকা, আজ এবং আগামী বছরগুলিতে বুস্টার ডোজের জন্য প্রস্তুত হওয়া উচিত।



মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা ও আমাদের সড়ক ব্যবস্থাপনা- মুক্তি কোথায়?


Thumbnail

সম্প্রতিকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে এক মর্মান্তিক দৃশ্যের অবতারণা হয়েছিল। সাবেক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক যে গাড়িটি চালাচ্ছিলেন সেটি একটি মোটর সাইকেলকে ধাক্কা দিলে এই মর্মান্তিক ঘটনার অবতারণা হয়। আর এই মর্মান্তিক ঘটনার সূত্র ধরে আমাদের মনে প্রশ্ন জেগেছে :ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা ও আমাদের সড়ক ব্যবস্থাপনা- মুক্তি কোথায়?

বিজয়ের মাসে আমাদের হৃদয় এমনিতেই  ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে ১৯৭১ সালের পাকিস্তানীরা যে বর্বর হত্যাকান্ড সারা দেশে চালিয়েছিল সেই সব স্মৃতিগুলো থেকে।বিজয়ের মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে সাবেক শিক্ষক যে বর্বরতার পরিচয় দিলেন, কিংবা ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ এবং ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০০৯ বিডিআর সদর দপ্তরে বর্বরতার যে নির্মম ইতিহাস রচিত হলো তার থেকে মুক্তির আকুলতা আমাদের সকলের। কিন্তু কোথায় আমাদের মুক্তি? এক সাগরের রক্তের বিনিময়ে কিংবা ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবীদের রক্তের বিনিময়ে যে আমাদের যে মুক্তি ১৬ ডিসেম্বর হয়েছিল সেটি কি তবে আবার কোথাও বন্দি হয়ে আছে ?

আমাদের ছাত্ররা যে ক্যাম্পাসে শান্তিতে নেই  সেটা আমাদের মহামান্য রাষ্ট্রপতির সমাবর্তন ভাষণে উঠে এসেছে।  সমাজ জনগণ অভিভাবক শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে তাকিয়ে আছেন যখন তখনি এমন একটি মর্মান্তিক ঘটনা সকলকে ভাবিয়ে তুলেছে। 

কিছুদিন আগে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস নিয়ে কিছু কথা লিখেছিলাম। সেখানে আমি এক শিক্ষক মুক্তিযোদ্ধার নীরবতা আকুলতা নিয়ে যে লেখাটি লিখেছিলাম তার সঙ্গে ক্যাম্পাস নিরাপত্তার বিষয় নিয়ে কিছু কথা লিখেছিলাম। লেখার আগে তুখোড় সাবেক ছাত্র নেতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য জনাব এস এম বাহালুল মজনুন চুন্নু ভায়ের সঙ্গে সন্ধ্যায়  ক্যাম্পাসে হাটতে হাটতে কিছু কথা হয়েছিল ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিয়ে এবং তিনি কি পরামর্শ দিয়েছিলেন সে গুলো বলছিলেন।  তার বক্তব্য গুলোর সঙ্গে আমার চিন্তাগুলো মিলে যাওয়াতে লেখার দুঃসাহস দেখিয়েছিলাম।  ভেবেছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সাবেক শিক্ষার্থীর কথাগুলোর গুরুত্ব দেবেন।  হয়তো তারা ভাবছেনও।  সেটা যাই হোক , আজ আবার ছাত্রদের দাবির সঙ্গে আমি সহমত পোষণ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও সারাদেশের সড়কের নিরাপত্তা নিয়ে কিছু কথা বলতে চাই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়কগুলো সাধারণ জনগণের জন্য খুবই প্রয়োজন।সুতরাং, সেখানে সেনানিবাসের মতো বিধিনিষেধ আরোপ সম্ভব নয়। তবে তার পরেও অনেক কিছু করা যায়।  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের রাস্তাগুলো খুবই প্রশস্ত। আমরা যখন ছাত্র ছিলাম তখন দেখেছি শিক্ষা ভবন থেকে কার্জন হলের সামনে দিয়ে দোয়েল চত্বর পর্যন্ত আলাদা রিকশার লাইন ছিল।  ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন খুব সহজেই সেই রকম একটি ব্যবস্থা করে দিতে পারেন।  বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় শিক্ষার্থীরা যাতে নিরাপদে চলতে পারে সেজন্য ফুটপাতগুলো হকার মুক্ত করে দিতে পারেন। এবং ফুটপাতগুলোতে যাতে মোটর সাইকেল বা সাইকেল নিয়ে কেউ পথচারীদেরকে অত্যাচার না করতে পারে সেজন্য ব্যবস্থা করে দিতে পারেন। এমনকি ফুটপাথগুলোকে রক্ষা করতে গ্রীল দিয়ে ঘিরে দিতে পারেন তাতে করে নিদৃষ্ট স্থান দিয়ে পথচারী পারাপার হবে।  এছাড়া গতিসীমা সর্বোচ ১০ কিলোমিটার করে দিতে পারেন।  ভারী যানবাহন প্রবেশ নিষিদ্ধ হতে পারে। আমার এই লেখাটি পড়েও  সেরকম মন্তব্য শুনতে হবে হয়তো।     

প্রসঙ্গক্রমে বলি, আমি রাজনীতি , সমাজের অবস্থা , শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে কথা বলি।সেগুলো যারা পড়েন বা শোনেন তাদের অনেকেই আমাকে পরামর্শ দেন নিজের কথা ভাবতে। আমি তাদের পুনরায় বলি সমাজে আজ অসহায় মানুষ, ছাত্র , শিশুদের নিয়ে কথা বলার মানুষ কমে গেছে।  ক্ষমতায় যারা আছেন তারও নিজেদের অক্ষমতা প্রকাশ করেন।  আমরা শুনি পুলিশরা নাকি সবচে ক্ষমতাবান।  কিন্তু তাদের সঙ্গে যখন কথা বলি তারাও বলেন- তারা কি রকম অসহায়! এইতো গুলিস্তানের সামনে সিএনজি চালকদের কাছ থেকে চাঁদা তুলছে পুলিশের সামনেই! তারা কতটা অসহায় তা দেখে সকলেই মুখ বুজে চলে যান।  আমি চেষ্টা করেছি, প্রতিবাদ করেছি।হয়তো সেজন্য আমি নিজের নিরাপত্তাকে হুমকিতে ফেলেছি ! কিন্তু বিবেকের তাড়নায় নীরব থাকতে পারিনি ! আমার প্রতিবাদ সুবিধাভোগীদের ভালো লাগছে না বলে নিজের বিপদ তৈরী হচ্ছে।  পরিবারের চিন্তা বাড়ছে। তথাপি আমি করছি প্রতিবাদ। আমার লেখার পাঠক/বন্ধুরা  জানতে চেয়েছেন "হুমকি কে দিল, কেন দিল জানালে উপকৃত হই।" আমি তাদের উত্তরে বলতে চাই - অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমার প্রতিবাদে যার সংক্ষুব্ধ তারাই আমাকে হুমকি দিয়েছে।   

আমাদের উপাচার্যরা কত অসহায় তা আমার চেয়ে হয়তো তারাই ভালো বোঝেন।তারা একটি ভালো পদক্ষেপ নিলে আরেকজন তার বাগড়া দেন। একজন যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ দিতে গিয়ে তিনি ব্যর্থ হন তথাকথিত সন্ত্রাসী সিন্ডিকেটের কাছে।একটি শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টি করবার চেষ্টাকে ভণ্ডুল করতে একটি মহল সবসময় চেষ্টা করেন।উপাচার্যকে অসহায় দেখে অনেকেই চুপ থাকেন।আজ আমাদের সকলের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে।  সুতরাং , সময় এখন জাগরণের। সবার আগে মাননীয় উপাচার্যদেরকে শক্ত হতে হবে এবং জনগণ তাঁদের জাগরণের অপেক্ষায়।      

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা নিরাপত্তা সহ ডাস্টবিনের দাবি করেছেন।তারা দাবি করেছেন উপাচার্য মহোদয়ের নিকট যত অভিযোগ জমা পড়েছে সেগুলোর সমাধান দাবি করেছে। আজ এসময়ে মনে পড়লো আমার প্রিয় সংগঠন রোটারাক্ট ক্লাব অফ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা। তারা ক্যাম্পাসে কিছু ডাস্টবিন দিয়েছিলো তখন মাননীয় উপাচার্য ছিলেন অধ্যাপক আব্দুল মান্নান।  উপাচার্য মান্নান স্যার ছাত্রদের দাবির প্রতি সমর্থন দিয়ে ছাত্রদের সঙ্গে উপাচার্য হয়ে মিছিল করেছেন স্বৈরাচারী এরশাদের নিপীড়ন নির্যাতনকে সহ্য না করতে পেরে।আজকের উপাচার্যরা সেই অবস্থান নিতে চাইলে কি হবে জানিনা , তবে এরশাদ আব্দুল মান্নান স্যারকে সরিয়ে দিয়েছিলো। 

কিছুদিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রোটারাক্ট ক্লাবের  সাবেক সভাপতি মঞ্জুরুল ইসলামকে , যিনি এখন বাংলাদেশ প্রতিদিন এর বার্তা সম্পাদক , বলেছিলাম অনুরূপ একটি ব্যবস্থা নিতে।  গতকাল পত্রিকায় দেখলাম তার প্রতিষ্ঠান বসুন্ধারা গ্রুপ সামর্থ্যহীনদেরকে হজে পাঠাচ্ছে। আশা করি তিনি তার প্রতিষ্ঠান বসুন্ধারা গ্রুপকে অনুরোধ করবেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের পাশে দাঁড়াতে।এভাবে যদি দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে দাঁড়ায়, তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু নয় পুরো শিক্ষা ব্যবস্থা অনেক উপরে উঠে আসবে।

ফুটপাথ , রিকশার আলাদা লেন ছাড়া গতিমাত্রা নিয়ন্ত্রণ সাইন ও ট্রাফিক পুলিশের ব্যবস্থা থাকা দরকার আছে।  আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ব্যাপক হারে মোটর সাইকেল ব্যবহার করছে।  সেগুলোকে নিয়মের মধ্যে আনতে হবে। সেজন্য ছাত্রলীগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।যে কথা আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বলছি, সেই কথা গুলো সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা পরিবেশ রক্ষায় অত্যন্ত জরুরি। 

আমাদের ছাত্র -ছাত্রীরা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতা করতে চায় বলে তারা র্যাংকিংয়ের কথা বলে।  সুতরাং সিঙ্গারা সমুসার যুগ থেকে উত্তরণে উপাচার্যদেরকেই আগে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে।  আপনাদেরকে অনেকেই পরামর্শ দেন নিয়োগের ৪ বছর যাতে সম্পন্ন করতে পারেন সেদিকে মনোযোগ দিতে।  দোহাই , আপনারা সেই মেয়াদ পূরণের সংস্কৃতি থেকে মুক্ত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে মুক্তির বার্তা দেন।  জনগণ এখন শিক্ষক -শিক্ষার্থীদের মুখে তাকিয়ে আছে। 

আগামী কয়েকদিন পরে মুক্তির সংগ্রাম ও স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র অর্জনে অনন্য ভূমিকা রেখে যে সংগঠন ইতিহাস সৃষ্টি করেছে সেই সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সম্মেলন।  আপনাদের সম্মেলনে শিক্ষার উন্নয়নের ভাবনাগুলো স্থান পাবে বলে আমার আশা। " আমরা যদি না জাগি মা কেমনে সকাল হবে "- কবির এই ছন্দ মিলিয়ে বলতে চাই - "ছাত্রলীগ যদি না জাগে আপা  কেমনে মুক্তি আসবে ?" 

ছাত্রলীগের লক্ষ লক্ষ কর্মী সরকারের পাশে আছেন।  আপনাদের একটু সমাজ ভাবনা জাতিকে উন্নয়নের মহাসড়ক থেকে শান্তির সৈকতে নিয়ে যাবে।  ক্যাম্পাস নিরাপত্তা যাতে সম্ভব হয় , সড়কে নিরাপত্তা ও শৃংখলা যাতে থাকে সেজন্য আপনাদের একটু দায়িত্ব নিতে হবে।  আপনারা আপনার ক্যাম্পাসে সেচ্ছাসেবক হিসেবে যদি কাজ করেন, তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃংখলার দৃষ্টান্ত সারা দেশে ছড়িয়ে যাবে এবং সেটা নেত্রীর হাতকে শক্তিশালী করবে। জনগণ এখন একটু শান্তি চায়।আপনার কি শান্তির পায়রা মুক্ত করে সম্মেলন শেষে  শান্তির দূতের ভূমিকায় একটু সময় দেবেন কি

সারা দেশেই পথে নিরাপত্তা নেই পরিবহন শ্রমিক , মালিক ও তাদের সহযোগীদের কারণে। উন্নয়নের সুফল যাতে মানুষ আরও সুন্দরভাবে ভোগ করতে পারে সেজন্য সরকারের মনোযোগ আরও বেশি কাম্য। আর যেন সড়ক পথে কিংবা ক্যাম্পাসে নির্মমতার শিকার না হয় সেজন্য আমাদের জাগরণ প্রয়োজন।  ১০ তারিখ যারা সরকার পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখছেন তাদের জন্য বলছি - সরকারকে চাপে না ফেলে দেশের জনগণ যাতে একটু শান্তি পায় সেজন্য দলকে কাজে লাগান।  লক্ষ লক্ষ লোক দেখিয়ে পাকিস্তানে বেনজির বা নওয়াজ শরীফ কিছুই করতে পারেনি।  বরং, নিজ নিজ এলাকায় কিছু করলে জনগণের কাছে প্রিয় হতে পারবেন।  যেদিন জনসভার সংষ্কৃতি থেকে রাজনীতি মুক্ত হবে, সেদিন কেবল গণতন্ত্রই নয় সব ধরনের মুক্তি আসবে। জনসভা এখন জনগণকে অসহায় অবস্থায় ফেলে দিচ্ছে।  সড়কের নিরাপত্তা ভেঙ্গে পড়ছে। এখন জনসমাবেশ নয় জনগণের পাশে দাঁড়ানোর সময়।শৃংখলা রক্ষায় আমাদের পুলিশ কর্তৃপক্ষ এমনিতেই হিমশিম খাচ্ছে - সেই সময়ে জনসভার রাজনীতি তাদের সক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করছে এবং তাতে আমাদের সকলের নিরাপত্তায় হুমকি সৃষ্টি করছে।  পরিণামে আমরা এক দুর্যোগের দিকে ধাবিত হচ্ছি।  প্লিজ - আমাদেরকে দুর্যোগ থেকে মুক্তি দিতে জনসভার রাজনীতি থেকে সরে আসুন।জনগণ এবার তাকেই ভোট দেবে যারা জনগণের শান্তির কথা ভাবে -জনসভা দেখে নয়!      



মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

মনি ভাই, আপনার কথা এক মুহূর্তের জন্যও ভুলি না


Thumbnail

আমার ছাত্র রাজনীতিতে প্রকৃত গুরু বলতে যদি কেউ থাকে তাহলে অবশ্যই বলতে হবে শেখ ফজলুল হক মনি। মনি ভাই আমার রাজনৈতিক গুরু অর্থাৎ রাজনৈতিক মেন্টর। যদিও মরহুম আব্দুর রাজ্জাক সাহেব এবং আমার ভাগিনা শহিদুল হক মুন্সী দুজনই আমাকে প্রথম ছাত্রলীগের সদস্য হিসেবে কাজ করার সুযোগ দেন এবং মনি ভাইয়ের কাছে নিয়ে যান। মনির ভাইয়ের সাথে কথা বলার পরে জিজ্ঞাসা করলো বাড়ি কোথায়? আমি বললাম গোপালগঞ্জ। শুনে তিনি মুচকি হাসি দিলেন।

মাঝে মাঝে মনি ভাইয়ের আরামবাগের বাসায় যেতাম। আজ মনি ভাইয়ের জন্মদিনে তার ব্যাপারে দুটো বিষয় উল্লেখ করার লোভ সামলাতে পারছিনা। মুক্তিযুদ্ধের পরে একজন যুবক আমার সাথে দেখা করলেন। আমি তাকে মনি ভাইয়ের খুব নিকটস্থ কর্মী হিসেবে চিনি। মনি ভাইয়ের প্রায় অন্ধ ভক্তই বলা চলে। মুক্তিযুদ্ধের সময় যেহেতু মনি ভাই মুজিব বাহিনী থাকতেন এবং আমি মুজিবনগরে চিকিৎসা সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ব্যস্ত থাকতাম এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে অন্যভাবে যুক্ত ছিলাম। তো সেই যুবকটিকে আমি আগে কখনো দেখিনি। সে এসে আমাকে বললেন যে আমি কি আপনাকে সালাম' করতে পারি? আমি বললাম, আমি আর এমন কি, সালাম করতে হবে না। তবু সে সালাম করবেই। আমি বললাম করো। সালাম করে সে আমাকে বলল, আপনার সাথে দেখা হয়নি আগে কিন্তু আমি মনি ভাইয়ের কাছে আপনার কথা শুনেছি। তিনি আপনাকে এতো পছন্দ করেন যে আপনার কোনো কথা ফেলবেন না।

সে আমাকে বলল, আমি খুবই সাধারণ মধ্যম শ্রেণীর পরিবারের ছেলে। আমার একটা চাকরি খুব দরকার। আমি রাজনীতি করতে চাই না। আমি বললাম তুমি মনি ভাইকে বলো। সে বলল আমি অনেক বলেছি, কিন্তু ভাই শুধু চুপ থাকেন। তারপর একজন বুদ্ধি দিলো যে আপনাকে দিয়ে মনি ভাইকে বলাই। আমি তাকে বললাম, আমি প্রথমত তোমাকে চিনি না। সে জবাব দিলো আপনিতো আমাকে সাথে নিয়ে যাবেন, তখনি তো বুঝবেন যে আমাকে আমি মনি ভাইয়ের লোক কিনা। তারপর আপনি বলবেন। এইজন্য তো আপনি আমাকে নিয়ে যাচ্ছেন। আমি বললাম ঠিক আছে।

তার পরেরদিন তাকে নিয়ে মনি ভাইয়ের ওখানে গেলাম। আমাকে দেখে মনি ভাই বলল, কিরে তুইতো বলেছিস তুই লেখাপড়া করবি। আমার এখানে তুই আসছিস কেন? পত্রিকায় লিখবি নাকি? আমি হাসে বললাম, আমারে চোখের লেখাপড়া চলছে। আশা করি এবার শেষ করতে পারব। তো এখন বল কি জন্য আসছিস? তার সাথে অনেক লোকজন। জিজ্ঞাস করলাম সবার সামনে বলা যায় বলা যাবে? তিনি অনুমতি দিলেন। আমি আমার সাথের যুবকটিকে দেখি বললাম, উনিতো আপনার সাথে মুক্তিযুদ্ধের কাজ করেছে। মনি ভাই তাকে দেখে বললেন, যদি বিশিষ্ট কয়েকজন মাত্র আমার মুক্তিযোদ্ধা এবং আমার বিশ্বস্ত কর্মী এবং রাজনীতি বুঝে মুক্তিযুদ্ধ করেছে এমন কয়েকজনের কথা বলি তাহলে তাদের মধ্যে এই যুবক একজন। আমি বুঝলাম যে ছেলেটি যা বলেছে তা সত্যিই বলেছে। আমি বললাম মনি ভাই ও আমাকে নিয়ে এসেছে একটা তদবির করার জন্য। মনি ভাই বলল, কি অনুরোধ করার জন্য এনেছে তা আমি জানি। আমি একটু চুপ করে থাকলাম। ওকে একটা চাকরি দিতে হবে, এইতো? আমি বললাম, জী। মনি ভাই বললেন, ঠিক আছে ওকে আমি চাকরি দিবো। ছেলেটিকে বললেন, তুমি যাও। যাওয়ার পর মনি ভাই একা আমাকে কিছু কথা বললেন। মনি ভাই বললেন, শোন, তোকে একটা কথা বলি। তোর ভবিষ্যতে অনেক কাজে লাগবে। আমি চুপ করে আছি। মনি ভাই আমাকে বললেন, এই যে কর্মীটা যাকে আনলি তাকে আমি চাকরি ঠিকই দেবো কথা দিলাম। কিন্তু হবে কি জানিস? এর ফলে আমাদের বিপদ-আপদের সময় সবচেয়ে বিশ্বস্ত এবং রাজনৈতিক সচেতন একজন কর্মীকে সারা জীবনের জন্য হারলাম। এই চাকরি দেওয়ার জন্যই তার নিজের ক্ষতি হলো, আমাদের ক্ষতি হলো এবং দেশের ক্ষতি হলো। এটা তোকে বললাম তোর মনে রাখার জন্য। মনিভাই তার কথা রাখেন। ছেলেটির চাকরি হয়। এরপর তার সাথে আমার একবার দু'বার দেখা হয়েছে। এখন সে কোথায় আছে আমি জানিনা। এই হচ্ছে কর্মীদের সম্পর্কে মনি ভাইয়ের মূল্যায়ন।

আরেকটি কথা আমি বলতে চাই, তখন আমি থার্ড ইয়ারে পড়ি। আমাদের তখন রাতে ক্লাস থাকতো এটা মনির ভাই জানেন। আমি গিয়েছিলাম মনি ভাইয়ের সাথে দেখা করতে। তখন সন্ধ্যা সাতটা সাড়ে সাতটা বাজে। আমাকে দেখেই মনির ভাই খুবই রাগ হয়ে গেলেন। ধমক দিয়ে বললেন, এখন আসছিস কেন? তোর তো এখন ওয়ার্ডে থাকার কথা। আমি এত ভয় পেয়েছি কি বলব বুঝতে পারছিলাম না। তুই ডাক্তার হবি। তোর প্রয়োজন হলে দিনের বেলা আসতি। ক্লাস ফাকি দিয়ে কেন? তোদের রাতের ক্লাস তো গুরুত্বপূর্ণ। আমি এতো ভয় পেয়েছিলাম যে, আর কিছু না বলে শুধু বললাম, তাহলে ঠিক আছে আসি মনি ভাই। সালাম করতে গেলাম। আমাকে বললেন সালাম লাগবে না। ওই ভাতের টেবিলে বস। আমাকে ভাত খাইয়ে একটা টাকা দিয়ে বললেন, যা রিকশা নিয়ে চলে যাবি। তার কথা আমি জীবনে ভুলবো না। আমার মনে হয় একজন ছাত্র নেতা হিসেবে একজন যুব নেতা হিসেবে মনির সাথে তুলনা করার মত আরেকটি লোক আমি এখনো দেখি না।

মনি ভাইকে যারা হত্যা করেছে তারা বুঝেই হত্যা করেছে এবং জানে যে মনি ভাই জীবিত থাকলে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে হত্যাকারীরা কোনদিনও রেহাই পেতো না।

মনি ভাই, আপনার কথা এক মুহূর্তের জন্যও ভুলি না। আপনার সন্তান তাপস এবং পরশ আমাকে পিতৃতুল্য সম্মান করে। এটাই আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া যে আপনার এত সুন্দর সোনার চাঁদের মত দুটি ছেলে আল্লাহ জীবিত রেখেছে এবং তারা ভালোভাবে দায়িত্ব পালন করে চলেছে।



মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

১০ ডিসেম্বরকে অবশ্যই প্রতিহত করতে হবে


Thumbnail

১০ ডিসেম্বর বিএনপি ঢাকায় একটি সমাবেশ ডেকেছে। এটি শুধু বাংলাদেশে নয় বিদেশেও এখন আলাপ আলোচনা হচ্ছে। বিদেশে অনেকের ভেতরেই এটি নিয়ে উৎকণ্ঠা কাজ করছে। কারণ তাদের সবারই ঢাকায় আত্মীয় স্বজন আছে। বিএনপি বলছে বিপুল সংখ্যক লোক তাদের এই সমাবেশে যোগদান করবে। তাদের সহযোগিতার জন্য দার্শনিক রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা বলছেন, কোন যানজটের ধর্মঘট যেনো না হয় সেটি বিষয়টি খেয়াল রাখতে এবং ছাত্রলীগের সম্মেলনকেও তিনি এগিয়ে এনেছেন যাতে বিএনপি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মঞ্চসজ্জা থেকে শুরু করে সকল পুর্বপ্রস্তুতি নিতে পারে। এবং আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে তিনি ইতিমধ্যে এ ব্যাপারে নির্দেশনা দিয়েছেন বলে আমরা বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে জানতে পেরেছি। ব্যাক্তিগতভাবে অনেকের সাথে যোগাযোগ করেও আমি জানতে পেরেছি যে, তিনি তার দল এবং যারা আইন রক্ষাকারী বাহিনী কেউ যাতে বাড়াবাড়ি না করে এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তারা যেনো শান্তিতে তাদের মহাসমাবেশ করতে পারে এবং সরকারের পক্ষ থেকে যতটুকু সাহায্য সহযোগিতা করা প্রয়োজন সেটুকু তারা করবেন। যদিও এটি কোনো পত্রিকায় আসেনি কিন্তু আমার ধারণা যেহেতু মহাসমাবেশে বিপুল সংখ্যক মানুষ আসবে বলে দাবি করছে বিএনপি, সেখানে পানির অসুবিধা হতে পারে, আমার ধারণা সরকার সেখানে তাদের জন্য পানির ব্যাবস্থাও করে দিবেন। সুতরাং আমার মনে হয় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ১০ তারিখ বিএনপির সমাবেশ করতে কোন অসুবিধা হবে না।

 

এই বিষয় নিয়ে আমাকে হঠাৎ করে গতরাত্রে ওয়েলস থেকে একজন ফোন করলেন। তার বাবা ছিলেন মরহুম সমাজকল্যাণ মন্ত্রী মহসিন সাহেবের বন্ধু। তারা আওয়ামী লীগ পরিবারের হলেও সরাসরি আওয়ামী লীগ দলের সাথে যুক্ত নয়। তার পিতাও দলের সাথে যুক্ত ছিলেন না। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে তিনি অনেক শ্রদ্ধা করতেন। তারা সকলেই খুবই নিভৃত মনে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারন করেন এবং তার কন্যাকেও খুবই সম্মানের চোখে দেখেন। আর এ কারণে তাদের সাথে আমার গত ৩০ বছরের যোগাযোগ। তিনি আমাকে বললেন, একটা সংবাদ এই মাত্র তিনি তার ছোট ভাইয়ের মাধ্যমে পেয়েছেন। কথাটি শুনে মনটা খুবই খারাপ হয়ে গেলো। বিষয়টি হলো কেনো ১০ ডিসেম্বর তারা মহাসমাবেসের তারিখ ঠিক করল। ১০ ডিসেম্বর আমরা জানি মানবাধিকার দিবস। তার চেয়ে গুরুত্বপুর্ন যে বিষয়টি তা হলো ১০ ডিসেম্বর প্রথম ১৯৭১ সালে এ দেশে বুদ্ধিজীবীদের ধরে নিয়ে যেয়ে রাজাকার আল-বদররা হত্যা করে। যাতে দেশ স্বাধীন হলেও কোনো বুদ্ধিজীবী যেনো জীবিত না থাকে। একটি গোষ্ঠী যদি ধরি তাহলে ১৯৭১ সালে চিকিৎসকরা সবচেয়ে বেশি জীবন দিয়েছে এবং ব্যাক্তিগতভাবে আমারও একটি দুর্বলতা আছে, কারণ আমার সরাসরি ২ জন শিক্ষক অধ্যাপক আলিম চৌধুরী এবং অধ্যাপক ফজলে রাব্বি। অধ্যাপক ফজলে রাব্বির অধীনে মিয়া চাকরীও করেছি। এই দুইজনকেও একই ধারাবাহিকতায় হত্যা করা হয়। বুদ্ধিজীবী হত্যার দিবসটি তাই আমার কাছে একটি ব্যাক্তিগত বেদনারও বিষয়। ওয়েলসের আমার সেই ছোট ভাই বললো পাকিস্তানের ইন্টিলিজেন্ট ব্রাঞ্চ আইএসআই’র টাকা দিয়ে এবং আইএসআই এর বুদ্ধিমতো বিলেতে অবস্থিত রাজপুত্রের মাধ্যমে ১০ডিসেম্বরকে ঠিক করা হয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও যাতে এগিয়ে না যেতে পারে তার সর্বশেষ চেষ্টা হচ্ছে ১০ ডিসেম্বর। এটা শোনার পর আমার মনে হলো কেবল সোহরাওয়ার্দী উদ্যান নয়, শুধু মাত্র শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে ছাড়া আর কোথাও কোনো গনজামায়াত বা কোনো কিছু হতে দেওয়া উচিত না।  আর সেইখানে বিএনপি দাবি করছে তারা সোহরাওয়ার্দী উদ্যান নয় পল্টন ময়দানে সমাবেশ করবে। এটাতো মামা বাড়ির আবদার না। আমি মনে করি ৯ তারিখ রাত ১২ টার পর শহীদ মিনারে প্রতিকি মোমবাতি জালিয়ে আমাদের শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণ করা উচিত এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের আসে পাশে না করে বাকি বিভন্ন জায়গায় আমরা ৯ তারিখ থেকে ১০ তারিখ পর্যন্ত ছোট ছোট আকারে হলেও সভা করা উচিত। তাদের আত্মা যাতে শান্তি পায়। তাদেরকে ভুলে যাইনি। কেননা এটা সরাসরি আমাদেরকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। যারা সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বন্দবন্ধুর নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে, ৩০ লক্ষ মানুষ তাদের জীবন দিলো, ২ লক্ষ মা বোন তাদের ইজ্জত দিলো তাদের কি আমরা স্মরণ করবো না? আমরা মৃত্যুর আগের যদি তাদের ভুলে যাই তাহলে কিভাবে হবে। ৯ এবং ১০ ডিসেম্বর হচ্ছে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নিবেদিত। যেহেতু সরকার তাদের অনুমতি দিয়েছে তারা তাদের সমাবেশ করুক। কোন প্রকার পেশি শক্তি দেখি আমরা তাদের সমাবেশ নষ্ট করতে চাই না। এটা কোনো রাজনীতির ভাষা নয়। যেহেতু দার্শনিক রাষ্ট্রনায়ক নির্দেশ দিয়েছেন এখানে তাদের গনজামায়াত হবে তাই এই ব্যাপারে আমরা কোনো কথা বলবো না। তারা সমাবেশ করুক। কিন্তু বাকি শহরগুলোতে সকলে মিলে নিজের দলের পরিচয় ভুলে গিয়ে আমরা ৯ এবং ১০ ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় অবশ্যই শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণ করবো এবং এই আইএসআইের পরিকল্পনা মতো ঠিক করা ১০ ডিসেম্বরকে অবশ্যই প্রতিহত করতে হবে। কেননা তা না হল আমাদের আরেটি পরাজয় গ্রহণ করতে হবে। আমরা পরাজিত হবার জন্য মুক্তিযুদ্ধ করিনি। পরাজিত হবার জন্য দার্শনিক রাষ্ট্রনায়ক দেশকে এগিয়ে নিচ্ছেন না। এটাতে অবশ্যই দার্শনিক রাষ্ট্রনায়কের হাত শক্তিশালী করা হবে এবং একই সাথে আওয়ামী লীগও উপকৃত হবে। কিন্তু আওয়ামী লীগকে সাহায্য করার জন্য আমরা এটি করছি না। আমরা করছি বঙ্গবন্ধুর কথা মনে করে, আমরা করছি দার্শনিক রাষ্ট্র নায়ক শেখ হাসিনার নির্দেশিত কথা মনে করে এবং সর্বোপরি যারা এ দেশের জন্য জীবন দিয়েছেন তাদের স্মরণ করে এবং তাদের পরিবারের সাথে একতা ঘোষণার জন্যে। সুতরাং, আইএসআই এর দেওয়া ১০ তারিখে বিএনপি এবং জামাতসহ অন্যান্য ধর্মান্ধরা আমাদের আই শহীদ বুদ্ধিজীবীদের আত্মাকে অপমান করবে এটাকে কিছুতেই গ্রহণ করা যায় না। 



মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

ছাত্রলীগের সম্মেলন এবং প্রাসঙ্গিক ভাবনা


Thumbnail

শিক্ষা, শান্তি, প্রগতির পতাকাবাহী সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিজ হাতে গড়া এই ছাত্র সংগঠনটির রয়েছে অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল এক রাজনৈতিক ইতিহাস। এদেশের প্রতিটি গণআন্দোলনের সাথে প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত হয়ে আছে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নাম। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি সময়ের প্রয়োজনে বাংলা, বাঙালি, স্বাধীনতা ও স্বাধিকার অর্জনের লক্ষে তৎকালীন তরুণ নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রেরণা ও পৃষ্ঠপোষকতায় একঝাঁক স্বাধীনতাপ্রেমী তারুণ্যের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় এশিয়া মহাদেশের ‘বৃহত্তম’ ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। প্রতিষ্ঠাকালীন নাম ছিল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ। পরবর্তী সময়ে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলাদেশে সংগঠনটির পরিবর্তিত নাম হয় বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।

সংগ্রামী এবং স্বাধীনতার চেতনায় লালিত সংগঠনটির প্রতিষ্ঠা পরবর্তী প্রথম প্রত্যক্ষ সংগ্রাম ছিলো বাঙালীর ভাষা আন্দোলন। ছাত্রলীগের নেতৃত্বে ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে বুকের তাজা রক্তের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠা হয় বাঙালির ভাষার অধিকার। ১৯৫৪ সালের যুক্রফ্রন্ট নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভ্যানগার্ড হিসেবে নিয়োজিত ছিলো ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা। যুক্তফ্রন্টের বিজয় সুনিশ্চিত করতে যাদের ছিলো অনবদ্য ভূমিকা। শিক্ষার অধিকার আদায়ে ১৯৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর রাজপথে রক্ত দিয়েছিলো বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ- বঙ্গবন্ধু প্রণিত ঐতিহাসিক ছয় দফা, যার পরিপ্রেক্ষিতে বেগবান হয় আমাদের মহান স্বাধীনতা আন্দোলন; এই ছয় দফা দেশের প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, প্রতিটি অলিতে গলিতে ছড়িয়ে দিতে নিরলসভাবে পরিশ্রম করেছিলো বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। তৎকালীন শাসক শ্রেণীর রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে দেশপ্রেমের বলে বলিয়ান হয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছিলো বঙ্গবন্ধুর ভ্যানগার্ড হয়ে। ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে ছাত্রলীগের ভূমিকা ছিলো ঐতিহাসিক। ছাত্রলীগের নেতৃত্বে বাংলার ছাত্রসমাজ সারাদেশে দুর্বার গণআন্দোলন গড়ে তোলে, যা  রূপ নেয় গণঅভ্যুত্থানে। পদত্যাগে বাধ্য করা হয় পাক শাসককে এবং বন্দীদশা থেকে মুক্ত হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ বাংলার ছাত্র সমাজের পক্ষ থেকে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন। ৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন এবং একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে সারা বাংলাদেশে পাকিস্তানের অপশাসনের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন গড়ে তুলতে ছাত্রলীগ ছিলো সদা তৎপর। 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের  ঐতিহাসিক ৭ই  মার্চের ভাষণে ছাত্রলীগের নেতৃত্বে সারা বাংলাদেশে ছাত্র-সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ এবং শহীদ হন ছাত্রলীগের বহু নেতাকর্মী।  ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছাত্রলীগের সমাবেশে বলেছিলেন- ‘দানবের সঙ্গে লড়াইয়ে যে কোনো পরিণতিকে মাথা পেতে বরণের জন্য আমরা প্রস্তুত। তেইশ বছর রক্ত দিয়ে এসেছি। প্রয়োজনবোধে বুকের রক্তে গঙ্গা বহাইয়া দেব। তবু সাক্ষাৎ মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও বাংলার বীর শহীদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি করব না।’ বঙ্গবন্ধুর কথাতেই তাঁর একান্ত অনুগত বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সতেরো হাজার নেতা-কর্মী মহান মুক্তিযুদ্ধে তাদের বুকের তাজা রক্তে স্বাধীন করেছিল প্রিয় মাতৃভূমি।  

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়েও বাংলাদেশ ছাত্রলীগের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ধারা অব্যাহত থাকে। ঘৃণ্য রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রে ৭৫-এ বঙ্গবন্ধু হত্যা  পরবর্তী সময়ে যখন এদেশের গণতন্ত্র হাটতে শুরু করে উল্টোপথে, তখন গণতন্ত্র পূনরুদ্ধারের বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ছিলো ঐতিহাসিক ভূমিকা। সামরিক জান্তা সরকারের জুলুম, নির্যাতন, বুলেটের আঘাতকে উপেক্ষা করে সৈরাচার বিরোধী গণআন্দোলনের মাধ্যমে অবসান ঘটায় দীর্ঘ পনেরো বছরের সামরিক শাসনের। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের দেশপ্রেম, মানবপ্রেম এবং দেশের স্বার্থে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ধারা অব্যাহত আছে আজও। এদেশের ইতিহাসের অন্যতম কালো অধ্যায় ১/১১’র সময় জননেত্রী শেখ হাসিনাসহ ছাত্র-শিক্ষক সবার মুক্তি এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দাবিতে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ গড়ে তুলেছিলো দুর্বার গণআন্দোলন। প্রতিষ্ঠার সূচনালগ্ন থেকে যখনই বাংলাদেশ সামাজিক, রাজনৈতিক, সংস্কৃতির সংকটের মুখোমুখি হয়েছে তখনই আলোর দিশা হয়ে সংকট মোকাবেলা করেছে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। প্রতিষ্ঠাকালীন থেকে এখনও অবধি বাংলাদেশ ছাত্রলীগ তৈরি করেছে হাজার হাজার দেশপ্রেমিক নেতা-কর্মী। যাদের অবদানে আজও স্ব-মহিমায় উড়ছে শিক্ষা শান্তি প্রগতির পতাকা। এদেশের স্বাধীনতা এবং স্বাধীনতা পরবর্তী সামাজিক, রাজনৈতিক, সংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের অবদান অনস্বীকার্য। দেশ এবং মানবসেবায় নিরলস পরিশ্রমী এই ছাত্র সংগঠনটি তাই রয়েছে সারাদেশের মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায়। ৭৫ পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার সুনির্দিষ্ট দিক নির্দেশনায় সকল অপশক্তির ষড়যন্ত্রকে নস্যাৎ করে সফলতার সাথে কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম এই সংগঠনটি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীদের হাতে অস্ত্রের বদলে কলম তুলে দেওয়ার কৃতিত্বও ঐতিহাসিক এই ছাত্রসংগঠনটির। আমরা দেখেছি করোনা মহামারির সময়ে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ সৃ‌ষ্টি করেছে মানবতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সারা বাংলাদেশের প্রতিটি আনাচে কানাচে বাংলাদেশর ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা পাশে দাঁড়িয়েছে অসহায় মানুষের। খাদ্য সহায়তা, অক্সিজেন সহায়তা, চিকিৎসা সেবাসহ যেকোনো প্রয়োজনে দেশের সংকটকালে সর্বদা মানুষের পাশে ছিলো বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।

তবে কালের বিবর্তনে আওয়ামীলীগের ভ্রাতৃপ্রতিম এই সংগঠনটি এখ সবচেয়ে অবহেলিত। ছাত্রলীগের প্রটোকল নিয়ে এমপি মন্ত্রী হওয়া যায়।যেকোন প্রোগ্রামে অডিটোরিয়াম বা মাঠ ভরাতে আদম হিসেবে ব্যবহার করা যায়। কখনো কখনো লাঠিয়াল হিসেবেও কাজে লাগানো হয়। কিন্তু ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করা যায় না। দিনশেষে চাটুকারদের ভিড়ে হারিয়ে যায় ছাত্রলীগের প্রকৃত ত্যাগী কর্মীরা। 

ছাত্রলীগের শরীরে ঘামের গন্ধ থাকে। ছাত্রলীগ স্যুটেড বুটেড থাকে না কারণ সারাদিন যে আপনাদের কামলাগিরি করতে হয়। তবে ছাত্রলীগের রক্তে উন্মাদনা থাকে, দেশপ্রেম থাকে, কম্প্রোমাইজ না করার দূর্বিনীত দু:সাহস থাকে। বঙ্গবন্ধু আর শেখ হাসিনাকে বুকে ও মগজে নিয়ে ঘুমাতে যায় ছাত্রলীগ।

দিনশেষে তাই শীতাতাপ নিয়ন্ত্রিত বিশেষ বিশেষ আয়োজনে ছাত্রলীগের দাওয়াত মেলে না,সেখানে জায়গা করে নেয় রাজাকারের ছানাপোনারা। ছাত্রলীগের বহু ত্যাগি নেতাকর্মীদের  জীবন সংসারে, ঘরে-বাইরে সবকিছু ত্যাগ করতে করতে বাকি আছে শুধু দলটা ত্যাগ করার। সেই সময়ও হয়তো সমাগত। আর তারা সুসময়ে এমনিতেই অভিমানে দুরে থাকে। দুঃসময়ে বুক পেতে আগলে রাখে দলটাকে। আগামীতে হয়তো আগলে রাখার হিসেবটাও বদলে যাবে। কেননা বক্তৃতায় আপনারা যতই বলেন তারা দলের প্রাণ, এগুলো শুধুই আপনাদের বয়ান।  

আগামী ৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ৩০ তম জাতীয় সম্মেলন। এই সম্মেলনে ত্যাগীদের সর্বোচ্চ মূল্যায়নের প্রত্যাশা তৃণমূলের। আগামীর জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিগত দিনে রাজপথের নেতৃত্ব দানকারী, জননেত্রী শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করতে অবদান রাখা, বিচক্ষণ নেতৃত্বের কাঁধেই উঠুক ছাত্রলীগের ভার। ছাত্রলীগ প্রসঙ্গে জাতির পিতা বলেছেন- আমি দেখতে চাই যে, ছাত্রলীগের ছেলেরা যেন ফার্স্টক্লাস বেশি পায়। আমি দেখতে চাই, ছাত্রলীগের ছেলেরা যেন ওই যে কী কয়, নকল, ওই পরীক্ষা না দিয়া পাস করা, এর বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলো। বঙ্গবন্ধুর সেই আকাঙ্খা পূরনের দায়িত্ব ছাত্রলীগের। তাই যোগ্য ব্যক্তিদের ছাত্রলীগের নেতৃত্ব প্রদানের মাধ্যমে ছাত্রলীগকে একটি মেধীবী সংগঠনে পরিণত করা এখন সময়ের দাবী। জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু।

লেখক: এন আই আহমেদ সৈকত 
সাবেক ছাত্রনেতা (shadshaikatbd@gmail)


ছাত্রলীগ   আওয়ামী লীগ   সম্মেলন  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

বিজয়ের এই মাসে

প্রকাশ: ০৮:০০ এএম, ০২ ডিসেম্বর, ২০২২


Thumbnail

শুরু হলো বিজয়ের মাস। মহান বিজয় দিবস উপলক্ষ্যে জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি বক্তব্য এরকম-‘এই বাংলাদেশ লালন শাহ, রবীন্দ্রনাথ, কাজী নজরুল, জীবনানন্দের বাংলাদেশ। এ বাংলাদেশ শাহজালাল, শাহ পরান, শাহ মকদুম, খান জাহান আলীর বাংলাদেশ। বাংলাদেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ, ধর্মান্ধ নয়। তাই ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার করবেন না। প্রত্যেককে নিজ নিজ ধর্ম পালনের অধিকার রাখেন। বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান- সকল ধর্মের-বর্ণের মানুষের রক্তের বিনিময়ে এ দেশ স্বাধীন হয়েছে।’প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিষয়টি স্পষ্ট করে ব্যক্ত করেছেন। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সংকটের মধ্যে বিজয় দিবস পালিত হচ্ছে। স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী অতিক্রম করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে শেখ হাসিনার বাংলাদেশে, মানুষের এগিয়ে চলার মহামন্ত্র আজ বিশ্ববাসী শুনতে পাচ্ছে। আসলে গভীরতর অর্থে, চেতনার পরিমাপে মুক্তিযুদ্ধের একটি ব্যাপক এবং বহুমাত্রিক রূপ রয়েছে। রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলন থেকে শুরু করে পাকিস্তানি অপশাসন-বিরোধী প্রতিটি আন্দোলনের সেই অনিবার্য চেতনা আমাদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক জীবনে যুগান্তকারী পরিবর্তন সাধন করেছে। ‘মুক্তি’ আন্দোলনের গণজাগরণ ও সংগ্রামী চেতনার স্পর্শে এক অপরিমেয় সম্ভাবনায় উজ্জীবিত হয়ে উঠেছিল আমাদের জনতা। সেই উজ্জীবনী শক্তি একাত্তরের রক্তস্নাত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়ে বর্তমান সময়েও চলিষ্ণু। সংগত কারণেই একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের অগ্রগতিতে মুক্তিযুদ্ধের অবদানকে নতুন করে মূল্যায়ন করা জরুরি হয়ে পড়েছে। যুদ্ধোত্তরকালে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ঘটনা সদ্য স্বাধীন দেশের বাস্তবতায় ছিল ভয়ঙ্কর ও অনাকাঙ্ক্ষিত। এসময় থেকে বাংলাদেশ ভূখণ্ডের নবতর অভিযাত্রা ব্যাহত হয়। যুগান্তকারী সব পরিবর্তন-সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবার পরই আবার রুদ্ধ হয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধের মুক্ত চেতনা, গণতন্ত্র ও শিল্পবিপ্লবের অবাধ বিকাশ হয় প্রলম্বিত। দীর্ঘ ২১ বছর পর পুনরায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধু ফিরে এলেন, জয় বাংলা ধ্বনিত হলো এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে স্বমহিমায় পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হলো। আর ২০০৮ ও ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে একাধারে সাড়ে ১৩ বছর ক্ষমতায় থাকায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আপামর জনগণের সঙ্গে বর্তমান প্রজন্ম তথা আড়াই কোটি তরুণ ভোটার আজ উজ্জীবিত। এজন্যই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবসময় বলে থাকেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা যায়। তাঁর মতে, সংবিধান ও গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা রক্ষার মাধ্যমে সামগ্রিক উন্নয়ন অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। এসময়ে এ কথার গুরুত্ব অপরিসীম। তিনি বলেছেন, ‘আমার চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই। জাতির পিতা স্বপ্ন দেখেছিলেন বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের। আমি সেই লক্ষ্যে নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে যাচ্ছি।’ রাষ্ট্রনায়কের এই কথার মধ্যেও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অভিব্যক্তি রয়েছে। 

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধ্বংস করা হয়েছিল। আর সেই চেতনা পুনরুদ্ধারে সক্ষম হয়েছেন শেখ হাসিনা। অন্যদিকে একজন রাষ্ট্রনায়কের প্রধান কর্তব্য জনগণের সেবা করা যা বঙ্গবন্ধু তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংগ্রাম আর সরকার প্রধান হিসেবে দেখিয়ে গেছেন। দেশপ্রেমিক শাসক আর জনগণের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার লালন করার মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রকাশ পায়। তবে স্বাধীনতার ৫১ বছর পরও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিষয়টি অমীমাংসিত থেকে গেছে। কারণ মুক্তিযুদ্ধের পরও আমরা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তিকে রাজনৈতিকভাবে নির্মূল করতে পারিনি। আমরা মনে করেছিলাম, রণাঙ্গনের সংগ্রামের ভেতর দিয়ে পাকিস্তানপন্থীদের অস্তিত্ব বিলীন হবে। কিন্তু বিস্ময়করভাবে দেখলাম বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে হত্যার পর ওই বাংলাদেশ বিরোধীরাই ২১ বছর একাধারে এবং ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করেছে। এবং উপহার দিয়েছে জঙ্গিবাদ, মৌলবাদ, সন্ত্রাস আর দুর্নীতি। অবশ্য একথা মনে রাখতে হবে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই প্রধান প্রধান যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন হয়েছে।

এদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আওয়ামী লীগের দিক থেকে উত্থাপিত হয়েছে বারবার। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বকারী বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক মতাদর্শের দিক থেকে প্রগতিপন্থী। কেননা আমরা তাদেরই নেতৃত্বে স্বাধীনতা পেয়েছি। কিন্তু বিএনপির স্লোগানই হচ্ছে গণতন্ত্র। আর সেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় বিএনপির প্রধান সহযোগী হচ্ছে জামায়াতে ইসলাম। গণতন্ত্র বিরোধী শক্তিকে সঙ্গে নিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা কি সম্ভব? শুধু তাই নয় বিএনপির নিজের ভাবমূর্তি গণতান্ত্রিক কি? গত ১৩ বছরে তাদের সুযোগ ছিল বিরোধী দল হিসেবে জনগণের আস্থার জায়গা তৈরি করা। বিশেষ করে জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগ, ১৫ আগস্টের নির্মমতার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বর্জন, ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের দল থেকে বহিঃষ্কার করা- তবেই তাদের দলীয় ভাবমূর্তি স্বচ্ছ হতো।

মনে রাখতে হবে, গণতন্ত্র আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অন্যতম অনুধ্যান। কারণ আমাদের স্বাধীনতাপ্রাপ্তির একেবারে মর্মমূলে রয়েছে গণন্ত্রের আদর্শ। বাঙালির গণতান্ত্রিক চেতনাকে যখন রুদ্ধ করার চেষ্টা করেছিল তথাকথিত পাকিস্তান, তারই প্রতিবাদে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিজয়ী দলকে একাত্তরে ক্ষমতায় যেতে দেওয়া হয়নি বলে গণযুদ্ধ হয়েছিল। এটা তাৎক্ষণিক কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণ। অবশ্য গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে বাংলাদেশের মানুষকে বঞ্চিত করার ঘটনা অনেকদিনের। সেই ইতিহাসে বাংলাদেশের মানুষকে, নানান প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলা করে গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামে অংশগ্রহণ করতে হয়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বলিষ্ঠ ও আপসহীন নেতৃত্বে ৫২এর ভাষা আন্দোলন, ৬২এর শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬এর ৬-দফা, ৬৯এর ১১-দফা ও গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত হয়ে ওঠে বাঙালি জাতি। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগষ্ঠিরতা অর্জন করে। ফলে বৈধ ভিত্তি পায় বাঙালির স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা। আবার এ কথাও সত্য যে, দীর্ঘ ৫০ বছরে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার পথ মসৃণ ছিল না। কখনো একদলীয় শাসন ব্যবস্থায় আর একাধিকবার সামরিক অভ্যুত্থানে পিছিয়ে পড়েছে এদেশ। ২০২২ সালে যুদ্ধের সংকটের মধ্যে যখন বাংলাদেশ বিজয় দিবস পালন করা হচ্ছে তখন গণতন্ত্রের মূল্যায়ন হচ্ছে পুনরায়। বিএনপি-জামায়াতের জনসমাবেশের নামে তাণ্ডবের আশঙ্কা বারবার জেগে উঠছে। ফলে ফিরে এসেছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রসঙ্গ।

২. জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালি জাতি হিসেবে আমরা পেয়েছি স্বাধীন রাষ্ট্র, নিজস্ব পতাকা ও জাতীয় সংগীত। ত্রিশ লাখ শহীদ এবং দুই লক্ষ মা-বোনের অসামান্য আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি স্বাধীন বাংলাদেশ। এজন্য মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলতে হলে ফিরে যেতে হবে ১৯৭১-এ। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণে স্বাধীনতা ও মুক্তির যে ডাক তিনি দিয়েছিলেন সেখান থেকে যাত্রারম্ভে অতীতের সংগ্রামের ইতিহাসকে স্মরণ করে ভবিষ্যৎপ্রসারি করতে হবে দৃষ্টিভঙ্গিকে। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণা করে মুজিবনগর সরকার। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রথম বাংলাদেশ সরকার হিসেবে খ্যাত এই সরকারের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছিল, ‘১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর থেকে ১৯৭১ সালের ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশে অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে শাসনতন্ত্র রচনার উদ্দেশ্যে প্রতিনিধি নির্বাচিত করা হয়েছিল।... সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী বাংলাদেশের জনগণ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রতি যে ম্যান্ডেট দিয়েছেন সে ম্যান্ডেট মোতাবেক আমরা, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা, আমাদের সমবায়ে গণপরিষদ গঠন করে পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশকে একটি সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্র ঘোষণা করছি।’

সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত ‘বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশকে একটি সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্র ঘোষণা’ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। অন্যদিকে ১৯৭২ সালের সংবিধানের ৪টি মূলনীতিও আমাদের মুক্তিসংগ্রামের অংশ। উল্লেখ্য, ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর জাতীয় সংসদে পাস হয় বাংলাদেশের সংবিধান। গত ৫০ বছরে সংবিধান সংশোধন হয়েছে ১৬ বার। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর বিভিন্ন সময়ে অগণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় এসে এই সংবিধানের চার মূলনীতিও বদলে ফেলার চেষ্টা চালিয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার ২০১১ সালের ৩০ জুন পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলোপের পাশাপাশি অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা দখলের জন্য রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধ বিবেচনায় সর্বোচ্চ দণ্ডের বিধান রাখা হয় এ সংশোধনীতে। এছাড়া এ সংশোধনীর মাধ্যমে ৭২র সংবিধানের চার মূলনীতি জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনা হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রও এই সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও সংবিধান অনুসারে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হলো স্বাধীন ভাবে আমাদের বেঁচে থাকা; ব্যক্তিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক মুক্তি, সকল মৌলিক অধীকার সমানভাবে নিশ্চিত করা; অর্থাৎ বৈষম্যহীন, মুক্ত এবং ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন, রাষ্ট্রে বলিষ্ঠ জাতি হিসেবে আমাদের বিকাশের সুযোগ থাকা এবং রাষ্ট্রে বেড়ে ওঠা আমাদের মানব সত্তা বিশ্বে মর্যাদা পাওয়া- সব মিলে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনের কথা বলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা।

৩. পদ্মা সেতু ও মেট্রোরেলের বিজয়গাথার কথা মনে রেখে বলতে হয় বাঙালির যা কিছু গৌরবের তার স্বীকৃতি ঘটেছে আন্তর্জাতিক পরিসরে যার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ সরাসরি সম্পৃক্ত। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে করণীয় বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ ‘ইউনেস্কো ইন্টারন্যাশনাল মেমোরি অব দ্য’ ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টার-এ অন্তর্ভুক্ত করে ‘বিশ্বপ্রামাণ্য ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ২৫ মার্চকে আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস ঘোষণার জোর দাবি উঠেছে। কানাডা প্রবাসী প্রয়াত রফিকুল ইসলাম এবং আবদুস সালামের উদ্যোগে এবং তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রচেষ্টায় ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। আমাদের ঐতিহ্যবাহী জামদানি, মঙ্গল শোভাযাত্রা, নকশিকাঁথা এবং সিলেটের শীতল পাটি ইতোমধ্যে ইউনেস্কোর আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য-তালিকায় স্থান পেয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অগ্রসর না হলে এসব অর্জন সম্ভব হতো না।

৪. কিন্তু দুর্নীতি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করে মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন ও চেতনাকে অবমাননা করছে। সমাজ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে আদর্শ ও নৈতিকতা।  প্রকৃতপক্ষে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রাখার জন্য রাষ্ট্রীয় দুর্নীতির বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু স্বয়ং। তাঁর শাসনামলে ১৯৭৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর জাতির উদ্দেশে প্রদত্ত ভাষণে তিনি বলেছিলেন, ‘... সুখী ও সমৃদ্ধিশালী দেশ গড়তে হলে দেশবাসীকে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়াতে হবে। কিন্তু একটি কথা ভুলে গেলে চলবে না- চরিত্রের পরিবর্তন না হলে এই অভাগা দেশের ভাগ্য ফেরানো যাবে কি না সন্দেহ। স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি ও আত্মপ্রবঞ্চনার ঊর্ধ্বে থেকে আমাদের সকলকে আত্মসমালোচনা, আত্মসংযম ও আত্মশুদ্ধি করতে হবে।’

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রতিষ্ঠার জন্য দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। কিন্তু সেই চেতনা প্রতিষ্ঠার জন্য কেবল রাষ্ট্রীয় নিয়মনীতি, আইনকানুন প্রণয়ন ও প্রয়োগই যথেষ্ট নয়; তার জন্য সামগ্রিক এবং নিরবচ্ছিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ প্রয়োজন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘নেশন মাস্ট বি ইউনাইটেড অ্যাগেইনস্ট করাপশন। পাবলিক ওপিনিয়ন মবিলাইজ না করলে শুধু আইন দিয়ে করাপশন বন্ধ করা যাবে না।’ স্বাধীনতার পর থেকেই দুর্নীতি দমন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিভিন্ন সময় বহুবিধ আইন, বিধি-বিধান প্রণয়ন করা হয়েছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর আরো কিছু নতুন আইন প্রণয়ন করেছে, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার উন্নয়নে বেশ কিছু নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছে এবং এগুলির ব্যবস্থাপনা ও পদ্ধতির উন্নয়ন সাধন করা হয়েছে। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (২০১১-২০১৫) শেখ হাসিনা সরকার সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি দমনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছে। ‘রূপকল্প ২০২১’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রণীত ‘বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০১০-২০২১’ শীর্ষক দলিলে দুর্নীতি দমনকে একটি আন্দোলন হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে। এই আন্দোলনে সবাইকে অংশীদার হতে উদ্যোগও নেয়া হচ্ছে। এছাড়া দুর্নীতি দমনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম যেসব আইন গত মহাজোট সরকারের সময় প্রণীত হয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল: সন্ত্রাস বিরোধী আইন, ২০০৯, তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯, সরকারি অর্থ ও বাজেট ব্যবস্থাপনা আইন, ২০০৯, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০০৯, চার্টার্ড সেক্রেটারিজ আইন, ২০১০, জনস্বার্থ-সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশ (সুরক্ষা প্রদান) আইন, ২০১১, মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২, প্রতিযোগিতা আইন, ২০১২ ইত্যাদি। এসব আইন প্রণয়নের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের সর্বস্তরে দুর্নীতিমুক্ত রাখার প্রত্যয় ঘোষিত হয়েছে। মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর আওতাধীন অপরাধও দুর্নীতি হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু দুর্নীতিকে কেবল আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে দমন করা সম্ভব নয়, তার জন্য প্রয়োজন সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ গ্রহণ ও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা। এজন্য সরকারি কর্মকর্তা, বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন, সুশীল সমাজ ও নাগরিকগোষ্ঠীর সম্মিলিত প্রয়াস দরকার। দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়ে বর্তমান অবস্থার পরিবর্তন করতে দেশের যুবসমাজ বড় শক্তি এবং অপার সম্ভাবনাময় বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় এগিয়ে যাওয়া বাংলাদেশ বলতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হওয়া ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার বাংলাদেশকে বুঝতে হবে। এই বাংলাদেশে জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ প্রণীত হয়েছে। যে শিক্ষানীতি ২০১০-এ ছাত্রদের চরিত্র গঠনের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। শিক্ষানীতির শিক্ষার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য তিন- অংশে বলা হয়েছে : ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করে তোলা ও তাদের চিন্তা-চেতনায় দেশাত্মবোধ, জাতীয়তাবোধ এবং তাদের চরিত্রে সুনাগরিকের গুণাবলি (যেমন: ন্যায়বোধ, অসাম্প্রদায়িক চেতনাবোধ, কর্তব্যবোধ, মানবাধিকার সচেতনতা, মুক্তবুদ্ধির চর্চা, শৃঙ্খলা, সৎ জীবনযাপনের মানসিকতা, সৌহার্দ্য, অধ্যবসায় ইত্যাদি) বিকাশ ঘটানো হবে। অর্থাৎ জাতীয় শিক্ষানীতিও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শাণিত।’

৫. মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় পরিচালিত হচ্ছে রাষ্ট্র এজন্য বাংলাদেশের সবচেয়ে বৃহৎ দল আওয়ামী লীগের নির্বাচনি ইশতেহারে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। ২০১৮ সালের নির্বাচনি ইশতেহারে ৮১ বছরের পরিকল্পনা সংযুক্ত হয়েছে। ২০০৮ সালে দিনবদলের সনদ নামে নির্বাচনী ইশতেহারে ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশের প্রতিশ্রুতি ছিল আওয়ামী লীগের। টানা দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসতে ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের ইশতেহারের স্লোগান ছিল শান্তি গণতন্ত্র উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। সেই ইশতেহারে ২০৪১ সালের মধ্যে দেশকে উন্নত সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করার ঘোষণা দিয়েছিল দলটি। ১৩ বছরে এই দুই ইশতেহারে যেসব প্রতিশ্রুতি ছিল সেগুলোই ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতির পর এখন লক্ষ্য মধ্যম আয়ের দেশ গড়ে তোলা। গত ইশতেহারে ৮১ বছরের অর্থাৎ ২০১৯ সাল থেকে ২১০০ সাল পর্যন্ত পরিকল্পনা ঘোষিত হয়েছে। ডেল্টা প্ল্যানের কথা ইতোমধ্যে সকলে অবগত হয়েছেন। এ ছাড়া ইশতেহারে সন্ত্রাস জঙ্গিবাদ এবং মাদক নির্মূলের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থাপিত। দ্বিতীয় পদ্মা ও যমুনা সেতু, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২ উৎক্ষেপণসহ দেশের সার্বিক উন্নয়নের বিভিন্ন বিষয় ছিল গত ইশতেহারে। দেশের প্রবৃদ্ধি যেন দুই অঙ্কে পৌঁছায় সেজন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের ঘোষণা ছিল সেখানে। উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশবাসী সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফলে বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত এখন, অপুষ্টির অভিশাপ দূর হতে যাচ্ছে; দারিদ্র্যের লজ্জা ঘুচেছে, নিরক্ষরতা দূর হচ্ছে, শিক্ষিত দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে উঠছে, শিল্প-সভ্যতার ভিত্তি রচিত হয়েছে; প্রতি ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছানোর ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। অন্যদিকে বেকারত্বের অবসান ও কোটি কোটি যুব সমাজের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হচ্ছে, সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হবে, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটচ্ছে; যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন হচ্ছে, পরিকল্পিত নগর-জনপদ গড়ে উঠছে এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ সমৃদ্ধির সোপানে পা রাখছে। রাজনীতি থেকে হিংসা, হানাহানি, সংঘাতের অবসান হচ্ছে, দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়নের ধারা থেকে বাংলাদেশ বেরিয়ে এসেছে; গড়ে উঠেছে একটি সহিষ্ণু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা।

বর্তমান সরকারের আমলে উন্নয়নমূলক অনেক কাজ ত্বরান্বিত হয়েছে। আগামী দিনগুলোতে জাতিকে উপহার দেওয়া হবে নতুন ভিশন- নতুন প্রেক্ষিত পরিকল্পনা রূপকল্প-২১০০। আর ২০৪১ সালের বাংলাদেশ হবে মধ্যম আয়ের পর্যায় পেরিয়ে এক শান্তিপূর্ণ, সমৃদ্ধ, সুখী এবং উন্নত জনপদ। সুশাসন, জনগণের সক্ষমতা ও ক্ষমতায়ন হবে এই অগ্রযাত্রার মূলমন্ত্র।

৬. মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা নিজেদের জন্য একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রকাঠামো পেয়েছি। যে রাষ্ট্রের ভিত্তি গণতন্ত্র, সামাজিক সাম্য এবং মৌলিক অধিকার চর্চা। আজ আমরা স্বাধীন জাতি হিসেবে উচ্চ মর্যাদায় অভিষিক্ত। যে রাজনৈতিক সংগ্রাম আর ত্যাগের মধ্য দিয়ে এই রাষ্ট্রের জন্ম সেই ইতিহাসকে যথাযথ উপলব্ধি করাই হলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। এই চেতনার মধ্যে গণতান্ত্রিক দাবি আদায়ের আদর্শ রয়েছে, মুক্তির স্বপ্ন আছে আর আছে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ না করার মূল্যবোধ। অন্যদিকে বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িকতা, সাম্য ও মানবাধিকার আমাদের বর্তমান বাংলাদেশের অগ্রগতির অন্যতম অনুপ্রেরণা যা আবার মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অন্যতম অনুষঙ্গ।

(লেখক : ড. মিল্টন বিশ্বাস, অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, বাংলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং বঙ্গবন্ধু গবেষক,  বিশিষ্ট লেখক, কবি, কলামিস্ট, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রগতিশীল কলামিস্ট ফোরাম, নির্বাহী কমিটির সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ email-drmiltonbiswas1971@gmail.com)



মন্তব্য করুন


বিজ্ঞাপন