ইনসাইড থট

“অনুগ্রহ করে একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করবেন না”

প্রকাশ: ১১:০০ এএম, ২৮ নভেম্বর, ২০২১


Thumbnail

বর্তমান পরিস্থিতিতে করোনায় আক্রান্তের (COVID-19) নিম্ন সংখ্যা এবং কম মৃত্যুর সাফল্যের জন্য, দেখছি বিভিন্ন ধরনের সুবিধাবাদী লোক শক্তিশালী লোকদের মনোযোগ আকর্ষণের জন্য একে অপরের সাথে লড়াই করে, উচ্চকণ্ঠে কেউ কেউ কিছু সরকারি নেতাকে কৃতিত্ব দিচ্ছেন; অন্যদিকে কিছু শক্তিশালী লোক চতুরভাবে মনোযোগ আকর্ষণ করার চেষ্টা করছে এবং এই সাফল্যের কৃতিত্ব নিতে দ্বিধা করছেন না। আজকাল একে অপরের পিঠ চাপড়ানোর মহামারী হয়ে উঠছে বলে মনে হচ্ছে। এই সাম্প্রতিক ঘটনাগুলি দেখে আমি কিছুটা ভয় পেয়েছি। তাদের দেখে মনে হয়, আমরা ইতোমধ্যেই যুদ্ধে জিতেছি, চিন্তার কোন দরকার নেই। আমি ভয় পাচ্ছি, আমরা কি স্বেচ্ছায় ২০২০ সালে এবং ২০২১ সালের প্রথম দিকের একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করতে যাচ্ছি, যা পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তুলেছিল, ফলস্বরূপ দুর্ভাগ্যবশত অতিরিক্ত হাজার হাজার মানুষ ভুক্তভোগী এবং মারা গেছে। সেই ভুলগুলো অকথ্য দুর্ভোগ ও অতিরিক্ত মৃত্যুর কারণ। অনুগ্রহ করে যেহেতু আমরা এখন ভালো অবস্থানে আছি, সঠিক কৌশল প্রয়োগ করুন, আপনার প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম কখনই কম করবেন না। এখনকার নিম্ন ক্ষেত্রের পরিস্থিতি আমাদের কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করা এবং জীবন ও দুর্ভোগ বাঁচানোর জন্য ব্যবস্থা নেওয়া একটি সহজ কাজ হবে। অকালে জয় ঘোষণা করবেন না এবং আবার একই ভুল করবেন না। ধনী পশ্চিমা দেশগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নিন।

ইউরোপ জুড়ে, সফল ভ্যাকসিনেশন কভারেজের কারণে, রাজনীতিবিদরা তাদের সাফল্যের কৃতিত্ব নিতে শুরু করে, সবকিছু অকালেই খুলে দেয়। আবার বুকে ধরে বা চুম্বন করে বা হ্যান্ড শেক করে একে অপরকে স্বাগত জানাচ্ছে, মুখোশ পরা একটি এলিয়েন কাজ হয়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে, মুখোশ ছাড়া হাজার হাজার মানুষ গাদাগাদি করে ফুটবল ম্যাচ উপভোগ করতে শুরু করেছে, থিয়েটার বা সিনেমা বা রেস্তোরাঁয় আগের সামাজিক দূরত্বের সেই ব্যবস্থা উধাও হয়ে গেছে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ফিরে পাওয়ার নামে। সেখানে লক্ষ লক্ষ মানুয এখনও টিকা নিতে অস্বীকার করছে। লক্ষ লক্ষ টিকাসহ বা টিকাবিহীন মানুষ মৃদু বা কোন উপসর্গ ছাড়াই ভুগছে, রোগ ছড়াচ্ছে। সম্পূর্ণরূপে টিকা দেওয়া, নিরাপত্তার একটি মিথ্যা অনুভূতি প্রদান করছে, যদিও আমরা জানি যতক্ষণ আমরা সবাই সুরক্ষিত নই, কেউ সুরক্ষিত নয়। বেশিরভাগ পশ্চিমা দেশের লোক সংক্রমণের জন্য সংবেদনশীল, তাদের স্বতন্ত্র প্রাকৃতিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা খুব কম। দ্রুত ভ্যাকসিন দেওয়ার সফলতার কারণে কোনোভাবে তাদের কোভিড থেকে রক্ষা করে, হাসপাতালে ভর্তি এবং মৃত্যু উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে শুরু করে। কিন্তু ইদানিংকালে টিকাবিহীন মানুষের মধ্যে সংক্রমণের সংখ্যা বাড়ছে এবং ভ্যাকসিনের সুরক্ষা হ্রাস পাওয়ার কারণে টিকা পাওয়া মানুষের মধ্যেও break through infection ঘটছে। পশ্চিমা দেশগুলিতে পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয়ে গেছে, টিকা দেওয়ার উচ্চ কভারেজ সত্ত্বেও, সংক্রমণ কমাতে এবং অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য প্রায় সম্পূর্ণ কঠোর লকডাউন আরোপ করা ছাড়া তাদের আর কোনও উপায় থাকছে না। যেহেতু যত্ন ব্যবস্থাপনার উন্নতি হয়েছে, এমনকি সংক্রামিত মানুষের সংখ্যা বেশি হলেও কম মানুষের মৃত্যু হচ্ছে, যদিও তারা খোলাখুলি বলছে না, তবে মনে হচ্ছে যুক্তরাজ্য কিছু অতিরিক্ত যন্ত্রণা এবং মৃত্যুর খরচেও আরও অনেক লোকের সংক্রামিত হতে এবং অনাক্রম্যতা অর্জন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। লকডাউন আরোপ করা এড়িয়ে চলছে, নতুন সংক্রমণের বিশাল এবং ক্রমবর্ধমান সংখ্যা সত্ত্বেও।

কোভিড-১৯ এর উচ্চ সংখ্যক মিউটেশনের নুতন রুপ যা বতসোয়ানাতে উদ্ভূত হয় এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রথম শনাক্ত হয়েছিল, এখন সেই নতুন (আরও মারাত্মক হতে পারে - আমরা এখনও জানি না) বৈকল্পিকটি যার নাম ওমিক্রোন (omicron), তা উদ্বেগের একটি রূপ হয়ে উঠছে। হংকং, বেলজিয়াম, ইসরায়েল, জার্মানি, চেক প্রজাতন্ত্র বৈকল্পিক রোগটির সন্ধান পাওয়া গেছে। আজ (২৭শে নভেম্বর) কেএলএম (KLM) ফ্লাইটে কেপটাউন এবং জোহানেসবার্গ, দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে উড়ে আসা ৬০০জন যাত্রীর মধ্যে , ৬১ জনের পজিটিভ পরীক্ষার রেজাল্ট পাওয়া গেছে (এখনও Omicron ভেরিয়েন্টে কয়জন আক্রান্ত, তা তারা জানেন না)। হংকং-এ আক্রান্ত দুজনকেই সম্পূর্ণ টিকা দেওয়া হয়েছিল। বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকার ৬টি দেশে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে। যেহেতু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, বেশিরভাগ ইউরোপীয় এবং কিছু এশিয়ান দেশে সংক্রমণ বাড়ছে, তার ফলে আরও মিউট্যান্ট বৈকল্পিক আবির্ভূত হবে এবং বর্তমান ভ্যাকসিন এবং টিকাকরণ কর্মসূচির উপর চাপ সৃষ্টি করবে। যদিও বিজ্ঞানীরা এখনও নিশ্চিত নন যে omicron ভেরিয়েন্ট আমাদের COVID-19 প্রচেষ্টা পুনরায় রিবুট বা আমাদের বর্তমান প্রচেষ্টাকে দুর্বল করবে কিনা, তবে বিজয় ঘোষণা করার এবং একে অপরকে সাফল্যের পিঠ চাপড়ানোর সময় এখনো আসেনি। “শুধু টিকা” দেওয়া কৌশলের জঙ্গিবাদী জনস্বাস্থ্য নেতাদের তাদের কৌশলের বিষয়টিও পুনর্বিবেচনা করতে হবে।

বাংলাদেশের জন্য সুসংবাদ, যদিও প্রাথমিক অব্যবস্থাপনা, স্বার্থপর কার্যকলাপ এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অদক্ষতার কারণে আমদের টিকাদান কর্মসূচি ধীরগতিতে শুরু হয়েছিল। তারপরও, প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং আন্তরিক উদ্বেগ এবং উৎসর্গের কারণে আমরা আমাদের টিকা কার্যক্রম সফলভাবে পুনরায় চালু করতে পেরেছি। প্রধানমন্ত্রী সংসদে আমাদের আশ্বস্ত করেছেন যে বাংলাদেশের নাগরিকদের টিকা দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন রয়েছে এবং থাকবে। বাংলাদেশে এখন সংক্রমণের হার কম, প্রতিদিনের আক্রান্তের সংখ্যা কম, সুস্থ হওয়ার হার বেশি এবং মৃত্যুর সংখ্যা কম। ব্যক্তি এবং পরিবার ধীরে ধীরে কিন্তু ক্রমবর্ধমানে, পরিবারের অন্যদের সাথে মেলামেশা, বিভিন্ন জায়গায় বেড়াতে যেতে শুরু করেছে। অর্থনীতি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। সবচেয়ে ভালো কথা, বাংলাদেশে সকলেই এমনকি তরুণ ও শিশুরা টিকা নিতে চায়।

কিন্তু নেতিবাচক দিক হতে পারে, আমরা আত্মতৃপ্তির কারণে আমাদের বাস্তবায়নযোগ্য পরীক্ষাসহ অন্যান্য প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম কমিয়ে ফেলছি, কম মানুষ মাস্ক পরেছে বা ভিড়ের জায়গা এড়িয়ে চলছে। মনে করছে সবকিছুই স্বাভাবিক, কোভিডের কোনো হুমকি নেই। উপসর্গবিহীন বা হালকা উপসর্গবিহীন রোগীর সংখ্যা বেশী, তারা অজান্তে রোগ ছড়াচ্ছে। ভ্যাকসিন এবং রোগ অর্জিত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। সম্পূর্ণরূপে টিকাপ্রাপ্ত লোকেরা সংক্রামিত হচ্ছে (সম্পূর্ণরূপে টিকাপ্রাপ্ত আমার এক ভাগ্নের স্ত্রী গতকাল সংক্রামিত হয়েছে) এবং ছড়াচ্ছে। ধীরগতির ভ্যাকসিনেশন ড্রাইভ (আমি জানি না টিকাদান কর্মসূচিতে কেন ধীরগতির মনোভাব) আরেকটি চিন্তার কারণ।

আমাদের কি করতে হতে হবে এবং চালিয়ে যেতে হবে:

১। আমাদের টিকা কভারেজ দ্বিগুণ বা চারগুণ করুন, প্রতিদিন বেশি করে, আরো দ্রুত টিকা দিন। আমাদের সেই ক্ষমতা এবং অতীত অভিজ্ঞতা আছে। সঠিক নেতৃত্বে আমরা এটা করতে পারি।

২। সক্রিয় নজরদারি ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করুন

৩। ঘরের বাইরে যাওয়ার সময়, প্লেন, বাসে, ট্রেনে বা লঞ্চে ভ্রমণের সময় মাস্ক ব্যবহারে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করুন এবং বাধ্যতামূলক করুন, এর কঠোর বাস্তবায়ন কার্যকর করুন।

৪। জনাকীর্ণ স্থান এড়াতে জনগণকে অনুপ্রাণিত করুন (মাস্ক ব্যবহার করুন)। স্যানিটাইজার ব্যবহার করুন

৫। অফিস, কারখানা, ব্যবসার জায়গা (রেস্তোরাঁসহ), স্কুল, বিমানবন্দরে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল ব্যবস্থা আছে এবং রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়েছে তা নিশ্চিত করুন। সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে বসার ব্যবস্থা করার চেষ্টা করুন। সে সমস্ত জায়গায় মাস্ক এবং স্যানিটাইজার রাখুন এবং তাদের ব্যবহার নিশ্চিত করুন।

৬। স্বল্প সংখ্যার কারণে (আমাদের কাছে অত্যন্ত দক্ষ প্রশিক্ষিত পোলিও নজরদারি অফিসার রয়েছে), অনুগ্রহ করে সমস্ত সংক্রামিত ব্যক্তিকে কঠোরভাবে বিচ্ছিন্ন করুন এবং যারা তাদের সংস্পর্শে এসেছে তাদের চিহ্নিত করুন এবং তাদের পরীক্ষা করুন।

৭। মানুষকে রোগ পরীক্ষা করার জন্য এগিয়ে আসতে অনুপ্রাণিত করুন।

৮। বিদেশ থেকে উড়ে আসা ব্যক্তিদের বাংলাদেশে প্রবেশের জন্য হয় সম্পূর্ণ টিকা দিতে হবে, অথবা অতিতে সংক্রমিত হওয়ার প্রমাণের কাগজ অথবা নেতিবাচক পরীক্ষার ফলাফল থাকতে হবে। এটা কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। বিমানবন্দরে আগত যাত্রীদের জন্য পরীক্ষার সুবিধা প্রতিষ্ঠিত করুন। কিছুদিন আগে সরকারের আমন্ত্রণে আমি সিরিয়ার সংঘাত-পরবর্তী স্বাস্থ্য ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের কৌশল বিকাশের জন্য তিন সপ্তাহের জন্য বৈরুত হয়ে দামেস্কে গিয়েছিলাম। বৈরুত বিমানবন্দরে অভিবাসনের (immigration) আগে, আমাকে COVID-19 PCR পরিক্ষা করতে হয়েছিল, যদিও আগমনের সময় আমার সম্পূর্ণ ফাইজার টিকা ছিল এবং আমার কাছে করোনা নেগেটিভ পরীক্ষার ফল ছিল। আজ আমস্টারডাম বিমান বন্দরে আশা ৬০০ জনকে বন্দরের ভেতরে PCR পরিক্ষা করে, ফলাফল পাওয়ার পর শুধু নেগেটিভ ফলাফলের যাত্রীদের বাইরে যেতে দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে ৬১জন যারা করেনায় ভুগছেন বলে প্রমাণিত হন, তাদের পৃথকীকরণ করা হয় এবং বিশেষ হোটেলে রাখা হয়।

৯। যারা COVID-19 দ্বারা সংক্রামিত, নিশ্চিত করুন যে তারা প্রয়োজনীয় তথ্য এবং যত্ন পাচ্ছেন হয় বাড়িতে বসে বা প্রয়োজনে হাসপাতালে।  বাংলাদেশে নতুন উদ্ভাবিত ওষুধ পাওয়া যাচ্ছে যা এখন ঘরে বসেই খাওয়া যায়।

এটা আমাকে ১৯৮০ সালের HIV/AIDS সংক্রমণের কথা মনে করিয়ে দেয়। আমি তখন (১৯৮৫) বতসোয়ানায় ছিলাম এবং HIV সংক্রমণের বৃদ্ধি এবং বিপুল সংখ্যক মৃত্যু দেখেছি। বিপুল সংখ্যক মৃত্যুর দীর্ঘশ্বাস দেখে লোকেরা তাদের আচরণ পরিবর্তন করতে শুরু করে। মানুষ স্বাস্থ্য উপদেশ মেনে চলতে শুরু করে, মৃত্যু ও দুর্ভোগ ধীরে ধীরে কমতে থাকে। এইচআইভি/এইডস-বিরোধী ওষুধগুলি প্রায় সর্বজনীন হয়ে উঠতে শুরু করে। ওষুধ মৃত্যু এবং দুর্ভোগ আরও কম করে। মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাপন শুরু করে এবং এইচআইভিসহ আরও বেশি দিন বেঁচে থাকে। এইচআইভি থাকা এখন আর মৃত্যুদণ্ড না। হল্যান্ড এবং অন্যান্য অনেক দেশে সমকামী সম্প্রদায়ের মধ্যে একই রকম ঘটনা ঘটেছে, যেখানে তারা দেখতে শুরু করে যে তাদের বন্ধুরা যৌন আচরণের কারণে HIV সংক্রামিত হয়ে বেশী সংখ্যায় মারা যাচ্ছে। তারা তাদের আচরণ পরিবর্তন করতে শুরু করে এবং ওষুধের সহজলভ্যতা এইচআইভি/এইডসকে একটি দীর্ঘস্থায়ী রোগে পরিণত করে এবং যার ফলে খুব কমই কেউ মারা যাচ্ছিল। কম মৃত্যুর ভয় এবং এইচআইভিতে ভোগা হ্রাসের কারণে ইদানিংকালে আমরা বিপরীত যৌন আচরণের ধরণ লক্ষ্য করছি, ফলে যৌন সংক্রামিত রোগ বাড়ছে। এইচআইভি সংক্রমণ কমছে না। COVID-19 মহামারী মানুষের মধ্যে  একই আচরণগত প্যাটার্নও দেখাচ্ছে। যেহেতু ভ্যাকসিনের কারণে, মৃত্যুর সংখ্যা এবং হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা কমছে, আজকাল মানুষ স্বাস্থ্য উপদেশ মানতে অনিচ্ছুক বা ইচ্ছুক নয়। ফলে রোগের সংখ্যা ক্রমবর্ধমানভাবে আবার বাড়ছে। মনে রাখবেন COVID-19 চলে যায়নি এবং এখনও আরো আনেক কাল আমাদের সাথে থাকবে। টিকা নিন এবং স্বাস্থ্য পরামর্শ অনুসরণ করুন। এটা 'শুধু ভ্যাকসিন' নয় বরং 'ভ্যাকসিনেশন প্লাস' কৌশলটি আমাদের অবশ্যই আসন্ন সময়ের জন্য গ্রহণ করতে হবে। অনুগ্রহ করে একই ভুল করবেন না। জনগণ আপনাদের আবার ক্ষমা করবে না।


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

বিএনপির লবিস্ট কেলেঙ্কারি- দেশ বিরোধী রাজনীতি

প্রকাশ: ১২:০০ পিএম, ২৯ জানুয়ারী, ২০২২


Thumbnail

বিএনপি কি আসলেই রাজনীতি বিবর্জিত একটি দল? আমার আসলেই বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়! যেভাবেই দেখি না কেনো, এই দলটা কয়েক দশকের অভিজ্ঞতাপূর্ণ, এদের নেতার সংখ্যাও নেহায়েত কম না। কিন্তু কি করে বিরোধী দল করতে হয়, কিভাবে রাজনৈতিক বিরোধিতা করতে হয়, কিভাবে বিরোধিতার সূতা গাঁথতে হয়, এই সম্পর্কে এই দলের বিরাট একটা অংশের বিন্দুমাত্র ধারনা নেই বলেই মনে হয়। কেনো নেই বা কেনো গণতান্ত্রিক চর্চা গড়ে উঠেনি, এটা মিলিয়ন ডলার প্রশ্ন! রাজনীতি বা জনগণ না হয়ে এদের ক্ষমতায় যাওয়ার একমাত্র অবলম্বন যেকোনো ভাবে পেছনের দরজা কেনো, এটাও অবাক করা বিষয়!  

টক অব দ্যা টাউন এখন , বিএনপির লবিস্ট নিয়োগ।  কয়েকদিন আগে এই দলের মহাসচিব মীর্জা ফখরুল নিজ মুখেই স্বীকার করলেন, বিএনপি লবিস্ট নিয়োগ করেছে। টাকা কিভাবে গিয়েছে, কত গিয়েছে, সেটা সরকারের এজেন্সির উপর ছেঁড়ে দিয়ে কেনো তারা লবিস্ট নিয়োগ করেছে, সেটা একটু দেখি। তারা লবিস্ট নিয়োগ করেছে, আমেরিকান সরকারকে দিয়ে বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ সরকারকে বিপদে ফেলতে, সরকারকে বিব্রত করতে। এবারের বিএনপির নিযুক্ত লবিস্ট নিয়োগে যে ক'টি বিষয় সামনে এসেছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে নিয়োগকৃত লবিস্টদের দিয়ে বাংলাদেশকে দেয়া আমেরিকার বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগিতা বন্ধ করা, এর মধ্যে কয়েকটি প্রধান অংশ হলো, দেশ রক্ষায় সেনাবাহিনীর হালকা ও ভারী অস্ত্র ক্রয়, ট্রেনিং, লাইফ সেভিং ইকুইপমেন্ট, আছে বাঁধ-সড়ক তৈরির সহযোগিতা, আছে জরুরী খাদ্য ও মেডিসিন সরবরাহ, আছে বন্যা-মহামারী-জলোচ্ছ্বাস-দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি। চিন্তা করে দেখুন, এর সবকিছুই কিন্তু বাংলাদেশের জনগণের সরাসরি স্বার্থ সংশ্লিষ্ট, এর সাথে, দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরোধিতায় বিএনপি কেনো দেশের জনগণকে জিম্মি করলো, সেটা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কোনো বিবেক-বুদ্ধিতেই বুঝে উঠতে পারলো না! এটা বিএনপির কি ধরনের রাজনীতি? 

আচ্ছা, লবিস্ট নিয়োগ করতেই পারে, কিন্তু রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে লবিস্ট নিয়োগ করা যে দেশদ্রোহিতার সমতুল্য, এটা কি তারা জানেন? সরকার যে তাদের এইজন্য ভালো ঝামেলায় ফেলতে সক্ষম, এটাও কি তারা জানেন?  আরে এই কাজটি তারা এই প্রথম করেন নি, এর আগেও করেছেন, ক্রমাগত করে যাচ্ছেন। আচ্ছা, আপনাদের মনে আছে? ২০১৩ সালের ৩০শে জানুয়ারি বিএনপি প্রধান খালেদা জিয়া আমেরিকার প্রভাবশালী পত্রিকা ওয়াশিংটন পোস্টে সরকারের বিরুদ্ধে একটি কলাম লিখেছিলেন, সেখানে সরকারকে বিপদে ফেলতে বেশি কিছু প্রস্তাব রাখা হয়:

১। বাংলাদেশের রাজনীতিতে আরো বেশী আমেরিকান ও ব্রিটিশ হস্তক্ষেপ,
২। বাণিজ্যে সুবিধা বাতিল, 
৩। জেনোসাইডের বিচারের বিরুদ্ধে আমেরিকাকে দাঁড়াতে প্ররোচিত করা। 
৪। জঙ্গি দমনে সক্ষম সামরিক সংস্থার বিরুদ্ধে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা, 

মূলত: এই চারটি বিষয় সেখানে খালেদা জিয়া তার নিজের দেশের বিভিন্ন ইন্সটিটিউটের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অনুরোধ করেন অন্য দেশের শক্তির কাছে। এই দাবীগুলো আপনারা একটি একটি করে চিন্তা করে দেখুন, প্রথমটিতে কিন্তু আমেরিকা পুরো চেষ্টা করেছে, কিন্তু ব্রিটিশ হাইকমিশনারের উপর জঙ্গিদের বোমা হামলার পর তারা পিছু হটে ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ়তায় সেটা পথ হারায়। 

দ্বিতীয়টিতে কিন্তু খালেদা জিয়া সফল হোন, বাংলাদেশকে দেয়া জিএসপি সুবিধাটি আমেরিকা বাতিল করে দেয় এবং বাংলাদেশ গত ৬ বছরে লক্ষাধিক কোটি টাকার বাণিজ্য হারায় ও ভিয়েতনাম আমাদের দেশকে রেডিমেড গার্মেন্টস রপ্তানিতে প্রায় ছাড়িয়ে যাওয়ার মুখে এসে দাঁড়ায়। খালেদা জিয়ার এই কাজটি দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যায় নি, গিয়েছে দেশের বিরুদ্ধে, দেশের পায়ে কুড়োল মেরে তিনি ব্যক্তি লাভে ও লোভে বাংলাদেশ ও তার জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে কুণ্ঠাবোধ বা লজ্জাবোধ করেন নি, এর জন্য ক্ষমাও চাননি।  

তৃতীয় কাজটি আরো ভয়াবহ, দেশের মূলে কুঠারাঘাত করতে চেয়েছিলেন খালেদা জিয়া, দেশকে একটি জঙ্গীরাষ্ট্র আফগানিস্তান বানাতে তার এই প্রচেষ্টা যদি সফল হতো, তাহলে এতদিনে রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হতো। সমস্ত রাজনীতি ও লাভ-ক্ষতি হিসেবের আগে-পরে আমাদের একটা ব্যাপার চিন্তা করা লাগে, প্রতিদিন ঘুম ভাঙার পরে প্রতিটি সকালে আমাদের প্রায় ১৭০ মিলিয়ন মানুষের মুখে সকালের খাওয়া উঠিয়ে দিতে হয়, দিনের বাকী সময় না হয় বলাই বাহুল্য। যে সাম্প্রদায়িক শক্তি বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডের বিরোধিতা করে, তাদের মুখেও এই খাওয়াটা দিতে হয়। এই বেসিক ব্যাপারটিই হচ্ছে আমাদের দেশের অর্থনীতির মূল কথা। আমরা নষ্ট-ভৃষ্ট-ভিক্ষুক হলে ভিক্ষা কিছু মিলবে হয়ত, সেটা দিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে সস্তা খাওয়াটা ভিক্ষুকের মতো খাওয়া যায়, ইজ্জত নিয়ে নিজের বাড়িতে নিজ পরিবারের সাথে বসে হালাল রুজি দিয়ে খাওয়া যায় না। আমাদের অর্থনৈতিক শক্তি আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে, আমাদের শক্তি আজ বিদ্যুতে লোড শেডিং বন্ধ করে প্রতিটি কারখানা, হাসপাতাল, স্কুল-কলেজ, রেস্টুরেন্ট চালাতে, আমাদের শক্তি আজ ছিটমহল-মংগা নিঃশেষ করে দিয়ে উত্তরবঙ্গে একসময়ের দরিদ্রতাকে নির্মূল করাতে, আমাদের শক্তি আজ প্রায় তিন কোটি মানবসম্পদের কাজের সংস্থান করাতে, আমাদের শক্তি আজ নিজের অর্থায়নে পদ্মা ব্রিজ করে অন্যের দয়াকে প্রত্যাখ্যান করা, যার সুবিধা আগামীর সব সরকার নেবে, আমাদের শক্তি আজ অস্ত্র ইপিজেড তৈরি করে লক্ষ লক্ষ চাকরীর সুযোগ তৈরি করা, আমাদের শক্তি আজ প্রবাসীরা অর্থ পাঠালে সরকারও সেখানে ভর্তুকি দেয়া, আমাদের শক্তি আজ বিধবা ভাতা-বৃদ্ধ ভাতা-পঙ্গু ভাতার মতো জনকল্যাণকর কর্মসূচী বাস্তবায়ন করা। খালেদা জিয়া এসবের কিছুই করলেন না, তিনি কি করলেন? মাঝখান দিয়ে আমাদের ভাতে মারার ব্যবস্থা করে ভিয়েতনামকে আমাদের পরাজিত করার সুযোগ তৈরি করে দিলেন। তারপরও, দেশের মেধাবী ব্যবসায়ী, পরিশ্রমী জনগণ ও সরকার পিছু হটলেন না, তারা সবাই মিলে প্রতিরোধ গড়ে তুললেন এবং সবচেয়ে বড় কথা, এই কাজে তারা সেই আমেরিকা, ব্রিটিশ ও ইইউসহ অনেক দেশের প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী সম্প্রদায়কে কাছে পেলেন, যারা আমেরিকার ভ্রান্ত নীতির বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থকে, সরকারের নীতিকে সমর্থন দিলেন ব্যাপকভাবে।  

চতুর্থ, বিএনপি সব কিছুতে ব্যর্থ হয়ে, যে কাজটি শেষ পর্যন্ত করলেন সেটা হচ্ছে, বাংলাদেশের জঙ্গি দমনে সফল ও দুনিয়াব্যাপী নাম করা র‍্যাবের কয়েকজনের বিরুদ্ধে আমেরিকায় ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা। এমন নয় যে, ইনাদের আমেরিকায় যেতেই হবে, কিন্তু এটা একটা বড় ধরনের ষড়যন্ত্রের অংশ। উল্লেখ্য, র্যাব তৈরি হয়েছিলো খালেদা জিয়ারই আমলে, সেই আমলে সন্ত্রাসী নির্মূলে, বাংলা ভাইসহ জঙ্গিদের ধরতে এই র্যাবই ছিলও বিএনপির সরকারের অস্ত্র, অথচ সেই অস্ত্রই আজ নমঃশূদ্র বিএনপির ও খালেদা জিয়ার কাছে। কেনো? কিছুই না, স্রেফ নির্বাচনে বিএনপির কথামতো না চলা ও সরকার-জনগণের দেয়া নিয়মের মধ্যে চলে বাহিনীকে রাজনীতির অংশ হয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি হতে দিতে অস্বীকার করা। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, খালেদা জিয়ার হাত থেকে এই বাহিনীও রক্ষা পাবে না, যদি না তাঁরা এখনকার মতো প্রফেশনাল না থাকে। 

এই হচ্ছে, এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের উপর বিদেশী শক্তির আক্রমণের বিভিন্ন দিক ও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের জড়িত থাকার বিভিন্ন চেহারা। ষড়যন্ত্র বন্ধ হয় নি, হবেও না, এটাই স্বাভাবিক। চেনা-জানা লোক উন্নতি করলে অনেকেই ক্ষুব্ধ হয়, বাংলাদেশের উন্নয়নে অনেকেই ইর্ষাকাতর হবে এটাও স্বাভাবিক ধরে নিচ্ছি, এই ধরনের চ্যালেঞ্জিং সময়ে যে ধরনের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সামনে রাখা লাগে, উপরের উদাহরণের পরে তা আর যেই হোক, দেশের পিঠে ছুড়ি মারা বিএনপি বা খালেদা জিয়া নন। 

আমার বা আমদের নতুন জেনারেশনের বড় কষ্ট হচ্ছে, এই যে আওয়ামী বিরোধিতা করতে করতে দেশের এক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবী বা রাজনীতিবিদদের এই দেশেরই বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যাওয়া, এটা কেনো? তারা কি রাজনীতির এই দেশপ্রেমিক বা দেশ কেন্দ্রীয় হয়ে উঠার শিক্ষাটা পায় নি, বা নেবে না? ৭৫-এর ১৫ই আগস্টে একটি জাতির পিতা ও তাঁর পুরো পরিবারকে হত্যা করার পরিকল্পনা ও হত্যা করাতো রাজনীতি না, ভয়ংকর অপরাধ, জেলের ভেতরে ক্ষমতার দম্ভে একটি দলের চার মুল নেতাকে হত্যা-তো রাজনীতি না, ভয়ংকর অপরাধ, ২১শে আগস্টে একটি প্রধান বিরোধী দলকে নিশ্চিহ্ন করার প্রচেস্টাতো রাজনীতি না, ভয়ংকর অপরাধ, এই ধরনের মাফিয়া মনোবৃত্তির কিছু মানুষের ক্ষমতার লোভে রাজনীতিকে ব্যবহার করাকে সম্মিলিত ভাবে থামাতে হবে, যেকোনো মূল্যে। যারা এসবের সাথে জড়িত, তারা কোনোভাবেই রাজনীতিবিদ নন, তারা অবশ্যই পরিত্যাজ্য ও জেলে সারাজীবন কাটানোর মতো স্রেফ অপরাধী। এদেরকে বিন্দুমাত্র ছাড় দিলে বাংলার মানূষকে তারা ধ্বংস করে দিবে।  

রাজনীতির এই অংশে, নিজ দেশের জনগণের কাছে না গিয়ে তৃতীয় কোনো দেশকে নিজ দেশের ক্ষতি করানোর প্রবণতা যে কোনো মানদণ্ডে রাস্ট্রদ্রোহীতা। খালেদা জিয়া তা করেছেন এবং তার দলের শীর্ষ কিছু নেতৃবৃন্দ এই ধরনের নেগেটিভ রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন, যা হতাশাজনক ও লজ্জার। আমাদের বোধগম্য হয় না, স্বাধীনতার ৫০ বছর পরে, আমাদের যেখানে আর কোনোদিনই ৭১-এর পূর্বাবস্থায় ফিরে যাওয়া সম্ভব না, সেখানে, বিএনপি এই বাস্তবতা মানতে পারছে না কেনো? তারা কেনো জনগণের কাছে যেতে পারছে না? যে লবিস্ট তারা নিয়োগ দিয়েছে, তা দিয়ে সারা বাংলাদেশে শীত বস্ত্র বিতরণ করলে মোটামুটি একটা কেস তারা দাঁড়া করাতে পারতেন, তা না করে, বাংলাদেশের জনগণের এই টাকাটা দিয়ে তারা কিছু লবিস্ট নিয়োগ দিয়েছে, যারা বাংলাদেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করছে। মানুষের মনোজগতে অবিশ্বাস, ঘৃণা ও দূরত্ব তৈরিতে এই একটি স্ক্যান্ডালই যথেষ্ট। 

বাংলাদেশের মানুষ তার নেতা হিসেবে বাংলাদেশের স্বার্থ দেখা রাজনীতিবিদদেরই দেখতে চাইবে, আধুনিক বাংলাদেশ এখন অর্থনৈতিক মুক্তির স্বার্থ সংশ্লিষ্ট, তারা ইতিহাসকে শ্রদ্ধা করে, ৭১ নিয়ে অহংকার করে এবং তারা সামনে এগিয়ে যেতে চায়। তারা যেমন জাতির পিতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কোনো অপমান সহ্য করে না, তেমনি, তারা ধর্মভীরু থাকতে চায় কিন্তু কোনো হিসেবেই পাকিস্তানী-তালেবানী রাজনীতি পছন্দ করে না, বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলকে এখন এই সত্যটি বুঝতে হবে, বাস্তবতায় দাঁড়াতে হবে। মনে রাখতে হবে, এই দেশের মাটি নরম হয় বর্ষায়, আবার এই দেশের সেই মাটিই পাথরের মতো শক্ত হয় চৈত্রে, বাংলাদেশে ক্ষমা হয়ত করে, কিন্তু ভোলে না কিছুই।

বিএনপি   লবিস্ট   খালেদা জিয়া  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিচারণ ও বর্তমান সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ২৭ জানুয়ারী, ২০২২


Thumbnail

স্বাধীনতার রজতজয়ন্তীতে মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকথা আগামী প্রজন্মকে মুক্তিযোদ্ধাদের মুখে সরাসরি শোনানোর জন্য ‘শ্যামপুর-কদমতলী সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার ক্লাব’ ১৪ জানুয়ারি, ২০২২ শ্যামপুর মডেল স্কুল এন্ড কলেজের সভাকক্ষে মুক্তিযোদ্ধাদের ‘স্মৃতিচারণ’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। মোট ৫৪জন বীর মুক্তিযোদ্ধা সরাসরি স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এছাড়াও মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে আরও কয়েকজন আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন। তনমধ্যে দুটি আলোচনা এখানে উদ্ধৃত করছি। 

নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ উপজেলার দাউদপুর ইউনিয়নের খাস কামালকাটি গ্রামের অধিবাসী সাবেক ইপিআর  সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা মমতাজ উদ্দিন। তিনি স্বাধীনতার পর রক্ষীবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুবিহীন বাংলাদেশে রক্ষীবাহিনীর চাকুরী ছেড়ে দিয়ে গ্রামে ফিরে আসেন। এরই মাঝে উনার স্ত্রী মারা যান। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, স্বাধীন বাংলাদেশে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা দু’কন্যা ও এক পুত্রসন্তান নিয়ে কর্মহীন জীবনযাপন করতে থাকেন। অনাহারে-অর্ধাহারে জীবন কাটতে থাকে। এক পর্যায়ে বিভিন্ন স্কুলের সামনে মুড়ির মোয়া, চকলেট, চানাচুরের প্যাকেট ইত্যাদি বাচ্চাদের খাবার বিক্রি করতে শুরু করেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা মমতাজ উদ্দিন সাহেব অত্যন্ত পরহেজগার লোক ছিলেন। গ্রামের বিত্তশালীরা সাধ্যমত সাহায্য সহযোগিতা করতেন। তিনি বলতেন, "আমি গরীব ঘরের ছেলে ছিলাম। দেশ স্বাধীন করার জন্য মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলাম। দেশ স্বাধীন হয়েছে, আমি আমার পূর্বাবস্থায় ফিরে এসেছি‘। মুক্তিযোদ্ধার সনদ সংগ্রহ করার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে ঢাকায় বিভিন্ন স্থানে যোগাযোগ করতেন। একদিন ঢাকা পুরাতন বিমানবন্দরের কাছে একটি মসজিদে জোহরের নামাজ আদায় করে মসজিদেই শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। একটু তন্দ্রা এসে যায়। এই ফাঁকে সাথে থাকা ব্যাগটা খোয়া যায়। ব্যাগে ছিল মুক্তিযুদ্ধের কাগজপত্র, জেনারেল ওসমানীর চিঠি, রক্ষীবাহিনীতে চাকুরীর কাগজপত্র ইত্যাদি। সবকিছুই শেষ, মুক্তিযোদ্ধার সনদ সংগ্রহ করতে পারলোনা। তারপর দীর্ঘদিন তিনি মনমরা হয়ে থাকতেন। টাকার অভাবে ঢাকা গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের কাগজপত্র ঠিকও করতে পারেন না, ভাতাদিও উঠাতে পারে না, এমনকি রক্ষীবাহিনীর চাকুরীর সুবিধাদিও সংগ্রহ করতে পারেন না। টুকিটাকি যা আয় হয় তা দিয়ে নিজ হাতে রান্না করে ছেলেমেয়েদের খাওয়াতেন। এভাবেই অত্যন্ত দুঃখকষ্ট, অর্থকষ্ট অযত্নে অবহেলায় একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা জীবনযাপন করতেন। একদা নীরবে ইহলোক ত্যাগ করেন। 
আব্দুল মোতালেব নামে আরেক  মুক্তিযোদ্ধার কাহিনী উঠে আসে রূপগঞ্জের খাসকামালকাটি গ্রামের অধিবাসী মেজবাউল হক বাচ্চু সাহেবের আলোচনায়।

বাচ্চু সাহেবের নিজ গ্রাম খাসকামালকাটি থেকে দুই কিলোমিটার দূরে অবস্থিত সাপ্তাহিক হাট বসে। এই গ্রামের লোকজন নিয়মিত ঐ হাটে সওদা করে। ১৯৭৬-৭৭ সালের দিকে হবে, মাটিতে ছালা বিছায়ে বসে ঝাঁকায় করে হলুদ মরিচ পিয়াজ রসুন বিক্রি করতেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মোতালেব। যা বেচাকেনা হতো তা দিয়েই খুবই কষ্টে অনাহারে অর্ধাহারে জীবন যাপন করতেন। হঠাৎ একদিন উধাও। কোন খোঁজ নাই। প্রায় ৪-৫ মাস পর গ্রামে ফিরে এসে বাজারের একই স্থানে দাঁড়িয়ে মানুষের সাথে কথা বলতে বলতে কাঁদছেন। চেহারা দেখে মনে হচ্ছিল খেয়ে পরে ভালই আছেন। সবার মনেই প্রশ্ন,  কান্না করছে কেন? তিনি বলছিলেন, ‘আমি ভাল আছি। ভাল বেতন পাই। ভাল খাবার খেতে পাই। কিন্তু তারপরও আমি কেন কাঁদছি? আমি মুক্তিযোদ্ধা। আমি যুদ্ধ করে দেশকে শত্রুমুক্ত করেছি। দেশ স্বাধীন করেছি। সেই স্বাধীন দেশে আমি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হয়ে পেটের তাগিদে রাজাকার মাওলানা মান্নানের বাড়িতে দারোয়ানের চাকুরী করি। মুক্তিযোদ্ধা হয়ে রাজাকার এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করি। এটাই আমার দুঃখ। সেই দুঃখে আমার বুক ফেটে কান্না আসছে’।

১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট কালো রাতে বঙ্গবন্ধু পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ স্বাধীনতার পরাজিত শত্রুদের ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে কতিপয় উচ্চাভিলাষী সামরিক কর্মকর্তার হাতে শাহাদাতবরণ করার পর মুক্তিযোদ্ধাদের ভাগ্যাকাশে নেমে এসেছিল অন্ধকার। তাঁদের প্রতি শুরু হয়েছিল অবজ্ঞা আর অবহেলা। মুক্তিযোদ্ধারা অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়ে গিয়েছিল। দীর্ঘ ২১ বছর পর বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসন, মুক্তিযোদ্ধাদের নামের আগে ‘বীর’ শব্দ ব্যবহার বাধ্যতামূলক, মুক্তিযোদ্ধাদের আর্থিক সহায়তা বৃদ্ধি, চিকিৎসা সুবিধাসহ নানাবিধ কল্যাণমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করেছেন। তনমধ্যে উল্লেখযোগ্য:

১। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের পারিবারিক জীবনে আর্থিক সচ্ছলতার জন্য সামাজিক নিরাপত্তাবলয় কর্মসূচির আওতায় জনপ্রতি মাসিক ১২,০০০/- টাকা হারে ১,৯২,৯৯৮ জন মুক্তিযোদ্ধাকে ভাতা প্রদান করা হচ্ছে।
২। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জীবনযাপন সুন্দর ও আনন্দময় করার লক্ষ্যে ২০২০-২১ অর্থ বছরে জনপ্রতি ১০,০০০/- টাকা করে ২টি উৎসব ভাতা, জনপ্রতি ২০০০/- টাকা হারে বাংলা নববর্ষ ভাতা ও জনপ্রতি ৫,০০০/- টাকা হারে বিজয় দিবস ভাতা ১,২০,৫২৪ জন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে প্রদান করা হয়েছে।

জুরাইন কবরস্থানে মৃত বীরমুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নির্ধারিত স্থানে বিনা খরচে দাফনের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কবর সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এছাড়া বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস সহ বিভিন্ন দিবসে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধাদের খোঁজ নেন, কুশলাদি বিনিময় করেন।

দেশমাতৃকা শত্রুমুক্ত করতে জীবন উৎসর্গ করেছেন বীর মুক্তিযোদ্ধারা। বঙ্গবন্ধুকন্যা রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা স্বাধীনতা অর্জনে জীবন উৎসর্গকারী সেই বীর সেনানীদের সুন্দর সচ্ছল জীবনযাপন নিশ্চিত করেছেন।


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশ – অস্ট্রেলিয়ার সম্পর্ক


Thumbnail

প্রায় সতেরো বছর আগের ঘটনা। ড্রয়িংরুমে বসে অস্ট্রেলিয়ান বন্ধুদের সাথে টেলিভিশন দেখছি। আফ্রিকান কোন একটা শহরের ছবিতে কয়েকটা ইটের তৈরি ভবনের ছবি দেখে এক অস্ট্রেলিয়ান বন্ধু আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলো, বাংলাদেশে এরকম ভবন আছে? বন্ধুর প্রশ্নে আমি খুব একটা অবাক হই নি। কারণ তখন অধিকাংশ অস্ট্রেলিয়ানের কাছে বাংলাদেশ মানে ছিল প্রাকৃতিক দুর্যোগ-কবলিত দরিদ্র একটা দেশ।

এখন দিন বদলেছে। সারা বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের ইমেজ বদলে গেছে। বিশেষ করে ২০০৮ সালের নির্বাচনের পরে ক্ষমতায় এসে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে বদলে দিয়েছেন। পৃথিবীর কাছে বাংলাদেশ আজ এক উন্নয়ন বিস্ময়! অর্থনীতি, স্বাস্থ্যসহ উন্নয়নের সকল সূচকে বাংলাদেশের ঈর্ষণীয় উন্নতি হয়েছে।  বাংলাদেশের ব্যাপারে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে যেমন বাংলাদেশের অভাবিত এই উন্নয়নের রহস্য উন্মোচনে বিশ্ব উন্মুখ, আরেকদিকে বাংলাদেশের সাথে বাণিজ্যিক ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নেও অনেক দেশের আগ্রহ বেড়েছে। এই তালিকায় এখন যোগ হয়েছে অস্ট্রেলিয়ার নাম।

পারস্পরিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কোন্নয়নের সকল সম্ভাবনা থাকা সত্বেও কোন এক অজ্ঞাত কারণে বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া সম্পর্কটা যেন তার কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌছাতে পারছিল না। এই নিয়ে দুই দেশেরই পারস্পরিক আগ্রহে বোধ হয় ঘাটতি ছিল।  অথচ পশ্চিমা বিশ্বের দেশসমূহের মধ্যে অস্ট্রেলিয়াই স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে প্রথম স্বীকৃতি প্রদান করে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সাহসী ভূমিকা রাখার জন্য অস্ট্রেলিয়ান নাগরিক ওডারল্যান্ডকে বীরপ্রতীক উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ওডারল্যান্ডই একমাত্র বিদেশী যিনি মুক্তিযুদ্ধে সাহসী ভূমিকার জন্য বীরপ্রতীক খেতাব উপাধি পেয়েছিলেন।  তবে আশার কথা হলো, গত কয়েকবছরে এই সম্পর্কের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ সম্পর্কে অস্ট্রেলিয়ান সরকারসহ নীতিনির্ধারকদের ধারণা অনেক বদলে গেছে।  দুইদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে এখন নিয়মিত যোগাযোগ হয়। গত ৩১ অক্টোবরে স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো শহরে শুরু হওয়া  জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন কপ-২৬ এ অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে সাক্ষাত করেছিলেন। এই সাক্ষাতটা অস্ট্রেলিয়ার অনরোধের ভিত্তিতেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল। আগে যেখানে অস্ট্রেলিয়ার ডিপার্টমেন্ট অব ফরেন অ্যাফেয়ার্স ও ট্রেডের (ডিফাট) বার্ষিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে মানবিক সহায়তা প্রদানের ব্যাপারটাই মূলত উল্লেখ থাকতো, সেখানে ২০২০-২১ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম ‘কী পার্টনার কান্ট্রি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই একই প্রতিবেদনে শ্রীলংকা, মালদ্বীপ, আফগানিস্তান, নেপাল এবং পাকিস্তান সম্পর্কে অস্ট্রেলিয়ার পক্ষ থেকে মানবাধিকার ও মানবিক সহায়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। 

গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে বিনিয়োগে অস্ট্রেলিয়ার আগ্রহ বেড়েছে। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে বর্তমানে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতিও হচ্ছে। দ্বিপাক্ষিক এই বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাংলাদেশের সাথে অস্ট্রেলিয়া গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে ‘ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট ফ্রেমওয়ার্ক অ্যারেঞ্জমেন্ট (টিফা)’ শীর্ষক একটা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। ভবিষ্যতের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশকে শুল্ক ও কোটামুক্ত সুবিধা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা ক্ষেত্রেও দুই দেশের সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য উন্নতি সাধিত হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার ন্যাশনাল সিকিউরিটি কলেজ, অস্ট্রেলিয়ান স্ট্রাটেজিক পলিসি ইন্সটিটিউট, লোয়ি ইন্সটিটিউটের মত বিখ্যাত নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠানগুলোও আজকাল বাংলাদেশের সাথে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা খাতে অস্ট্রেলিয়ার সম্পর্ক নিয়ে কথা বলছে। এদের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে নিয়ে সম্প্রতি একাধিক নিবন্ধ লেখা হয়েছে। ঢাকার অস্ট্রেলিয়ান দূতাবাসে ডিফেন্স অ্যাটাশের অফিস খোলার ব্যাপারে অস্ট্রেলিয়ান সরকার বাংলাদেশ সরকারের কাছে অনুমতি চেয়েছে। এর থেকে বোঝা যায়, বাংলাদেশ সম্পর্কে অস্ট্রেলিয়ান নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টিভঙ্গি অনেক বদলেছে। এছাড়াও শিক্ষাখাত, ভিসা সহজীকরণ, বাংলাদেশ থেকে দক্ষ-অদক্ষ শ্রমিক আমদানিসহ বহুমুখী খাতে দুইদেশের কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা চলছে। সিডনি-ঢাকা সরাসরি বিমান যোগাযোগের ব্যাপারেও আমাদের দূতাবাসের পক্ষ থেকে জোর প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে।  এসব কিছুই বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া সম্পর্কের উন্নতিকেই নির্দেশ করে।

দুই দেশের সামগ্রিক সম্পর্ক উন্নয়নের মূলে রয়েছে দুই দেশেরই সরকারী পর্যায়ে এ ব্যাপারে আগ্রহ। বিশেষ করে ২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অস্ট্রেলিয়া সফরের পর থেকে দ্বিপাক্ষিক এ সম্পর্ক বিনির্মাণের প্রচেষ্টাগুলো অধিক গতি পায়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. আব্দুল মোমেনও অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েই দুই দেশের সম্পর্কোন্নয়নে নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। আর এই সম্পর্কোন্নয়নে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থিত আমাদের দূতাবাসের কর্মকর্তারাও দক্ষতার সাথে তাদের দায়িত্ব পালন করছেন। এক্ষেত্রে প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত কাজি ইমতিয়াজ হোসেন এবং বর্তমান রাষ্ট্রদূত মো. সুফিউর রহমানের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। ক্যানবেরায় সরকারী অফিসে কর্মরত উচ্চ পর্যায়ের অনেক কর্মকর্তার কাছে আমি শুনেছি, আমাদের বর্তমান রাষ্ট্রদূত সুফিউর রহমান অস্ট্রেলিয়ান সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধির কাছে বাংলাদেশের উজ্জ্বল ভাবমূর্তি তুলে ধরার ব্যাপারে এবং স্বার্থরক্ষায় খুবই তৎপর। তার এই কর্মতৎপরতার ফলও আমরা পাচ্ছি। কয়েকদিন আগে কথা প্রসঙ্গে সুফিউর রহমান বলছিলেন, ‘ড. মিল্টন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সার্বিক নির্দেশে ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মোমেনের তত্ত্বাবধানে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের স্বার্থরক্ষায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। ইতোমধ্যে আপনারা তার কিছু ফলও পেয়েছেন। আরো অনেকগুলো বীজ রোপন করেছি, তারও ফল ইনশাআল্লাহ আপনারা দ্রুত পাবেন।’  

রাষ্ট্রদূত সুফিউর রহমানের কথার প্রতিফলন আমরা অস্ট্রেলিয়ায় বসে দেখতে পাচ্ছি।  কেবল অস্ট্রেলিয়া-বাংলাদেশের সম্পর্কই নয়, আমরা বাংলাদেশের দূতাবাসের নিয়মিত কর্মকাণ্ডেও অনেক পরিবর্তন দেখছি। দূতাবাসের সেবামূলক কর্মকাণ্ড আগের চাইতে অনেক বেশী পেশাদারীত্বপূর্ণ ও সন্তোষজনক হয়েছে। তাদের কাজের জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতাও অনেক বেড়েছে। জবাবদিহিতার অংশ হিসাবে ২০১৯ সালের আগস্ট মাস থেকে দূতাবাসের ওয়েবসাইটে আগের মাসের কনসুলার সেবার বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়। সাম্প্রতিক একটা পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, পাঁচ হাজারের বেশী মেশিন রিডাবল পাসপোর্টের আবেদনের ক্ষেত্রে শতকরা ৯৯.৪ ভাগ আবেদনেরই সফল নিষ্পত্তি হয়েছে।  যে বত্রিশটা পাসপোর্ট আবেদন সফল হয় নি, সেটাও বাংলাদেশ সরকারের বিদ্যমান আইনের আবশ্যকতা পূরণ না করার কারণে হয় নি।  অতীতে আমরা দূতাবাসের কন্সুলার কর্মকাণ্ডে কিছুটা অনিয়ম লক্ষ্য করেছি, যা বর্তমান রাষ্ট্রদূত এসে কঠোর হাতে দমন করেছেন। আমাদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ছিল, ক্যানবেরায় বাংলাদেশ দূতাবাসের একটা নিজস্ব ভবন হবে। আমাদের সেই আশাও আজ পূর্ণ হবার একেবারে দ্বারপ্রান্তে, আশা করি অচিরেই এই ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হবে। সিডনিবাসীর দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে সম্পত্তি সিডনিতে দূতাবাসের একটা অফিস খোলা হয়েছে।  সিডনির কনসুলেটটার অবস্থান ও কার্যক্রম ইতোমধ্যেই কমিউনিটির প্রশংসা অর্জন করেছে। এছাড়া অস্ট্রেলিয়ার অন্যান্য শহরেও নিয়মিত কন্সুলার ক্যাম্প আয়োজন করা হচ্ছে, যার ফলে বাঙালি কমিউনিটি উপকৃত হচ্ছে।

আজ অস্ট্রেলিয়া দিবস। আর্থর ফি-লিপের নেতৃত্বে ১৭৮৮ সালের ২৬ জানুয়ারি সিডনির জলসীমায় বৃটিশ পতাকাবাহী যে প্রথম নৌবহরটা এসেছিলো, সেটাই অস্ট্রেলিয়ায় বৃটিশ উপনিবেশের সূচনা করেছিল। এই দিনটাকেই বর্তমানে সরকারিভাবে অস্ট্রেলিয়া দিবস উপলক্ষে পালন করা হয়।  যদিও আদিবাসী অস্ট্রেলিয়ানসহ অনেকেই এই দিনটাকে অস্ট্রেলিয়া দিবসের পরিবর্তে ‘ইনভেশন ডে’ বা দখলদারিত্বের দিন হিসেবে মনে করেন।  আপাতত এই বিতর্কে না গিয়েও প্রশান্তপাড়ের দেশ অস্ট্রেলিয়া থেকে সবাইকে এই বিশেষ দিনে আন্তরিক শুভেচ্ছা। বাংলাদেশ – অস্ট্রেলিয়া সম্পর্কের পাঁচ দশক পূর্তিতে আমরা আশা করবো, আগামীতে বাংলাদেশ এবং অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ ও কূটনৈতিক সম্পর্কের আরো উন্নতি হবে। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অস্ট্রেলিয়ার সক্রিয় অংশীদার হিসেবেও বাংলাদেশের সম্মান উজ্জ্বলতর হবে। চিয়ার্স মেটস।

বাংলাদেশ   অস্ট্রেলিয়া   প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

কোভিড-১৯, ওমিক্রন এবং ভবিষ্যৎ

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ২৬ জানুয়ারী, ২০২২


Thumbnail

আমার মনে হয় স্বাভাবিক কারণে বর্তমানে সংক্রমণের হার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে দেখে বাংলাদেশে আমরা অনেকেই এখন খুব চিন্তিত। খুশি যে আমরা আমাদের লকডাউনের অতীতের ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি করিনি। তবে দুঃখজনকভাবে স্কুল আবার বন্ধ। কিন্তু আমি মনে করি বিশ্বের অনেক ধনী বা উন্নতশীল দেশ গুলির চেয়ে আমরা এখনো অনেক ভালো অবস্থায় আছি। আরও দ্রুত টিকা এবং বুস্টার ডোজ দেওয়ার জন্য আমাদের সমস্ত উদ্যোগ এবং শক্তি নিযুক্ত করতে হবে। প্রয়োজনে টিকাদান কর্মসূচিতে আমাদের সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করা উচিত।

আজ (২৫ জানুয়ারি) সংক্রমণের হার এখন ৩২.৪০%। প্রায় ৫০ হাজার মানুষ পরীক্ষার জন্য এগিয়ে এসেছেন এবং সেই অনুযায়ী ১৬,০৩৩ জন ইতিবাচক সংক্রামিত ব্যক্তিকে সনাক্ত করা হয়েছে। সংক্রামিত হওয়া লোকের সংখ্যা দেখে আমি চিন্তিত নই, কারণ আমরা যদি আজ ১০০,০০০ জনকে পরীক্ষা করতাম তবে আমরা প্রায় ৩০,০০০ জন সংক্রামিত লোককে খুঁজে পেতাম। অনেকেই পরীক্ষার জন্য আসছেন না, কারণ তাদের অধিকাংশই হয় উপসর্গবিহীন বা তাদের হয়তো খুব হালকা ফ্লুর মতো উপসর্গ রয়েছে বা তাদের পরীক্ষা করার সামর্থ্য নেই বা পজিটিভ হবার ভয়ে তারা হয়ত আসছেন না। বাংলাদেশের অধিকাংশ জেলাতেই সংক্রমণের হার ২৩% এর উপরে বলে মনে হচ্ছে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে ওমিক্রন সমগ্র বাংলাদেশে কমিউনিটি ট্রান্সমিশন শুরু করেছে এবং দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। বেশির ভাগ মানুষ যদি স্বাস্থ্য উপদেশে প্রবাহিত না হয়, বা না মানতে পারে এবং গণসমাবেশ চলতে থাকে, তাহলে ওমিক্রনের সামাজিক সংক্রামণ শুরু হবার পর সংক্রামণের হার বাড়বে এটাই স্বাভাবিক, এতে নতুন কিছু নেই। তাই সংক্রমণের হার দ্রুত বৃদ্ধি নিয়েও আমি তেমন উদ্বিগ্ন নই। আমি বিশ্বাস করি সম্ভবত কয়েকদিন বা সপ্তাহের মধ্যে সংক্রমণ কমে আসবে, কারন আমি মনে করি বেশীর ভাগ লোক ইতিমধ্যে সংক্রামিত হয়েছেন বা হবেন। যেমন ডেল্টা তরঙ্গের সময়, যা অনেক বিপর্যয় সৃষ্টি করেছিল, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ সংক্রামিত হবার ফলে গত বৎসর আগস্ট মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের দিকে সংক্রামণের হার কমতে শুরু করে। সুইজারল্যান্ডে, জনস্বাস্থ্যের লোকেরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে সেখানে ৫০% এরও বেশি লোক ওমিক্রন দ্বারা সংক্রামিত হবে, কোন কঠোর লকডাউন বা বিধিনিষেধ দিয়ে এটি তারা বন্ধ করতে সক্ষম হবে না। শুধুমাত্র সেখানে যেকোনো কেনাকাটা, ইনডোর, ভোজনশালা বা অনুষ্ঠানের স্থানে কঠোরভাবে মাস্ক পরা এবং কোভিড ভ্যাকসিন পাস ব্যবহার করা নিশ্চিত করছে। WHO ইউরোপীয় আঞ্চলিক অফিসও ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে বেশিরভাগ মানুষ ইতিমধ্যেই সংক্রমিত হয়েছে বা শীঘ্রই সংক্রমিত হবে এবং অল্প সময়ের মধ্যে সংক্রমণ কমবে বা কিছু দেশে ইতিমধ্যেই কমতে শুরু করেছে। ডব্লিউএইচওর ইউরোপীয় আঞ্চলিক পরিচালক বলেছেন যে তিনি আশা করছেন আমরা মহামারীটির শেষের কাছাকাছি।

বাংলাদেশে ১৬.৬ কোটি মানুষের মধ্যে আজ ১৬,০০০ জনেরও কিছু বেশি লোক সংক্রমিত হয়েছে দেখে আমরা আতঙ্কিত। কিন্তু হল্যান্ডে মাত্র ১.৭ কোটি লোকের মধ্য কিছুদিন প্রতিদিনের মত গতকালও তারা ৬৫,০০০ সংক্রামিত লোক নিবন্ধন করেছে, তবুও তারা সবকিছু খুলে রাখার সিদ্ধান্তে নিয়েছে। যুক্তরাজ্যে ৭.৭ কোটি লোকের মধ্যে আজ ৯৪,০০০ সংক্রামিত লোক নিবন্ধন করে, ৪৩৯ জন কোভিডের কারণে মারা গেছেন। তবুও তারা মুখোশের ম্যান্ডেট সহ সবকিছু খুলে দিয়েছে (মুখোশ ম্যান্ডেট বাদ দেওয়া আমি একটি ভুল সিদ্ধান্ত মনে করি)। কেন তাহলে আমেরিকা সহ পশ্চিমা দেশগুলো তাদের বিধিনিষেধের নিয়ম শিথিল করছে? কারণ ওমিক্রন দ্বারা সংক্রামিত বেশিরভাগ লোকই উপসর্গবিহীন বা ফ্লুর মতো হালকা লক্ষণ রয়েছে, হাসপাতালে ভর্তি কম হচ্ছে এবং গুরুতর যত্নের প্রয়োজনও খুব কম। মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে, খুব কম লোক মারা যাচ্ছে। টিকা দেওয়ার কভারেজও অনেক বেশি। আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের জার্নাল (JAMA) নীচের হিসাবে দক্ষিণ আফ্রিকার তুলনামূলক ফলাফল প্রকাশ করেছে:

দক্ষিণ আফ্রিকাডেল্টাওমিক্রন
রোগীদের গড় বয়স৫৯৩৮
তীব্র শ্বাসযন্ত্রের উপসর্গ৯১%৩১%
হাসপাতালে ভর্তির সময়কাল৭দিন৩দিন
রোগীর অক্সিজেন প্রয়োজন৭৪%১৭%
হাসপাতালে ভর্তি৬৯%৪১%
আইসিইউ ভর্তি৩০%১৮%
যান্ত্রিক বায়ুচলাচল (ventilation)১২%১.৮%
মৃত্যুহার২৯%৩%
JAMA ৩০শে ডিসেম্বর ২০২১


ডেল্টার কারণে ২০২১ সালের জুলাই থেকে দ্রুত সংক্রমণ শুরু হয় এবং আমরা দ্রুত ক্রমবর্ধমান সংক্রমণ এবং মৃত্যু দেখতে শুরু করি। ২৮শে জুলাই সবচেয়ে বেশি ১৬,২৩০ জনের মধ্যে সংক্রমণ রিপোর্ট করা হয়েছিল এবং ২৭শে জুলাই আমরা মৃত্যুর সংখ্যা ২৫৮ হিসাবে দেখেছি। ৫ই আগস্টে সর্বোচ্চ সংখ্যক ২৬৪ জন মারা গিয়েছিল। হ্যাঁ, এখন আবার সংক্রমণ বাড়ছে, সারা বাংলাদেশে দ্রুত কমিউনিটি ট্রান্সমিশন চলছে কিন্তু মৃত্যুর সংখ্যা আগের মত বাড়ছে না। আজ স্বাস্থ্য দফতর ১৭জন কোভিডের সাথে মারা যাওয়ার খবর দিয়েছে। ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ১৭ জনের মধ্যে ১১ জন পুরুষ ও ছয়জন নারী। বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৮১ থেকে ৯০ বছরের মধ্যে একজন, ৭১ থেকে ৮০ বছরের মধ্যে সাতজন, ৬১ থেকে ৭০ বছরের মধ্যে ছয়জন, ৫১ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে দুইজন ও ২১ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে একজন রয়েছে। তাদের মধ্যে ঢাকা বিভাগের ১১ জন, চট্টগ্রাম বিভাগের দুইজন, খুলনা বিভাগের দুইজন, বরিশাল বিভাগের একজন ও ময়মনসিংহ বিভাগের একজন রয়েছেন। বাংলাদেশের মতো, যুক্তরাজ্য এবং অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলিতে ৯০% ভাগের মত হাসপাতালে ভর্তি এবং মৃত্যু যারা টিকা পাননি তাদের মধ্যে রয়েছে। ভারতের দিল্লিতে নতুন সংক্রমিত লোকের সংখ্যা ১৩ই জানুয়ারি ২৮,৮৬৭ -এর সর্বোচ্চ সংখ্যা থেকে নেমে এখন অর্ধেকেরও কম হয়ে গেছে এবং সরকারী তথ্য অনুসারে শহরের হাসপাতাল জুড়ে ৮০% এরও বেশি কোভিড শয্যা খালি রয়েছে।

আইসিডিডিআরবি, রিপোর্ট অনুসারে প্রায় ৭০% সংক্রমণ ওমিক্রনের জন্য। আমি বিশ্বাস করি যে এই সংখ্যা এখন তার চেয়ে বেশি। এখন বাংলাদেশে আমরা ওমিক্রনের সাথে ভালভাবে মোকাবিলা করছি কারণ রোগটি হালকা, আমরা লোকেদের টিকা দিচ্ছি এবং উপরন্তু উন্নত হাসপাতালের যত্ন সহ আমাদের মুখে খাওয়া কোভিড ওষুধ মানুষ ব্যাপকভাবে পেতে পাচ্ছে।

আমরা যাই করি না কেন, স্কুল বন্ধ হোক বা না হোক, এখন বাংলাদেশে এই সংক্রমণ বন্ধ করা যাবে না, বা প্রায় অসম্ভব। পশ্চিমা দেশগুলির মানুষ এই সমস্ত বিধিনিষেধে ক্লান্ত এবং বিরক্ত হয়ে পড়ছে এবং আরও বেশি সংখ্যক মানুষ এর বিরুদ্ধে সহিংসভাবে প্রতিবাদ করছে। এই পরিস্থিতিতে সে দেশের সরকাররা বুঝতে পেরেছে ওমিক্রন ট্রান্সমিশন বন্ধ করা যাবে না। যেহেতু রোগটি মৃদু, হাসপাতালে ভর্তি বিশেষ করে গুরুতর যত্নের প্রয়োজন বাড়ছে না এবং মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কম, রাজনৈতিক কারণে তারা প্রকাশ্যে না বললেও মনে হচ্ছে, সরকার সমস্ত বিধিনিষেধ শিথিল করছে, মানুষকে সংক্রামিত হতে দিচ্ছে এবং এর থেকে তাড়াতাড়ি ভালো হয়ে যাতে ওমিক্রন এবং ডেল্টার বিরুদ্ধে অনাক্রম্যতা অর্জন পারে সেই কৌশলের পথ নিয়েছে। অন্য কথায় ভাইরাসের সাথে জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে এবং সে দেশগুলো মানুষের জীবিকা এবং সামগ্রিক অর্থনীতির আরও ক্ষতি না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পশ্চিমা দেশের অর্থনীতি আর বেশী ক্ষয়ক্ষতি সহ্য করতে পারবে না। সরকারি ঋণ বাড়ছে, মূল্যস্ফীতি বাড়ছে, নিত্যপণ্যের দামও বাড়ছে। শুধুমাত্র একটি জিনিস তারা সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছে তা হল টিকা এবং বুস্টার ডোজ। যেহেতু আরও কম বয়সী মানুষ সংক্রামিত হচ্ছে, ডব্লিওএইচওর জন্য অপেক্ষা না করে, তারা ৫ বছরের বেশি বয়সী বাচ্চাদের টিকা দেওয়া শুরু করেছে। সিঙ্গাপুরও তাই করছে। জনস্বাস্থ্য পরিমাপের লক্ষ্য হল জনগণের দুর্ভোগ ও মৃত্যু কমিয়ে আনা এবং যে কোন ঘটনার জন্য প্রস্তুত থাকা।
 
আমি জানি অনেকেই আমার সাথে একমত হবেন না বা মনে করবেন আমি বোধগম্য কথা বলছি না, তবুও আমি বলব বাংলাদেশ এখনও ভালো অবস্থানে আছে এবং জীবন ও জীবিকার আর বেশী ক্ষতি হবে না। আমি নিশ্চিত যে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ইতিমধ্যেই ওমিক্রন দ্বারা সংক্রামিত হয়েছে বা শীঘ্রই সংক্রমণের প্রান্তিক স্তরে (threshold) পৌঁছে যাবে, ওমিক্রন সবচেয়ে বিপজ্জনক রূপ ডেল্টাকে মুছে ফেলবে এবং শীঘ্রই কয়েক দিনের মধ্যে সংক্রমণের হার কমতে শুরু করবে।

বাংলাদেশের মানুষ এপর্যন্ত যথেষ্ট কষ্ট সহ্য করেছে, তারা তাদের জীবন ফিরে পেতে চায়। আমরা আগেও পারিনি, এবং আমরা এখনও তাদের আরও বিধিনিষেধ অনুসরণ করতে বাধ্য করতে পারব না (এটি দুঃখজনক কিন্তু একটি সত্য)। আমাদের মাটির বাস্তবতা মেনে নিতে হবে, বালিতে মাথা লুকিয়ে অন্ধ হতে হবে না। সুতরাং, আসুন আমরা ন্যূনতম যা করতে পারি তা করার চেষ্টা করি যা সর্বোচ্চ সম্ভাব্য ইতিবাচক প্রভাব আনবে:

১। টিকা এবং বুস্টার। আমাদের স্টকে ৯ কোটি ভ্যাকসিন রয়েছে এবং আরও ভ্যাকসিন আসছে। আমাদের অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যে সমস্ত উপলব্ধ ভ্যাকসিন যাতে তাদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে ব্যবহৃত হয়। আমাদের এখন J&J ভ্যাকসিন আছে, যা এক ডোজ ভ্যাকসিন। সমস্ত জেলা এবং সম্প্রদায়ের মধ্যে, আমাদের অবশ্যই টিকা এবং বুস্টার ডোজ দেওয়া আরও গতিশীল করতে হবে। প্রয়োজনে টিকাদান কর্মসূচিতে আমাদের সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করা উচিত।
২। দয়া করে WHO-এর জন্য অপেক্ষা করবেন না। আমরা যদি আমাদের বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ স্টক সম্পর্কে নিশ্চিত হই, তাহলে সিঙ্গাপুরের মতো ৫ বছর এবং তার বেশি বাচ্চাদের টিকা দেওয়া শুরু করুন।
৩। আরও বেশি শিল্প, ব্যবসায়িক প্রাঙ্গণ, বেসরকারি ও সরকারি অফিস সহ বাড়ির বাইরে মাস্কের যথাযথ ব্যবহার আরো জোরদার করুন
৪। কিছু সময়ের জন্য, আরও কিছু মাস রাজনৈতিক, ধর্মীয়, বিবাহ প্রভৃতি গণসমাবেশ আটকে রাখুন/বন্ধ করুন। শক্ত ভাবে কোভিড পাস প্রয়োগ করুন।
 
আশা করি নিশ্চিত করবেন যে সাধারণ জনগণ সময়মত এবং ক্রমাগত অবহিত হয়। আমরা পরীক্ষার সুবিধা বাড়িয়েছি, আমাদের ভ্যাকসিন আছে, আরো আসছে এবং টিকাদান কার্যক্রম ভালোভাবে চলছে এবং আমাদের কাছে সহজলভ্য কোভিড ওষুধ রয়েছে। তাই ওমিক্রন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে কিন্তু ডেল্টার মত বিপর্যয় সৃষ্টি করছে না। অন্য দেশের মত বাংলাদেশের মানুষও ডেল্টার পরে ওমিক্রনের এই বৈকল্পিকটির সাথে জীবনযাপন করা শিখতে শুরু করেছে এবং সম্ভবত এটি স্থানীয় রোগ হয়ে উঠবে। কিন্তু আমাদের অবশ্যই প্রতি বছর একবার মানুষকে টিকা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। অন্যের করুণার উপর নির্ভর না করে দেশে ভ্যাকসিন উৎপাদনে আরও বিনিয়োগ করতে হবে। আমরা ভাল করছি এবং আমি আত্মবিশ্বাসী যে আমরা খুব বেশি জীবন এবং অর্থনৈতিক দুর্ভোগ বা ক্ষতি ছাড়াই এই তরঙ্গকেও কাটিয়ে উঠবো। তাই আসুন ভাইরাসের সাথে বাঁচতে শিখি। আসুন সম্মত হই মাস্ক পরা একটা সুন্দর অভ্যাস এবং ভ্যাকসিনগুলি জীবন এবং জীবিকা রক্ষা করবে।

কোভিড-১৯   ওমিক্রন  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

করোনা টেস্টে অমানবিক মুনাফা এবং সময় ও ব্যয় সাশ্রয়ী বিকল্প টেস্ট পদ্ধতি

প্রকাশ: ০৫:২০ পিএম, ২৫ জানুয়ারী, ২০২২


Thumbnail

চলমান বৈশ্বিক মহামারীতে পৃথিবীর অধিকাংশ দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা যখন বেহাল, জনজীবন ও জীবিকা যখন প্রায় পর্যুদস্ত, তখন রোগ নির্ণয়, উপশম ও নিরাময়ের জন্য নিয়োজিত প্রতিষ্ঠান করছে উচ্চ মাত্রার মুনাফা। উন্নত দেশের উদ্ভাবনী প্রতিষ্ঠান যেমন দু’হাতে মুনাফা লুটেছে, তেমনি মাঠ পর্যায়ের প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানও ছাড় দেয়নি। সবার উদ্দেশ্য অভিন্ন এবং তা হচ্ছে অমানবিক অতিমাত্রার মুনাফা। প্রযুক্তি কোম্পানি, ওষুধ কোম্পানি, হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক ল্যাবরেটরি- কেউ ভাবেনি মানবিকতার কথা। কোভিড টেস্টের কথাই ধরি। সারা বিশ্বে কোভিড পরীক্ষার জন্য আরটি-পিসিআর (Reverse Transcription Polymerase Chain Reaction) পদ্ধতি ব্যবহৃত হচ্ছে। এ পদ্ধতি আবিষ্কার হয়েছে ১৯৮৩ সালে। শরীরে কোন ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা অন্য কোন সংক্রামক এজেন্ট বা ক্যান্সারে আক্রান্ত কোষের উপস্থিতি থাকলে পিসিআর তা নির্ভুলভাবে সনাক্ত করে।

সে প্রেক্ষিতে এ দেশের অনেক সরকারি-বেসরকারি ল্যাবরেটরিতে পিসিআর ব্যবহার করা হচ্ছে আগেই থেকেই। এটি ব্যবহার করে শরীরে ভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত করার জন্য রি-এজেন্ট/এনজাইম ব্যবহার করা হয়। এগুলোর উৎপাদক প্রতিষ্ঠান শুরুর দিকে এক একটি পরীক্ষার জন্য উক্ত রি-এজেন্ট যে মূল্যে বিক্রয় করেছে, বর্তমানে তারাই কম-বেশি ৮০ শতাংশ ছাড় দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের Roche, Thermo Fisher Scientific এবং Qiagen সহ হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এগুলোর উৎপাদক। তারা যে পিসিআর রি-এজেন্ট কিট ২০২০ সালে ২,০০০/- থেকে ২,৫০০/- টাকায় বিক্রয় করেছে, তারাই এখন ১ লক্ষ বা তার বেশী কিট আনলে ৬০০/- টাকায় সরবরাহ করছে। কারণ অনেক কোম্পানী উৎপাদন শুরু করেছে এবং প্রতিযোগী বেড়ে গেছে। রি-এজেন্ট কিটের মূল্য এতো কমলেও এদেশে বেসরকারি পর্যায়ে কোভিড টেস্টে এর কোনই প্রভাব পড়েনি।

সরকারি হাসপাতালে কোভিড টেস্টের ফি মাত্র ১০০ টাকা, কিন্তু রি-এজেন্ট কিটের মূল্য বেশি থাকায় এপ্রিল ২৯, ২০২০ তারিখে বেসরকারি পর্যায়ে টেস্টের জন্য ফি নির্ধারণ করা হয় ৩,৫০০/- টাকা এবং একই বছর ডিসেম্বর ২৭, তারিখে পুনর্নির্ধারণ করা হয় ৩,০০০/- টাকা। বিদেশি কর্মীর জন্য ২,৫০০/- টাকা এবং বাড়ি থেকে স্যাম্পল বা নমুনা সংগ্রহ করলে ৩,৭০০/- টাকা। ইতোমধ্যে এক বছরের বেশি সময় পার হয়েছে। কোভিড টেস্টের সংখ্যা বৃদ্ধি ঘটেছে আশঙ্কাজনকভাবে এবং সংশ্লিষ্ট রি-এজেন্ট কিটের সংগ্রহ মূল্য কমেছেও একই গতিতে। লক্ষ লক্ষ কিট আমদানি করলে দামে যেমন ছাড় আছে অনেক, তেমনি কোল্ড চেইনে আনতে হয় বিধায় বেশী রি-এজেন্ট আমদানী করলে বিমান ভাড়াও কম লাগে। প্রতিবেশী দেশ ভারতে মাত্র ৯৫০ রুপিতে বেসরকারি ল্যাবে এখন কোভিড টেস্ট করা যায়। এসব বিবেচনায় এ দেশে বিশেষজ্ঞগণ এ টেস্টের ফি অনেক কমিয়ে আনার প্রস্তাব করেছেন। যা খুবই যৌক্তিক এবং বাস্তবায়ন হওয়া খুবই জরুরি।

যে কোন জীবের প্রতি কোষে থাকে ডিএনএ ও আরএনএ। ডিএনএ ওই জীবের বৈশিষ্ট্য বহন করে এবং আরএনএ বৈশিষ্ট্য বহনের পাশাপাশি প্রোটিন তৈরি করে। ভাইরাস আধা-প্রাণ বলে এর কোনটিতে ডিএনএ (ডিএনএ ভাইরাস) থাকে এবং কোনটিতে আরএনএ (আরএনএ ভাইরাস) থাকে। বর্তমান মহামারীর ভাইরাস সার্স-কভ-২ একটি আরএনএ ভাইরাস। তাই এ রোগ সনাক্তের জন্য আরটি-পিসিআর (Reverse Transcription Polymerase Chain Reaction) পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়। পিসিআর-এর কাজ হচ্ছে দেহের বাইরে টিউবের মধ্যে সংশ্লিষ্ট নমুনার ডিএনএর লক্ষ লক্ষ প্রতিলিপি তৈরি করা। প্রথমে ডিএনএ বা আরএনএ আলাদা করা হয় ফিল্টার করে। এরপর এই ডিএনএ’র প্রাইমারের (Primer) সাথে পলিমারেজ এনজাইম মিশিয়ে লক্ষ লক্ষ ডিএনএ প্রতিলিপি তৈরি করা হয়।

প্রাইমার (Primer) হচ্ছে ডিএনএ’র অতি ক্ষুদ্র অংশ যা সংশ্লিষ্ট প্রাণ/আধা-প্রাণের সম্পূর্ণ বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রাখে। আমরা কোন লেখার ফটোকপি করলে সম্পূর্ণ লেখা যেভাবে অক্ষুণ্ন থাকে, পিসিআর হচ্ছে সেরূপ মলিকুলার ফটোকপি তৈরির পদ্ধতি। টিউবের মধ্যে সংশ্লিষ্ট নমুনার লক্ষ লক্ষ ডিএনএ তৈরি হওয়ায় ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি থাকলে রং পরিবর্তিত হয় ও রোগ সনাক্ত করা যায়। সার্স-কভ-২ আরএনএ ভাইরাস বিধায় আরএনএ আলাদা করার পরে একে রিভার্স ট্রান্সক্রিপটেজ (reverse transcriptase) নামক এনজাইমের মাধ্যমে ডিএনএ (cDNA) তে রূপান্তর করে পিসিআর পদ্ধতিতে লক্ষ লক্ষ প্রতিলিপি তৈরি করা হয়। এজন্য এ পদ্ধতিকে আরটি-পিসিআর (Reverse Transcription PCR) বলে। বিভিন্ন ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, জীব ও উদ্ভিদের দেহে এ রিভার্স ট্রান্সক্রিপটেজ এনজাইম পাওয়া যায়।

পিসিআর পদ্ধতি ছাড়াও অ্যান্টিজেন নির্ণয় করে কোভিড রোগ পরীক্ষা করা হয়। তবে শরীর থেকে সংগৃহীত নমুনায় ভাইরাস বেশি না থাকলে (২৫০ বা তার বেশি) অ্যান্টিজেন টেস্টে রোগ ধরা যায় না। রোগের প্রাথমিক অবস্থায় ভাইরাস কম থাকায় অ্যান্টিজেন টেস্ট খুব কার্যকরী হয়না। অপরদিকে, দক্ষ অনুজীব বিজ্ঞানীর তত্ত্বাবধানে পিসিআর মাধ্যমে ডিএনএ’র লক্ষ লক্ষ প্রতিলিপি তৈরিতে ভিন্ন ভিন্ন্ন তাপমাত্রা রাখার পাশাপাশি অনেক মানমাত্রা বজায় রাখতে হয়। পদ্ধতিটি সময় সাপেক্ষ, তবে সম্পূর্ণ নির্ভুল। পিসিআর যন্ত্র বেশ দামি এবং এটি স্থাপন করার জন্য সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি অবলম্বনের প্রয়োজনে সময় বেশী লাগে এবং ব্যয়বহুল। নির্দিষ্ট ল্যাবরেটরির বাইরে এটি ব্যবহার করা যায় না। সে কারণে বর্তমান মহামারীর শুরু থেকেই পৃথিবীর সব নামকরা প্রতিষ্ঠান পিসিআর টেস্টর ন্যয় নির্ভুল সহজ পদ্ধতির টেস্ট উদ্ভাবনের প্রচেষ্টা চালায়।

২০২০ সালেই যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ এ খাতে বরাদ্দ করে ১.৫ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু স্বল্প খরচে সহজ পদ্ধতি দ্রুত ব্যবহারে প্রথম সফলতা পায় আমাদের কাছের দেশ থাইল্যান্ড। ব্যাংককের চুলালংকর্ন বিশ^বিদ্যালয় করোনা সংক্রমণ সনাক্তের জন্য আরটি-ল্যাম্প (RT-LAMP- Reverse Transcription Loop-mediated Isothermal Amplification) পদ্ধতি ব্যবহারের তথ্য উপস্থাপন করে। বিশ্বের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান চলমান মহামারিতে ভাইরাস সনাক্তে আরটি ল্যাম্প পদ্ধতির ব্যবহারের উপর অনেক গবেষণাপত্র প্রকাশ করে। সে প্রেক্ষিতে এ পদ্ধতির রি-এজেন্ট তৈরীতে বিনিয়োগ শুরু হয় এবং প্রাইম তৈরি, ভেলিডেশন এবং অন্যান্য অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পন্নে কয়েক মাস বিলম্ব হয়।

ভাইরাস/ব্যাকটেরিয়া বা অনুরূপ সংক্রমণ সনাক্তের জন্য ল্যাম্প (LAMP) পদ্ধতি আবিষ্কার হয় ২০০০ সালে। করোনার অন্য প্রজাতির ভাইরাস, ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস, হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসসহ অনেক সংক্রমক ভাইরাস সনাক্তে এ পদ্ধতি ব্যবহৃত হচ্ছে। এটিও পিসিআর-এর ন্যায় ডিএনএ’র লক্ষ লক্ষ প্রতিলিপি তৈরি করে, তবে ভিন্ন পদ্ধতিতে। একটি সুনির্দিষ্ট তাপমাত্রা বজায় রাখলেই হয়, ঘন ঘন তাপমাত্রা পরিবর্তন করার প্রয়োজন হয় না । তাপমাত্রা ওঠানো-নামানোর জন্য দক্ষ জনবল এবং সংশ্লিষ্ট যন্ত্রের প্রয়োজন হয় না। অধিকন্তু একই সাথে বহু নমুনা প্রক্রিয়াকরণের পাশাপাশি মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে রোগ নির্ণয় করা যায়। যন্ত্রের দাম এবং সম্পূর্ণ ল্যাব স্থাপনা ব্যয় কম বেশী ৩ লক্ষ টাকা এবং কম সময়ে যে কোন স্থানে বসানো যায়। এমনকি গাড়ীতে/পিকআপে বসিয়ে ভ্রাম্যমাণ ল্যাব পরিচালনা করা যায় ও সেখানেই ৩০ মিনিটে রিপোর্ট দেওয়া যায়। লক্ষ লক্ষ প্রতিলিপি তৈরির পূর্বে ডিএনএ’র অংশ তথা ‘প্রাইম’-এর সাথে বেগুনি রং মিশানো হয়। নমুনায় ভাইরাসের উপস্থিতি থাকলে তা নীল রং ধারণ করে, আর উপস্থিতি না থাকলে রংয়ের পরিবর্তন হয় না। রংয়ের পরিবর্তন খালি চোখে দেখা যায়। এ পরীক্ষার জন্য দক্ষ অনুজীব বিজ্ঞানীর প্রয়োজন হয় না। রোগ নির্ণয়ের সঠিকতা পিসিআর-এর মতো হওয়ায় ব্যয় সাশ্রয়ী, অত্যন্ত সময় সাশ্রয়ী ও সহজ এ পদ্ধতি খুব দ্রুতই বিভিন্ন দেশে ব্যবহার শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ সকল দেশে পিসিআর টেস্ট রিপোর্টের ন্যয় আরটি-ল্যাম্প টেস্ট রিপোর্ট থাকলে ঐ দেশে প্রবেশে কোন বাধা থাকেনা। সে কারণে এবং বিশেষ করে বিমানবন্দরে বসেই রিপোর্ট নিয়ে বিমানে চড়া বা বিমানবন্দর থেকে বের হওয়া যায় বিধায় আরটি-ল্যাম্প পদ্ধতি প্রতিবেশী ভারতসহ অনেক দেশের বিমানবন্দরে ব্যবহার শুরু হয়েছে বেশ জোরেসোরেই।

দেশে ওমিক্রনের সংক্রমণ বাড়ছে লাগামহীন গতিতে। আরটি-পিসিআর পদ্ধতিতে সাথে সাথে রিপোর্ট না পাওয়ায় সংক্রমিত ব্যক্তি একদিনের মধ্যে অপর শত শত ব্যক্তিকে সংক্রমিত করতে পারে। অপরদিকে, যথাসময়ে করোনা টেস্ট রিপোর্ট না পাওয়ায় অনেক বিদেশগামী যাত্রীর ভোগান্তির সীমা থাকেনা। সে প্রেক্ষিতে দ্রুত সময়ে অনেক বেশি নমুনা পরীক্ষার জন্য সহজ ও ব্যয় সাশ্রয়ী আরটি-ল্যাম্প টেস্ট পদ্ধতি আমাদের দেশে এখনই ব্যবহারের জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যৌক্তিক। একইসঙ্গে আরটি-পিসিআর টেস্টের খরচ ১,০০০ টাকার মধ্যে আনয়নের জন্য এক বা একাধিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অপেক্ষাকৃত কম মূল্যে লক্ষ লক্ষ রি-এজেন্ট/কিট আমদানি করে তা সরকারি/বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে সরবরাহ করার বিষয়টিও বিবেচনা করা যায়। এসব বিবেচনায় জরুরী ভিত্তিতে বিমান বন্দরসহ অন্যান্য স্থানে আরটি-ল্যাম্প পদ্ধতির ব্যবহার এবং পিসিআর টেস্টের খরচ অনেক নিচে নামিয়ে আনা প্রয়োজন। এতে ওমিক্রনের লাগামহীন সংক্রমণের গতি রোধ করার পাশাপাশি অমানবিক মুনাফার গতিতেও যেমন লাগাম টানা যাবে, তেমনি বিদেশগামী যাত্রীসহ দেশের মানুষের আর্থিক ভোগান্তিও কিছুটা লাঘব করা সম্ভব হবে।


মন্তব্য করুন


বিজ্ঞাপন