ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৩ আশ্বিন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

‘শুধু বাংলাদেশ নয়, সারাবিশ্বের জন্যই এই রেড অ্যালার্টটা ছিলো’

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২০ বৃহস্পতিবার, ১০:০১ এএম
‘শুধু বাংলাদেশ নয়, সারাবিশ্বের জন্যই এই রেড অ্যালার্টটা ছিলো’

করোনার সময় আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশের বাস্তবতাটা দেখলাম। কিন্তু ডিজিটাল নিরাপত্তা এখন একটা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আমাদের সামনে এসেছে। সেক্ষেত্রে আমাদের ডিজিটাল নিরাপত্তা কতটা সুরক্ষিত? ডিজিটাল নিরাপত্তা সুরক্ষায় আমরা কতটুকু প্রস্তুত? এর উত্তরে নাটোর-৩ আসনের সংসদ সদস্য এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বলেন,‘গত ১১ বছরে প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ও আর্কিটেক্ট অব ডিজিটাল বাংলাদেশ জনাব সজীব ওয়াজেদ জয় ভাইয়ের সুনির্দেশনা ও পরামর্শে আমাদের ডিজিটাল অবকাঠামোগুলো পূরণের যে রুপকল্প, তা তৈরী হয়ে গেছে। এখন আমরা এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারকারীরা যেন নিরাপদ থাকে তার জন্য আমরা মনোযোগ দিয়ে কাজ করছি।’

বাংলা ইনসাইডারের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে জুনাইদ আহমেদ পলক এ বিষয়ে বিস্তারিত আলাপ করেছেন। তিনি বলেন, ‘ইতোমধ্যে আমরা প্রায় ২২ টা ডিজিটাল ইনফরমেশন ইনফ্রাকচার আইডেন্টিফাই করেছি। সেগুলো যেমন আমাদের ব্যাংকিং সেক্টর, সেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ আরো ৫৮ টি ব্যাংক রয়েছে। এর সঙ্গে সিভিলাইজেশন, ন্যাশনাল বোর্ড অব রেভিনিউ, ন্যাশনাল আইডি, পাসপোর্ট- এই ধরণের যে ডিজিটাল ইনফ্রাকচারগুলো আছে, সেগুলোর জন্য আমরা ১৫ টি জায়গায় সেন্সর বসিয়েছি। এখন আমরা আমাদের দেশের ভিতর এবং দেশের বাইরে যে কোন ধরণের সাইবার অ্যাটাক বা ম্যানুয়াল অ্যাটাক করতে আসলে তার একটা ওয়ার্নিং পাওয়ার জন্য আমরা ইন্টারন্যাশনাল যে বিভিন্ন এক্সপার্টের যে অ্যাসোসিয়েশন আছে তাদের সদস্যপদ গ্রহণ করেছি। ফলে বিশ্বের যে কোন জায়গা থেকে যে কোন আশংকা বা বিপদ বা আক্রমণের ঝুঁকি থাকলে সেগুলো আমরা আমাদের দেশের ক্রিটিকাল ইনফরমেশন ইনফ্রাকচারগুলোকে অবহিত করি যেন প্রতিরোধ ব্যবস্থা সঠিকভাবে নেওয়া সম্ভব হয়।’

গত কিছুদিন ধরেই ব্যাংকিং পাড়ায় একটা আতঙ্ক চলছে, বিভিন্ন ব্যাংক রাতে এটিএম বুথগুলো বন্ধ করে রাখছে। গণমাধ্যমে সাইবার হামলার আশঙ্কার কথা উল্লেখ করা হচ্ছে। আপনি এ সম্পর্কে কতটুকু জানেন? এ ব্যাপারে আমাদের প্রস্তুতি কতটুকু? এমন প্রশ্নের উত্তরে জুনাইদ আহমেদ পলক বলেন,‘আমরা এই বিষয়টি গত মাসের ২৬ তারিখে প্রথম অবহিত হই। আমাদের আইসিটি বিভাগের যে সাইবার টিম কাজ করে তারা এই বিষয়টা অবহিত করে। যেহেতু এটা ব্যাংকিং সেক্টরে হামলার একটা আশঙ্কা ছিলো, সাথে সাথে আমরা বাংলাদেশ ব্যাংককে জানাই , ফাইন্যান্স ডিভিশনকে জানাই। তারা প্রত্যেকটি ব্যাংকে খুব দ্রুততার সাথে সেই খবরটি জানিয়ে দেয়। যার ফলে এখন অ্যান্টি ম্যালওয়ার বা অ্যান্টি ভাইরাস- যে সফটওয়ারগুলো ইনস্টল করার দরকার ব্যাকংগুলো তা করছে। পাশাপাশি এই ধরণের আশঙ্কা ছিলো যে, এটিএম বুথে এই হ্যাকাররা হ্যাক করার চেষ্টা করবে। এটা শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, সারাবিশ্বের জন্যই এই রেড অ্যালার্টটা ছিলো। এখন পর্যন্ত আমরা এ রকম কোন ক্ষতি বা হামলার খবর পাইনি।

পুরো বিশ্বেই এ ধরণের সাইবার ক্রিমিনালরা প্রতিনিয়ত চেষ্টা করতে থাকে উল্লেখ করে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী বলেন,‘ এটা কিন্তু একটা চলমান প্রক্রিয়া। প্রতিনিয়ত যেমন অ্যান্টি ম্যালওয়ার সফটওয়ার তৈরী হচ্ছে, ক্রিমিনালরাও সাইবার অ্যাটাক করার জন্য নতুন নতুন ম্যালওয়ার তৈরী করছে। সেটা দিয়ে তারা আক্রমণ করছে।’

সরকার এর জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে বিভিন্ন পর্যায়ে। প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বলেন, ‘দেশের ১৭ কোটি মানুষকে ব্যক্তিগতভাবে সচেতন করার জন্য বিভিন্ন ধরণের কর্মসূচী হাতে নিয়েছি। যেমন অক্টোবরে সাইবার সিকিউরিটি উইক যেটাকে বলে, এটা মাসব্যাপী হবে। আমরা চারমাস ব্যাপী সচেতনতা তৈরীর জন্য ‘সত্যকে জানুন’ একটা ক্যাম্পেইন শুরু করেছি। যেখানে www.durbar.org নামে একটা ওয়েবসাইট আমরা ওপেন করেছি, যেখানে আমরা একেবারেই ঢাকা থেকে তৃণমূল পর্যন্ত বিভাগ- জেলা- উপজেলা- ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত প্রতিনিধি নিয়োগ করছি। যার যার পাড়া মহল্লা এবং ফেসবুক গ্রুপ, ইনস্ট্রাগ্রাম, ইউটিউবে তারা এই সচেতনতা মূলক কার্যক্রম পরিচালনা করবে, পাশাপাশি প্রযুক্তিগত সক্ষমতার দিক থেকে আমরা ন্যাশনাল কম্পিউটার ইনসিডেন্ট রেসপন্স টিম গঠন করেছি, সজীব ওয়াজেদ জয় ভাইয়ের নির্দেশনায় আমরা গাজীপুরের কালিয়াকৈরে একটা জায়গা নিয়েছি, যেখানে বিশ্বমানের সাইবার সিকিউরিটি এজেন্সি তৈরী করা হবে। যেখানে আমাদের একটা সাইবার টিম তৈরী হবে যারা বর্ডার গার্ড বা আমাদের সেনাবাহিনী-পুলিশবাহিনী যেমন রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য সশস্ত্র অবস্থায় সব সময় প্রস্তুত থাকে, ঠিক একইভাবে আমাদের এই সাইবার টিমও তৈরী থাকবে দেশের সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য।’

তিনি বলেন,‘ বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সাইবার রেঞ্জ তৈরী করা হচ্ছে। যেমন মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সাইন্স এন্ড টেকনোলজি (এমআইএসটি)-তে আমরা প্রায় ২০ কোটি টাকার ওপর খরচ করে একটা সাইবার রেঞ্জ তৈরী করছি। যেখানে আমাদের স্টুডেন্ট, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী এবং আমাদের যারা সাইবার সিকোউরিটি এক্সপার্ট, তারা প্রতিনিয়ত দুটো করে দল করে নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিতে পারবে। আমরা একটা সাইবার জিম করেছি যেখানে প্রতিনিয়ত সেই প্রাকটিস এবং ট্রেনিংগুলো হচ্ছে।’

ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং ডিজিটাল মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধ শনাক্তকরণ, প্রতিরোধ, দমন, বিচার ও আনুষঙ্গিক বিষয়াদি সম্পর্কে বিধান প্রণয়নকল্পে ২০১৮ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে যে আইন অনুমোদন করেন তার উল্লেখ করে তিনি বলেন,‘ সেই আইনবলে আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে এই সাইবার জগতের যারা অপরাধী তাদেরকে অনুসন্ধান করছে। সাইবার অপরাধকে প্রতিরোধ করা এবং সেই তথ্য উপাত্ত উদঘাটনের জন্য ইতোমধ্যেই সিআইডিতে একটা ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে, আরেকটি ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব আমাদের আইসিটি ডিপার্টমেন্টে স্থাপন করা হয়েছে। বড় আকারের আন্তর্জাতিক মানের সাইবার ফরেনসিক ল্যাব স্থাপন কালিয়াকৈরিতে করবো। যে প্রজেক্টটা এখনো ডিজাইন করছি। এরফলে আমরা ব্যক্তিগতভাবে, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সক্ষমতা এবং কঠোর আইনের প্রয়োগ এবং সাথে সাথে আন্তর্জাতিক কোলাবেরেশন, ইনফরমেশন শেয়ারি করবো- এইভাবে আমরা এই সাইবার যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছি। এটি চলমান একটি যুদ্ধ। এই যুদ্ধে যেন আমাদের দেশের তরুণরা নিজেদের সফলভাবে গড়ে তুলতে পারে সেজন্য স্কুল কলেজ থেকে শুরু করে সচেতনেতা তৈরী করছি। অপরদিকে এক্সপার্ট তৈরীর জন্য আইসিটি ডিভিশন প্রশিক্ষণ কর্মসূচীও চলমান রেখেছি।’

এখন যে আতঙ্কের কথাগুলো শোনা যাচ্ছে, আপনি কি আমাদের আশ্বস্ত করবেন আমাদের যারা ব্যাংকে টাকা রাখছে বা যাদের আমানত আছে তারা প্রতারিত হবেন না বা তারা এক সকালে জানবেন না যে, তাদের সর্বস্ব লুন্ঠন হয়ে গেছে। এরকম কি কোন আশ্বাস আমাদের দিতে পারেন? এই প্রশ্নের উত্তরে জুনাইদ আহমেদ পলক বলেন,‘সাইবার সিকিউরিটির অ্যাসুরেন্স কোন দেশ বা কোন প্রতিষ্ঠান বা কোন ব্যাক্তি এখন পর্যন্ত দিতে পারেনি। তবে এটুকু আমরা আশ্বস্ত করতে পারি যে, আমাদের যথাসম্ভব প্রস্তুতি এবং যথাসম্ভব সক্ষমতা তৈরী হয়েছে। আমাদের ব্যাংকিং সেক্টরে যে উপলব্ধিটা এসেছে, বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের সেই দুর্ঘটনা ঘটার পর থেকে, তাতে আমি যথেষ্ঠ আশাবাদী যে আমাদের ব্যাংকিং সেক্টরে যারা আছেন তাদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা আছে। তাতে তেমন ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আপাতত যেই থ্রেটটা আমরা পেয়েছিলাম, সেটাতে এখন পর্যন্ত কোন ক্ষতি হয়েছে সেই দু:সংবাদ পাইনি। অবশ্যই আমাদের ব্যাংক, প্রতিষ্ঠান বা সরকারের ওপর নির্ভর করলেই হবে না। আমাদের ব্যক্তি পর্যায়ে সচেতনেতা দরকার। কারো কার্ড যদি হ্যাক হয় সেক্ষেত্রে কিন্তু শুধুমাত্র ব্যাংকের একার দায় থাকে না। অনেক সময় পাসওয়ার্ড বা পিন নাম্বার অসচেতনভাবে কারো কাছে দিয়ে ফেলি কিংবা সেগুলোকে গোপন রাখতে পারি না। সে কারণেও কিন্তু অনেক সময় আমরা প্রতারণার শিকার হই। সেক্ষেত্রে বলবো, আমাদের ভয়ের কোন কারণ নেই। আমাদের নিজেদেরও সচেতন হতে হবে।’