লিট ইনসাইড

চলচ্চিত্রে কাজী নজরুল ইসলামের সাংগীতিক কর্ম

প্রকাশ: ১২:২৬ পিএম, ২৬ মে, ২০২৩


Thumbnail

চলচ্চিত্রে কাজী নজরুল ইসলামের সাংগীতিক কর্ম

‘পঞ্চগীতি  কবি’দের সর্বশেষ উত্তরসূরি কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬)। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১), দ্বিজেন্দ্রলাল রায় (১৮৬৩-১৯১৩), রজনীকান্ত সেন (১৮৬৫-১৯১০) এবং অতুল প্রসাদ সেন (১৮৭১-১৯৩৪) প্রবর্তিত সাংগীতিক বৈশিষ্ট্যের ধারাকে পরিহার করে বাংলা সংগীতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনয়ন করেন নজরুল ইসলাম। বৈশিষ্ট্যে, বৈচিত্র্যে ও সাংগীতিক ঐশ্বর্য গুণে কাজী নজরুল ইসলামের গান আপামর মানুষের কাছে হয়ে উঠল ‘নজরুল-সংগীত’। সকল শ্রেণির মানুষের জন্য তিনি গান রচনা করেছেন। নজরুল-সংগীতশিল্পী খালিদ হোসেন-এর মতে: সঙ্গীত সৃষ্টির বিভিন্ন মুখিতায় নজরুল অনন্য,তাঁর রচিত গজল, খেয়াল অঙ্গের গান, রাগপ্রধান, ঠুমরী, হোরী, কাজরী, ভজন, কীর্তন, শ্যামাসঙ্গীত, কাব্যসঙ্গীত, হাসিরগান, দেশাত্মবোধক, ইসলামীগান, হাম্দ, নাত, মর্সিয়া, মুসলিম জাগরণী গান, পল্লীসঙ্গীত, ভাটিয়ালী, ঋতুসঙ্গীত, বৃন্দগান, গণসঙ্গীত- যেমন শ্রমিকের গান, কৃষকের গান, ধীবরের গান, ছাদপেটার গান, লেটোগান, ছাত্রদলের গান, নারী জাগরণী গান, শিশুতোষ গান, নৃত্যসঙ্গীত প্রভৃতি প্রায় ৩৫/৪০ ধরনের গানে বাংলা সঙ্গীত ঐশ্বর্য মণ্ডিত হয়েছে।

সাহিত্য ছাড়াও সংগীতের এমন কোনো শাখা নেই যেখানে তাঁর পদচারণা ঘটেনি। সার্থক ইসলামি সংগীত রচয়িতা রূপে তাঁর গান মানুষের অন্তরকে ছুঁয়ে যায়। ইসলামি গানগুলি পরিবেশনায় রমজান মাস যেন আরও সার্থক হয়ে ওঠে। ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ [ইদ]’ গানটি শুনলেই যেন মনে হয় সত্যিই খুশির ইদ এসেছে। আবার ভক্তিমূলক, কীর্তন, শ্যামা, ভজন গানগুলোর বাণী ও সুরের যে মাধুর্যতা তাতে এমন সৃষ্টি দ্বিতীয় কারো নেই বললেও অত্যুক্তি হয়না।

নিজের সৃষ্টি সংগীত সম্পর্কে নজরুল ইসলাম তাঁর বিশ্বাসের কথা ও ব্যক্ত করেছেন। তাঁর ভাষায়: ‘কবিতার জগতে আমি কিছু দিতে পেরেছি কিনা জানিনা। কিন্তু আমার স্থির বিশ্বাস গানের জগতে আমি কিছু দিয়ে যেতে পেরেছি। ’কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর অসামান্য সংগীত প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন অসংখ্য গান রচনার মধ্য দিয়ে। তিনি ছিলেন একজন পরিপূর্ণ সংগীতকার। হয়তো এবিবেচনায় নজরুলের সান্নিধ্য-ধন্য শিল্পী সুকুমার মিত্র নজরুল গীতি আলোচনা গ্রন্থে ‘কাজীন জরুল ও তার রাগরাগিণী’ শীর্ষক নিবন্ধে লিখেছেন: ‘কবিন জরুল ইসলাম বাংলা সঙ্গীত জগতের একজন পূর্ণ সঙ্গীত ব্যক্তিত্ব। তাঁর রচিত ও সুরারোপিত গানগুলি শুধু যে দূর্লভ [দুর্লভ] স্বীকৃতি লাভকরেছে তাই-ই নয়, আজ তার নতুন করে মূল্যায়নের সময় এসেছে।’

কাজী নজরুল ইসলাম যতগুলো পর্যায়ের গান রচনা করেছেন তন্মধ্যে চলচ্চিত্রের গান নিয়ে তুলনামূলকভাবে কম আলোচনা ও গবেষণা হয়েছে। এমন কি চলচ্চিত্রে যোগদান প্রসঙ্গেও দু’চারজন নজরুল গবেষক ব্যতীত কেউই বিশদ আলোচনা করেননি। অথচ চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত কাজী নজরুল ইসলামের গানের সংখ্যা নিতান্তই কম নয়। বরং অনেক পর্যায়ের গান অপেক্ষা সংখ্যায় ও বেশি। শুধু সংখ্যায় নয় এর মানও উঁচু মার্গের। এ প্রসঙ্গে কাজী নজরুল ইসলামের সহযোগী সংগীত শিল্পী মনোরঞ্জনসেন-এর ‘বাংলার সঙ্গীতে নজরুল ইসলাম’ শীর্ষক নিবন্ধের কথা উল্লেখযোগ্য। উক্ত নিবন্ধে তিনি বলেন ‘এক কথায় নজরুল ঐ যুগে তাঁর সৃষ্ট সঙ্গীত বাংলা গীতি ধারায়দু’কূল প্লাবিত করেন। একা জসম্ভব হয়েছিল শুধুমাত্র বিপুলসৃষ্টিরাশির ফলে নয়। অফুরান বৈচিত্র্য ও স্বকীয় উৎকর্ষ তাই [উৎকৃষ্টতাই] ছিল মূলগুণ।’

কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ছিল বৈচিত্র্যে ভরা। তাঁর বিচরণের ক্ষেত্র ও ছিল বিচিত্র। এমনি এক টিবিচরণক্ষেত্র হলো চলচ্চিত্র। মূলত সংগীতের প্রয়োজনেই তাঁর চলচ্চিত্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়া। তিনি প্রথম ১৯৩১সালে ‘সুরভাণ্ডারি’ হিসাবে ‘ম্যাডান থিয়েটার্স কোম্পানি’তে যোগদান করেন। ‘সুরভাণ্ডারি’র কাজ ছিল চলচ্চিত্রে অংশগ্রহণকারী শিল্পীদের কণ্ঠস্বর পরীক্ষা করা। এই সম্পর্কে ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দে দৈনিক বঙ্গবাণীতে প্রকাশিত সংবাদটি হলো:

ম্যাডান থিয়েটার্স লিমিটেড বাঙ্গালা গানের টকি নির্মাণ করিতেছেন। প্রসিদ্ধ কবি ও সংগীত কারন জরুলকে সুরভাণ্ডারী নিযুক্ত করিয়াছেন। তাহাদের এ মনোনয়ন যথার্থ হইয়াছে, কারণ অধুনা বাঙ্গালার তরুণ কবিদের মধ্যে নজরুল ইসলাম রচয়িতা ও সুরকার হিসেবে শ্রেষ্ঠ। বর্তমানে কিছু কাল ম্যাডান কোম্পানি নট-নটীদের সুরপরীক্ষার জন্য কেবল গান, আবৃত্তির সবাক চিত্রই নির্মাণ করিবেন, পরে বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথের নৌকাডুবির তাহারা সবাক করিয়া তুলিবেন বলিয়া শুনাযাইতেছে।

উক্ত সময়েই (১৯৩১খ্রিষ্টাব্দে) ‘ম্যাডান থিয়েটার্সকোম্পানি’ ৩০-৪০টিস্বল্প দৈর্ঘ্য খণ্ড  চিত্র নির্মাণ  করে। এ সকল খণ্ড চিত্রে কাজী নজরুল ইসলামের প্রত্যক্ষ উপস্থিতির কথা জানা যায়। এ প্রসঙ্গে আশোক কুমার মিত্র লিখেছেন:

১৯৩১খ্রিস্টাব্দে অভূতপূর্ব বৈজ্ঞানিক সাফল্য লইয়া যখন সবাক চিত্র সর্বপ্রথম কলকাতার চিত্রগৃহে আত্নপ্রকাশ করে এবং যখন কেবলমাত্র সংক্ষিপ্ত নমুনামূলক বাংলা চিত্র ম্যাডান থিয়েটার্স লিমিটেড কর্তৃক পরিবেশিত হয়, তখনই আমরা দেখিয়াছি সবাক চিত্রের মাধ্যমে কাজী নজরুলকে বলিতে শুনিয়াছি তাহার উদাত্ত কণ্ঠের আবৃত্তি :

সাম্যের গান গাই

আমার চক্ষে পুরুষ ও নারী

কোন ভেদাভেদ নাই।

১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে ‘ম্যাডান থিয়েটার্স’-এর অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ‘পায়োনিয়ার ফিল্মস কোম্পানি’-এর চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে নজরুল ইসলাম যোগদান করেন। এই প্রতিষ্ঠান থেকে ১৯৩৪ সালে ধ্রুব নামে মুক্তি প্রাপ্ত চলচ্চিত্রে কাজী নজরুলের অবদান ছিল বহুমাত্রিক। এ প্রসঙ্গে অতনুচক্রবর্তীর মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য:

বাংলা গানের ধারাবাহিকতায় পথিকৃত কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর মেধা বিনিয়োগ করেছিলেন সিনেমার গানে, নির্মাণেও । ১৯৩৪ সালের নববর্ষের দিনে, ক্রাউন সিনেমার রূপালি [রুপালি] পর্দায় দর্শক কাজী নজরুলকে একই সঙ্গে গান গেয়ে অভিনয় করতে দেখেছিল। ছবিটির নাম ‘ধ্রুব’, ভূমিকাটি ছিল নারদের। ছবিটি যুগ্মভাবে পরিচালনা করেছিলেন নজরুল ইসলাম এবং সত্যেন্দ্রনাথ।

ধ্রুব চলচ্চিত্রে ১৮ টি গান ব্যবহৃত হয়। সবগুলি গানের সুরকার এবং ১৭ টি গানের গীতিকার ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। এছাড়া পরিচালক, সংগীত পরিচালকসহ ‘নারদ’ চরিত্রে অভিনয় করে ৪টি গানে কণ্ঠও প্রদান করেন তিনি। তাই বলা যায়, বিরল প্রতিভার অধিকারী এই সংগীতজ্ঞ চলচ্চিত্রে ছিলেন সর্বত্র ও অত্যাবশ্যকীয়।ধ্রুবচলচ্চিত্রের গানগুলো হলো: ‘অবিরত বাদর বরষিছে ঝর ঝর’; ‘কাঁদিসনে আর কাঁদিসনে’; ‘আমি রাজার কুমার’; ‘গহন বনে শ্রীহরি নামের’; ‘চমকেচ পলা মেঘে মগন গগন’; ‘জয় পীতা ম্বরশ্যাম সুন্দর’; ‘জাগো ব্যথার ঠাকুর’; ‘দাও দেখা দাও দেখা’; ‘ধুলার ঠাকুর ধুলার ঠাকুর’; ‘নাচো বন মালী কর তালি দিয়া’; ‘ফিরে আয় ওরে ফিরে আয়’; ‘ফুটিল মান সমাধবী কুঞ্জে’; ‘মধুর ছন্দে নাচে আনন্দে’; ‘শিশু নটবর নেচে নেচে যায়’; ‘হৃদি পদ্মে চরণ রাখো’; ‘হরি নামের সুধায়’; ‘হেদুখ-হরণ ভক্তের শরণ’; ‘আয়রে আয় হরিবলে’ (এই গানটি গিরিশ চন্দ্র ঘোষ রচিত)।

চলচ্চিত্রের কাহিনি অনুযায়ী গান রচনা যেমন কঠিন কাজ তেমনি গানের বাণী অনুযায়ী সুর রচনা ও সহজসাধ্য নয়। কাজী নজরুল ইসলাম এই দুইয়ের সমন্বয় ঘটিয়েছেন দক্ষতার সঙ্গে। এ বিষয়ে নজরুলের স্নেহধন্য শিল্পী কাননদেবী বলেন:

ছবির গান ও সুর বাঁধার সময় ও দেখেছি কত প্রচণ্ড আনন্দের মধ্যে কি প্রবলভাবেই না কবি বেঁচে উঠতেন, যখন একটা গানের কথা ও সুর ঠিক তাঁর মনের মত হয়ে উঠতেন। মানুষ কোন প্রিয় খাদ্য যেমন রসিয়ে রসিয়ে আস্বাদ করে কাজী সাহেব যেন তেমনি করেই নিজের গানকে আস্বাদ করতেন।

১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দে ‘কালীফিল্মস’-এর প্রযোজনায় মুক্তি প্রাপ্ত পাতাল পুরীচলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালক, গীতিকার ও সুরকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন কাজী নজরুল ইসলাম। চলচ্চিত্র গবেষক অনুপম হায়াৎ তাঁর চলচ্চিত্র জগতে নজরুল গ্রন্থে লিখেছেন:

১৯৩৫সালের ২৩মার্চ কলকাতার রূপবাণী প্রেক্ষাগৃহে যখন কালীফিল্ম সপ্রযোজিত প্রিয় নাথ গাঙ্গুলী পরিচালিত ‘পাতালপুরী’ মুক্তিপায়, তখন দর্শকরা দুই সাহিত্যিক বন্ধুর সম্মিলিত মেধার সঙ্গে পরিচিত হয়। এঁদের একজন কাহিনিকার, চিত্রনাট্যকার শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, আরেকজন এ ছবির সঙ্গীত পরিচালক, গীতিকার, অভিনেতা কাজী নজরুল ইসলাম। এ ছবির কাহিনী গড়ে উঠেছে কয়লাখনির শ্রমিক নারী পুরুষদের নিয়ে। নজরুল ছবির কাহিনির মূল ‘থিম’ অনুযায়ী সঙ্গীত সৃষ্টির জন্য বর্ধমানের কয়লাখনি অঞ্চলে ও গিয়েছিলেন প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্য। এ ছবিতে তিনি ‘ঝুমুর’ নামে নতুন সুর সৃষ্টি করেছিলেন।

পাতালপুরী চলচ্চিত্রে দায়িত্ব পালনের পারিশ্রমিক হিসেবে নজরুল ইসলাম পেয়েছিলেন মাত্র ৫০টাকা। পাতালপুরী  চলচ্চিত্রের গানগুলো হলো: ‘আঁধার ঘরের আলো’; ‘এলো খোঁপায় পরিয়েদে’; ‘তাল পুকুরে তুলছিলসে’; ‘দুখের সাথি গেলি চলে’; ‘ধীরে চল্চরণটলমল’; ‘ফুলফুটেছে কয়লাফেলা’; ‘ওশিকারি মারিসনা তুই’; ‘বন কত দূরেসই’ (এই গানটি শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় রচিত)।  

কাহিনির প্রয়োজনে গানের বাণী রচনার পাশাপাশি সুর রচনার জন্য কবি নজরুল কতটা যত্নবান থাকতেন সে-সম্পর্কে শিল্পী কাননদেবী জানিয়েছেন তাঁর ‘কবি প্রণাম’ প্রবন্ধে। কাননদেবী লিখেছেন:

আমাকে অবাক হয়ে চেয়ে থাকতে দেখে বলতেন, ‘ডাগর চোখে দেখছ কি? আমি হলাম ঘটক, জানো? এক দেশে থাকে সুর, অন্যদেশে কথা। এই দুই দেশের এই বরকনেকে এক করতে হবে। কিন্তু দুটির জাত আলাদা হলে চলবে না, তাহলেই বেবনতি। বুঝলে কিছু?’

১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দে ‘দেবদত্ত ফিল্মস’-এর প্রযোজনায় মুক্তিপায় চলচ্চিত্র গ্রহেরফের। এইচলচ্চিত্র সম্পর্কে নজরুল গবেষক আসাদুল হক তাঁর নজরুল সংগীত গ্রন্থে লিখেছেন: ‘এই ছায়াছবিতে কাজী নজরুল ইসলাম ৬ টি গানে সুরারোপ করেন এবং সঙ্গীত পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন।’

১৯৩৮খ্রিষ্টাব্দে মুক্তি লাভ করে ছায়াছবি বিদ্যাপতি। বিদ্যাপতি ‘অরোরা ফিল্ম কর্পোরেশন’-এর পরিবেশনায় ‘চিত্রা’ প্রেক্ষাগৃহে মুক্তিলাভ করে। এই চলচ্চিত্রের কাহিনি কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত নাটক ‘বিদ্যাপতি’ অবলম্বনে রচিত। বিদ্যাপতি চলচ্চিত্রে নজরুল ইসলামের একটি গান ও সুর ব্যবহৃত হয়েছে। গানটি হলো: ‘রাই বিনোদিনী দোলো’।একই বছরে বিদ্যাপতি চলচ্চিত্র হিন্দি ভাষায় ও মুক্তি পায়।

১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দে ‘দেবদত্ত ফিল্মস’-এর প্রযোজনায় মুক্তি পায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাহিনি নির্ভর চলচ্চিত্র গোরা। এই চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালক ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। গোরা চলচ্চিত্রের ৫টি গানের মধ্যে ৩টি রবীন্দ্রসংগীত, ১টিনজরুল-সংগীত ও বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখিত১টি গান ব্যবহৃত হয়। এই চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের একটি ঘটনার উল্লেখ করা আবশ্যক। এ থেকে নজরুলের সাংগীতিক জ্ঞানের স্বীকৃতির পরিচয় পাওয়া যায়। ঘটনাটি নিতাই ঘটকের স্মৃতিচারণায় পাওয়া যায় নিম্নরূপে:

দেবদত্ত ফিল্মস রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’র চিত্ররূপ তুললেন। সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। তখন বিশ্ব ভারতীয় সঙ্গীত বিভাগীয় বোর্ড থেকে রেকর্ড বা ফিল্মের গানগুলির জন্য অনুমতি নিতে হতো। কবি নজরুল বিনা অনুমতিতেই কিন্তু ‘গোরা’র গান করেছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল অন্তত পক্ষে তিনি যেখানে সঙ্গীত পরিচালক বিশ্বভারতীর বোর্ড সেখানে কোন রকম আপত্তি তুলবেন না, কিন্তু ছবিটির মুক্তির জনীর২/১দিন পূর্বে ‘ট্রেডশো’রদিন বিশ্বভারতীর পর্যবেক্ষক এসে কবির গাওয়ানো গানগুলির ত্রুটি ধরলেন এবং ছবির মুক্তি বন্ধ করলেন। প্রডিউসারের মাথায় হাত। কবি সঙ্গে সঙ্গে একটি গাড়ীতে করে ‘গোরা’ ফিল্মটির কপি, একটি ছোট প্রজেকশনমেশিন, সঙ্গে দেবদত্ত ফিল্মস এর প্রোপ্রাইটার ও তখনকার তাঁর সহকারী মানুগাঙ্গুলীকে নিয়ে সোজা শান্তিনিকেতন চলে গেলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের কাছে। বিশ্ব কবি তো তাঁকে দেখে প্রথমে অবাক হয়ে পরমুহুর্তে আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলেন।

কুশলাদি জিজ্ঞেস করে বললেন, ‘এসেছোই যখন কয়েকদিন আমার কাছে থেকে যাও’।নজরুল বললেন, ‘সেতো আমার সৌভাগ্য কিন্তু এখন যে এক ভীষণ বিপদ থেকে উদ্ধার পেতে আপনার কাছে ছুটে এসেছি’। তারপর তিনি ছবি সংক্রান্ত সমস্ত ব্যাপার বললেন। বিশ্বভারতীর বোর্ডের অনুমোদন না পাওয়ার কথাও আনলেন। শুনে বিশ্বকবি বেশ অসন্তুষ্ট স্বরে অভিমত প্রকাশকরলেন ‘কীকাণ্ড বলতো? তুমি শিখিয়েছ আমার গান আর ওরা কোন আক্কেলে তার দোষ ধরে...? তোমার চেয়েও আমার গান কী তারা বেশি বুঝবে? আমারগানের মর্যাদাকী ওরা বেশি দিতে পারবে? কবি নজরুল বললেন, ‘কিন্তু লিখিত অনুমতি না পেলে সামনের ঘোষিত তারিখে ছবিটির মুক্তি দেওয়া যাবেনা। আপনি দয়া করে আজ একসময় ছবিটি দেখুন; আমি প্রজেক্টর ফিল্ম সঙ্গে করে এনেছি। তারপর অনুমতি পত্রে একটা সই করে দিন।’ বিশ্ব কবি বললেন ‘ছবি দেখাতে চাও সকলকেই দেখাও, সবাই আনন্দ পাবে। আপাতত দাও কিসে সই করতে হবে।’ এই বলে কবির হাত থেকে আগের থেকেই লিখে রাখা অনুমতিপত্র নিয়ে তাতে সইও তারিখ দিয়ে দিলেন। নির্দিষ্ট দিনেই ছবিটি মুক্তি পেল।

এ ঘটনা হতে ধারণা করা যায়; নজরুলের সাংগীতিক প্রতিভার গভীরতা সম্পর্কে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ও অবগত ছিলেন। গোরা চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত নজরুল-সংগীতটি হলো: ‘ঊষা এলচুপিচুপি’।

১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দে মুক্তি লাভ করে সাপুড়ে চলচ্চিত্র। এই চলচ্চিত্রের গীতিকার, সুরকার ও কাহিনিকার কাজী নজরুল ইসলাম। সাপুড়ে চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত ৮টি গানের মধ্যে ৭টির গীতিকার ও সুর কারছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। সাপুড়ে চলচ্চিত্রের গানগুলো হলো: ‘আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ওই’; ‘কথা কইবেনা বউ’; ‘কলার মান্দা সবা নিয়ে দাওগো’; ‘পিছল পথে কুড়িয়ে পেলাম’; ‘ফুটফুটে ঐ চাঁদ হাসেরে’; ‘দেখিলো তোর হাত দেখি’; ‘হলুদ গাঁদার ফুল রাঙাপলাশ ফুল’; ‘আমার এই পাত্রখানি ভরেনা সুধায় জানি’ (এই গানটি অজয়ভট্টাচার্য রচিত)।

সাপুড়ে চলচ্চিত্রের গানে কণ্ঠ দিয়েছেন এমন একজন শিল্পী কাননদেবী। তিনি তাঁর ‘কবি প্রণাম’ প্রবন্ধে লিখেছেন:

আমি তরা গরাগিনী কিছু বুঝতাম না। কিন্তু লক্ষ্য না করে উপায় ছিলনা কি সীমাহীন ব্যাকুলতায় তিনি কথার ভাবের সঙ্গে মেলাবার জন্য হার্মোনিয়াম তোলপাড় করে সুর খুঁজে বেড়াতেন।ঠিক যেন রাগের মর্ম থেকে কথার উপযুক্ত দোসর অন্বেষণ।

এই চলচ্চিত্রের ‘আকাশে হেলান দিয়ে’ গানটি শেখার সময় নজরুল ইসলাম তাকে গানের বাণীর সাথে সুরের সাযুজ্য বুঝিয়ে দিয়েছেন নানাভাবে। কাননদেবীর ভাষায়:

শেখাতে শেখাতে বলতেন, মনে মনে ছবি এঁকে নাও নীল আকাশ দিগন্তে ছড়িয়ে আছে। তার কোন সীমানেই, দুদিকে ছড়ানোই তছড়ানোই। পাহাড় যেন নিশ্চিন্ত মনে তার ইগায়ে হেলান দিয়ে ঘুমোচ্ছে। আকাশের উদারতার বুকে এই নিশ্চিন্ত মনে ঘুমোনোটা প্রকাশ করতে হলে সুরের মধ্যেও একটা আয়েশ আনতে হবে। তাই একটু ভাটিয়ালীর ভাব দিয়েছি। আবার ঐ পাহাড় ফেটে যে ঝর্ণা বেরিয়ে আসছে তার চঞ্চল আনন্দকে কেমন করে ফোটাবে? সেখানে সাদামাটা সুর চলবে না। একটু গীটকি রীতানের ছোঁয়াচাই । তাইবো-ও-ও-অইবলেছুটলো ঝর্ণার [ঝরনার] আত্মহারা আনন্দে। এমনই করে তিনি এই মেলানোর আনন্দ আমাদের হৃদয়েও যেন ছড়িয়ে দিতেন।

১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দে ‘রূপবাণী’ প্রেক্ষাগৃহে মুক্তিলাভ করে ছায়াছবিনন্দিনী। এই চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত ৯টি গানের মধ্যে একটি গানের গীতিকার ও সুরকার কাজী নজরুলইসলাম। গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত শিল্পী শচীনদেববর্মণ। শচীনদেব বর্মণ তাঁর ‘কাজীদা’ প্রবন্ধে লিখেছেন:

তাঁর যে কখানা গান আমি রেকর্ড করেছি; তার প্রত্যেকটিতেই কাজীদার [...] স্পর্শে আমার গান সকলের প্রিয় হয়ে উঠেছে। তাঁর গান গেয়ে যে আনন্দ ও তৃপ্তি পেয়েছি তা আমার মনে সর্বদাই গেঁথে আছে ও থাকবে। তাঁর গান গেয়ে আমি ধন্য হয়েছি।

নন্দিনী চলচ্চিত্রের গানটি হলো: ‘চোখ গেল চোখ গেল’। ‘পদ্মার ঢেউরে’ গানটি এই চলচ্চিত্রের জন্য রেকর্ড করা হলেও পরবর্তীপর্যায়ে ব্যবহৃত হয়নি।

১৯৪২খ্রিষ্টাব্দে মুক্তিলাভ করে চৌরঙ্গী চলচ্চিত্র। এই চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত ৯টি গানের মধ্যে ৮টি গানের গীতিকার ও সুরকার কাজী নজরুল ইসলাম। চৌরঙ্গী চলচ্চিত্রের গানগুলো হলো: ‘ওগো বৈশাখী ঝড়’; ‘ঘুম পাড়ানী মাসিপিসি’; ‘ঘরছাড়া ছেলে’; ‘চৌরঙ্গী চৌরঙ্গী’; ‘প্রেম আর ফুলের’; ‘রুম্ম্ঝুম্ঝু ম্রুম্ম্ঝুম্’; ‘জহরত পান্না হীরার বৃষ্টি’; ‘সারাদিন পিটিকার দালানের ছাদ’; ‘আরতি প্রদীপজ্বালি’ (এই গানটি নবেন্দু সুন্দর রচিত)। চৌরঙ্গী চলচ্চিত্রটি পরবর্তীসময়ে হিন্দি ভাষায় ও নির্মিত হয়।

১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দে ‘নিউথিয়েটার্স’-এর প্রযোজনায় মুক্তি পায় ছায়াছবি দিকশূল। এই চলচ্চিত্রে নজরুল ইসলামের ২টি গান ব্যবহৃত হয়। গান দুটি হলো: ‘ঝুমকোল তার জোনাকী’ এবং ‘ফুরাবেনা এই মালা গাঁথা’।

১৯৪৫খ্রিষ্টাব্দে মুক্তি পায় ছায়াছবি অভিনয় নয়। এই চলচ্চিত্রে নজরুল ইসলামের একটি গান ব্যবহৃত হয়। গানটি হলো: ‘ও শাপলা ফুল নেবনা বাবলা ফুলএনেদে’।

কাজী নজরুল ইসলাম সম্পৃক্ত মোট চলচ্চিত্রের সংখ্যা কত তা সঠিকভাবে বলা সম্ভব নয়। কারণ অনেক চলচ্চিত্রে তাঁর সম্পৃক্ততার কথা শোনা গেলেও তথ্য-প্রমাণের অভাবে এখন পর্যন্ত সেগুলি উদ্ঘাটন করা সম্ভব হয়নি। চলচ্চিত্র গবেষক অনুপম হায়াৎ তাঁর চলচ্চিত্র জগতে নজরুল গ্রন্থের ভূমিকায় নজরুল সম্পৃক্ত নিম্নোক্ত চলচ্চিত্র সমূহ উল্লেখ করেছেন:

(১) নারী (২) ধূপছায়া (৩) প্রহলাদ (৪) বিষ্ণুমায়া (৫) ধ্রুব (৬) পাতালপুরী (৭) গ্রহেরফের (৮) বিদ্যাপতি (বাংলা) (৯) বিদ্যাপতি (হিন্দি) (১০) গোরা (১১) সাপুড়ে (বাংলা) (১২) সাপেরা (হিন্দি) (১৩) নন্দিনী (১৪) চৌরঙ্গী (বাংলা) (১৫) চৌরঙ্গী (হিন্দি) (১৬) দিকশূল (১৭) অভিনয়নয় (১৮) বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম (প্রামাণ্য চিত্র) (১৯) বিদ্রোহী কবি (প্রামাণ্য চিত্র) (২০) কবি নজরুল (প্রামাণ্য চিত্র) (২১) কাজী নজরুল ইসলাম (প্রামাণ্য চিত্র)।

গণযোগাযোগের শক্তিশালী এই মাধ্যমটির উন্নতিকল্পে নজরুল ইসলামের পরিকল্পনার কথা জানা যায়। তিনি শেরে বাংলা একে ফজলুলহক’সহ আরও কয়েকজনকে নিয়ে গঠন করেছিলেন বিটি পিকচার্স অর্থাৎ ‘বেঙ্গল টাইগার পিকচার্স’। ‘১৯৪১সালের ১৩সেপ্টেম্বর ওস্তাদ মুহম্মদ হোসেন খসরুর কলকাতাস্থ বাসায় এই কোম্পানির প্রথম সভাহয়।দ্বিতীয় সভা অনুষ্ঠিত হয় ওই বছরের ১৯নভেম্বর আব্বাস উদ্দিন আহমদের আবাসস্থল স্যাভয়ে। ওখানে কাজী নজরুলকে নিয়ে একটি কমিটি গঠিতহয়। কোম্পানির পরবর্তী সভায় সভাপতিত্ব করেন কাজী নজরুল ইসলাম।’ এই প্রতিষ্ঠান থেকে ‘মদিনা’ নামে একটি চলচ্চিত্র প্রযোজনার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল।চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করার কথা ছিল কাজী নজরুল ইসলামের। কিন্তু তা আর সম্ভব হয়নি।কারণ তার পূর্বেই ১৯৪২সালের ৯জুলাই কাজী নজরুল ইসলাম অসুস্থ হয়ে পড়েন। ফলে বিটিপি কচার্স-এর কর্মকাণ্ড আর অগ্রসর হয়নি।

পঞ্চগীতি কবিদের মধ্যে একমাত্র কাজী নজরুল ইসলামই চলচ্চিত্রের বিভিন্ন কর্মের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। তাঁর বহু গান ও সুর বাংলা চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত হয়েছে এবং ভবিষ্যতে ও হবে। যেমন কলকাতার চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন (১৯৪৯); শ্রীশ্রী তার কেশ্বর (১৯৫৮); দাদা ঠাকুর (১৯৬২); হাঁসুলি বাঁকের উপকথা (১৯৬২); বারবধূ (১৯৭৮); দেবদাস (১৯৭৯) প্রভৃতি চলচ্চিত্রে কাজী নজরুল ইসলামের গান ব্যবহৃত হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ ভূখণ্ডে ওস্বাধীন বাংলাদেশে নির্মিত নবাব সিরাজউদ্দৌলা (১৯৬৭); আমির সওদাগর ও ভেলুয়াসুন্দরী (১৯৭০); জীবন থেকে নেয়া (১৯৭০); বধূবিদায় (১৯৭৮); লাইলী মজনু (১৯৮৩); রাজ লক্ষ্মী শ্রীকান্ত (১৯৮৭) প্রভৃতি চলচ্চিত্রে নজরুল-সংগীত ব্যবহৃত হয়েছে।

কাজী নজরুল ইসলামের কাহিনি নিয়েও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে বাংলাদেশে। তন্মধ্যে সুখদুঃখ (১৯৭১); মায়ার বাঁধন (১৯৭৬); জিনের বাদশা (১৯৯০); মেহেরনেগার (২০০৫); রাক্ষুসী(২০০৬) উল্লেখযোগ্য। কাজী নজরুল ইসলামের এই অবদান চলচ্চিত্রে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। চলচ্চিত্রে তাঁর অসামান্য অবদান এখনও পরিপূর্ণভাবে উদ্ঘাটিত হয়নি । তাই নজরুল গবেষকদের উচিত বিস্তৃত গবেষণার মাধ্যমে অনুদ্ঘাটিত চলচ্চিত্রসমূহ উদ্ঘাটন করে নতুন প্রজন্মের কাছে পরিপূর্ণরূপে কাজী নজরুল ইসলামকে উপস্থাপন করা।

লেখক, ড. পরিতোষ কুমার মণ্ডল



মন্তব্য করুন


লিট ইনসাইড

কবিতা

প্রকাশ: ০২:০৩ পিএম, ২৩ মার্চ, ২০২৪


Thumbnail




মন্তব্য করুন


লিট ইনসাইড

বিশ্বের সেরা এবং আকর্ষণীয় পাচ মসজিদ

প্রকাশ: ১১:০২ এএম, ২৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪


Thumbnail

বিশ্বের এমন পাঁচটি মসজিদ সম্পর্কে জেনে নিন:


১. মসজিদুল হারাম, মক্কা, সৌদি আরব:

বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মানুষ দেখতে যায়, এমন মসজিদের তালিকায় সবার প্রথমে আছে পবিত্র নগরী মক্কার মসজিদুল হারাম। প্রতিবছর প্রায় ৮০ লাখ মানুষ এই মসজিদে যান। এটিই বিশ্বের সবচেয়ে বড় মসজিদ। একসঙ্গে ১৫ লাখ মানুষ এখানে প্রবেশ করে ঘুরে দেখতে পারেন। মুসলমানদের কাছে সবচেয়ে পবিত্র তিন স্থানের একটি এই মসজিদুল হারাম। মুসলমানদের কিবলা পবিত্র কাবাশরিফ এখানেই অবস্থিত।

তবে যে কেউ চাইলেই মসজিদুল হারামে প্রবেশ করতে পারেন না। অমুসলিমদের জন্য মক্কা নগরীতে প্রবেশ পুরোপুরি নিষিদ্ধ।


২. শেখ জায়েদ মসজিদ, আবুধাবি, সংযুক্ত আরব আমিরাত:

২০০৭ সালে স্থাপিত এই মসজিদ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মসজিদগুলোর একটি। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ঝাড়বাতি ও সবচেয়ে বড় গালিচাও আছে এই মসজিদে।

আরব আমিরাতে বসবাসকারীদের বেশির ভাগই প্রবাসী, যাঁরা মূলত শ্রমজীবী হিসেবে বিভিন্ন দেশ থেকে সেখানে যান। এই বৈচিত্র্যময়তাই মসজিদটির নকশার মূল ভিত্তি। ব্রিটিশ, ইতালীয় ও আমিরাতি স্থপতিরা মিসর, মরক্কো, তুরস্ক, পাকিস্তানসহ বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম দেশের মসজিদের নকশা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে শেখ জায়েদ মসজিদের নকশা এঁকেছেন।

প্রতিবছর মসজিদটি দেখতে প্রচুর দর্শনার্থী আসেন। শুধু ২০১৭ সালেই এসেছেন প্রায় ৫৮ লাখ দর্শনার্থী। নামাজের সময় ছাড়া অন্য সময় অমুসলিম দর্শনার্থীরাও মসজিদ ঘুরে দেখতে পারেন। তবে শুক্রবার অমুসলিম দর্শনার্থীদের এই মসজিদে প্রবেশ নিষেধ।


৩. আয়া সোফিয়া, ইস্তাম্বুল, তুরস্ক:

ইউরোপের সবচেয়ে আকর্ষণীয় শহরগুলোর একটি তুরস্কের রাজধানী ইস্তাম্বুল। আর ইস্তাম্বুল বা গোটা ইউরোপের অন্যতম সুন্দর মসজিদ আয়া সোফিয়া। ৩৬০ খ্রিষ্ট-পূর্বাব্দে স্থাপিত এ স্থাপনা শুরুতে মসজিদ ছিল না। ১৪৬৩ সালে সুলতান মেহমেদ এটিকে মসজিদ হিসেবে স্বীকৃতি দেন।

১৯৩৪ সালে এটিকে জাদুঘরে রূপান্তরিত করে তৎকালীন তুরস্ক সরকার। কিন্তু ২০২০ সালে তুরস্কের রাষ্ট্রপতি রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এটিকে আবার নামাজ আদায়ের জন্য মুসল্লিদের কাছে উন্মুক্ত করে দেন। ১৯৮৫ সালে আয়া সোফিয়াকে বিশ্ব ঐতিহ্যর স্বীকৃতি দেয় ইউনেসকো।


৪. আল–আকসা মসজিদ, পূর্ব জেরুজালেম, ইসরায়েল:

মুসলিম স্থাপত্যশৈলীর শুরুর দিককার অন্যতম নিদর্শন জেরুজালেমের আল–আকসা মসজিদ।

বলা হয়ে থাকে, খোলাফায়ে রাশিদিনের অন্যতম খলিফা হজরত উমর (রা.)–র শাসনামলে ৬৩৭ খ্রিষ্টাব্দে শুরু হয় মসজিদটির নির্মাণকাজ। তবে বর্তমানে আল-আকসা বলতে পুরো চত্বরটাকেই বোঝানো হয়। ‘হারাম আল শরিফ’ নামে পরিচিত এই চত্বরের চার দেয়ালের মধ্যে আছে কিবলি মসজিদ, কুব্বাতুস সাখরা (ডোম অব দ্য রক) ও বুরাক মসজিদ। মূল আল–আকসা বা কিবলি মসজিদ হলো ধূসর সীসার পাতে আচ্ছাদিত গম্বুজওয়ালা একটি স্থাপনা। তবে পর্যটকের কাছে আল–আকসা নামে বেশি প্রসিদ্ধ সোনালি গম্বুজের স্থাপনা কুব্বাতুস সাখরা।

জেরুজালেমের সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন এই মসজিদ ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের তালিকায় উঠে আসে ১৯৮১ সালে। এখানে প্রায় চার লাখ মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন । তবে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে দখলকৃত পূর্ব জেরুজালেমে অবস্থিত আল-আকসা মসজিদ বন্ধ করে দিয়েছে ইসরায়েলি পুলিশ। কোনো মুসল্লিকে তারা মসজিদ প্রাঙ্গণে ঢুকতে দিচ্ছে না। পবিত্র স্থানটির দায়িত্বে থাকা ইসলামিক ওয়াক্‌ফ বিভাগ এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।


৫. দ্বিতীয় হাসান মসজিদ, কাসাব্লাঙ্কা, মরক্কো:

আলজেরিয়ার জামা এল জাযের মসজিদের মিনার সবচেয়ে উঁচু, ৮৭০ ফুট। তারপরেই কাসাব্লাঙ্কার দ্বিতীয় হাসান মসজিদের মিনার, উচ্চতা ৬৮৯ ফুট। মরক্কোর বাদশাহ দ্বিতীয় হাসানের তত্ত্বাবধানে নির্মিত মসজিদটির নকশাকার ফরাসি স্থপতি মিশেল পিনসু।

আটলান্টিক মহাসাগরের একটি শৈলান্তরীপের মাথায় মসজিদটির অবস্থান। মেঝের একটা অংশ স্বচ্ছ কাচের বলে আটলান্টিকের নীল পানি দেখতে পান নামাজে যাওয়া মুসল্লিরা। দেয়ালে মার্বেলের চোখধাঁধানো কারুকাজ। ছাদ অপসারণযোগ্য বলে নামাজ পড়তে যাওয়া মুসল্লিরা রাতের আকাশও দেখতে পান।

দ্বিতীয় হাসান মসজিদের মিনার থেকে একটি লেজাররশ্মি মুসলমানদের কিবলা কাবাঘরের দিকে তাক করা। অনন্য স্থাপত্যশৈলীর জন্য জগৎ–খ্যাত এই মসজিদে একসঙ্গে ১ লাখ ৫ হাজার মুসল্লির নামাজ আদায় করার সুবিধা আছে।


মসজিদ   সেরা  


মন্তব্য করুন


লিট ইনসাইড

মুখের ঠিকানা

প্রকাশ: ১২:১৬ পিএম, ২১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪